15 Jul

ভূতের টেবিল চেয়ার

লিখেছেন:ডা পি কে দাস


গল্পটা আমায় কমলেশবাবু বলেছিলেন। সেবার আষাঢ়ের ভরা বর্ষায় একদিন অফিসে বসে মুড়ি তেলেভাজা খেতে খেতে গল্প চলছিল। গল্পটা এই রকম। একটা ভালো দামি টেবিল চেয়ারের প্রয়োজন ছিল কমলেশবাবুর। ছেলে জয়েন্ট দিয়ে চান্স পেয়েছে নাম করা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। তার একটা ভালো পড়ার টেবিল চেয়ার দরকার । অনেকগুলো ফার্নিচারের দোকান ঘুরলেন কমলেশবাবু।  পছন্দ হচ্ছে না কোনোটাও। কোথাও হাতল পছন্দ হচ্ছে তো রং পছন্দ নয়। কোথাও রং পছন্দ হয়ত হাতল পছন্দ নয়। কোথাও হাতল, রং দুই-ই পছন্দ হয় না । শেষে ছোট্ট একটা ফার্নিচারের দোকানে এসে ভালো একটা টেবিল চেয়ার পছন্দ করে বাড়িতে নিয়ে চলে এলেন । বাড়িতে ছেলের পড়ার ঘরে টেবিল চেয়ারটা ঢোকাতে না ঢোকাতেই দেশের বাড়ি থেকে খবর এল কমলেশবাবুর বাবা হঠাৎ করে পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন । তড়িঘড়ি দেশের বাড়ি ছুটলেন কমলেশবাবু। দেশের বাড়ি তারকেশ্বরে। গিয়ে জানতে পারলেন রাস্তা পার হতে গিয়ে বয়স্ক বাবা গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেছেন । থানা, পুলিশ, হাসপাতাল সবকিছুই সামলাতে হল। গোটা বাড়িতে শোকের ছায়া । রাতের বেলাতে দাহ কার্য শেষ করে ভোর বেলায় বাড়ি ফিরলেন কমলেশবাবু । মনটা খুবই খারাপ। শোকে মুহ্যমান বাড়ির সকলে । অপঘাতে মৃত্যু বলে তিন দিনেই শ্রাদ্ধশান্তি শেষ করে ফিরে এলেন কোন্নগরের বাড়িতে ।

ফিরেই মাথায় এল কদিন আগে কিনে আনা টেবিল আর চেয়ারটার কথা। সেটাকে ছেলের পড়ার ঘরে সেট করতে গিয়ে ঘটল আর এক বিপদ। কাঠের মিস্ত্রীর মাথায় সিলিং ফ্যান খুলে পড়ায় তাকে গুরুতর চোট নিয়ে ভর্তি হতে হল হাসপাতালে ।২ থেকে ৩ দিন ঘর-বার করে কেটে গেল কমলেশবাবুর। খসে গেল একগাদা টাকা। তার মনের কোণে একটা সন্দেহ উঁকি দিয়ে গেল । টেবিল-চেয়ার টা আনার পর থেকেই একের পর এক অনাসৃষ্টি কান্ড ঘটে যাচ্ছে। এর পেছনে কি কোনো কারণ আছে? ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরেই শুনলেন স্ত্রী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন । খবর নিয়ে জানতে পারলেন দুপুরের দিকে গরম থাকার জন্য ছেলের পড়ার ঘরে এসে টেবিল ফ্যান টা চালিয়ে চেয়ারে একটু বসে গা এলিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর তার আর কোনো জ্ঞান ছিল না। জ্ঞান ফিরতে দেখেন যে মাটিতে পড়ে আছেন। মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা। মাথায় চোট লেগে রক্তারক্তি ব্যাপার। তারাতারি ডাক্তার ডেকে এনে স্ত্রীর সেবা করতে লাগলেন কমলেশবাবু। এবারে সন্দেহটা আরো দৃঢ় হল। কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ ছেলের ঘরে ঢুকে চেয়ার-টেবিলকে উলটে রেখে দিলেন, যাতে কেউ যেন তাতে না বসে পড়তে পারে।   কিন্তু  এর পরেও ঘটে চলল নানা অবাক কান্ড।  সন্ধ্যেবেলায় খবর পেলেন দক্ষিণ-পূর্ব চক্রধরপুর স্টেশনের কাছে একটা এক্সপ্রেস ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে গেছে। দু’তিনটে বগির প্যাসেঞ্জার প্রায় সবাই মারা গেছে। তার পরই খবর পেলেন ওই   ট্রেনের উল্টে যাওয়া বগিতেই তার এক শ্যালক, শ্যালকের বউ ও তাদের ছেলে ফিরছিল কলকাতা । সকলেই মারা গেছে । বিনা মেঘে বজ্রপাত । এই ভয়ংকর মৃত্যুর খবর কিভাবে ওদের দিদিকে দেওয়া হবে? ও নিজেও যে অসুস্থ । এইরকম দুরাবস্থায় অনান্য শ্যালকদের পাশে থেকে সব কাজটা উদ্ধার করে দিয়ে  কিছুটা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন কমলেশবাবু। কিন্তু মাথা থেকে কিছুতেই ভূতুরে চেয়ার টেবিলের ভাবনাটা যাচ্ছে না । কিছুটা ভয় পেয়ে ছেলের পড়ার ঘর তালা দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। ছেলেকে বললেন অন্য ঘরে গিয়ে পড়াশুনো করতে । বাবার আদেশ মেনে নিয়ে ছেলে ওই ঘর ছেড়ে অন্য ঘরে চলে গেল পড়াশুনো করার জন্য।

এরপরে বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে। আর কোনো দুঃসংবাদ তাড়া করেনি কমলেশবাবুকে। তবে কৌতুহল মেটাতে কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে তিনি একবার দেখা করলেন শ্যামনগরের এক তান্ত্রিক মহাশয়ের সঙ্গে। তাকে সব খুলে বললেন কমলেশবাবু। সেই সঙ্গে সন্দেহের কথাটাও । তান্ত্রিকও সব শুনে বললেন, ঠিক আছে আমি নিজে একবার দেখতে চাই ঘরটা। আপত্তি না করে একটা নির্দিষ্ট দিন ঠিক করে ওনাকে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে দিলেন কমলেশবাবু।

অদ্ভুত ব্যাপার । তান্ত্রিক  বাড়িতে যেই ঢুকেছে তখনই দোতলায় ছেলের পড়ার ঘর থেকে ঝনঝন করে কি যেন একটা পড়ার শব্দ ভেসে এল। সবাই চমকে গেল। তান্ত্রিকের মুখের দিকে তাকাতে ইশারা করে জানাল ভয় পাওয়ার কিছু নেই।    বলল, আপনারা আমার পিছন পিছন আসুন। ওনাকে নিয়ে দোতলার পড়ার ঘরের কাছে আসতেই দেখা গেল মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে ঘরের তালাটা। তবে দরজাটা বন্ধ। ঘরের ভেতর থেকে হাতুড়ি দিয়ে পেটানোর আওয়াজ আসছে। তান্ত্রিকের পেছনে রয়েছেন কমলেশবাবু সহ আরো অনেকে ।

তান্ত্রিক ঘরের দরজাটা খুলল। ঘরের মধ্যে যেন বেশ কয়েকটা বাদুড় ঘোরাফেরা করছে। ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ হচ্ছে । ঘরের মধ্যে ঢুকে তান্ত্রিক  এক ঝটকায় টেবিল চেয়ার থেকে সোজা করে বসিয়ে দিল মেঝেতে । ঠিক তার পরেই শোঁ শোঁ আওয়াজ চলে গেল । তান্ত্রিক অনেকক্ষণ ধরে নানারকম মন্ত্র পড়ল বেশ জোরে জোরে। তারপর হাততালি দিয়ে জোর গলায় যেন কাউকে চলে যেতে বলল। এর কিছুক্ষণ পরে সকলের অবাক হয়ে দেখল টেবিলটা মাঝ বরাবর ফেটে চৌচির হয়ে গেল। চেয়ারের অবস্থা তথৈবচ। তান্ত্রিক গঙ্গাজল ছিটিয়ে বলল, এক্ষুনি টেবিল-চেয়ার বাড়ির বাইরে খোলা জায়গায় নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দিন।

তার নির্দেশ অনুযায়ী টেবিল চেয়ারে আগুন লাগাতেই কোথা থেকে একটা বিকট আওয়াজ হল। ভয় পেয়ে কেঁপে উঠল উপস্থিত সকলে । দেখা গেল টেবিল-চেয়ার পোড়ানো আগুনের শিখায় আগুনের ফুলকির মধ্যে একটা মেয়ে মানুষের অবয়ব ধীরে ধীরে আকাশ পথে চলে যাচ্ছে । কি করুণ মুখ আর কি অসহনীয় চাহনি । কমলেশবাবু সকলের  মতই চোখ বুজে ফেললেন। যখন সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল তখন তান্ত্রিক  শোনাল কাহিনীটা।

বেশ কিছুদিন আগে ওই টেবিলের উপর দাড়িয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে পরনের কাপড় জড়িয়ে আত্মঘাতী হয়েছিল একটি বছর কুড়ি বয়সের অবিবাহিতা মেয়ে । নিজের পছন্দের ছেলের সঙ্গে বিয়ে না দেওয়ায় সে আত্মঘাতী হয় । এরপর এই মেয়েটির বাবা সংস্কার বশে একেবারে জলের দরে ওই দামী চেয়ার-টেবিল বিক্রি করে দেয় একটি ফার্নিচারের দোকানে। মেয়েটি ওই টেবিল চেয়ারে বসেই পড়াশোনা করত। ওই চেয়ার-টেবিল ওর খুব প্রিয় বস্তু ছিল। টেবিল চেয়ার টা মেহগনি কাঠের তৈরি ছিল । অন্যদিকে মেয়েটি পড়াশুনায় খুব ভালো ছিল। পরীক্ষায় রেজাল্ট ভালো করতো । ওই কলেজের এক সহপাঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল । কিন্তু সেই সম্পর্ক বাস্তবায়িত হওয়ার আগে তার বাবা-মা অন্য ছেলের সঙ্গে সম্বন্ধ করে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। সেই শোকে দুঃখে মেয়েটি আত্মঘাতী হয় । এরপর থেকেই তার অতৃপ্ত অশরীরী আত্মা সবসময়  টেবিল-চেয়ারকে ঘিরে থাকত। মুক্তি পাচ্ছিল না বলে প্রচুর কষ্ট পাচ্ছিল । সেই জন্য একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে একের পর এক অনাসৃষ্টি কাণ্ডকারখানা ঘটাচ্ছিল । চেয়ার-টেবিলটা সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যাওয়ায় ওর আর আশ্রয়স্থল থাকল না। ফলে সে চিরকালের জন্য শাপমুক্ত হল।

কমলেশবাবুর কাছে শোনা ওই আষাঢ়ে গল্পটি আষাঢ়ের এই আয়োজনে আপনাদের বলার লোভ সামলাতে পারলাম না।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ