03 Sep

হার্মাদ ও চাঁদ

লিখেছেন:কিন্নর রায়


মহানন্দার বুকে চাঁদ ডুবকি লাগালে চন্দ্র দেবের চেহারাও কেমন একটু যেন বদলে যেতে থাকে। জিনস প্যান্ট, জিনস জ্যাকেটের অবশ্য এত কিছু দেখার সময় নেই।

কাঁধে টাঙানো কাঁধঝোলা এই শীতের বাতাসে কেমন যেন একটু ঠকঠকিয়ে উঠতে আকাশে ঝোলা রোহিণীপতির মনে হলো, আরে বাপ রে বাপ, শীতের মহানন্দায় একটা রাতে যে সরাসর ডুব দিলাম, তাতে তো এতটুকুও ঠাণ্ডা বোধ হলো না। তাহলে কি শরীর থেকে চলে গেল সব বোধ ভাষ্যি। ছোঁয়াছুঁয়ি, উত্তেজনার যাবতীয় আগামাথা কি একটু একটু করে মুছে যেতে যেতে ক্রমশ বিলীয়মান হয়ে যায় মহাশূন্যে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে?

দূর-দূর! চাঁদের আবার বয়স বাড়ে নাকি!

দেবতাদের বয়স হয় কখনো! মেঘেরা ফিসফিস করে বলতে চায় যেন।

হয়। হয়। সবারই বয়স বেড়ে যায়। বুড়ো হয় সবাই। তারপর একসময় মরে যায়। দুচক্ষু ওপর বাগে তুলে পটল।

না না, দেবতারা মরে না! তার ওপর চাঁদ কখনো মরে নাকি! জলবাহক, আবার জলবাহী নয়ও এমন শুকনোশাকনা মেঘেরা এ কথা বলতে থাকে চাপা গলায়।

এসব শুনেটুনে চাঁদ হাসে। তার হাসির সঙ্গে সঙ্গে ফুটে ওঠে হাজার গন্ধরাজ। নয়তো লক্ষ কামিনী পুষ্প। শেষরাতের নিবিড় জ্যোৎস্না অভিসারে দল মেলে নাগকেশর, হাস্নুহানারা ফুটতে থাকে রাতে, গহিন রাতে, চাঁদের দুধ ঘন হতে হতে পরমান্ন হয়ে গেলে, এই ফুলেদের ভেতরই থাকে শরৎ শিউলি। গোটা আগমনী ঋতু ধরে তার ফুটে ওঠা। তারপর দুর্গা-কাল পার করে দিয়ে প্রথম হেমন্তেও তার অবিরত ফুল্ল-অভিসার।

চাঁদ কি জানে এত সব ফুল ফোটার কথা?

নিশ্চয়ই জানে।

আবার জানেও না হয়তো।

দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলি বর্ডারে জ্যোৎস্না নিজের মতো জাল ফেলে। মস্ত বড় রেললাইন। হিলি স্টেশন সবটাই বাংলাদেশ।

এপারে ইন্ডিয়া। ওপারে বাংলাদেশ।

এপারে ফেনসিডিল, ইউরিয়া সার, নুন, গরু।

ওপারে কাঁচা টাকা। রেডিমেড গার্মেন্টস, সফিসটিকেটেড আর্মস।

মাল চলাচল চলতে থাকে। দিনে রাতে। রাতে দিনে। প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে।

মহানন্দার ওপর শীত হাওয়ায় সামান্য কুঁকড়ে যাওয়া সেই জিনস প্যান্ট, জিনস জ্যাকেট কেন যে মহানন্দার প্রায় থেমে থাকা জলধারা পেরোতে পেরোতে হিলি বর্ডার ভাবে, কে জানে।

মানুষের মন বড় দ্রুতগামী। হয়তো আলো, শব্দ সবার চেয়েই তার ছুটে যাওয়া বেগ অনেক অনেক জোরালো।

মানুষের মন বড়ই বিচিত্রগামীও।

নইলে মহানন্দার খেয়ায় দাঁড়িয়ে কেন জিনস প্যান্ট জিনস জ্যাকেটের মনে পড়বে শীতের হিলি বর্ডার।

বিএসএফ বলেছে, এখানে কোনো নো ম্যানস ল্যান্ড নেই। একটা সিমেন্টের তেকোনা বেদিমতো, বড়জোর হাতখানেক কী হাত দেড়েক উঁচু হবে। তারই গায়ে এক পারে ভারত। অন্য পারে বাংলাদেশ। গলাগলি করে দুটো আলাদা দেশ। ইন্ডিয়ার দিকে শীতের হিসেবি রোদ। একদম বর্ডার ছুঁয়েই বিএসএফ পোস্ট। বাঁশের বেড়ায় ঘেরা একটা বাড়ি আছে ইন্ডিয়ার মাটিতে। রেললাইন, লেভেলক্রসিং, আর গায়ে গায়ে শেষ বাড়িটি। বাড়ির উঠোনে আমগাছ। সেই আমের ডালপালা, পাতা সবার কথা অমান্য করে। রাষ্ট্র, কাঁটাতার, পাসপোর্ট, ভিসা, অভিবাসন, পুলিশ, কাস্টমস, বিডিআর, বিএসএফ সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবলীলায় চলে যায় বাংলাদেশের দিকে। কে তাকে বাধা দেবে? কে আটকে রাখবে তাকে?

আমগাছের ডাল কাঁচকলা দেখায় সবাইকে।

তেমনই এ বাড়ির উঠোনে বাড়তে থাকা ছায়াচ্ছন্ন বাঁশঝাড়। বাঁশগাছেরা একটু একটু করে বংশবিস্তার করে। উপনিবেশ ছড়ায়। কাঁচা বেড়া ঠেলেঠুলে তাদের অবিরাম সম্প্রসারণ। সম্প্রসারণবাদী বাঁশঝাড় নিপাত যাক।

অনুপ্রবেশকারী আমগাছের ডাল-পাতা দূর হটো।

মেঘেদের বেআইনি অনুপ্রবেশ চলবে না।

সন্ত্রাসবাদী রোদ্দুর দূর হটো।

অন্যায়ভাবে ঢুকে আসা চাঁদের আলোকে সত্যি সত্যি এবার পুশব্যাক করতে হবে।

এসব কথা কেউ বলে কি?

এমন স্লোগান উচ্চারিত হয় কি বাতাসের গায়ে গায়ে?

কে জানে।

হয়তো হয়। হয়তো হয় না।

হলে ভালো। না হলেও ভালো।

আকাশে মেঘ আর রোদের চিকেগোল্লা খেলা কাটাকুটি চলতেই থাকে অবিরত। ছক কেটে সেই শূন্য আর গুণ চিহ্ন আঁকার খেলায় রোদ্দুরের পাশাপাশি জ্যোৎস্নাও চলে আসে। যখন যেমন শো টাইম আর কি! মর্নিং, ম্যাটিনি, ইভনিং, নাইট সময়ের হিসাব করে করে চলতে থাকে।

হিলি সীমান্তে যেসব মুরগি- মোরগা সেই সঙ্গে তাদের কুট্টি কুট্টি, হাফ কুট্টি কুট্টি, একটু ধাঁড়ি হয়ে উঠতে থাকা ছানা- পোনারা এদিক-ওদিক-সেদিক করে। সেই সঙ্গে ধেড়ে ছাগল আর কুত্তারা, তারা ঠিক কোন ভূখণ্ডের নাগরিক? মোরগা-মুরগি, তাদের ছানা-পোনারা, বড় হয়ে যাওয়া ছাগলরা নয় কোনো না কোনো দেশের বাসিন্দা। তাদের যেহেতু অর্থমূল্য আছে, তাই তাদের নয় কোনো একটা দেশের হিসেবে রাখা যেতে পারে। কিন্তু কুকুরেরা? তারা পড়ে কোন মানচিত্রের কোটায়? কোন ম্যাপ বইতে বসিয়ে রাখা যাবে তাদের?

সে কি ইন্ডিয়া?

সে কি বাংলাদেশ?

মার খাওয়া, কেঁউকেঁউ শব্দ তুলে দৌড়ে বেড়ানো, ঠাঙার বাড়িতে বিপর্যস্ত পায়ের সারমেয়কুল। চারপাশে শুধুই দূর ছাই আর দূর ছাই। যাঃ! যাঃ! হ্যাট হ্যাট! দূর হ। দূর হ! ছেঃ ছেঃ!

এই যে এতসব ঘৃণা আর তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য অপবাক্য, তারা ঠিক কোন দেশের?

কুকুরদের কি তাহলে কোনো স্বদেশ নেই! পারাপার,অবিরত এপার-ওপার করাই কি তাদের কাজ? বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত?

হিলি বর্ডারের একেবারে মাঝখান দিয়ে বসানো রেললাইন (ইস্পাতের) ঝকঝকে পাটা। বিডিআর (আউটপোস্টের ওপারে) হিলি স্টেশন। ধস ধস ধস ধস শব্দ করতে করতে চলে যায় কোমর বাঁকা, ঘাড় ট্যারা বুড়ো মালগাড়ি। বড় বাঁক নিয়ে সে যেন চলে যেতে থাকে কোনো নিরুদ্দেশে।

সকাল দশটা কুড়ি কী আরেকটু এদিক-ওদিক হবে। গাঢ় নীল রং আর আকাশ থেকে তুলে আনা কালার মহিমা মিলেমিশে আন্তনগর এক্সপ্রেস। ইন্টারসিটির সপাট বাংলা। ট্রেনটি ধীরে গড়িয়ে যেতে থাকে রেলের পাটার ওপর দিয়ে রাজশাহী, নীলফামারী – এসব নাম লেখা বোর্ড। বাংলা অক্ষরে সাজানো সুন্দর নাম, রেলগাড়িটি গড়ায়। গড়াতে থাকে। কে যেন বর্ডারের এপাশ মানে ইন্ডিয়ার দিক থেকে বলে, হিলি ইন্ডিয়ায় থাকলে নর্থ বেঙ্গল থেকে কলকাতায় যাওয়ার সময় অনেকটাই কমে যেত।

এই ট্রেন চলাচলের ফাঁকেই যেটুকু যা বিরতি থাকে পারাপারের। না হলে তো অবিরাম মাল যাওয়া-আসা করে এপার থেকে ওপারে। আবার ওপার থেকে এদিকে। ছোট ছোট ছেলেরা পাঁচ কিলো পাঁচ কিলো করে নিজেদের ভাগ ইন্ডিয়া থেকে বাংলাদেশে নিয়ে চলে যায়। ইন্ডিয়ান কাস্টমস ধরে। আটকায়। কৈফিয়ত চায়। একই ক্যারিয়ার। চেনা মুখ। শীতের সকালে ক্রিকেট খেলার ছলেই হয়তো এঁটুলি হয়ে থাকে সীমান্ত এলাকায়।

ক্রিকেট চলে।

হা-উ-জ-দ্যা-ট।

ক্রিকেটের টাটকা ফেনা উড়তে থাকে হিলির বাতাসে।

তার থেকেই কখনো কখনো খেলাছুট বালক।

বালক জানে না কী করতে চলেছে। কিংবা জানেও। কারণ ক্যারিয়ার হলে ক্যাশ টাকা আছে। রয়েছে হাতে হাতে নগদ পেমেন্ট। হাতে গরম টাকা।

তাও সব সময় থাকে কি!

থাকে না হয়তো।

তবু বিশ্বাস আর জবানের দাম সম্বল করে চলে এই নিত্য পারাপার।

বিএসএফ জানে। বিডিআর জানে।

পাঁচ কিলো তো মাত্র লবণ। কে যেন সহমর্মিতার কথাও ছুঁইয়ে দেয়।

ওই পাঁচ কিলো পাঁচ কিলো করেই তো জমে। জমতে থাকে। বিন্দু বিন্দু জলে সাগর। কে আর অত ধরেবেঁধে রাখে ছোটদের।

এভাবেই যায় কাশির ওষুধ- ফেনসিডিল। ছোট-বড় নানা অসুখের দাওয়াই।

মাথায় সারের বস্তা নিয়ে চট করে রেললাইন পেরিয়ে ইন্ডিয়া থেকে বাংলাদেশ।

হিলিতে কোনো নো ম্যানস ল্যান্ড নেই। ইন্ডিয়া আর বাংলাদেশের বর্ডার এখানে যেন যমজ বোন হয়েই পাশাপাশি শুয়ে আছে।

ওপার থেকে বিডিআর চেকপোস্টের কাছাকাছি নবীন কন্যা তার প্রথম মা হওয়ার আশ্বাস বুকে নিয়ে একেবারেই কচি গ্যাদাটিকে দেখাতে চায় এপারে দাঁড়ানো মা-বাবা, মামাবাড়ির জনেদেরও, দিদিমা দেখেন নাতিটিকে।

পুরুষ সন্তান। ভালো, ভালো।

মাতামহ দেখেন নাতনিটিকে।

ভালো, ভালো।

প্রথম সন্তান কন্যা হলে পিতার আয়ু-যশ বৃদ্ধি হয়।

অ মনু, কবে আইবা! দিদিমার ঠোঁট নড়ে। একই ঠোঁটে কথা বলতে থাকে মা, দিদিমা।

শাশুড়ি দেখে তাদের বলবান জামাতা বাবা জীবন নিজের প্রথম পৌরুষ-স্থাপত্যটিকে মাথার ওপর তোলে। রেলপথের ওপর রোদ পোহায় বিডিআর। তার উর্দির সঙ্গে বিএসএফের ফৌজি ইউনিফর্মের যে শেড, তার কতটাই বা তফাত!

রঙের ফারাক তো নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেটা বড় কথা খুব একটা নয়। দুদলের হাতেই এসএলআর। ফ্ল্যাগ মিটিং, ক্রস ফায়ারিং, মনকষাকষি, ভাব-ভালোবাসা সবই আছে। রয়েছে ঠাট্টা-তামাশা, হাসি-মশকরাও। তবু কেন গুলি চলে সীমান্তে।

কেন অনুপ্রবেশ।

কেনই বা সীমান্ত লঙ্ঘনের ঘটনা!

আওয়ামী লীগ আসছে। এইবার ইন্ডিয়ার লগে তাগো রিলেশন যথেষ্ট ভালো অইব। ধুতি পায়ে অঙ্ব্লাড কালারের অ্যালবার্ট, নীল-মোজা, বিস্কুট কালারের ফুলশার্ট, তার ওপর ছাইরঙা হাফ সোয়েটার। সবার ওপর শালের নিবিড় বেষ্টনী। মাথায় হনুমান টুপি।

শীত তাড়াতে আর কী চাই?

জাড়ের ধক কাটাতে, পুরো হাতা শার্টের নিচে ফুল স্লিভ উলিকট। উলিকটের তলায় এমনি গেঞ্জি। মানুষটি লম্বায় বেশ অনেকটা। তা প্রায় ছফিট তো হবেনই, চওড়াতেও যথেষ্ট। নাকের নিচে কাইজার গোঁফ, যত্নে কলপ করা। যেহেতু মাংকি ক্যাপ মুখের আদল পুরোটা গ্রাস করতে পারেনি, তাই গোঁফের দার্ঢ্য, ঔদ্ধত্য, সাহসী শোরগোল সহজেই চোখে পড়ে।

আওয়ামী লীগ আসছে, এইবার ইন্ডিয়ার লগে রিলেশন –

থাকতে দিলে তো –

থাকব। থাকব।

ইট উইল ডিসাইডেড বাই আমেরিকা।

কোনটা?

থাকনের ব্যাপার।

কে কইল?

আমি কইতাছি। ইট উইল ডিসাইডেড বাই ওবামা।

মাংকি ক্যাপ রং করা কাইজার মোচ আর ধুতির সঙ্গে তারই কাছাকাছি বয়সের শার্ট-প্যান্ট তর্ক করে। হিলির বাতাসে তর্কের গুঁড়ো দৌড়ায়। একটার পর একটা যুক্তি বা কুযুক্তির বুদ্বুদ ফাটে।

লাল রঙের কলকাদার লেডিস শাল, ডিজাইনে পাড়, কলকা থাকলেও তেমন কিছু দামি নয় মোটেই; বরং তাকে একটু যেন খেলোই মনে হয়, তার পেট কাপড়ে মেডিসিন যায়। ক্যাশমেমো-সমেত। রসিদ ছাড়াই কখনো কখনো। সব বুঝে নেয় টাউটরা। মহিলাটি এদিক-ওদিক দেখে খানিকটা টালুমালু চাউনিতেই পুরো পরিস্থিতিটা বুঝে ফেলে এপারকা মাল ওপার করে দেয়।

আকাশ থেকে ভগবানের সার্চলাইট রোদ্দুর নাম ধরে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হলে তার উত্তাপটুকু সমান তালে পেতে থাকে বিডিআর-বিএসএফ। হাওয়াও কোনো ভেদাভেদ করতে পারে না -এটা ইন্ডিয়া, ওটা বাংলাদেশ। রাতে ঘনিষ্ঠ চাঁদ উঠে এলে তার জ্যোৎস্নায়ও কোনো বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ার ভাগাভাগি থাকে না।

লাল শালের যে নারী মেডিসিন নিয়ে টুক করে চলে যায়, এদিক থেকে ওদিকে, তার গায়ও কখনো ইন্ডিয়ার রোদ, কখনো বাংলাদেশের। হাওয়াও তা-ই। তবে রোদ, বাতাস সে কথা বোঝে না। বুঝতে চায়ও না। এই বিপুল চলাচলের মধ্যেই রাষ্ট্র, ফৌজ, বেড়া, সীমান্ত, কাঁটাতার, পাসপোর্ট, ভিসা, অভিবাসন, জেল, আইন বোকা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

অনুপ্রবেশ, সন্ত্রাসবাদ, বর্ডার টেররিজম ইত্যাদি শব্দ ঢুকে পড়তে থাকে নিয়মিত। বিএসএফের শেষ পোস্টটিতে একজন জওয়ান জংলা ছাপ ডাংরি পরে চেয়ারে বসে থাকে। তার পাকা ছাউনিটির পেছনে কাঁচা নর্দমা। ইন্ডিয়ার জল গড়াতে গড়াতে বাংলাদেশের পানিতে মেশে। সেখানে প্রায় মজা একটি ডোবা। সবুজ সবুজ কচুরিপানা বোঝাই সেই বদ্ধ জলায় নেহাতই হাঁটুজল বড়জোর। সেই জল পেরিয়ে সারের বস্তা হাঁটে। হেঁটে যায় নুন আর মেডিসিন।

জলার ওপর রোদ পড়ে থাকে।

কচুরিপানার আশপাশে কী কী সব যেন খুঁটে বেড়ায় মোরগা-মুরগিরা। দলবাঁধা পাতিহাঁসেরা প্রবল স্বরে ডাক দিতে দিতে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশের বর্ডার গুলিয়ে দেয়।

আকাশে ভাসা মেঘেরা অনায়াসেই পাসপোর্ট, ভিসা, কোনো রকম পারমিশন, রাষ্ট্রীয় স্ট্যাম্প ছাড়াই এদেশ-ওদেশ করতে থাকে অবলীলায়। তাদের কে বাধা দেবে। এমনকি কাক, অন্য সব পাখি, প্রজাপতিদেরও আটকাবার কেউ নেই। এখানেই রাষ্ট্র থমকে থাকে, বোকা বনে যায়।

প্রজাপতিরা দুয়ো দেয় চেকপোস্টকে।

ইমিগ্রেশনকে দুয়োক্কো দিতে থাকে কাকেরা। পাখিরাও।

শীতের তুলতুলে রোদে পৃথিবী যখন তুলট কাগজ, তখনই হাঁসেরা নিজেদের ভাষায় আইন ভাঙার কথা বলে।

রেললাইনের ধার ঘেঁষে অবিরত ক্রিকেট।

ছেলেরা ব্যস্ত ক্রিকেটে। তারপর হঠাৎই তার থেকে ছুট হয়ে মন দিতে হয় নুনের প্যাকেটে। মোটে তো পাঁচ কেজি ভার। তা নিয়ে এত ভাবাভাবির কী আছে!

আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, বিএনপি, এরশাদ, জাতীয় পার্টি – এসব কথা ইমিগ্রেশন অফিসের সামনে উড়তে থাকে।

নতুন গ্যাসলাইন, ফারাক্কার পানি, গঙ্গাজল বণ্টন চুক্তি, সীমান্ত পার করে আসা সন্ত্রাসী – এসব কথাও নিজের নিজের মতো বাতাস সাঁতরায়। হাঁসেদের, মোরগা-মুরগিদের, কাক, চড়ই অথবা শালিকদের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। খেয়াল থাকার কথাও কি খুব আছে?

হাঁসেরা এই কচুরিপানাঢাকা জলের নিচে কোনো গেঁড়ি-গুগলি খুঁজে পায় না, বেশ কয়েক বছর। না পেয়ে বিরক্তই হয় রীতিমতো। তাদের ভাষায় প্রতিবাদও হয়তো করে। কিন্তু ওইসব প্রতিবাদী কণ্ঠ শোনার তেমন লোক কোথায়? কমিশন বসানোর লোকজনই বা পাওয়া যাবে কোনখানে? ফলে হাঁসেরা বিরক্তই থাকে।

রাজশাহী-নীলফামারী আন্তনগর জেলায় রেললাইন পেরিয়ে যায়। ট্রেনের শব্দ, শরীর- সবই একটু একটু করে দূরের কোনো অজানা নক্ষত্র হয়ে যেতে থাকে। তারপর আবার সেই রোদমাখা নির্জন রেললাইন। মানুষ, মাল পারাপার করানোর দালাল, টাউটদের ব্যস্ততায় নিজের মেজাজে ফিরতে থাকে হিলি বর্ডার।

প্রচুর পয়সা এখানকার লোকদের। ফিসফিসিয়ে বলে যেন কেউ। অনেক গাড়ি, লরি, ট্রাক। দক্ষিণ দিনাজপুরের ট্রান্সপোর্ট-ব্যবস্থার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করেন হিলির মানুষরা। তাঁরা কেউ কেউ যথেষ্ট মানিড ম্যান। অশেষ ক্ষমতাধরও।

হিলি বাজারে শীতের সকাল সাড়ে দশটা-এগারোটায় কেনাবেচা যেমন চলার, চলতে থাকে তেমনই। আইড় মাছ তুলে দিয়ে সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, কাতলা, রুই খুব চাষ হচ্ছে এখন। বালুরঘাটে, তপনে, গঙ্গারামপুরে, কালিয়াগঞ্জে সেই মোহন-স্বাদু আইড় আর পাওয়া যায় না। বোয়ালও অনেক কমে গেছে। তেমন বাঘাটে বোয়াল, বড় আইড় আর সেভাবে চোখে পড়ে কই!

তুলাই পানজি চাল, রাইখর মাছ- এসবও তো অতীতের পৃষ্ঠাতেই প্রায়। তুলাই পানজি রায়গঞ্জেই সবচেয়ে ভালো। কোথাও কোথাও এর ডুপ্লিকেট চাষ হয়। সেই ডুপ্লিকেট মালই এখন পয়সা দিয়ে কেনেন গ্রাহক। রায়গঞ্জের তুলাই পানজির ব্যাপারই আলাদা। হাইব্রিডের কল্যাণে সব কিছুই হারাতে বসেছে এবার। হিলি সীমান্ত এলাকার বাতাস তেমন কথাই বলতে চায় বুঝি নিজস্ব কোডে। সেই কোডকে ডিকোড করা হয়তো খুব কঠিন নয়। আবার নেহাতই সহজ নয় হয়তো।

মহানন্দায় ভেসে থাকা, ভেসে ভেসে চলা জিনস প্যান্ট আর জিনস জ্যাকেটের এ রকম অনেক কিছুই মনে হতে থাকে হয়তো। মাথার ওপর মহানন্দায় ডুব দিয়ে ওঠা চাঁদ গালে হাত দিয়ে কত কী ভাবছে বসে যেন। জিনস প্যান্ট-জ্যাকেট কি সত্যি সত্যি এই সব কিছু নিয়ে মাথার মধ্যে ক্যারম অথবা লুডু খেলছে? নাকি সময়কে সঙ্গে নিয়ে, খানিকটা বগলদাবা করেই হয়তো জিনস প্যান্ট-জ্যাকেট গোটা সময়টাকেই দুই হাতের চেটোর মধ্যে ফেলে ডলে ডলে, রীতিমতো পিষে তারপর ধুলো করে তাকে উড়িয়ে দিয়েছে হাওয়ায়।

রাস্তা থেকে কেনা গুটখার প্যাকেট ছিঁড়ে হা-হা-হা, হা-আ-আ বা এ রকম কিছু একটা চাপা শব্দ তুলতে তুলতে গালে ঢালল জিনস জ্যাকেট। আকাশে তখন মহানন্দার জলে ভেজা চাঁদ একটু যেন জবুথবু।

সীমান্তের ওপার থেকে বিডিআর পোস্টের পেছনে দাঁড়ানো নতুন বাচ্চার মা-বাবা হওয়া গর্বিতজনেরা কত সহজেই না বাপকে তুলে ধরে নাড়ায় শূন্যে! মূলত বাচ্চার বাবাই এ কাজটি করে থাকেন।

এপারে মাতামহী। মাতামহ। মামা-মামিরা। কচিটিকে দেখে তাদের বেশ আনন্দই হয়। পুলক জাগে। দুঃখে অনেকখানি ভোরের আলো নিয়ে এসে তারা কেউ কেউ বলতে থাকে, মোখখান বুইনের মতোই অইসে।

যে পাকা দাড়ি, লুঙ্গি অথবা ঢিলে পায়জামায় ওপারে দাঁড়ায়, তাঁর সঙ্গের বিবির আবার জবরদস্ত বোরকা। তাবলিগ জামাত চারদিকেই বাড়ছে। চতুষ্পাশ্র্বে বড় শক্ত, কড়া নজর তাদের। গায়ে ইসলামী কাজ হচ্ছে কি না, তা নিয়ে খুবই কঠিন নজরদারি।

নারীর ছতর ঢাকা অবশ্যকর্তব্য। তাই প্রয়োজন বোরকার। বোরকা না পরলে চাদর। পুরুষের মাথায় টুপিটি রাখা অবশ্যকর্তব্যের মধ্যে পড়ে। নইলে শয়তানে পেসাব করে, বাবা। মাথায় ইবলিসের পেচ্ছাপ, সে কি ভালো? নামাজ আদায়ের সময়, কোরবানি করা, দোওয়ার সময় টুপিটি তো রাখতেই হবে- তেমনই বিধান আল্লাহ্পাকের। হাদিস, শরিয়ত তো এমন কথাই বলছে রে বাপ। মাথায় টুপিটি রাখো। গালে দাড়ি। গোঁফটি ছেঁটে রাখো, যাতে পানিতে না ডুবকি খায়। কামিয়ে ফেলতে পারলে সবচেয়ে ভালো। গোঁফের চুল পানিতে ডুবলে সে পানি সঙ্গে সঙ্গে না-পাক, অপবিত্র।

ফুরফুরে শীত-হাওয়ায় সাদা দাড়ি ওড়ে।

বোরকার কালো রঙে শীতের রোদ্দুর বসতে চায় খানা গেড়ে।

ঢিলে পায়জামা অথবা লুঙ্গিতে ছুঁয়ে যায় বাতাস।

মেয়ে তার বিটা ছাওয়াল দেখায় আব্বাকে।

বেটি- এসব তো আদতে কিছুই তোমার নয়, বাবা। সব তো দিয়েছেন আল্লাহ্পাক। তিনি দ্বীন-দুনিয়ার মালিক। সেই মালিকের কাজ করা মানে আখেরাতের কাজ করা। জামাত তো সে জন্যই বেরোয়, বাবা। চিল্লায় চিল্লায়- চল্লিশ দিন, তারপর দরকারে ৮০ দিন বা তারও বেশি সময় ধরে প্রচার চলে। মসজিদে মসজিদে তাবলিগের লোকজন। এরা দ্বীনের কাজ করছে, বাবা সকল। আখেরাতের কাজ করছে।

দ্বীনের কাজ না করলে কব্বরের নিচে শুয়েও তো শান্তি পাবে না, বাবারা। রোজা, নামাজ, জাকাত, হজ না করলে যারা অবিশ্বাসী, কাফের, তাদের জন্য ক্রমশ ছোট হয়ে আসবে কব্বর। তোমার হাড় মড়মড়িয়ে ভাঙবে। তারপর ভয়ংকর সে এক প্রাণী, যে তার নখে বিঁধিয়ে আছাড় মারতে থাকবে তোমায়। উফ্, কী যন্ত্রণা, কী কষ্ট! তারপর তো জাহান্নামের আগুন আছেই। রোজ কেয়ামতের দিনে আখেরি বিচার পাওয়ার জন্য যখন কব্বরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে সব রুহরা আর তারা মুখে বলবে ইয়া নাফসি…ইয়া নাফসি…ইয়া নাফসি…। আমার কী হবে! আমার কী হবে! আমার কী হবে!

কেবল হুজুর – রসুল – আল্লাহ্র যিনি সবচেয়ে বড় বান্দা, সেই শেষ নবী, তিনি বলবেন, ইয়া উম্মতি…ইয়া উম্মতি…ইয়া উম্মতি…। অর্থাৎ কিনা আমার উম্মতের কী হবে! সারা পৃথিবীর মুসলমানদের – মোমিন মুসলমানদের কী হবে!

ইস্রাফিলের শিঙ্গা বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাটির তলায় কব্বরের অন্ধকারে থাকা কোটি কোটি রুহ উঠে এল ওপরে। তাদের মুখে মুখে ইয়া নাফসি…ইয়া নাফসি। সূর্য নেমে এসেছে মাটির কাছাকাছি। পৃথিবী হয়ে উঠেছে তামার তপ্ত কড়াই। কোথাও জল নেই। ছায়া নেই। যেটুকু ছায়া আছে, তা খোদার আরশের- সিংহাসনের। তার ছায়ায় আমাদের নবীজি। রাসুল।

তাবলিগের আমির সাহেবটি তাঁর টানা কথায় সামান্য বিরতি দেন। আকাশে প্রায় মুছে যাওয়া আলো স্মৃতিমাত্র হয়ে জাগে। বাতাসে অন্ধকারের গান। আমির সাহেবের মুসাফা করতে চাওয়া হাতের পাতার ভেতর প্রাইমারি স্কুল টিচার অথবা সেকেন্ডারি স্কুলে পড়ানো মাস্টার মশাইটির ভীরু হাত। কিংবা যে কৃষক সারা দিন হাল ঠেলেছেন, বীজ অথবা ফসল, সারের ক্রমশ বাড়তে থাকা দাম নিয়ে ভেবেছেন, তাঁর কর্কশ, কর্মঠ, খসখসে হাতখানিও তাবলিগের আমির সাহেবের হাতে।

কী ভাই, আসছেন তো মসজিদে? সন্ধ্যের পর, এশার নামাজের আগে!

হাতের ভেতর বন্দি হাত কী উত্তর দেবে? তার মুখে সত্যি সত্যি তো কোনো ভাষাই থাকে না।

ইস্রাফিলের শিঙ্গা বাজনের সঙ্গে সঙ্গে উঠে এসেছে রুহরা। কত দূরে বেহেশত? জাহান্নামই বা কতখানি দূরত্বে! পুলসেরাত- তারই বা দূরত্ব কতখানি? শেষবিচার-রোজ কেয়ামতের দিনে শেষ বিচার, সেটাই বা কেমন করে, কী পদ্ধতিতে হবে? বিশ্বাসী – মোমিন মুসলমানরা,নিয়মিত রোজা রাখা, জাকাত, হজ, রোজ রোজ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে_পাক্কা নামাজি, মুসলি্ল হয়ে ওঠা জনেরাই তো পাবে বেহেশতের কুনজি- চাবি।

তপ্ততামা হয়ে ওঠা পৃথিবী! উফ্, কী তার ভয়ানক তাপ! গরম। গরম। গরম। উত্তপ্ত লাভাস্রোত যেন ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। সেই সঙ্গে লক্ষ-কোটি কণ্ঠে আমার কী হবে-আমার কী হবে, কোথাও কোনো ছায়া নেই। দাঁড়ানোর জায়গাও নেই।

বোরকা পরা রক্তহীন, ফ্যাকাসে, শিরা বের করা শীর্ণ হাতটি বাতাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেন বা তার মেয়ের ঘরের ছেলেটিকেই ছোঁয়। হাওয়াই তো বহন করে আনে নাতি অথবা নাতনির গন্ধ। নতুন ত্বক, নবীন প্রাণ, তেলগন্ধমাখা কাঁথা, কাজল, বুকের দুধ, কৌটোর দুধ, ছাগলের দুধ, বেবি পাউডার সব মিলিয়ে এ যেন অলৌকিক কোনো ঘ্রাণ।

নানির চোখে জল আসে।

নানার চোখে পানি।

বর্ডার, কাঁটাতার, রাষ্ট্র, বিএসএফ, বিডিআর এসব দেখে না। দেখতে পায় না অথবা দেখতে চায় না। রাষ্ট্র তো কাঁটাতার বোঝে, সেই সঙ্গে সই-সাবুদ, রাবার স্ট্যাম্প, আইন-কানুন।

নাতির বাতাস, নাতনির হাওয়া দিদিমাকে ছুঁয়ে যায়।

দিদিমা কাঁদে। লোলাকাঠি, কাজললতা, ঘুমপাড়ানি গান, রূপকথার গপ্পো কথা, মন-পবনের নাও, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি, পক্ষিরাজ ঘোড়া, সোনার কাঠি, রুপোর কাঠি, কলাবতী রাজকন্যা, দুধকুমার রাজপুত্র, হাড়ের পাহাড়, কড়ির পাহাড় কইড়া জাঙাল, কুঁচবরণ কইন্যা তার ম্যাঘবরণ কেশ সব কিছু একাকার হতে থাকে চোখের সামনে।

বোরকার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসা রোগাটে, হেমন্তের শালিকের পা যেন, এমন বিশীর্ণ হাতটি বাতাস ছুঁতে ছুঁতে তার নাতি অথবা নাতনির গন্ধ পায়।

একটা তাবিজ করাতে হবে গোপনে পীরস্তানের মাটি দিয়ে। সেই সঙ্গে খানিকটা তেল পড়িয়ে রাখতে হবে পীরের মাজারের খাদেম সাহেবকে দিয়ে। বড় হুজুরের মাজারের মাটি, খাদেম সাহেবের ফুঁক মারা তেল কচিটার কাজে লাগবে। উবগার হবে।

কুশমণ্ডি, গঙ্গারামপুর, খাঁপুর, তপন, কুমারগঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ, রায়গঞ্জ, বোয়ালদাড়, হিলি কোথাকার কোথাকার বাতাস সব যেন এক হয়ে মিশে যেতে থাকে। ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, রংপুর, রাজশাহীর বাতাসও মেশে সেই হাওয়ায়। হাওয়ার কোনো পাসপোর্ট লাগে না। প্রয়োজন হয় না বৈধ ভিসার।

এরপর তো হাওয়ায় হাওয়ায় ফিসফিসানি। ফুসফাস কথাবার্তা।

হাওয়ায় হাওয়ায় কথা কয়। কেউ শুনতে পায় না।

কিংবা শুনতে পায়। খুবই স্পষ্টভাবে শুনতে থাকে।

হাতের ভরে নবীন শিশুটি বাতাসে কোনো একটি উজ্জ্বল ফুল, নয়তো চাঁদ হয়ে দোল খায়। হাঁসেরা তাদের নিয়মিত কুচকাওয়াজ থামিয়ে সমবেত প্যাকপ্যাক, প্যাকোরপ্যাকোরে মিলিটারি ব্যান্ড, নয়তো বিউগল বাজিয়ে দিতে থাকে। সামরিক কায়দায়, গার্ড অব অনার দিতে থাকে মোরগা-মুরগিরা।

শিশুটি হাসে।

শিশটি কাঁদে।

তার মা হাসে।

মা কাঁদে।

বাবা হেসে ওঠে।

তারপর একসময় কেঁদেও ওঠে বাবা।

হায় রে রাষ্ট্র। হায় রে আইন। হায় রে পিতৃভূমি, মাতৃভূমির বুকিশ ডেফিনেশন। নাগরিকত্ব, ভোটার, ভোটার আইডি কার্ড, পাসপোর্ট, ভিসা, ভোটার লিস্টে নাম থাকা, না-থাকা সবই কি তুচ্ছ হয়ে যায় না এর কাছে?

শিশুটি আবারও হাসে।

তার কোনো ছায়া কি পড়ে অন্য কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জমিতে? ছায়া কি বেআইনি অনুপ্রবেশ ঘটাতে পারে! অকস্মাৎ, আচমকাই অনুপ্রবেশ!

ছায়াকে কে গ্রেপ্তার করবে?

কোন রাষ্ট্র? কোন আইন?

কোন বিএসএফ!

কোন বিডিআর!

ছায়া কি আদৌ গ্রেপ্তারযোগ্য অথবা শাস্তিযোগ্য!

শিশুটির ছায়া মাটিতে লুটোয়। ধুলোয় নেমে আসা ছায়ার গায়ে এখন আর কোনো মলিনতা নেই। কচিটির চোখের জলে তার চোখের কাজল থেবড়ে যায়। পাউডারের আড়াল দিয়ে রক্ষা করতে চাওয়া কাজল টিপ কখন যেন ছেতরে গেছে।

সে কি নয়নজলে?

অশ্রুরেখায় দেশভাগের যন্ত্রণা, সীমান্ত বেড়ার অপমান ঘোচে কি!

ছেলেটির গায়ে তার মায়ের বুকের দুধের গন্ধ। সেই স্তন্যঘ্রাণে ম-ম করতে থাকে বাতাস।

‘চাঁদের কপালে চাঁদ ‘টি’ দিয়ে যা…’

‘আয় চাঁদ নড়েচড়ে

ভাত দেব বেড়েগুড়ে’

শিশুর কপালে কাজল টিপ চোখের জল হতে থাকে।

ঠাকুমা, নয়তো দিদিমা, নানি অথবা দাদি, ঠাকুরদা কিংবা দাদামশাই, দাদা অথবা নানা সবাই দেখে শিশুর ছায়া আসমানে কোনো দেবদূত অথবা ফেরেশতাবৎ! শিশুর গায়ের দুধ-দুধ গন্ধ, কাঁথা-বালিশ আর তেলের গন্ধ চরাচরে ছড়ায়।

দিদিমা ভাবে, এবার একটা নকশিকাঁথা তৈরি করে পাঠাতে হবে। কাঁথায় ফুল, পাখি, সোনাটার নাম, ঠাকুরের নাম।

নানি ভাবে, একখান কাঁথা বোনত লাগব। চাঁদতারা, মসজিদ, পাখি সব থাকবে তাতে। কী যে সোন্দর হবে কাঁথাখান! সোনামণি সেই কাঁথায় শুইয়া শুইয়া হাগবে, মোতবে, খিলখিল কইরা হাসবে। পাউডার, বুকের দুধ, গায়ে মাখার তেল, কাজল হগগল গন্ধ মিলিয়া গন্ধকাঁথা!

নানা-নানি, দাদা-দাদি, দিদিমা-দাদামশাইদের সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্ন দেখতে থাকে পায়চারি করা শালিক, গুয়ে আর গাঙশালিকেরা। স্বপ্ন দেখে হাঁসেরা, মোরগা-মুরগিরা।

গোটা সীমান্ত স্বপ্ন দেখে।

ফিরে যেতে থাকে নতুন নতুন খোয়াবে। খোয়াব দাস্তানে।

জিনস প্যান্ট, জিনস জ্যাকেট কি এত এত সব স্বপ্নের কথা, স্বপ্ন-জাগরণের খবর জানে!

মহানন্দার ওপর রাতের শেষ খেয়া ভাসে। আকাশ থেকে নেমে আসা চাঁদও এবার সওয়ারি হয় সেই নৌকোয়।

একই চাঁদ লক্ষ চাঁদ হয়ে আছাড় খায় আত্রেয়ী, পুনর্ভবা, বাউটি, জয়ন্তীতে। কোচবিহারের বাউটির জলে নাকি পুজো-পাঠ হয় না।

কেন হয় না দেবতার পুজো বাউটির জলে?

হয় না, তার কারণ এই জল নাকি বানাসুরের পেচ্ছাপ।

এমন উপাখ্যান তো অনেকখানেই।

বাউটির জলে বড় বেশি লোহা-আয়রন।

কোচবিহারের এদিকে এই বেল্টে সব জলেই প্রায় আয়রন আধিক্য।

বাতাস চাপা স্বরে বলতে থাকে এই সব কথা। তার কথায় গলা মেলায় রোদ্দুর। সেই সঙ্গে পাখিরা। বিশেষ করে শালিকেরা। শালিকেরা নাচে। নাচে আর কথা বলে। পায়চারি করে আর ডাক দেয়। ডাক দিতে থাকে আর পায়চারি করে। বাউটির জলে পড়ে থাকে চাঁদ।

চাঁদ ভেসে থাকে মহানন্দার জলে।

আত্রেয়ী তার বুকে চাঁদ নিয়ে বহে যায়।

জয়ন্তীর শুকনো দীর্ঘ খাত, প্রশস্ত নদীবুক, বালি-পাথর, নুড়ি, ভাঙা-আধভাঙা সেতুর স্মৃতি নিয়ে জলহীন খাঁ খাঁ প্রান্তর যেন, শীতে। দূরে দূরে কাছে কাছে নানা ধরনের গাড়ি। শীত ঋতুর পিকনিক মচ্ছব।

লরি পাথর তুলছে। পাথরের পর পাথর। এই সব প্রস্তরখণ্ড মনুষ্যসভ্যতা প্রসারে সহায়তা করবে। সাইবার যুগেও প্রস্তরখণ্ড বড়ই প্রয়োজনীয়। লরি পাথর তোলে। পিকনিক অথবা নেশায় যেতে চাওয়া মানুষ-মানুষী, কচি ছেলেপিলে বহে আনে মারুতি ভ্যান, টাটা সুমো, অলটো, স্করপিও, হুনদাই, অ্যামবাসাডার। নদীর নির্জনতায় প্রচুর শুকনো কাঠ। তা জ্বেলে আগুন করা। পাথরের গায়ে পাথর সাজিয়ে উনুন। তার ওপরই রান্নার আয়োজন। ভাত, মাংস, চালে-ডালে খিচুড়ি, ডাল, নদীর পারে পাথরের ওপর আদা থেঁতো করা, সব চলতে থাকে পর পর।

পিকনিক হয়।

মানুষ পিকনিক খায়।

ছেলেরা। মেয়েরা। কচিরা।

চিলাপাতা, মেন্দাবাড়ি, হলং, জলদাপাড়া, জয়ন্তী, বকসা সব নাম পর পর ঘুরে আসতে থাকে। এই ঘোরাঘুরির মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে থাকে মানুষের অতীত জঙ্গলপথ। ময়ূর, বাঘ, ভালুক, সাপ, বেজি, শিয়ালদের সঙ্গে সহবাসের ইতিহাস।

পাথরে সাজানো উনুনে আগুন জ্বলে। দূরে ডলোমাইট মেশানো পাথরে সাজানো ভুটান পাহাড়। জয়ন্তী, জঙ্গল। গভীর সবুজ জঙ্গল থেকে প্রায়ই বেরিয়ে আসে হাতির পাল। জঙ্গুলে রাস্তার ওপর তাদের টাটকা নাদের চিহ্ন। জিনস প্যান্ট কি এত জানে!

লেখাটি ইতিপূর্বেই অন্যত্র প্রকাশিত। লেখকের অনুমতিতে ‘গল্পের সময়’-এ প্রকাশিত হল। 

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ