06 Feb

নাড়ায় আগুন ছিল

লিখেছেন:মৃন্ময় চক্রবর্তী


চৈত্রের দুপুরে দখিনা হাওয়া বইছে ধীর। হলুদ পাতা পড়ছে টুপটাপ।  কতগুলো মেয়ে ঝুড়ি নিয়ে ভাঙা রাস্তার কোলে পাতা কুড়োচ্ছে। খালের ওপারে শিরিষগাছে কোকিল ডাকছে।

রঞ্জনের ভাঙা সাইকেল ঝনঝন করে চলেছে দুপুরের নিস্তব্ধতা ভাঙতে ভাঙতে। রাস্তায় একহাঁটু ধুলো। ঠেলতে ঠেলতে সাইকেলের চাকা মলিন। সে যাবে দক্ষিণের আবাদ। সেখানে আগুন জ্বলেছিল একদিন। তার কিছু দাগ ফসিলের মত এখনো কোথাও খোদিত আছে কিনা ছুঁয়ে দেখবে একবার সে।

ধুধু মাঠে গোরু চরছে। রঞ্জন দেখল, বনসৃজনের পঞ্চায়েতি ইউক্যালিপটাস, বাবুলের লম্বমান একচিলতে ছায়ায় এক বৃদ্ধ রাখাল লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

সে থামল একটু সেখানে। রাখাল গৌরবর্ণ সুন্দর মানুষ। সম্পূর্ণ খালি গা, কাছা বেঁধে পরা ধুতি, থুতনিটুকু লাঠির ডগায় রেখে মর্মরমূর্তির মত স্থির। ঘাড় ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল তাকে, কোথায় যাবেন?

প্রশ্ন করার আগেই প্রশ্ন শুনে বিব্রত হল রঞ্জন। জানতে চাইল, দখিনাবাদ কতদূর?

-দখিনাবাদের কোথায় যাবেন?

রঞ্জন এই ফাঁকা মাঠে দাঁড়িয়ে ভাবল বৃদ্ধের কৌতুহল মেটালে অসুবিধা নেই।

– যাব ভিগুরামের বাড়ি, পথ বলে দিতে পারেন?

– আমি নতুনাবাদ হাইস্কুলের মাস্টার ছিলুম। লড়াই করিনি কিন্তু সমর্থক ছিলুম। মহাদেবদা খুন হল। আমি জানি সব। সোজা পোল পেরিয়ে চলে যান। গ্রামের মাঝখানে বাড়ি পেয়ে যাবেন।

রঞ্জন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ভাবল ইনি এতটা অনুমান করলেন কি করে, ইনি কি রাজনৈতিক পুলিশ ? সে জেনেছে গ্রামের মানুষ অনুমানে অনেক কিছু বোঝে, সে স্থির হল। বিদায় জানাল তাকে। বৃদ্ধ মাস্টার বললেন ফেরার পথে দেখা করতে, তাঁর কাছে অনেক গল্প আছে।

সাইকেল জোয়ারার পোল পেরিয়ে বনবিবিতলা ছাড়িয়ে ঢুকে পড়ল গ্রামে। এটাই দক্ষিণের আবাদে। পিকিং রেডিও একদিন প্রচার করেছিল এই গ্রামের কথা।

 

বাঁশবনে কুঁকো নাচছে। মাঠে বাতিল মটরশুঁটির গাছ পড়ে আছে অযত্নে। সব কোলাহল চাপা দিয়ে আছে মগ্ন দুপুর। এখানে ওখানে ইতস্তত ছড়ানো খড়, খড়ের পালা। মাটির দেওয়াল, জোড়া ঘুঁটের আলপনা পেরিয়ে রাস্তা আরো সংকীর্ণ হয়ে ঢুকে পড়ল তালগাছের দুসারির মাঝখানে। এক কিশোর পথ দেখিয়ে দিল রঞ্জনকে। অই যে পুকুরের পাড়েই ঘর।

উঠোনে এসে দাঁড়াল রঞ্জন। ঝিমোনো স্তব্ধতা ভেঙে গেল সাইকেলের শব্দে। বারান্দায় ঘুমন্ত কেউ উঠে পড়ল ধড়মড়িয়ে

– কে?

– এটা কি ভিগুরাম মণ্ডলের বাড়ি?

– হ্যাঁ, আপনি কে?

– আমি ওনার সঙ্গে কথা বলতে চাই!

– বাবা ও বাবা….আসুন আমার সঙ্গে। বাবা ও বাবা!

রঞ্জন নারকেল গাছের গায়ে হেলিয়ে রাখল সাইকেল। তারপর ভিগুরামের ছেলের সঙ্গে বাড়ির পিছনদিকে এসে দাঁড়াল।

এক দীর্ঘকায় বৃদ্ধ জাল বুনছে। গায়ের রঙ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। কোমরে একফালি ধুতি, সারাগায়ে আর কিছু নেই। তার পেশীগুলো এখনো নিটোল। বয়স তার মেরুদণ্ডকে একফোঁটা জব্দ করতে পারেনি।

ভিখুরাম রঞ্জনের দিকে তাকাল। রঞ্জন ভিখুর দিকে।

– আপনার খোঁজে এলাম!

– কে বললে আমার কথা?

– ইতিহাসের পাতায় আপনার নাম পেয়েছি!

ভিখুর চোখ রক্তিম হয়ে উঠল, কেঁপে উঠল ঠোঁট। বৃদ্ধ চোখ ঠেলে জল এসে ভাসিয়ে নিল রঞ্জনকে। তারা আলিঙ্গন করল। আলিঙ্গনের এমন উষ্ণ নিবিড়তা রঞ্জন এর আগে অনুভব করেনি।

– কই গেলে, দেখে যাও আমার কমরেড এসেছে !

তার আবেগময় ডাক শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এল তার বৃদ্ধা রুগ্ন স্ত্রী। রঞ্জনকে দেখে ব্লাউজহীন পিঠটা পরনের কাপড়ে ঢাকল, তারপর ঘোমটা টেনে এগিয়ে এল।

ভিখুরাম রঞ্জনকে তার ঘরে নিয়ে এল। বসাল খেজুরপাতার চাটাইয়ে।

 

২.

গুড়ের চা খেতে খেতে চুপচাপ শুনে গেল রঞ্জন। ভিগুর নিকোনো দাওয়ায় রোদ নেমে গেছে। বুড়ো বলল চলো কমরেড তোমায় দেখিয়ে আনি বাগারখোল কি জিনিস।

মেঠো পথে হাঁটতে হাঁটতে রঞ্জন ভাবতে লাগলো একদিন এই মাঠ কত না চঞ্চল ছিল। চারপাশে ছিল বিস্তর আগুন।

পথের দু পারে ঘেঁটু ফুলে মৌমাছি উড়ছিল, আকাশে উড়ছিল গাঙচিল। সুতিগাঙ দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল জল। কত জল বয়ে গেছে এর আগে, কত জল বয়ে যাবে আরো।

–ও ই যে দেকচ বাঁধ, ওখেন থেকে একেবারে সাধুর মাঠ অবধি আমরা ফতে মোল্লার দলবল কে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলুম। ওদের বন্দুক আমাদের তীর!

রঞ্জন তাকিয়ে দেখল যতদূর চোখ যায় ধান আর ধান। অথচ একদিন এসব জলকর করে রেখেছিল নস্কর জমিদাররা। চাষজমিকে জলজমি করে দিতে পারলেই ঠেকানো যাবে সিলিং, জমি আর খাস হবেনা!

— লালঝাণ্ডা তেভাগ হল। প্রথম বড় ভাগ চিয়াঙের দোস্তের সাথে হাত মিলিয়ে চাষিদের লড়াইয়ের সাথে বেইমানি করল।

‘চিয়াঙের দোস্ত’, অজানা শব্দটি শুনে সে যতটা না অবাক হল তার চেয়ে মুগ্ধ হল বেশী। কি অসাধারণ ব্যাখ্যা, যারা রাজনীতি বোঝে তাদের আর কিছু বলার দরকার হবেনা। চিন বিপ্লবের শত্রু চিয়াংকাইশেক, তার এদেশীয় দোস্ত। বাহ চমৎকার! সে নীরবেই বুড়োকে বাহবা দিল।

— ফতে মোল্লা প্রথম দলের নেতা, সে-বোম-পিস্তল-পাইপগান লাঠি নিয়ে এসে বাজনা বাজিয়ে জমি দখল নিত। নতুন লালঝাণ্ডার নেতা গঙ্গাদারা একটু দুর্বল ছিল। কিছু ঘটলি মহাদেবদার কাছে ছুটি আসত।

–আমি তখন কোনো দল করিনা। মহাদেবদার সঙ্গে ভোর ভোর কোদাল কাঁধে নে বেরিয়ে পড়ি, ফিরি সেই রাতে। মাটি না কাটলি, জাল না টানলি মাইলো গোলাও জোটেনা, তখন এমন কাল।

–মহাদেবদা, তুলসীদা পুরোনো পাটির লোক। ওরা কৃষক সভা করত। ক্ষেতমজুর আন্দোলনে ছিল। ওদের সঙ্গে তলায় তলায় নতুন ঝান্ডার ভেতরকার খাঁটি কমরেডদের যোগাযোগ হয়েছিল কি করে যেন।

–তো সেবারে আমি, তপনদা, মহাদেবদা কৃষকদের জড়ো করি ফতে মোল্লার কেরামতি থামিয়ে দিলুম। আমাদের হাতে শুধু তীর আর কয়েকটা পাইপ। তীরের চোটে তপনদা আর মহাদেবদার সামনে কেউ দাঁড়াতি পাল্লে না। আমাদের কয়েকজনের হাতে পাইপ দেখে বন্দুক ভেবে আরো ভিরমি খেল তারা। সেই আমার প্রথম লড়াই বুঝলে কমরেড। এই সেই মাঠ।

মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছিল রঞ্জন। হঠাৎ মাঠের ভেতর দাঁড়িয়ে পড়ল ভিগু।

–এই এই দেখো। এই হল গে বাগারখোল। এখন আর দেখা যায়না। দু এট্টা এখনো আছে এদিক ওদিক।

–এখনো বাঘ আসে নাকি এদিকে?

— হা হা এখন বাঘ কোতায় পাবে তুমি? সে তো আমরাও দেখিনি। তবে শুনিচি শীতের সময় নাকি আসত আর এই গত্তে লুকিয়ে থাকত। তাই এগুলোর নাম হয়েচে বাগারখোল। এখন সব শ্যালের আস্তানা।

সূর্য ঢলে যাচ্ছিল পশ্চিমে। পশ্চিমের গেরুয়া আভায় সুতিগাঙের জল যেন গলন্ত লোহার মত দেখাচ্ছিল।

–চল নিতাই সাধুর সাথে দেখা করিয়ে আনি, সে আমাদের দেশব্রতীর কমরেড!

গ্রাম ছাড়িয়ে মাঠ পার হয়ে সুতিগাঙের পাড়ে, দূরে একান্ত নির্জনে, বাসক, আকন্দ, ধুতরোর ঝোপে ঘেরা সাধুর জীর্ণকুটির।

 

৩.

মাথায় ঝনঝন করছে রোদ। সারা গায়ে ঘাম ঝরছে রঞ্জনের। এতখানি রাস্তা একনাগাড়ে সাইকেল চালিয়ে আসা কম কথা নয়। মাঝেমাঝেই তার দেখা করতে ইচ্ছে হয় বুড়ো ইস্পাতের সাথে। বড্ড ভালবেসেছে সে ভিগুরামকে। এত সুন্দর কথা বলে সে, কে বলবে নিরক্ষর!

বনবিবিতলার বাঁকে অশথগাছের নিচে একটু দাঁড়ালো রঞ্জন। ঝিরঝির হাওয়া লাগছে, আহ… বড্ড ভাল লাগছে তার। শরীরের ঘামটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। এখান থেকে কিছুটা দূরেই গেঁড়িপোতা, একদা পর্তুগিজ নৌঘাঁটি। সেখানে ও বহুবার গেছে, দেখার কিছু নেই, শুধু কয়েকটা প্রাচীন ইঁটের দেওয়াল। এই অঞ্চলে অনেকেরই চোখের মণি নীল। গোপনে অনেকেই এই পর্তুগিজ অবদানের কথা স্বীকার করে।

রঞ্জন দেখল দূরে একটা লোক দুলতে দুলতে আসছে। কাঁধে বাঁক থাকলে হাঁটার এই বিশেষ ছন্দের প্রয়োজন হয়। ও তাকিয়ে থাকে সেদিকে। ঘর্মাক্ত শ্যামদেহে সূর্যরশ্মি ঠিকরোচ্ছে।

–ভিগুদা না? সে আপনমনেই বলে ওঠে।

দুজন সামনাসামনি হয়  অশ্বত্থতলায়। ভিগু তাকে দেখে হাসে। হাসিতে তার আনন্দ। রঞ্জন কুশল জানতে চায় তার কাছে। ভিগু শিকড়ের উপর বসে ঘাম মুছতে মুছতে গল্প করে।

–বুঝলে কমরেড এই বুড়ো বয়সেও পরের বোঝা টেনে যাচ্ছি। ছেলেদের আয় উপায় বড় কম। তার উপর লাতিনটাকেও ফুসলে নিয়ে গিয়ে পেট বাঁধিয়ে ফেরত দে গেল। পঞ্চাতের ছাবাল, তার বিরুদ্ধে আমি কি করব বলো! আগের দিন হলি ওর বাপ শুদ্ধু নে আসতুম থাবা মেরে!

রঞ্জন নীরবে শোনে। তারও কিছু বলার নেই। বিপ্লবের পরাজয় নেই এই আপ্তবাক্য মেনে গোটাজীবন কাটানো, ক্ষমতার বিপরীতে বাঁচা যে কত কঠিন সে বোঝে। শহিদ হয়ে গেলে এক ব্যাপার। কিন্তু সারাজীবন শহিদত্ব বয়ে বেড়ানো?

–কার বিচালি এগুলো?

–আজ ধান কাটা ছিল। সেখেনে পেলুম কিছু। গ্রামে যাদের গরু আছে তাদের বেচে দেব। কিছু টাকা পাবো !

–ও আচ্ছা!

আবার নীরব হয় তারা। আচমকা, ‘কমরেড কমরেড ‘ ডাক শুনে পিছন ঘুরে দেখে ভাঙা সাইকেলে হাত নাড়তে নাড়তে নিতাই সাধু আসছে। আনন্দে ফোকলা দাঁত বেরিয়ে গেল ভিগুর,

— পাগলটা এসে গেল গো, হা হা নাও ঠ্যালা!

রঞ্জনের মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা। সাধু তার গাঙপাড়ের কুটিরে তাকে জোর করে ধরে রেখে তার গাইয়ের দুধ খাইয়েছিল। সে কিছুতেই খাবেনা অথচ সাধু তাকে ছাড়বেনা। শেষপর্যন্ত তাকে খেতেই হল। একদম সদ্য দোয়ানো গরম দুধ, একফোঁটা জল নেই তাতে।

গ্রামে গ্রামে ইস্তেহার বিলি করার জন্য কেমন করে পরনের কাপড় খুলে, তা দিয়ে কাগজ পেঁচিয়ে মাথায় নিত নিতাই, তারপর হাতে লন্ঠন ঝুলিয়ে জোঁক আর সাপের ভয় তুচ্ছ করে বর্ষায় ডোবা মাঠ পেরিয়ে চলে যেত, সযত্নে রাখা পুরোনো কিছু ইস্তাহার দেখাতে দেখাতে সেইসব গল্প শুনিয়েছিল সাধু। শুনতে শুনতে রঞ্জন ভুলে গিয়েছিল রাত হয়ে গেছে তাকে ফিরতে হবে অনেকদূর।

 

৪.

সাধু বেশীক্ষণ দাঁড়াল না, সে যাবে ডায়মন্ডহারবার। কাল তার আখড়ায় মোচ্ছব। পুর্ণিমার বিশেষ তিথিতে উৎসব হয়। রঞ্জনকে খুব করে বলল সাধু, সে যেন অবশ্যই করে পরের বছর যায়। দেখে আসে কেমন তার আশ্রম।

–বিপ্লব তো নেই তাই সাধুর ভেখ ধরিচি। কি করি বলো। এখানেও তো সেই একই মানুষের সেবা! গেলি দেখতি পাবে। তবে হ্যাঁ, বিপ্লব জিনিসটা আলাদা। ফের ডাক পেলি এসব গেরুয়া টেরুয়া ফেলে দে ছুটে চলি আসব কমরেড। চলি একন বেলা নেমে এলো, টেরেন ফেল হলি ঝামেলা। চলি গো দোস্ত!

সাধু শক্ত হাতে ভিগু আর রঞ্জনের সাথে করমর্দন করে বিদায় নিল। যাবার সময় দুজনের হাতে দুটো কলা আর দুটো পেয়ারা দিয়ে গেল। রঞ্জন নিতে চাইছিল না। হয়ত এ তার পথের সম্বল এই ভেবে। ভিগু তাকে নিতে ইঙ্গিত করায় সে নিল। কমরেড দিলে নাকি নিতে হয়!

সাধু চলে গেল সাইকেলে ধুলো উড়িয়ে পশ্চিমে, ওরা হাঁটতে লাগল পুব বরাবর সদ্য ধানশূন্য মাঠের ভেতর দিয়ে। চারদিকে নাড়ার খোঁচা, টুকরো খড়। ভিগু বলল, চলো আজ গগন কবির বাড়ি নে যাই তোমারে, গান শুনবে অখন। আমাদের বিপ্লবী গান। ওস্তাদ বড় ভাল গায়।

রঞ্জন বলল, কিন্তু তুমি বাড়ি যাবে না ভিগুদা? সারাদিন যে খেটে এলে!

–আরে সঙ্গে পান্তা ছিল গো। না খেয়ি কি আচি! গগনের গরুর জন্যি এই খড়গুলো নে যাব। তা এক কাজে দু’কাজ।

ওরা গ্রামে ঢুকে পড়ল। তালসারির মাঝ বরাবর মেটে পথ দিয়ে চলতে চলতে থমকে দাঁড়ালো ভিগু। খানিক গিয়েই বাঁ হাতে ওর বাড়ি। ভিগু আঙুল দিয়ে বড় পুকুরটা দেখালো রঞ্জনকে। পুকুরের পাশে নিঝুম বাঁশবন। দিনের বেলাতেও কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।

–যকন পিডি এ্যাক্টে ওয়ারেন্ট বেরুল। ওই বাঁশবনের পথে রাতের বেলায় লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়িতে আসতুম। একবার খবর পেলুম আমার বউ যে বাচ্চাটা প্রসব করেছিল কদিন আগে, সেটা মরে গেচে। মাইলো গুলো খেয়ে বেঁচে থাকা জেবন বুঝলে না! জান আর কত কড়া হবে। প্রচণ্ড শীতের দিন হাড় জমি যায় এমন। পুলিশের তাড়া, জমিদারের চরের নজর এড়িয়ে বাড়িতে এলুম। আমারে দেখেই বৌ ডুকরে কেঁদে উঠল। আমি সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখ চেপে ধরে বল্লুম চুপ কর, নইলে ধরা পড়ি যাব।

রঞ্জন ভিগুর কথা শুনতে শুনতে অতলে তলিয়ে গিয়ে চেষ্টা করছিল সময়ের দৃশ্য নির্মাণ করতে। আচমকা ভিগু থেমে যেতে সে তাকে তাড়া দিল।

–তারপর ?

–হু, তারপর। তারপর সে রাতে শ্যালের নজরে পড়েছিলুম আমরা। ভোর রাতে বার হয়ি যাব এমন সময় দেকলুম মহাদেবদা আর আমি দুজনেই ধরা পড়ে গেছি। ওরা কোমরে দড়ি দে টেনে নে যাবার সময় আমি কোনোরকমে দড়ি আলগা পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লুম জলে। আমারে আর ধরতি পাল্লে না। কিন্তু মহাদেবদাকে ওরা নে গেল। কাত্তিক, নিতাই নামে দুই গেরিলা চাষী বাঁশবনে লুকিয়ে থেকে মহাদেবদাকে ছাড়াবার জন্যি তক্কে তক্কে ছিল, কিন্তু সুবিধে কত্তি পাল্লে না তারা!

 

গগনের বাড়িতে ঢুকেই বাজখাঁই গলায় ভিগু চিৎকার করে ডাক দিল, গগন আছিস?

ঘরের ভেতর থেকে সাড়া এলো, আছি সেনাপতি!

–হারমনিটা নে বাইরে আয়। আমাদের কমরেড এসেছে গান শোনা দুটো।

–হায়রে কপাল, হারমনি তো খারাপ সেনাপতি, তা কই সে কমরেড, এত দিন বাদে!

গগন বেরিয়ে এল। খালি গা, গলায় তুলসীমালা, একমুখ সাদা দাড়িগোঁফের এক মায়াময় মুখ। সে দাওয়ায় আসন পেতে দিল। রঞ্জন তাতে বসল। ভিগু কাঁধের বাঁক নামিয়ে গগনকে বলল, দেখ দেখি তোর গাইয়ের পোষাবে কিনা!

–দাদা তুমি এসব কেন কত্তি যাও, টাকাকড়ি কিচ্ছু নেবে না শুদুমুদু খাটো কেন আমাদের জন্যি, কি পাও? একফোঁটা দুধ দিলি তো খেতিও চাওনা!

–মেলা বকিসনি গগনা, বৌমাকে খাঁটি দুধের চা কত্তি বল। আর তুই গান শোনা। খালি গলায় তো কম গাসনা!

রঞ্জনও গগনকে অনুনয় করল তার গান শুরু করার জন্য। গগন গাইল,

–চাষী দে তোর লাল সেলাম তোর লাল নিশান রে!

বৃদ্ধ কন্ঠের তুমুল আবেদন তার অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে তুলল। হাত বাড়িয়ে দিল রঞ্জন তার দিকে।

-আহা কি অসাধারণ গলা আপনার গগনবাবু!

 

সূর্য ডুবে গেছে। গগনের গান শুনে মুগ্ধ দুজন ফিরছে সন্ধ্যার পথে। ঘরে ঘরে শাঁখ বাজছে কাঁসরের শব্দ হচ্ছে। ওরা নীরবে হাঁটছে।

–কেমন শুনলে গান?

–এই বয়সেও এত ভাল গলা ভাবা যায় না।

—গগন ছিল আমাদের বিপ্লবী গানের দলের হেড। যেখানে সভা হত গগন সেখানে হাজির। চাষীদের মাতাল করে তুলত গান গেয়ে। আহা কি সেসব গান, ‘লাল রঙ দেখে কিছু লোক ভয়ে হয় জড়োজড়ো!’

আবার ওরা নীরবে হাঁটতে থাকে। দূরে মাঠের এদিক ওদিক আগুন জ্বলতে দেখা যায়। ভিগু আবার কথা বলে।

–বড় অন্যায় করেছি কমরেড। মহাদেবদাকে যখন মিলিটারি পিছমোড়া করে বেঁধে গুলি করি মেরেছে তখন আমি দল ছেড়ে ফতে মোল্লার দলে ঢুকেছিলুম। বলতি পারো সারেন্ডার। মহাদেবদা শিবঠাকুরের মত মানুষ। সংসারের দিকে খেয়াল দেয়নি লোকটা। জীবন বাজি করেছে। আমি একমুঠো ধানের জন্য বিক্রি করিছি নিজেরে।

অন্ধকারে তার হাত চোখের দিকে ওঠে। রঞ্জন বুঝতে পারে তার চোখ ভিজে উঠছে।

—মহাদেবদা জেলে যাবার পর, ফতে মোল্লার নেতা হরি ঘোষ বার বার লোক পাঠিয়ে ডেকে নে যায় আমারে। বলে এ পথ ভুল পথ এ পথ ছাড়ো!

ঘরে তখন একদানাও মাইলো নেই। জমিদারের জমি দখল হচ্ছে ভূমিহীন চাষীকে বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু আমরা যেহেতু লড়াইয়ের মাথা, আমরা নিতি পাচ্ছিনা। পরিবার না খেয়ে মরে যাচ্ছে, বাচ্চাগুলো কাঁদচে। আমাদের নিজের দরকারটুকু দাবি কত্তি পাচ্ছিনা। কারন সবাইকে বিলোনোর পর কিছু থাকচে না!

হরি ঘোষ বললে দল ছেড়ে চলে এসো। আমরা পি ডি কেস থেকে বাঁচাবো, জমি দেব। পাল্লুম না নিজেরে ধরে রাখতে। ভুল রাস্তায় গেলুম। নিজেরে ধরে রাখা যে কি কঠিন ছিল কমরেড, বুঝবে না তোমরা!

কিন্তু তারপর যকন মহাদেবদা শহিদ হল, তকন নিজের প্রতি এট্টা ধিক্কার এলো, থুতু দিলুম নিজেরে!

অনেকবড় অন্যায় করেচি পারলে ক্ষমা করে দিও তোমরা!

রঞ্জন ভিগুর হাত শক্ত করে ধরে থাকল। সে কি বলবে, কি বলা উচিত তার? সে নীরবে তার হাত ছেড়ে দিল।

–আবার এসো কমরেড। বুড়োকে ভুলোনা!

–আসব, নিশ্চই আসব!

 

রঞ্জন নেমে পড়ল মেঠোপথে। ঝনঝন করে এগিয়ে চললো নাড়ার উপর দিয়ে, কখনো আবার সাইকেল আলের ভাঙা পথে উঠে এলো।

মাথার উপর জরির আকাশ। তাকিয়ে দেখল রঞ্জন কালপুরুষ উঁচিয়ে রেখেছে তীর। এখনো পৃথিবীতে যুদ্ধ শেষ হয়নি বলেই কি সে আকাশে ঈঙ্গিত এঁকে রেখেছে? কবে যুদ্ধ শেষ হবে, কবে জিতবে মানুষ?

মাঠের মধ্যে কারা যেন এখানে ওখানে আগুন জ্বালিয়েছিল, এখন সব নিভে গেছে। রঞ্জন যেতে যেতে দেখল নাড়ার ছাই থেকে ধোঁয়া উড়ছে তখনও।

Tags:

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ