29 Dec

আসল টেনিদার গল্প

লিখেছেন:দেবরাজ গোস্বামী


ডি লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফেলিস… ইয়াক ইয়াক । প্যালা, হাবুল, ক্যাবলা আর গড়ের মাঠে গোরা ঠ্যাঙ্গানো পটলডাঙ্গার অবিসংবাদিত লিডার ভজহরি মুখুজ্জে ওরফে টেনিদাকে কে না চেনে । এক চড়ে তিনি প্যালার নাক নাসিকে অথবা ক্যাবলার কান কানপুরে পাঠাতে পারেন । ডুয়ার্স হোক বা ঝন্টিপাহাড়ী, চন্দ্রকান্ত নাকেশ্বর বা স্বামী ঘুটঘুটানন্দ, চারমূর্তির বীরত্বের সামনে সকলের অবস্থাই যাকে বলে ‘পুঁদিচ্চেরি’। আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগে সেই ইস্কুলের ছাত্রাবস্থায় প্রথম পড়েছিলাম এদের কথা। ব্যাস আর কোনদিন ভুলতে পারিনি ।  এইবার বলি সেই আসল টেনিদাকে নিয়ে একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প । ছোটবেলায় পটলডাঙ্গায় আসল টেনিদার সঙ্গে দেখা করবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার ।
আমার বাবার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু অজিতকাকা থাকতেন পটলডাঙ্গায় । সেই সুত্রে একদম ছোটবেলা থেকেই আমার ওই পাড়ায় যাতায়াত ছিল । তখন অবিশ্যি গল্পের বই পড়া শুরু করিনি , ফলে টেনিদার নামও জানতাম না । যখন একটু বড় হলাম , ইস্কুলে ভর্তি হলাম, তখন গল্পের বইয়ের নেশা ধরল । পরিচয় হল টেনিদা, হাবুল, ক্যাবলা এবং প্যালার সঙ্গে । বছর বত্রিশ আগে সম্ভবত ১৯৮৫ অথবা ৮৬ সালের কথা, তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। একবার পটলডাঙ্গায় অজিতকাকুর বাড়িতে বেড়াতে গেছি,  কথায় কথায় প্রশ্ন করে বসলাম ‘আচ্ছা টেনিদার বাড়িটা কোথায় ?’ আমি তখনও জানতাম না যে টেনিদা বলে সত্যিই কেউ আছেন ।  আমার প্রশ্নের উত্তরে অজিতকাকুই প্রথম বললেন  যে পটলডাঙ্গায় সত্যিই টেনিদা আছেন এবং লেখক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁরই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন একদা । আমি তৎক্ষণাৎ আবদার করে বসলাম আসল টেনিদার সঙ্গে দেখা করবো ।
অজিতকাকুর ছেলে পার্থ টেনিদার বাড়িটা আমাদের দেখিয়ে দিয়েই কেটে পড়ল । অগত্যা আমি আর বাবা ভেতরে ঢুকে পড়লাম । একতলাটা বেজায় অন্ধকার । একটা ঘর পেরিয়ে সামনে উঠোন। সেখানে চৌবাচ্চা থেকে জল তুলছে একটা হিন্দুস্তানি চাকর । বাবা তাকে জিজ্ঞেস করলো ‘এখানে টেনিদা কোথায় থাকেন’? চাকরটা কিছুক্ষন অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল ‘টেনিদা ! ইয়ে নামকা কোই নেহি রহতা হ্যায় ইধার’। যাচ্চলে। ! এখন আমরা কি করব ?  ঠিক সেই সময় একটি বছর পঁচিশের ছেলে বাড়িতে ঢুকছিল । সে আমাদের দেখে এগিয়ে এসে জানতে চাইল ‘কাকে খুঁজছেন’? আমরা কিছু বলার আগেই  হিন্দুস্তানি চাকরটা বলে উঠলো ‘আরে ইয়ে লোগ কোই টেনিদাকো ঢুঁড় রাহা হ্যায়, ম্যায় বোলা ইধার কোই নেহি হ্যায় ইস নাম কা , নেহি শুনতা হ্যায়’। ছেলেটা একটু হেসে বলল ‘ও তুমি টেনিদাকে দেখতে এসেছ, দাঁড়াও’। এবার সে হাঁক দিল ‘বড় জ্যেঠু , তোমার সঙ্গে কারা দেখা করতে এসেছেন দেখো’- তারপরেই দোতলা থেকে জ্যেঠুর গলা পেলাম ‘ওপরে পাঠিয়ে দে’। উঠোন থেকেই খোলা সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে । উঠতে উঠতেই শুনতে পেলাম চাকরটা বলছে ‘হায় রাম,বড়া বাবুকা নাম টেনিদা হ্যায় ইয়ে তো মুঝে মালুম হি নেহি থা !
দোতলায় পৌঁছতেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সৌম্যদর্শন ছিপছিপে চেহারার এক বয়স্ক মানুষ। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা । মাথায় হাল্কা চুলের সবটাই সাদা। আর পেল্লায় খাঁড়ার মত নাক । আসল টেনিদা ! বাবা বলল ‘আপনার গল্প পড়ে আমার ছেলে আপনাকে দেখতে এসেছে’। আমি ওঁকে প্রণাম করতেই আমার হাত ধরে উনি কাছে টেনে নিলেন, তারপর নিজের নাকটা দেখিয়ে বললেন ‘ভাল করে দেখোতো দাদুভাই , নাকটা মিলছে, গল্পের সঙ্গে’? তারপর জানতে চাইলেন কি কি গল্প পড়েছি, কোন ক্লাসে পড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি। ফেরার সময় বললেন ‘একদিন হাতে কিছুটা সময় নিয়ে এসো, অনেক গল্প আছে, সব বলবো । আমি আনন্দে নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে এলাম । পরদিন ইস্কুলে বন্ধুদের কাছে গল্প করতে প্রথমে তো তারা বিশ্বাসই করতে চায় না । তারপরে এটা জিজ্ঞেস করলিনা কেন, ওটা জিজ্ঞেস করলিনা কেন এইসব বলে আমাকে প্রায় পাগল করে দিল । আমি বললাম পরেরবার যখন পটলডাঙ্গায় যাব তখন আসল টেনিদাকে সব জিজ্ঞেস করে আসবো ।
সেই পরের বার আর এল না , আর যাওয়া হয়ে উঠলো না টেনিদার বাড়ি । মাঝখান থেকে আমিই ধাঁ করে কিভাবে জানি বড় হয়ে গেলাম ।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ