28 Feb

লিঙ্গুইস্টিক

লিখেছেন:সুকল্প দত্ত


ভিড়ের কিন্তু দারুণ একটা অনুভব থাকে।এক লাইন দাও হে আমি ভিড়ের কথা বলি। আমি ভিড়ের মাঝে প্রতিদিন বাসে-ট্রেনে-ট্রামে ঝুলি।‌ভিড়ের মধ‍্যে আমি খুঁজি দুটো মুখ।একমুখ লাবণ্য,আর একমুখ দাড়ি। আমার বারবার ভুল।গন্ডগোল,গন্তব্যে অমিল। দুই মুখে দুই গোলার্ধ দাখিল।

প্রতিবছর মাহেশে রথের মেলায় নিয়ে যেত স্কুল থেকে। আমার জুনিয়র কৈবল্য ভীড় দেখলেই কনুই মারত। মারতোই না শুধু,মেরে বলতো ‘এক্সট্রমলি সরি’।অথচ ৩৭৭ আইন হবার আগে আমার বন্ধু রূপমকে সে দিয়েছিল এক তড়তাজা প্রেমপত্র।আমরা সকলেই কমবেশি সমপ্রেমে পড়েছি। আমার এক প্রেমিক ছিল ইন্দ্র। আমি জবাফুল নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করেছি কতদিন মাইরি ‘A’ মার্কা সেকশনে। দাড়িমুখো ইন্দ্রকে হলঘরের নির্জনে ডেকে চুমু খেয়েছিলাম ফেয়ারওয়েলের দিন। ইন্দ্রর ক্লাস নাইনেই ঘনদাড়িতে মুখ ঢেকে যায়। সে কাঁদে।ওর কান্না চেটে নিয়ে বলি-

‘আসছে বছর তোকে একটা মেয়ে খুঁজে দেব’।

তা সেই ইন্দ্রর সঙ্গে গেলবার রি-ইউনিয়নে দেখা।নতুন নম্বর নিলাম।সেদিন মনে পড়ছিল আমাদের পুরোনো কথা। হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছিলাম। মদ খাওয়ার নেমন্তন্ন করল।তার সবকটা দাড়ি গেছে পেকে। আমার খুঁজে দেওয়া মেয়ে নিয়ে গাদা বাচ্চাময় সংসার। অলাভজনক কিছু নয় তা।বহুপরে আমি বিট কবি অ্যালেনের নাম শুনেছিলাম। সে ভালোবাসতো আরেক বিট কবি পিটারকে। পিটারও ছিল ইন্দ্রের মতোই সংসারী। ইরাবতিকে সে কথা বলিনি কখনও। বললে হয়তো কিনসে স্কেল দিয়ে মাপতো। ইরাবতির সঙ্গে দেখা হয় ডাইনিংয়ে,বিছানায় ও চিড়িয়াখানায়।প্রত্যেক শনিবার সে আর আমি অফিসফেরতা যাই জন্তু-জানোয়ার দেখতে।

আমি ভীড়ের মধ্যে এই দু’জনকেই খুঁজি। ইরাবতি ও ইন্দ্র। আমার প্রথম ও শেষ প্রেমিক-প্রেমিকা।একজনের সঙ্গে বয়েজ স্কুলে দেখা আর একজনের সঙ্গে কো-এড কলেজে। অনেককে বারবার উল্কি তুলতে হয়। কারণ তারা জামা বদলাবার মতো বারবার প্রেমিকা বদলায়।কিন্তু আমাকে বদলাতে হয়নি।ইরাবতী ও ইন্দ্র।ইন্দ্র ও ইরাবতী। দু’জনের আগেই হ্রস্ব-ই কার। দু’জনেই ‘i’ দিয়ে শুরু। আমার কব্জিতে নামের পাশে প্লাস ‘i’ থেকে গেল। আর বদলালো না। ইন্দ্রকে কোনোদিনও মাঠে নামতে দেখিনি, তার গলা ছিল দরাজ। আর ইরাবতি? সে তো রুটি বেলতে গিয়ে প্রতিরাতে ভারত গড়ে ফেলে।

সবাই জানলা দখল করতে চায়। জানলা দিয়ে দেখতে চায় পৃথিবী। হোস্টেলে যার যার জানলার ধারে চৌকি ছিল সে লাকি,ট্রেনে যার জানলার ধারে সিট সে’ও।ভিনসেন্টের বেডরুমের ছবিগুলোয় জানলা খুব সিগনিফিকেন্ট। ইরাবতি আজ জানলার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে ছিল বহুক্ষণ। কেন আমি জিজ্ঞেস করিনি।তারপর সামনের ফ্ল্যাটের যে লোকটা ওকে হাঁ করে দেখে,তাকে দেখে সরে এসে পর্দা টেনে দিল। হয়তো ও আজ আলমারি ঘাটতে গিয়ে,বলা ভালো পুরোনো ডাইরি ঘাটতে গিয়ে ইন্দ্র’র সব কথা জেনে ফেলেছে তা অনুমান ক‍রি।

পাওয়ার কাট। সিলিং ফ্যানটা  চুপ মেরে থাকে তালপাতার পাখার কাছে। ইরা হাওয়া দেয়। ইদানীং ইরার চুল উঠে যাচ্ছে। গুঁড়ো সিঁদুরে যে পারদ থাকে,তার পারা দিন দিন চড়ে যাওয়ায় ব্রহ্মতালু গড়ের মাঠ হয়ে এসেছে। তার সবকটা চুল উঠে গেলে কীভাবে রাত কাটাব ভাবতে ভাবতে ফিনকি দিয়ে ওঠে কান দু’টো। দেখি টাকমাথা ইরা চুমু খাচ্ছে আমায়।তার গোটা মুখ লাবণ্যে ভরে যায়।সে কাঁদে। ওর কান্না চেটে নিয়ে বলি- ‘আসছে বছর তোমাকে একটা ছেলে খুঁজে দেব’।

[বানানবিধি লেখকের নিজস্ব]

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ