20 Feb

দুটি গল্প

লিখেছেন:তপন মোদক


সময়

আমার বাবার একটা পুরোনো রঙচটা বাক্স ছিল। সারা গায়ের জংগুলোতে – পৃথিবীর মানচিত্র। বাবার জীবিতকালে ও বাক্স খোলার অনুমতি ছিল না কারো। বাবা মাঝে মাঝে বাক্সটি আমাদের আড়াল করে খুলতেন আর ম্যাজিসিয়ানের মত অন্যদিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে ভেতরের জিনিষগুলো স্পর্শ করতেন। মুখে থাকত অদ্ভূত এক সন্তুষ্টি – আবেশে তাঁর চোখ বুজে আসতো। বাক্সটা রাখাও থাকতো একটা নির্দিষ্ট জায়গায়। ঘর পরিষ্কারের কারণে মা যদি বাক্সটা অন্য জায়গায় রাখত, সেদিন কেলেঙ্কারির একশেষ হত। ওই বাক্সটাকে ঘিরে আমাদের তিন ভাইবোনের কৌতুহলের অন্ত ছিল না। আমরা অনেক কিছু কল্পনা করতাম। আমরা এমনিতে কোনও দিনও স্বচ্ছল ছিলাম না। ফলে সেই ছোটবেলা থেকেই ঐ বাক্সটিতে কোনও মূল্যবান বা মহার্ঘ্য অস্তিত্বের কথা কল্পনায় আনতাম না। তবুও কৌতুহলের কোনও খামতি ছিল না আমাদের।

শেষের দিকে বাবা শয্যাশায়ী ছিলেন অনেকদিন। তার অনেক আগে থেকেই বাক্সটার দিকে বাবা আর নজর দিতেন না। ক্রমে বাক্সটিতে ধুলো জমতে লাগলো। আমরাও বাক্সটার কথা আর মনে রাখতাম না। বাবা গত হবার পর ঐ বাক্সটা বার হল খাটের তলা থেকে। বোন বলল, দাদা এবার বাক্সটা খোল। আমারও আগ্রহ ছিল। বললাম, আত্মীয় স্বজন চলে যাক – রাতের দিকে খুলবো – মাও থাকবে। বাবার শ্রাদ্ধ শান্তি মিটে গেলে একদিন রাত্রে আমরা তিন ভাইবোন আর মায়ের সামনে বাক্সটা বার করা হল। বোনের আগ্রহ বেশি। বোন অত্যন্ত নাটকীয় ভাবে ফটাস করে বাক্সটার ঢাকনা খুললো। কিচ্ছু নেই। একদম ফাঁকা। বোন শব্দ করে বাক্সের ঢাকনাটা বন্ধ করে তার চেয়েও বেশি শব্দ করে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। ইঙ্গিত পরিষ্কার। যেহেতু বাবা আমার কাছেই থাকতেন – আগে থেকেই বাক্স খুলে আমি সব বার করে নিয়েছি। দীর্ঘদিনের সংসার করার অভিজ্ঞতা থেকে এটা বুঝি – এই ধরনের অযৌক্তিক ধারনা যুক্তি প্রমাণ দিয়েও কখনও পালটানো যায় না। আমি সে রাস্তাতে গেলাম না। আমিও চিন্তা করছিলাম, বাক্সে এমন কি ছিল যা বাবাকে এত খুশি রাখতো। যদিও বাবাকে কখনও কোনও জিনিষ বাক্স থেকে বার করতে দেখিনি বা কোনও জিনিষের শব্দ শুনিনি।

পরদিন বেশ ভোর বেলায় ঘুম ভেঙে গেল। মনের মধ্যে এক মহান উপলব্ধি! বাবা এক টুকরো সময়কে ওই বাক্সে বন্ধ করে রেখেছিলেন। সেটা হতে পারে কোনও সুখের মুহূর্ত। সেই থমকে থাকা সময়ের গায়ে হাত বুলিয়ে আমার  জীবনযুদ্ধে ব্যর্থ বাবা বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে নিতেন হয়তো।

 

ছেঁড়া পাতা

গল্পটা হরিদার কাছে শোনা। হরিদা ৭৫ বছরের চির যুবক। গল্পের খনি। নাড়া দিলেই ঝুরঝুর করে গল্প ঝরে।

১৯৬০ সাল। হরিদা তখন ক্লাস এইটের ছাত্র। দ্বিগুণ বয়সী এক সহপাঠী নগেন’এর বিয়ে। নগেনরা নদীয়া জেলার একটি বিশেষ সম্প্রদায়ভুক্ত। নগেনের বাবা স্কুলের প্রধান শিক্ষককে অনুরোধ করেছিলেন, যা লাগে দেব, ছেলেকে যে ভাবেই হোক ক্লাস এইট পাশের কাগজ দিতে হবে। না হলে ছেলের দাম পাওয়া যাবে না। নিরীহ প্রধান শিক্ষকমশাই ওই অঞ্চলে ওই সম্প্রদায়ের প্রভাবের কথা চিন্তা করে দুটি ক্লাসঘর নির্মাণের বিনিময়ে সে আদেশ রক্ষা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মেয়ে ক্রোশ দশেক দূরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের একই সম্প্রদাভুক্ত। হরিদার বাবার সঙ্গে নগেনের বাবার পরিচয়ের সূত্রে হরিদা বরযাত্রী যাবার দুর্লভ  সুযোগ অর্জন করেছিলেন। বরযাত্রীদের নিয়ে গরুর গাড়ি ছাড়ল সকাল সাতটা। মাঝ রাস্তায় দুপুরে কন্যাকর্তাকে মধ্যাহ্ন ভোজনের আয়োজন করতে হয়েছিল। আবার যাত্রা। পৌঁছানো রাত আটটায় । পৌঁছানো মাত্রই জলখাবার। চিরে,গুড় আর ছানা।এবার নগেনের বাবা স্যাকরাকে নির্দেশ দিলেন সোনা মাপার। হরিদা বন্ধুদের সঙ্গে গল্পগুজবে ব্যস্ত।

হঠাৎ চেঁচামেচি গন্ডগোল। যা কথা হয়েছিল সোনা নাকি তার চেয়ে কম দেওয়া হয়েছে। নগেনের বাবা সবাইকে ফিরে যাবার নির্দেশ দিল। এ বিয়ে হবে না। আসল গণ্ডগোল শুরু তারপর। মেয়েপক্ষও তো ঐ সম্প্রদায়ের মানুষ। তারাও ঝাঁপিয়ে পড়ল। বড় বড় তেল মাখানো লাঠি বেরিয়ে পড়ল। নগেন আর তার বাবাকে একটা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ফেলা হল। নিকষ অন্ধকারের মধ্যে অজানা জায়গায় যে যেদিকে পারল পালাতে লাগলো। হরিদা আর দুজন একটা পাটক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। হাঁটু পর্যন্ত এঁটেল মাটির কাদা, সঙ্গে মৃত্যুভয়। নেমতন্ন খেতে এসে এ কি গেঁড়ো। ইষ্টনাম জপ করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। বেশ কিছু সময় পর মাঝরাতে হ্যাজাক নিয়ে ঐ গ্রামের লোকদের নিয়ে নগেনের মামা চিৎকার করে নাম ধরে ধরে সবাইকে ডাকতে লাগলো। সবাই বেরিয়ে এস, আর কোনও ভয় নেই – শেষ লগ্নে নগেনের বিয়ে। অবশেষে পাটক্ষেত থেকে আত্মপ্রকাশ। পরে বাকি সোনা দিয়ে দেওয়া হবে – এ রকম নাকি রফা হয়েছে। তারপর বাকি কাজ নির্বিঘ্নে মিটে গেল।

বছর দেড়েক বাদে নগেনের বৌকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে গায়ে আগুন লাগিয়ে শেকল তুলে দেওয়া হল। নগেনের বাবার থানা পুলিশের জন্য অনেক খরচ হয়ে যায়। ছমাসের মধ্যে নগেনের বিয়ে। একই গ্রামে। হরিদার আবার বরযাত্রীর নেমতন্ন। ততদিনে হরিদারা গ্রামের বাস তুলে কলকাতাবাসী। না – হরিদাদের পরিবার ঐ নেমতন্ন রক্ষা করতে গ্রামে ফিরে যায় নি।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ