02 Jan

হাসির রচনাকে নির্দিষ্ট সীমারেখায় বাঁধা যায় না

লিখেছেন:তারাপদ রায়


প্রশ্নঃ সাহিত্যে নির্ভেজাল আনন্দরস বা হাস্যরস যেন দিনে দিনে লুপ্তই হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয় – কেন?

উত্তরঃ কখনও কিছু হঠাৎ লুপ্ত হয়ে যায় বলে মনে হয় না। রমরমার কম-বেশি হতে পারে। তবে বাংলা সাহিত্যে হাস্যরসের প্রাধান্য কখনই ছিল না। ত্রৈলোক্যনাথ, ইন্দ্রনাথ, পরশুরাম, শিবরাম এঁরা অবশ্যই স্মরণীয়। কিন্তু বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যের ঠিক কতখানি অংশ জুড়ে এঁরা রয়েছেন সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। আমার তো মনে হয়, যে কোন ভাষার সাহিত্যে শতকরা একভাগও যদি রম্যকাহিনী বা রম্যরচনা হয় সেটাও খুব বেশি। পত্র-পত্রিকায় প্রতিদিন প্রতি সংখ্যায়, প্রতি পৃষ্ঠায় হাসির লেখা থাকবে মাসে মাসে শ’-এ শ’-এ হাসির বই বের হবে এরকম ভাবাটাও একটা হাস্যকর ব্যাপার।

প্রশ্নঃ একটি উচ্চবর্ণের হাসির লেখায়, যা ভাঁড়ামিতে পরিণত হবে না, কী কী বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত বলে আপনার মনে হয়?

উত্তরঃ এ-বিষয়ে একজন লেখক হিসেবে আমার পক্ষে কোনও সাহিত্যতত্ত্ব নির্দেশ করা উচিত কাজ হবে না। তবে একটা ভাল হাসির গল্পের কী কী বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তা জানতে হলে বাংলায় পরশুরামের অথবা ইংরেজিতে স্টিফেন লিককের যে কোন গল্প পড়লেই জানা যাবে।

প্রশ্নঃ এ-প্রসঙ্গে পরশুরাম থেকে শিবরাম পর্যন্ত কাকে আপনার ভাল লাগে?

উত্তরঃ বাংলা সাহিত্যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ হাসির লেখক পরশুরাম। যদিও শিবরামের আমি একজন অতি পুরনো ভক্ত। শিবরামীয় অনুপ্রাস গল্পের স্বাদ গ্রহণে অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া পৌনঃপুনিকতার দোষে তিনি দোষী। তবু তিনি বড় জাতের, বড় মাপের লেখক। এমন সরল, অনাবিল হাসির রচনার লেখক যে কোন সাহিত্যের পক্ষেই গৌরবের। কেউ কেউ বলতে পারেন শিবরামের বহু বিখ্যাত রচনা আসলে বিদেশী গল্পের ছায়া। কিন্তু সে-দোষে তো আমি নিজেও দোষী, এমন কি স্বয়ং পরশুরামও। আসলে হাসির গল্পকে কোনও নির্দিষ্ট সীমারেখায় বেঁধে রাখা সম্ভব নয়। ব্যবহার করার মুনিশিয়ানাটাই আসল কথা।

প্রশ্নঃ কবি হলেও বেশ কিছু হাসির লেখাও আপনি লিখেছেন। এই লেখার উপাদান, যেমন ধরুন, ‘কাণ্ডজ্ঞান’-এর টুকরো টুকরো ঘটনাগুলির উৎস কী?

উত্তরঃ বহুকাল আগে আমি যখন প্রথম ধারাবাহিক রম্যরচনা লেখা শুরু করি, সে প্রায় ত্রিশ-বত্রিশ বছর আগে, নক্ষত্র রায় ছদ্মনামে ‘অমৃত’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় ‘অদ্বিতীয়’ দিয়ে, তখন প্রায় সবই বানিয়ে লিখতাম। এর প্রায় কুড়ি বছর পরে দেশ পত্রিকায় কাণ্ডজ্ঞান শুরু করে প্রথমে আমি মৌলিক রচনারই চেষ্টা করেছি কিন্তু তারপরে আর পারিনি। কারণ গত দশ-বারো বছরে বাহান্ন সপ্তাহের মধ্যে অন্তত চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ সপ্তাহ আমাকে ধারাবাহিক রম্যরচনা লিখতে হেয়েছে দেশ, আনন্দবাজার, আজকাল এবং আরও অন্যান্য পত্রিকায়। এই মুহূর্তে আমার রম্যরচনার বইয়ের সংখ্যা এগারো। সর্বসমেত রম্যরচনার সংখ্যা প্রায় হাজারের কাছাকাছি। এছাড়া হাসির গল্পের সংখ্যাও বোধহয় শতাধিক হবে। এর অনেকটাই বানিয়ে নিজের মন থেকে লেখা আবার কখনও কখনও দেশী-বিদেশী হাজার রকমের রঙ্গ রসিকতা, আমার নিজের ভাষায় আমি এসব রচনা মালায় জুড়ে দিয়েছি। কখনও বই থেকে টুকে, কখনও অনুবাদ করে কখনও বা লোকমুখে শুনে। আমি জানিনা এদেশে তো নয়ই, অন্য কোনও ভাষায় আর কেউ এরকম হালকা রচনা দিনের পর দিন মাসের পর মাস লিখে গেছেন কিনা। একটা উদাহরণ দিই, শুধু ডাক্তারের ওপর আমার রম্য নিবন্ধের সংখ্যা অন্তত কুড়িটি, হাসির গল্প গোটা পাঁচেক। অর্থাৎ প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ হাজার শব্দ আমি ডাক্তারদের নিয়ে লিখেছি যা সবই হাসির ব্যাপার। মাতালের কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকের বিষয়ে বোধহয় লিখেছি এরও দ্বিগুণ। বিলিতি হাসির গল্পের বইয়ে আমার বাসা-বাড়ি ছেয়ে গেছে। আমি জানিনা, এ-জাতীয় বইয়ের এত বিশাল সংগ্রহ কলকাতায় আর কারও আছে কিনা। ফুটপাত থেকে কেনা প্রচ্ছদহীন বইয়ের সঙ্গে বড় দোকান বা বইমেলা ঘুরে ঘুরে কেনা সরস গ্রন্থের মূল্যবান সংস্করণ নিয়ে আমার মূলধন এখন বিরাট। কৃতজ্ঞচিত্তে এই বইগুলির কাছে আমার ঋণস্বীকার করতে বাধা নেই, আমার লেখার একটা বড় অংশ এসেছে আমার সংগৃহীত বইগুলি থেকে।

প্রশ্নঃ কবিতা ও রম্যরচনা আমি একই মন নিয়ে লিখি। বহুকাল আগে যখন আমি কবিতা লিখতে শুরু করি তখন স্থির করেছিলাম, এমন কবিতা লিখব না যা বহুজন বোধ্য নয়, মনে মনে প্রতিজ্ঞা ছিল কবিতার ভাষাকে নিয়ে আসতে হবে মুখের ভাষার কাছে। কখনও সে পদস্খলন হয়নি এমন নয় – ছন্দ, কারিকুরির লোভে, চমকের প্রয়োজনে বহুবার এদিক-ওদিক হয়েছে। তবু আজও আমি কবিতার ভাষাকে কথা বলার ভাষা থেকে দূরে রাখতে পারি না। রম্যরচনার ক্ষেত্রে আমার জনপ্রিয়তার খবর, দুঃখের বিষয় আমি জেনে গেছি, কিন্তু ব্যাপারটা আমার ভাল লাগে নি। অবশ্য বই বিক্রি হয়, লেখা ছাপা হয় সে তো আছেই কিন্তু ছুটির দিনে সকালে লক্ষ লক্ষ পাঠকের সঙ্গে যখন লেখার মধ্য দিয়ে দেখা হয়, আমার লেখা পড়ে যখন তাঁরা খুশি হন একটু হাসেন, হয়ত বহু শোনা, বহুপুরনো একটা গল্প পাঠ করে আরেক জনকে বলেন বা শোনান সেটাই আমার পরমপ্রাপ্তি।

সাক্ষাৎকার ভিত্তিক অনুলিখন/সূত্র- ওভারল্যান্ড,২৬ সেপ্টেম্বর,১৯৯৩

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ