08 Mar

পেনে প্রীতি

লিখেছেন:স্বর্ণকুমারী দেবী


আমরা এখন টুরে ফিরিতেছি ; অর্থাৎ ঘুরে বেড়াইতেছি, বেদিয়া জাতির জীবন যাপন করিতেছি। আজ কোনো এক গ্রামপ্রান্তের বৃক্ষ ছায়া সঙ্কুল নিস্তব্ধ বিজন ক্ষেত্রস্থল আমাদিগের বস্ত্রাবাস মন্ডলী এবং সিপাই সান্ত্রী ভৃত্যাদিবর্গে পরিবৃত হইয়া জাগ্রত যমালয় হইয়া উঠিল, সেখানে আবেদন পত্রধারী গ্রাম্যলোকের দলে দলে সমাগম চলিল ; শুষ্ক বিবর্ণ চিন্তা–পীড়িত আসামী নীরব বেদনায়, ফরিয়াদীর ক্রোধ ও ঈর্ষাজনিত অব্যক্ত আস্ফালনে, উভয় পক্ষীয় উকিল মোক্তারের বক্তৃতা কলরবে, এবং একই সাক্ষীর তিন তিন বার নামডাক চীৎকারে বনতল ব্যথিত কম্পিত হইতে লাগিল, আবার দুদিনে সমস্তই অন্তর্ধান। প্রান্ত প্রদেশ পূর্ববৎ বিজনতা বক্ষে ধারণ করিয়া একাকী ধ্যাননিমগ্ন, আর আমরা আমাদের গড়া বাস ভাঙ্গিয়া, ভাঙ্গাবাসা পুনর্বার গড়িতে, কভু ক্ষেত্র, কভু প্রান্তর, কভু চড়াই, কভু উৎরাই, কভু সজল, কভু শিলাকঙ্করময় শুষ্ক নদী গহ্বর দিয়া সমান অগম্য পথে,বিষম ঝাঁকুনি খাইতে খাইতে অন্যত্র টঙ্গায় ধাবিত। ইহাই ক্যাম্প লাইফ। আয়াস আছে বলিয়া ইহাতে আয়েসও আছে। নিত্য নবদৃশ্য, বিশ্ব তাই বড় মধুর, নিত্য নব গতিতে স্থিতিটুকু অতীব শান্তিজনক। অন্যান্যরূপ সুখস্বচ্ছন্দতারই বা এখানে অভাব কি। ভৃত্যগণ অবিরাম আরাম জোগাইয়া চলিয়াছে। আমরা নূতন কোনো জায়গায় যাইব, আমাদের একদিন বা একবেলা পূর্বে অধিকাংশ তাম্বু ও আসবাব দ্রব্যাদি গোরুর গাড়ির উপর বোঝাই দিয়া সিপাহী এবং তাম্বু বাবুর্চি খানসামা একদল, নির্দিষ্ট স্থানে আড্ডা বাঁধিয়া, আহারাদির ব্যবস্থা করিয়া রাখিতে চলিল, আমরা পরে সেখানে পৌঁছিয়া সমস্ত পাইলাম। আমাদিগের শেষ পরিত্যক্ত তাম্বু প্রভৃতি লইয়া অন্য ভৃত্যদল পরে আসিতেছে। অসুবিধার মধ্যে ভৃত্য এবং ভ্রমণসরঞ্জাম এজন্য কিছু অধিক সংখ্যায় রাখিতে হয়।

এইরূপ অ্যাসিসটেন্ট কলেক্টরগণ এদেশে বৎসরে সাতমাস ধরিয়া বনচারী যদি বা হন বিজনচারী, হেড কোয়ার্টার ছাড়িয়া এ কয়মাস কাল ইহাদিগকে সাবডিভিশনের গ্রামে গ্রামে অধীনস্থ ক্ষুদ্রতম কর্মচারীটি হইতে উচ্চপদ মামলাদারের পর্যন্ত রাজকার্য তত্ত্ববধান এবং সাক্ষাৎ সম্বন্ধে গ্রামনিবাসীগণের আর্জি গ্রহণ করিয়া সর্বতোভাবে ডিস্‌ট্রিক্‌টের সুবিচার রক্ষায় ভ্রমণনিযুক্ত থাকিতে হয়। বৎসরের অন্য পাঁচ মাস বৃষ্টির কাল, সেইজন্য সেই সময় তাঁহারা হেডকোয়ার্টরের আশ্রয় গ্রহণ করেন। আপাতত এই সঙ্গে ইহাদিগের আর একটি কার্য বাড়িয়াছে।

 

প্লেগের তদারক, তাহার সংক্রামক কোপপ্রশম সংকল্পে সুনিয়ম প্রচার এবং সেই সকল নিয়মাবলী যাহাতে পালিত হয় তদ্দর্শন, ইহাঁদের অধুনাতন একটি প্রধান কর্তব্য। মহারাষ্ট্রীয় ভাষায় সাব ডিবিসন প্রান্ত শব্দে অনুবাদিত, ইহা হইতে অ্যাসিন্টেন্ট কলেক্টরগণ প্রান্ত সাহেব নামে অভিহিত। অনুবাদ কি সুসঙ্গত ?

কোলাবা ডিসট্রিক্‌ট বম্বে শহরের খুবই কাছে, আলিবাগ ইহার হেড কোয়ার্টার। আলিবাগ সমুদ্রতীরবর্তী স্থানে, বম্বে সহর হইতে স্টীমারে এক ঘন্টার পথ মাত্র। আমি অতি অল্পদিন এ ডিসট্রিক্‌টে আসিয়াছি, একমাসও এখনো হয় নাই, আসিয়া অবধি হহার পদপ্রান্তেই ঘুরিতেছি।

তবে মন্‌সুন্‌ সন্নিকট, শীঘ্রই মাথায় চড়িব এরূপ আশা করিতেছি। প্রতি গ্রাম ছাড়িয়া সমুদ্রের অধিকতর নিকতবর্তী হইতেছি ; এখন পেনে আসিয়াছি, এখান হইতে বম্বের তোপ দেখা যায়।

কলিকাতা হইতে একটানা মেল ট্রেনে কল্যাণ জংশনে পৌঁছিতে প্রায় ৪৪ ঘণ্টা লাগে। সেখান হইতে ভিন্ন লাইন ধরিয়া আরো দুই ঘন্টার মধ্যে কর্জৎস্টেশনে নামিয়া একখানি ডগ্‌কার্টে ওঠা গেল। গাড়িতে উঠিবার অবসরটুকুমাত্র দিয়া, তৎযোজিত ঘনঘোর লোহিতকান্তি (Bay)সুচিক্কণ, সুগঠন, সুদর্শন আরব্যাম্ব মুহূর্তে কেশরগুচ্ছ বিকম্পিত, বক্রগ্রীবা স্ফীত করিয়া, সুবঙ্কিম সুঠাম পদক্ষেপণে বায়ুগতিতেই যেন ধাবিত হইয়া দুই চারি মিনিটের মধ্যে এক নিভৃত নিকুঞ্জতলস্থাপিত বস্ত্রাবাসমন্ডলীর নিকট আমাদিগকে আনিয়া ফেলিল।

প্রায় মাইল ধরিয়া আম্রকানন, নিবিড় নহে, বৃক্ষদল শ্রেনীবদ্ধ ভাবে বিভক্ত ও বিরাজিত হইয়া মধ্যে মধ্যে প্রশস্ত ভ্রমণপথ রাখিয়া গিয়াছে। কাননের এক প্রান্তে সুনির্মিত গ্রাম্যপথ, অন্যপ্রান্ত অবধি জলপূর্ণ নদী ; নদীর তীরে একদিকে কর্জুতের গ্রাম্য শহর ; অন্যদিকে স্থানে স্থানে কুটীরাবলী ; দূরে চতুর্দিকে ছবির মতো পাহাড় চিত্র। কাননাভ্যন্তরে এক একটি তরুচ্ছায়াতলে আমাদিগের এক একটি তাম্বু স্থাপিত, ইহা সংখ্যায় নিতান্ত অল্প নয় ; আফিস, আফিসের লোকদিগের ঘর, ভৃত্যদিগের ঘর, স্নানাগার, রন্ধনশালা, আমাদিগের দুইজনের স্বতন্ত্র শয়নকক্ষ প্রভৃতিতে এই আবাসকুঞ্জ বহুদূর বিস্তৃত। এখানে পদার্পণ করিবামাত্র সুকন্ঠ পক্ষীগণ শাখার মধ্যে লুকাইয়া তাহাদের এক শান্তিনিকেতনে আমাদের স্বাগত করিয়া লইল ; কি এক অমৃতময় ভাবে হৃদয় ভরিয়া উঠিল।

বনতলে একটি বস্ত্রছাউনির মধ্যে একাকী এই আমার প্রথম শয়ন। পূর্বেও এই বম্বে প্রেসিডেন্সিতেই অল্পদিন তাম্বুবাস করিয়াছি, কিন্তু এরূপ একাকী স্বতন্ত্র তাম্বুতে রাত্রিবাস করি নাই। আমার তাম্বুটি খুব ছোট এবং অন্যগুলি হইতে খানিকটা তফাতে। ছায়াবহুল গাছ বাছিয়া তাহার নীচে তাম্বু খাটাইতে হয়, এই কারণে আমার তাম্বু অন্য তাম্বু হইতে অল্পবিস্তর দূরে পড়িয়া যায়। রাত্রিকালে সহসা ঘুম ভাঙ্গিয়া গেলে জনমানবের ত্রিসীমায় আছি, ইহা বুঝিতে পারি না ; পরিপূর্ণ বিজনতার মধ্যে চেতনা লাভ করিয়া সহসা স্নায়ু প্রণালীতে কি এক প্রকার নূতনতর অনুভূতির ক্রিয়াতরঙ্গ সঞ্চারিত হইয়া আবার মিলাইয়া পড়ে ; চিরাভ্যস্ত মানুষশ্বাস নিঃশ্বাস পূর্ণ বদ্ধ প্রাসাদভবনে তাহার রঞ্জিত কড়ি বরগা, মার্জিত মেজিয়াতল, কাষ্ঠময় দ্বার, বাতায়ন ও প্রজ্জ্বলিত দীপালোক দেখিতে গিয়া তরুলতা শুষ্ক তৃণময় স্তব্ধ মাঠের অন্ধকার ও আকাশের শান্ত ম্লান তারকালোকে নয়নে প্রতিবিম্বিত হইয়া উঠে। দ্বিতল ত্রিতল গৃহের পরিবর্তে, ভূমির সমতলে একাকী আপনাকে খট্টাঙ্গ শায়িত দেখিয়া প্রথমে কেমন যেন একটি বিস্ময় বিভ্রমভাবে সমস্ত ভুল হইয়া যায়, পরে ঈষৎ আতঙ্কে যেন দেহ কন্টকিত হইয়া উঠে। ক্রমশ সম্পূর্ণ জাগরণে এই অজ্ঞাত আতঙ্ক স্পষ্ট আশঙ্কায় পরিণত হয়। কোনো বন্য পশু গৃহে প্রবেশ করিয়া যদি আক্রমণ করে এইরূপ ভয় হইতে থাকে। কিন্তু চারিদিকের পরিপূর্ণ শান্তিময় নিস্তব্ধতায় সে ভয় ধীরে ধীরে অতি শীঘ্রই আবার নিদ্রাবিলুপ্ত হইয়া পড়ে। বলিব কি এতদিন তাম্বু বাস করিতেছে একটি শৃগালের ডাক পর্যন্ত শুনি নাই।

কর্জতে আমরা ছয়দিন ছিলাম। মধ্যাহ্ন হইতে বেলা তিনটা পর্যন্ত সেখানে কি ভয়ানক গরম হইত। উষ্ণ বাতাসে দেহের যেখানে স্পর্শ করিয়া যাইত মনে হইত যেন ফোস্কা পড়িতেছে। এই শান্তিনিকেতনের সহিত বিদায় গ্রহণের সময়ও তাই শান্তি ভঙ্গ হয় নাই। এখন মনে হয় গরমের সময় তাম্বুর পর্দা কেন ফেলিয়া দিতাম না। ক্রমশ শিক্ষা লাভ করিতেছি। কর্জৎ হইতে চৌক্‌ ছয় মাইল, চৌক্‌ হইতে পানুয়েল (Panuel) ১২ মাইল। আমরা দুই রাত্র চৌকের বাঙ্গলায় বাস করিয়া এক রাত্র পানুয়েল কাটাইয়া পরে পেনে আসিয়াছি। চৌকের বাঙ্গলাটি বেশ উচ্চ স্থানের উপর। ইহার চারিদিকে গোলক চাঁপার গাছ, নিষ্পত্র গাছের শাখায় শাখায় থরে থরে ঝাঁকে ঝাঁকে কেবলি ফুল, গাছতলা পর্যন্ত ফুলে ফুলে ঢাকা। প্রবল বাতাসে সেই ফুলদল উড়িয়া উড়িয়া আমাদের পূজা লইয়াই যেন বারান্দায় আসিয়া জমা হইত।

পানুয়েলের চিঠিপত্রাদি বহিয়া সমুদ্রখালের যে বন্দর হইতে স্টীমার বম্বে যাতায়াত করে, সেই বন্দরের নাম উলুয়া বন্দর, ইহা পানুয়েল হইতে ৭ মাইল দূরে। উলুয়া গ্রামের পুরাতন অংশ এখন কি শোচনীয় শেষ দৃশ্যময়। গ্রামকে গ্রাম শূন্য পরিতক্ত্য ; ভগ্ন কুটীরের মৃত্তিকা প্রাচীর মাত্র অবশিষ্ট, প্লেগের প্রাদুর্ভাবেই ইহার এইরূপ দৃশ্য। কয়েকখানি অবরুদ্ধ সুন্দর বাঙ্গালা দেখিলাম – শুনিলাম একসময় একদিনের জন্যও খালি পড়িয়া থাকিত না। তৎসংলগ্ন বহুদূর – বিস্তৃত আম্র কাননে অসংখ্য আম ফলিয়াছে, বৃক্ষরাশি ফলভারে যেন অবনত ; কিন্তু সে সকল ফল ভোগ করিবে কে, কে জানে ? দেখিলে অত্যন্ত কষ্ট বোধ হয়।

পানুয়েল ও পেনে বেশ বর্দ্ধিষ্ণু গ্রাম ; বাড়ি, ঘর, দোকান প্রভৃতিতে ক্ষুদ্র শহরতুল্য। এমন কি রাস্তায় কলের জল, দীপ আছে, পানুয়েলে আমরা যেখানে ছিলাম, আর পেনে গ্রামপ্রান্তে যেখানে আছি, ইহার মধ্যে পথব্যবধান ২২ মাইল। যাতায়াতে মধ্যে দুই বার দুইটি জল পার হইতে হয়। পানুয়েল হইতে ১২ মাইল পথ অতিক্রম করিয়া আমরা প্রথম জলের নিকট পৌঁছিলাম। শুনিয়াছিলাম জল এখানে খুবই কম, ঘোড়া ইহার উপর দিয়া পারে চলিয়া যায়। কিন্তু তীরে পৌঁছিয়া দেখিলাম বিপরীত ; সুবিস্তৃত সুগভীর ভরা নদী কূলে কূলে ছাপিয়া স্রোতের বেগে বহিয়া চলিয়াছি। টঙ্গায় পার হইব কিরূপে ? তখন জানিলাম আসলে ইহা নদীই নহে, সমুদ্রের খোলা জোয়ারে বড় নদীর মতো জলে ভরিয়া উঠে ; ভাঁটায় নাবিলেই ঘোড়া মানুষ স্বচ্ছন্দে ইহার উপর দিয়া হাঁটিয়া পার হয়। আমরা যখন পৌঁছিলাম তখন ভরা জোয়ার, একজন কৌপিনধারী প্রবীন মাঝির সহিত কথা কহিয়া জানা গেল পাঁচটার আগে এ জলে গাড়ি যাইবে না। আমরা একটার সময় তীরে আসিয়াছি তাহা হইলে আর ৪ ঘন্টা কাল এই রৌদ্রে বসিয়া থাকিতে হইবে। সে বড় সুখের কল্পনা নহে। আমাদিগের বিপন্নভাব দেখিয়া মাঝি বলিল, “পার হইবে নৌকায় চল না, টঙ্গা ঘোড়া সব পার করিতেছি।” দেখিলাম নিতান্ত ক্ষুদ্র একখানি ডোঙ্গা তীরের জলে ভাসিতেছে। দের হাত পরিসর হইবে  কিনা সন্দেহ, লম্বায় হাত আষ্টেক হইতে পারে। এই নৌকায় টঙ্গা ঘোড়া সব পার করিবে। প্রান্তসাহেব অবিশ্বাসজনক বিস্ময় দৃষ্টিতে নীরব হইয়া রহিলেন। সে তাঁহার অবিশ্বাস বুঝিয়া সদর্পে গম্ভীরভাবে কহিল, “বড় বড় বয়েল ও বয়েল গাড়ি আমি অনায়াসে পার করি”, তথাপি টঙ্গা পারের হুকুম না পাইয়া আর দ্বিরুক্তি না করিয়া নিতান্ত নিষ্পরোয়াভাবে অদূরে গাছের তলায় গিয়া তামাকু টানিতে বসিল। তাহার ভাবটা এই “ভাল পরামর্শ দিলাম শুনিলে না আচ্ছা সেই ৫টা অবধি এখানে বসিয়া থাক না, আমার ত ভারি গরজ”। তাহার সেই খাতিরনদারৎ ভাবটা লাগিল ভাল, আমার ত মনে হইল ইহার হাতে আত্মসমর্পণ করা যায়। তাহা ছাড়া ৫টা অবধি বসিয়া থাকাটাও কিছু বিশেষ লোভনীয় নহে ; আমাদের আপনাদের মধ্যে একটু কথাবার্তা হইবার পর টঙ্গাওলাকে বলা গেল, “মাঝিকে বল নৌকায় টঙ্গা পার করুক”, তাহারা গাড়ি ভাসাইতে গেল, আমি কৌতূহলপূর্ণ দৃষ্টতে দেখিতে লাগিলাম, ঐটুকু ছোট ডিঙ্গিতে অত বড় গাড়ি উঠায় কিরূপে। দেখিলাম অতি সহজ। গাড়ী ঠেলিয়া তাহার দুইচাকার মধ্যে নৌকাখানি প্রবেশ করাইইয়া নৌকা ভাসাইয়া দিল, তাহার পর টঙ্গাওয়ালা ডিঙ্গিতে উঠিয়া গাড়ি ধরিয়া বসিলে, মাঝি তাহার বাঁশের লগী ঠেলিয়া নৌকা ওপারে লইয়া লাগাইল। তখন এত জল যে এক বাঁশে ঠাই পাওয়া যাইতেছিল না। নৌকা চলিবার সময় গাড়ির দুইচাকা, নৌকার দুইটি চাকার মতো ঘুরিতে লাগিল। ঘোড়া পার করা ইহা হইতেও সরেস। ঘোড়ার মুখের লাগাম নৌকার মাঝির হাতে রহিল, ঘোড়া দুইটি নৌকার সঙ্গে সঙ্গে সাঁতার দিয়া তীরে উঠিল। সর্বশেষে আমরা পার হইলাম।

এই সমস্তক্ষণের মধ্যে মাঝিকে একবার গাম্ভীর্যচ্যুত হইতে দেখি নাই। কিন্তু ওপারে গিয়া প্রান্তসাহেব বক্‌সিস্‌ সমেত মেহনতি যখন তাহার হস্তে সমর্পণ করিলেন, তখন সহসা আত্মবিস্মৃতি জন্মিল, ছেলেমানুষের মতো গালভরা হাসিতে তাহার আকর্ণ কুঞ্চিত হইয়া পড়িল।

ইহার পর আরো একবার ডিঙ্গিতে সমুদ্রখানা পার হইয়া দুইবার টঙ্গা চক্রে দুইটি ছোট নালা উত্তীর্ণ হইয়া ঘোড়াকে বিশ্রাম দিবার নিমিত্ত দুইবার সেই রৌদ্রে পদব্রজে দুইটি চড়াই পথ ভাঙ্গিয়া অবশেষে ২২ মাইল পথ ৫ ঘন্টায় অতিক্রম করিয়া অপরাহ্নে পেনে আসিয়া পড়িলাম।

এখানে আমাদের বাসক্ষেত্রে আসিয়াই প্রথমে নজরে পড়িল একটি ভাঙ্গা কুটীর ; কুটীরখানি আমাদের তাম্বুর এত কাছে। শুনিলাম এখানে কোনো ব্রাক্ষ্মণ পরিবার বাস করিত ; একজনের প্লেগ হওয়াতে সকলকেই গৃহ ছাড়িয়া যাইতে হইয়াছে ; এখন কুটীরের এই দশা, তাহাদের দশা কি হইয়াছে কে জানে !

এখানেও আম্রনিকুঞ্জতলে আমাদের বসবাস ; কিন্তু কর্জতের ন্যায় ইহা পরিষ্কার সুমার্জিত নিকুঞ্জকানন নহে। এই শুষ্কক্ষেত্র প্রান্তরের সর্বত্রই প্রায় লাঙ্গল চষা উচ্চ নীচ ভূমি ; এক পা বাড়াইতে শুষ্ক তৃণগুল্মে তাহা আটকাইয়া যায়। তরুরাজি এখানে অসংলগ্ন অসম্বদ্ধভাবে যত্রতত্র বিক্ষিপ্ত ; এক একটি আম গাছ বহু পুরাতন, প্রকান্ড ও বহুল শাখাকান্ডে বিপুলাকার, তাহার এক একটি সুবিস্তৃত শাখার নীচে সুবিশাল ছায়া। গাছগুলি পরগাছায় ভরা, কোনটি বা বৃহৎ অশ্বত্থ তরুর আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। এত আম গাছের মধ্যে মোটে দুই চারিটির মধ্যে আম ঝুলিতে দেখিলাম, আর সবে মাত্র ও ক্ষেত্রে যে একটি কাঁঠাল গাছ তাহা কাঁঠালে কাঁঠালে ভরা। এখানে নানা জাতীয় সুকন্ঠ পক্ষী নাই। শ্যামা, দয়েলেরই ডাক সারাদিন শুনিতে পাই । এমন বনতল কোকিল, পাপিয়ার গীতরবে ধ্বনিত হইয়া উঠে না। এখন শুক্লপক্ষ, হঠাৎ দুইদিন হইতে সন্ধ্যার ম্লান জ্যোৎস্নায় একটি পাপিয়া ক্ষীণকন্ঠে ডাকিয়া ওঠে, ডাকিয়াই আবার নীরব হইয়া পড়ে, বুঝি তাহার প্রতিধ্বনি গীতি শুনিতে পায় না বলিয়া। কর্জতের ন্যায় এখানেও এই ক্ষেত্রস্থলের এক প্রান্তে গ্রাম্যপথ অহরহ গোরুর গাড়ির চক্রঘর্ষণে শোষিত, নিনাদিত, আর অন্য প্রান্তে নদী, কিন্তু কর্জতের সে ভরা নদী নহে, ইহা শিলা কঙ্করময় শুষ্ক গহ্বর সার। দূর দূরান্তর প্রসারিত এই শুষ্ক গহ্বরের কদাচ কোনো অংশে একটুখানি জলের চিহ্ন দেখা যায় ; কোনো শিলাতলে বা একটুখানি জল গুপ্তভাবে বিরাজিত। এপারে ওপারে পরস্পর হইতে দূরদূরান্তরসংস্থিত দুইচারিখানি করিয়া যে কুটীর গৃহ দেখা যাইতেছে, তাহার লোকেরা এই গুপ্তস্থানের সন্ধান জানে।

পেনে আসিয়াছি বটে, কিন্তু সাক্ষাৎ সম্বন্ধে তাহার সহিত আমার সম্পর্ক রহিত, পেনে হইতে এই বিজন ক্ষেত্রস্থল প্রায় দুইমাইল দূরে ; কিন্তু আমি ইহাকেই পেনে বলিয়া জানি। নাগরিক সুবিধা স্বচ্ছন্দ আয়েস বিলাসের চিহ্ন আছে। একদিকে সুদূরব্যাপি মাঠ, অন্যদিকে স্তরে স্তরে তরঙ্গে তরঙ্গে  ক্রমোন্নত শ্যামকান্তিশূন্য শুষ্ক শৈলমালার পদপ্রান্তে, বক্ষে, চূড়ায় পর্যন্ত স্থানে স্থানে কুটীর। এবং এই পার্বত্য দুর্গম পথেও এক একখানি গোরুর গাড়ি মাঝে মাঝে সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটীরগ্রামের কোন একখানির উদ্দেশ্যে চলিয়াছে দেখা যায়। সাহস দেখিয়া অবাক হইতে হয়। রেল গাড়ির গতি সুনির্মিত যন্ত্রগঠিত মসৃণ পথে, আর গোরুর গাড়ির গতি সম অসম সুগম দুর্গম সর্বস্থানে। কাহার কার্যকারিতা অধিক বলা দুঃসাধ্য।

এ দেশে কাটকরী বলিয়া একরূপ আদিম অসভ্য জাতি আছে, পাহাড়চূড়ার বিরল কুটীরগুলি তাহাদেরই বাসস্থান। ইহারা সভ্যজাতির সংস্রবে শহরে বিক্রয়ার্থ আনে। তীর ধনুকে বন্যপশু শিকার করিয়া প্রায় ইহারা জীবিকা নির্বাহ করে।

নদীর ধারে উচ্চপাড়ে একটুখানি বেশ মসৃণ বেড়াইবার স্থান আছে। আমি রোজ বিকালে ঐখানে বেড়াইতে বেড়াইতে শৈল প্রদেশস্থিত দূর দূরান্তর বিক্ষিপ্ত ঐ কুটীরগুলির প্রতি চাহিয়া ভাবি – এখানেও লোক আছে। কে জানে কোনো অজ্ঞাত অনুপম সুকোমল রূপচ্ছায়ায় এই নীরস শুষ্ক রুদ্র কঠোরতারও তাহাদের নেত্রে সুকুমার কমনীয় কান্তিতে বিভাসিত কি না ? কে বলিবে, কোনও সুদুর্লভ স্নিগ্ধ সুধাসিঞ্চিত হইয়া এখানকার শত অভাব, শত অসুখ লইয়াও তাহার পুলক পরিপূর্ণ কি না ?

আমার পার্শ্বদেশে যূথিকার ন্যায় আর একরূপ বনফুল এক বৃন্তে রাশি রাশি ফুটিয়া দুলিতে থাকে, দুলিয়া দুলিয়া হাসিয়া হাসিয়া যেন উত্তরে কহে “এখানকার এই রুদ্র প্রকৃতির মধ্যে সুকোমল সুখ কি চাহিয়া দেখ”।

খাতা একখানি কোলে, কলমটি হাতে লইয়া তাম্বুর মধ্যে আরাম চেয়ারে বসিয়া ভাবিতেছি, কি লিখি ; অনেক দিন হইতে গল্প লিখিতে অনুরুদ্ধ, লিখিতে ইচ্ছাও খুব, কিন্তু শূন্য মস্তিষ্ক মন্থনে বিষামৃত কিছুই উঠাইতে পারিতেছি না। নিরাশচিত্তে মুক্ত দ্বারপথে চাহিয়া আছি দেখিলাম পুষ্পগুচ্ছ হস্তা, পীতবাসনা এক মহারাষ্ট্রী কন্যা। এই আম্রকুঞ্জতলে প্রবেশ করিয়া অদূরে তাম্বুর নিকট আসিয়া দাঁড়াইল। একজন সিপাহী তাহাকে আমার তাম্বু দেখাইয়া কি বলিল, সে প্রফুল্ল হরিণীর ন্যায় দ্রুতপদে ইহার দ্বারবর্তী হইয়া হঠাৎ একটু যেন থমকিয়া দাঁড়াইল, তাহার পর হাস্যমুখে সেলাম করিয়া ফুলের তোড়াটি আমাকে সমর্পণ করিল। দেখিলাম বালা কিশোরী, শ্যামা সুবদনী ললিতা। তাহার সুকোমল সহাস্য আনন, তাহার সুহাবভাব, এমন কি ফুল সমর্পণে তাহার সেই যে ভঙ্গীটি তাহাতে পর্যন্ত আমার প্রীতি উৎপাদন করিল। কেবল তাহাই নহে, আমাকে দেখিয়া লজ্জাবতী লতাটির মতো সহসাসে যে একটু বিষম কুন্ঠিতভাবে ধারণ করিয়াছিল, পরিচিত প্রার্থিতের স্থলে অপরিচিত অজ্ঞাত মূর্তি দর্শনে তাহার যে একটুখানি হতাশা জন্মিয়াছিল, তাহা পর্যন্ত আমার ভাল লাগিল। আমি ফুল লইয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “কোথা থেকে ফুল নিয়ে এলে ?” সে বলিল, “গাঁ থেকে !” অবশ্যই গাঁ থেকে ; এই ক্ষেত্র প্রান্তরের ত্রিসীমায় গোলাপ বেল প্রভৃতি কাননফুলের চিহ্নও দেখিতে পাই না। কিন্তু “কোন গাঁ থেকে ? গাঁ কি আছে ? ও পারে ?” ভাবিয়াছিলাম নিকটের গ্রাম হইতেই আসিয়াছে। সে বলিল, “অনেক দূরে” – আর কিছু জিজ্ঞাসার অবসর না দিয়া ও অতঃপর অভিবাদনপূর্বক চলিয়া গেল। প্রান্তসাহেব প্লেগ তদারকী হইতে গৃহে ফিরিল তাঁহাকে বলিলাম, “একটি মেয়ে একটি ফুলের তোড়া এনেছিল,” তিনি সাগ্রহে বলিলেন “নিয়েছ ত ?” “ঐ যে টেবিলের উপর।”

“তার সঙ্গে ভাল করে দু – চারটে কথা কইলে ? শুনেছি বেচারা অনেক দূর থেকে ফুল আনে।”

“তা অবশ্য কইলুম। কিন্তু আমাকে নতুন দেখে সে যেন একটু থম্‌কে গেল। পুরানো লোকের হাতে ফুলটি দিতে পারলেই যেন বেশি খুশি হত।”

“সত্যি নাকি ?”

“আমি কি ঠাট্টা করছি ? ও মেয়েটি কে ? কেন ফুল আনে ?”

আমাকে তিনি চেনেন, এক জন গরীব ফুল বিক্রেতার সম্বন্ধে এইরূপ অপরূপ প্রশ্নে বিস্ময় প্রকাশ করিলেন না, বুঝিলেন ইহার মধ্যেই কোন একটি কল্পনা – শিখরের অনেকদূরে উঠিয়াছি। হাসিয়া বলিলেন –

“বলতে পারছিনে ও মেয়েটি কে ?”

“তা যেন নাই পারলে, কিন্তু ফুল দেয় কেন – তার উত্তর ?”

“ওদের ফুলের বাগান আছে বলে।”

“ফুলের বাগানতো অনেকেরই আছে।”

“ভাগ্য ফেরে এই ব্যাক্তিটিই কলেক্টরের ফুল জোগাত। নিশ্চয়ই পূর্বজন্মের কোনরূপ নির্বন্ধ ছিল না ?”

“কিন্তু কোন নির্বন্ধে”-

“আমাকে জোগাচ্ছে ; সেটা নির্বন্ধ নয় নিতান্তই বিধির বিপাক। একদিন ব্যাক্তিটি কলেক্টরকে ফুল দিতে এসে দেখলে আমি এখানে তাদের ছবি তুলছি, আমাকেও একটি দিলে।”

“সেই বাড়তিটি বুঝি ? রোজই ওর হাতে যেন একটি তোড়া দেখি, বোধহয় অন্য কাউকে দেবার জন্য নিয়ে আসে, এখান থেকে সেখানে যায়।”

কিংবা নদীর জলে মানৎ ভাসাবার জন্যেও নিয়ে আসতে পারে ; যে জন্যই আনুক আমার জন্য অবশ্য আনেনি।”

“তা কি করে বলা যায়। সে দিন হয়ত শুনেছিল” –

“হ্যাঁ শুনেছিল ! একটি কাজে আগের দিন নেমে এসেছি, পরদিন চলে যাব, এই দু – একদিন মাত্র কলেক্টরের অথিতি ; এ খবরটা অমনি গাঁ রাষ্ট্র হয়ে গেল।”

“তা বুঝি হতে পারে না ?”

“পারে ? তবে হয়েছিল। ফুলগুলি আমার উদ্দেশ্যেই যদি গুচ্ছাবস্থা প্রাপ্ত হয়ে থাকে তাতেই বা এত দুঃখ কি।”

“সুখ হবারই ত কথা।”

“তা যদিও হচ্ছে না। বক্সিসটা দিয়ে যাওয়া হয় নি – তাই মনে মনে একটু অপরাধী আছি।”

“এবার সে অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত সহজেই হবে।”

“হ্যাঁ এবার ত আমাকে কলেক্টরের পদবীতে বসিয়ে রীতিমত খরিদ্দারভুক্ত করে ফেলেছে। যাহোক বেচারা অনেক দূর থেকে ফুল আনে, ওকে একখানি ভালো কাপড় দিও, তার উপর আর যা দাও”, বলিয়া তিনি চলিয়া গেলেন, আমি ভাবিলাম – তা যেন দেব, কিন্তু সবই মিথ্যা। যাহা ভাবিয়াছিলাম তাহা কিছুই নয়। সুন্দরী মালিনীর ফুলোপহারে মধুর সুন্দর কোন ভাবেই বিজড়ন নাই। পয়সার জন্য এ শুধু ফুল বিক্রয়।’ অত্যন্ত নিরাশ হইলাম। প্রান্তসাহেব মিথ্যা আঁচেন না, আমি সত্যই ইতিমধ্যেই বাতাসে মস্ত প্রাসাদ ফাঁদিয়া বসিয়া ছিলাম। প্লেগ সম্বন্ধে ইহার খুব সুনাম আছে জানি। এখানে অবশ্য অল্প দিন আসিয়াছেন, কিন্তু ইতিপূর্বেই যেখানে ছিলেন সেখানে ইহার সকরুণ যত্নে গরীব গ্রামবাসীগণ কিরূপ বশীভূত ছিল সে গল্প শুনিয়াছি, তাহাই স্মরণ করিয়া, সেই ভিত্তির উপর ঐ ভগ্ন কুটীরে – প্লেগ শুশ্রূষা নিরত এই বিপন্ন বালিকা, এবং তাহার বিপদভঞ্জন পুরুষপ্রবরকে, ঔপন্যাসিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে গাঁথিয়া, তাহার অবশ্যম্ভাবী পরিণাম এই ফুলোপহারে গরীব ফুলওয়ালীর কৃতজ্ঞতারূপ অসীম হৃদয়বিভব উৎসর্গীকৃত দেখিয়া মনে মনে দিব্য আত্মপ্রসাদ উপভোগ করিতেছিলাম। ভ্রম সংশোধনে তাই বড়ই ক্ষুব্ধ হইয়া পড়িলাম। এতক্ষণ ধরিয়া ফুলওয়ালীর সম্বন্ধে এত যে কৌতূহল, এতটা যে ভাবোচ্ছ্বাস, কল্পনা ভঙ্গে সে সমস্তই যে শুধু শূন্যে বিলীন হইল এমন নহে, অধিকন্তু তাহার প্রতি এতটা অশ্রদ্ধা জন্মিল যে পরদিন তাহার মূর্তির মাধুর্য –বৈশিষ্ট্যটুকু পর্যন্ত উপলব্ধি করিতে পারিলাম না। অন্নচেষ্টারত সাধারণ গ্রাম্যকন্যার ভাব ধরিয়াই সে আত্মার নেত্রগোচর হইল।

তথাপি ভদ্রতার নিয়ম সর্বস্থলেই অভঙ্গনীয়, আমি তৎপ্রদত্ত ফুলগুচ্ছ হস্তে লইয়া পূর্ব দিনের মতই সাদরে বলিলাম –

“চমৎকার ফুল ? বাগান তোমার নিজের হাতে ?”

সে সেলাম করিয়া বলিল, “না সাব, মালী আছে, আমরা শুধু দেখি।”

“বাড়িতে তোমার কে কে আছে ?”

“মা।”

“আর কেউ নেই তোমার।”

“আছে। বিদেশে।”

“ফুল বিক্রীতে যা পাও তাতে তোমাদের বেশ চলে ?”

“না আমাদের ধানের ক্ষেত আছে।”

“ফুল কি তুমিই রোজ বাজারে বিক্রয় করিতে নিয়ে যাও ?”

সে ইহার উত্তরে কোন কথা কহিল না, কেবল জিহ্বা ও তালুকার সংস্পর্শে একরূপ শব্দ করিয়া জানাইল, বাজারে ফুল বিক্রী করিতে যাওয়া তাহাদের পক্ষে অপমানজনক। আমি ভাবিলাম স্বার্থকুশল যুক্তিতে মানুষ কিরূপ যুক্তির বিরোধী। বাজারে ফুল বিক্রয় করিতে যাওয়া যদি অপমানজনক হয় তাহা হইলে এখানে বিক্রয় করিতে আসাই বা অপমানের নয় কিসে ? বলিয়াও ফেলিলাম “এখানে যে আস তবে” ? সে তাম্বুর স্তম্ভে ঠেসান দিয়া নতমুখে নীরব হইয়া রহিল। এই নীরবতা তাহার লুক্কায়িত গুপ্ত রহস্যের সন্ধান করিয়া দিল, আমার স্বাভাবিক কৌতূহল উদ্দীপ্ত হইয়া উঠিল। আমি বলিলাম, “তুমি বাজারে যাও না ; আর একলাটি ছেলেমানুষ এতদূর ফুল বিক্রী করতে এস ; তাতে তোমার মা কিছু বলেন না ?”

“তিনি জানেন না।”

“তিনি জানেন না ? তুমি নিজে লুকিয়ে আস ? কেন ? সে একটু ইতস্তত করিয়া আমার দিকে চাহিয়া রহিল, যেন তাহার যাহা বলিবার আছে বলিবে কিনা ঠিক করিয়া উঠিতে পারিতেছে না। আমি তাই বিশেষ অনুনয়ের ভাবে মিষ্ট করিয়া বলিলাম।

“বল না, বল, তাতে তোমার কিছু ক্ষতি হবে না। আমিও খুব খুশি হব।” সে বলিল –

“যদি তার দেখা পাই, দেখতে।”

“কার ?”

“প্রান্তসাহেবের।”

কি আবার আজগুবি কথা। আস্পর্ধাও কম নহে – যদিও আমি নিজেই পূর্বে প্রান্তসাহেবের সহিত এ বিষয় কৌতুক করিয়াছি, কিন্তু এখন ভারি রাগ ধরিল, অথচ কি বলিব হঠাৎ জোগাইল না। সে আমার ভুল বুঝিয়াই বোধ হয় তাড়াতাড়ি কহিল –

“এ প্রান্তসাব নন ; আর একজন।”

“কে তিনি ?”

“আমার বোনের স্বামী।”

“তিনি প্রান্তসাহেব ? বিলাতফেরত মহারাষ্ট্রী বুঝি ?”

“না ইংরেজ।”

ইংরেজ। কিছুদিন পূর্বে একজন পারসি ইঞ্জিনীয়ার আমাদের ক্যাম্পে অতিথি হইয়াছিলেন। তিনি এদেশের উচ্চ পদধারী গভর্নমেন্ট  কর্মচারীদিগের নানারূপ গল্প  করিতেন, তন্মধ্যে দু – একজনের সম্বন্ধে ‘নেটিভ’ বিবাহ রহস্যের কথাও বলেন। ফুলওয়ালীর কথায় তাই আমার দ্বিগুণ কৌতূহল জন্মিল। বলিলাম –

“ইংরাজ তোমার ভগিনীপতি, তোমরা ত হিন্দু ?”

“না মুসলমান। আমরা বিজাপুর নবাবকন্যার বংশ।”

মুসলমান। কিন্তু ঠিক হিন্দু কন্যারই বেশ। ইহার আগে আমি এদেশে মুসলমানী দেখি নাই।

নবাব বংশীয় হউক সে যে ভদ্রবংশীয় তাহাতে বিশ্বাস জন্মিল। হাবভাব কথাবার্তা ধরনধারণ সবেতেই একটি কৌলিন্য মর্যাদা প্রকাশ পাইতেছিল বটে। আমি বলিলাম –

“তোমার দিদিকে তিনি কি করে জানলেন ?”

“আমার বাবা তাঁর সিপাই ছিলেন, মরবার সময় আমাদের ভার তাঁকে দিয়া যান।”

“তখন তোমার দিদির বয়স কত ?”

“ষোল। দিদিকে প্রান্তসাব পুনার স্কুলে দিয়েছিলেন সেখানেই দেখাশুনা হত।”

“বিয়ে হল কতদিন পরে ?”

“এক বছর পরে পুনাতেই। তারপর এই পেনেই। তারপর এই বনেই এই বাগানে প্রান্ত সাহব দিদিকে নিয়ে এসেছিলেন, আমরা সবাই এসে দেখা করলাম। সেসব কথা আমার খুবই মনে আছে।”

“তখন তোমার বয়স কত ?”

“সাত বৎসর। মা আমার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “সাহবে – তোমার জন্যে আমাদের জাতকুল গেল, আমার এ মেয়েকে এখন ভাল লোকে বিয়ে করবে না, একটিকে তুমি নিয়েছ। এটিকেও নাও, তাহলেই আমি নিশ্চিন্ত হই।”

“তিনি কি বললেন ?”

“তিনি তাঁর বৌদির কাছে আমাকে টেনে নিয়ে আমার চুলে হাত দিতে দিতে বললেন – এখন এর বিয়ে কি ? এখনো খুব ছোট।”

“তা ঠিকই বলেছিলেন।” ফুলওয়ালী আমার কথা না শুনিয়াই আপন মনে কহিয়া গেল।

“আমার হাতে একটি ফুলের তোড়া ছিল, আমি সেইটি তাকে দিয়ে বললেম, – “বড় হলে বিয়ে করবে ?”

“তিনি কি উত্তর দিলেন ?”

“তিনি হেসে আমাকে চুমো খেয়ে বললেন – ‘করব’।” বলিতে বলিতে দীর্ঘঃনিশ্বাস ফেলিয়া আঁচলে চক্ষু মুছিল। আমি তাহার দুঃখের কারণ ঠিক উপলব্ধি না করিয়া কহিলাম – “দিদিকে বুঝি খুব ভালবাসতে ! তারপর দেখাশুনা হয়েছে ?”

“না তাঁরা সেই যে চলে গেলেন আর আসেন নি। দশ বৎসর থেকে আমি তাঁদের পথ চেয়ে আছি, এখানে তাম্বু পড়লেই তাদের দেখব প্রাত্যাশা করে আসি।”

“ফুল বুঝি তাদের জন্যই আন ?”

“হ্যাঁ তাঁদের জন্য এনে অন্যকে দিয়ে যাই।”

“তা দেও কেন ? ফিরিয়ে নিয়ে গেলেই হয়।”

“কি ছুতায় তাহলে ফের এখানে আসব যাব ? যেটি তাঁরই জন্যেই মনে করে আনি সেটি ফিরিয়ে নিয়ে যাই।”

ফুলওয়ালীর বাড়তি তোড়ার ইতিহাস এতক্ষণে পাওয়া গেল। বলিলাম, “কি কর সেটি ?”

“বাবার গোরের উপর রেখে দিই।”

আমি চুপ করিয়া রহিলাম, সে কহিল, “রোজ ফিরে যাই, রোজ মনে হয় পর দিন তাকে দেখব, সাহেব লোকদের কাছে কত বন্ধুলোক আসেন, এক দিন তিনিও ত আসতে পারেন।”

বহুবচনে ছাড়িয়া সে দেখিলাম এইবার একবচনে আসিয়াছে। কিন্তু এ বিষয়ে ত কথা কহা চলে না, কি তবে বলি ; বলিলাম, “তোমার বয়স এখন সতের না ?”

“হ্যাঁ সাহবে।”

“এখনো বিয়ে হয় নি ?”

সে নেত্র বিস্ফারিত করিয়া কহিল, “কি করে হবে ; তিনি ত আসেন নি এখনো।”

বালিকার মনের কথা এতক্ষণে সমুদয় বুঝিলাম। সে তাহার ভগিনীপতির উপহাস্য বাক্য অঙ্গীকাররূপে হৃদয়ে গাঁথিয়া তাহাতে নিজে অঙ্গীকৃত হইয়া পড়িতেছে। সেই ভ্রান্তময় সরল বিশ্বাসে মুগ্ধ ব্যাথিত হইয়া বলিলাম, “তুমি কি জান না ইংরাজেরা এক স্ত্রী থাকতে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে পারে না ; আর শ্যালিকে বিয়ে করার নিয়মও তাদের মধ্যে নেই।”

“তিনি মুসলমান। দিদিকে বিয়ে করার জন্য মুসলমান হয়েছিলেন। আমাদের বংশে ত অন্য বিয়ে হবার যো নেই।”

বিয়ে করার জন্য মুসলমান হয়েছিলেন। সম্প্রতি বিগামির চার্চে যে সিলন সিভিলিয়ান গবর্নমেন্ট কর্তৃক কর্মচ্যুত হইয়া দরখাস্ত করিয়াছেন তিনিই কি তবে ইহার ভগ্নীপতি ? তিনিও ইংরাজ পত্নী থাকিতে মুসলমান হইয়া মুসলমানী বিবাহ করেন, কিংবা ভুলিতেছি ; প্রথম বিবাহিতা মুসলমানী ভার্যা ত্যাগ করিয়াই বুঝি পুনরায় স্বদেশীয়া ভার্যা গ্রহণ করিয়াছেন। এই দ্বিজাতি দ্বিপত্নী পরিণয়ের পর্যায় পরম্পরায় আবৃত্তিতে আমার ভুলচুক হউক, কিন্তু মূল ঘটনাটি সত্য। উক্ত শোচনীয় পরিণাম – ফুলওয়ালীকে কহিয়া তাহার মনঃক্ষোভ জন্মাইতে আমার প্রবৃত্ত হইল না। আমি শুধু জিজ্ঞাসা করিলাম, “তিনি কি সিলন সিভিলিয়ান হইয়া যান ?” সে বলিল, “সে কোথা ? আমি জানি না।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “তোমার ভগিনীপতির নাম কি ?”

সে যাহা বলিল সিলন সিভিলিয়ানের নামের সহিত মিলিল না। সম্ভবত তবে এ আর একজন – যদি না ইহারা নাম বিকৃত করিয়া থাকে। আমি চুপ করিয়া এ সম্বন্ধেই ভাবিতেছি – সে সহসা বলিল, “সাব একটি আর্জি আছে।”

“কি বল।”

“প্রান্ত সাহেব তসবীর তোলেন – না।”

“হ্যাঁ।”

“তাঁর তসবীর এঁর কাছে আছে কি ?”

হাসিয়া বলিলাম, “এ প্রান্তসাহেব চার বৎসর এদেশে এসেছেন আর তুমি বলছ তোমার প্রান্তসাব ১০ বছর এখানে আসেন নি ?”

“অন্য জায়গায় ত দেখা হতে পারে ?”

“তা বটে, কিন্তু ইনি ও নামের কাউকে চেনেন বলে আমি ত জানিনে। জিজ্ঞাসা করব এখন।”

সে বহুদিন হইতে ভবিষ্যতের মুখপানে চাহিয়া নিরাশ, ব্যথিত, ক্ষুব্ধ, সুতরাং এই আকাঙ্ক্ষাটি পূরণের জন্য পর্যন্ত আবার ধৈর্য ধরিতে চাহিল না, বলিল, “সাব, প্রান্ত সাহেবের ছবিগুলি একবার আমাকে দেখান না।” আমি তাহাতে অসম্মত হইবার কোন কারণ না দেখিয়া সিপাইকে ডাকিয়া তাহার টেবিল হইতে ছবিগুলো আনিতে আদেশ করিলাম। জানিতাম তাহাকে নিরাশ হইতে, কিন্তু কি করব।

সিপাই ছবির রাশি আনিয়া আমার শয্যায় রাখিয়া চলিয়া গেল। ফুলওয়ালী আমার আজ্ঞার অপেক্ষা না করিয়াই সোৎসুকে একের পর একে ছবিগুলো দেখিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে হঠাৎ একেবারে বিস্ময়ে আহ্লাদে “এই এই” করিয়া উঠিল।

আমি এতক্ষণ ছবির দিকে লক্ষ্য না করিয়া তাহার মুখের দিকে লক্ষ করিতেছিলাম। তাহার কথায় মুখ বাড়াইয়া দেখিলাম প্রান্তসাহেবের ছবির সঙ্গে দুচারখানি রং জ্বলা ফটোগ্রাফ রহিয়াছে, সেগুলি সেই পার্সি ইঞ্জিনীয়ারের সম্পত্তি, তিনি একদিন আমাদের দেখাইবার জন্য বাক্স হইতে বাহির করিয়াছিলেন, তাহার পর দেখিতেছি ভুলিয়া ফেলিয়া গেছেন। সেই ছবিরই একখানি দেখিয়া সে হর্ষবিহ্বল হইয়া উঠিল, তাহার পর অনেকক্ষণ ধরিয়া দেখিয়া দেখিয়া বলিল, “সাব, আমাকে এইখানি দিতে হুকুম হোক।” আমি বলিলাম, “ছবিখানি আমাদের নয়, আমাদের একজন বন্ধুর, তিনি ফেলে গেছেন। আচ্ছা তাঁকে চিঠি লিখব ; যদি তিনি দিতে বলেন ত তোমাকে দিব।”

সে বলিল, “কবে টের পাব সাব্‌ ?”

“কাল বা পরশুই উত্তর পাওয়া যাবে।”

সে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া ধীরে ধীরে ছবিখানি রাখিল। শয্যার উপর অন্যান্য ছবিগুলোর সহিত একত্রে না রাখিয়া আমার ক্ষুদ্র বেতের টেবিলের উপর সেখানি রাখিয়া তাহার বাড়তি ফুলের তোড়াটি তাহাকে সমর্পন করিয়া বিদায় গ্রহণ করিল।

তৃতীয় দিনে নহে, আজ চতুর্থদিনে পার্সি সাহাবের উত্তর পাইয়াছি, তিনি ছবিখানি লইতে বলিয়াছেন। আমি তাই আগ্রহ সহকারে ফুলোয়ালীর জন্য অপেক্ষা করিয়া আছি। সে প্রতিদিন তাম্বু প্রবেশ করিয়াই সাভিবাদনে সর্বাগ্রে ঐ প্রশ্ন করে ; – উত্তরে হতমান হইয়া দীর্ঘনিঃশ্বাস সহকারে আমার ফুলের তোড়াটি আমাকে দিয়া অন্যটি ছবির পদপ্রান্তে রাখিয়া সজল নয়নে তৎপ্রতি চাহিয়া থাকে। তাহার পর মুখ তুলিয়া একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস সহকারে সেলাম করিয়া  চলিয়া যায়।

ঐ সে আসিতেছে। তাহার ফুলের রূপে, তাহার নিজের রূপে ফুল্লপ্রভাত ফুল্লতর করিয়া ঐ সে চঞ্চল চরণে আসিতেছে। এই তাম্বু প্রবেশ করিয়া সাভিবাদনে আমার নিকট দাঁড়াইল। দাঁড়াইইয়া ছবির প্রতি দৃষ্টিপাত করিল, আমি তাহার হৃদকম্পন অনুভব করতেছি।

আজ সে প্রথমেই ফুলের তোড়াগুলির যথাবিহিত ব্যবস্থা করিয়া পরে জিজ্ঞাসা করিল “খবর পেয়েছেন আর ?” আমি বলিলাম, “পেয়েছি, ছবিখানি তোমার।”

তাহার নয়নে, আনন্দে কি সানন্দ উদ্ভাসিত হইল, সর্বাঙ্গে প্রীতিপুলক সঞ্চারিত হইয়া উঠিল ; সেই তরঙ্গাবেগ আমাকেও স্পর্শ করিতেছে। সে মুখে কিছু কহিল না, কিন্তু তাহার নীরব কৃতজ্ঞতা অভিবাদন অধিকতর মর্মগ্রাহী। তাহার সে সুখে আমি কেমন দুঃখিত হইয়া পড়িলাম – ভাবিলাম কি অপরূপ ঘটনা। এই যৌবনবতী রূপবতী রমণী কি ঐ নির্জীব ছবিখানির দর্শনে পূজায় আপনার জ্বলন্ত জীবন্ত প্রাণবন্ত অনুরাগ আকাঙ্খা চিরসমাধিস্থ করিবে ?

ফুলওয়ালীর মুখে এরূপ কোন দুঃখের ছায়াও দেখিলাম না। প্রীতিময়ী রমণী তাহার চির আকাঙ্ক্ষিত মিলাতেই যেন অসীম প্রীতিপূর্ণ হইয়া অঞ্চল হিল্লোলে দিগদিগন্তে সে আনন্দ প্রীতি বিস্তার করতে করিতে চলিয়া গেল।

শুষ্ক নীরস কঠোর পেন কাহার রূপে নবীন সরস সুকোমল। এখানকার শত অভাব, শত অসুখ কোন স্নিগ্ধতা সিঞ্চনে পুলক প্রচ্ছন্ন তাহা আমি একবার হৃদয়ঙ্গম করিলাম।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ