28 Feb

একটা ভাট গাছ ,কালুয়া আর ….

লিখেছেন:শ্রীকান্ত অধিকারী


আমি খুব খুশি ।গতকাল রাতে ওর মেসেজ পেয়েছি । ও ছুটি পেয়েছে ।আসছে ।ও আমার কাছে আসছে । আমি যখন এইসব ভাবনার জালে জড়িয়ে পড়ছি তখন এক চিলতে হলদে রোদ্দুর আমার ঘুমঘোর মুখ ছুঁয়ে বলে , ওঠ-ওঠ । অনেক ঘুমোলে । এবার ওখানে  চল । বসে বসে আলো বাতাস দেখবে।তারপর দেখতে দেখতে আকাশ-পাতাল  যা খুশি ভাববে।

আমি বললাম , হ্যাঁ এবার তুমি বলবে , – জানলা খোল । সিল্কি পর্দা সরাও । বড় বড় চোখ কর ।ওই গাছটার নিচে গিয়ে বস । তারপর এদিক ওদিক চাও ।কখনও কখনও দু চোখ মুদে মনের সুখে স্বপ্ন দেখ ।

– আচ্ছা তাই না হয় হল । এবার তো ওঠ ।

আমি বললাম , উঠছি গো উঠছি । নরম বিছানার সুখ ছেড়ে কে উঠতে চাই বল । সবাই তো তোমার মত না । যে সাত তাড়াতাড়ি ওঠার দায় পড়েছে ।

আলসে চোখে আলগা হাতে জানলা খুলে দিলাম । আলতো করে পর্দা সরিয়েও দিলাম । বেরিয়ে পড়ল আমার সেই প্রিয় ভালোবাসা।একটা ভাট গাছ, শীর্ণ তবু মাথায় থোকা থোকা সাদা ভাটফুলের তোড়া ।তার ওপর সুন্দর করে টেনে আনা সবুজ রিবনের মত বনকেঁদুরির লতা । জেগে উঠল প্রেম । উথলে উঠল বুক । ডাক দিল  হৃদয়ে। খানিকক্ষণের মধ্যে সারা শরীরে ভালোলাগার ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল । আমি ভালো হয়ে উঠলাম । শরীর মনে সকালের সুবাস বয়ে গেল।

এখন আমার মন ভালো থাকে। তরতরিয়ে হেতা হোতা যেতে চায়। আর চলেও যায়।তবে আমার তো যাওয়ার তেমন কোন হেতাহোতা নেই। শুধু এই খান। এই ঘর ।এই বিছানা বালিশ ঘড়ি , মেডিসিন টেবিল টুল আর দেয়ালে সাটানো আহ্লাদে  আটখানা পুরুষ মহিলার মুখচ্ছবি। আর ওই যে আমাকে ডাকছে। আমার প্রিয় গাছতলা । ভাটফুল গাছের ছায়াতল । ছোট ছোট ঘাস । ঘাসের ফুল । আর চাদরের মতন ছেয়ে আছে বনকেঁদুরির লতা । তাতে টকটকে সিঁদুররঙা বুনো কেঁদুরি। হোক সে রুগ্ন ,আমার মত মনমরা । তবু সরু সরু শুকনো ডালের ওপর কুঁড়েঘরের চালের মত লতাপাতার জড়ানো আদরে সে তো বেশ থাকে । আমি যখন ওই আশ্রয়ে বসে বসে স্বপ্ন বুনি, মাঝে মাঝে ফালি ফালি রোদও আমার সঙ্গে স্বপ্ন বোনে । লুকোচুরি খেলে । সে যে আমার বড় ভালোবাসা । সে আমার ভালো  বাসা ।

যেদিন থেকে এখানে এসেছি আমার বিষন্নতা নিয়ে , আমি চুপটি করে একলা থেকেছি ।বর্ষার মেঘের মত গুম হয়ে থেকেছি যতক্ষণ  আমার গুমোট থাকতে ইচ্ছে করেছে । জানলা গুলো বন্ধ করে দিয়েছি পাছে বাইরের লোকও আমাকে দেখতে না পাই । এমনকি ফাঁক ফোকরও কাপড় গুঁজে গুঁজে সিল করেছি যাতে কোনও আলো বাতাস এসে আমাকে বিরক্ত না করে ।সেবিকা দিদিরা বার বার জানলাগুলো খুলে দিয়েছে । জোর করে রোদ্দুরকে ঢুকতে দিয়েছে।ভাব জমানোর চেষ্টা করিয়েছে আলো মাটি বাতাস বাগানের । রঙ বাহারি গাছপাতা ফুলের ।অদূরে সবুজ মাঠ , কাঁটাঝোপ ।অল্প অল্প দূরে অনেক উঁচু উঁচু ঘর-বাড়ি বড় বড় চোখ করে  নির্বাক দাঁড়িয়ে  আছে ।  ধীরে ধীরে আর সব্বাইকে ভালো না লাগলেও পুব জানলার ধারে ঐ ছোট্ট গাছতলা আমার মন কেড়েছে । আমি ওকে ভালো বেসেছি দিনদিন ।আমার আর কাউকে দরকার পড়ে না । সকাল হলেই ওকে দেখতে পাই ।কাছে গিয়ে ছুঁতে পারি ।মন খুলে কথা কইতে পারি ।গায়ে আদরের স্পর্শসুখ পাই ।কোন বিরক্তি নেই , অধৈর্য নেই, নেই ছটফটানি কিংবা পালিয়ে যাওয়ার তাড়া। বুঝে গেছি সে আমার । শুধুই আমার ।পর্দার  আস্তরণ সরে যেতেই সে আমার কাছে ধরা দেয় । কিন্ত্ত  এ কি !গায়ে যেন অন্য কারও গন্ধ । এ আমার নারীর তৃতীয়  আর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের মিলিত বিশ্বাস । ভুল হবার নয়। আমি তো নারী । নারীর লালিত ভালোবাসায় এ কার ছোঁয়া ! আর যাই হোক আমি আমার ভালোবাসাকে উচ্ছিষ্ট হতে দিতে  পারি না ।

আমি সতর্ক হলাম । আঁতিপাঁতি খোঁজাখুজি শুরু করতেই বেরিয়ে পড়ল সে । গোটা গা কালো, গলার কাছে পাকা হলুদের বের । দিব্যি কেমন ঘার বেঁকিয়ে একটা ডালে নিজের ডানার নরম পালকে ঠোটজোড়া ঢুকিয়ে সুখ নিচ্ছে । বাহ্! ভারি মজা  না । যা যা ! যা বলছি । ওরে দুষ্টু– আমাকে গ্রাহ্য হয় না ? তবে রে হুস হুস । যা –। তুই এত বদ কেন রে ? কথা শুনিস না ! তবে রে —- ।

আমার ভারি রাগ হয় । ওই পাখিটার ওপরে নয় ,  আমার প্রিয়তমের ওপর । ওইই তো বসতে দিল । যে কেউ আসবে , আর তুই বসতে দিবি ! বারণ করবি না । সব রাগ গিয়ে পড়ল ওটার ওপর । দড়াম করে জানলাবন্ধ করে দিলাম ।  বন্ধ জানলার ধারে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতাম কে জানে ।যদি না আমার সেবিকা দিদি এসে বলতো , নাও জায়গা কর ।  তারপর আমি বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে কোমরের কাপড় সরিয়ে কোমর উন্মুক্ত করে দেব । দিদিমনি তখন ইন্জেকশনের ছুঁচটা আমার শরীরে ঢুকিয়ে যন্ত্রণা দেয়ার চেষ্টা করবে । ওষুধটা সম্পূর্ণ শরীরে ঢোকানো হয়ে গেলে বলবে , লাগলো ? আমি ঠোটের কোণ দুটো ফাঁক করে বলব , না লাগেনি তো । দিদিমনি চলে যাওয়ার আগে হাসি দিয়ে যাবে ।আর আমি তখন যন্ত্রণায় চোখ মুছবো । প্রত্যেক দিন শরীরে সূচ ফোটাতে কার ভালো লাগে বল! ধীরে ধীরে আমার গোটা শরীর এলিয়ে যায় । আমি চোখ বন্ধ করি।

পরদিন সকালে আবার রোদফালিটা আমার চোখে মুখে হাত বুলায় । ডেকে তোলে ,–ওঠ। চল তোমার আশয়ে ।আবার জানলা খুলি । পর্দা সরিয়ে দিতেই সেই আশয় আমাকে হাতছানি দেয় । আলিঙ্গনের জন্য প্রলুব্ধ করে । আমি তৃষ্ঞার্তের মত ঝাঁপিয়ে পড়ি । কিন্ত্ত আবার ! আবার সেই পর লোকের বাস । আমার গা ঘিনঘিন করে ওঠে । আচ্ছা বেবাফা তো । আবার সেই কালো পাখিটাকে ঘরে  এনেছে ! আবার ওর সংগে ওঠা বসা ! সহবাস !– না এবার রাগ হল না । অভিমানে ওই আশয়কে আমি নাম ধরে ডেকে  উঠলাম ,- ওরে শীর্ণ ভাটফুলের ক্ষুদ্র বৃক্ষ , তোর এ কেমন মতি ! আমাতে তোর মন বসে না!

সবুজ লতার আদরে মাখা ভাটফুলের গাছটি দুলে উঠল । না কি কেঁপে উঠল ! আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলাম । দিলাম পর্দা টেনে ।  আর কোনও দিন ওর সঙ্গে কথা বলব না । এই বলে দিলাম ।

খানিক ক্ষণ যেতে না যেতেই আমার মন আবার খারাপ হয়ে গেল । কিচ্ছু ভালো লাগে না । বিছানা বালিস ঘড়ির টিক টিক । ফুলদানির ফুল । মনে হয় আমাকে রাগানোর জন্য ওরা একই ফুলের তোড়া  ঐ কালসিটে পড়া ফুলদানিতে গুঁজে দিয়ে চলে যায় । জানলা দরজার পর্দা গুলো তেল চিটে চিমুটি হয়ে আমার কাছে কিম্ভুতকিমাকার নাচ নাচছে । আমার  ভয় করছে । আমি বালিসটাকে  কান  অবদি টেনে নিয়ে চেপে ধরেছি , তখনই কানে ভেসে এল জোরালো শিস ––একটানা ,–টি–টু—টিটু। টি–টু –টিটু ।বড্ড বিরক্তিকর । ঘার ঘুরিয়ে কান পাতলাম । আবার সেই শিস্ । পর্দা সরাতেই  আমার চোখে ধরা দিল সে ।–আচ্ছা ফাজিল তো! আমাকে শিস দিয়ে আবার গান শোনানো হচ্ছে । কি ভেবেছিস , তোর গান শুনে আমি গ’লে যাব । সেটি হচ্ছে না । দেখ দেখ ,আবার –টি–টু—টিটু । টি–টু- টিটু ।

আমি তোর গান শুনব না । তুই যা । যা এখান থেকে । আমার জায়গা ছেড়ে দে । ও আবার কি ! পেছনের পালক গুলো আবার চায়না পাখার মত মেলে ধরা হয়েছে? হ্যাঁ হ্যাঁ খুব সুন্দর লাগছে ।যা ! আবার ঘার ফুলিয়ে গা দুলিয়ে তিড়িক তিড়িক করে নাচা  হচ্ছে । এ ডাল সে ডাল করে লাফিয়ে লাফিয়ে নাচ দেখালেই নাচ দেখবো ভেবেছিস ! ওতে আমি ভুলছি না ।

দাঁড়িয়ে দাঁড়ি্য়ে যখন ক্লান্ত বোধ হল , আমি বিছানাতে গেলাম । আর তখনই ফটফটে সাদা কাপড় পরে সেবিকা দিদি আমাকে হাসি হাসি মুখে বলল,- জায়গা কর মালতি । আস্তে আস্তে আমার দু চোখ বুজে এল ।

ঐ দিন বিকেল বেলা , আমার উদ্বেগ, আমার ছটফটানি বেড়ে গেল । সেই ডাকটা  আবার কানে এসে বাজতে লাগল — –টি—টু টিটু। টি-টু টিটু। এসে গেছে আমার উপদ্রব ।মনে হল , আমাকে বেশি করে জ্বালানোর জন্য ই আর ও আর ও ডেকে যাচ্ছে । — সে আমার তাচ্ছিল্য, আমার পরাজয় ।

আমি আর বিছানায় থাকতে পারি ! দ্রুত জানলার পর্দা সরিয়ে চোখ ফেললাম আমার আশয়ে । হ্যাঁ যা ভেবেছি তাই । ওই কেলে টা । আমার দিকে পিট পিট করে তাকিয়ে । বললাম, কী রে আমাকে তুই ঘুমোতে দিবি না ! এমনি করে শত্তুতা করবি ? বুঝিস না আমার যে হাত পা কাঁপে । গাদা গাদা ওষুধ খাই ।  আমাকে কি তুই ভালো থাকতে দিবি না ? আর ওভাবে ডাকিস না । যা দেখি এখান থেকে । আমায় একটু শান্তি দে দেখিনি ।- একি !অবাক হই আমার বাক ভঙ্গি দেখে ।  এ তো আপোসবাণী ।মানুষ যখন আর পেরে ওঠে না, হেরে যায় তখন সে এই পথ বাছে । বিনীত আকুতি জানাই । আজ আমার ভালোবাসার জন্য তাই করলাম !                                            – কেলেটা চলে গেছে । আর আসে না । ডাকে না । শিসও দেয় না । নেচে নেচে এ ডাল সেডালও করে না ।গা থেকে জ্বর নেমেছে । আবার সেই আগের মত সব কিছু ফিরে পেয়েছি ।

এখন কোনও মন খারপ নেই । কান্না গুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে । নিজেই নিজের মনকে বোঝাই, -ছিঃ  কাঁদে নাকি কেউ ? অকারণে মানুষ কষ্ট পাই । দুঃখ গুলোকে মিছিমিছি ডেকে আনি ।  আর সাজিয়ে গুছিয়ে খেতে পরতে দিয়ে মনের ঘরে আসন পেতে মশারি খাটিয়ে থাকতে দিই । আমরা কত বোকা । আমার হৃদয় গান গেয়ে উঠে—‘ আয়োগে যব তুম সাজনা ,–আঙিনা ফুল খিলে ……।’ অদ্ভুত ! আমার গলায় গান ফুটেছে ।

এখন রোদের ফালিগুলো আসার আগেই আমার ঘুম ভাঙে । গাছের পাতাগুলো তিরতির করে নেচে ওঠে ।বাতাস  গান গেয়ে ওঠে । সাথে আমি গলা মেলায় । কখনও কখনও আমি গান করি  ওরা  নাচে । হেলেদুলে ফুলেফুলে।

ভাটফুলের মরা গাছে লতাপাতার ঝোঁপ বেড়েছে । ভেতরে ছায়া আরও শীতল হয়েছে । সকাল সকাল দিদিমনি আসে । আমাকে খুব খু-ব সুন্দর হাসি উপহার দেয় । আমিও ওকে খুব মিষ্টি করে হাসি ফিরিয়ে দিই । আমাকে আর  কোমরের কাপড় তুলে কোমর বের করতে হয় না । দিদিমনি বিষহাসি উপহার উগরে দিয়ে বলে না আর , মালতি জায়গা কর ।

এখন আমার নিজে নিজেই চুল বাঁধতে ভালো লাগে  । বেনি বাঁধতে ভালো লাগে  । মুখে ক্রীম লাগাতে ভালো লাগে  । আকাশে চোখ মেলতেই মন খুশিতে ভরে ওঠে ।  আরও ভাল লাগে আমার ঐ শীর্ণ রুগ্ন ভাট গাছ । মাথায় লকলকে বনকেঁদুরির লতা । লতা জড়ানো শীতল আশয় ।ওখানের আকাশ বাতাস।আর ওদের জড়ানো সবুজ আদর ।ওদেরকে ছাড়া একটুক্ষণও সরে থাকা অসম্ভব । মন থেকে দূর করা যায় না যে ।

সেদিন  রমাদি এসে বলল , বাহ্ ! বেশ সাজ গোছ করে নিয়েছ তো । বেড়াতে যাবে বুঝি ।

– ধুর ! এদের কে ছেড়ে আর কোথায় যাই বল দেখি ।

– কিন্ত্ত কালকে তো তোমায় ছাড়তেই হবে । তোমার বাড়ির লোক আসছে যে । কাল তোমার ছুটি ।

-ছুটি !

জীবনে এই একটা শব্দ আমার কাছে ভাঁওতা ছাড়া কিছু না । আগে হাস্যকর মনে হত ।পরে রাগ হত। তারপর ধীরে ধীরে এই শব্দটাকে গিলতে শুরু করেছিলাম । এই গিলতে গিয়েই যত সর্বনাশ। নিজেকে বড্ড একা লাগতে শুরু করল । বন্ধু-বান্ধব কেউ নেই । শ্বশুর শাশুড়ী ঘর দুয়োর পাড়া প্রতিবেশী বলে কিচ্ছু নেই। নেই নেই সেও নেই । আমি জানি তার ছুটি নেই । ছুটি থাকতে নেই ।

বিয়ের পর পরই আমাকে শেখানো হল , তুমি কিন্ত্ত  দেশ রক্ষকের বউ । সব সময় বর বর করলে হবে না । তোমার বর কিন্ত্ত ম্যাদামুখো দুপুরে ঘুমোনো ভুঁড়িমোটা নামানুষ নয় । ও তো দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছে  , তুমি শুধু সেই মানুষটাকে ছ’মাস একবছরের জন্য ছেড়ে দিতে পারছ না । দেখবে ওর জন্য তোমার গর্বে মাথা উঁচু হয়ে থাকবে একদিন ।

কিন্ত্ত মা , এখন যে আমার বুকটা খালি পড়ে থাকছে । নিজ মুখে যে কথা শাশুড়ীমাকে বলা যায় না তাই বলতে হচ্ছে ।-  আমার ও তো সাধ হয় ওর সংগে সারাক্ষণ ঘুর ঘুর করি । ওর গায়ের পুরুষালিগন্ধে বুনো ভালুক হতে চাই । নেশাগ্রস্থ হয়ে ওর পাশে পড়ে থাকি । ঘেমো গন্ধে নিজের মতিছন্ন করে দিই । কিন্ত্ত সে আমি পারি কই !  আমার যে বড় একা লাগে মা । মাঝে মাঝে মনে হয় সারা বিছানা জুড়ে সাহারার গরম বালির চর পড়েছে । আর তোমরা বাধ্য করছো সেই তপ্ত বালির চরে হাসি মুখে বিচরণ  করতে ।  আপানারা হয়তো বলবেন , আমরা আছি কী করতে ? মাগো – এই বয়সে কী করে আর তোমাদের মুখ ফুটে বলি , ঘর বাঁধা কি একা একা হয় ! ওই ছোটো ছোটো বুলবুলিগুলোও ঠোটে করে খরকুটো  আনে দুজনে । ওরা কথা বলে , ভালোবাসে –ঝগড়া করে । মা-গো ঝগড়া করতেও আরেকজন লাগে । ভালোবাসাবাসি যেমন একা হয়না,ভালো বাসাও একা একা হয় না । ওকে ছুটি নিতে বল না মা ।

কিন্ত্ত কার আর্জি  কে রাখে ।সূর্যতাপে যেমন উতাল সমুদ্রজল বাষ্প হয়ে উড়ে যায়  কেউ দেখতে পাই না , আমার উষ্ণবুকের আবেগও কখন  উড়ে উড়ে চলে যায় কেউ তার খবর রাখে না । একদিন আমি আবিস্কার করি কাঁদছি  – শুধু কেঁদেই যাচ্ছি ।আবেগের মেঘগুলো বৃষ্টি হয়ে ঝরে ঝরে পড়ছে ।

 

আজ অনেকক্ষণ  আমার সংগে সিন্নিদি গল্প করে গেছে ।  দিদি মনে করে ,আমরা নাকি সবাই একা । কোন না কোন সময়ে আমরা নিঃসঙ্গতা বোধ করি ।তখন মা বাবা ভাই বোন ছেলেপুলে আত্মীয় সজন এমনকি স্বামী বা স্ত্রী কেউ না কিচ্ছু না । আর এই সত্যটা যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করা যায় ততই মঙ্গল । আমি এখান ছেড়ে চলে যাব , অন্য দিদিদের মত ওরও হয়তো মনে গভীর না হলেও একটুখানি দাগও পড়েছে । — প্রায় বছর খানেক ! না? সিন্নিদি মনে করার চেষ্টা করে ।

আমি বললাম , ঠিক এগার মাস তেরো দিন ।

সিন্নিদি বাইরে খোলা জানলার দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে বলে , হবে হয়তো ।

-না , আমি হিসেব কষে দেখেছি । গত সেপ্টেম্বরে …. ।

-সিন্নিদি মাথায় হাত বুলিয়ে বলে , খুব হয়েছে । এবার লক্ষ্মী মেয়ের মত রাতের ওষুধটা খেয়ে নাও তো। আটটা বাজতে না বাজতেই সিন্নিদি ডিউটি শেষ করে চলে গেল । যাওয়ার সময় শুধু বলে গেল ,আমাদের মন হল কাঁচা দুধের মত যে কোন ছোঁয়াতেই খারাপ হয়ে যায় । ওকে নাগিনির মত মনি করে আগলে আগলে রাখতে হয় । আর মাঝে মাঝে শুধু ভালোবাসার আঁচে সেঁকে নিলেই দেখবি বেশ করকরে রয়েছে । কী বলিস ,পারবি তো ? আবার সেই হাসি । আমি বহুবার শুধিয়েছি ,তোমার ওই হাসি আসে কোত্থেকে ? সিন্নিদি উত্তরে শুধু আবার হাসিই ফিরিয়ে দিয়েছে । আজও আমি চেয়ে চেয়ে দেখেছি । আজ ও সেই প্রশ্ন করেছি । যাবার আগে শুনে তো যাই ঐ বিষাক্ত হাসি  আসে কোত্থেকে ?

-কাঁদতে কাঁদতে যখন ভালোবাসা  ভিক্ষে করতে হয় অথচ পাওয়ার ঝুলিটা থাকে শূন্য , যখন আর কাঁদতে ইচ্ছে করে না , তখন কান্নাগুলো হাসি হয়ে ফিরে আসে  এই রকমই ।–যেতে যেতে সিন্নিদি আবার হেসে ওঠে ,-সেই বিষাক্ত হাসি ।

আমার অনেক আগেই ঘুম ভেঙেছে । রোদের ফালিগুলো এসে আদর করছে সারা মুখে । ভাটফুলের আশয় আমাকে হাতছানি দিয়েই যাচ্ছে । তবু আমার সময় হয় নি । আমি তো জানি  উঠে  উঠেই আমাকে যেতে হবে । আমার আপনজনরা আমায় নিতে আসবে । আমি বাড়ি যাব । আপনজনকে ছাড়া আর কতদিন থাকা যায় বল ।শুধু ওর জন্য আমার এখন মন খারাপ করে । না খারাপ না , মন কেমন করে । আসলে মন খারাপ আর মন কেমন করার মধ্যে তফাৎটা আমি বুঝে গেছি। শূন্যগর্ভ মেঘ আর পুর্ণগর্ভ মেঘের যা পার্থক্য, ওকে আমার দেখা আর না দেখার সেই পার্থক্য । একা থাকা আর একসঙ্গে থেকে একা হয়ে যাওয়া এক নয় । ওর সঙ্গে থেকে থেকে একা হয়ে যাওয়া আর ওর জন্য একা একা থাকার ফারাক অনেক । ওকে শুধু চোখেরদেখা দেখার জন্য মন কেমন করছে । অধীর অপেক্ষা চোখ ভিজিয়ে দেয় । এ জল তবু মন খারাপের জল নয় । আনন্দের অশ্রু। অশ্রুমোচনে যার নির্বান । খুশিই যার প্রকাশ ।আজ সে আসবে। এই ভাবনায় আমাকে খুশি করে। কতদিন –!কতদিন—পর ! আমার যা কিছু আছে গামছা কাপড়, শায়া, ব্লাউজ আরও পুরোনো নতুন সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছি । দিদিরা আমায় বলেছে ,আমার নাকি রিহ্যাভিটেশন পীরীয়ড শেষ ।আমার আচরণ আর দশটা মেয়ের মতই ।-কান্না হাসি রাগ ঘৃণা এ সবের প্রকাশ নাকি সব

ঠিকঠাক । তাই আমাকে সাজাতে কোন কষ্ট নেই । বন্ধুর জন্য নিজের নৈবেদ্য প্রস্ত্তত করতেও কোনও দ্বিধা নেই । আবার আমি ফিরে যাব আমার ভালো বাসায়।

জানলার ফাঁক দিয়ে রোদ্দুর চলে গেছে শেষ বারের মত । বুড়ো ভাটগাছটা মাথায় কেঁদরি গাছের সবুজ ছাতা নিয়ে বসে আছে আমার জন্য । কখন আসব । বসে দুটো প্রাণের কথা কইব  । কিন্ত্ত আমি ঠিক করেই নিয়েছি ওদের কিছু বলবই না । সুড় সুড় করে আমি আমার ভালোবাসার হাত  ধরে পালিয়ে যাব । জানতেই পারবে না।

সিঁড়িতে কার পায়ের আওয়াজ !  এবার সে আসছে ।অবশেষে  ছুটি নিয়ে আসছে । আমারও ছুটি।   এবার আমি যাব । আমি চললাম আমার আশয় । আমার হাতছানি।রোদের ফালি।ঘর পালানো বাতাস । আমার কেঁদরিফলের লতা । ঝোঁপালো শান্তি । অখন্ড অবসর । তোমরা ভালো থেকো । ভালোবেসো ।

আমি আমার  এগার মাস তেরো দিনের ভালো লাগার ঘর দুয়োর ছেড়ে শেষবারের মত বাইরে পা রেখেছি হঠাৎ জানলার গায়ে একেবারে খুব কাছে , সেই চেনা ডাক শোনা গেল ।–টি-টু-টিটু ।–আমি চমকে  উঠলাম ।–কালুয়া না !এদিক ওদিক খুঁজলাম। লজ্জার মাথা খেয়ে একবার ডাকও দিলাম ––কালুয়া –। কা –লুয়া —! কিন্ত্ত কোথাও দেখতে পেলাম না।আমার মন কেমন করে উঠল।ভাবলাম একবার, একবার–। শুধু একবার চোখের দেখা কি দেখা যাই না ! তার সঙ্গে যাওয়ার আগেই।

[বানানবিধি লেখকের নিজস্ব]

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ