16 Oct

ওল্ড ইজ নট গোল্ড

লিখেছেন:ত্রিদিবেশ বন্দ্যোপাধ্যায়


আরে ছ্যা ছ্যা ছ্যা। আজকালকার এগুলি কি গান! কোথায় গেল সেই বাংলা গানের স্বর্ণযুগ! হেমন্ত, মান্না, সতীনাথ, ধনঞ্জয়……। কতনাম করব! সেই স্বর্ণযুগের গান শুনে যারা বড় হয়েছেন তাঁদের কাছে আজকের এই জীবনমুখী গান বা ব্যান্ডের বীভৎস চিৎকার বিভীষিকা বই কি! বর্তমান লেখকও সেই দলে।

শুধু গান কেন? ট্রেনে বাসে, পাড়ার রকে, পারিবারিক আড্ডায়, মফঃস্বলের রেল প্লাটফর্মে, বৃদ্ধদের মজলিশে কান পাতলে শোনা যায় একই সুর। আজকালকার ফুটবল? কবেই দেখা ছেড়েছি।আজকাল কার সাহিত্য? আলোচনা করতে লজ্জা করে। সিনেমা যাত্রার সেলুলয়েড ভার্সান।রাজনীতি- কিছু বলার অপেক্ষা রাখে? আজকালকার ছেলেপুলে মানে ইয়ং জেনারেশান? সব সমাজের বিষফোঁড়া। ডাক্তার নোবল প্রফেশানের লজ্জা,শিক্ষক ব্যবসায়ী, এমনকি এখনকার ফুলকপিতে স্বাদ নেই, নলেনগুড়ে গন্ধ নেই। আর তালিকা দীর্ঘ করে লাভ নেই। আমার মত সূর্য যাদের পশ্চিমে ঢলেছে এসব তাঁদের সকলেরই মনের কথা। শুধু হায় হায়, শুধু হাহাকার। কাঁহা গ্যায়েঁ ও দিন!

ছেলেবেলার সাথীদের সঙ্গে কদাচিৎ যখন বৈঠকের সুযোগ ঘটে ঘুরে ফিরে আমরা পুরনোদিনের আলোচনায় মশগুল হই, সে সব সোনার দিন গুলো আমাদের স্মৃতিমেদুর করে তোলে।আমাদের বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে, সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হয়ে যায় অজিতেশকে নিয়ে, মারীচ সংবাদ, জগন্নাথকে নিয়ে। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল নিয়ে। ভুবন সোম, অরণ্যের দিনরাত্রি, শ্যাম বেনেগাল নিয়ে।

তবে মাঝে মধ্যে ধন্দ লাগে। সোনার দিন কোন গুলো? কেউ যখন নঈম, হাবিবের কথা বলে অন্য কেউ প্রতিবাদ করে বলে সোনার ফুটবল ছিল সেই চুনী,পিকের দিন গুলোয়। কেউ আবার ভুল ধরায়- কেন শ্যাম থাপার সেই সোনার গোলটা? তর্ক চলে কোন সময়টা শ্রেষ্ঠ? চুনী, পিকের যুগ নাকি নঈম অথবা শ্যামের যুগ অথবা শিশির যুগ নাকি শম্ভু,উৎপল, অজিতেশের যুগ।

আমাদের গাঁ ছিল সোনার গাঁ। সমবয়সী সবাই বন্ধু ছিল।গাঁয়ের সব বয়স্ক মানুষকেই গুরুজন বলে মনে হত।অপরের ক্ষেতে না বলে মটরশুটি খেলে চোর অপবাদ জুটত না। অথচ বাবার কাছে শুনেছি আমাদের গাঁ নাকি সোনার গাঁ ছিল তাঁদের ছেলেবেলায়। গরমের ছুটিতে দল বেঁধে গঙ্গায় চান করতে যাওয়া ছিল। সাঁতার কেটে এপার-ওপার জল ভাত ছিল। ওপারে গঙ্গার চরে ভাল তরমুজ চাষ হত।তখন কার দিনে তরমুজ এখনকার মত নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির জন্যে তৈরী হতোনা, এই বড় বড় ।ওপারের বন্ধুদের ক্ষেত থেকে একটা করে তরমুজ পাওয়া যেত। সেই তরমুজ ভাসিয়ে সাঁতার কেটে আবার বাড়ি ফিরে আসা।কিন্তু সে গ্রাম কবেই ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংস হতে নাকি শুরু হয়েছিল বেয়াল্লিশের দুর্ভিক্ষে তারপর তা সম্পূর্ন হয়েছিল দেশ ভাগে। আমার ধন্দ লাগে আমরাও তো সেই সোনার গাঁয়ে বড় হয়েছি- সে কি তাহলে নকল সোনা? অজিতেশ বাবাকে স্পর্শ করতে পারত না। বাবার স্মৃতি তোলপাড় করত অহিন চৌধুরী, শিশির ভাদুড়ী।

বৃদ্ধ জ্যাঠামশাইকে বলতে শুনেছি, ‘হ্যাঁ উত্তম ছোকরা মন্দ করে না, তবে ছবি ছিল আমাদের সময়ে। শেষ উত্তর ছবিতে বড়ুয়া সাহেব ট্রেন থেকে ভোর বেলা আসছে।কাননবালা শুদ্ধ কাপড় পরে সাজি হাতে ফুল তুলছে-গান গাইতে গাইতে। -ও কেন গেল চলে কথাটি নাহি বলে। বড়ুয়া সাহেব গান শুনে ঘুরে দাঁড়ালেন’। ওঃ সে সব কী ছবি। আমি হাসি চাপতে পারিনা বলি- জ্যাঠামশাই আপনাকে আমি দু একটা এখনকার ছবি দেখাব। তা হলে আপনি বুঝতে পারবেন।

জ্যাঠামশাই আমার প্রস্তাব বাতিল করে দেন- তিনি এই ধারনা নিয়েই গেছেন যে সিনেমার উৎকর্ষ তাঁদের সময়েই তাঁদের সময়েই দেখা গিয়েছিল।এখনকার সব তো অসভ্যতা। এই বয়সে পৌঁছে আমারও কখনও কখনও মনে হয় এখনকার ছবি অসভ্যতার চূড়ান্ত। ছবি ছিল আমাদের সময়ে। সে সব কী ছবি!

আরেকদিনের কথা মনে পড়ে। জ্যাঠামশাই তখন প্রায় অন্ধ।জরা তাকে গ্রাস করে ফেলেছে।মানসিক ভাবেও প্রায় অশক্ত।কোন কিছুতেই আর তাঁর কিছু  যায় আসে না। তবু পুরনো দিনের কথা আর পুরোন দিনের গান শুনলে তাঁর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এমনই এক দুপুর সাড়ে বারোটায় রেডিওতে গান হচ্ছে- ‘ঐ মহাসিন্ধুর ওপার হতে কী সঙ্গীত ভেসে আসে’। জ্যাঠামশাই ধীরে ধীরে দেওয়াল ধরে ধরে এগিয়ে গিয়ে রেডিওর কাছে দাঁড়ান। খুশিতে তাঁর চোখ দুটো চক চক করছে।– আহা – কী গান। গান শেষ হতে ঘোষকের কন্ঠে শোনা গেল – এতক্ষন আপনারা দ্বীজেন্দ্রগীতি শুনলেন মান্নাদের কন্ঠে। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার, ‘তাই বলি, কৃষ্ণচন্দ্রের গলা এমন খ্যান খ্যানে লাগছে কেন? মান্না দে গাইছে। ওঃ গান খানা একেবারে মাটি করে দিয়েছে’।আমার অবাক লাগে।কারণ আমাদের সোনালী দিনের গায়ক মান্না দে। তাহলে তা কি নকল সোনা?

প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়ে আমি একটা পার্কে কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষের পাশে বসি। নিঃসঙ্গ মানুষদের আলাপচারিতা শুনি।তাদের কৃতি সন্তানরা কেউ প্রবাসে কেউ বিদেশে, যে যার কর্মস্থলে ব্যস্ত। যোগাযোগের কল্যাণে তাঁরা পুত্র-কন্যা, নাতি-নাতনিদের কন্ঠস্বর থেকে অবশ্য বঞ্চিত নন। এই বৃদ্ধ মানুষরা সকাল সন্ধ্যে একে অপরকে  আঁকড়ে ধরে সময় কাটান।সুখ দুঃখের কথা বলেন। সুখ মানেই অতীত,বর্তমান শুধুই দুঃখের,ভবিষ্যৎ গভীর অন্ধকার। তাঁরা আলোচনা করেন সেই বৃদ্ধের কথা যাঁকে হাসপাতাল থেকে ছুটি হয়ে গেলেও বাড়ির লোকেরা নিতে আসেনি। বৃদ্ধ অভিমানে হাসপাতালের ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে সমাধান খুঁজেছেন। অথবা সেই বৃদ্ধ বৃদ্ধার কথা যারা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন পুত্র, পুত্রবধু এবং একমাত্র পৌত্রের সঙ্গে থাকার দাবিতে। বৃদ্ধ অবসর প্রাপ্ত চীফ ইঞ্জিনীয়ার, পুত্র বিমানচালক। তাঁদের ঘরে অর্থের প্রাচুর্য, বেদনারও।

পৃথিবী কি বৃদ্ধ হয়ে আসছে? আমাদের যা কিছু উৎকৃষ্ট তা কি অতীত হয়ে গেল? নাকি আমাদের দৃষ্টিটাই সোনালী থেকে রূপালি, রূপালি থেকে তামাটে হয়ে যায়? আমি গোলক ধাঁধায় পথ হারাই, উত্তর খুঁজি এখানে ওখানে।হঠাৎ মনে পড়ে সিধু জ্যাঠার কথা, যে কোনও প্রশ্নের উত্তর তাঁর ঠোটের ডগায়। প্রয়োজনে বহু পুরনো ঢাউস কাঠের আলমারি থেকে ঠিক বইটি বার করে এনে দেবেন প্রমাণ।

এক কুয়াশা ঢাকা সন্ধ্যায় গিয়ে হাজির হই সর্দার শঙ্কর রোডে সিধু জ্যাঠার বাড়ি।একটা তক্তাপোশ, দুটো চেয়ার আর ইয়া বড় বড় তিনটে বইয়ের আলমারি ছাড়া ঘরে আর কিছু নেই। তক্তাপোশটার অর্ধেকটা বইয়ে বোঝাই। আমি চেয়ারে বসলাম। সিধু জ্যাঠা নারায়নকে এক কাপ চা দিতে বলে এসে বসলেন অন্যটায়। আমার প্রশ্ন শুনে মিটিমিটি হেসে একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, ঐ বৃদ্ধ মানুষদের কথা শুনে বড় দুঃখ হয়। আমি তো ওদের থেকেও বৃদ্ধ।তাই ওদের ব্যাথা আমি বুঝি। তবে কি জান ভাই দোষ ওদের ছেলে মেয়েদের নয়, বর্তমান যুগেরও নয়, দোষ বার্ধক্যের।

-বলেন কি? আগেকার কালে ছেলে মেয়েরা বাবা মা কে অনেক বেশি শ্রদ্ধা সেবা করত না? আমি প্রশ্ন করি।

দেখ, ছেলে মেয়েরা বাবা মাকে কতখানি ভক্তি শ্রদ্ধা করত তা তো ইতিহাসে লেখা নেই। তাই সাক্ষ্য খুঁজতে হবে সাহিত্যের পাতায়।সে যুগে সমাজে কী কী হোতো তাঁর সাক্ষী দেবে সে যুগের সাহিত্য। চল আমরা যাই রামায়নের পাতায়।শ্রবণ কুমারের গল্পটা স্মরণ করা যাক।পিতৃমাতৃ ভক্তির এক অনুপম কাহিনী।– আচ্ছা আমি যদি প্রশ্ন করি এই গল্পটা এত যত্ন করে পরিবেশন করার উদ্দেশ্য কী? আমি চুপ করে থাকি।সিধু জ্যাঠা মিট মিট করে হাসেন।আমার মনে পড়ে হেমিংওয়ের সে বৃদ্ধ মানুষটার কথা। Everything was old except his eyes and they were the same colour as the sea and were cheerful and undefeated।

আমি যদি বলি সমাজকে পিতৃমাতৃভক্ত করার জন্যই এই প্রয়াস? অর্থাৎরামায়নের কালেও সকলে পিতৃমাতৃভক্ত হোত না। যেমন এখনও হয়না। এখনও সকলে পিতামাতাকে অভক্তি করেনা, সেদিনও করত না।মানুষ যাতে পিতৃমাতৃ ভক্ত হয় সে জন্যই রামায়ণকার এই কাহিনী লিখেছেন।

সিধু জ্যাঠার এই রকম একটা বাউন্সার কী করে খেলব ভাবছি তখনই তিনি বলে উঠলেন, ‘ও রামায়ণের সাক্ষ্য পছন্দ হলনা তো? না হবারই কথা। তোমরা তো একদল রামকে ভগবান বানিয়ে দিয়েছ, আর অন্যদল রামের নাম শুনলে অন্য দিকে মুখ ফেরাচ্ছ।আমার তো মনে হয় রামায়ণকে উৎকৃষ্ট সাহিত্য হিসাবেই নেওয়া উচিৎ যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনোরঞ্জন করেছে এবং সৎ শিক্ষা দিয়েছে। থাকগে তুমি তো দ্বিতীয় দলের মানুষ ফলে রামায়ণের কথা তোমার পছন্দ হচ্ছে না। তোমাকে অন্য একটা উদাহারণ দিই। রামায়ণের যুগ থেকে অনেক এগিয়ে মাত্র দেড়শ বছর আগে। তুমি ঐ দ্বিতীয় আলমারিটা খোল তো। হ্যাঁ, একদম নিচের তাকে, হ্যাঁ ডানদিকে ঐ নীল মলাটের বইটা। হ্যাঁ দাও। তোমাকে এখান থেকে একটু পড়ে শোনাই।

“পঞ্চাশোর্ধে বনং ব্রজেৎ।এ কোন গন্ড মূর্খের কথা। আবার বন কোথা? এ বয়সে এই অট্টালিকাময়ী লোকপূর্ণা আপনী সমাকুলা নগরীই বন। কেননা হে বর্ষীয়ান পাঠক! তোমার আমার সঙ্গে আর ইহার মধ্যে কাহারও সহৃদয়তা নাই। বিপদ কালে কেহ কেহ আসিয়া বলিতে পারে যে, বুড়া! তুমি অনেক দেখিয়াছ, এ বিপদে কী করিব বলিয়া দাও- কিন্তু সম্পদ কালে কেহই বলিবে না, বুড়া! আজি আমার আনন্দের দিন, তুমি আসিয়া আমাদিগের উৎসব বৃদ্ধি কর।বরং আমোদ আহ্লাদ কালে বলিবে, দেখ ভাই যেন বুড়া বেটা জানিতে পারে।আর অরণ্যের বাকি কি?

যেখানে আগে ভালবাসার প্রত্যাশা করিতে, এখন তুমি কেবল ভয় বা ভক্তির পাত্র। যে পুত্র তোমার যৌবনকালে, তাহার শৈশবকালে তোমার সহিত এক শয্যায় শয়ন করিয়াও, অর্ধনিদ্রিত  অবস্থাতেই ক্ষুদ্র হস্ত প্রসারিত করিয়া তোমার অনুসন্ধান করিত সে এখন লোকমুখে সংবাদ লয় পিতা কেমন আছেন”।

-সিধু জ্যাঠা বই থেকে মুখ তুলে মিটিমিটি হাসলেন।

-আমি বললাম, বঙ্কিমচন্দ্র- কমলাকান্ত।

– রাইট। এ লেখা তোমরা সকলেই পড়েছ। আমি শুধু মনে করিয়ে দিলাম।আমরা কি এখান থেকে সিদ্ধান্ত করতে পারিনা যে সে যুগেও পিতারা বৃদ্ধবয়সে নিঃসঙ্গ হতেন? পুত্ররা লোকমুখে পিতার সংবাদ নিত? মনে হয় যৌবনকালটাই অভিশপ্ত। যুগে যুগে যুবকেরা বৃদ্ধদের অভিযোগের শিকার হয়েছে। যুবকেরা বৃদ্ধ হয়েছে, আবার পরবর্তী প্রজন্মকে অভিযুক্ত করেছে। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

আমি আলোচনাটা অন্যদিকে নিয়ে যাই।–আজকের শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, সিনেমা, খেলাধুলা-

দেখ- সিধু জ্যাঠা বলেন, সর্বকালে সর্বদেশে এ জিনিসটা দেখা যায়।কখনও শিল্প সাহিত্যে উৎকর্ষতা কখনও বা বন্ধ্যা যুগ। এ নতুন কিছু নয়। তবে কোনও সৃস্টির সত্যিকারের মুল্যায়ন সমকালে হয়না। তা হয় পরবর্তী যুগে, কখনও বা অনেক পরে। রবীন্দ্রনাথ যে সময়ে গান লিখছেন সেই সময়কার সঙ্গীত বোদ্ধারা, যারা কালোয়াতি গান শুনতে অভ্যস্ত ছিলেন তাঁরা রবিবাবুর গানকে পছন্দ তো করেনই নি, ঐ গানকে সঙ্গীতের মর্যাদাই দিতে চাননি। পঞ্চাশের দশকে সলিল চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি গানের ভেতর দিয়ে রাজনৈতিক প্রচার চালাচ্ছেন। সুমন নচিকেতাও প্রথম দিকে ভীষণ সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। পরবর্তী কালে এইসব স্রষ্টা জয়মাল্য পেয়েছেন। দাঁড়াও তোমাকে একটা কবিতার কয়েকটা শোনাই। খুব চেনা কবিতা , আমার কৈফিয়ত- কাজীসাহেব।

বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’           

 কবি ও অকবি যাহা বল মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি।   

কেহ বলে, তুমি ভবিষ্যতে যে                           

 ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে।                        

যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে বাণী কই,কবি?           

দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী।              

 কবি বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা পড়ে শ্বাস ফেলে            

বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাঁশ ঠেলে।

তার মানে কাজী সাহেবের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ছিল যে তাঁর কবিতা ভবিষ্যতে টিকে থাকবে না।কিন্তু তা ত সত্যি হয়নি।কবিতাটিতে কাজীসাহেব তাঁর বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ তোলা হত সব লিখেছেন। যেমন-কবিতায় পলিটিক্স থাকার জন্য বন্ধুরা হতাশ।হিন্দুরা বলেছেন যবন, স্বধর্মীরা কাফের। নন ভায়োলেন্টরা বলেছেন ভায়োলেন্সের ভায়োলিন, কেউ বলেছেন যুগের নয় হুজুকের কবি, কেউ বা হাফ নেতা, আরও কতক কী! শেষে জবাবও দিয়েছেন কবি।

বন্ধু গো, আর বলিতে পারিনা বড় বিষ জ্বালা এই বুকে          

দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি তাই যাহা আসে কই মুখে                

 রক্ত ঝরাতে পারিনা তো একা তাই লিখে যাই এ রক্ত লেখা       

 বড় কথা বড় ভাব আসে নাক মাথায় বন্ধু বড় দুখে           

অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু যাহারা আছ সুখে।  

একটু মন দিয়ে যদি দেখ দেখবে আজকের যুগের নতুন কবি গায়কদের বিরুদ্ধেও একই অ্ভিযোগ।সব হুজুকের কবিতা হুজুকের গান। সুতরাং কে বলতে পারে আজকের নিন্দিত সৃস্টি একদিন নন্দিত হবে না? উদাহারণ বাড়িয়ে লাভ নেই।শুধু সত্যজিতের কথা না বললে বিষয়টা অসম্পূর্ণ থাকবে। ভাব তো কী অভ্যর্থনা তিনি পেয়েছিলেন প্রথম দিকে? সেদিন কেউ তাকে বুঝতে পারেনি, গ্রহণ করতে পারেনি। অথচ তাঁর হাত ধরেই ভারতীয় সিনেমা সাবালক হল।

-তাহলে কি আপনি মনে করেন যে সমসাম্যিক কালে শিল্পের যে সমালোচনা হয় তা যথার্থ নয়? অথবা সমকালে কি শিল্পের সমালোচনা হওয়াই উচিৎ নয়?

– দেখ, এত বড় কথা আমি বলতে চাইনা। সমালোচনা হবে কিন্তু তা কখনই শেষ কথা নয়। শেষ কথা বলবে মহাকাল। এস আমরা একটু বড় ক্যানভাসে চলে যাই। যে যুগটার জন্যে বাঙালি জাতি গর্ব করে সেই নবজাগরণের যুগকে আমরা কবে চিনলাম? নবজাগরণের নায়করা, রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষের মতো কাজ করে চলে গেছেন। কেউ তাদের নবজাগরণের নায়ক বলে চিনতে পারেনি।সমকালে তাঁদের ভাগ্যে কুৎসাও কম জোটেনি। ডঃ সুশোভন সরকার ১৯৪৫ সালে বাংলার নবজাগরণ বা রেনেসাঁ কথাটা ব্যবহার করেছেন। এর আগে   বঙ্কিমচন্দ্র চৈতন্যদেবের সময় কে নবজাগরণের যুগ বলে চিহ্নিত করেছিলেন যেটা সাধারণ ভাবে গৃহীত হয়নি বললেই চলে।অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্র নিজেকেই চিনতে পারেননি যে তিনিই একদিন বেঙ্গল রেনেসাঁর একজন স্থপতি বলে বন্দিত হবেন। সুতরাং বিচার থাক কালের হাতে।আমরা বিচারক হতে গেলে ভুল হবার সম্ভাবনাই বেশি। আমরা বরং রসিক হই। রসিক মানুষকে রক্ষণশীলতা ত্যাগ করতে হবে। নতুন কিছু আগ্রহ করে শুনতে হবে, পড়তে হবে।রসগ্রহণ করার চেষ্টা করতে হবে। না করতে পারলে তুমি চলে যাবে পিছনের সারিতে। আর তুমি রসগ্রহণ করতে পার আর না পার নতুন সৃস্টি হবেই, নতুন নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা হবেই আর তা থেকেই ভবিষ্যতের ধারা সৃষ্টি হবে। বয়স তো হবেই, শারীরিক ভাবে বৃদ্ধ তো হতেই হবে।কিন্তু চেষ্টা থাকতে হবে মানসিক ভাবে নবীন থাকবার। বার্ধক্যের ধর্মই অতীতচারিতা।বার্ধক্যকে যদি ঠেকাতে চাও সন্ধান কর কোথায় কোথায় নতুন নতুন কী কী ফুল ফুটছে।তাদের সুগন্ধ নেবার জন্যে মনকে উন্মুখ কর। এটা নিশ্চিত জানবে নতুন নতুন ফুল ফুটছেই এবং ফুতবেই চিরকাল। তুমি চোখ বন্ধ করে রাখলে তোমারই ক্ষতি।

আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সিধু জ্যাঠার অনুমতি চাই- এবার তহলে উঠি।

সিধু জ্যাঠার চোখে তখনও আনন্দ।বলেন- দাঁড়াও তোমাকে একটা কবিতা শোনাই।দু হাঁটুতে হাত রেখে সিধু জ্যাঠা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান। তারপর পা টেনে টেনে ঘরের কোণে রাখা আলমারিটা খুলে একটা চটি বই বার করে পাতা  ওল্টাতে ওল্টাতে এগিয়ে আসেন।

এটি একটি অনুবাদ কবিতা, পদাতিক কবি সুভাস মুখপাধ্যায়ের। মুল কবিতা সংগ্রামী কবি নাজিম হিকমত এর, জেলখানার চিঠি।

………যে সমুদ্র সব থেকে সুন্দর

                    তা আজও আমি দেখিনি

                সব থকে সুন্দর শিশু আজও বেড়ে ওঠেনি

                  মধুরতম যে কথা আমি বলতে চাই

                  তা আজও আমার বলা হয়নি’’।

বিশ্বাস কর, আমি এখনও সেই সব থেকে সুন্দর সমুদ্র দেখার আশায় বসে আছি।সিধু জ্যাঠার চোখে তখন সমুদ্রের নীল।

বিদায় নিয়ে আমি পথে নামি। কুয়াশা কেটে গিয়ে তখন আকাশে ঝকঝকে চাঁদ।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ