06 Sep

দোস্তি

লিখেছেন:দেবাশিস মজুমদার


       [  এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না – এই স্পষ্ট উচ্চারণ তাঁর। তিনি বরাবরই ছিলেন সহজে কঠিন কথা বলার মানুষ। তিনি নবারুণ ভট্টাচার্য। আমাদের ফ্যাতাড়ু। শুদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতির নামে ধামাধরা আতুপুতুদের তোয়াক্কা না করা পুরন্দর ভাট। জুলাই মাস ছিল এই ব্যাতিক্রমী সাহিত্যিকের মৃত্যু মাস। দীর্ঘ সময়ের ঘনিষ্টতা থেকে দেখা নবারুণের একটি কোলাজ চিত্র একটি সাহিত্য তথ্য চিত্রায়ন হিসেবে উঠে এল দেবাশিস মজুমদারের লেখায়।]

                                                                                     দৃশ্য – ১

তখন কাঙাল মলসাট নিয়ে খুব হইচই। কলেজ স্ট্রিটের ‘বুক ফ্রেন্ড’ দোকানটায় বসে আছি। বইটা কিনতে আসা হকারদের মধ্যে কেউ একজন বলল-

– ‘শালা বইটার যা বিক্রি আছে না ? বই কবে রিলিজ করবে ঠিক নেই। বইটা দেখতেই হবে।’

আরেকজন কেউ বলে উঠল – এরপরের বইটাও তো বেরিয়ে গেছে।

– ‘কি নাম রে?’

– ‘ও বাবা জানিস না।’

– ‘আমার ছেঁড়া যাবে।’

– ‘সত্যি?’

– ‘কি জানি!’

  – কাট –

                                                                                             দৃশ্য – ২

একটি বইয়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছি। হঠাৎ আমার মোবাইল বাজল। [রিংটোন – ‘ও নমঃ শিবায়’]

– হ্যালো, হ্যাঁ, নবারুণদা?

– হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি না যেতে পারিনি। আপনার বইটা জেরক্স হয়ে গেছে। জানি নবদ্বীপ নিয়ে আপনারা খুব ….। কাল ভাষাবন্ধনে আসবেন? ঠিক আছে, ঐ দুপুর ২টো নাগাদ? ঠিক আছে? জানেন বইটা জেরক্স করতে গিয়ে একটা ঘটনা মনে পড়ল। এইতো … বললে রেগে যাবেন। সুনীল গাঙ্গুলী মারা যাওয়ার আগে নবদ্বীপে গিয়েছিলেন …( ওপার কিছু বলতে চাইল। তার আগেই) মাইরি … সত্যি বলছি। আমার ছাত্রের বাবারা নবদ্বীপে সম্বর্ধনা দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানের পর দু দিন ছিলেন। সব পুরোনো টোলে টোলে ঘুরেছিলেন। একটা মন্দিরেও ঢোকেননি। স্বাতী ঢুকেছিলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুরছিলেন। আর সমানে দুটো আঙুল দিয়ে ঠোঁটে টোকা মারছিলেন। …

(একটু চুপচাপ) ওপারের কণ্ঠস্বর বলছে – আমি তো ওকে একনলেজ করেছি। কিন্তু এটা মনে রাখিস শুধু – সুনীল গাঙ্গুলীও লেখক, সতীনাথ ভাদুড়ীও লেখক, আবার কমলকুমার, অমিয়ভূষণও লেখক। যাক্‌গে  শোন নবদ্বীপের বইটা নিয়ে কাল কফি খেতে খেতে আরও আড্ডা হবে। ভাল থাকিস।

ফোন বন্ধ করলাম। বামপন্থী দোকানদারের লোলুপ চোখ জিজ্ঞাসা করল –

– কে রে?

– নবারুণ ভট্টাচার্য।

– ও, সেই আমাদের মহাশ্বেতা দেবীর ছেলে? নকশাল তো? হেভি নকশাল ওরা।

 

     – কাট –

                                                                                               দৃশ্য – ৩

বইমেলা। ভাষাবন্ধনের স্টলের অনতিদূরে লোকায়ত সাহিত্য চক্রের স্টল। দাঁড়িয়ে আছি। ২০১২ সালের বইমেলার শেষের শনিবার। হানি সিং ছাঁটের চুল দাড়ির একটা ছেলে একগাদা বই কিনে যাচ্ছে। বই এর ব্যাগে ভাষাবন্ধনের স্ট্যাম্প। ছেলেটির বান্ধবীর মিহি গলার আওয়াজেই চোখ ফেরালাম।

– আমি পড়েছি দু একটা। লাইনগুলো খুব ‘এ’।

– ‘এ’  কি?

– তোমরা বার বার বল ‘ফ্যাতাড়ু’। ফ্যাৎ ফ্যাৎ সাঁই সাঁই। কি রকম যেন।

– ও, ওসব কিছু নয়। আসল লাইন তো ওখানে – ব্ল্যাকে মাল খেলে কখনো হলুদ হ্যালোজেনের জোনে যেও না।

-দূর কেমন যেন বাজে বাজে কথা।

– ওটাই আসল। শালা, সোসাইটিকে ন্যাংটো করে ছেড়েছে।

– দূর, আমার কেমন যেন লাগে। গা রি রি … করে।

 

  – কাট –

                                                                                               দৃশ্য – ৪

২০১২-র বই মেলা। ভাষাবন্ধনের স্টলের সামনে জিনসের জামা গায়ে নবারুণ ঘুরছেন। হঠাৎ ঢুকে দেখতে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছিলাম। বেরোতে গিয়ে প্রায় মুখোমুখি। বললেন –

– কিরে?

বললাম – খুব দরকার একটা ইমিডিয়েট ইন্টারভিউ লাগবে।

বললেন – কোনো কাগজের?

বললাম – ‘লোকায়ত’র কথা।

বললেন – যে কোনো দিন দুপুরে চলে আয়।

পরদিন গেলাম। সঙ্গে মৃন্ময় সেনগুপ্ত আর পার্থসারথি দাশগুপ্ত। মেঘলা, টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে।মেলার মাঠে দমকলের লোক চেয়ার এগিয়ে দিতে দমকল অফিসের সামনেই আড্ডা শুরু হল। আড্ডা হল প্রায় ঘন্টা দেড়েকের মতো। নিজের থেকেই নিজেকে মেলেছিলেন সেদিন। একটা অসাধারণ কথা বলেছিলেন – পপুলার সাহিত্য নিয়ে। গ্রাহাম গ্রিনকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন – এক ধরনের শিল্প আছে যা এন্টারটেইন করে তাকে মানতেই হবে। বাকি ধারাটাই লিটারেচার। একটা উদ্ধৃতি দিয়ে গোটা বিষয়টা পরিষ্কার করে দেওয়ার নমুনা বোধহয় এটাই।

 

   – কাট –

                                                                                                – দৃশ্য ৫ –

বই মেলার ফুড জোনের পেছনের দিকের চাতাল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঘিরে রয়েছে। স্মোকার্স জোন্‌ এর বিস্তৃতি হয়েছে। ছোট ছোট দল জটলা করছে। হাতে হাতে গীটারটা ঘুরছে। আবছা আলোয় ছেলে মেয়ে ঠাহর করা দায়। গাঁজার কড়া গন্ধটা ভক্‌ ভক্‌ করে নাকে ধাক্কা দিল । ছোট ছোট ৫০০ এমএল লিমকা, থামস্‌ আপের বোতল হাতে হাতে ঘুরছে। আমার মতো ‘চেনা পাবলিক’রা সবাই জানে ওগুলোতে আছে ‘জল ক্লাবের জলতরঙ্গ’ হঠাৎ একজন বলে উঠল –

– আসলে কেউ নয়। আমরাই ফ্যাতাড়ু।

– [তীব্র সিটি] ওঃ! গুরু কি বলেছে।

– কি লিখেছে বল? আমরা শালা … এই সোসাইটির মুখে একটু হিসু করি। আবার করতালি … শালা ছিঁড়ব, আর বাঁধব। খুব খোলতাই চিৎকার। হাওয়া কাটা শব্দে … ‘লায়লা ও লায়লা ….. ও মেরি লায়লা।’

সামনে পতপত করে দোল খাচ্ছে সুমঙ্গল আলুর বন্ডের ফ্লেক্সটা। লেখা… ইনভেস্ট ইট্।

 

 – কাট –

                                                                                             – দৃশ্য – ৬

ভাষাবন্ধন অফিস, ৩/৫২, বিজয়গড়।

বাইরে খুব বৃষ্টি। ভিজে ছাতায়, ভিজে জামা জুতো পোঁটলা পুঁটলি ব্যাগ নিয়ে দরজায় উঁকি। সোজাসুজি, চোখাচুখি।

– হ্যাঁরে, আয়।

– আরে বৃষ্টিতে একেবারে যা-তা অবস্থা।

– বৃষ্টিটা খুব সুন্দর হচ্ছে না? আমি অনেকক্ষণ এসেছি। জানলা দিয়ে বসে বসে বাইরে বৃষ্টি দেখছিলাম। কেউ তো আসে নি আজকে।

– নবারুণদা, ছাতাটা এইখানটা মেললাম।

– হ্যাঁ হ্যাঁ, এমা একদম ভিজে গেছিস। দাঁড়া বেশ কড়া কফি বানাতে বলি। কম্পিউটারের মেয়েটাকে কফি বানাতে বল। কফি না হলে আড্ডা জমে না। খাবি তো ?

– হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটাই তো ইন্টেলেকচুয়াল হেলথ্‌ ড্রিঙ্ক। বৃষ্টির দুপুরে কফির আড্ডার মেজাজই আলাদা। ………. ওগুলো কি রে?

– কয়েকটা গাছ কিনলাম।

– কি গাছরে? দেখি দেখি নিয়ে আয়। ওরে শালা, এতো লাল নয়নতারা রে। কোথা থেকে নিলি রে?

– শিয়ালদা।

– বাঃ ভারি সুন্দর। ফুটলে এত সুন্দর লাগে না? পূর্ববঙ্গের অনেক জায়গায় একে বলে –‘নন্দদুলাল’ – জানিস? বাবা বলতেন – একদৃষ্টে উদাস চোখে বাইরের দিকে। (একটু পরে) আসলে বাবার কাছেই সব শোনা তো? বাবার কাছে সব শিখেছি। বাবাই আমার কাছে মা। (একটু চুপ) যা, বোস কফিটা ঠান্ডা হয়ে যাবে।

– এটা নেবেন? (গাছগুলো দেখিয়ে)

– না, না। যাঃ গোল্ডেন (আমার স্ত্রীকে ঐ নামেই ডাকতেন) কি ভাববে? ও বেচারীর গাছের শখ। ওর থেকে কেড়েকুড়ে নেওয়া। এক কাজ কর। গোল্ডেনকে ফোন লাগা। ওকে একটা দায়িত্ব দেব।

[ফোন করা হল ]

– স্কুলে নাকি? দে দেখি ফোনটা?

– শোন্‌ গোল্ডেন, আমি নবারুণদা, তোর বর অনেকগুলো হেভি নয়নতারা নিয়ে আমার সামনে দিয়ে যাচ্ছে। দিতেও চেয়েছিল।

– (ওপাশ থেকে) – আপনি নিয়ে নিন না?

– না-না, যাঃ তা হয় নাকি? শোন না, আমাকে একটা গাছ যোগাড় করে দিতে পারবি। সাদা চিনা গোলাপ প্রচুর হয়। থিক্ থিক্ করে গাছে। বুঝতে পেরেছিস, কোন গাছ গুলোর কথা বলছি।

[ওপারের ফোনে কিছু বর্ণনা]

– হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটা দুটো জোগাড় করে পাঠাস তো? এমনি ভালো আছিস তো? বেশ। ভালো থাকিস্‌। সুইচ অফ্‌ ফোনের।

 

  মিক্সিং / মন্তাজ

                                                                                             দৃশ্য – ৭

১লা আগস্ট। সকাল সাড়ে দশটা। গল্‌ফ গ্রিন সরকারি আবাসন।

সামনের মাঠে সাদা প্যান্ডেল। এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মানুষগুলোর জটলা। মাঝে উঁচু টেবিল। সাদা বরফের ওপর লাল ডোরা পাঞ্জাবি পরে শায়িত নবারুণ। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি। বাইরে অঝোরে ভিজছে নবারুণের প্রিয় সাথী ক্ষ্যাপাদা। দূরে অনেকটা দূরে ছাতা মাথায় একটানা সিগারেট টানছেন ইংরাজি অধ্যাপক নবারুণের মানসপুত্র রাজীব চৌধুরী। দূর থেকে হাত নাড়লেন। ফুলে ফুলে মুখ দেখায় দায়। লাল গোলাপ। হলুদ গোলাপ, সাদা পদ্মের বড় বড় বোকে। একটাও সাদা গোলাপ চোখে পড়ল না। পাশে দাঁড়িয়ে নিথর মহাশ্বেতা দেবী। একটু পরে ধরাধরি করে গাড়িতে তুলে দেওয়া হল। বৌদি (প্রণতি ভট্টাচার্য) স্থির বলে আছেন পাশের চেয়ারে। কখনও কখনও কারোর সাথে নিচু স্বরে কথা বলছেন। অথবা ফোন রিসিভ করছেন। লিবারেশনের ছেলেরা ঘিরে রয়েছে। রবীন দেব, সুজন চক্রবর্তী, পার্থ চ্যাটার্জীর মতন হেভিওয়েটদের মাল্যদান শেষ হল। তাঁরা চলেও গেলেন। ‘কপু’ (কলকাতা পুলিশ) আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

ক্ষ্যাপাদা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। শালা, ফ্যাতাড়ু, বাঘে গরুকে একঘাটে জল খাইয়ে ছাড়ল।

ভাষাবন্ধনের একজন বলল – এখন থাকলে যা খিস্তি করত না।

ক্ষ্যাপাদা বলল – ঠিক চুপ করে শুনছে। আর মন ভরে পরের লেখার খিস্তি সাজিয়ে নিচ্ছে।

রাজীবদা হাসতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে ফেলল।

চোখের দিকে তাকালাম।

বন্ধ চোখ সমাহিত বৌদ্ধ ভিক্ষুর মতন। গুণী মানুষের চোখের দৃষ্টিতে খুব তেজ থাকে শুনেছি। অসম্ভব উজ্জ্বল ছিল চোখ দুটো। ঠিক বৈদিক যুগের ঋষিদের মতন।

কথাটা একদিন বলেছিলাম আড্ডা মারতে মারতে। হেসে বলেছিলেন, – তাই? বাবারও খুব উজ্জ্বল চোখ ছিল জানিস?

 

 – কাট –

জুম আউট করে –

একটু পরে ইন্টারন্যাশনাল শুরু করল লিবারেশনের ছেলেরা। তারপর – গাইল ‘যেতে যেতে একলা পথে নিবেছে মোর বাতি।’ ‘খুব প্রিয় গান’ ছিল একজন বলে উঠলেন।

 – মিক্স / মন্তাজ –

একদিন গল্প হচ্ছিল, বললেন –

‘যেতে যেতে একলা পথে’টা বেশ ভালো লাগে। বেশ ভালো, আর প্রতুলের ‘ডিঙ্গা ভাসাও’

– মিক্স / মন্তাজ –

লিবারেশন শুরু করল – ‘ডিঙ্গা ভাসাও’ সাগরে সাথীরে

‘ডিঙ্গা ভাসাও’ সাগরে –’

একটু পরে এসি শববাহন যান পেছিয়ে এল দেহের কাছে।

রাজীবদা দূরে দাঁড়িয়ে একটানা সিগারেট টেনে যাচ্ছেন।

লিবারেশনের ছেলেরা পিতার যত্নে ‘শেষ-গাড়ির’ সওয়ারি করে দিলেন। বাইরে লেখা ‘প্রতিবাদী লেখক নবারুণ ভট্টাচার্যের প্রতি শ্রদ্ধা ‘গণসংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি’ ‘আপোষহীন সংগ্রামী’ ইত্যাদি ইত্যাদি তকমা। গাড়ির সামনে পুত্র, পুত্র বধূ, বৌদি ও আরও কয়েকজন। আর শেষে শোক মিছিলে লিবারেশন কর্মীরা আর অসংখ্য গুণমুগ্ধ পাঠক। ভাগ্যিস কোন কোন লেখক আগে এসেছিলেন ঐ সময় আসেন নি। ইন্টারন্যাশনাল গাওয়া হচ্ছে। হাঁটছি ভাষাবন্ধনের অফিসের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে দু পাশে লক্ষ্য করছি মানুষকে। এই পথেই তো রোজ বিকেলে ভাষাবন্ধন থেকে বাড়ি ফিরতেন নবারুণ। কোন কোন দিন সাক্ষী হতাম। কত মজার গল্প, কাহিনী, স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে অতীতের পাতায়।

[ক্লোজ আপ] ঘড়িতে দুপুর – ২টো কুড়ি মিনিট।

গাড়ি ভাষাবন্ধন অফিসের নিচে এসে দাঁড়াল। ফ্ল্যাটের ওপর থেকে কয়েকজন দৌড়ে নেমে এল। ঘড়ি বাঁধা হাত ওলটাতে গিয়েই চোখাচোখি রাজীবদার সাথে – হাউ হাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সামলানো যাচ্ছে না রাজীবদাকে। এতক্ষণ একটানা সিগারেট টেনে আটকাচ্ছিলেন কান্নাটাকে। এখন আর পারলেন না।

হ্যাঁ, ঠিক এই সময়ই তো অফিসে ঢুকতেন নবারুণ। আজও আসলেন। দাঁড়িয়ে নয় শুয়ে, চোখটা ঝাপসা হয়ে আসছে।

 

মিক্স / মন্তাজ –

অনেক দিন আগে পড়া প্রথম গল্প (পরিচয়-এ বেরিয়েছিল) ভাসান এর প্রথম অংশটা খুব মনে পড়ছে এখন ‘The time has come’, The walrus said to talk of many things” – Alice in wonderland.

অভাবনীয়ভাবেই লোকচক্ষুর অন্তরালে মরিলাম। রাস্তায় সে রাত্রে মহা হট্টগোল। বিজয়া দশমীতে মা তাঁহার ফ্যামিলি কন্ট্রোলের নিয়মের একটা বেশি সন্তান লইয়া সংগ্রামী সহস্র দন্ডায়মানকে চোখের জলে ভাসাইয়া ট্রাকে করিয়া যাইতেছিলেন। যে ট্রাকে করিয়া রাত্রির আঁধারে ভূতের ন্যায় দুর্লভ চালের বস্তারা শহরে ঘুরিতে বাধ্য হয় সেই ট্রাকে। দিনের বেলায় উহারা বাহির হইতে পারে না। তাই মধ্যরাত্রেই উহাদের গুদাম হইতে গুদামে চালাচালির প্রশস্ত সময়। মাও রাত্রিতে চলিয়াছেন। ঢাক, ব্যান্ড, তাসার আওয়াজ এবং পটকার শব্দ মিলিয়া এক আশ্চর্য সিম্ফনির সৃষ্টি করিয়াছে। মধ্যে মধ্যে ঋত্বিকের দল দুর্গা মাতার জয় চারণের ন্যায় লোককর্ণে ঘোষণা করিতেছিল। আমিও মরিলাম এমনই সময়ে।

যে পাগলটিকে আমি কোনওদিন ভালবাসি নাই সে আমার পাশে বসিয়া অঝোর ধারে কাঁদিতেছিল আর কী গাহিতেছিল। আমি তাহার সব সঙ্গীত শুনি নাই। প্রকৃতপক্ষে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শুনিতে পারি নাই। তাহার কারণ যে পার্কে আমি মরিতেছিলাম, তাহার সামনেই রাস্তা।’

 

 – কাট –

এমন লাইন লিখতে লিখতেই হিট চরিত্র ফ্যাতাড়ু। ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরছিলাম। ভাবছিলাম নবারুণের সাহিত্য ধারা নিয়ে। ব্যক্তিমানুষ নবারুণ নিয়ে। বাংলা সাহিত্য, বিশ্ব সাহিত্য নিয়ে কত আড্ডাই তো হয়েছে।

 

  – কাট –

                                                                                                   দৃশ্য – ৮

সেই ২০০২ সাল। ভাষাবন্ধন স্টলে হঠাৎ ধাক্কাধাক্কি। বই পড়ে গেল। তুলে দিতে গিয়ে আলাপ। এটা ওটা সেটার পরই অমিয়ভূষণের প্রসঙ্গ। ব্যস ‘দোস্তি’র শুরু। ‘দোস্তি’ শব্দটা নিজেই ব্যবহার করেছিলেন। ‘এরকম একটা গ্রাউন্ড-এ দোস্তি হতেই পারে।’ খুব দুর্বলতা ছিল শব্দটার ওপর। ২০০২-২০১৪ সাল। দীর্ঘ ১২ বছরের প্রথম দিকে বিক্ষিপ্ত যোগাযোগ, ফোনাফুনি। শেষের কয়েক বছরে প্রায় টানাটানি।

 – মিক্স / মন্তাজ –

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনটাকে আমি কয়েকটা ভাগে ভাগ করি। (এক) হারবার্ট মাইলস্টোনের আগের কালে নবারুণ (দুই) খেলনা নগরের নবারুণ (তিন) ফ্যাতাড়ুর নবারুণ (চার) পুরন্দর ভাটের নবারুণ (পাঁচ) এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়/বুলেটপ্রুফ কবিতার নবারুণ।

তবে এই ভাগগুলোতে সময়কাল মানা হয়নি। প্রত্যেকটার আলাদা আলাদা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে নবারুণ থেকে যাবেন বহুকাল। শুধুই প্রতিবাদী লেখক হিসাবে দেখতে আমার আপত্তি আছে। একজন লেখকের হাজারো অভিমুখ থাকে। নানা কর্ম নিয়ে নানাসময় কাজ করতে করতে নবারুণ ভট্টাচার্য বাংলা সাহিত্যে কমলকুমার, অমিয়ভূষণের মতন স্বতন্ত্র ধারার জন্ম দিয়ে গিয়েছিলেন যার বীজ কোথায় যেন সেই নবান্নর আস্তাকুঁড়েই বাঁধা ছিল। রূপান্তর ঘটেছিল নানারকম। কিন্তু নবারুণ ভট্টাচার্যকে আমার মনে হয়েছিল সেই চল্লিশের দশকের বাংলা বামপন্থী আন্দোলনের কান্ডারি আই.পি.টিএ বা পরিচয় গোষ্ঠীর সার্থক উত্তরসুরী। যাদের মহত্ত্ব, ঐতিহ্য, চেতনা, মানবিকতা অন্য অনেককে পেছনে ফেলে দেয়। এবং এইভাবে ফেলতে পেরেছিলেন নবারুণ। চূড়ান্ত আড্ডাবাজ, চূড়ান্ত পড়ুয়া হওয়া সত্ত্বেও ‘ডগমা’হীন ব্যবহার তাকে ‘কমন পিউপিল’ এর কাছের কমন মানুষ করে তুলেছিল, যেটা প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের কাছে ‘মোস্ট আনকমন ফ্যাক্টর’। শব্দ ব্যবহারে কমন পিউপিলের কমন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহারের কারিগরিতে সাহিত্যকে ভেরি আনকমনও করেছিলেন। সহ্য করা কষ্টকর হয়েছিল আগমার্কা সাহিত্য সেবকদের। ফলে এই অন্যরকম সাহিত্যকে হয় ছাপ মেরেছে ‘দ্রোহসাহিত্য’-এর এবং কেউ আবার বলেছেন – এটি একমাত্র সঠিক প্রতিবাদীধারা যার মধ্যে নো কমপ্রোমাইজের পাশাপাশি আছে নেকেড সোসাইটির ‘ন্যুডিটি’র প্রতি ‘নগ্ন-বিদ্বেষ।’ নগ্ন বিদ্বেষসূচক শব্দতালিকার ব্যবহারে নবারুণের স্টাইলকে কেউ অতিক্রম করতে পারেননি বা চেষ্টাও করেননি আগে। তাই নবারুণ ভট্টাচার্যের সাহিত্য আমার মতে বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র ধারা যেটা করার খুব ইচ্ছা ছিল মনে মনে। নানা আলোচনায় সেটা স্পষ্ট হয়েছে বার বার।

 

 – কাট –

                                                                                                  দৃশ্য – ৯

যাদবপুরের ৮-বি বাসস্ট্যান্ডের কাছে দেখা হওয়ার কথা। রাশিয়ান কম্পোজার চাইকভস্কির একটা কম্পোজিশেন-এর তথ্য দেওয়ার কথা। (সিডি সমেত)।

আদান প্রদানের পর একথা-সেকথা থেকে আসল ‘ঋত্বিক দর্শন’। ভীষণ দুর্বলতা ছিল ঋত্বিক ঘটকের প্রতি। কমলেশ্বরের মেঘে ঢাকা তারা ছবিটা দেখার কথা বলতেই বললেন –

– ‘জানিস প্রথম দিন গিয়ে কিচ্ছু দেখতে পারলাম না। শুধু কেঁদেছি। সুবর্ণরেখার শুটিং-এর সময় ঋত্বিক এর সাথে গেছিলাম দেখতে। নানা কথা মনে পড়ছিল। সেই শুটিং, একথা-সেকথা হচ্ছে। এমন সময় সংস্কৃতির ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ তোলায় ঋত্বিক একটা কথা খুব সুন্দর বুঝিয়েছিল – নদীমাতৃক সভ্যতার ইতিহাস বহু প্রাচীন। এই প্রাচীন ঐতিহ্যের ইতিহাস চার/পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস। এতে নানা বিশ্বাস অবিশ্বাস, নানা বিজ্ঞান-অপবিজ্ঞান – নানা ধরনের ব্যাপার জড়িয়ে আছে। একজন শিল্পীর কাছে কোন কিছুই ফেলনা নয়। সবটাই তার কাছে এলিমেন্ট। সবই তার কাছে সাবজেক্ট।

– ক্লোজ আপ –

বলতে বলতে দুটো চোখ জলে ভরে উঠতে দেখেছিলাম। এই একটা তথ্যে কত বড় সত্যকে উদ্‌ঘাটন করেছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিজে সেটা মেনেও ছিলেন। সারাজীবন। তাই নানা ‘অতিপ্রাকৃত ঘটনা’ বা স্বপ্নের বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় বলতেন – সব এলিমেন্ট লিটারেচার-এ ব্যবহার কর। এর পেছনে পড়তে যাস না। ওটা তোর কাজ নয়।

 

– কাট –

                                                                                              দৃশ্য – ১০

শ্রীনগর থেকে পহেলগাঁও যাচ্ছি। নবারুণদার ফোন।

– হ্যাঁরে পহেলগাঁওতে নাকি’রে? (জানতেন আমি কাশ্মীরে। বহুবার ফোন করেছেন কুশল সংবাদ নিয়ে)

– বলুন।

– হ্যাঁরে? এতো শালা, পাগল করে দিলরে।

[কয়েকদিন আগে সেবাস্টিয়ান বাখের ব্র্যান্ডনবুর্গ কনচেরতো ১-৬ দিয়েছিলাম]

– দারুন লাগবেই তো জানতাম।

– ওরে ব্বাবা, দারুন মানে নিদারুণ। বাবার কাছে খুব ভাল কালেকশন ছিল তখন শুনেছি। একেবারে নতজানু হয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে এদের কাছে। কবে আসছিস বল? পরদিন বিঠোফেনের ‘মুন লাইট সোনাটা’টা নিয়ে আসিস কিন্তু। আর কি খবর বল? (বলে অন্যান্য আলোচনা শুরু করলেন। সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না)

 

    – কাট –

সত্যি, সত্যি মেরা এক আসলি দোস্ত চলা গ্যয়া।

জিসকে পাস বইঠনে সে আলাগ কুছ মিলতা হ্যায়, হর সময় পর। তাই তার ভাষায় – ‘নতজানু হয়ে বসে থাকা যায়’ অনেক কিছু শোনার জন্য, বোঝার জন্য, লেখার জটিলতা সমাধানের জন্য।

‘রিয়েলি ও চলা গয়া

দূর গগন ছাঁও মে

জিসকে পাশ সব থে

ঔর মেরে পাশ কুছ নেহি থা

লেকিন দোস্তি বন্‌ গ্যয়া।’

সত্যি বলছি, সাধুসঙ্গ করার মতো সাহিত্যিক সঙ্গ করার নেশায় ঘুরতে ঘুরতে পথের মাঝে এক ‘দোস্ত’-এর দেখা পেয়েছিলাম। সে ছিল ‘রিয়েলি বৌদ্ধিক’, ‘রিয়েলি বাপের বেটা’, ‘রিয়েল পাঠক’ যার কাছে বয়স কোন ফ্যাক্টর হয়নি। খ্যাতি মাপকাঠির সীমানা দিয়ে দূরত্ব তৈরি করেনি – ফলে আমি কেমন করে যেন হয়ে উঠেছিলাম তার কনীয়ান বন্ধুদের একজন। যাঁর কাছে অনেক কিছু শিখতে যেতাম। –

যাঁর চলে যাওয়ায় অনেক বুঝতে না পারা বিষয় বুঝতে অসুবিধা হবে খুব। –

রিয়েলি, ও চলা গ্যয়া –

আর যার একগোছা কেউ কখনও ছিঁড়তে পারে নি।

 

……………………

লেখাটি ইতিপূর্বে ‘লোকায়ত’ পত্রিকায় প্রকাশিত। লেখকের অনুমতিতে ‘গল্পের সময়’-এ প্রকাশিত হল।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ