17 Jul

বাঘ বাহাদুর

লিখেছেন:অমিয়া বন্দোপাধ্যায়


[একটা রাস্তার কুকুর,কিছুই ক্ষতি করেনি আমার। তবুও তার তলপেটে ইঁট ছুঁড়ে,তার অসহায় কুঁই কুঁই ডাক শুনে আমার আনন্দ। যেন এটা আমার অধিকার। কয়েকমাস আগে কোথা থেকে যেন লালগড়ের জঙ্গলে ঢুকে পড়েছিল একটা বাঘ। ব্যাস আর যায় কোথায়? আক্রমণ করতে পারে এই অজুহাতেই বাঘের বিচরণভূমিতে ঢুকে তাঁকে মেরে ফেলল একদল মানুষ। ‘মানুষখেকো’ নয় জেনেও এ কেমন কাজ আমাদের ? প্রশ্ন তুললেন অমিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়।]

কোথা থেকে সে এসেছিল পায়ে পায়ে, কখন এসেছিল? কোন রাস্তায় বঙ্গে প্রবেশ করল, কেউ জানে না। কে সে ?

হিংস্র কিন্তু সুন্দর ভয়ংকর

রূপেতে তিনি অতি মনোহর

হলুদ গায়ে কালো ডোরা কাটা

চক্ষুদুটি যেন আগুনের ভাঁটা।

সেই সে হচ্ছে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। মানুষ তার চেহারা খানা চাক্ষুস দেখেনি। দেখেছে শুধু তার পায়ের ছাপ। সে লালগড়ের জঙ্গলেই ছিল। দু-মাসে ধরে জঙ্গলে বিচরন করেছে সে। তার এইরকম অদৃশ্যপনা দেখে আমি তার নাম দিলাম বাহাদুর।

কোথা থেকে আসতে পারে এই বাহাদুর? হয়তো সে থাকত পালামৌ (বেথ্‌লা) টাইগার রিজার্ভ অভয়ারন্যে) ঝাড়খন্ডে। ঝাড়খন্ড রাজ্যতো মেদিনীপুর থেকে বেশি দূরে নয়। কোয়েল নদী পেরিয়ে চলে এসেছে পায়ে পায়ে। কিম্বা সে হয়ত থাকত উড়িষ্যায়, সিমলিপাল ন্যাশান্যাল পার্কে যা হচ্ছে টাইগার রিজার্ভ স্যাংচুয়ারি।

যখন রাস্তা পাড়ি দিচ্ছিল তখন কেউ তাকে মানুষ মারতে দেখেনি। যখন লালগড় জঙ্গলে বিরাজ করছিল তখনও সে মানুষ মারেনি। তবে তাকে নিয়ে কেন মানুষের এত ভয়? বল্লম দিয়ে মাথা ফুঁড়ে দিয়ে তার মৃত্যু ঘটানো হল। বাহাদুর এখানে আসার পর যদি মানুষ মারত তাহলে ও মরার পর আমরা দুঃখ পেতাম না। যখন বুঝলাম, ও মানুষখেকো নয় অথচ ভয় পেয়ে মানুষ তার মৃত্যু ঘটালো তখন খুব দুঃখ পাচ্ছি। কষ্ট হচ্ছে ওর কথা ভেবে।

আমরা জানি, মধ্যপ্রদেশের কানহা, মহারাষ্ট্রের তাড়োবা, নাগজিরা জঙ্গলে সে সব ব্যাঘ্র আছে তারা সুন্দরবনের বাঘের মত মানুষ খেকো নয়। বরং ঐ সব জঙ্গলে যে সব বুনো কুকুর আছে ওরা খুব বিপজ্জনক। এরা দলবেঁধে বাঘকে আক্রমন করে মৃত্যু ঘটাতে পারে এবং তার মাংস ভক্ষন করতে পারে। পূর্বোক্ত জঙ্গলগুলিতে এত বেশি পরিমান খাদ্য (হরিণ, শুকর ইত্যাদি) যোগান দেওয়া হয় যার ফলে মানুষের মাংসে ওদের অরুচি। এ ও হয়তো সেইরকমই একটা বাঘ ছিল।

বাহাদুর কোন্‌ জঙ্গল থেকে চুপি চুপি এসে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলায় লালগড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, নতুন জঙ্গলের সৌন্দর্য তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিল তা তো আমরা দু-মাসে ধরে শুধু শুনে গেছি।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ব্যাঘ্র দর্শনের নিমিত্ত বিভিন্ন জঙ্গল সফর করে থাকে। বছর তিনেক আগে আমরা ছয়বন্ধু মিলে মহারাষ্ট্রের নাগজিরা আর তাড়োবা জঙ্গল ভ্রমন করেছিলাম ব্যাঘ্র দর্শণের জন্য। কেন তাড়োবা, নাগজিরা? ওইসব জঙ্গলের বাঘেরা নরখাদক নয়। তাই বুকে বল নিয়ে জঙ্গল ভ্রমন। তাড়োবা জঙ্গলে ব্যাঘ্র দর্শন ফসকে গেল, বুনো কুকুর দেখতে গিয়ে। এক মাদী কুকুর কয়েকটা বাচ্চার জন্ম দিয়েছে। বাঁশগাছ গুলির গোড়ায় বাচ্চা আগলে বসে আছে। একটু দূরে একটা মদ্দা কুকুর তাদের পাহাড়া দিচ্ছে। ছবি তুলতে গিয়ে সময়ক্ষেপ। অন্য পয়েন্টে গিয়ে শুনলাম একটি বাঘ দক্ষিন দিকের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ঘাস জমির উপর দিয়ে যাচ্ছিল। কী ভেবে একবার বসেও ছিল। তারপর গুটি গুটি পায়ে গিয়ে উত্তরদিকের জঙ্গলে ঢুকে পড়লো। একটা জিপসীর সওয়াররা ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী ছিল। আমরা যদি বুনো কুকুরের জন্য সময় নষ্ট না করতাম তাহলে বাঘটির দেখা পেতাম। সেদিনকেই তাড়োবা ছাড়তে হবে। তাড়োবা জঙ্গলে বাঘ দেখা আর হলো না।

তাড়োবা থেকে নাগপুর যাবো। পরেরদিন নাগজিরা জঙ্গলে যাওয়া। নাগজিরা জঙ্গলের উদ্দেশে রওনা হলাম। দুপুরের পর ফরেষ্ট বাংলোর ঘরে মালপত্র জমা রেখে বিকাল বেলা জিপসিতে চড়ে জঙ্গলে প্রবেশ। সন্ধ্যে পর্যন্ত ঘুরেও বাঘের দেখা মিলল না। জঙ্গলের দুষ্টু ময়ূর গুলো ক্যারক্যারে গলায় চিৎকার করে বাঘেদের সাবধান করে দেয়। বলে, ‘ভিনরাজ্যের মানুষরা এসেছে। তোরা এখন যেন জঙ্গল থেকে বেরোসনা। তোদের দেখে ফেলবে’। তখন বাঘেরা সাবধান হয়ে যায়।

রাত্রিবেলা গাছমছম করা পরিবেশ। এই বুঝি বাঘ এলো বাংলোর কাছে।

পরের দিন সূর্য্যোদয়ের পূর্বে জিপসি নিয়ে বেরনো হল। বেলা দশটা বাজতে চলল। ঘুরতে ঘুরতে বনবাংলোর কাছাকাছি এসে পড়েছি। এই জঙ্গলেও কি বাঘ দেখা হবে না? গাইড ড্রাইভারকে জিপসি থামাতে বলল। দেখা গেল বাঁশঝাড়ের গোড়ায় শুয়ে রয়েছে একটা বাঘ। বন্ধুরা ক্যামেরা নিয়ে অপেক্ষা করল, যদি একবার উঠে দাঁড়ায় তাহলে বাঘের পূর্ণাঙ্গ ছবিটা তোলা যাবে। কিন্তু তিনি উঠলেন না। শিকার সেরে, জলপান করে নিদ্রা যাবার জন্য অপেক্ষা করছেন। মনে হচ্ছে তিনি এক বাঘিনী। দূর থেকেই বাঘিনীর শোওয়া অবস্থায় ছবি নেওয়া হল। সুন্দরবনে গিয়ে বাঘ দেখতে পাইনি। সিমলিপল, তাড়োবা জঙ্গলে বাঘ দেখতে পাইনি। নাগজিরাতে বাঘ দেখা কপালে ছিল।

বাংলোয় ফিরে খাওয়াদাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে থাকলাম। বাংলোর কর্মীদের কাছে বাঘ সম্বন্ধে অনেক গল্প শুনতে লাগলাম। শুনলাম নাগজিরা জঙ্গলে বিখ্যাত বাঘিনী মাঈ বাস করে। বাঘিনী মাঈ এর দুটি সন্তান জন্মেছিল। একটির নাম জয় অপরটি বীরু। দুই ভাই হঠাৎ একদিন নাগজিরা জঙ্গল থেকে হারিয়ে যায়। তবে ২০১৩ সালে জয়ের খোঁজ পাওয়া যায় উমরেড কারাণ্ডলা জঙ্গলে। নাগজিরা জঙ্গল থেকে ৬০ কিমি দূরে মহারাষ্ট্রের উমরেড কারাণ্ডলা জঙ্গল। জয় কিভাবে নাগজিরা জঙ্গল ছেড়ে মাঠ, ঘাট, বনজঙ্গল, নদী, রাজপথ ইত্যাদি পেরিয়ে উমরেড কারাণ্ডলা জঙ্গলে পৌঁছল সেটা চিন্তা করার বিষয়। তখন এই জঙ্গলে ছিল দুটি পুরুষ বাঘ আর তিনটি বাঘিনী। জয় প্রথমে দুইটি পুরুষ বাঘকে জঙ্গলছাড়া করে বাঘিনীদের নিজ অধিকারে নিয়ে আসে। এই তিনরানীর ১১ টি সন্তান যাদের পিতা জয়। তিন রানীকে নিয়ে উমরেড কারাণ্ডলা জঙ্গলে রাজার মত বাস করছে জয়। বীরুর খোঁজ এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

আমাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে জঙ্গলের বাঁশতলায় যাকে দেখলাম সে জয় আর বীরুর মা বাঘিনী মাঈ নয়তো?

তাহলে বীরু কোথায় গেল? লালগড়ে আসা পুরুষ বাঘটি বীরু নয়তো? সেই কবে নাগজিরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে গিয়ে বিভিন্ন জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে লালগড়ের জঙ্গলে এসে পৌঁছল নাতো? সকলের চোখে ধূলো দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। বনদপ্তরের কর্মীরা ফাঁদ পাতল ছাগলের টোপ-দিয়ে তবুও বাঘ ধরা পড়লনা, লালগড়ের মানুষ তখন  আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

জঙ্গলের আদিবাসীরা শিকার উৎসব পালন করে থাকে। দিনটা হচ্ছে চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন, নীলষষ্ঠীর দিন। এবছর দিনটা পড়ল ১৩ই এপ্রিল, ২০১৮। শিকারীরা অনেকগুলি দলে বিভক্ত হয়ে জঙ্গলে শিকারে গেল। লালগড় থেকে ২২ কিমি দূরে বাঘঘরার জঙ্গলে তারা পেয়ে গেল বাহাদুরকে। প্রথমে তীর মেরে তারপর বল্লম দিয়ে মাথা ফুটো করে, পরে অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে বাহাদুরকে শেষ করে দিল। আর পায়ের ছাপ নয়। জঙ্গলের মানুষ চাক্ষুষ দেখল বাহাদূরকে। তবে মৃত। দুমাস ধরে জঙ্গলে ঘোরা ফেরা সাঙ্গ হল তার।

বনকর্মীরা বলল, আদিবাসী শিকারীরা বাঘটিকে মেরে ফেলেছে। আদিবাসীরা  বলেছে- মিথ্যাকথা । তাহলে আসল সত্যটা কি?

এখনতো বন্য জন্তুদের জন্য সচেতনতার খামতি নেই। আপামর জনসাধারণ সে ব্যাপারে ওয়াকিবহাল।

তবুও শিকারীরা যখন দেখল বাঘঘরার জঙ্গলে বাঘটি রয়েছে তখন বনদপ্তরকে কেন খবর দিল না ? আর বনদপ্তরের কর্মীরা কেনই বা খবর রাখেনি যে ১৩ ই এপ্রিল নীলষষ্ঠীর দিন আদিবাসীদের শিকার উৎসব ? ঐ দিনের পূর্বেই বাঘটিকে আটক করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল না কি?

মৃত বাহাদূরকে মেদিনীপুরের আড়াবাড়ির জঙ্গলে আনা হল। পোষ্ট মর্টেম করে বাহাদুরের দেহ দাহ করা হল, ১৮ ই এপ্রিল, ২০১৮।

বনদপ্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাঘটির বয়স আনুমানিক ১০/১২ বছর। দৈঘ্য ৬ ফূট ৪ ইঞি। ওজন ২০০ কিলোগ্রাম, লিঙ্গ পুরুষ।

জানিনা, কবে থেকে জঙ্গল সাফারি শুরু করেছিল বাহাদুর। মানুষের উপর কোন অত্যাচার না করেও মানুষের হাতেই মরতে হল বাহাদুরকে। তুমি নাগজিরা জঙ্গলের বীরু না কি অন্য কেউ? যেই হও তোমার মৃত্যুর জন্য দুঃখ প্রকাশ না করে পারছি না।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ