17 Apr

কয়েকটি গল্প

লিখেছেন:হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়


হাত

শরীর মানেই কি আড়াল-আবডাল? শরীর মানেই কি অন্ধকার গলি-ঘুঁজি? শরীর মানেই কি ঘরের জানলায় ফুটো? শরীর মানেই কি কাপড়ের ফাঁক-ফোকর?

পুকুরে ডুব দিতে গিয়ে বাসন্তী পুকুরের জলে নিজের শরীর দেখে। শরীর তো নয়, যেন একটা ভাঙা নৌকো। তবুও দেখে। পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখে। বাসন্তী আজ আর নিজেকে আড়াল করে রাখে না। না, লজ্জা হয় না। শরীর বলার মতো কিছুই তো নেই।

কী অত দেখে! একটা শরীরে কতবার হাত রাখা যায়! প্রতিবার কি নতুন নতুন রূপে ধরা দেয়। যে দেখে তার চোখে একটা শরীর কি অনেকবার জন্ম নেয়? সেজন্যেই কি সারাজীবন ধরে সে শরীরে এসে বারবার হাত রাখে?

ভেজা কাপড় ছেড়ে বাসন্তী একটু রোদে বসে। মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। বেশ একটু শীত শীতও করছে। বসে থাকতে থাকতে শুয়ে পড়ে বাসন্তী। এটাও তো একটা হাত। একটা আরাম সারা শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। ঠিক এই সময়েই বাসন্তীর নিজের শরীরের ওপর ঘেন্না হয়। এটা যদি সত্যিই একটা শরীর হতো তাহলে এ জীবনে একটা অন্তত রোদের হাত আসত।

 

বাসস্টপে

বাসস্টপে একটামাত্র লোক দাঁড়িয়েছিল। বাসস্টপটা এমন একটা জায়গায় যে চারপাশে কোনো বসতি আছে বলে মনেই হয় না। অথবা জায়গাটা এই এলাকার একটা অলংকারের মতো। সংসারজীবনে বিধ্বস্ত কোনো মানুষ এই জায়গায় দাঁড়িয়ে অনায়াসে যেন একটা সমাধান বিন্দুতে পৌঁছতে পারে। যদিও লোকটাকে দেখে একবারের জন্যও মনে হচ্ছিল না সে কোনো সমস্যায় জর্জরিত। বরং মনে হচ্ছিল সে যেন এই জায়গার একজন উপযুক্ত মানুষ।

অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি। বাস আসার নামই নেই। একটা নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষার পর পায়চারি করছি। কিন্তু দেখলাম লোকটা স্থির হয়ে একজায়গায় বসে। আমার পায়চারি দেখে বললো, ” যার জন্যে পায়চারি করছেন তার কথা একবার ভাবুন। আপনি যেমন তাড়াতাড়ি যেতে চাইছেন, সেও তেমনি তাড়াতাড়ি আসতে চাইছে। কিন্তু রাস্তায় আমাদের মতো হাজার হাজার মানুষের চাওয়া তাকে আটকে রাখে।”

লোকটার মন্তব্য আমার পছন্দ না হলেও একটা ব্যাপার আমাকে ভাবিয়ে তুললো। সত্যিই তো, বাসস্টপে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই বাসের চিন্তায় ডুবে থাকলেও বাসের কথা আমরা ক’জন ভেবে উঠতে পেরেছি ?

প্রায় এক ঘন্টা অপেক্ষার পর বাস এলো। আমরা দুজনেই উঠে পড়লাম। সারা রাস্তায় লোকটা বাসস্টপের মতো চুপচাপ তো ছিলই, উপরন্তু দু’একজনের সঙ্গে হেসে কথাও বললো। মনেই হবে না তার যাত্রা একঘন্টা পিছিয়ে গেছে। অথচ আমি রেগে রেগে অগণন কথা বলে যাচ্ছিলাম, যার সবকটাই বাসকে নিয়ে কিন্তু বাসের জীবন নিয়ে নয়।

 

গরমের দিন

ভিজে গামছাটা শুকাতে দিতে বারান্দায় এলো সলিল। আজ ভয়ঙ্কর গরম। গতমাসেও এখানে বসে ছিল বাবা। এইরকম গরমে সারাটা দুপুর বারান্দায় বসে থাকত। ঘরে পাখার নিচে কিছুতেই বসতে চাইতো না। বলত, শরীরকে সবকিছু সহ্য করাতে হয়। রাস্তা দিয়ে কোনো ফেরিওয়ালা গেলেই তাকে ডেকে জল বাতাসা খাইয়ে তার সঙ্গে গল্প করত। বাবার কাছে গরমের কথা বলা যেত না বলে গরমও খুব একটা লাগত না। আসলে গরমকে তো লুকিয়ে লুকিয়ে রাখতে হত। এইভাবেই গরম যেন কখন গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল।

এখন বারান্দাটা ফাঁকা। দু’একজন খোঁজ নেওয়া ছাড়া বারান্দার সামনে আজ আর কেউ দাঁড়ায় না। বাড়িটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেছে। বছর দশেক আগে বাড়ির সামনের বটগাছটা কেটে দেওয়ার পর কয়েকমাস যেমন হঠাৎ করে গরম বেড়ে গিয়েছিল, আজকের গরমটাও যেন সলিলের সেরকম মনে হচ্ছে।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ