28 Feb

প্রথম অনুভূতি

লিখেছেন:সায়ন্বিতা সরকার


সকাল থেকেই মিষ্টির আজ মন খারাপ। আজ কলেজ যাওয়া নেই। মোবাইলে দেখলো সাতটা বাজে। আবার লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ ঢুকেই যাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে নেট কানেকশনটা অফ করে রাখলো। কিন্তু ঘুমটা এখন আর হবে বলে মনে হচ্ছে না।

বাইরে মায়ের হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে। “কি রে আর কতক্ষন বিছানায় পরে থাকবি?  আমাকে তো বেরোতে হবে। এই এক হয়েছে। বিয়ের বয়স হতে চললো, কিন্তু বাচ্ছাপনা গেলো না মেয়ের। চাকরিও হবে না এত আলসেমি করলে বুঝেছিস….।”

এইসব কথা শুনে শুনে প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে মিষ্টির। তার মনখারাপ আর কে বুঝবে। বাড়িতে প্রাণী তিনটি। মিষ্টি, মিষ্টির মা আর ঠাম্মা। এছাড়া ঝি চাকর। মিষ্টির জীবনটা ছোট থেকেই আর পাঁচটা বাচ্ছার চেয়ে আলাদা। যে সময়টা বাবা মা দুজনকে আঁকড়ে কাটানোর কথা, সেই সময় তার বাবা, মায়ের সঙ্গে সব সম্পর্ক ত্যাগ করে চলে যান। ছোটবেলায় অতো কিছু বুঝতো না সে। ভাবতো বাবা চাকরির কাজে বাইরে গেছে। কিন্তু যত বড় হয়েছে বুঝেছে। এখন মাঝে মাঝেই মিষ্টির মনে হয় কতটা দয়া মায়াহীন হলে কোনো তিন বছরের বাচ্ছাকে ছেড়ে তার বাবা চলে যেতে পারে। বাবা এখন অন্যত্র সংসার পেতে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী, বাচ্চাকে নিয়ে ভালোই আছেন। ঠাম্মার থেকে সে শুনেছে, বাবা মার সমন্ধ করে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু সম্পর্কে ফাটল ধরার কারণ তার অজানা। বাবাকে ওর খুব নিষ্ঠুর লাগে। মনে আনতে চায়না। তবে সম্পর্ক ব্যাপারটা নিয়ে খুব জটিল ভাবে চিন্তা করে মিষ্টি। ভালোবেসে বিয়ে করেও তো শুনেছে অনেক ছাড়াছাড়ি হয়। তবে ভালোবাসাটা কি খুব কষ্টদায়ক কিছু যেখানে বেশিরভাগ সময়েই আঘাত ছাড়া কিছু জোটে না।

মিষ্টি শুনেছে বিয়ের আগে থেকেই ওর মা কেন্দ্রীয় সরকারের বড় পোস্টে চাকরি করতো। এখনো করে। ইচ্ছা করলেই মাও ডিভোর্সের পর আরেকটা সংসার পাতাতেই পারতো। মা দেখতেও যথেষ্ট সুন্দরী। কিন্তু মা এই সংসারের মায়ায় পরে গেছিলো হয়তো। তাই এখানেই থেকে গেছেন। অথবা তার কথা ভেবেও হতে পারে। দাদু দিদা অনেক আপত্তি করা সত্ত্বেও শোনেননি। ঠাকুরদাকে চোখে দেখেনি মিষ্টি। শুনেছে তিনিই নাকি মাকে পছন্দ করেছিলেন। মায়ের বিয়ের একবছর পরই মারা গেছিলেন তিনি। ঠাম্মা তাঁর ছেলের নোংরামো সহ্য করতে না পেরে মন থেকে একপ্রকার ত্যাজ্যপুত্রই করে দিয়েছেন বলা চলে। আরেক ছেলে বিদেশে। তাই ঠাম্মার সবটুকু এখন সে আর তার মা। মাকে ঠাম্মা বরাবরই বৌমা না ভেবে মেয়ের সম্মান দেন। সেদিক দিয়ে মা খুব ভাগ্যবতী বলতে হবে। কিন্তু ভালোবাসা জিনিসটা বড় অদ্ভুত। কিছুতেই মনের দ্বন্দ গুলো কাটেনা মিষ্টির। সমীকরণ মেলাতে পারেনা। স্কুলে পড়াকালীন অনেককে ভালো লাগতো ওর। এমনকি বেশ কয়েকজন স্যার কেও। পরে সেই ভালোলাগাগুলো আপনা থেকেই কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। পাশের বাড়ির নিতাই জ্যেঠু আবার ছোটবেলা থেকেই তার বাবা নেই বলে খুব ভালোবাসা দেখাতো।  যেন তিনিই ওর বাবা। মা আর ঠাম্মার আড়ালে আদর করতেনও খুব বিশ্রীভাবে। সেই আদরে আর যাই থাকুক ভালোবাসা ছিল না। পরে সাহস করে মাকে একদিন বলতেই মা জ্যেঠুর এ বাড়িতে আশা বন্ধ করে দিয়েছিল। সেই নিয়ে পাড়ার লোক মাকে অনেক কটু কথাও শুনিয়েছিল। এখন বুঝতে পারে মিষ্টি লোকটা কতটা বদ ছিল।

মা ও ঠাম্মার মতো মিষ্টিও বলতে নেই ভালোই সুন্দরী ও স্মার্ট। তবে কলেজের অন্যান্য সুন্দরীদের মতো ঢঙ বা ন্যাকামি তার একটুও আসেনা। ছেলেদের সাথে বন্ধুত্বের ব্যাপারে সে যথেষ্ট সাবলীল। একদিকে সুন্দরী অন্যদিকে ডাকসাইটে। আবার প্রেসিডেন্সির ফিজিক্স অনার্সের পার্ট ওয়ান ব্যাচের ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট সে। ফলে অনেক ছেলেই তার পিছনে ঘুর ঘুর করে। তবে সে সবার সাথে বন্ধুর মতোই মেশে। কিন্তু অনেক ছেলেই এই বন্ধুত্বটাকে ভেবে নেয় তার প্রতি দুর্বলতা। আগের বার ভ্যালেন্টাইনস ডে’র দিন তিনটে আলাদা বিভাগের দাদা একইদিনে প্রপোজ করেছিলো। ভয়ে পরের সাতদিন কলেজই যায়নি মিষ্টি। পরে ঠাম্মা সহজ সমাধান দিয়েছিল। সবাইকে নির্ভিকভাবে মিষ্টি বলে দিয়েছিল, সে এখন শুধু পড়াশুনা নিয়েই ভাবতে চায়। পরে এসব ভেবে দেখবে।

ঠাম্মা তার ভীষণ ভালো বন্ধু। মানুষটা কত পুরানো দিনের অথচ ভাবনা চিন্তা কত আধুনিক। মা চাকরির কারণে তাকে খুব একটা সময় দিতে না পারলেও  ঠাম্মা তার এই অভাব পূরণ করে দেয়। ঠাম্মার নাকি অনেক ছোট বেলায় বিয়ে হয়েছিল। ঠাম্মা একদিন তাকে গল্প করেছিল, ঠাম্মারও নাকি ভালোবাসার মানুষ একজন ছিল। সে যুগের প্রেমের মাধ্যম বলতে  চিঠি। ঠাম্মা নাকি তাকে চিঠি লিখতো। সেই মানুষটির লেখা অনেক চিঠিও নাকি ঠাম্মার কাছে অনেকদিন ছিল। ঠাকুর্দাকেও নাকি ঠাম্মা সব বলেছিল। আগেরকার দিনে অধিকাংশ প্রেমই অসমাপ্ত থেকে যেত বোধহয়। মনের ভালোবাসা মনেই থাকতো। কিন্তু সেটাও ভালো ছিল। এখনতো ভালোবাসা মানেই কিছুদিনের মধ্যেই শারীরিক সম্পর্ক আর তারপর ব্রেকাপ। সব যেন কেমন লোক দেখানো।

“কি দিদিভাই আজ বুঝি কলেজ নেই? এখনো লেপের তলায়।” ঠাম্মার গলার আওয়াজে ভাবনার তার কাটে মিষ্টির।

—– না দিভাই আজ যাবো না। আজ শুধু পাশের ক্লাস ছাড়া কিছু নেই।

ছোটবেলা থেকেই ঠাম্মা মিষ্টিকে ডাকে দিদিভাই বলে আর মিষ্টি ঠাম্মাকে দিভাই বলে।

“তা মুডটা আজ মোটে ঠিক নেই মনে হচ্ছে।”

—– উফফ দিভাই, তুমি কি করে আমার মুখ দেখে সব বুঝে যাও বলোতো?

“আরে বয়সটা কি কম হলো।

মিনতি আমায় আর দিদিভাইকে এক কাপ চা দিয়ে যা দেখি।”

‘ও তোমরা বসে পড়েছো গল্প করতে। যাইহোক আমার হাতে আর একটুও সময় নেই । আমি আসলাম।” কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে বেরিয়ে গেলেন ইন্দ্রানী দেবী অর্থাৎ মিষ্টির মা।

—— বাবা পুরো ঝড় যেন। বলে ওঠে মিষ্টি।

নাতনির কথা শুনে হেসে ওঠে সত্তর বছরের বৃদ্ধা।

ইতিমধ্যে চাও এসে গেছে।

চায় চুমুক দিয়ে মিষ্টি বলে, আমার কিছু ভালো লাগছে না দিভাই। কিন্তু ভালো না লাগার কারণটাও ঠিক পরিষ্কার নয়।

“দিদিভাই প্রেমে পড়েছিস বুঝি? জানিস তো প্রেমে পড়লে এরকম অকারণ ঘন ঘন বিরহ হয়।

—- ধুৎ । তুমি না পারোও বটে।

“বলনা আমাকে। আমি কি আর তোর মাকে বলে দিচ্ছি নাকি!”

—– জানিনা দিভাই। তোমার আমাদের কলেজের অভিষেককে মনে আছে; এই দেখো ছবি দেখাচ্ছি, আমাদের বাড়িতেও এসেছিল একবার সবার সাথে, চিনতে পারছো?

মোবাইলে ছবি দেখায় মিষ্টি তার ঠাম্মাকে।

“হ্যাঁ মনে পড়েছে।”

—- ও আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল যেন।

“ছিল কেন এখন আর নেই বুঝি?”

—- আরে শেষ করতে দাও। বাকি বন্ধুদের মতো ঠিক ও নয়। ও যদিও খুব বড়লোক বাড়ির ছেলে কিন্তু ওর মনটা খুব ভালো। সবার বিপদে পাশে দাঁড়ায়।পড়াশুনায় মোটামুটি।কিন্তু খুব ভালো গান গায় আর কবিতা লেখে। তাইতো আমার সাথে ভালো ফ্রেন্ডশিপ হয়ে গেছিলো। কিন্তু ওর একটা খুব বাজে অভ্যাস আছে যেটা আমার একটুও ভালো লাগে না। ও একটু ফেসবুক পাগলা আছে।

“মানে?” ঠাম্মার চোখে বিস্ময়।

—— মানে আর কি। আমিও তো ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ করি। কিন্তু ওর কাছে কিছু পার্সোনাল নেই। সব ফেসবুকে জানাতে পারলেই ওর শান্তি। আর ওর এই স্বভাবটাই আমার ভালো লাগে না।

“তুমি ওর ভালোলাগায় হস্তক্ষেপ করছো কেন দিদিভাই। তোমার কি সমস্যা হচ্ছে ওর ফেসবুক করা নিয়ে?”

—– আমার সমস্যা অন্য জায়গায়। ওর সাথে মাঝে মাঝে এদিক ওদিক যাই । এই ধরো কোথাও খেতে গেলাম কি সিনেমায় গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে ও আমাকে ট্যাগ করে … ও তুমিতো আবার ট্যাগ বুঝবে না। মানে আমাকে সঙ্গে নিয়ে এবং আমার প্রোফাইলে আমাকে অ্যাড করে ছবি দেয়। আমিও ট্যাগ রিমুভ করে দি, কিন্তু তাও বারেবারে একই কাজ করে।

এই নিয়ে অন্য বন্ধুরা আমায় প্যাঁক মারে।

সেদিন টিউশনের পর ওর সাথে অনেকক্ষন কলেজ স্কোয়ারে বসেছিলাম। এমনিই গল্প করছিলাম। ও দুটো নতুন কবিতা লিখেছিল, পড়ে শোনালো। ওকে বারণ করেছিলাম কাউকে বলতে। কিন্তু ও রাতে ফেসবুকে আপডেট দিলো, ‘ফিলিং কুল। আজকের সন্ধ্যাটা দারুন কাটলো। থ্যাংক ইউ মিষ্টি।’

ব্যাস সব বন্ধুরা জেনে গেল। রাগে আমি গত সপ্তাহ থেকে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছি।

“কিন্তু এখন তাহলে মন খারাপ কেন দিদিভাই। যা চেয়েছিস তাইতো করেছিস।”

—– ও অনেকবার ফোন করেছে। কলেজে দুদিন ধরে অনেক কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমি ওকে জাস্ট পাত্তাই দিইনি। কাল রাত থেকে আমাকে ফাইনালি ফোন করা বন্ধ করেছে। কিন্তু কেন জানিনা আমার ভালো লাগছে না কিছু।

“তুমি প্রেমে পড়েছো দিদিভাই। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।”

—– কি বলছো দিদি। আমি , মোটেই না।

“আমিতো বুঝতে পারছি লক্ষণ। ঠিক আছে আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে আরো দুদিন অপেক্ষা কর। দেখবি তখন নিজেরই ইচ্ছা করবে ওর সাথে কথা বলার জন্য। আসলে ভালোবাসা আর ভালোলাগার মধ্যে তফাৎ আছে দিদিভাই। ভালো অনেককেই লাগতে পারে কিন্তু ভালোবাসা সেটা আলাদা জিনিস।”

—– তুমি মনে হচ্ছে এ ব্যাপারে পি এইচ ডি করেছো দিভাই।

সেদিনের পর আরো দুদিন কেটে গেছে। অভি আর ফোন করেনি। কাল কলেজ গেছিলো মিষ্টি দেখা পাবার আশায়। কিন্তু কাল অভি আসেনি।

গতদুদিন ধরে ফেসবুকেও কোনো আপডেট নেই। যে ছেলে পাঁচ মিনিট অন্তর একটা স্ট্যাটাস দেয় তার হলোটা কি। ভেবে পায়না মিষ্টি। তাহলে কি অভিও মিষ্টির মতো মনখারাপের অসুখে ভুগছে।

ডিনার টেবিলে আজ মিষ্টি, মা, ঠাম্মা একসাথে খেতে বসেছে। গত দুদিন ধরে মায়ের ফিরতে দেরি হচ্ছিল বলে একসাথে খাওয়া হচ্ছিলো না। আজ মিষ্টির মা প্রথম বললো, কি ব্যাপার মিষ্টি দুদিন ধরে দেখছি কিছু নিয়ে খুব ভাবছিস। পড়াশুনা নাকি অন্য কিছু?

ঠাম্মা বললো, “ওর আসলে মনে একটু সংশয় চলছে। তুমি ভেবোনা। এই বয়সে এসব একটু হয়ে থাকে।”

মিষ্টির মা খানিক গম্ভীর হয়ে থাকে। তারপর বলে, দেখো তোমার বয়স আমিও পেরিয়েছি। আগে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তারপর বাকি সব। তোমার বাবাকেও কিন্তু আমি খুব ভালোবাসতাম। কিন্তু সে আমার ভালোবাসা নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। আমি যদি বেকার হতাম তাহলে নিজের জীবনটা আজ হয়তো ধুলোয় মিশে যেত। তাই যাই করো নিজের কেরিয়ারটা আগে গুছিয়ে কোরো।

রাতে ঘুম আসছিল না মিষ্টির। গল্পের বই পড়তেও আজ আর ভালো লাগছে না।

ভোর রাতে ঘুম এলো মিষ্টির। ঘুম থেকে উঠে দেখে  অনেক বেলা হয়ে গেছে। আজ রবিবার। তাই কেউ আর ডাকেনি। মুখ ধুতে বেরিয়ে মিষ্টি দেখলো ঠাম্মা বসে বারান্দায় কাগজ পড়ছে। মা বোধকরি বাজারে গেছে।

ঠাম্মা বললো, “দিদিভাই এদিকে আয়।  তোকে তোর বন্ধু এই বইটা দিয়ে গেছে।”

ঠাম্মার মুখে মুচকি হাসি।

বইটা হাতে নিয়েই চমকে ওঠে মিষ্টি। এটাতো আগের মাসে অভিকে পড়তে দিয়েছিল সে। এক ছুটে ঘরে গিয়ে বইটা নিয়ে ঘরে ঢোকে । অভি এলো অথচ তাকে ডাকলো না ঠাম্মা। তবে কি…..।

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বইটা নড়াচড়া করতে গিয়ে পায়ের সামনে একটা ছোট্ট চিরকুট পড়ায় তুলে নিয়ে বিছানায় বসে পড়তে শুরু করে মিষ্টি। পরিষ্কার অভির হাতে লেখা,

Dear মিষ্টি,

সেদিন তোর সাথে কাটানো সন্ধ্যার কথা ফেসবুকে দেয়ায় খুব চটেছিস জানি। তার জন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। দেখ আমি টুকটাক লিখি বটে তবে তোর মতো আসে না। গল্পের বইও আমার ঠিক না পসন্দ। আমার ওর চাইতে fb করতেই বেশি ভালো লাগে। তাই যা বুঝছি তাতে তুই উত্তরে গেলে আমি দক্ষিণ । তবে কি জানিস বিপরীতেই জমে ভালো। অনেকদিন ঝগড়া করিনি । মিস করছি। দয়া করে বারবার হোয়াটস অ্যাপে অনলাইন হয়ে আমায় চেক না করে বরং একটা রিপ্লাই করিস কাল বিকালে ফাঁকা আছিস কিনা। হ্যাঁ , বলতে প্যারিস খানিকটা রেগে আমিও আছি। তোর ঠাকুমাকে বইটা দিয়েই চলে এলাম। তুইতো আবার সবই মান্ধাতার আমলের হালচাল পছন্দ করিস তাই চিঠিই দিলাম। তা বলে আবার ভাবিস না যে এবার থেকে হোয়াটস অ্যাপ ছেড়ে  তোকে চিঠি লিখবো। চিঠি পেলে পিং করিস। ততক্ষন অবধি বাথরুমে গেলেও ফোন নিয়ে যাবো।

—–অভি

চিঠি পরে অনেকক্ষন হাসলো মিষ্টি। সত্যি পাগল , পুরো পাগল একটা।

ফোন খুলে পিং করে মিষ্টি।

সাথে সাথে উত্তর আসে, কাল সময় হবে?

—- কোথায় যাবি সেটাতো বল। পার্কে বা সিনেমায় যেতে পারছিনা।

পাগল তোকে নিয়ে পার্কে বা সিনেমায়। আমার কি পেট খারাপ না মাথা! বাগবাজার ঘটে আসছি। ঠিক বিকেল 5 টায়।

বলেই অফলাইনে।

মাথায় কিছুই ঢোকে না  যাক তার বাড়ি থেকে বেশি দূরের পথ নয়। মিষ্টিদের বাড়িটা উত্তর কলকাতার বেশ পুরোনো বাড়ি। অভিদের বাড়ি উল্টোডাঙ্গার কোথায় একটা। চেনে না মিষ্টি।

পরেরদিন উত্তেজনায় পাঁচটার বেশ খানিক আগেই পৌঁছায় মিষ্টি । ওই তো অভি।  যে ছেলে সবসময় লেট করে আসে সে আজ ওর আগে!  ঘাটের উল্টোদিকে এখন অনেক মানুষেরই ভিড়। জেটিতেও তাই। তারই মধ্যে একফালি জায়গা বার করে বসে ওরা। বল কি ব্যাপার। মিষ্টিই প্রথম শুরু করে।

‘কি ব্যাপার মানে। এমনি ই ডাকলাম।  তোর সাথে অনেকদিন দেখা হয়নি তাই।’

—– ও। তা কলেজ যাচ্ছিস না কেন!

‘ধুর এখনতো ক্লাসও কম হচ্ছে। তাছাড়া মামাতো দাদার বিয়ে ছিল বলে দুদিন মামারবাড়ি ছিলাম। তোর খবর বল…।‘

কথা বলতে বলতে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। গঙ্গার পারে মৃদু হাওয়ায় সন্ধ্যা নামে। অভি হটাৎ বলে, তোকে কিছু একটা বলার ছিল মিষ্টি। কিন্তু মনে করতে পারছিনা।

মিষ্টির মুখে দুস্টু হাসি খেলে যায়। বলে, থাক আর মনে করতে হবে না। মনের কথা তুই মনেই রাখ। সব কথা না বললেও চলে। চল এখন উঠি। কি খাবি বল।

চল আজ তোদের পাড়ার মোড়ে যে  ফুচকা বসে খাবো। একেবারে কম্পিটিশন করে খাবো।

এবার সত্যি হাসবে কি কাঁদবে বোঝে না মিষ্টি। যে ছেলে খাবার কথা উঠলেই, মিয়ো আমোরে বা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ঢোকে সে আজ মিষ্টির পছন্দের ফুচকা খাবে। এটা একটু বাড়াবাড়িই হয়ে যাচ্ছে।

ফাইনালি পঞ্চাশ টাকার ফুচকা খেয়ে মিষ্টি বলে, আর পারবোনা বস। টাকা মিটিয়ে মিষ্টি বাড়ির দিকে এগোবে, হটাৎ হাতটা চেপে ধরে অভি। কেমন অদ্ভুত একটা অনুভুতি হয় মিষ্টির। এর আগেও অনেকবার হাত ধরে হেঁটেছে ওরা কিন্তু আজকের অনুভূতিটা কিরকম আলাদা। মিষ্টি অভির দিকে তাকাতেই সে বলে  ওঠে, ‘রাগ কমেছে মেয়ের?’

এবার মিষ্টি হেসে ফেলে। হাত ছেড়ে মিষ্টির গালটা আলতো করে টিপে দেয় অভি। বলে, চল সাবধানে বাড়ি ঢোক। আমি আসি। এগিয়ে যায় অভি। মিষ্টি দাঁড়িয়ে থাকে খানিকক্ষন। মনে হয় এটাই প্রেমে পড়ার প্রথম অনুভুতি। তাদের এই মিষ্টি মুহূর্তের সাক্ষী থাকে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের মৃদু আলো।

বাড়ি ঢুকে মিষ্টি বুঝতে পারে আজ মনটা একদম ভালো হয়ে গেছে তার।। সেই মন খারাপ ভাবটা আর নেই। দিভাই তাহলে ঠিকই বলেছিল তাকে। পড়ার বই নিয়ে বসে, কিন্তু মনে শুধু বিকালের কথাই ঘুরপাক খায়। ঠাম্মা আসে ঘরে।

“কি দিদিভাই মনের মেঘ সরেছে?”

লজ্জা পায় মিষ্টি। ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, তুমি ঠিক বলেছো দিভাই; ভালোবাসা আর ভালোলাগা দুটো আলাদা। আজ বুঝলাম।

ঠাম্মা একটু হেসে চলে যায়। মিষ্টি শুধু মনে মনে ভাবে, সত্যি এই ভালোবাসার সম্পর্ক বড় অদ্ভুত। সে নিজেও জানে না আজ যা হলো তার শেষ পরিণতি কোথায়। তবে এটুকু জানে অভি তার মনের মধ্যে চিরকাল থেকে যাবে। সে কাছে থাকুক আর দূরে।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ