12 Feb

যীশু যেদিন ক্রশ-বিদ্ধ হয়েছিলেন

লিখেছেন:লিওনিড অ্যান্দ্রেইভ


[রুশীয় গল্প ‘On the day of Crucifixion’-এর অনুবাদ। গল্পটি অনুবাদ করেছেন কুমারেশ ঘোষ]

যে অভিশপ্ত দিনে, ধর্মগুরু যীশুখ্রীষ্টকে অন্যায় ভাবে অন্যান্য খুনী বদমায়েসদের সঙ্গে গলগথা শহরে ক্রশে বিদ্ধ করা হয়েছিল – সেইদিন সকাল থেকে জেরুজালেমের এক ব্যবসাদার, নাম তার বেন-টবিন ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলো দাঁতের যন্ত্রণায়।

আগেরদিন থেকে যন্ত্রণা শুরু হয়। প্রথমে আক্কেল দাঁদের পাশের দাঁতটা, পর‍ে জীবরে গোড়াটা পর্যন্ত ব্যথা করে ওঠে। রাত্রে খাওয়ার পর ব্যথাটা একটু কম পড়লো। আর তার একটা বুড়ো গাধারৈ বদলে একটা বাচ্চা-গাধা জোগাড় করতে পারায় মনটাও তার খুশী হয়ে উঠলো সেই সঙ্গে।

রাত্রেও ঘুম হলো ভালোই। কিন্তু পরদিন, মানে সেই অভিশপ্ত দিনের সকাল থেকেই আবার কেন যেন আরম্ভ হলো তার দাঁতের যন্ত্রণা। কালকের সেই দাঁতটায়, না, তার পাশের দাঁতটা যন্ত্রণা হচ্ছে তাও বেন-টবিন বুঝতে পারলো না। যেন, হাজার-হাজার গরম ধারালো পেরেক তার মাড়িতে বিঁধছে। ব্যথায়, বেন-টবিনের মাথা ধরে উঠলো। শেষে ঘটী থেকে গরম-জল নিয়ে কুলকুচি করায় যন্ত্রণাটা বুঝি একটু কমলো।

বেন-টবিন শুয়ে পড়লো। আবার মনে পড়লো তার নতুন বাচ্চা-গাধাটার কথা। জিতেছে সে। হায়, দাঁতের যন্ত্রণাটা যদি না থাকতো – আজ সে প্রাণ ভরে আনন্দ করতে পারতো। একটু ঘুমুবে ঠিক করলো! … না, আবার আরম্ভ হলো যন্ত্রণা। বিছানার উপর উঠে বসে দুলতে লাগলো সে। মুখ লাল হয়ে উঠলো, গা দিয়ে ঘাম বেরিয়ে গেলো।

একটু পরে সূর্য উঠলো। আজকের এই সূর্য সেই অভিশপ্ত দিনেও উঠেছিলো গলগথার আকাশে। ক্রশের উপরেও সেই রবি-রস্ম‍ি পড়েছিলো বৈকি।

বেন-টবিন লোকটা নেহাৎ মন্দ ছিলো না, কিন্তু সেদিন সকালে কেন যেন সে তার স্ত্রীর উপর হঠাৎ গেলো রেগে। বহু কষ্টে মুখ খুলে আরম্ভ করলো গালাগালি। যন্ত্রণায় প্রাণ গেলো কেউ দেখলো না। বেচারী স্ত্রী চুপ করেই গালাগালি শুনলো। পরে যন্ত্রণা যাতে কমে সেজন্যে নানারকমের টোটকা টাটকা আরম্ভ করলো। কিন্তু যন্ত্রণা কমলো না। যে-কে সেই!

শেষে বেন-টবিন রুমাল দিয়ে মাথা বেঁধে ঘরময় পায়চারী করতে লাগলো। জানালার দিকে গেলো না – লজ্জায়। পাছে লোকে তার এই অবস্থা দেখতে পায়। কয়েকবার ছেলেমেয়েরা এসে নাজারেথের যীশুর কথা বলে গেলো। ঐ যীশুকে নিয়ে আসছে ওরা। বেন-টবিন তাদের কথা শুনলো। পরে দিলো সবাইকে দূর-দূর করে ঘর থেকে তাড়িয়ে।

রাস্তায় এবং বাড়ীর ছাদে লোকে ভীড় করে দাঁড়িয়েছিলো। তাদের অনেকের লক্ষ্য ঘরের মধ্যে বেন-টবিনের উপরেও পড়েছিলো।

স্ত্রী বেন-টবিনকে ডাকলোঃ এসো না, দেখবে খুনে-বদমায়েসদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। মনটা অন্যদিকে গেলে যন্ত্রণাটা কমবে।

বেন-টবিন বললোঃ আমার ঐ সব দেখবারই সময় বটে এখন!

কিন্তু স্ত্রীর অনুরোধে শেষ পর্যন্ত বেন-টবিন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো – অনিচ্ছাসত্বেও।

সরু রাস্তাটা ক্রমে পাহাড়ের উপরে উঠে গেছে। সেই রাস্তায় চলেছে লোকের পর লোক। জনসমুদ্র! পাগলের মতো চেঁচাচ্ছে। ভীড়ের মাঝ দিয়েচলেছে আসামীরা, ক্রশ বয়ে নিতে গিয়ে তারা নুয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে তাদের পিঠের উপরে এসে পড়ছে রোমান সেনাদের চাবুক। যেন কালো সাপ! আসামীদের মধ্যে একজন – চুলের রং তার বাদামী – ছেঁড়া পোশাক রক্তে মাখা. হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো পাথরে পা লেগে! জনতা আরো চীৎকার করে উঠলো। এগিয়ে এলো পড়ে যাওয়া লোকটির কাছে! … এমন সময় বেন-টবিনের দাঁতের যন্ত্রণা আবার বেড়ে গেলো।

লোকগুলো কেমন চেঁচাচ্ছে মজা করে! আমার যদি দাঁতটা ভালো থাকতো – আমিও অমন মজা করে হৈ-চৈ করতে পারতাম! – বেন-টবিন ভাবলো। আবার যন্ত্রণা – উ-হু-হু!

স্ত্রী তার পাশেই ছিলো। বললোঃ ঐ লোকটা নাকি অন্ধের দৃষ্টি-শক্তি ফিরিয়ে এনে দিয়েছিলো।  বলে, একটা পাথরের টুকরো যীশুকে লক্ষ্য করে ছুঁড়লো। চাবুক খেয়ে যীশু তখন উঠে দাঁড়িয়েছেন।

বেন-টবিন ঠাট্টা করে বললোঃ আমার দাঁতের যন্ত্রণা সারাতে পারলে বুঝতাম! বলেই মুখ বেঁকিয়ে বেন-টবিন বারান্দা থেকে ঘরে চলে এলো। তারপর হঠাৎ বেন-টবিনের দাঁতের যন্ত্রণাটা বেশ একটু কম পড়লো। স্ত্রীর টোটকা ওষুধেই হয়তো হবে। দুপুরে ঘুমও হলো। যখন ঘুম ভাঙলো, দাঁতের যন্ত্রণা তার একেবারেই সেরে গেছে। শুধু মাড়ীটা ফুলে ছিলো। বেন-টবিন আর তার স্ত্রীর মুখে এতক্ষণে হাসি দেখা দিল।

বেন-টবিনের বন্ধু, চামড়া-ব্যবসায়ী সামুয়েল এলো বিকেলে বেন-টবিনের সঙ্গে দেখা করতে। বেন-টবিন তাকে তার নতুন বাচ্চা গাধাটাকে দেখালো। তারপর চললো গল্ু-গুজব।

পরে বেন-টবিন তার স্ত্রীর সারা-র অনুরোধে, সারা আর সামুয়েলকে নিয়ে গেলো সেই ক্রশ-বিদ্ধ খুনেদের দেখতে। রাস্তায় বেন-টবিন আরম্ভ করলো তার দাঁতের যন্ত্রণার গল্প বন্ধু সামুয়েলের কাছে। হাত-পা-মাথা-মুখ নেড়ে চোখ ঘুরিয়ে সে তার দাঁতের যন্ত্রণার বর্ণনা দিতে লাগলো। আর সামুয়েল মাথা নাড়তে লাগলোঃ আহা! সত্যিই তো, কী কষ্টই পেয়েছো ভাই!

বেন-টবিনের উৎসাহ গেলো বেড়ে। সবিস্তারে আরম্ভ করলো তার দন্ত-ইতিহাস। শেষে গলগথায় পৌঁছলো তারা। দূরে পাহাড়ের আড়ালে সূর্ৃ তখন অস্ত যাচ্ছে। সব দেখেছে সে। কিরণ তার রক্ত-রাঙা। ক্রমশগুলো পোতা রয়েছে। মাঝখানে যে ক্রশটা পোঁতা, তার গোড়ায় ওরা কারা নতজানু হয়ে রয়েছে?

জনতা তার আগেই চলে গেছে। হিমেল হাওয়া বইছে। বেন-টবিন ক্রশ-বিদ্ধ লোকগুলোকে একবার দেখে, সারা ও সামুয়েলকে নিয়ে বাড়ীর দিকে ফিরে চললো। দাঁতের যন্ত্রণার কথা তার শেষ হয়নি, এখনও বাকী আছে। সুতরাং রাস্তায় যেতে যেতে বেন-টবিনের আরম্ভ হলো হাত-পা-মাথা-মুখ নেড়ে, চোখ ঘুরিয়ে দাঁতের যন্ত্রণার গল্প। সামুয়েলও শুনে গেলো বেশ মনোযোগ দিয়েই। গল্প করতে করতে ফিরে এলো তারা বাড়িতে।

সেই দিনের শেষে রাত্রের কালো অন্ধকার নেমে এলো পৃথিবীর মুকে। পৃথিবীর অন্যায়, অত্যাচার, অনাচার, অবিচার, যাতে স্বর্গ না জানতে পারে – তাই বুঝি মর্তে রাতের অন্ধকারের অবতারণা!

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2021 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ