28 Feb

একটি প্রেমের গল্প

লিখেছেন:তপন মোদক


দমদম স্টেশন থেকে ব্যারাকপুর যাব । ট্রেন আসতে দেরি আছে । সময় কাটানোর উপায় খুঁজছি। তিন নাম্বার প্লাটফরমে কলেজ ফেরত দশ বারো জন ছেলেমেয়ে হই হই করছে । এই জেনারেশানের কথাবার্তা আড়ি পেতে শোনার মধ্যে একটা মজা আছে । আর মেয়েগুলোও বেশ ঝকঝকে আর খোলামেলা। লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওদের দিকে  আড় চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে বেশ খানিকটা সময় চলে গেল । ঘড়ি দেখলাম এখনও আধঘণ্টা। হঠাৎ এক নাম্বার প্লাটফরমের পিছনের দিকে একটা গণ্ডগোল আমাকে টেনে নিয়ে গেল। দেখলাম একটা মাঝবয়সী মেয়ে , সম্ভবত স্টেশনেই থাকে , হাতে একটা থান ইঁট নিয়ে দাঁড়িয়ে । প্লাটফরমের শেডটা যেখানে শেষ হয়েছে তার নিচে একটা ঝুপড়ি । ফ্যাকাসে নীল রঙের প্লাসটিক দিয়ে ঢাকা । ঐ ঝুপড়ির ঠিক বাইরে মাঝবয়সী একটা ছেলে, সম্ভবত ঐ ঝুপড়িটারই বাসিন্দা, হাতে একটা চাপা কলের ভাঙ্গা ডাণ্ডা নিয়ে বিক্রম দেখিয়ে যাচ্ছে । প্লাটফর্ম ভর্তি দর্শক।  প্রচুর লোক মজা দেখছে। মেয়েটাকে ভাল করে দেখলাম ।  পোশাক সদ্য ছেঁড়া । এই ধরণের মেয়েদের একটা আদিম আকর্ষণ  থাকে।  একটা বন্যতা ।  এর মধ্যে তা পুরোপুরি আছে । সারা শরীর রক্তাক্ত । কপালের ডান দিকে  অনেকটাই ক্ষত । সেখান থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে । আমাদের দৃষ্টি  তার কপাল চুঁইয়ে ছেঁড়া ব্লাউজের ভিতরে উঁকি মেরে উন্মুক্ত নাভি হয়ে পায়ের গোছের দিকে নামছে । ছেলেটা চিৎকার করে উঠল, শালা বাংলাদেশের রেণ্ডি – এই প্লাটফর্মে যদি কোনও  দিনদেখেছি, একেবারে পুঁতে দেব শালী । মেয়েটি বলে উঠল, খানকির ছেলে – তর বাপের স্টেশন – বাপ্পের বেটা হস ত এগো, বলেই থান ইঁটটা ছোঁড়ার ভঙ্গি করল । দর্শক একটু পিছিয়ে গেল মাত্র।  পাছে রসভঙ্গ হয়, সেই ভয়ে কেউ বাধা দিচ্ছে না । মেয়েটির ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরেই ব্যাপারটা চলছে । এবং ছেলেটি যথেষ্ট আঘাত করতে সক্ষম হয়েছে । কিন্ত এখন ছেলেটি মেয়েটিকে যথেষ্ট সমীহ করছে । ছেলেটি একই জায়গা থেকে বিক্রম দেখাচ্ছে । মাঝে মাঝে পিছিয়েও যাচ্ছে । ছেলেটি পিছোতে পিছোতে একইরকম বিক্রম দেখিয়ে যাচ্ছে,  আমি যদি তোকে তুলে না আনতাম – তা হলে রেণ্ডি খাতায় নাম লেখাতিস রে শালী। তুইই তো আমাকে খানকি বানাবার তরে ছিলিস – খানকির ছেলে, বলতে বলতে মেয়েটি অনেকটাই এগিয়ে গেল । ছেলেটি এবার রণে ভঙ্গ দিল মনে হয়। ছুটে  লোহার রেলিং’এর কাছে পালিয়ে গেল । যেটা ডিঙলেই রাস্তায় পালিয়ে যাওয়া যাবে ।  নাটকটার শেষ দৃশ্যে চলে এসেছি মনে হল । কিন্তু না, আরও একটু বাকি ছিল । ওরা দুজনেই এতক্ষন স্থান কাল পাত্র ভুলে ঝগড়া করছিল । কৌতুহলী দর্শকদের পাত্তাই দিচ্ছিল না । এবার মেয়েটি থান ইঁটটা ফেলে দিয়ে প্লাটফর্মে বসে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল, জানেন এ খানকির ছেলে আমাকে অনেক স্বপ্ন দ্যাখাইছে – মিথ্যা বইলা আমারে তুলে আনছে – ঘর দিমু – সংসার দিমু – খানকির ছেলে কচু দেছে । আবার একজন চিরন্তন অভিমানী মেয়ের মত পা ছড়িয়ে কান্না শুরু করে দিল । এদিকে ট্রেনের সময় হয়ে আসছিল। অ্যানাউনসমেন্টও হয়ে গেছে। ভিড় কমতে শুরু করেছে । আমিও ভাবছিলাম নতুন আর কিছু পাবার নেই – আর তখনই ছেলেটা ছুটে এসে চাপাকলের ভাঙ্গা ডাণ্ডাটা মেয়েটার মাথায় বসিয়ে দিল । মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে নেতিয়ে গেল । রক্তে ভেসে যাচ্ছে । আর দেখার মত কলজের জোর আমার অন্তত নেই । কেউ একজন বলল, পুলিস – পুলিস । আমার ট্রেন ঢুকছে । আমাকে সামনের দিকে উঠতে হবে । সামনের দিকে দ্রুত পা চালাতে লাগলাম ।

অন্য দিনের মতই বাড়ি ফিরলাম । বউ যথারীতি টিভি সিরিয়ালে মগ্ন । বিজ্ঞাপন শুরু হলে চা জুটবে । মেয়ে কলেজ করে উত্তরপাড়ায় একটা টিউসানি সেরে নটা নাগাদ বাড়ি ফেরে। বউকে বললাম, মেয়ে কখন ফিরবে। কি ব্যাপার মেয়ের খোঁজ খবর নিচ্ছ – নটা বেজে গেছে নাকি , বউ সিরিয়ালে চোখ না সরিয়েই উত্তর দিল । আমি বললাম, না এমনি – দেরী টেরি হবে কিছু বলে গেছে নাকি। সিরিয়ালে তখন বেনারসি পরা শাশুরির সঙ্গে বেনারসি পরা বউমার মারকাটারি ডায়লগ চলছে। বউ কোনও উত্তর দিল না। আমি অফিসের প্যান্টজামা ছেড়ে টাওয়াল নিয়ে বাথরুমে চলে গেলাম। মুখে চোখে ঘাড়ে জল দিলাম । হঠাৎ শরীরটা গুলিয়ে উঠল । দমদম স্টেশনের ওই রক্তের দৃশ্য কিছুতেই মাথা থেকে সরছিল না । চোখের সামনে মেয়েটির লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য বার বার ভেসে আসতে লাগল । আর ঐ রক্ত । আমি কোনও দিনও রক্ত সহ্য করতে পারি না । আর একবার মুখে চোখে জলের ঝাপটা দিয়ে মন থেকে ঘটনাটা তাড়াবার চেষ্টা করতে করতে আমার ঘরে চলে গেলাম । একটু পরেই বউ চা নিয়ে এল । কি ব্যাপার শরীর খারাপ নাকি – ড্রয়িং রুমে বসলে না , বউ একটু উদ্বিগ্ন । সচরাচর অন্যদিন এই সময় সিরিয়াল নিয়ে চোখা চোখা মন্তব্য ঝাড়ি । বউও স্বামী থেকে পুরুষ জাতির বাপ-বাপান্ত করে । এই খেলা আজ বন্ধ । বলতে গেলাম, আজ কি হল জান । মনে হল ঘটনাটার বর্ণনা দিলে আবার সব চোখের সামনে ভেসে উঠবে । সামলে নিয়ে বললাম, না – কিছু নয় । বউও কথা না বাড়িয়ে দ্রুত চলে গেল । বিজ্ঞাপণ পর্ব শেষ হয়ে সিরিয়াল শুরু হয়ে গেছে । রাতে আর ঘুম এল না । আমি ঘটনাটা তাড়াতে চাইলে কি হবে । আরও বেশি বেশি করে মনে পড়তে লাগল । একদম সিনেমার মত । একটা সিনেমা বার বার দেখলে ঘটনার আকস্মিকতা কেটে গিয়ে যেমন ডিটেলসের দিকে মন যায় , আমারও ঘটনাটার পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে পড়তে লাগল । ছেলেটা একটা ময়লা লুঙ্গি পরেছিল – অর্ধেক তুলে গিঁট বাঁধা । খালি গা । দোহারা চেহারা । এক মুখ দাড়ি – তবে কিছুদিন আগে মনে হয় কামানো হয়েছিল । আর মেয়েটা ! হঠাৎ মনে পড়ল । বেশ কিছুদিন আগে আমার মেয়ে একটা ভিডিও দেখিয়েছিল । রাজস্থানের কিছু সমাজকর্মী রাস্তার ভবঘুরে ভিখারিদের ধরে ধরে ছেঁড়া ময়লা পোশাক খুলে দিয়ে – দাড়ি মাথা সব কামিয়ে – সাবান মাখিয়ে স্নান করিয়ে দিচ্ছিল । এই রকম একজন  ভিখারিকে সব কিছুর পর একটা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সবার সঙ্গে লাঞ্চে বসাল । সেই ভিখারিকে আর চেনা যাচ্ছিল না । একদম অন্য মানুষ । আমিও মেয়েটার ছেঁড়া পোশাকের আড়ালে একটি পরিশীলিত মেয়েকে দেখতে পাচ্ছিলাম । কথায় পূর্ববঙ্গীয় টান । বাংলাদেশের মেয়ে । ছেলেটাও বলছিল সে কথা । তারপর মেয়েটির ঐ কথা গুলো কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না, আমাকে অনেক স্বপ্ন দ্যাখাইছে – মিথ্যা বইলা আমারে তুলে আনছে – ঘর দিমু – সংসার দিমু । স্টেশনে পড়ে থাকা একটা মেয়ে “স্বপ্ন দ্যাখাইছে” এই শব্দবন্ধন বলবে ! আমার অভিজ্ঞতা বলে , অসম্ভব । মেয়েটার অবশ্যই একটা অতীত আছে – যেটার সঙ্গে ওর এখনকার জীবনের কোনও মিল নেই । মেয়েটা মারা গেল কিনা জানি না তবে আমার রাতের ঘুমটা কেড়ে নিল ।

পর দিন অফিসে গিয়েও ঘটনাটা মন থেকে তাড়াতে পারছিলাম না । আমি সচরাচর হাওড়া হয়ে বাড়ি ফিরি । গতকাল এক অসুস্থ কলিগের বাড়ি গেছলাম নাগের বাজারে । তাই দমদম হয়ে ফেরা । কালকের মতই  ঐ  অসুস্থ কলিগকে দেখতে যাবার নাম করে তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম। সোজা দমদম স্টেশন। দেখলাম ঝুপড়িটা ভাঙা । যেখানে ঘটনাটা ঘটেছিল তার কাছাকাছি একটা চায়ের দোকানে একটা চা খেলাম । একটু ফাঁকা হলে জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা কাল ওখানে একটা ঘটনা ঘটেছিল – দেখেছেন । লোকটা আমার দিকে একবার তাকাল । কোনও উত্তর দিল না । আবার একই প্রশ্ন করলাম । লোকটা আমার দিকে না তাকিয়ে  ফ্লাস্কে চা ঢালতে ঢালতে বলল, কোন ঘটনা দাদা – এই প্লাটফর্মে হাজারো ঘটনা – তা আপনি কোনটার কথা বলছেন । ঐ যে ঠিক এই সময় আপ ব্যারাকপুর লোকাল ঢোকার আগে – ঐ যে একটা মেয়ের মাথায় একটা ছেলে লোহার ডাণ্ডা দিয়ে মারল , আমি আর একটু বিশদ ভাবে বলার চেষ্টা করার আগেই লোকটা বলে উঠল, ডাঁশা মেয়েছেলের ঘটনা তো – সব বাবুরাই জিজ্ঞেস করে – আপনাকে নিয়ে একশজন হল । আমি একটু হকচকিয়ে গেলাম । সত্যিই তো আমার কিসের আঠা ? পয়সা মিটিয়ে সরে গেলাম চুপচাপ । চায়ের দোকানী উল্লিখিত ‘ডাঁশা মেয়েছেলে’ বলেই কি আমি এতদূর ছুটে এসেছি । খুব ছোট লাগছিল নিজেকে । পরিচিত কেউ শুনে ফেললে কেলেঙ্কারির এক শেষ । ব্যারাকপুর লোকালের এখনও ঢের দেরী । প্লাটফর্ম থেকে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম । বাইরে থেকেও ঝুপড়িটা দেখা যায় । ছেলেটাকে নিশ্চয় পুলিশে ধরেছে। কাল কেউ কেউ ‘পুলিশ’ ‘পুলিশ’ বলে চিৎকার করছিল । ঝুপড়িটা দেখে মনে হচ্ছে পুলিশের হাত পড়েছে। এখানকার জি আর পি’র সঙ্গে দেখা করলে কেমন হয় । জি আর পি যদি জিজ্ঞেস করে কেন খোঁজ করছেন – কি উত্তর দেব । যদিও কোনও মিল নেই তবে কোথাও যেন আমার মেয়ের সঙ্গে ওই মেয়েটার একটা একাত্মতা খুঁজে পাচ্ছিলাম । হঠাৎ পরিমলের সঙ্গে দেখা । আমার কলেজের বন্ধু । বেলঘরিয়ায় থাকে । আমার অফিস পাড়াতেই ওর অফিস । প্রায়ই টিফিন টাইমে দেখা হয় । বলল, আরে তুই – এখানে কি ভেরেণ্ডা ভাজছিস । আমি এই ভয়টাই করছিলাম । যদিও পরিমল আমাকে চেনে । ওকে সব খুলেবলা যায় । বললাম, চ – চা খাই । তারপর কাল থেকে শুরু করে আজ অবধি যা ঘটেছে সব বললাম । চায়ের দোকানদারের পিত্তি জ্বলানো মন্তব্য সমেত। পরিমল বলল, তোর সেই গেঁড়েমো এখনও গেল না । আগের কেসটার তো এখনও ঘা শুকোয় নি । বুঝতে পারলাম ও আমাদের পাড়ার চোরের কেসটা উল্লেখ করছে । গত বছর পুজোর আগে পাড়ায় একটা চোর ধরা পড়েছিল । পাড়ার ছেলেরা একটা বেশ কম বয়সী ছেলেকে বাঁশে বেঁধে পেটাচ্ছিল । জনরোষ কাকে বলে আমার জানা আছে । মারের সময় জ্ঞান থাকে না মানুষের । আমি গোপনে পুলিশে ফোন করেছিলাম । পুলিশ এসে চোরটাকে উদ্ধার করে পাড়ার প্রায় কুড়ি জনের নামে কেস দিয়ে দেয় । সেই কেস এখনও চলছে । পাড়ার ছেলেরাও চেষ্টা করছে কে পুলিশে খবর দিয়েছিল । জানলে কি হতে পারে সে নিয়ে খুবই চাপে আছি । ঐ ঘটনাটাই উল্লেখ করল পরিমল । আমি বললাম, এটা তো সে রকম কিছু নয় – জাস্ট জানতাম আর কি – চোখের সামনে ঘটানাটা ঘটল – মেয়েটার জন্য খুব মায়া হচ্ছে বুঝলি । আর যদি মেয়েটা মারা যায়- তখন ভাল লাগবে – তার চেয়ে না জানাই তো ভাল , পরিমল খুব যুক্তিপূর্ণ কথা বলল। তারপর বলল, ঠিক আছে চ – দেখি। জি আর পি’তে আমাদের বেলঘরিয়ার একজন আছে। ওর ছেলে আর আমার ছেলে এক সঙ্গে ট্যুইসানিতে যায় – দেখি মালটা আছে কিনা, বলে পরিমল আমাকে নিয়ে এক নাম্বার প্লাটফর্মে ঢুকল । জি আর পি অফিসে  দুজন পুলিশ সিম্পল ড্রেসে বসে আছে । পরিমল বলল, সুনীলবাবু  আছেন । কে জানে কেন আমাদের দেখে কোনও প্রশ্ন না করে একজন বলল, তিন নাম্বার প্লাটফর্মে ডিউটিতে আছে – পিছনের দিকে – ওভারব্রিজ দিয়ে চলে যান । তিন নাম্বার প্লাটফর্মে ভদ্রলোক আরও দুজন কনেস্টবলের সঙ্গে নিয়ে একজনের সঙ্গে কথা বলছিল । আমাদের দেখে বলল, আরে পরিমলবাবু – কি ব্যাপার – বাড়ি ফিরছেন । বাড়ি তো ফিরছিলাম – এই বন্ধুটি আটকালো – আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে, পরিমল সোজাসুজি  বিষয়ে চলে গেল । কি ব্যাপার বলুন তো – কোনও প্রবলেম, ভদ্রলোক বেশ সিরিয়াস হয়ে বলে আমাদেরকে নিয়ে একটু ফাঁকা জায়গায় নিয়ে এলেন। পরিমল বলল, না না সমস্যা টমস্যা নয় – জাষ্ট একটা ইনফরমেসান। আমার এই বন্ধুটি – দাঁড়ান আলাপ করিয়ে দিই । সংক্ষেপে আলাপ পর্ব সেরে পরিমল কালকের ঘটনাটা জানিয়ে বলল, বন্ধুটির কাল রাত থেকে ঘুম হচ্ছে না – ঐ রক্ত টক্ত দেখে খুব শক পেয়েছে বুঝলেন – মানে একটু জানতে চাইছে আর কি – তারপর কি হল । সুনীলবাবু হো হো করে হেসে উঠলেন । তারপর বললেন, আরে মশাই পুলিশ লাইনে থাকলে আপনার তো রোজই হার্টফেল করত – ওরকম ঘটনা হামেশাই ঘটছে – মেয়েটার নাম রিনী – এই ছ’মাস মত দেখছি – পেটে একটু বিদ্যেটিদ্যে  আছে মনে হয় – আর ছেলেটা হচ্ছে ভগা । স্টেশনে আমি যদ্দিন এসেছি দেখছি – গাছ হারামি ।ঐ লাইনে কাটা ফাটা পড়লে ডোমের কাজটা করে দেয় – দমদমে কোনও ডোমের পোস্টিং নেই – শিয়ালদা থেকে আনতে হয় – ঐ জন্য ওকে আমরা আর ঘাঁটাই না – ওসব মারধর নিত্যদিনের । ভদ্রলোক কর্ড লাইনে যাচ্ছে দেখে আমি বললাম, মেয়েটার কি হল । সুনীলবাবু পুলিশি কায়দায় বলল,  পাষ্টটা না জানলে প্রেজেন্ট বুঝবেন কি করে মশাই – হ্যাঁ কালকের কেসটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছল – পাবলিকও পড়ে গেছল । মেয়েটা এখন হাসপাতালে – টাঁসবে বলে মনে হয় না – এদের জান খুব কড়া – আমার আপনার ঘরে হলে – কালকেই টেঁসে যেত । আর ঐ ভগাকে কোর্টে চালান করতে হল – বললাম না পাবলিক পড়ে গেছল – এখন কাটা ফাটা পড়লে – সেই শিয়ালদা থেকে লোক আনাও । সুনীলবাবু বলেই চলেছেন । আমি বাধা দিয়ে বললাম, কোন হাসপাতালে আছে – মানে মেয়েটা।আর জি কর । দমদমের সব কেস ওখানেই যায়, ভদ্রলোক আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন । আমরা আর কথা না বাড়িয়ে সবিনয়ে চা’এর অফার প্রত্যাখান করে সময়ের দোহাই দিয়ে নমস্কার করে পালিয়ে বাঁচলাম ।

পরের দিন সমস্ত কিছু মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে অফিস গেলাম । মেয়েটা যে বেঁচে গেছে এই ঢের । ছেলেটা – কি যেন নাম বললেন সুনীলবাবু – হ্যাঁ ভগা – ওর জেলেই পচে মরা উচিত । ঘটনাটার শেষ তো জানা হল । ভাবলাম ব্যাপারটা মন থেকে তাড়িয়ে দিতে পারলাম । কিন্তু নিজেকেই ঠিক চিনি না । মহাপুরুষরা বলে গেছেন, নিজেকে চেনা সবচেয়ে  কঠিন । ব্যাপারটা যে কত সত্যি দুপুরের পরই টের পেলাম । বার বার মনে হতে লাগল, মেয়েটাকে একবার দেখে এলে কেমন হয় । ওকে সুস্থ অবস্থায় না দেখলে মনটা খিঁচ খিঁচ করবে সারা জীবন । টিফিনে বাইরে বেরিয়ে পরিমলকে খুঁজলাম । পেলাম না । ফোন করলাম, কিরে টিফিনে আসবি না । ও বলল, আজ অফিসেই একটা খাওয়া দাওয়া ছিল – বেরোলাম না । তারপর বলল, ব্যাপারটা মাথা থেকে গেছে – না – এখনও কালটিভেট করছিস । আমি বললাম, তুই একবার বাইরে আয় না – কথা আছে । ও একটা চোখা খিস্তি মারল । তারপর বলল, যাচ্ছি দাঁড়া । পরিমল আসলে বললাম, শালা ব্যাপারটা কিছুতেই মাথা থেকে তাড়াতে পারছি না । মেয়েটা – কি যেন নাম – রিনী – ওকে একবার দেখতে যাব – প্লীজ তুই একটু হেল্প কর । পরিমল খুব গার্জেনী ভঙ্গিতে বলল, কেন দেখতে যাবি কেন ?  সত্যি বলতে কি দেখতে যাওয়ার সপক্ষে  কোনও যুক্তি আমার কাছে  ছিল না । আমিও নিজেকে প্রশ্ন করেছি – উত্তর পাই নি । তবুও ব্যাপারটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিলাম না । আমার অবস্থা দেখে পরিমল বলল, বাড়াবাড়ি করছিস – কেন জড়াচ্ছিস ফালতু ঘটনায় – বাঁশ কেন ঝাড়ে ইত্যাদি ইত্যাদি । আমি বললাম একবারই যাব – শুধু আজকে – তুই থাকলে একটু সাহস বাড়ে আর কি। পরিমল বলল, অগত্যা – চ দেখি – আমারও দেখতে ইচ্ছা করছে মালটাকে – একটা ষ্টেসানের  ভিখিরি ক্লাসের মাইয়ার কি দেখে তুই টলে গেলি – এটা একটা গবেষণার বিষয় । তুই যা ভাবছিস ব্যাপারটা তা নয় – আসলে , আর কিছু বলতে পারলাম না । পরিমল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। বলল, আসলে তোর কাছে কোনও ব্যাখ্যা নেই – আর থাকলেও আমাকে বলতে পারছিস না । আমি আর কথা বাড়ালাম না । পরিমলকে যতটুকু চিনি ও হাসপাতালে যাচ্ছে ।

দুজনে বিকাল পাঁচটা নাগাদ হাসপাতালে গেলাম। এমারজেন্সিতে একটু উঁকি মেরে দেখলাম ওই ধরণের কোনও পেসেন্ট নেই। এনকোয়ারিতে পরিমল জিজ্ঞেস করল, রিনী নামে একটা মেয়ে – কাল দমদম ষ্টেসানে একটা এক্সিডেন্ট হয়েছিল – এখানে ভর্তি আছে -। এনকোয়ারির ভদ্রমহিলা কমপিউটার দেখে বললেন, না- ও নামে কেউ নেই । তারপর বললেন, কি বললেন – দমদম স্টেশনে এক্সিডেন্ট – স্টেশনের ভেতর না বাইরে ? পরিমল বলল , প্লাটফর্মে । ভদ্রমহিলা কমপিউটার থেকে চোখ সরিয়ে বললেন, ও তো জি আর পি কেস – ফিমেল ওয়ার্ডে  চলে যান – পুলিশ কেস আলাদা রাখা থাকে । আমি বললাম,  ফিমেল ওয়ার্ডটা কোন দিকে । ভদ্রমহিলা হাত তুলে যেদিকটা দেখালেন – সেটা ডান দিকেও হয়, বাঁ দিকেও হতে  বাধা নেই । পরিমল আমার হাত টেনে নিয়ে বলল, ফালতু প্রশ্ন কেন করিস – যেটুকু ইনফর্মেসান দিয়েছে – এই ঢের । খোঁজ করে করে ফিমেল ওয়ার্ডে  গেলাম । একজন সিনিয়র সিষ্টার বললেন, রিনী – না ও নামে কেউ ভর্তি হয় নি – তবে  ডান দিকটা দেখুন – কাল থেকে গোটা আষ্টেক এক্সিডেন্ট কেস এসেছে – দূর থেকে দেখবেন – কাছে যাবেন না ।  সরকারি হাসপাতালে লাষ্ট কবে এসেছি মনে পড়ে না । চারিদিকে পেসেন্ট । ভিজিটিং আওয়ার্স চলছে । পা ফেলার জায়গা নেই । একে ওকে কাটিয়ে ডান দিকে গেলাম । আটটা নয় । পাঁচ জন পেসেন্টকে একটু আলাদা করে রাখা আছে । শুধু এক জনের কাছেই ভিজিটর্স আছে । সব গুলোই এক্সিডেন্ট কেস । ব্যান্ডেজে এমন ভাবে মোড়া আছে চেনা খুব মুশকিল । কারো পা ওপর দিকে বাঁধা আছে  কারো আবার পা এমপুট করা হয়েছে । পরিমল আমার দিকে তাকাল । ইঙ্গিতে জানতে চাইল কোনটা । আমি একদিক থেকে দেখা শুরু করলাম । প্রথম দুজন বাদ – বয়স অনেক বেশি । থার্ড পেসেন্টের ভিজিটর আছে – ওটা হবে না । ফোর্থ পেসেন্টের পা এমপুট করা হয়েছে । রিনির চোট তো মাথায় । তার মানে একদম সাইডের পেসেন্টেটাই হওয়া উচিত । মাথায় ব্যাণ্ডেজ । এলিমিনেসান থিওরিতে তাই তো দাঁড়াচ্ছে । পরিমলকে আঙ্গুল তুলে ওদিকেই দেখালাম । যদিও তখনও আমি নিশ্চিত নই । নার্সের নিষেধ থাকা সত্বেও দুজনে কাছে গেলাম । হ্যাঁ – রিনীই । একেই আমি কাল দমদমে দেখেছিলাম । সারা মাথায় ব্যাণ্ডেজ – ভ্রূ অবধি। সম্ভবত সব চুল কেটে দেওয়া হয়েছে । চোখ বোজা । ময়লা ছেঁড়া কাপড়টা হাঁটুর ওপরে ওঠা । দুজন অনাত্মীয় বুড়ো দামড়ার এই পেসেন্টের বেডের সামনে  দাঁড়িয়ে থাকা অসভ্যতারই সামিল । একটু কেন – বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল । আবার মনে হল , না আসলেই ভাল হত । পরিমল এসব ব্যাপারে খুব স্মার্ট । ও একটু জোরেই বলল, এই যে শুনতে পাচ্ছো । মেয়েটা একটু যেন নড়ে উঠল । একটু সময় নিয়ে আবার বলল,  শুনতে পাচ্ছো । এবার মেয়েটা আস্তে আস্তে চোখ খুলে আমাদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দেখল । পরিমল বলল, কাল আমরা দমদম ষ্টেসানে ছিলাম – তোমার অজ্ঞান হয়ে যাওয়াটা দেখেছি । এখন কেমন আছ । মেয়েটা কিচ্ছু বলল না – শুধু দু চোখের কোন থেকে জল গড়িয়ে পড়ল । আমি বললাম, কোনও কষ্ট হচ্ছে – বল – আমরা তাহলে ডাক্তারবাবুকে বলব । কোনও উত্তরই দিল না । আমরা আরও দশ মিনিট মত ওখানে ছিলাম – মেয়েটা আর একবারও চোখ খোলে নি । পরিমল বলল, চল – কেটে পড়ি – লোকজন দেখছে – ঝামেলায় জড়িয়ে যাব । শিয়ালদা স্টেশনের বাইরের চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে পরিমল বলল, দ্যাখ জিতেন এনাফ ইজ এনাফ – আর নয় – আবার যদি তুই আসিস বিপদে পরে যাবি – এবং সে যে কি বিপদ কল্পনাও করতে পারবি না – ভাল চাকরি করিস – বউ মেয়ে নিয়ে সাজানো সংসার – মেয়েটার একটা ভবিষ্যত আছে । আমি বাধা দিয়ে বললাম, কি রকম বিপদ । সেটা তুইও জানিস – তুই অত হাঁদা গঙ্গারাম নোস , আর একটা গা জালানো গালাগাল দিয়ে চা টা শেষ করল । আমি বুঝতে পারছিলাম, পরিমল ঠিকই বলছে । একটা সিগারেট ধরিয়ে খানিকক্ষণ পর বলল, তুই কি ভাবিস মেয়েটার দিকে পাচারকারীদের নজর নেই – মেয়েটার যৌবন আছে – বয়স কম – তাছাড়া বলনেবালা কেউ নেই । আমরা যে আজ হাসপাতালে গেলাম – আমি নিশ্চিত ওরা মার্ক করেছে – আর এদিকে আসবিনা – সোজা হাওড়া স্টেশন দিয়ে বাড়ি। আমি বাধ্য ছেলের মত বললাম, ক্ষেপেছিস – এলাইন আর মাড়াব না।

প্রায় এক সপ্তাহ ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করিনি।বাড়িতে এলাহাবাদ থেকে বড় সম্বন্ধী এসেছিল। অনেকদিন পর এল , ওকে একটু সময় দিতে হয়েছে। ওর স্ত্রী খুব বুদ্ধিমতী। বাংলা সিরিয়াল দেখে না । এলাহাবাদের বেঙ্গলি ক্লাবের অনেক কাজকর্মের সঙ্গে জড়িত । সাতটা দিন কোথা দিয়ে বেরিয়ে গেল বুঝতে পারলাম না ।ওরা চলে যেতে গতানুগতিক সংসার চলতে লাগল । সকালে কাগজে দেখলাম  আর জি কর হাসপাতালে একজন জীবিত পেসেন্টকে মৃত ঘোষণা করায় পেসেন্টের আত্মীয়-স্বজন ডাক্তারকে মারধর করেছে । আবার রিনির কথা মনে পড়ল । আত্মীয়-স্বজন থাকতেই  জীবিত পেসেন্টকে মেরে ফেলছে – আর রিনীর তো কেউ নেই । যদিও ওকে জি আর পি ভর্তি করেছে । মনকে এই বলে প্রবোধ দিলাম যে, রিনী আমার কে। তাছাড়া পরিমলের সতর্কবাণীগুলো মনে পড়ল ।  অফিসেও কয়েকজন আর জি করের ঘটনাটা নিয়ে আলোচনা করছিল । রিনী কি সুস্থ হয়েছে একটু । এখন নিশ্চয় কথা বলতে পারবে । জি আর পি’র সুনীলবাবু বলছিলেন মেয়েটার পেটে বিদ্যা আছে । বিকাল চারটের সময় দেখলাম, যে ফাইলটা নিয়ে সকালে বসেছিলাম সেটাই সামনে খোলা আছে । কাজ কিছুই এগোয় নি । সারা সময়টা রিনীর কথাই ভেবে গেছি । সাড়ে চারটের সময় ডিপার্টমেন্টের  হেডপিওন বকশীবাবু বলল ফাইল টাইল তুলে দিয়ে তাড়াতাড়ি চলে যাবে । আমাদের একজন সুইপার  আর জি কর’এ ভর্তি আছে তাকে দেখতে যাবে । হঠাৎ মনে হল,  বকশীবাবুর সঙ্গে হাসপাতালে গেলে কেমন হয় । অফিস কলিগ হাসপাতালে ভর্তি আছে – তাকে দেখতে যাওয়া যেতেই পারে । বকশীবাবুকে বললাম, কে বলুন তো – কি হয়েছে । বকশীবাবু বলল, আরে দাদা কানু রাউত, মদ খেয়ে খেয়ে লিভারটাই পচে গেছে – যে কোনও দিন মরে যেতে পারে । তারপর বলল, আমি তো ইউনিয়ন করি – এসব একটু দেখতে টেখতে যেতে হয়- না হলে এই সব ছোটলোকদের ব্যাপারে কে আর থাকে মশাই । বকশীবাবুর একটু উঁচু জাতের গুমোর আছে। আমি বললাম, আমিও দেখতে যাব ভাবছি । আপনার তো হাওড়া লাইন – আপনি যাবেন কেন – আমার নেহাৎ যাবার পথেই পড়ে – একবার টুক করে দেখে কেটে পড়ব, বকশিবাবু বাধা দিয়ে বলল । আমি ওর কথাকে পাত্তা না দিয়ে বললাম, না – আমি যাব – ও দিকে একটা অন্য কাজও আছে ।

কালকে যে এই হাসপাতালে এত বড় ঘটনা ঘটে গেছে তা আজকের চেহারা দেখে কিছুই বোঝার উপায় নেই । মিডিয়াগুলো পারেও বটে । বকশিবাবুর সঙ্গে প্রথমে কানু রাউতকে দেখতে গেলাম । মেল ওয়ার্ডের ১৩নং বেডের ধারে কানু রাউতের পুরো পরিবার উপস্থিত। সব মিলিয়ে প্রায় এগারো জন । দূর থেকে ভিড়টা দেখে নিয়ে বকশিবাবুকে বললাম, আপনি দেখে আসুন – আমি কাজটা সেরে আসি । বকশিবাবু একটা চোখ ছোট করে কানের কাছে মুখটা নিয়ে এসে বলল, আপনি যান না মশাই – কাজ মিটিয়ে আসুন – আপনাকে আর এদিকে আসতে হবে না – আমি এমারজেন্সির সামনে অপেক্ষা করছি । আমি প্রথমে ভাবলাম বকশিবাবুকে বলে দিই অপেক্ষা করার দরকার নেই । পরে ভাবলাম যদি বিপদে পড়ি ওকে দরকার হবে । বললাম, ঠিক আছে তাই করুন – আমি আসছি – একসঙ্গে চা খাব । সোজা একতলায় নেমে পরের বাড়ির দোতলায় ফিমেল ওয়ার্ডেচলে গেলাম । রিনি যে বেডে ছিল সেটা ফাঁকা । পাশের পেসেন্টরা সবাই আছে । আগের দিন যে বেডে ভিজিটার্স ছিল – তাদের সংখ্যা আজ বেশি । কাকে জিজ্ঞেস করা যায় । নার্সিং ডেস্কে একজন বয়স্কা নার্সকে জিজ্ঞেস করলাম, ওই দেওয়ালের কোনের বেডে পেসেন্টের কি ছুটি হয়ে গেছে । ভদ্রমহিলা বেডের দিকে তাকিয়ে বললেন , অ – ওই মাথা ভাঙ্গা জি আর পি কেস । আমি বললাম, হ্যাঁ হ্যাঁ – নামটা সম্ভবত রিনী । ওর নাম বুঝি রিনী –যতদূর জানি ওর সাতকুলে কেউ নেই – ষ্টেসানে থাকে – তা আপনি কে হন – মিডিয়ার লোক হলে সুপারের সঙ্গে দেখা করুন, ভদ্র মহিলার কথা শুনে তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, না না মিডিয়ার লোক নই – আসলে – , বলার মধ্যেই ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন ,ঐ যে এলেন – কাল থেকে চড়ে বেড়াচ্ছে । সিষ্টারটি রিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, এই মেয়ে – এই ভদ্রলোক তোকে খুঁজছেন । রিনী আমার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল । মাথায় ব্যাণ্ডেজটা একটু ময়লা হয়েছে । শাড়িটা পাল্টানো । কেউ দিয়েছে হয়ত । ভেতর থেকে একটা ভদ্র পরিবারের মেয়ে উঁকি মারছে । আমি বললাম, ঘটনার দিন আমি ষ্টেসানে ছিলাম – তোমায় দেখতে এসেছি। আপনি আগেও  একবার  এসেছিলেন না, রিনী বেশ সন্ধিগ্ধ সুরেই প্রশ্নটা করল । সিষ্টারটিও আমাদের কথাবার্তা শুনছিল । আমি বললাম , চল তোমার বেডের কাছে যাই । রিনী কিছু না বলে ওর বেডের দিকে এগিয়ে গেল । আমিও পিছু পিছু গেলাম ।বিছানায় বসে চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে রইল । কথা তো আমারই শুরু করার কথা । প্রথমে বললাম, তোমার নাম তো রিনী । রিনী সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল । বললাম, আমি সেদিন স্টেশনে ছিলাম – সচরাচর আমি দমদম স্টেশন দিয়ে যাই না – তো সেদিন ব্যারাকপুর লোকাল ধরব বলে দমদম দিয়ে যাচ্ছিলাম । রিনী বাধা দিয়ে বলল, কাকু থাহেন কোথায় ? শ্রীরামপুর, আমি চটজলদি উত্তর দিলাম ।  তারপর আমি নিজের আসাকে জাষ্টিফাই করতে একটু রঙ চড়িয়ে বললাম , সেদিনের ঐ রক্ত দেখে আমিও কেমন অসুস্থ হয়ে পড়ি – তারপর যা শুনলাম তোমার পেটে একটু বিদ্যে বুদ্ধিও নাকি আছে । এরপর রিনী আস্তে আস্তে সহজ হতে থাকে । ভিজিটিং আওয়ারস শেষ হতে এখনও এক ঘন্টার মত বাকি । সেদিন একঘন্টা কাটিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরোনোর সময় মনে পড়ল, বকসীবাবুর এমারজেন্সির সামনে দাঁড়িয়ে থাকার কথা । আবার এমারজেন্সির সামনে গেলাম । বকসীবাবু নেই । ফোন করলাম । রিং হয়ে গেল । আমি আর সময় ব্যয় না করে একটা হাওড়ার বাসে উঠে পড়লাম ।

পরের দিন একটা ছাপা শাড়িআর কিছু ফল নিয়ে  রিনীকে দেখতে গেলাম । শাড়িটা না কিনে একটা পুরনো শাড়ি বউ’এর কাছে চাইতেই পারতাম । কিন্তু পারিনি । তারপর পরপর  আরও  পাঁচ দিন । হাওড়া লাইনের সুখ ছেড়ে ভিড় ট্রেনে দমদম থেকে ব্যারাকপুর ফেরা । একটা অমোঘ টান । কেন গেলাম ব্যাখ্যা করতে পারব না । এই ছদিনে আমিও অনেকটা সহজ হয়ে গেছি । শেষের কদিন আমি যাওয়া মাত্র রিনী বেশ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠত । এ কদিনে ওর বায়োডাটা  অনেকটাই আমার জানা হয়ে গেছে ।সব সত্যি কিনা জানিনা । বাংলাদেশের খুলনা – অধুনা সাতক্ষীরা জেলার কর্ণমাধবপুর গ্রামের দরিদ্র হিন্দু চাষি পরিবারের মেয়ে রিনী । ভাল নাম অর্চনা । ওর যখন দু বছর বয়স – মা মারা যায় – আর একটা বাচ্ছার জন্ম দিতে গিয়ে । ক্লাস এইটএর পড়া শেষের আগেই বাবা বিয়ে দিয়ে দেয় । বরের আর একটা পরিবার ছিল ।মাস তিনেক বরের ঘর করে পালিয়ে আসে – আর যায়নি । বাবা মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়ত । মেয়ে রিনীর শুশ্রুষায় উঠে দাঁড়াত । এবার আর উঠতে পারেনি । গ্রামের কয়েকজন পরামর্শ দেয় ইণ্ডিয়ায় গিয়ে চিকিৎসা করাতে । যে কটি নিম্নবিত্ত হিন্দু পরিবার এখনও বাংলাদেশে টিঁকে আছে তারা বিপদে পড়লে এই উপদেশই দেওয়া হয় । রিনীও ভিটে বাড়িটা রেখে জমিজমা যা ছিল সব বিক্রি করে দালাল ধরে বাবাকে নিয়ে কলকাতায় আসে । দালালরাই নাম ভাঁড়িয়ে পার্ক সার্কাসের একটা সরকারী হাসপাতালে ভর্তি করে দেয় । ভর্তি হবার দিন পাঁচেক পরে বাবা মারা যায় । দেহ দাহ করার সুযোগও  ছিল না । বেওয়ারিশ বলে মর্গে চালান হয়ে যায় ।রিনী তখন একা । কলকাতা শহর । প্রথম রাতটা হাসপাতালেই কাটায় । পরদিন সকালে সেই দালালটির এক সাগরেদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় । ওরাও হয়ত তক্কে তক্কে ছিল । ওকে পুলিসের ভয় দেখিয়ে কাজের নাম করে একজনের বাড়িতে তোলে । সেই সাগরেদই পরপর  দশদিন ওকে ধর্ষন করে । এগারো দিনের মাথায় অন্য লোক আসে । তখন রিনী বুঝতে পারে ওকে বেশ্যাপাড়ায় তোলা হয়েছে । বারো দিনের মাথায় রিনী সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হয় । বারাসাত ষ্টেসানে দুরাত ভয়ে ভয়ে কাটানোর পর তৃতীয় রাতে চার পাঁচ জন লোক ওকে ঘিরে ধরে । তখনই ভগবান ওরফে ভগা সিনেমার নায়কের মত ওকে উদ্ধার করে । যদিও ভগাকে তার জন্য মূল্য দিতে হয়েছিল।ওর হাতটা ভেঙে যায় । ওখান থেকে দমদম স্টেশন । বাবাকে সেবা করার অভিজ্ঞতায় রিনী মাস দুয়েকের মধ্যে ভগাকে সুস্থ করে তোলে । ভগারও এই পৃথিবীতে কেউ নেই । ও বিহারী । ছোট বেলায় মা মারা যাবার পর  বাবা অন্য বিয়ে করে নেয় । ভগা সেই সময়ই দ্বারভাঙ্গা থেকে কলকাতা পালিয়ে আসে । অনেক ঘাটের জল খেয়ে শেষে একটা কনট্রাক্টটরের কাছে লেবারের কাজ করত । সেখানেই কাজ করতে করতে একটা ছোট দুর্ঘটনায় ওর একটা পা ভেঙে যায় । মালিকও তাড়িয়ে দেয় । হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ঘুরতে ঘুরতে দমদম ষ্টেসানে ঠেক । ওখানে ও ডোমের কাজ করে ।সেদিনের মারের ঘটনাটা সম্বন্ধে যা বলল সেটা নারী পুরুষের চিরন্তন কিসসা । ভগা সেদিন সকালে ওর আগের কন্ট্রাকটারের সঙ্গে দেখা করতে গেছল  । ওর কাছে কিছু টাকা এখনও  পাওনা আছে । সেই ছোটবেলা থেকে রিনীর খুব কালীঘাটে মাকে দর্শন করার ইচ্ছা । ভগাকে বলেও ছিল । সময় মেলে নি । ভগার একটা লুকানো জায়গায় কিছু টাকা থাকে । ভগা বেরনোর পর সেখান থেকে পঞ্চাশটা টাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল কালিঘাট । যাবার সময় বাসে গেছল । মাকে দর্শন করাবে বলে একজন প্রায় জোর করেই ওর বাকি টাকাটা ছিনিয়ে নেয় । বাসে ফেরার আর উপায় ছিল না । হেঁটে ফেরার সময় রাস্তা ভুলে টুলে ভগা ফেরার অনেক পর দমদম পৌঁছায় । ভগা ভেবেছিল পাখি উড়ে গেছে ।  একে টাকার শোক । তার ওপর না বলে চলে যাওয়া । এরই জেরে ওই নৃশংস কাণ্ড ।

আজ আসার সময় ওর জন্য আর একটা ভাল শাড়ি কিনে এনেছি । রিনী দেখে বলল, কাকু এসব শাড়ি-টাড়ি আমার কি হবে – তার চেয়ে একটা আশ্রয় দিন না কাকু – একটা কাজ । ইতিমধ্যে রিনী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার সম্পর্কে প্রায় সব কিছু জেনে নিয়েছে । আমার বউ  মেয়ের কথা ও জানে ।রিনী কিন্তু একবারও আমার বাড়ি যাবার কথা বলেনি। ওর এইটুকু জীবনের অভিজ্ঞতাই ওকে তা শিখিয়ে দিয়েছে । একে ও বাংলাদেশী । তার ওপর এখানে এসেছে বেআইনী পথে । একে ওকে ধরে হয়তো ওর একটা কাজের ব্যবস্থা করা যায় , কিন্তু আমারও পুলিশি ঝামেলায় জড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল । রিনী আমার কাছে ভগার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েছে । ভগা জেলে শুনে একচোট কান্নাকাটিও করেছে । আজ চলে আসার সময় আমাকে বলল, কাকু একটা কথা বলব । আমি সম্মতিসূচক তাকাতে ও বলল, আমাকে একবার ওর খবর এনে দেবেন – ও ছাড়া তো ইন্ডিয়ায় আমার নিজের বলে কেউ নেই । রিনী হাসপাতালের একটা পোশাক পরে আছে । মাথার চুল সবে গজাচ্ছে । কপাল থেকে একটা লম্বা স্টিচ মাথার পেছন পর্যন্ত চলে গেছে । মুখে চোখে এখনও অসুস্থতার ছাপ স্পষ্ট । কিন্তু ভগার কথা বলতে গিয়ে মুখে একটা লজ্জার ছটা ফুটে উটছে । মেয়েটা সত্যিই ভালবাসে ভগাকে । কিন্তু আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল । বেশ রাগত স্বরেই বললাম,  এখনও ওর খোঁজ করছ – সেদিনের কথা মনে নেই -আবার মারধর করবে – এবার কোনও রকমে বেঁচে গেছ – আমি পারব না । বলে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলাম । এতদিন মেয়েটার জন্য একটা মায়া কাজ করছিল । আজ বেশ রেগে গেলাম । ছোটলোক আর কাকে বলে । এই সব ছোটলোকদের লাই দিলেই হল – সাহস কি – আমাকে কিনা একটা ডোমের খোঁজখবর করে ওনাকে দিয়ে আসতে হবে । অনেক হয়েছে, আমি কাল থেকে আর আসছি না ।

পরের দিন থেকে হাসপাতালে যাবার কোনও প্ল্যানই ছিল না । কদিন তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ার জন্য অফিসের অনেক কাজ বাকি পড়ে ছিল । সেগুলো শেষ করে অফিস আওয়ার্সের প্রায় ঘন্টা খানেক পর বেরিয়েই একটা দমদমের বাস পেয়ে উঠে পড়লাম । ওঠার পর মনে হল, আজ সারাদিন  একবারও রিনীর কথা মনে আনিনি । কাল রাতে শপথও করেছিলাম । তা হলে । মনের অন্তস্থলে কি রিনী ঘাপটি মেরে বসে আছে । আমার চারিত্রিক দৃঢ়তা সম্পর্কে মা সারা জীবন সন্দেহ প্রকাশ করে এসেছে । তা বউ’এর মধ্যেও সঞ্চারিত । প্রায়ই কথা শোনায় । আমি নাকি বলি এক আর করি এক । ঠিকই বলে । ভাবলাম বাসে  উঠেই যখন পড়েছি ভগবানবাবুর খোঁজটা নিতে পারি কিনা দেখি । পরিমলকে আর আপডেট করিনি । ইচ্ছা করেই । ও থাকলে এখন সুবিধা হত । দমদম ষ্টেসানে জি আর পি অফিসে উঁকি মেরে দেখি বেলঘরিয়ার সেই সুনীলবাবু বসে আছেন । চোখাচোখি হতে চিনতে পারল বলে মনে হল না । চেনার কথাও নয় । গলা খাঁকারি দিয়ে ঢুকতেই পুলিশি মেজাজে বলল, কি চাই । চিনতে পারছেন – সেদিন পরিমল আলাপ করে দিল আপনার সঙ্গে, বুঝতে পারলাম বেশ আনস্মার্টলি ভাবেই বললাম । উনি সেই একই স্বরে বললেন, কোন পরিমল ? বলেই বললেন, ও আমাদের বেলঘরিয়ার পরিমলবাবু – হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে – আরে মশাই – কত লোকের সঙ্গে রোজ মিট করতে হয় – মনে রাখা খুব মুশকিল – বসুন বসুন । দায়টা আমার । বসে পড়লাম । চা বলি – বলুন কি ব্যাপার, বেশ উৎসাহের সঙ্গেই বললেন । আমি বললাম , না না চা খাব না – ট্রেনের দেরী আছে – ভাবলাম আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই । বেশ করেছেন – আমাদের সোশ্যাল লাইফ বলে তো কিছু নাই – এমনিতে পুলিশের সঙ্গে লোকে মিশতে চায় না – কথায় বলে না বাঘে ছুঁলে , বলেই হা হা করে হাসতে লাগলেন । আগের দিনই দেখেছিলাম ভদ্রলোক একটু বেশি কথা বলেন ।আমি সুযোগ খুঁজতে লাগলাম কখন কথাটা পাড়া যায় । মিনিট পাঁচেক পর ওনার কথার মাঝে বললাম, ভগার খবর কি ? ব্যাস আমাকে আর বলতে হল না । আর বলবেন না মশাই , কালই একটা রান ওভার হল – এই নিয়ে তিনজন – সেই শিয়ালদা থেকে ডোম আনাও – হুজ্জুতির একশেষ – পাবলিকের চাপে কাষ্টডিতে নিতে হল – একটা পেটি কেস দিয়ে কোর্টে চালান করে দিয়েছি – হপ্তা দুয়েক বাদে খালাস পেয়ে যাবে – এখন আলিপুর জেলে । তারপর রিনীর প্রসঙ্গে গেলেন, এদিকে তো মেয়েটা রিলিজ হয়ে গেছে – আটখানা স্টিচ পরেছিল মশাই – জান বটে – হাসপাতালে বলে কয়ে রেখে দিয়েছি – একা এনে কে দায়িত্ব নেবে মশাই – পেছনে লোক পড়ে যাবে – কম বয়স – বুঝলেন না । যা জানার জানা হয়ে গেছে । কথার মাঝে বাধা দিয়ে বললাম , আমার ট্রেনের সময় হয়ে গেছে – সুনীলবাবু । আসুন আসুন – আসবেন মাঝে মাঝে – আরে আপনাদের মত লোক মাঝে মাঝে এলে ভাল লাগে , ওনাকে আর বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম । সত্যিই তখন একটা রানাঘাট লোকাল ঢুকছিল । সামনের একটা ভিড় কামরায় নিজেকে গুঁজে দিলাম ।

আজ অফিস নেই । ঈদের ছুটি । সকালে বেশ জমিয়ে বাজার করলাম । গত রবিবার অফিসে কাজের নাম করে দুবেলাই হাসপাতালে গেছলাম । আজ সে উপায় নেই । সত্যি বলতে কি এখন সে প্ল্যানও নেই । বাজার বাড়িতে রেখে দুলালের বাড়িতে গেলাম । দুলাল আমার ছোটবেলার বন্ধু – একটা এনজিও হাসপাতালের সর্বময় কর্তা । দু একটা খেঁজুরে আলাপ করে রিনীর ঘটনাটা বললাম। অবশ্যই অনেকটাই বাদ দিয়ে । মাথার আঘাত – বাংলাদেশী – বাবার মৃত্যু – কেউ নেই , এগুলোর ওপর বেশি চাপ দিলাম । তারপর বললাম, তোদের হাসপাতালে তো অনেক আয়া টায়া নেওয়া হয় – মেয়েটার একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবি ? দুলাল বলল, দ্যাখ এমনিতে তো নেওয়াই যায় – আমাদের লোক লাগবেও – আর  এরকম পিছুটানহীন মহিলার দরকার আমাদের সব থেকে বেশি – তবে । আমি বললাম , আটকাচ্ছে কিসে । ঐ বাংলাদেশী – পাসপোর্ট ভিসা কিচ্ছু নেই , দুলাল বেশ চিন্তিত ভাবেই বলল । আমি বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বললাম, শুনছিস মেয়েটার অবস্থা – এখানে এসেছে দালাল ধরে – সে মাল পরিষ্কার ছেঁটে দিয়েছে ওকে । একটু থেমে বললাম, মেয়েটার  আর ফেরার উপায় নেই বুঝলি – একটা ব্যবস্থা কর না প্লীজ । দুলাল একটু থেমে – হয়তো আমার অবস্থা দেখে বলল, ঠিক আছে নিয়ে আয় – একটু শিখিয়ে পড়িয়ে আনিস – কি নাম বললি । আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম, রিনী  – মানে অর্চনা মণ্ডল।  দুলাল বলল, শোন – ও  সব বাংলাদেশী – টেশী বলা চলবে না – ভোটার কার্ড বা আধার কার্ড হারিয়ে গেছে – ওকে । আমি বললাম, সে তোকে ভাবতে হবে না ।

দুপুরে ভাত খেতে খেতে বউ বলল, চল না আজ একটা সিনেমা দেখে আসি – হলটা নাকি দারুণ সাজিয়েছে । মেয়েও বলল, যাও না বাপি – অনেকদিন দুজনে একসঙ্গে সিনেমা দেখতে যাওনি । আমি প্রস্তাবটা লুফে নিলাম । কিছুক্ষণ অন্তত ব্যাপারটা ভুলে থাকা যাবে ।

পরের দিন আবার অফিস কেটে হাসপাতালে গেলাম । রিনী অভিমান করে বলল কাল আসেননি কেন কাকু – আমি ভাবছি এই আসছেন আসছে্ন । আমি অফিসের দোহাই দিলাম । তারপর ভগার খোঁজ নেওয়ার কথা বললাম । রিনী উৎসাহিত হয়ে বলল, কবে ছাড়বে কাকু । আমি বললাম, মিনিমাম পাঁচ বছর – বেশিও হতে পারে । কোনও কথা না বলে ও আমার দিকে তাকিয়ে রইল । বেশ বুঝতে পারলাম, ঠোঁট কাঁপছে । প্রাণপণে কান্না আটকাবার চেষ্টা । একটা সহায় সম্বলহীন মেয়ের শেষ খড়কুটটাও চলে গেলে মুখের কি অবস্থা হতে পারে – তা বসে বসে প্রত্যক্ষ করলাম । আমি চাইছিলাম না মেয়েটার সঙ্গে ভগার আবার দেখা হোক । কান্না থামিয়ে রিনী বলল, আমি তাহলে কার কাছে থাকব কাকু – সবাই ছিঁড়ে খাবে – এদিকে নার্সদিদি বলছিল পুলিশ আমাকে ছেড়ে দিয়েছে – হাসপাতালও আমায় রিলিজ করে দিয়েছে – এখন আমি কি করব কাকু । ওকে একটু কাঁদতে দিয়ে  দুলালের এন জি ও’র কথা বললাম । রিনী এক কথায় রাজি হয়ে গেল । আবার কাঁদতে লাগল । আমি বললাম , কি হল । ও কাঁদতেকাঁদতে মোদ্দা যেটা বলল, পাঁচ বছর পর ভগা জেল থেকে বেরোলে ওকে যদি খুঁজে না পায় ।  তারপর শান্ত হয়ে বলল, আমাকে একবার জেলে ওর সঙ্গে দেখা করিয়ে দেবেন কাকু – তারপর ওখান থেকে আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন চলে যাব । আমি ওকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে নিরস্ত করলাম । রিনীকে বললাম, নার্স দিদিকে বলে রেখ কাল সকাল এগারটা নাগাদ তোমায় নিয়ে যাব । পরদিন অফিস কামাই করলাম ।

দিন পাঁচেক বাদে রবিবার দুলালের বাড়ি গেলাম । তার মাঝে দু-তিনবার ফোনে খবর নিয়েছি । দুলালের হাসপাতালে আমাদের পাড়ার চার-পাঁচজন মেয়ে আয়ার কাজ করে । আমার এক প্রতিবেশির ছেলে ওখানে ক্লার্কের কাজ করে । কথা প্রসঙ্গে দুলালের কাছ থেকে  এগুলো আমি পরে জেনেছি । তার প্রত্যেকেই আমাকে চেনে । নিজেকে প্রশ্ন করি, আগে জানলে কি আমি ওখানে রিনীর ব্যবস্থা করতাম না ! আবার মনে হল আমি নিজেকে ঠিক চিনতে পারছি না । তবে ব্যাপারটা জানাজানি হলে বউ-মেয়ের কানে যেত এবং সম্মিলিত প্রশ্নবানের মাঝে দাঁড়াতে পারতাম না । ভগার জেলের মেয়াদ সম্বন্ধে রিনীকে মিথ্যা কথা বলারও কোনও ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে । রিনীর খবর যদি ভগা পায় তাতে আমার কি ক্ষতি বৃদ্ধি হত জানি না । রিনীর প্রতি কি আমি দুর্বল !  এটা ভাবাটাও যে কত বড় অন্যায় এ বোধ আমার আছে । সেই স্টেশনে মাথায় ডাণ্ডা মারার দিন থেকে আজ অবধি যা যা করেছি তাতে নিজেকে লম্পট বলার কোনও কারণ দেখি না । রিনী যদি একটা মেয়ে না হয়ে একটা ছেলে হত – তাহলে কি আমি এত সময় দিতাম ! ভাবনাকে থামিয়ে দিয়ে বলি, অবশ্যই দিতাম ।

দুলাল বলল, মেয়েটা কাজের রে – বাংলা তো বটেই ইংরাজিও পড়তে পারে – দারুণ  কাজের মেয়ে – একদিন তো চব্বিশ ঘন্টা ডিউটি দিল । আমার শুনতে বেশ ভালই লাগছিল । একটা সৃষ্টির আনন্দ – আবিষ্কারের আনন্দ । একটা রাস্তার মেয়ের এই উত্তরণে আমারও কিছু অবদান আছে । বেশ কিছুদিন আর রিনীর কথা মনে পড়ল না । নিজের কাজের মধ্যেই বেশ কেটে যাচ্ছিল । প্রায় দিন দশেক বাদে অফিস টাইমে দুটো নাগাদ দুলালের ফোন, কিরে তুই বলেছিলিস মেয়েটার কেউ নেই – ওর তো বর এসে হাজির হয়েছে – প্রচণ্ড ঝামেলা করছে । আমি এতদিন যে কারণে যাই নি সে সব ভুলে গিয়ে বললাম, মালটাকে আটকে রাখ – আমি অফিস ফেরৎ যাচ্ছি ।

১০

অফিস থেকে ফিরে ভগার দেখা পাইনি । ও রিনীকে শাসিয়ে গেছে , কাল সকালের মধ্যে না গেলে ওকে জানে মেরে  দেবে । দুলালকে  সত্যিই খুব বিপদে ফেলে দিলাম । বিড়ম্বনার এক শেষ । ভগা শাসালে কি হবে – রিনী দুলালকে এই হাসপাতালে ভগার একটা কাজের জন্য বলেছে । ভগার ঐ চেহারা আর মারমুখী  ভঙ্গী  দেখে দুলাল রিনীর আবেদন তৎক্ষণাৎ নাকচ করে দিয়েছে । ঝোঁকের মাথায় হাসপাতালে চলে এসেছি । রিনীকে বলেছিলাম, ভগার পাঁচ বছর জেল হয়েছে । এখন দেখা হলে কি বলব । আর ভগাই বা রিনীর খবর পেল কি করে ।  দুলাল বলল, আরে একটা লোচ্চা মার্কা লোক – এক মুখ দাড়ি – দেখি রিনীর হাত ধরে টানাটানি করছে – যদিও এখানকার লোকেরা সব সামলে দিয়েছে – তোর ঐ রিনী বলছে যে মালটা নাকি ওর সোয়ামী । আমি বললাম, স্বামী কিনা জানিনা তবে ওর সঙ্গে থাকত – দমদম স্টেশনে – তোকে তো আগেই বলেছি । আমি কিন্তু এসব এলাও করতে পারব না – আমাকে আরও অনেককে নিয়ে এই হাসপাতালটা চালাতে হয়, দুলাল বেশ কড়া সুরেই বলল । আমি বললাম, এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিস না – আমি একটু কথা বলি – তুই বরং রিনীকে একবার ডাক । দুলাল আবার সেই মোক্ষম কথাটা বলল,  একটা স্টেশনের মেয়ে – তার ওপর বাংলাদেশী – কাগজ পত্তর কিছু নেই – ঝামেলায় পড়লে পুলিশ  ডাকতেও পারব না – বুঝতে পারছিস ব্যাপারটা – আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার – তোর অত আঠা কিসের রে । আমার আর বলার কিছু ছিল না । দুলাল যা বলছে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি । তবু একবার ডেকে দে, আমি শেষ চেষ্টা করি । দ্যাখ কথা বল – তবে আমি আর এখানে রাখতে পারবো না, বলে দুলাল ভিতরে চলে গেল । কিছুক্ষণ পর রিনী প্রায় ছুটতে ছুটতে এল । মাথায় এখন অনেকটাই চুল । এই এন জি ও’র পিঙ্ক রঙের শাড়ি আর সাদা ব্লাউজে খুব সুন্দর লাগছে  ওকে – একদম চেনাই যাচ্ছে না । কে বলবে এই সেই মেয়ে যাকে মাস দেড়েক আগে আমি দমদম ষ্টেসানে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখেছিলাম । আবার মেয়ের দেখানো সেই ভিডিওটার কথা মনে পড়ে গেল । মুখে একরাশ অভিমান নিয়ে বলল, এতদিন আসেননি কেন কাকু । বলেই কেঁদে উঠল । এ আমার কে । কেন জানি না আমার বুকের ভেতরটাও মুচড়ে উঠল । আমি তা চাপা দিয়ে বললাম, একদম সময় পাই নি – তা এসব কি শুনছি – ভগা এসেছিল – ও এখানকার খবর পেল কি করে ? ওকে তো জেল থেকে আগেই ছেড়ে দিয়েছে – আমি এখানকার এক দিদি – দমদম দিয়ে বাড়ি যায় – সেই দিদিটাকে দিয়ে পুলিশবাবুকে খবর পাঠিয়েছিলাম, বলেই বলল , আপনি রাগ করেছেন কাকু । সত্যিই আমি রেগে গেলাম । যদিও কেন রাগলাম জানি না । সেই ভাবটা রেখেই বললাম, শোন – একটা পরিষ্কার কথা বলি – যদি সুস্থ ভাবে বাঁচতে চাও – ভগার সঙ্গে কোনও রকম সম্পর্ক রাখা চলবে না – আমি দুলালবাবুকে বললে এবারের মত হয়তো মাফ করে দেবে – কিন্তু আর একবার ভগা এখানে এলে – এরা তোমায় তাড়িয়ে দেবে – এমন কি পুলিশের হাতেও তুলে দিতে পারে  । রিনী মাথা নীচু করে রইল । কোনও উত্তর দিল না । তারপর আরও মিনিট দশেক একই কথা বিভিন্ন ভাবে বললাম । রিনী আর মাথা তোলেনি । কেবল আসার সময় একবার ঘাড়টা শুধু নাড়ল । তখনও জানতাম না ওর মনের মধ্যে কি রসায়ন কাজ করছে ।

১১

এর ঠিক পাঁচ দিন পর অফিস থেকে সবে ফিরেছি , দুলালের ফোন, একবার বাইরে আয় । তখন রাত প্রায় নটা । বুঝলাম হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পথে দুলাল দেখা করতে এসেছে । নিশ্চয় রিনী আবার কোনও ঘোটলা পাকিয়েছে । বাইরে বেরিয়ে বললাম, চ চায়ের দোকানে বসি । দুলাল বেশ দার্শনিক ভঙ্গিতে শুরু করল, মানুষের ভাল করতে নেই বুঝলি – এই এন জি ও’তেই আমার বাইশ বছর হয়ে গেল – তারপর ধর বাবার – । আমি ওকে বাধা দিয়ে বললাম, রিনীর কি হয়েছে বল । দুলাল সোজা বিষয়ে চলে এল, কাল রাত থেকে রিনী বেপাত্তা – এদিক ওদিক অনেক  খোঁজা হয়েছে – পাওয়া যায় নি । বুঝলাম ও বেশ চাপে আছে । তারপরএকটু দম নিয়ে বলল, এ তো শালা পুলিশেও খবর দেওয়া  যাবে না – এদিকে এই কদিনেই আমাদের মেয়েগুলোর সঙ্গে ও বেশ মিশে গেছল – তারাও চাপ দিচ্ছে – পুলিশে খবর দিতে – মহা ঝামেলায় পড়েছি বুঝলি । আমি দুলালের অবস্থাটা অনুমান করতে পারছিলাম । আমি দুলালের হাতটা ধরে বললাম, আমিই তোকে এমন একটা অড সিচুয়েশানে ফেলে দিলাম – প্লীজ একটু মানিয়ে নে – আর মেয়েগুলোকে যা হোক  কিছু একটা বলে দিস । দেখা যাক – ম্যানেজ তো করতেই হবে – আমার কি ভয় হচ্ছে জানিস – এর পর যদি ওরা – আই মিন ওই ছেলেটার সঙ্গে – যদি কোনও ক্রাইম করে – আমি শালা ফেঁসে যাব । আমি ওর ভয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বললাম, ধ্যুস – ওসব কিচ্ছু হবে না । আরও দু এক কথার পর দুলাল চলে গেল । আমার সারারাত ঘুম এল না । রিনী নিশ্চয় ভগার সঙ্গে কেটেছে । রিনীর ভ্যানিস হয়ে যাওয়ার হাজার সম্ভাবনা কে একটা সরল সমাধানের মধ্যে পুরে দিয়ে শেষ রাতে সামান্য ঘুমতে পারলাম । এর পর আস্তে আস্তে রিনীকে ভুলে যেতে লাগলাম – না ভুলে আমার উপায়ও নেই ।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ