30 Sep

দেবেশ রায়ের মুখোমুখি -২য় পর্ব

লিখেছেন:আলাপেঃ অনিন্দ্য সৌরভ


[দেবেশ রায়ের জন্ম ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ডিসেম্বর  অধুনা  বাংলাদেশের পাবনার বাগমারা গ্রামে।  তাঁকে বাংলা কথাসাহিত্যের সেই বিস্ময়কর লেখকদের একজন বলে মনে করা হয়  যিনি আখ্যানের ফর্ম বা আঙ্গিক নিয়ে  আজীবন সচেতন ভাবে ভেবেছেন। উপন্যাস বা আখ্যানরীতি নিয়ে তিনি ছিলেন একজন  গভীর অন্বেষণকারী । এখানেই তিনি স্বতন্ত্র, সমুজ্জ্বল।  মাত্র কয়েক মাস আগে ২০২০র ১৪ মে দেবেশ রায়ের জীবনাবসান হয়। তাঁর লেখালিখি নিয়ে, গল্পের  ফর্ম নিয়ে, উপন্যাসের ভাবনা নিয়ে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন লেখক ও অনুবাদক অনিন্দ্য সৌরভ। সাক্ষাৎকারটি ইতিপূর্বে ‘শিল্প সাহিত্য’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আরও বেশী পাঠকের  কাছে  সাক্ষাৎকারটি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে লেখকের অনুমতিক্রমে তা ‘গল্পের সময়’এ তা প্রকাশ করা হল। পড়ুন সাক্ষাৎকারটির  দ্বিতীয় পর্ব।]     

( প্রথম পর্বের পর)

দেবেশ :     প্রথম কথা বলছি, আকার বা টেকনিকের বাইরে কোনও শিল্প হয় না। দ্বিতীয়ত, এই আকার তার নিজস্ব কতগুলো শর্তে গড়ে ওঠে। যেমন স্কাল্পচার, মূর্তি, তার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে  যে মাসটা তৈরি হল তার ওজনটা কোথায় দেবে। ওজন কোথা থেকে মাটির ভিতরে যাবে, স্কাল্পচারের এটা একটা মৌলিক সমস্যা। এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। পিকাসোর বিখ্যাত মূর্তি আছে – একটি মেয়ে স্কিপিং করছে। মূর্তিটার বিখ্যাত হবার কারণ, এর সামঞ্জস্য এবং ওজন। স্কিপিংয়ের দড়িটা মাটিতে ছুঁয়ে আছে এক জায়গায়। পুরো ব্রোঞ্জের ওয়েট ওই জায়গা দিয়ে মাটিতে চলে যাচ্ছে। এইভাবে শিল্পের আকার, তার সামঞ্জস্য এবং তার সমতা রাখা হয়। যদিও এমন অনেক বড় লেখা আছে যাতে এর কোনোওটাই নেই, তবু লেখাটা মহৎ। এর কারণ, যখন আপনি লেখাটা পড়েন, তখন এদিকে মন না-দিয়েই পড়েন।

অনিন্দ্য :     ব্যালান্স বা সামঞ্জস্য নেই অথচ মহৎ লেখা, এমন দু-একটি লেখার উদাহরণ কি দেবেন? আমাদের বুঝতে সুবিধে হবে।

দেবেশ :     বিভূতিভূষণের “আরণ্যক’’। কেন নেই, কারণ উপন্যাসের সূত্রপাত যে ধরণ দিয়ে, শেষটায় সেই ধরণ লেখকের আর মনে নেই। অথচ ঐ লেখার ভিতর যে কী অসামান্য শিল্প – যা আমি ছাড়তে রাজি নই।

অনিন্দ্য :     তাহলে কোনও উপন্যাসে ব্যালান্সের অভাব থাকলেও মহৎ হয়ে উঠতে পারে যদি তার মধ্যে অন্যরকম তাৎপর্যপূর্ণ উপাদান থাকে?

দেবেশ :     এই জায়গাতে আমি ওভার ফরমুলেট করতে চাই না। যে কোনও শিল্পের আকারে নিজের ভিতরকার সামঞ্জস্য এবং ব্যালান্স – এ দুটো থাকতেই হবে, না থাকলে সেটা টেঁকে না, ভেঙে যায়। একমাত্র প্রাকৃতিক আকারের থাকে না, কারণ সেই আকারের কোনও মানে নেই। আবার সেরকমও অনেক লেখা হয়, অতীতে লেখা হয়েছে। এর খুব বড় উদাহরণ ‘ডন কুইকজোট’। আমাকে যদি বলেন, আপনার মত অনুযায়ী এর ব্যালান্স আর সামঞ্জস্য করে দিন, তাহলে আমি মনুমেন্ট থেকে ঝাঁপ দেব। আর ওটাই তো বাহার! শেষ পযন্ত একটা মহৎ ঔপন্যাসিক কল্পনা এমন জায়গায় গেছে… আমি একজন ছোট লেখক হিসেবে ছোট জায়গার কথা বলছি, বড় লেখকদের বড় জায়গার কথা কী করে জানব!

অনিন্দ্য :     উপন্যাসের যে যে পর্বে বাঘারু থাকে সে সে পর্বে মাদারির মা অনুপস্থিত, আবার মাদারির মা’র পর্বটা যেন এক স্বতন্ত্র আখ্যান, মূল কাহিনীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত নয়। এ সম্পর্কে আপনার পরিকল্পনাটা যদি একটু বলেন।

দেবেশ :     হতেই পারে। হয়তো সত্যিই বিচ্ছিন্ন।

অনিন্দ্য :     ওটা কি আপনি প‍রে পরিকল্পনা বদল করে যুক্ত করেছেন।

দেবেশ :     না, কোনও কৃত্রিমতা নেই।

অনিন্দ্য ;     শুনেছি ‘পথের পাঁচালি’র প্রাথমিক খসড়ায় দুর্গা চরিত্রটা ছিল না। পরে ভেবেচিন্তে …

দেবেশ :     তার মানে উপন্যাসটা তখনো সম্পূর্ণ হয়নি। সেজন্যই বের করেন নি।

অনিন্দ্য :     আমার মনে হয় আপনি প্রথমে বাঘারু‍কে নিয়ে উপন্যাস লিখলেন। পরে মনে হয়েছে শুধু বাঘারু নয় – মাদারি, মাদারির মা প্রভৃতি চরিত্রও এতে দরকার। তাই নতুন চরিত্র যোগ করে নতুন করে লিখলেন – ভাবনাটা পূর্ণতা পেল। আমি আপনার লেখার প্রসেসটা জানতে চাইছি।

দেবেশ :     প্রসেসটা বলা যায় বানিয়ে টানিয়ে।

অনিন্দ্য :     বানিয়ে নয়, যা ঘটেছিল তাই শুনতে চাইছি।

দেবেশ :     ওই সমগ্রতা, যাকে আমি নভেলি কল্পনা বলছি, তার মধ্যে সেই সমগ্রতা যতক্ষণ না এসেছে, ততক্ষণ কল্পনা সমগ্র হয়নি। এমন হতেই পারে, কল্পনার সমগ্রতা গ্রাহ্য হলে আপাত বিচ্ছিন্নতা আপনার মতো পাঠকের মনে হয়েছে। এখানে বিচার্য বিষয়, কল্পনার সমগ্রতা আছে কী না। ওতে এক ধরনের কৃত্রিমতাও আছে, যেন বাঘারু তার একটা উত্তরসুরী পেয়ে গেল। আবার একটা বাঘারু  তৈরি হবে। সেটা যে খুব একটা আমাকে টানে নি, তাও না। কিন্তু সেটাই একমাত্র থিম না। দুর্গার উদাহরণ দিলেন। যতক্ষণ পর্যন্ত দুর্গা না এসেছে ততক্ষণ বিভূতিবাবুর ঔপনাসিক কল্পনা সমগ্রতা পায়নি। এটা সম্পূর্ণ হওয়ার ব্যাপার। আপনি প্রসেস জানার কথা বললেন। প্রসেসটা বলামাত্র এটা তুচ্ছ হয়ে যায়।

অনিন্দ্য :     তবু পাঠকের জানার কৌতূহল হতে পারে। মাদারির মা কি প্রথম থেকেই আপনার মাথায় ছিল না পরবর্তীকালে?

দেবেশ :     না, শুধুমাত্র পাঠকের কৌতূহল মেটাতে তা বলা যায় না। … মাদারির মা প্রথম থেকে ছিল না।

অনিন্দ্য :     সেটাই আমার মনে হয়েছে।

দেবেশ :     কিন্তু উপন্যাস-পাঠকের সমগ্রতাবোধ যদি এতটা যান্ত্রিক হয় যে শেষে একমাত্র সেইসব চরিত্রই আসবে যেগুলো আগে প্রস্তাবিত তাহলে …

অনিন্দ্য :     তা নয়। তবে …

দেবেশ :     এটার প্রসেস বলতে গেলে গল্প বলতে হবে, যে তারপর বছর কাটল, তখন আমি ভাবলাম কী করে শেষ করব। তারও গল্প আছে কিন্তু সে গল্প বলব না। কারণ এটা নভেলটির নির্মাণের উপাদান নয়। ফর্স্টার, ইংরেজ ঔপন্যাসিক নভেলের সংজ্ঞা দিয়েছিলেন – অনলি কানেক্ট। এই কানেক্ট করাটা যুক্তির ব্যাপার নয়।

অনিন্দ্য :     সম্ভবত সত্তরের দশকে তিস্তাপারের জীবন নিয়ে আপনি কয়েকটি গল্প লিখেছিলেন। আশির দশকে সেই জীবন ও পরিবেশ নিয়ে লিখলেন সুবৃহৎ “তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ – যা আপনাকে লেখক হিসেবে অন্য একটি উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ২০০০এ দেখি, তিস্তাপারের কাহিনী বৃত্তের অন্ত বাস্তবে হয়নি। এবার আরও বড় করে তিস্তা এসে হাজির – পুরাণের চেহারায়। দীর্ঘকাল কলকাতাবাসী হবার পরও দেখছি, লেখকের চোখ থেকে তিস্তার ঘোর কাটেনি।

দেবেশ :     কাটবে কেন?

অনিন্দ্য :     কলকাতায় আপনি দীর্ঘদিন আছেন। তবু তিস্তা আপনাকে ছাড়ছে না কিংবা আপনি তিস্তাকে ছাড়ছেন না। এটা কেন হচ্ছে?

দেবেশ :     একজন লেখককে পড়ার এটা একেবারেই ভুল পদ্ধতি। পৃথিবীতে অজস্র লেখক আছেন যিনি একটা টোপোগ্রাফিতে থেকেই তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলো লিখে গেছেন। এগুলো তথ্য হিসেবে লক্ষ্যণীয় কিন্তু তার বাইরে, লেখকের জীবনে বা লেখকের চৈতন্যে এর কোনও সার্থকতা খোঁজা, আমার মনে হয় না ঠিক। জেন অস্টিন সম্পর্কে বলা হয়, তিনি আসলে একটা গ্রামের পাঁচটা বাড়ি নিয়ে তাঁর উপন্যাসগুলো লিখেছেন। তিস্তাকে আমি ছেড়ে আসতে পারছি না বা আমাকে তিস্তা ছাড়তে পারছে না এভাবে বললে যে রোমান্টিসাইজেশন হয়, সেটাই ভুল। আমি শুধু বলতে পারি এবং এটাই সত্য ঘটনা, তিস্তাপারের বৃত্তান্ত লেখার পর যখন ‘তিস্তাপুরাণ’ লিখতে শুরু করলাম, সেটা খুব আচমকা, আগে ভাবিনি। এই ঘরে আমার বন্ধু অমিতাভ দাশগুপ্ত এসে বসে আছে, গল্প হাতে নিয়ে যাবে। গল্প লিখতে লিখতে হঠাৎ বোঝা যায় যে আমি একটা জায়গায় রিচ করছি। এটা যেমন হয়, তেমনি একটা জায়গায় রিচ করার জন্য আবোল তাবোল ভ্যানতাড়া করে যাচ্ছি, এটাও হয়। দুটোতে একই নিবিষ্টতা দরকার। এক জায়গায় এসে আমার মনে হল, এটা বড় গল্প হতে পারে। আমি খুব তাড়াহুড়ো করছিলাম, অমিতাভ বসে আছে। তা আমি বললাম, “আমি, একটা দিন সময় দে, কাল তোর বাড়িতে ঠিক পৌঁছে দিয়ে আসবো।” ও বলল, “ওরকম অনেক শুনেছি, তাড়াতাড়ি দাও”। বললাম, “ভালো গল্প হত কিন্তু।” ও বলল, “আমার অত ভাল দরকার নেই। একটু খারাপ হলেও চলবে।’’ এরপর গল্পটা এগুতে পারে না। তাই সেখানেই দাগ দিয়ে ছেড়ে দিলাম। নাম দিলাম “তিস্তাপুরাণ’’। পরিচয় শারদীয় সংখায় বেরুল। নামটার কারণেই আমার মনে পড়ল, কারণ সেই ছবি, চিন্তাটা এত চকিতে এসেছে যে হারিয়ে যা‍ওয়ার ভয় খুব বেশি। কিন্তু মনের মধ্যে সেটা ভীষণ আসা যাওয়া করছিল। পরদিন দুপুরবেলা আমি শুয়েছিলাম, একটু আচ্ছন্নভাবে, ঘুমের মতো। অন্য উপন্যাসের ক্ষেত্রেও আমার এরকম হয়। আমি ক্রমাগত শুনতে পাচ্ছিলাম “তিস্তাপুরাণ’’ বলে যা লেখা হয়নি, তার সংলাপ। সংলাপ একটা মানুষ বলে, চরিত্র বলে। চরিত্রগুলো আসছিল, যাচ্ছিল। তাদের সংলাপ পরিষ্কার ভাষায় শুনতে পাচ্ছিলাম। শোনাটা অবশ্য আমার খুব বেশি ঘটে। যেন কেউ ডিকটেশন দিচ্ছে, আমি লিখছি। ডিকটেশন ছাড়া আমি বোধহয় খুব কম লিখেছি। সেজন্য আমার লেখায় সাধারণভাবে প্রথম খসড়াতেও কাটাকুটি থাকে না। যা হয় সেটা হল – পরিষ্কার ঝরঝরে একশো পৃষ্ঠা হয়তো বাদ দিয়ে দিলাম।

অনিন্দ্য :     সেই পৃষ্ঠাগুলো নষ্ট হয়ে গেল?

দেবেশ :     আমার ছেলে ঠাট্টা করে বলে, হরাইজেন্টাল সিফ্‌ট। মানে আমি লাইনে লাইনে কাটি না। … ফাইনালাইজ করার আগে হঠাৎ মনে হল …

অনিন্দ্য :     এটা ম্যাচ করছে না?

দেবেশ :     এটা হল না। যোগেন মণ্ডল নিয়ে সেরকম সংকটের মধ্যে আছি।

অনিন্দ্য :     সেজন্যই উপন্যাসটা এখনো কমপ্লিট হয়নি?

দেবেশ :     কমপ্লিটের দিকেই যাচ্ছে। প্যাঁচে পড়েছি, তবে একটা সুর ধরেছি। তিস্তাপুরাণে যেমন ঘটেছিল। মানে যে সুরটা শুনতে পাই, আমি যদি স্পিরিচুয়ালিজমে বিশ্বাস করতাম, তাহলে, এটা বানিয়ে বানিয়ে অনেকদূর বলা যেত। আমি সেসব কিছু বলছি না। ডিকটেশন শুনতে পাচ্ছি, সেজন্য আমার ঘুম আসেছে না। কিন্তু ঝোঁকটা আমার ঘুমের দিকে। তখন আমি ‘ধুৎ তোরি’ বলে উঠে টেবিল চেয়ারে বসে, প্যাড বের করে লেখা শুরু করলাম। ব্যাপারটার হান্টিং থেকে আমি মুক্তি চাই। আমি যদি লেখার লজিকের ভিতর ঢুকে যেতে পারি, তখন নিজেকে সংগঠিত করতে পারব। নিজেকে সংগঠিত করতে পারছি না অথচ লেখাটা আমাকে হান্ট করছে – ভূতের মতো কথা বলে যাচ্ছে – এটা একটা অসহ্য অবস্থা।

অনিন্দ্য :     মফস্বলি বৃত্তান্ত থেকে শুরু, তারপর আমরা একে-একে পেয়েছি তিস্তাপারের বৃত্তান্ত, সময়-অসময়ের বৃত্তান্ত, আত্মীয় বৃত্তান্ত। তা নামের শেষে বৃত্তান্ত কেন?

দেবেশ :     বলতে পারেন খানিকটা প্লেসমেন্টের সমস্যা। লক্ষ্য করবেন, আমার গল্পের নামগুলো আলাদা। এখন বাংলায় সেই ট্র্যাডিশনটা এসেছে নামকরণ থেকেই বোঝা যায় এটা বানানো মানে নামটা। … ধরুন তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’। গণদেবতা একটা নাম হল? গণদেবতা একটা বিশেষণ – একটা লোক সম্পর্কে বলা যায়। উপন্যাসের নাম কী করে হবে? সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের নামকরণ সবচেয়ে ভাল। যত কম সম্ভব শব্দে – গোরা, চতুরঙ্গ, ঘরে বাইরে। আমার মনে হত, বাংলা উপন্যাসের নামকরণের মধ্যে একটা মিথ্যে আছে। ভুল কথা বলা হত, ভুল ইঙ্গিত দিয়ে পাঠককে ডাকা হত। ভুল মানে – ইচ্ছাকৃত না।

অনিন্দ্য :     তাহলে নামকরণ আপনার যথার্থ মনে হত না?

দেবেশ :     যথার্থ কী না কথাটা তা নয়। তাঁরা তাঁদের বইয়ের নাম তাঁদের মতো করে করেছেন। আমার মনে হত, এতে একটা মিথ্যা কাজ করছে। লেখক তার গল্পকে প্রেজেন্ট করছেন, তিনি প্রেজেন্টার। নামকরণ আসছে শেষে, তার আগে তিনি গল্প লিখছেন। তা নিজের গল্পটা কি তিনি ঐ পড়লেন? সেদিক থেকে একটা অসন্তুষ্টি আমার ছিল। আরেকটা হচ্ছে, আমি চাইছিলাম উপন্যাসের আকারের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সাহিত্যের মডেলটার অসম্ভব সাযুজ্য – এটা ভাঙতে। মনে হয়েছিল – বৃত্তান্ত, পুরাণ – এই সমস্ত যোগ করে দিলে আমার লেখার গঠন সম্পর্কে একটা মন্তব্য করে দেওয়া গেল। এমন কী ‘ব্যক্তিগত ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে একটি উপন্যাস’ – আমি এইরকম নামও দিয়েছি।

অনিন্দ্য :     বৃত্তান্তের পর প্রতিবেদনে চলে এলেন। …

দেবেশ :     বৃত্তান্ত আর প্রতিবেদনের মডেল আলাদা। প্রতিবেদন মানে রিপোর্টিং।

অনিন্দ্য :     শিল্পায়নের প্রতিবেদন, একটা ইচ্ছামৃত্যুর প্রতিবেদন-এ দেখছি, প্রথম অধ্যায়টি যেন নন-ফিকশন, দ্বিতীয় অধ্যায় থেকে মূল ফিকশন আরম্ভ হয়েছে। একটি তাত্ত্বিক ভূমিকার পর মূল কাহিনী।

দেবেশ :     মূল কাহিনী, মূল কাহিনী না …

অনিন্দ্য :     আমরা উপন্যাস পাঠে যেভাবে অভ্যস্ত, সেভাবেই বলছি।

দেবেশ :     তাহলে বলুন অভ্যাসে লাগছে।

অনিন্দ্য :     হ্যাঁ, তা লাগছে।

দেবেশ :     হয়তো অভ্যাস বদলাতে চাইছি, অভ্যাসে আঘাত করতে চাইছি। আমার কাছে সমগ্রতার যে ধারণা, মূল কাহিনীর যে ধারণা, সেই অনুযায়ী লিখেছি। কার্যকারণ শৃঙ্খলা এবং ধারাবাহিকতা, ঘটনাক্রম অনুসরণ – এটা ভাঙতে চেয়েছি।

অনিন্দ্য :     সেই কারণে শুরুটা এভাবে করেছি – তা না। প্রথমাংশে যা লিখেছি, আপনার মতে তা মূল কাহিনী নয়। এমনও হতে পারে যে সেটাই মূল কাহিনী, পরের অংশটা উপকাহিনী। আমি সচেতনভাবেই করে থাকি, যতটা সম্ভব, গল্প-উপন্যাসের প্রচলিত কজ্যালিটি, ঘটনাক্রম শৃঙ্খলা ভাঙতে। তাহলে ভূতের গল্প লিখতে হয়, তা তো লিখি না তাহলে আমি নিশ্চয়ই কোনও একটা মিলিত শৃঙ্খলার দিকে ইঙ্গিত করতে চাই। যে শৃঙ্খলা বাংলা গল্প-উপন্যাসে এত বড় বড় ঔপন্যাসিক সত্ত্বেও চর্চিত হয় না। তার কারণ থিয়েটারের ভঙ্গি, প্রথম সিনে যা হচ্ছে শেষও সেভাবেই হচ্ছে। একমাত্র মানিক বন্দ্যোপাধায়ের মধ্যে শৃঙ্খলার লজিকের নীচে আরেকটা শৃঙ্খলার লজিক চলছে। তারও নীচে পালটা আরেকটা চলছে। তিন-চার লেভেলে যদি বাস্তবতা কাজ করে তাহলে অন্ততপক্ষে একটার সঙ্গে অন্যটা শিকলের মতো যুক্ত থাকে না। তাহলে এ প্রশ্নও ওঠে না যে মাদারির মা আগে একবার মুখ দেখায় নি কেন।

অনিন্দ্য :     আপনি অনেকবার বলেছেন, উপন্যাসের ইউরোপীয় মডেল আমাদের সাহিত্যের ক্ষতি করেছে। আমার সবিনয় জিজ্ঞাসা, উপন্যাসের কোনও নির্দিষ্ট ইউরোপীয় মডেল আছে কী? আমার ধারণা, ইউরোপের অনেক লেখকই ভিন্ন ভিন্ন মডেলে উপন্যাস লিখেছেন। সারভেন্টেস, তলস্তয়, জেমস জয়েসের উপন্যাসগুলিকে একই মডেলে লেখা – বলা মুশকিল।

দেবেশ :     এগুলো তো কুতর্ক যে ইউরোপিয়ান মডেল কি একটা?

অনিন্দ্য :     ঠিক তাই বলতে চাইছি।

দেবেশ :     আমি তো ইউরোপিয়ান নভেল নিয়ে কথা বলছি না যে তার মডেল গুনব। আমি বলছি বাংলা নভেলের কথা। বাঙালি লেখকের কাছে ইউরোপ তো ইংরেজি অনুবাদ। কত ইউরোপীয় ভাষায় লেখা মহৎ উপন্যাস ইংরেজি অনুবাদে নষ্ট হয়েছে, জানেন? তাহলে আমরা কলোনি হয়ে যাওয়ার পর আমাদের কাছে মডেল একটাই ইংরেজি অনুবাদে যেটা আসে। এছাড় উপায় নেই আমাদের। আমার কাছে এটার কোনও ঐতিহাসিক, দার্শনিক বা নান্দনিক উত্তর নেই যে বাংলা উপন্যাস ইংরেজিতে অনুদিত বা ইংরেজিতে লিখিত উপন্যাসের দ্বারা প্রভাবিত এখনো।

অনিন্দ্য :     এতে কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। তবে ইউরোপিয় মডেল থেকে সরে আসার সচেতন চেষ্টা কিংবা ইউরোপিয় মডেল আমাদের ক্ষতি করছে বললে আমাদের একটা বিকল্প ব্যবস্থাও ভাবতে হবে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ভারতীয় মডেল বলে কিছু গড়ে তোলা সম্ভব কি? এটাই জানতে চাইছি।

দেবেশ :     ইউরোপের উপন্যাস বলতে ইংরেজিকে বোঝায় না যদিও ইংরেজিতে দু-তিন‍টি মহৎ উপন্যাস লেখা হয়েছে। কিন্তু রুশ, জার্মান ও ফরাসি ভাষায় উপন্যাসের যে ঐতিহ্য তার কাছে ইংরেজি নভেল দাঁড়াতে পারে? আমাদের দুর্ভাগ্য, এমনই মহাজন এল যার নিজের পুঁজিই ধারের পুঁজি। কারণ সেই বঙ্কিমের আমল থেকে শুরু করে এতেই অভ্যস্ত। এর মধ্যে লেখক টু লেখক, ভাষা টু ভায়া, সিচুয়েশন টু সিচুয়েশন ভ্যারি করছে। এটাই আমাদের কাছে একমাত্র মডেল। অন্তত বাংলা। কিন্তু ভারতের অন্য যে সব ভাষার ওপর ইংরেজির প্রভাবটা কম, বাংলা ভাষার ওপর প্রভাবের তুলনায় কম – সে সব ভাষায় ঐ মডেলের বাইরে উপন্যাস অনেক কাল ধরেই লেখা হয়েছে ও হচ্ছে হিন্দি, কন্নড, উর্দু, ওড়িয়া, মালয়ালমে। বাঙা‍লি লেখকরা এগুলো পড়েন না। যে ইংরেজি জানে না সে কী লিখবে? সে মডেল পাবে কোথা থেকে?

অনিন্দ্য :     বাংলায় লেখা উপন্যাসকেই মডেল করবে।

দেবেশ :     সে তো সাহেবরা শিখিয়েছে যে কংক্রিটের দেয়াল করো,কংকিরটের ছাদ করো। আমরা তো আবিষ্কার করিনি।

অনিন্দ্য :     আমরা এর কোনও বিকল্প গড়ে তুলতে পেরেছি কি?

দেবেশ :     ইংরেজরা আমাদের কলোনি বানিয়েছিল – এই সত্যটা আমরা এড়াতে চাই। কলোনির একটা বিস্তার ঘটে অর্থনীতিতে। সেখানে আমরা কলোনি মানি। কলোনির আর একটা সূচিমুখ বিস্তার ঘটে মাটির অদৃশ্য অতলে গাছের শিকড়ের মত। সেখান থেকে সেচন আসে, খাদ্য আসে। এটাকে বলতে পারি – তৈন্যের গ্রহণ, কলোনি থেকেই সেই গ্রহণ লাগে। এই কলোনিটা আমরা এড়াতে চাই। আমাদের দেশে কি ছাদওয়ালা বাড়ি ছিল? কংক্রিটের দেয়াল ছিল? আপনি কতদিন ছাদওয়ালা বাড়িতে থাকেন? আমি সেদিনও টিনের বাড়িতে থাকতাম। এখন ছাদবাড়ি অপরিবর্তনীয় মাধ্যম বলে মানতে হয়েছে। মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট সেই অনুযায়ী পরবর্তন করা হয়েছে। এখন যদি বলেন, এটা আবার ইউরোপিয়ান কী? বাড়ি তৈরির এই ব্যবহারটা শিখিয়ে গেছে ইউরোপিয়রা। কিন্তু ইউরোপে, আমেরিকায় এটা করে না। ওরা কংক্রিটের ছাদ করে না। এরকম কংক্রিটের প্লেন ছাদ যদি করে, বরফে ভেঙে পড়বে। আমাদের এই মৌসুমী দেশে এখান থেকে জল গড়াবেই। আমাদের দেশটার নাম বাংলা। একটা বিশেষ ধরণের বাড়ি তৈরির প্রক্রিয়া-বাংলো। ইউরোপীয়ানরা এটা আমাদের কাছ থেকে নিয়েছে। দোচালা, চারচালা, ছ’চালা, আট চালা। যাতে ভিতরটা ঠাণ্ডা থাকে, বাতাস খেলার নানা জায়গা থাকতে পারে এবং বৃষ্টিটাকে ব্যবহার করতে পারে। যখন বাইরে বৃষ্টি হয় তখন আমার এ ঘরে থাকা যায় না, এমন গুমোট হয়ে যায়। বাইরেটা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, সমস্ত হিট এদিকে আসছে। কিন্তু ছনের ঘরে তা হয় না। ছন, বাঁশ এখানকার জিনিস। সাহেবরা সবগুলো নিজেরা ব্যবহার করে আর আমাদের শিখিয়ে গেছে এগুলো করতে। এখন আমাকে যদি বলেন, এটা আপনার একমাত্র অ্যাভেলেবল মডেল। এর আবার অ্যাভেলেবল কী, ভিক্ষার চাল কাড়া না আকাড়া। ওরা চাপিয়ে দিয়েছে, আমার কোনও চয়েস নেই। এই পরিস্থিতিতে যদি জিজ্ঞেস করেন, ইউরোপিয়ান   মডেলের বিকল্প কি? ইউরোপিয়ান  মডেলটাই বিকল্প। যাকে বলে দশচক্রে ভগবান ভূত। আমার যা অরিজিন্যাল চাল ছিল, সেটা তুলে দিয়ে তুমি তোমার সিমেন্ট বিক্রি করছ। এখন বলছ যে তোমাদের কোনও বিকল্প নেই। আমাদের যেটা বদলে এই বিকল্পটা দিয়েছিলে সেই অরিজিন্যালটা দাও। সেটা যদি পাঁচালি, কথকতা, মঙ্গলকাব্য হয়, তাই হবে। এগুলোর মধ্যে খানিকটা ধর্মভাব আছে। যে জন্য এনিয়ে সোজা করে বলা যায়, আরে, এগুলো দিয়ে কী করে হবে। ইনডিভিজুয়াল পারসোনালিটি না হলে কী করে উপন্যাস লেখা হবে। এ ধারণাটাই ভুল। বুর্জোয়া ইডিভিজুয়ালিটি থেকেই উপন্যাস লেখার দরকার হয় না। প্রত্যেক সমাজের নিজের গল্প, নিজের ন্যারেটিভ, আখ্যান দরকার হয়। আরও বহুবিধ কারণ আছে – তার মধ্যে যাচ্ছি না। বুর্জোয়া ইনডিভিজুয়ালিজম অনেক পরের ব্যাপার। তার আগে অনেক কাহিনী – মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসি লেখা হয়েছে। এগুলো কি আখ্যান, ন্যারেটিভ নয়? প্রত্যেক জাতির ন্যারেটিভ দরকার হয়। আমাদের কথকতা, পাঁচালি, মঙ্গলকাব্য ক ভাবে গাওয়া হত আমরা জানি না। সুতরাং সেখানে যেতে চাইলে আমাকে কে নিয়ে যাবে! প্রথম কথা, এগুলো পুরোপুরি ধর্মাশ্রিত সাহিত্য নয়। শুধু একটা পুকুর নিয়ে একটা পাঁচালি লেখা হয়েছে। গাছ নিয়ে কথকতা আছে। ঐ বৈশাখ মাসের পূর্ণমিার দিনে গাছের তলায় এটা বলতে হয়, বললে পরে ঐ হয়। এরকম অজস্র ন্যারেটিভ আছে। কোথাকার গাছ, কি গাছ, একেবারে নির্ভুলভাবে সেই ন্যারেটিভের লোকালাইজেশন করা আছে – আপনাকে ম্যাপ আঁকতে হবে না। বিহারের একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করুন, সে নিজের গ্রামের বিবরণ দেবে, গ্রাম ধরে ধরে কীভাবে যেতে হবে। “আরে মুঙ্গের সে হোগা দশক্রোশ’। এই স্থানিকতা যদি আমার বিষয় হয়, সেক্ষেত্রে আমি “মডেল’’ শব্দটা ব্যবহার করছি না, সেটা কি করে বলতে হয়, একটা পুকুরের বর্ণনা কি করে দতে হয় – সেটা আমাদের শোনা আছে, জানা আছে। পড়াও যায় – এখন অনেক বেরিয়েছে। এই ধরণের স্থানিক সাহিত্যের একটা অংশ সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মকভাবে হিন্দু উচ্চবর্ণরে দেব দেবতার মাইথোলজিকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সে কী সাংঘাতিক ভাবা যায় না! তারা এ সাহস পেল কী করে! ফিদা হুসেন কী এঁকেছেন বলে দেশের বাইরে আছেন আর ইংরেজরা আসার আগে আমাদের সাহিত্যে এমন কোন দেবদেবী নেই যাকে লম্পট এবং শ্বৈরিণী হিসেবে বর্ণনা না হয়েছে। আমাদের বিদ্বজ্জন লেখক পাঠকরা এই বাস্তব, এই ঐহিকতা, এই জীবনোল্লাস ও এই রসবোধ কখনো পড়তেই পারেন নি। মনসা পুজো হয় – বেহুলা-লখিন্দর ইত্যাদি। কানি কি কোনও দেবতা হয়? কানাকে দেবতা বানানোই থিওক্র্যসির বিরোধিতা করা। ভুল বললাম?

অনিন্দ্য :     মনে হয় কানা মানুষকে সমাজে প্রতিষ্ঠা দেবার একটা প্রয়াস।

দেবেশ :     এক চোখ কানা বা ল্যাংড়া মানুষ সমাজে হাস্যকরতা নিয়ে থাকে – তাকে ইষ্ট মন্ত্র দিয়ে শুদ্ধ করা যায় না। এই যে দেবনির্মাণ, যাকে বলতে পারি, মেকিং অব দ্য গডস্‌, বিখ্যাত ভারতীয় মণ্ডনশিল্পের রীতিনীতি সহ বর্ণহিন্দু সিস্টেমটাকেই চোরাগোপ্তা মেরে দিয়েছে। মডেলের কথায় আসি, সে সংস্কৃত বা ইউরোপীয় মডেল যাই হোক, আপনার একটা পুরুষ, আর দুটো মেয়ে দরকার কিংবা দুটো পুরুষ আর একটা মেয়ে দরকার – এছাড়া মডেল নেই! সুতরাং আমি যখন বলি বাংলা উপন্যাস লজ্জাজনক ভাবে ইউরোপীয় মডেলে বাঁধা তখন বলতে চাই না তার বিকল্প কোনও ভারতীয় মডেল হয়। আমি বলছি, ওটাই তো বানানো, মৌলিক নয়। আমাদের মূল নভেল হারিয়ে গেছে। আমাদের গল্পলেখক, ঔপন্যাসিকদের মধ্যে আর আমাদের মৌলিক কল্পনা কাজ করছে না।

অনিন্দ্য :     সেই জন্যই বাধ্য হয়ে গ্রহণ কেরেছ?

দেবেশ :     বাধ্য হয়ে না। আর কিছু নেই, তাই গ্রহণ করেছে।

অনিন্দ্য :     মফস্বলি বৃত্তান্ত, তিস্তাপারের বৃত্তান্ত, তিস্তাপুরাণ, বরশালের যোগেন মণ্ডল উপন্যাসের সংলাপে উপভাষার ব্যাপক ব্যবহারের ফলে কি বৃহত্তর পাঠকের কমিউনিকেশনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে না?

দেবেশ :     যাঁর অসুবিধা হবে তিনি পড়বেন না। আমি কী করব! আমি তো স্প্যানিশ  জানি না বলে স্প্যানিশ উপন্যাস পড়তে পারি না।

অনিন্দ্য :     স্প্যানিশ বিদেশী ভাষা। আপনার লেখার পাঠক শিক্ষিত বাঙালি, উপন্যাসগুলো বাংলায় লেখা। তাছাড়া বাংলাদেশ, অসম, ত্রিপুরাতেও আপনার পাঠক আছে। আমি সবার কথা মাথায় রেখেই বলছি।

দেবেশ :     সে যদি ঠিকমতো বাংলা ভাষা না জানে, সে যদি বাংলা ভাষারই বিশেষ উপভাষার প্রকরণ জেনে নোওয়ার উদ্যোগ না করে, তাহলে তার ইংরেজি বই পড়ারও অভ্যাস নেই। কারণ ফক্‌নার বা হেনরি জেমস্‌ যে ইংরেজিতে লিখেছেন সে – ইংরেজি একবার পড়লে চট করে বোঝা যাবে না।

অনিন্দ্য :     তাহলে প্রশ্ন উঠবে, উপন্যাসে উপভাষার ব্যবহার করা হয় কেন?

দেবেশ :     অনেক সময় আখ্যান বা ন্যারেটিভের ভাষার স্তরান্তর দরকার। একটা তল চলছিল হঠাৎ করে তলটা অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া দরকার। সে জন্য প্রয়োজন অন্য একটা স্তর। সে অন্য স্তর কোথা থেকে আসবে? আমার কাছে সবচেয়ে ভালো ভাবে আসে চলতি ভাষায়। স্ল্যাংও দেওয়া যায়। যে কথাটিকে আমরা স্ল্যাং বলি, তা আসলে প্রবাদ। প্রবাদ বলি তাকে যেখানে অনেকটা অভিজ্ঞতা সংক্ষিপ্ততম ভাবে সংবদ্ধ হয়েছে। শব্দ হলে স্ল্যাং, বড় হলে প্রোভার্ব। যেখান থেকে একটা স্তরান্তর ঘটে।

অনিন্দ্য :     অন্য একটা মাত্রা যুক্ত হয়।

দেবেশ :     বড় লেখকের সেই মাত্রার দরকার নাও হতে পারে। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণের গল্পে কোনও ডায়ালেক্ট নেই। ওরা এতবড় লেখক যে ওঁদের স্বাভাবিক গদ্যেই সেই স্তরান্তর এনে দিতে পারেন। একটা বিশেষণে, ক্রিয়াপদে, একটা বর্ণনায়। আমার হাতে দিয়েছেন একতারা, আমি ওটাই টং টং করে বাজাতে পারি। বললেন জটিল সব রাগরাগিনী বাজাতে, আমি কোথা থেকে বাজাব! আমার আঙ্গুল জানে না, যন্ত্রও বাজাতে জানে না। সুতরাং ডায়ালেক্ট একটা উপায় দিতেও পারে। আমাদের এপারের বাংলা ভাষা ভীষণ দুর্বল হয়ে গেছে। এর কোনও রক্তসংবাহী শিরা-উপশিরা নেই।

অনিন্দ্য :     নতুন শব্দ আসছে না।

দেবেশ :     নতুন শব্দ না, নতুন প্রকাশভঙ্গি না।

অনিন্দ্য :     একেবারে স্টাটিক?

দেবেশ :     হ্যাঁ, স্টাটিক। … ডায়ালেক্ট ছাড়া ভাষায় হিউমার আসবে কোত্থেকে? বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় সর্বনাশ হয়েছে – এ ভাষায় কোনও হিউমার আসতে পারে ন। একটা ভাষায় হিউমার থাকবে না! মজার কথা বলা যাবে না!

অনিন্দ্য :     পরশুরামের লেখা?

দেবেশ :     পরশুরাম! কোনও রকমে খুঁজে পেতে একটা নাম বললেন। তিনি হাসির গল্প লিখতেন, আমি বলছি ভাষার মধ্যে নেই।

অনিন্দ্য :     ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’ এর বিভিন্ন চরিত্রের মুখে আপনি পূর্ববাংলার যে উপভাষা ব্যবহার করেছেন, সেটি কি বরিশাল জেলার কথ্য ভাষা, না কী একাধিক উপভাষার মিশ্রণ?

দেবেশ :     এখানে আমার লেখার যে কণ্ঠস্বর সে বাঙালের স্বর। যোগেন মণ্ডল যে শব্দ প্রয়োগ করেছে বা যেভাবে বাক্য সাজিয়েছে, সেটা সব সময়ে একরকম নয়। কারণ বরিশালের ভাষা বলে কোনও ভাষা নেই। বরিশালেও চৌদ্দ জায়গায় চৌদ্দ ভাষা। এই যে স্ট্যান্ডার্ড বাংলা স্ট্যান্ডার্ড হল কী না আর উপভাষা যথাযথ উপন্যাস হল কী না, এ নিয়ে বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গে এমন একটা ধারণার প্রচল আছে যেটাকে আমার ক্ষতিকারক মনে হচ্ছে। আমার ইচ্ছে আছে – এটাকে তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখে একটা প্রবন্ধ গোছের লেখার।

অনিন্দ্য :     আপনি যখন শহুরে মধ্যবিত্তদের নিয়ে উপন্যাস লেখেন, অনেক ক্ষেত্রে সেখানে নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অথচ গ্রামীণ নিম্নবর্গীয়দের সম্পর্কিত লেখায় দেখি – এ দিকটা তেমন আসে না। সেখানে পুরুষ চরিত্র, প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে তার জীবনসংগ্রামই আপনার মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসে। এটা কি সচেতন ভাবে ঘটেছে?

দেবেশ :     না। গ্রামের এই স্তরের নারী-পুরুষের জীবন আমি জানি না। ‘মফস্বলি বৃত্তান্ত’তে কিছুটা এসেছে।

অনিন্দ্য :     অন্যগুলিতে  তেমন নেই। তিস্তাপারের বৃত্তান্তে বাঘারু একা।

দেবেশ :     ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’-এ মাদারির মায়ের কথা আছে। ‘তিস্তাপুরাণ’ আশ্রয় করে আছে  এক নারীকে।

অনিন্দ্য :     তবু আপনার শহুরে জীবনের উপন্যাস যেমন – লগন গান্ধার,আত্মীয় বৃতান্ত,জীবনচরিতে প্রবেশ…

দেবেশ :     এই ভাবে একজন লেখককে পড়া কি ঠিক যে এখানে করেছেন। প্রত্যেকটা গল্পই আলাদা।

অনিন্দ্য :     মেনে নিচ্ছি প্রত্যেকটা ভিন্ন-ভিন্ন কাহিনী। তবু শহরের মধ্যবিত্ত জীবন আর গ্রামের নিম্নবিত্ত জীবনের গল্পে পার্থক্যটা বেশ প্রকট।

দেবেশ :     পার্থক্য আছে। আমি খুব সচেতন এ ব্যাপারে। আমার অভিজ্ঞতা নেই। এ সম্পর্ক আদতে যৌন-সম্পর্ক। নিম্নবিত্ত সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্ক কল্পনা করে লেখা যায় না। এর বাস্তবভিত্তি থাকতে হবে।

অনিন্দ্য :     নানারকম মারণ ব্যাধি, মৃত্যু, উদ্দেশ্যহীন  হত্যা আর আতঙ্কের মর্বিড পরিবেশ ‘মার বেতালের পুরাণ’ এর ভাববস্তু। একুশ শতকের সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আপনি কি সমাজে ইতিবাচক কিছুই দেখতে পান নি?

দেবেশ :     আমি কোনও মেসেজ দিইনি, ওতে কোনও মেসেজ নেই। ঔপন্যাসিক হিসেবে আমি কোনও ভবিষ্যৎবক্তা নই।

অনিন্দ্য :     পুরো উপন্যাস জুড়েই হত্যা, ক্যানসার, এইডস-এর পরিবেশ। সমাজে পজিটিভ কিছুই নেই?

দেবেশ :     কোনও মানে খুঁজতে যান কেন! মানে খোঁজার কী আছে! একটা শিল্প কি মানে দিয়ে হয়!

অনিন্দ্য :     শিল্পের পিছনে কোনও একটা মানে থেকেই যায়।

দেবেশ :     কেন থাকবে?

অনিন্দ্য :     তাহলে শিল্প কি পুরোটাই উদ্দেশ্যহীন?

দোবেশ :     উদ্দেশ্য থাকলে শিল্প আর শিল্প থাকে ন। আপনি এটুকু পর্যন্ত বলতে পারেন, বড় মর্বিড, পড়া যায় না। কিন্তু তা থেকে এই সিদ্ধান্ত হয় না যে একুশ শতক সম্পর্কে এটাই আমার ভবিষ্যৎ বাণী।

অনিন্দ্য :     এতক্ষণ কথা বলবার জন্য ধন্যবাদ স্যার।

 

 এই সাক্ষাতকারটি ২০০৯ সালে লেখকের বাসভবনে গৃহীত।

 

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ