30 Jul

শতবর্ষ পেরিয়ে অমিয়ভূষণ

লিখেছেন:সিদ্ধার্থ সান্যাল


[জুলাই ছিল ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক এবং নাট্যকার অমিয়ভূষণ মজুমদারের  মৃত্যুমাস।ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক এবং নাট্যকার হিসেবে তাঁর কীর্তি তাঁর জীবিতকালে সেভাবে চর্চিতই হয় নি বলে অভিযোগ।সাহিত্যের টানে স্বভূমিচ্যুত না হওয়া এবং সারাজীবন লিটল ম্যাগাজিনে লিখে যাওয়া অমিয়ভূষণ মজুমদারকে নিয়ে নানা কথা শোনালেন গল্পকার সিদ্ধার্থ সান্যাল]

অমিয়ভূষণ মজুমদার কোনো প্রথাসিদ্ধ ভাবেই  জনপ্রিয় লেখক ছিলেন না ।

ওঁর লেখা পড়লে যে কোনো ঋদ্ধ পাঠকেরই মনে হবে তিনি সচেতনভাবেই  জনমোহিনী সাহিত্যিক

হতে চাননি, জনরুচির সঙ্গে আপস করার সামান্যতম প্রচেষ্টা তাঁর ছিল না ।

তাঁর  লেখক জীবনের পুরো সময়টাতেই ছিল প্রতিষ্ঠানের প্রতি এক নিরাসক্ত  নির্মোহ ভাব ।

তাঁর গল্প-উপন্যাসের বিষয় বিস্তারে এক বিশিষ্ট নৈর্ব্যক্তিক কথনভঙ্গি লক্ষ্য করেছি ।

লেখক তাঁর জীবনভর যেন দূরে দাঁড়িয়ে মার্জিনালাইজড প্রান্তিক মানুষের বাস্তব জীবনের ছবি এঁকে গেছেন ।

অমিয়ভূষণের সমস্ত সাহিত্যকর্মই নিগূঢ় মননশীলতায় সংপৃক্ত, সীমায়িত ঋদ্ধ পাঠককুলের জন্য নির্দিষ্ট ।

ভালো ইংরাজিতে এই ধরণের লেখাকেই বোধহয় সেরিব্রাল বলা হয় ।

লেখার বিষয়বস্তু নির্বাচন ও বিস্তার পুরোপুরি মনননির্ভর, কখনো কখনো বিমূর্ত ।

কিন্তু বুদ্ধি দিয়ে সবকিছু ব্যাখ্যা করার মধ্যে একটা সীমাবদ্ধতা আছে ।

তাঁর নিজের কথায়,

“Boy meets girl নিয়ে গল্প লেখা নিরর্থক । জনসাধারণের অতৃপ্ত কামের wish fulfilment-এর ব্যবস্থা করা লেখকের কাজ নয় ।  Aesthetic delight আর wish fulfilment  এক জিনিস নয় । যারা wish fulfilment চায় তারা সমরেশ বসু পড়ুক । ‘ঘরে বাইরে’ বা ‘যোগাযোগ’ এমনকি ‘গোরা’ তারা নাই-বা পড়লে ।”

সাংঘাতিক কথা ! বলা বাহুল্য, সমরেশ বসু তো বটেই, এমনকি ‘নীললোহিত’-এর পক্ষেও এমন কঠিন বক্তব্য হজম করা কঠিন !

#

এ কথা লিখতে আমার দ্বিধা নেই যে হয়তো তাঁর এইরকম ঘোষিত ও বিশেষভাবে আদৃত লিখনশৈলীর পরিপ্রেক্ষিতেই প্রতিষ্ঠান ও বিনোদন বৃক্ষের পল্লবগ্রাহী সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী পাঠক অমিয়ভূষণের সাহিত্যকীর্তির প্রতি অনাদর করেছেন  ।

জীবদ্দশায় ‘লিট্ল ম্যাগাজিন’-এর লেখক বলে পরিচিত হওয়া এই অসাধারণ কথাসাহিত্যিকের সাহিত্য গবেষকদের বিচারে আধুনিক বাংলা গদ্যসাহিত্যের ‘লেখকের লেখক’-এর তকমা পেতে লেগেছে দুদশকের বেশী সময় ।

অবশ্য ১৯৮৬ সালে ‘রাজনগর’ উপন্যাসের জন্য পরপর বঙ্কিম ও সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার পাওয়ার পর  অবস্থার দৃশ্যতঃ পরিবর্তন ঘটে ।

পশ্চিমবঙ্গ তথা জাতীয় স্তরে কিছু স্বীকৃতি লাভের পর বাংলা কথাসাহিত্যের বৃহত্তর সুশীল সারস্বত সমাজ (!) অমিয়ভূষণের লেখালেখির প্রতি মনোযোগ দিতে শুরু করেন ।

বেশ কিছু পত্রপত্রিকা তাঁর সাহিত্যরচনার গুণাগুণ নিয়ে প্রবন্ধ বা ক্রোড়পত্র জাতীয় বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেন।

২০১৮ সালে অমিয়ভূষণের জন্ম শতবর্ষে ( ২০০১ সালের ৮ই জুলাই তিনি প্রয়াত হন ) এই ধারা অব্যাহত ছিল, যদিও বাংলা সাহিত্য প্রতিষ্ঠান পরিবারের বড় তরফের শরিকরা তাঁর জন্মশতবার্ষিক স্মৃতিতর্পণে সেই ২০১৮ সালে খুব যে সক্রিয়  ছিলেন তা এই প্রবন্ধলেখকের জানা নেই।    সেই পটভূমিকায়, শতবর্ষ অতিক্রান্ত এই সময়ে ‘গল্পের সময়’ যে অমিয়ভূষণের ওপরে কিছু আমন্ত্রিত রচনা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে তা অত্যন্ত প্রশংসার্হ। এজন্য তাঁরা নিশ্চয়ই বাংলা সাহিত্যের বিদগ্ধ পাঠককুলের ধন্যবাদের পাত্র হয়ে উঠবেন ।

তবে এই পরিপ্রেক্ষিতে একটা মজার ঘটনা বলার লোভ সামলাতে পারছি না, কারণ আমার ধারণা,, অধিকাংশ বাঙালি সাহিত্যপ্রেমী মানুষের এই বিষয়টা জানা নেই ।

ভারত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রকের অধীনে সমকালীন আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলির বিবর্তন ইত্যাদির ওপর গবেষণা করার জন্য ১৯৬৯ সাল থেকে মাইশোরে ‘সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গয়েজেস’ ( Central Institute of Indian languages ) নামে একটি জাতীয় ভাষা গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে ।

গত শতাব্দীর শেষদিকে  এই সংস্থা ‘ভাষা মন্দাকিনী’ নামে একটি প্রজেক্ট করেছিলেন যেখানে আটটি ভারতীয় ভাষার আধুনিক গদ্যের নির্মাতা হিসাবে আটজন প্রতিনিধিস্বরূপ কথাসাহিত্যিকের গদ্য নির্মাণের কারুকৃতি নিয়ে বিশ্লেষণমূলক আলোচনা ইত্যাদি নিয়ে আটটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করা হয়েছিলো ।

এই প্রায় অজানিত তথ্য উল্লেখযোগ্য এই কারণে যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অনিবার্যভাবেই এই প্রজেক্টের ভাষাতালিকায় স্থান করে নিয়েছিলো । আর যে বাঙালি কথাসাহিত্যিকের গদ্যনির্মাণের কুশলতা ইত্যাদি নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরী হয়েছিল তিনি ছিলেন অমিয়ভূষণ মজুমদার !

অবশ্য লেখক-দুহিতা ও অমিয়ভূষণ-গবেষক এণাক্ষী আমাকে একবার কথাচ্ছলে জানিয়েছিলেন, ওই তথ্যচিত্রটিতে বেশকিছু তথ্যের প্রমাদ ঘটেছিলো ।

প্রসঙ্গতঃ, এণাক্ষী মজুমদার, পিতা অমিয়ভূষণের জীবন ও সাহিত্যকৃতির পটভূমিকায় ‘বনেচর’ নামাঙ্কিত এক অসাধারণ আকর-গ্রন্থ রচনা করেছেন যেটা শতবর্ষে দে’জ পাবলিশিং ( এঁরা একাদশ খন্ডে অমিয়ভূষণের রচনাবলী প্রকাশ করেছেন ) থেকে প্রকাশিত হয়েছে ।এই অসামান্য বইটি আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে । কন্যার পক্ষে কৃতী বিখ্যাত পিতার জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে বই লেখা এক কঠিন কাজ সন্দেহ নেই ।এণাক্ষী যে কুশলতায় এই দুরূহ রচনা সুসম্পন্ন করেছেন তা বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখে ।

#

অমিয়ভূষণের তিনটি গল্পগ্রন্থ ছাপা হয় ; ‘পঞ্চকন্যা’ ১৯৬২তে ও পরে দ্বিতীয়বার ১৯৯০, ‘দীপিতার ঘরে রাত্রি’ ছাপা হয় ১৯৬৫তে  ও শ্রেষ্ঠগল্প ছাপা হয় ১৯৮৬তে ।

মোট তিরিশটি গল্প এই তিনটি গ্রন্থে বিধৃত আছে যা আমার ব্যক্তিগত পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় তিনশোটি গল্পের সমতুল !

বিভিন্ন ‘লিটল ম্যাগাজিন’-এ আরও সত্তরটির মতো গল্পের খোঁজ পাওয়া যায় ।

এই সবকটি গল্প ও প্রকাশিত উপন্যাসের সবগুলি এগারো ভল্যুমের অমিয়ভূষণ রচনাসমগ্র’-তে আছে যেগুলি, আমি আগেই জানিয়েছি, দে’জ পাবলিশিং যত্নসহকারে একের পর এক প্রকাশ করেছেন ।

না, ‘দেশ’ পত্রিকায় অমিয়ভূষণের কোনো গল্পই ছাপা হয়নি ।

বঙ্কিম ও একাডেমী পুরস্কারের পর যখন তাঁর লেখাপত্র নিয়ে কিছুটা আগ্রহের সঞ্চার হয়েছে সেইসময় বোধহয় ‘দেশ’ থেকে কিছু অনুরোধ গিয়ে থাকবে ।

এ বিষয়ে তিনি নিজে যা লিখেছেন সেটা বেশ মজার…” একটা গল্প পাঠিয়েছিলাম, তা ওরা ফেরত পাঠিয়েছিলো । একাডেমী পুরস্কার পাওয়ার পর ওরা গল্প চাইলো । আমি বললাম, তোমাদের কাছে একটা তো পাঠিয়েছিলাম, ওটাই ছাপো । উপায়ান্তর না দেখে ‘দেশ’ ওটাই ছাপালো।”

অপ্রাতিষ্ঠানিক স্বাভিমানী অমিয়ভূষণকে চিনবার জন্য আমার মনে হয় এই একটি ঘটনাই যথেষ্ট ।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়, এই মজার ঘটনার একটি পরিশিষ্ট আছে ।

‘দেশ’-এর গল্পের পর এবার ‘আনন্দ পাবলিশার্স’ থেকে একটা বই দেওয়ার জন্য ক্রমাগত তাগাদা চলতে থাকে ।

কিছু টালবাহানার পর তিনি একটি প্রবন্ধের বই দিতে সম্মত হলেন ।

তারপর ‘আনন্দ পাবলিশার্স’ থেকে ১৯৯৬-এ অমিয়ভূষণের একটা অসাধারণ প্রবন্ধসংগ্রহ বেরোলো ‘লিখনে কি ঘটে ।

আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে বইটি…বেনিয়াটোলা লেন-এর আউটলেট থেকে নিয়েছি।

একেবারেই উচ্চস্তরের সেরিব্রাল লেখা…মেরেকেটে একশো গ্রাম ওজনের বইয়ের ভার্চুয়াল ওজন দুকিলোর কম নয় !

জানিনা এ বই এখন সাধারণ বইয়ের দোকানে পাওয়া যাবে কিনা ।

গুরুগম্ভীর প্রবন্ধের উৎসাহী পাঠক পাবলিশারের নিজস্ব আউটলেটে খোঁজ নিতে পারেন।

‘আনন্দ পাবলিশার্স’ একটা যথার্থ কাজ করতে পারতেন যদি অমিয়ভূষণের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তাঁরা এই বইটি তাঁদের শ্রদ্ধাৰ্ঘ্য হিসাবে পুনর্মুদ্রণ করতেন। কিন্তু ওই যে ! ‘They missed the bus…again !’

#

এই পর্যায়ে অমিয়ভূষণের গল্পের লিখনশৈলী তথা গদ্যনির্মাণের ওপরে উদাহরণ সহযোগে সংক্ষিপ্ত আলোচনা যথার্থই প্রয়োজন ।

তাঁর গল্পের কাহিনীর বিষয়বস্তুর উপস্থাপনায়, বিস্তারে ও পরিণতিতে নভেলটি তথা অভিনবত্ব তো আছেই কিন্তু ঋদ্ধ পাঠক বুঝবেন যে জোর করে কোনো চমকসৃষ্টির চেষ্টা নেই ।

ভাষার ব্যবহার, বাক্যগঠনের অভিনব রীতি এবং এই দুইয়ের সমন্বয়ে তাঁর গল্প বলার স্টাইলটি এতই  নতুন রকমের যে গল্প পড়তে পড়তে বেশ বুঝতে পারা যায় বাংলা ছোট গল্পের লিখনশৈলীতে ইনি এক ব্যতিক্রমী পথের পথিক ।

গল্পের খাতিরে অমিয়ভূষণ অকুণ্ঠভাবে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন ।

উত্তরবঙ্গের প্রাচীন জনজাতি কোচ ও রাজবংশীদের মুখের ভাষা ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর গল্পের বিভিন্ন আঞ্চলিক চরিত্রের নিজেদের কথোপকথনের   মধ্যে । এতে চরিত্রগুলির চিত্রায়ণ বাস্তবানুগ যথাযথ হয়েছে।

যদিও সঙ্গত কারণেই ঘটনার বর্ণনা ইত্যাদিতে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ তিনি করেননি ।

তাঁর ছোটগল্প পড়তে পড়তে আমার আর এক কালজয়ী মহৎ সাহিত্যের কথা মনে পড়ে যায়…সতীনাথ ভাদুড়ীর লেখা ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’।

আমরা যারা কলকাতার বাংলা ভাষায় কথা বলি, শহুরে ভাষায় লেখা সাহিত্য পাঠ করি, এই উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা সংলাপ বুঝতে আমাদের অসুবিধা হবে ।

এ ব্যাপারে সচেতন অমিয়ভূষণ নিজেই লিখে গেছেন…’আমি কখনোই বলতে পারি না, আমি যা লিখলাম সকলেই তা সমানভাবে বুঝতে পেরেছে।’

এজন্যই আগে লিখেছি অমিয়ভূষণের লেখার ভাষা,কাহিনীর চলন, বিস্তার ও উপসংহার সবকিছুই পাঠকের একান্ত মনোযোগ দাবী করে, সহজ উপায়ে তার রসগ্রহণ সম্ভব নয়।

তাঁর কাহিনীর প্লট সঞ্চয়নে বৈচিত্রের অভাব নেই ।

গল্পের মধ্যে একটা মৌলিক জীবন জিজ্ঞাসা, একটা অস্পষ্ট অন্বেষণ যেন বার বার ততঃ কিম ততঃ কিম শব্দে ফিরে ফিরে আসে।

কিন্তু কিসের বা কেন সেই অন্বেষণ তা সবসময় বোঝা যায় না।

লিখেছেন ‘ততঃ কিম’ নামেই এক গল্প…

‘রেলগাড়ি যখন চলতে থাকে অনেক সময়ে ততঃ কিম ততঃ কিম এই রকম শব্দ শোনা যায়।….একজন সংসারী মানুষ থেকে থেকে যেন সংসারের নিরেট দেওয়ালের মধ্যে জানালা খুলে দেয়। এ তুলনাটা রাখতে হলে বলতে হবে জানালা খোলার আগে একরকম বন্ধ বাতাসে দম আটকে আসছে বলে সে অনুভব করে।’

বাক্যগঠনের চমৎকার স্টাইলটা মনোযোগী পাঠক নিশ্চয়ই লক্ষ্য করছেন !

কথাসাহিত্যিক অমিয়ভূষণকে চিনতে গেলে সব থেকে ভালো উপায় এটাই…গঙ্গোদকে গঙ্গা-তর্পণ !

‘যে সাগ্নিকা’ গল্পে…

‘জীবনের একটা প্রান্ত যেন মহেন্দ্র ধরতে পেরেছে। বেঁচে থাকার সার্থকতা কি এই ধরতে পারাটুকু ? কিংবা এই ধরার জন্য পথের ধুলোয় যে ক্লান্ত পদচিহ্ন রেখে মানুষ ছুটে চলেছে সেগুলিই সার্থকতা ?’

আবার ‘সাদা মাকড়সা’ গল্প থেকে…

‘তুমি যে প্রশ্নটা করেছো সোজাসুজি তার উত্তর দেওয়া যায় না। কে কখন কি কাজ করে, কেন করে এ যদি বলা গেলো তবে তো পৃথিবী সম্বন্ধে সব বলা হলো, সীমাবদ্ধ করা হলো।  মানুষের মন কি পরিসীমায় বর্ণনা করা যায় ?’

সত্যিই তো মানুষের মনকে এক নির্দিষ্ট পরিসীমার মধ্যে বেঁধে রেখে বর্ণনা করা যায় না। কিন্তু কাহিনীকার অমিয়ভূষণ যেন সেটাই করতে চান ! কিন্তু সেই ক্রিয়ার মধ্যে যেন কোনো তাগিদ নেই, নেই ক্ষিপ্রতা, লেখকের চিন্তা ও মননের ওপর ভর দিয়ে সে বর্ণনা এগিয়ে চলে।

‘নটিলাস’ গল্পে অমিয়ভূষণ লিখছেন,

‘সেই যে ডুবুরি জাহাজের জানলায় বসে সমুদ্রের প্রাণময় বিস্ময়কে লক্ষ্য করার গল্প । জীবন-রহস্য সম্ভবতঃ তার চাইতেও বড়ো, গতিময় বিস্ময় চারিদিকে থৈ থৈ করছে ।’

এক অসাধারণ গল্প ‘ওগো মুগ্ধা’…

‘গায়ত্রীর মনে হলো একটা অন্ধকার নিঃসঙ্গ কূপেতে সে শুয়ে আছে। মেল্ ট্রেন ছুটে চলেছে। বাইরে কখনও আলোকিত স্টেশন ছিটকে যাচ্ছে। সে আধ-ঘুমন্ত অবস্থায়, তার মনে হতে লাগলো : কৃত্রিম। এই শব্দটাই বার বার মনে হতে লাগলো একটা অব্যক্ত অনির্দিষ্ট আবেগের মতো।  সম্মুখের গতিটাই যেন কৃত্রিমতার পরিহাস। শুধু অন্ধকারটা তাকে যেন শান্তি দিচ্ছে বলে সে জানালা খুলে চিৎকার করে কিছু বলছে না। শুক্তি দুটি ডানায় আটকানো অন্ধকার যেন।  তারপর তার স্বপ্নের পরিবর্তন হলো। সে যেন দেখতে পেলো কৃত্রিম রেললাইনের পাসগে ঘাসফুল ফুটে রয়েছে। যেন রাজপথের ফাটলেও ফুটে উঠতে পারে।’

এবার ‘মৃন্ময়ী অপেরা’ গল্প থেকে…

‘ছিধর আগে ভাবতো অতীতের কথা মনে করা যেন অল্প জলে বাস করতে অভ্যস্ত কোনো মাছের এক অন্ধকার সমুদ্রের গভীরে নামা । দম বন্ধ হয়ে আসে, অন্ধকারে চোখে দেখা যায় না। এখন সে ভাবে তা নয়, বরং জলের দু-এক ফুট নীচেকার অস্পষ্ট আলোর নীল নীল স্তরে অভ্যস্ত সেরকম মাছের জলের উপরে উঠে আসা। সেখানে প্রচুর অক্সিজেন থাকতে পারে, থাকতে পারে অন্ধকার কাটানো আলো, কিন্তু বেশীক্ষন থাকলে দম নেওয়া যাবে না।’

বাংলা সাহিত্যে ‘তাঁতি বৌ’ বা ‘সাইমিয়া ক্যাসিয়া’-র মতো গল্প আমার মতে খুব কম লেখা হয়েছে।

‘সাইমিয়া ক্যাসিয়া’-র কাহিনী ঘটছে এক দুর্গম পার্বত্য পরিবেশে, কাহিনীর পটভূমিকায় রয়েছে ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সংকট ও উপসংহারে রয়েছে মর্মান্তিক ট্রাজেডি।

অমিয়ভূষণের সবকটি গল্পের মধ্যে আমার মতে এই দুটি গল্পে তাঁর গল্পকথনের স্বাতন্ত্র সবথেকে বেশী ফুটে উঠেছে ।

রচনাসংগ্রহে দেওয়া সূত্র থেকে ‘সাইমিয়া ক্যাসিয়া’-র রচনাকাল সম্বন্ধে যথাযথ দিকনির্দেশ পাওয়া যায় না।

তবে গল্পটা পড়ে আমার মনে হয়েছে, দালাই লামার তিব্বত থেকে ভারতে নিষ্ক্রমণ এবং সেইসময়ে চীনা সৈন্যবাহিনীর তিব্বতবাসীদের ওপর সমূহ অত্যাচারের যেসব খবর এদেশে এসেছিলো, তা আজীবন ট্রেড ইউনিয়ন করে আসা অমিয়ভূষণের মনে কঠিন রেখাপাত করেছিল এবং এই অসাধারণ গল্পটি সেই মানসিক বেদনার প্রতিফলন।

‘সাইমিয়া ক্যাসিয়া’ থেকে অন্ততঃ  দু-তিন লাইন তুলে দেওয়ার লোভ সামলানো কঠিন। গল্পের এক প্রধান চরিত্র তিব্বতী লামা থেনডুপ বলছে,

‘…উত্তরের কুকুররা এসে পড়েছে সে খবর কি তোমরা পাওনি ? আমাদের সব গেলো, উদ্ধারের আর আশা নেই। উত্তরের কুকুরদের দাঁত ঝকঝক করছে, জিভ থেকে লালা গড়াচ্ছে। তারা আমাদের দেশের মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে।

পেমা বললো, কাদের কথা বলছো, সাম্যবাদীদের ? – হ্যাঁ, তাই বলে নিজেদের তারা। কিন্তু আমি তাদের রাক্ষুসে ক্ষুধা দেখেছি…’

#

এতক্ষণে মনে হয় জনপ্রিয় গল্প-বলিয়ে শংকর, শীর্ষেন্দু  মুখোপাধ্যায় বা নরেন্দ্রনাথ মিত্রের তুলনায় অমিয়ভূষণের গল্পকথনের ভঙ্গির তফাৎটা মনোযোগী পাঠকের চোখে ধরা পড়েছে ।

আমাদের মনে রাখতে হবে যখন সন্তোষ ঘোষ, বিমল কর, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সুবোধ ঘোষ, সমরেশ বসু একধরণের গল্পে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছেন সেই সময়টাতেই নিঃসঙ্গ প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখক অমিয়ভূষণ লিখে যাচ্ছেন তাঁর নিজস্ব স্টাইলে, কলকাতা থেকে দূরে মফঃস্বল  কুচবিহার শহরে বসে, কোনোরকম বড়মাপের স্বীকৃতির তোয়াক্কা না করে ।

সঞ্জয় ভট্টাচার্যর পূর্বাশা পত্রিকায় অনিয়ভূষণের গল্প ‘প্রমীলার বিয়ে’ তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প।

সেই প্রথম প্রকাশিত গল্পের পেছনের ঘটনাটাও বেশ মজার, নিজেই লিখেছেন তিনি তাঁর প্রবন্ধের বইটিতে,’নিজের কথা’ প্রবন্ধে ।

‘….লিখে তো যাই একের পর এক। পাঠাই না।  স্ত্রী পড়েন আমার লেখা।  একদিন সন্ধ্যায় বললেন, লেখো তো বটে, ছাপে না তো কেউ।’

শুনে ছাব্বিশ বছরের স্বামীর বোধহয় মানে লাগলো। টেবিলের ওপরে পড়েছিল পূর্বাশা পত্রিকা, ছোটভাই ট্রেনে পড়ার জন্য কিনেছিলো।

অমিয়ভূষণ আগে কখনো সে পত্রিকার নাম শোনেননি। তখন ‘প্রবাসী’ ‘ভারতবর্ষ’-এর রমরমা সময় চলছে ।’দেশ’ ও ‘শনিবারের চিঠি’ -ও বেশ পরিচিত পত্রিকা। ‘প্রমীলার বিয়ে’ পাঠিয়ে দিলেন পূর্বাশার ঠিকানায়। সপ্তাহ দুইয়ের পর তাঁর হাতে এলো ‘পূর্বাশা’-র কপি, তাতে ছাপা হয়েছে ‘প্রমীলার বিয়ে’ আর তার সঙ্গে সাম্মানিক পনেরো টাকা !

অমিয়ভূষণ লিখেছেন,

‘অবাক কান্ড ! শুধু ছাপায়নি গল্পটা,এতো তাড়াতাড়ি, আবার তার জন্য টাকাও।’

সেদিন হয়তো সঞ্জয় ভট্টাচার্য ততটা বুঝতে পারেননি যে এই ছাব্বিশ বছরের তরুণ গল্পকার কালক্রমে গল্পকথনের এক নতুন ভঙ্গির প্রবর্তন করবে।

এই ‘প্রমীলার বিয়ে’ প্রকাশিত হওয়ার পর অমিয়ভূষণকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি ।

তবে ‘দেশ’ গল্প ফেরত দিয়েছিলো যে সে কাহিনী তো আগেই লিখেছি ।

অমিয়ভূষণ চিরকাল সাহিত্যের পণ্যমূল্যকে তুচ্ছজ্ঞান করে তার ধ্রুপদী কালজয়ী সাহিত্যমূল্যকে প্রধান আসনে বসিয়ে রেখেছিলেন।

তাই প্রধান প্রধান পত্রিকা বাদ দিয়ে প্রায় সারাজীবন তাঁর সাহিত্যকর্ম ছড়িয়ে দিয়েছেন ছোট পত্রিকায়, লিটল ম্যাগাজিনের পাতায় পাতায়।

নিজেকে তিনি লিট্ল ম্যাগাজিনের লেখক বলেই পরিচিত করেছেন নিজের লেখায়।

তাঁর শতবর্ষে এক স্মৃতিসভায় আমন্ত্রিত হয়ে আমি পরিহাসছলে আমার ভাষণের মধ্যে বলেছিলাম, অমিয়ভূষণ সম্ভবতঃ একমাত্র লেখক যাঁর গল্প ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার আগে তিনি বঙ্কিম ও সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার পেয়েছেন। পরে জেনেছি  এই শ্লাঘনীয়  ক্লাবের সদস্য আর একজন বিরল ব্যক্তিত্ব, স্বমহিমায় উজ্জ্বল, তিনি মহাশ্বেতা দেবীর পুত্র নবারুণ ভট্টাচার্য্য ( ‘হার্বার্ট’ – ১৯৯৭ ) !

ওই ছোট পত্রিকায় লেখালেখির সূত্রেই নিবিড় ঘনিষ্ঠতা হয়ে ওঠে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে যা কবির মৃত্যু পর্যন্ত অটুট ছিল।

অমিয়ভূষণের পুরস্কার প্রাপ্তিতে কবি পরম আনন্দে রোগশয্যা ( প্রয়াণ – ১৯৮৫ ) থেকে কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন।

আর অমিয়ভূষণের প্রয়াণ ( ২০০১) ঘটলে বিভিন্ন লিট্ল ম্যাগাজিন, তাঁর স্মৃতিতে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল।

এমনই এক পত্রিকায় কবি প্রবাস দত্ত তাঁর স্মৃতিতে যে কবিতাটি লিখেছিলেন সেটি এখানে উদ্ধার করার লোভ সামলাতে পারছি না।

‘সাহিত্যিকের সাহিত্যিক’ অমিয়ভূষণ এই কবিতার কয়েকটি মাত্র ছত্রে একেবারে জ্বলজ্বল করছেন।

 

অমিয়ভূষণ

প্রবাস দত্ত

প্রথাসিদ্ধ পথে গেলে

সিদ্ধি জানি তাঁরও লভ্য ছিল।

উত্তরীয় কাঁধে ফেলে

হওয়া যেত সম্ভ্রান্ত বণিক।

 

তবুও যখন তিনি

স্বেচ্ছায় নির্বাসনে যান,

নদী-গাছ-মাটি

আকাশের সস্নেহ আশ্রয়,

বাঁচার ভেতরে বাঁচা

এইসব তুচ্ছতায় একা এক দুষ্প্রাপ্য জীবন

কঠিন কৃচ্ছ্রের বৃত্তে নিরন্তর সমর্পিত রেখে

কেবলই বেড়ান খুঁজে

অন্য এক আশ্চর্য ভুবন,

 

তখনই নিশ্চিত জানি

সিদ্ধি তাঁর অভিপ্রেত নয়।

 

কঠিন শ্রমের শেষে

স্বেদই তাঁর সর্বোচ্চ ভূষণ।

#

গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষভাগে, যখন আমার মাতামহ মাখনলাল মজুমদার আমাদের সঙ্গে শ্রীরামপুরের বাড়িতে কিছুকাল ছিলেন, সেইসময় এক প্রাক-বৈকালে অমিয়ভূষণ তাঁর জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে আমাদের বাড়ি এসেছিলেন।

কলেজের পর একটু আড্ডা মেরে আমি সন্ধ্যার মুখে বাড়ি ফিরলাম।

বাড়িতে ঢুকতেই মা বললেন, ‘অন্তিকাকার ছেলে অমিয়দা এসেছিলেন বাবার সঙ্গে দেখা করতে । কত বড়ো লেখক, জানিস ? ঘন্টাখানেক বসে চলে গেলেন, গোলপার্কের রামকৃষ্ণ মিশনে সভা আছে। ইস, তোর সঙ্গে দেখা হলো না।’

১৯৭৫-এ পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে গেলাম ।

আজ পর্যন্ত কুচবিহারে কখনো যাওয়াই হয়নি ।

একচল্লিশ বছরের প্রবাস জীবনে এখনও মাঝে মাঝে ভাবি কেন যে সেদিন কলেজের পর সোজা বাড়ি ফিরে আসিনি ।এ আক্ষেপ আমার সারা জীবনে যাবে না

 

ঋণ : অজস্র লিট্ল ম্যাগাজিন, দেবাশিস মজুমদার

 

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2021 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ