17 Apr

কাগজের নৌকো

লিখেছেন:অনিলেশ গোস্বামী


মাঝে মাঝে লক্-আউট , লে অফ্ , সাসপেনশন অফ ওয়ার্ক – এইসব নিয়েই এখানে বেশিরভাগ চটকল চলে অথবা চলেনা । দেখলেই বোঝা যায় । শ্রমিকদের কোয়ার্টারগুলো নোনাধরা , দেয়ালে কোথাও কোথাও ইঁট বেরিয়ে গেছে । এখানেই শ্রমিক ইউনিয়নের অফিস । তার অদূরে লম্বা ড্রেনটা পেরোলেই একটা বিরাট বটগাছ । তার একদিকে মুদির দোকান আর অন্যদিকে একটা বড়সড় চায়ের দোকান যেটা সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত সরগরম থাকে।

এখানেই পশ্চিম ঘেঁষে যে পাঁচিলটা একদিকে একটু কাৎ হয়ে একটা ডুমুর গাছের গায়ে হেলে আছে সেখান থেকে সামান্য বাঁদিকে গেলেই লালুর বাসা। এইটাই আস্তানা লালুর অর্থাৎ লালমোহন সিং এর পরিবারের। লালু তার বৌকে ডাকে ‘ রাই ‘ বলে । তার আসল নামটা যে ‘ রুক্মিনী ‘ সেটা বোধহয় এই দশবছরে রাই নিজেও ভুলে গেছে । সে আজকের কথা নাকি। দেখতে দেখতে দশ দশটা বছর পেরিয়ে গেলো । রুক্মিনী তখন বারাউনি রেলকোয়ার্টারে কাজ করতো । সুন্দর মিষ্টি চেহারা । কোয়ার্টারে থাকতো যে স্টোরবাবু ,তারও রুক্মিনীর ওপর  নজর ছিলো ।লালু সেখানেই তাকে প্রথম দেখেছিলো। প্রথম দর্শনেই প্রেম । রাইয়েরও শক্তপোক্ত টগবগে লালুকে দেখে খুব ভালো লাগলো । তারপর নানা ছুতোয় মাঝেমধ্যে একটু আধটু দেখা হওয়া । দুজনেই বুঝতে পারছিলো খুব বেশিদিন তারা পরস্পরের থেকে দূরে দূরে থাকতে পারবেনা ।

তারপর অনেক কান্ড করে সবাইয়ের অলক্ষ্যে এক গভীর রাতে তারা পালিয়ে গেলো বহুদূরে। এখানে ওখানে ঠোক্কর খেতে খেতে নোঙর ফেলেছে কলকাতার উপকণ্ঠে এই জুটমিলে । কাজ করে মিলের কার্পেট সেকশনে । প্রথম প্রথম কিছুদিন ভালোই চলছিলো কিন্তু তারপর মাঝে মাঝে মিলে লক্-আউট চলে । তখন লালুর ঘরে নিত্য অভাব , অশান্তি লেগে থাকে । ঝগড়া হলেই লালুর চণ্ডালের রাগ , তখন আবার মুখে খিস্তি খেউড়ের বন্যা । দিশি কিছুটা পেটে পড়লে তো কথাই নেই , তখন বেধড়ক পেটায় বৌকে । আশ্চর্যের ব্যাপার , রাই কিন্তু পরে সব ভুলেও যায় । সে ভাবে রাগের মাথায় একটু আধটু না পেটালে আবার মরদ কিসের ! তবে অভিমান কি আর হয়না ।

গত তিনদিন ধরে একটানা বৃষ্টি হয়ে চলেছে । কখনো কম , কখনো বেশি। আকাশটা যেন ফুটো হয়ে গেছে কোনো যাদুবলে । দুজনেই সকাল থেকে ঘরবন্দি । পুরো একটা সপ্তাহ হয়ে গেলো মিল বন্ধ আছে । সবাই জানে আলোচনা চলছে খোলবার জন্যে , এখনো  দুপক্ষের গ্রহনযোগ্য কোনো পথ পাওয়া যায়নি ।

কয়েকদিন থেকেই চাল বাড়ন্ত । ওদের বাচ্চা দুটো সকাল থেকে এদিক ওদিক ভিজে ভিজেই খেলে বেড়াচ্ছে ।

রাই গুম মেরে দরজার কাছে বসে । গতরাতে ওদের মধ্যে প্রচণ্ড বচসা হয়েছিলো , তারপর লালুর মেজাজের ওপর আর লাগাম ছিলোনা । প্রচণ্ড মারধোর করে ফেলেছে রাইকে । সেই কারণে রাই এর সর্বাঙ্গে ব্যাথা , ভালো করে বসতে পারছেনা ।

বৃষ্টি আরও বাড়তে লাগলো , সেই সঙ্গে প্রবল হাওয়া । নর্দমাগুলো জলে টইটম্বুর । রাই দেখছিলো তাদের কোয়ার্টারের সামনে নর্দমার চলমান জলস্রোতে কেউ একটা কাগজের নৌকো ভাসিয়েছে । তখনও ভিজে চুপসে যায়নি বলে নৌকোটা  বেশ তরতরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে । দশবছর আগের স্মৃতি রাইকে কিছুটা উদাস করে দিলো । তার মনের পর্দায় ভেসে উঠছিলো বারাউনির রেলকোয়ার্টারে কখনো কখনো এইরকম অবিশ্রান্ত বৃষ্টির সময় তার কি ফূর্তি , কী আনন্দ । তখন সে নিজেও ভাসাতো কাগজের নৌকো ।

হঠাৎ পিঠের ওপর একজনের হাতের স্পর্শ । রাই চমকে উঠলো । দেখে লালু তার শরীর ঘেঁষে ঘন হয়ে বসে আছে । বুঝতে পারলেও রাই কিছু না বোঝার ভান করলো । একটু পরে বললো , ” কিরে আবার মারবি নাকি ? মার্ , মার্ , মেরেই ফ্যাল্ একেবারে ।” শেষের কথাগুলো বলার সময় তার গুমরে ওঠা কান্না মিশে গেলো ।

রাই বুঝতে পারলো লালু তার খোলা পিঠের ওপর নিজের গালটা রেখেছে।

সামনের পথঘাট , উপচে পড়া হাইড্রেন আর প্রবল বর্ষার জলোচ্ছ্বাস রাইএর দুচোখের বাঁধভাঙা অশ্রুধারায় মিলেমিশে একাকার ।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ