তারিখ: 25 Sep

ভগীরথ মিশ্র’র লেখালিখি

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমীর ঘোষ


[ বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে  তাঁর  লেখা সুবৃহৎ উপন্যাস ‘ মৃগয়া’। একে কেউ বলেছেন মহাসাহিত্য আবার কেউ  বলেছেন ভারতীয় উপন্যাসের মডেল। তাঁর লেখালিখি হয়ে উঠেছে  বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের গবেষনার বিষয়।  তিনি ভগীরথ মিশ্র। যাঁর লেখায় পাঠক খুঁজে পান মাটির টান।  তিনি মনে করেন গোটা ভারতবর্ষটাই কৃষিপ্রধান আধা সামন্ততান্ত্রিক দেশ। গোটা দেশটাই  একটা গ্রাম। যার ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে আছে অজস্র গল্প, অজস্র কাহিনী। পেয়েছেন বঙ্কিম পুরস্কার সহ বহু সম্মান।প্রচারের আলো থেকে নিজেকে আড়ালে রেখেই নিরলস সাহিত্য সৃষ্টি করে চলা মানুষটির সাক্ষাৎকারে উঠে এল অনেক অজানা কথা। ‘গল্পের সময়’-এর পক্ষে  সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমীর ঘোষ।]

গল্পের সময়ঃ    আপনি দীর্ঘ বছর ধরে গল্প লিখছেন। ৩১ বছর বয়সে আপনার প্রথম গল্প প্রকাশ হয় বালুরঘাট থেকে প্রকাশিত ‘মধুপর্ণী’ পত্রিকায়। গল্পের নাম ছিল ‘কদমডালির সাধু’। এই গল্প কী আপনি হঠাৎ লিখেছিলেন? নাকি গল্প লেখার কোনও প্রস্তুতি ছিল?

ভগীরথ মিশ্রঃ   এই গল্পটা লেখার কোনও প্রস্তুতি ছিল না ঠিকই, কিন্তু অনেক ছোটবেলা থেকেই আমি টুকটাক গল্প লিখতাম। আমি যখন ক্লাস সেভেন-এইট বা নাইনে পড়ি তখন একটা পাখির গল্প লিখেছিলাম পোয়েটিক জাস্টিসের ঢঙে। একজনের বাড়ির বাগানে, পুকুর পাড়ে একটা পাখি বাসা বেঁধেছিল। পাখি বাচ্চা দিলেও মালিক সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে বিশেষ কারণে গাছটা কেটে ফেলল। এতে বাচ্চাগুলো জলে পড়ে মারা গেল। এরপর ওই জমির মালিক যখন সপরিবারে গঙ্গাসাগর গেল তখন তার দুই শিশু সন্তানও জলে ডুবে মারা গেল। এই ছিল আমার গল্পের বিষয়। সেই গল্পের একজন মাত্র শ্রোতা ছিলেন, আমার মা। এই গল্প শুনে মা দু-বার কেঁদেছিলেন। একবার পাখির বাচ্চা মারা যাওয়ার সময়, আর একবার ওই জমির মালিকের বাচ্চা দুটো মারা যাওয়ার সময়। এরপর টুকটাক স্কুল ম্যাগাজিন বা এখানে ওখানে যা লিখেছি তা হারিয়ে-টারিয়ে গেছে। তখন আশুতোষ, যোগমায়া এবং শ্যামাপ্রসাদ এই তিন কলেজ নিয়ে গল্প কবিতা-প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা হত। ১৯৬৬ সালে আমি তখন আশুতোষ কলেজের ছাত্র। সে বছর আমার লেখা একটা গল্প দ্বিতীয় স্থান অধিকার করল এবং পরের বছর ম্যাগাজিনে তা ছাপা হল। সেই ম্যাগাজিন আজও আমার কাছে আছে। এরপর নবকল্লোল পত্রিকায় ‘মূলধন’ নামে আমার একটি গল্প প্রকাশ হয়। সেটি ছিল একটি   ট্যাঁস গল্প। এখন শুনলে হাসি পায়। এদিকে ১৯৭৪ সালে আমি বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে যোগ দিই। বালুরঘাটে আমার পোস্টিং হয়। বিডিওর চাকরি করতে গিয়ে লেখালিখি লাটে ওঠে। আমার গল্পের খাতা বাড়িতেই থেকে যায়। চাকরিতে ঢুকে ৭৮ সাল পর্যন্ত আমি আর কিছুই লিখিনি। লেখার কথা ভাবিও নি। গল্প লিখে সাহিত্যিক হব সে কথা কল্পনাও করিনি।  তবে কোথাও বোধহয় তাগিদটা ছিল। তখন ‘মধুপর্ণী’ উত্তরবঙ্গের সেরা পত্রিকা।  অজিতেশ ভট্টাচার্য তার সম্পাদক। তার সঙ্গে পরিচয় হল, আলাপ হল। তার এক বিশেষ দিক ছিল। যার সঙ্গেই তার আলাপ হত (বিশেষ করে বহিরাগত সরকারি কর্মচারি) তাকেই কীভাবে ‘মধুপর্ণী’ পত্রিকার জন্য ব্যবহার করা যায় তা ভাবতেন। যার লেখালেখির ক্ষমতা নেই, কিন্তু শুনতে ভালবাসেন তাকে সাহিত্যপাঠের আসরে টেনে নিয়ে যেতেন। আমার সঙ্গে আলাপ হতে দু-চার কথায় তিনি বুঝে নিলেন আমি অল্পসল্প লেখালিখি করেছি। তিনিই আমার অফিসে বার তিরিশ ফোন করে এবং বাড়িতে বার কুড়ি এসে আমাকে দিয়ে গল্প লিখিয়ে নিলেন। সে গল্প লিখে মধুপর্ণী সাহিত্য সভায় পাঠ করা হল। সবাই মতামত দিলেন এবং তা ১৯৭৮ সালে ‘মধুপর্ণী’তে প্রকাশ হয়ে গেল। সেই গল্পটিই ‘কদমডালির সাধু’। প্রকাশ হওয়ার পর গল্পটি উচ্চ-প্রসংশিত হল। এমনকি মণি বাগচি গল্পটির সঙ্গে দস্তয়ভস্কির গল্পের তুলনা করে বসলেন।

গল্পের সময়ঃ প্রথম গল্প ছাপা হওয়ার পর কী লেখার নেশা পেয়ে বসল?

ভগীরথ মিশ্রঃ   আসলে হল কী এরপর সেখানে সাহিত্যমনস্ক মানুষের সঙ্গে দেখা হলেই  তাঁরা সেই গল্পের কথা বলেন। বালুরঘাট তখন খুব সংস্কৃতিমনস্ক অঞ্চল। সেখানে অনেকেই আমায় উৎসাহ দিতে লাগলেন। আমিও গল্প লেখার তাগিদ অনুভব করলাম। অজিতেশবাবু পুজো সংখ্যার জন্য গল্প চেয়ে বসলেন। আমার সেই পর্বে দ্বিতীয় গল্প লেখা হল। নাম লেবারণ বাদ্যিগর।  এই গল্প আমার বিখ্যাত গল্পগুলোর মধ্যে একটি। পরে এই নামে একটি বইও বের হয়। এই গল্প প্রকাশ হওয়ার পর আমি   উত্তরবঙ্গে গল্পকার হিসেবে প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলাম। খুবই উৎসাহিত বোধ করলাম। আমি উত্তরবঙ্গে ৮১ সাল পর্যন্ত ছিলাম। সেখানেই আমি প্রায় ৪০টা গল্প লিখে ফেললাম। তারপর মহাশ্বেতা দেবীর ‘বর্তিকা’তে একের পর এক গল্প লিখতে লাগলাম।  ‘প্রমা’ তখন গল্প চাইল। সেখানে লিখলাম। তারপর ‘অনুষ্টুপ’-এ গল্প লিখতে লাগলাম। এরপর আমি ওখান থেকে বিষ্ণুপুর চলে এলাম। বিষ্ণুপুর-বাঁকুড়া তো গল্প-উপন্যাসের খনি। আমি তো যতগুলো উপন্যাস লিখেছি তার বারোয়ানারই পটভূমি হল বাঁকুড়া। এই হল আমার মোটামুটি গল্প লেখার শুরুর গল্প।

গল্পের সময়ঃ    লেখক হয়ে ওঠার জন্য একজন লেখকের একটা লড়াই থাকে।কোথায় ছাপা হবে,কতজন পাঠক তা পড়বেন। আপনার সেই লড়াইটা কীরকম ছিল?  

ভগীরথ মিশ্রঃ   সৌভাগ্যবশত আমাকে লেখা ছাপানোর লড়াইটা করতে হয় নি। এটা অধিকাংশ গল্পকারের ক্ষেত্রেই জোটে না, কিন্তু আমার জুটেছিল। তার কারণ গোটা উত্তরবঙ্গ ছিল ভীষণভাবে সাহিত্য-সংস্কৃতির জায়গা। শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, রায়গঞ্জ, বালুরঘাট সমস্ত জায়গা থেকে প্রকাশিত হত বহু প্ত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন। সাহিত্যের বহু বোদ্ধা এই সব অঞ্চলে থাকতেন। ৭৮ থেকে ৮১ এই তিন বছরে উত্তরবঙ্গের কাগজে আমি ২০টির মত গল্প লিখেছি। আর বাকি গুলো লিখেছি বর্তিকা, প্রমা ইত্যাদি পত্রিকায়। এখনকার নবীন গল্পকারদের মধ্যে একটা জিনিস লক্ষ্য করি যে তারা দু-চারটে গল্প লিখেই তা ছাপানোর জন্য পাগল হয়ে যায়। এখানে ছোটো, ওকে ধর, একে ধর। আমাকে এসব করতেও হয়নি, আর করিও নি। কারণ প্রথম দুটো গল্প বেরিয়ে যাওয়ার পর, অন্তত উত্তরবঙ্গে আমি যে ভাল গল্পকার তা প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। ‘মধুপর্ণী’ পত্রিকাটি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন পত্রিকা দপ্তরে যেত। সেখানে আমার গল্প দেখে পত্রিকা অফিসগুলো থেকেই আমায় গল্প চাইতে লাগল। এত প্ত্রিকাকে যোগান দেওয়ার মত ভাল গল্পকার তখনও ছিল না, এখনও নেই। উত্তরবঙ্গে গল্পকার বলতে তখন বালুরঘাটে আমি লিখি, অভিজিৎ সেন লেখেন, আলিপুরদুয়ারে জিষ্ণেন্দু চক্রবর্তী লেখেন – এইরকম পাঁচ-ছ-জন তখন লিখছেন। দেবেশ রায় তখন কলকাতায় চলে এসেছেন। উত্তরবঙ্গে স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার সংখ্যা না হলেও খান কুড়ি ছিল। কাজেই আমাদের গল্প লেখার চাপ ছিল। প্রত্যেকেই  পুজো  সংখ্যায় গল্প চায়। আমিতো বছরে ছ’টার বেশি গল্প লিখতেই পারতাম না। যারা চাইত, তাদের ডাকে গল্প পাঠিয়ে দিতাম। কলকাতাতেও লিটল ম্যাগাজিনগুলো অন্যান্য জেলার ভালো কাগজের লেখাগুলো নজর করত। সেই সুবাদে মহাশ্বেতা দেবী আমাকে গল্প পাঠাতে বললেন।প্রমার সুরজিৎ ঘোষ আমাকে গল্প পাঠাতে বললেন। অনুষ্টুপের অনিল আচার্য গল্প চাইলেন। এইরকম সেই সময়ের প্রতিনিধি স্থানীয় দু-তিনটে পত্রিকায় লেখা শুরু করলাম। সেই অর্থে আমার গল্প ছাপানোর কোনও লড়াই ছিল না, কিন্তু গল্প লেখার লড়াই ছিল। যেহেতু দীর্ঘদিন লিখিনি, তাই কী লিখছি, কী লিখব তা নিয়ে ভাবতে হত। আমার চাকরি সামলে সময় বের করে লেখালিখি করতেও বেগ পেতে হত। পরবর্তীকালে কাগজ-কলম নিয়ে বসলেই যেমন লেখা চলে আসত প্রথম দিকে তেমন ছিল না। তখন কমপিউটারও ছিল না। তবে ২০০১ সাল থেকে আমি হাতে এক লাইনও লিখিনি। সবটাই কমপিউটারে। হাতে লেখার ক্ষেত্রে কাটাকুটি, আবার ফ্রেশ করা এসব মিলিয়ে বেশ পরিশ্রমের কাজ। যাই হোক আমি যখন দক্ষিণবঙ্গে এসে পড়লাম তখন বর্তিকা, প্রমা, অনুষ্টুপে নিয়মিত লিখছি। এক্ষণেও গোটা দুই গল্প বেরিয়েছে। এসবই ডাকে পাঠিয়ে দিতাম। তবে কলকাতার খবরের কাগজে যখন লিখতাম তখন শহরে এলে কাগজের দপ্তরে গিয়ে লেখা জমা দিয়ে আসতে হত। এমনকি আমার ‘দেশ’-এ প্রথম গল্প যে ছাপা হল তাও আমি নিজে পাঠাই নি। তখন আমি বিষ্ণুপুরে চাকরি করি। সেখানকার বিখ্যাত চারণ কবি বৈদ্যনাথের পুত্র স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় ‘দেশ’ পত্রিকায় কবিতা লিখতেন। সেই সময় ‘দেশ’-এ গল্প দেখতেন আনন্দ বাগচি। তিনি একসময় বাঁকুড়া কলেজের প্রফেসর ছিলেন। ‘পারাবত’ নামে একটি কাগজও করতেন। আর স্বপন করতেন ‘সোপান’ নামের কাগজ। সেই আলাপের সূত্র ধরে আনন্দদা একদিন স্বপনকে বলেন, ভগীরথ তো বিষ্ণুপুরে থাকে, ওকে বলো একটা গল্প দিতে। স্বপন সে কথা আমাকে জানায়। আমি স্বপনের হাত দিয়েই ‘রাবণের বয়স’ নামে গল্প পাঠিয়ে দিই। এরপর সম্মান দক্ষিণা নিতে আমি যখন ‘দেশ’-এর দপ্তরে গেলাম তখন আনন্দদা বললেন তুমি আর একটা গল্প দিও। কোথাও কোনও লেখা ছাপার জন্য আমাকে তদ্বির করতে হয়েছে এমনটা আমার মনে পড়ে না।

গল্পের সময়ঃ    ‘মধুপর্ণী’তে গল্প প্রকাশের পাঁচ বছরের মাথায় ১৯৮৩ সালে আপনার গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়,  যার নাম ছিল জাইগেনসিয়া অন্যান্য গল্প’কারা ছাপল সে বই?

ভগীরথ মিশ্রঃ   আসলে ‘জাইগেনসিয়া ও অন্যান্য গল্প’ নিয়েও একটা গল্প আছে। তখন আমি বিষ্ণুপুরে চাকরি করি। তখন মেদিনীপুর থেকে প্রকাশিত ‘অমৃতলোক’ পত্রিকার সম্পাদক সমীরণ মজুমদার গল্প পড়ে আমার কাছে ছুটে আসেন। সে খুব কষ্ট স্বীকার করে ওই কাগজ করত। সে বলল আমি আপনার একটা বই করব। অথচ তার হাতে তখন বই ছাপানোর মত পয়সা ছিল না। সমীরণ তখন মেদিনীপুর কালেক্টরেটে কেরানীর চাকরি করত। একটা আশ্চর্য উপায় ঠিক হল। সে ‘অমৃতলোক’ পত্রিকাকে ত্রৈমাসিক থেকে মাসিক করে দিল। তাতে সামান্য কিছু কবিতা, কিছু লেখা ও আমার গল্প প্রকাশ করা হত।প্রতি সংখ্যাতেই শ’পাঁচেক করে প্রিন্টআউট বাড়তি রেখে দেওয়া হত। এইভাবে আমার ১২টা গল্প প্রকাশ হওয়ার পর একদিন সে আমার বাড়িতে এসে সেইসব ছাপাগুলো রেখে গেল। ততদিনে সে নানা সাংসারিক সংকটে জড়িয়ে পড়ে হতাশ হয়ে পড়েছে। সমীরণ বললেন, আমি এতদূর করেছি, এবার আপনি যা হয় করুন। বিষয়টা কানে গেল কুটুম-কাটুম ও নিজের হাতে গড়ে তোলা গ্রামীন শিল্প সংস্থা ‘অভিব্যক্তি’র প্রধান এবং অধ্যাপক উৎপল চক্রবর্তীর। তিনি একদিন একটা প্রচ্ছদ এঁকে নিয়ে এলেন। বললেন এবার আপনি যা হয় করুন। তখন গল্পকার দীপঙ্কর দাস ওই প্রচ্ছদটি একদিন নিয়ে গিয়ে ৫০০ কপি ছাপিয়ে দিয়ে গেলেন। বললেন এবার আপনি যা হয় করুন। আমার তখন বইটা আর না বের করে উপায় রইল না। আমি বিষ্ণুপুরেরই বাঁধাইওলাকে ডেকে বললাম এই হল প্রচ্ছদ, এই হল ছাপা গল্প। তুমি এগুলো বেঁধে দাও দিকি। বাঁধাই খরচটাই কেবল আমাকে দিতে হয়েছিল। এইভাবেই আমার প্রথম বই বের হল ‘জাই্গেনসিয়া ও অন্যান্য গল্প’।

গল্পের সময়ঃ    ১৯৯০ সালে ‘প্রমা’ থেকে প্রকাশিত হল আপনার প্রথম উপন্যাস। নাম ‘অন্তর্গত নীলস্রোত’প্রথম উপন্যাস লেখার অভিজ্ঞতাটা একটু শুনব।

ভগীরথ মিশ্রঃ   তখন আমি প্রমা’তে একাধিক গল্প লিখেছি। কলকাতার নানা কাগজে লিখছি। প্রমার সুরজিৎ ঘোষ একদিন আমাকে বললেন, তুমি উপন্যাস লিখছো না কেন? আসলে তখন আমি ভেতরে ভেতরে একটা উপন্যাস লেখা শুরু করেছি। আমি সে কথা বলতেই বললেন, শেষ করে ফেল। তো তারপর সেই উপন্যাস আমি ২-৩ মাসের মধ্যে শেষ করলাম। কিছু দেখা চরিত্র, কিছু দেখা ঘটনা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই লিখে ফেলেছিলাম এই উপন্যাস। সেটা সে বছর ‘প্রমা’ পুজো সংখ্যায় ছাপা হয়ে গেল। তারপরই সুরজিৎ ঘোষ বললেন, এটা কিন্তু বই করব আমরা। এটা অন্য কাউকে দিও না। সেই উপন্যাসই একটা মলাট চাপিয়ে বের হয়ে গেল বইমেলায়।

গল্পের সময়ঃ    বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে আপনার লেখা সুবৃহৎ উপন্যাস ‘ মৃগয়া’।একে কেউ বলেছেন মহাসাহিত্য আবার কেউ  বলেছেন ভারতীয় উপন্যাসের মডেল।এর আকার দেখলে বিস্মিত হতে হয়। অন্তরের কোন তাড়না থেকে লিখেছিলেন এমন আখ্যান?

ভগীরথ মিশ্রঃ   মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। তিনদিকে আদিবাসীদের পাড়া। একদিকে বিশাল শালের জঙ্গল। তার মধ্যে আমাদের বিশাল গ্রাম। সেই গ্রামে সব রকমের মানুষ আছে। এমনকী একজন ডাকসাইটে জমিদারও আছে। এইরকম একটা পরিমণ্ডলে আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। একেবারে সামন্ততান্ত্রিক একটা পরিবেশ, যেখানে জমিদারের অত্যাচারও ছিল তেমনি অত্যাচারিত মানুষের নানারকমের প্রতিক্রিয়া ছিল। অন্যদিকে আমি ছোটবেলা থেকেই ছিলাম খুব বাউণ্ডুলে প্রকৃতির। গ্রামে যে সব সম্পন্ন পরিবার ছিল তারা প্রত্যেকেই গরু চড়াবার জন্য সারা বছরের লোক রাখত। তাদের ‘বাগাল’ বলত। এরা গরু চড়াতে গিয়ে সারাদিন জঙ্গলেই কাটাত। আমাদের বাড়ির যে বাগাল সে আমাকে অদ্ভূত অদ্ভূত জঙ্গলের গল্প শোনাত। এইসব শুনে আমি প্রকৃতি দেখার লোভে কাউকে কিছু না বলে জঙ্গলে পালিয়ে যেতাম। তখন ওয়ান বা টুতে পড়ি। স্কুল হয়ত আগেভাগে ছুটি হল, কাউকে কিছু না বলে চলে যেতাম জঙ্গলে। সারাদিন ফুল-পাখি-গাছ দেখে বাড়ি যখন ফিরলাম তখন দেখি কান্নার রোল। মনে আছে  একবার  এক গ্রামীণ ম্যাজিশিয়ানের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলাম। একমাস ওর সঙ্গে ছিলাম। সে এক অন্য গল্প। পড়াশুনায় মোটামুটি ভালই ছিলাম। বড় হয়ে অনেক পেশায় যুক্ত হয়েছি। মাইনে নিয়ে পেশাদার দলে যাত্রা করেছি। ৬০-এর দশকে যাত্রা দলে আমার মাইনে ছিল আট টাকা। মাছের ব্যাবসা করেছি, ওঝা-গুণীনের সাগরেদি করেছি, সাপুড়ের সাগরেদি করেছি। পরবর্তীকালে একজন মাস্টারমশাই রেখে যাদুবিদ্যা শিখেছি। সেটা অবশ্য এই ১৯৯৭ থেকে ২০১০ পর্যন্ত। তখন আমি সরকারি চাকরি করছি। ইংল্যাণ্ডে গিয়ে, মালয়েশিয়া গিয়ে ঘণ্টা দেড়েক করে শো করেছি। মাস্টারের সঙ্গে ঘুরে উত্তরবঙ্গের প্রায় সমস্ত জায়গায় ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়িয়েছি। এত কথা বলার কারণ হল, আমি খুব এলোমেলো বিধিবদ্ধহীন জীবন কাটিয়েছি। আমার সব বিচিত্র অভিজ্ঞতা জমা ছিল ভেতরে। ‘কদমডালির সাধু’ লিখতে গিয়েও তা বুঝতে পারি নি। পরবর্তীকালে তা যেন আমার কলমের ডগায় চলে এল। শৈশবে মনের ভেতর যা জমা হয় তা হারায় না। চাকরি সূত্রেও প্রত্যন্ত গ্রামে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। গ্রামের বিচিত্র মানুষ, আদিবাসীদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখেছি। বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরের ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে আছে অজস্র গল্প, অজস্র কাহিনী। আসলে ভারতবর্ষটাই কৃষিপ্রধান আধা সামন্ততান্ত্রিক দেশ। আসলে গোটা দেশটাই একটা গ্রাম। নামেই কিছু শহর আছে। সেখানকার মানুষজন প্যান্ট-শার্ট পরে, কাঁটা-চামচে খায় ঠকই কিন্তু একটু তলায় ঘুরে দেখলেই দেখা যাবে

                            ম্যাজিক দেখাচ্ছেন ভগীরথ মিশ্র

সেখানে বয়ে চলেছে যাবতীয় সংস্কার-কুসংস্কারের ধারা। সেই ছোটবেলার আমার গ্রাম, জমিদার-প্রজা সম্পর্ক, বৈচিত্রময় কর্মজীবন, বিচিত্র পেশা, গোটা দেশের হালচাল আমার সামনে এই বিশাল ভারতবর্ষের একটা ক্যানভাস তুলে আনল। তখনই আমি লেখা শুরু করলাম ‘মৃগয়া’। ১৫ বছর লেগেছিল আমার এই উপন্যাসটি শেষ করতে। পাঁচটি খন্ড বেরিয়েছিল। এখন অখণ্ড সংস্করণ পাওয়া যায়। শুধু এই উপন্যাসের উপর ভিত্তি করেই ২০১২ সালে অসম সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক অধ্যাপক পি এইচ ডি করেছেন। আর দুটি এম ফিল হয়েছে।

গল্পের সময়ঃ    শোনা যায় আপনি যখন ‘মৃগয়া’ লিখছেন তখন অন্য কোনো লেখায় নাকি হাতই দেননি।পুজোসংখ্যার লেখালিখিও ন্ধ রেখেছিলেন?

ভগীরথ মিশ্রঃ   এই উপন্যাস লেখার জন্য দশ বছর আমি পেপার ওয়ার্ক করেছি। তথ্য সংগ্রহ করেছি। প্রস্তুতি নিয়েছি। ১৯৯৬-এ প্রথম খণ্ড প্রকাশ হয়। ১৯৯৭-এ দ্বিতীয় খণ্ড, ৯৮-এ তৃতীয়, ৯৯-এ চতুর্থ আর ২০০০ সালে পঞ্চম খণ্ড। তা এই পাঁচ বছর আমি কোনো কাগজে গল্প তো দূরের কথা, একটা চিঠি অবধি লিখি নি। তখন একটা ঘোরের মধ্যে লিখছি। চাকরি করছি, মিটিং করছি কিন্তু মনের মধ্যে লেখা কাজ করে চলেছে। যখনই সময় পেতাম, বিশেষ করে ভোর পাঁচটা থেকে ৯’টা পর্যন্ত টানা লিখতাম। আবার রাত আটটায় অফিস থেকে ফিরে লিখতাম। চলত ১২টা ১টা পর্যন্ত। বেড়াতে যাওয়ার নাম করে ৫ বছরে অন্তত পাঁচবার একমাস করে ছুটি নিয়ে দরজা জানলা বন্ধ করে লিখেছি। আমার একটা সুবিধে ছিল যে সংসারের কাজ দোকান-বাজার আমায় তেমন একটা করতে হত না। এসব আমার স্ত্রী সামলে দিতেন। লেখার জন্য তিনি এতটা পরিসর দেওয়াতেই আমি এইসব লিখতে পেরেছি।

ভগীরথ মিশ্রর নিজের তৈরি ‘কুটুম-কাটাম’

গল্পের সময়ঃ   অনেককেই বলতে শুনেছি ( যারা লেখালিখির মধ্যে আছেন ), লেখকের কোনও  সামাজিক  জীবন  থাকে না।  লেখককে বন্ধু-বান্ধব, সংসার  জীবনের  আনন্দে অনেকটাই কমপ্রোমাইজ করতে হয়। বিষয়ে আপনার কী মত?

ভগীরথ মিশ্রঃ   দেখুন সেই অর্থে  ১৯৭৮ থেকে আমার লেখক জীবন শুরু। নব্বইয়ের পর থেকে একের পর এক উপন্যাস বেরিয়েছে। দু-তিনটে বাদ দিলে কোনও উপন্যাসই রয়াল সাইজের ৫০০ পাতার চেয়ে কম নয়। গল্প তো প্রায় ২৫০ মত। ছোটদের গল্প লিখেছি, ছোটদের উপন্যাস লিখেছি – তার সংখ্যাও কম নয়। আমার লেখা ভ্রমণকাহিনী নিয়ে সাত-আটখানা বই আছে। দু-তিনটে রম্যরচনার বই আছে। তার সঙ্গে আমি বনসাই চর্চা করতাম। ৫০০টা বনসাই আমি নিয়মিত পরিচর্চা করতাম। বাংলা ভাষায় ‘বনসাই’ নিয়ে যে পূর্ণাঙ্গ বই সেটি আমারই লেখা। সেটা এখনও খুব রমরমিয়ে চলে। এর সঙ্গে আমি ‘কুটুম-কাটাম’ নামের আর্টের চর্চা দীর্ঘকাল ধরে করে চলেছি। তার সঙ্গেই আমি খুব আড্ডাবাজ মানুষ বলে বন্ধু-বান্ধব ও সাহিত্যমহলে পরিচিত। এই সুবাদে আমি ঘুরেও বেড়াই প্রচুর। আসলে আমার যেটা মনে হয়। আমি যেটা সকলকে বলি যে ঠিকমত ব্যবহার করতে জানলে ২৪ ঘণ্টা কিন্তু অনেকটা সময়। টাইম প্ল্যানিং না করলে অনেক বেশি কাজ করা যাবে না।

                         ভগীরথ মিশ্রর নিজের তৈরি ‘বনসাই’

গল্পের সময়ঃ    গল্প উপন্যাসের পাশাপাশি এই যে ভ্রমণকাহিনী, রম্যরচনা – এগুলো কী একঘেঁয়েমি কাটাতে নাকি প্রকাশক-
সম্পাদকের
চাপে?

ভগীরথ মিশ্রঃ   না, না আমি কারোর চাপে কখনও লিখি নি। সেজন্যই তো আমার আনন্দবাজার  হাউসে টিকে থাকা হল না। কোনও ফরমায়েসি লেখা কেউ দিলেই তা খারাপ হয়ে গেছে। আমাকে এই বিষয়ে লিখতে হবে এই যখন মাথায় খেলে গেছে সে লেখা আর হয়ে ওঠে না। আমি নিজের খেয়ালে লিখি। ভ্রমণ সাহিত্যগুলো সেভাবেই লেখা। আর ছোটবেলা থেকেই আমার হাসির গল্প পড়তে আর শুনতে খুব ভাল লাগত। আর আমার মধ্যেই একটা হিউমারাস মানুষ বাস করে। সেই আমাকে দিয়ে এসব লিখিয়ে নেয়। একসময় ‘প্রতিদিন’ কাগজে ধারাবাহিক রম্যরচনা লিখেছি। এই তো কিছুদিন আগেও বছর দেড়েক ধরে ‘উত্তরবঙ্গ সংবাদে’ রম্যরচনা লিখতাম। সেইসব সংগ্রহ করে বেরিয়েছে ‘অর্বাচীনের জার্নাল’। তারপর বেরিয়েছে ‘লঘুপুরাণ’।


গল্পের
সময়ঃ    ছোটদের জন্য প্রচুর লিখেছেন। গল্প লিখেছেন, কিশোর উপন্যাস লিখেছেন। ছোটদের জন্য   লিখতে কেমন লাগে?

ভগীরথ মিশ্রঃ    ভালই লাগে। তবে কঠিন কাজ বলে মনে হয়। বড়দের লেখার চেয়ে ছোটদের জন্য লেখা, ছোটদের মত করে তা পরিবেশন করা তুলনায় বেশ কঠিন। যেমন বলা যায় সিরিয়াস গল্প লেখার চেয়ে হাসির গল্প লেখা বেশ কঠিন।

গল্পের সময়ঃ    কোনও বাড়তি দায়িত্ব কী এসে পড়ে?

ভগীরথ মিশ্রঃ   না, দায়িত্বের ব্যাপার-ট্যাপার নয়। ছোটদের জন্য বিষয় নির্বাচন করা,উপস্থাপনার শৈলী ইত্যাদি আমাকে খুব ভাবায়।

               ভগীরথ মিশ্রর আঁকা ব্যাঙ্গচিত্র


গল্পের
সময়ঃ    বঙ্কিম পুরস্কার সহ বহু সম্মান পেয়েছেন, লেখালিখির ক্ষেত্রে এসবের গুরুত্ব কতখানি বলে আপনি মনে করেন?

ভগীরথ মিশ্রঃ   গুরুত্ব তো আছে। পুরস্কার, সম্মান লেখককে উৎসাহিত করে। কিন্তু পুরস্কারের খপ্পরে যারা পড়ে গেছেন তাদের দেখেছি সেটা না পেলে তাদের কেমন মানসিক অশান্তি তৈরি হয় । তবে আমার এসব নিয়ে সেরকম কোনও ভাবনা হয় না। আমার গল্প উপন্যাসের যে ধরণ তাতে পাঠকের যে সম্মান পেয়েছি তাতে আমি তৃপ্ত। আমার ‘মৃগয়া’ উপন্যাসের উপর গবেষণা যেমন হয়েছে তেমনই আমার লেখা সব উপন্যাস নিয়ে গবেষণা করে ২০১৪-তে বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি থেকে পি এইচ ডি করেছেন এক অধ্যাপক। দুখানা এম ফিল হয়েছে। আর কতজন যে আমার লেখা নিয়ে কাজ করছেন তা চিঠি বা ফোনের মাধ্যমে জেনে অবাক হই। আমার লেখার পাঠক সীমিত কিন্তু নির্দিষ্ট। রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে যাবে এমন লেখা তো আমি লিখি নি। এ সত্বেও অনেক মানুষ আমার লেখা পড়ছেন, প্রচুর এডিশন হচ্ছে। পুরস্কার পেলে খারাপ লাগে তা নয়, কিন্তু আমি পুরস্কার প্রত্যাখানও করেছি। আমি ‘সেতু’ পুরস্কার নিই নি। আমি বাংলা আকাদেমির ‘জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায়’ পুরস্কার নিই নি। পুরস্কারের উপর লোভ নেই। তবে আমি ‘সোপান’ পুরস্কার নিয়েছি, ‘গল্পমেলা’ পুরস্কার নিয়েছি। আসলে পুরস্কার ঠিকঠাক পেলে ভালই লাগে, খারাপ লাগে না। তবে আমি পুরস্কারের জন্য লালায়িত  নই। আমার লেখালিখির জন্য যে গুণী, নির্দিষ্ট, সিরিয়াস, বোদ্ধা পাঠক আমি পেয়েছি সেটাই তো বড় সম্মানের।

গল্পের সময়ঃ     এতটা  সময় আমাদের দেওয়ার জন্যগল্পের সময়’-এর পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

ভগীরথ মিশ্রঃ   আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • কোটেশন ব্লগ

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • কিছু গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ।