02 Oct

মহালয়া মানেই মন কেমন

লিখেছেন:মিতালী মিত্র


আমাদের মহালয়াতে রেডিও ছিল। কাশফুল ছিল, খড়ে নদীর ধারে বেড়ানো ছিল। ভোরবেলা তখন শিশির পড়তো, হিম হিম ঠাণ্ডা লাগতো। বীরেন ভদ্র তখন বছরে একবারই শোনা যেত, যখন তখন ক্যাসেট চালানোর রেওয়াজ ছিল না। একেবারে তিথি মেনে দেবীপক্ষের সূচনাতেই তাঁর জাগো জাগো মা শুনে আমাদের মন কেমন করে উঠত। দেখতুম বাবা মায়ের মুখে হাসি, চোখে জল। তার আগের রাত্তিরে বারে বারে ঘুম ভেঙে যেত, যদি মা ডেকে না দেয়, যদি প্রথম থেকে শুনতে না পাই। অন্ধকার থাকতে উঠেই আগে দাঁত-টাত মেজে পরিষ্কার জামা পরে আমরা তৈরি হয়ে বসতুম রেডিওর সামনে। দাদাভাই পেন আর খাতা নিয়ে রেডি থাকতো, প্রথম থেকেই একটার পর একটা গান লিখে নিতে চেষ্টা করত। মা ঘর ঝাঁট দিয়ে দরজায় দরজায় জল দিয়ে, ঠাকুরঘরে ধূপ জ্বালিয়ে দিত। আমাদের ফিলিপস মুলার্ড রেডিওতে প্রথমে বিপবিপ শব্দ, তারপর সেই চিরকালীন ধূন। শুরু হয়ে যেত আমাদের পুজো। অন্ধকার একটু আবছা হলেই ছাতে চলে যেতাম। আশেপাশে বাড়িতে রেডিওতে বাজলো তোমার আলোর বেণু। সামনের ঠাকুমার বাড়ি থেকে শিউলি ফুলের গন্ধ উঠছে, টুপটাপ ফুল ঝরে পড়ছে, আর পাড়ার অনেকেই দল বেঁধে নদীর ধারে বেড়াতে যাচ্ছে। কেমন আনন্দ হতো, সে বোঝানো যাবে না। একটু পরে বীরেন ভদ্র যখন রূপং দেহি, জয়ং দেহি শুরু করবেন, তখন বাবার সঙ্গে আমরাও নদীর ধারে বেড়াতে যেতাম। আমাদের জলঙ্গী যাকে আমরা বলি খড়ে নদী, তার পার ধরে সেই ব্রিজ পর্যন্ত চলে যেতাম আমরা। আমাদের নদীর ওপারটা ছিল মায়াকোল গ্রাম। কত যে কাশ ফুল ফুটে থাকতো নদীর দুই পারে দেখলেই মনের মধ্যে কী যেন হত, ভালো লাগতো, মন কেমনও করত। কেন এমন হত জানি না। কত চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হত, হাঁটতে হাঁটতেই কথা, যার বেশিটায় থাকতো এই পুজোতে কটা জামা হল, জুতো না চটি, আর লিপস্টিক, কুমকুম বিন্দি, চুলের ক্লিপ……..

সেই সকালে আমরা বাড়ি ফিরতাম জিলিপি কিনে। ফেরার পথে টিনের ছোট গেট ঠেলে ঢুকে পড়তুম বড়দি-ছোড়দির বাড়ি। নদীর ধারে ঠাকুর বিসর্জনের ঘাট আর মোমিন পার্কের মাঝে ছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামী শিবরাম গুপ্তর বাড়ি। যেখানে থাকতেন তাঁর দুই দিদি বড়দি আর ছোড়দি বাল্যবিধবা চুল ছাঁটা সাদা মাথা বড়দি আর স্কুলের দিদিমনি এক ঢাল সাদা চুলের ছোড়দি। অকারণে স্নেহ দিতে বড়দি, ছোড়দির কাছেই প্রথম শেখা। স্থল পদ্ম তো ছিলই, একটা ছোট গোল চৌবাচ্চাতে জল পদ্মও ফুটে থাকতো সেই বাড়িতে। বারান্দার সামনে দিয়ে আঙুর লতায় থোকা থোকা আঙুর ঝুলতো। আর ছিল এক বিরাট বেড়াল পরিবার। আরও নানা ফুল ও ফলের গাছ ছিল। বাবা যখন শিবরাম জ্যাঠার সঙ্গে দেশের হালচাল নিয়ে কথা বলত, আমরা হুটোপাটি খেলতাম।শুধু তো আমরা নই, আমাদের এপাড়া সেপাড়ার অনেকেই সেদিন বড়দি ছোড়দির সঙ্গে দেখা করে যেতেন। সেই বাড়িতে কিছু সময় কাটিয়ে আবার পরের বছর আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাড়ি ফেরা।

এমনই চলত। তবে মাঝে মাঝে মহালয়াতে নদীর ধারে যাওয়া হত না। যখন অঝোর বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে থাকত নদীর ধার। তখন আমাদের বাড়িতে অতিথি হতেন পুন্যিদিরা। একেবারে সহজ সরল হাসিখুশি পুন্যিদির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কখনও মাথা ঘামানো হয়নি। বড় হয়ে জেনেছি, তিনি ছিলেন আমার বড় পিসির জায়ের মেয়ে পূর্ণিমা। সে যাই হোক, চিরকাল আমাদের মা –বাবা  ই ছিলেন পুন্যিদির মামী-মামা।তাঁরও যেমন, তাঁর ছেলেদেরও তেমনই মামাবাড়ি ছিল আমাদের বাড়িটাই। পুন্যিদি, অমিতাভ জামাইবাবু আর তাদের দুই ছেলে- দেবু আর টাপু। ওদের বাড়ি ছিল নদীর ধারে, নগেন্দ্রনগরে তিন ইঞ্চি বাড়ির পাশে। বেশি বৃষ্টি হলেই সেই নগেন্দ্রনগরে জল জমত, পথঘাট, ঘরবাড়ি জলময়। বৃষ্টি বাড়াবাড়ি হলেই আমার মা অস্থির হয়ে উঠতো, ওদের খবর নিতে। তখন টেলিফোন ছিল না, তাই বাবাকেই ছুটতে হত, সাইকেল নিয়ে। বাবার তাগাদায় জল বেশি হওয়ার আগেই ওরা এসে উঠত আমাদের বাড়ি। তা কয়েকদিন হইহই করে ভালোই কাটত আমাদের। শরৎকালে বৃষ্টি থামার পরে সামান্য রোদ্দুর মাখা বিকেলে হেঁটে বেড়াতে মজা লাগে। আমাদের কাজ ছিল কদমতলায় গিয়ে নদীর ধার বরাবর যে রাস্তাটা গিয়েছে নগেন্দ্রনগরে তার জল মাপা। জল কতটা কমল তা দেখে এসে পুন্যিদিকে বলতে হত। মানে, কোনও দিন চৌধুরিবাড়ির বারান্দা দেখা যাচ্ছে, তারপর খেয়া ঘাট, তারপর বিসর্জনের ঘাট আর তারপর মোমিন পার্ক এর পাশের রাস্তা থেকে জল নামলে বোঝা যেত, এবারের মতো বন্যা নামল। আমার মহালয়ার সঙ্গে সেই জল মাপা ও যুক্ত হয়ে রয়েছে।

মহালয়া মানে নতুন জামা কাপড়। পুজোর প্রায় মাসখানেক আগে থাকতেই জামার ছিট আসতে শুরু করবে। বড়মামা কলকাতা থেকে কেমব্রিক থান নিয়ে যেতেন। আমাদের জামা তৈরি করতো মা। আনন্দবাজারের পাতায় বিজ্ঞাপনে নতুন জামা পরা ছবি দেখলেই আমার মা, সন্ধ্যেবেলা কাজকম্মো সেরে বড় কাঁচি, লাল-নীল পেনসিল, মাপের হলুদ টেপ ফিতে আর নতুন ছিট কাপড় নিয়ে মাটিতে বসে পড়তো। কাটাকাটি চলত। একবার এদিক, একবার ওদিক ভালো করে দেখে নিয়ে কাঁচি চালিয়ে দেওয়া। তারপরে সিঙ্গার কোম্পানির হাত মেশিনটি পেড়ে নিয়ে মাটিতেই শতরঞ্চি বিছিয়ে বসে পড়তো মা সেলাই করতে। আমরা উৎসাহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকতাম কিন্তু জামা আর হয় না। হবে কী করে, মা তো মাঝে মাঝেই উঠে যাচ্ছে, একে তাকে খাবার দিতে, চা দিতে। এত কাজও করতে পারে মা। দেখে তখন খুব রাগ হতো, মায়া নেই একটু। আমার যে ঘুম পেয়ে যাচ্ছে, কখন জামাটা পরে দেখব। সকলের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে মশারি, বিছানার পালা চুকিয়ে আমাকে শুয়ে পড়তে বলে মা আবার বসতো। যতক্ষণ পারি, ঘুম ঠেকিয়ে রাখতাম, মেশিনের আওয়াজ শুনতাম, কী তাড়াতাড়ি মেশিনের চাকাটা ঘুরিয়ে দিচ্ছে মা। এখনই হয়ে যাবে জামা, ঘুমোনো যাবে না।

তবে ঘুমিয়ে পড়তাম। ভোর বেলা ঘুম ভাঙলেই অবাক মাথার পাশে ভাঁজ করে রাখা আমার নতুন জামা-কী যে সুন্দর গন্ধ। মা এত ভালো সেলাই করে, কী সুন্দর ফিল দেওয়া ফ্রক বানিয়েছে। তাড়াতাড়ি মুখ টুখ ধুয়ে ফ্রকটা মাথায় গলিয়ে নিয়ে একছুটে রান্নাঘরে মায়ের সামনে গিয়ে দুহাত ছড়িয়ে দাঁড়াতাম, দেখোতো মা। কাজের মাঝেই মা তাকিয়ে দেখে নিত, কখনও কাঁধের কাছে, কখনও পিঠের বোতামটায় হাত দিয়ে ঠিক করে দিত। হল তো, যাও এবার জামাটা খুলে রাখো, ষষ্ঠীর দিন পরতে হবে তো। কিন্তু খুলে রাখতে বললেই তো আর হয় না, অন্যদের না দেখালে, মজা নেই। তাই বাবা, দাদাভাই এর সামনে দুপাক ঘুরে নিয়ে একদৌড়ে ছাত । উঁচু আলসে দেওয়া ছাতে আমি থাকলে, আমার জামা কেউ দেখতে পাবে না, তাও যেতাম। তারপর পাশের বাড়ি ঘুরে দেখানো আছে। মা যখন আবার বকাবকি শুরু করবে, তখন জামা খুলে রেখে আবার ভাঁজ করে রাখতে হবে। একটু বড় হতে অবশ্য মায়ের ওপর রাগ হতো। কেন সবাই যখন সঞ্জীব জ্যাঠাকে দিয়ে জামা করাচ্ছে, এমনকী আমার বাবা, দাদাভাইও, তখন আমারটা হবে না। কেন ? আমার জেদে দু-একবার করানো হয়েছে। সঞ্জীব জ্যাঠাও ভালোই ফ্রক বানাতেন, কিন্তু মায়ের মতো সুন্দর হতো না, তাই পরে মা-কেই আমাদের দায়িত্ব নিতে হত। এমনকী শাড়ি পরা শুরু করলে, পুজোর আগে নতুন শাড়ির ম্যাচিং ব্লাউজও মা তৈরি করে দিত। পাঞ্জাবি গলা, লম্ব হাতা, অথবা চাইনিজ হাতা, পাফ হাতা, কত ডিজাইন। আমার বন্ধুরা বলতো, তোর মা কী সুন্দর বানায়, গর্ব হতো মায়ের জন্যে। আমার মহালয়াতে মায়ের জন্য সেই গর্বটাও মিশে রয়েছে।

মহালয়ার দিন ছুটি থাকায়, কখনও কখনও আমার দিদি আর দিদিভাই আর দুই জামাইবাবু আসত পুজোর জামা-কাপড় নিয়ে। চিঠি লিখে আগেই জানিয়ে দিত যে আসছে ওরা। তাই সেই সব দিনে বাবার সকালে বাজারে যাওয়ার তাড়া থাকতো, ব্রিজ পর্যন্ত আর বেড়ানো হত না। মোমিনপার্ক ঘুরেই বাবার সঙ্গে ফিরতে হত। তার জন্য দুঃখ ছিল না কোনও কারণ দিদি-দিদিভাইরা আসা মানেই দুশো মজা। সকাল সকাল চান-টান সেরে ফিটফাট হয়ে ছাতে দাঁড়িয়ে পড়তাম সাইকেল রিক্সার প্যাঁক প্যাঁক শুনলেই উত্তেজনায় আলসের থোপে পা দিয়ে ডিঙি মেরে দেখার চেষ্টা করতাম। রিক্সাটা শান্তাদিদের রোয়াকটা ঘুরলেই কে আছে তা দেখা যাবে। বারবার ঝুঁকে দেখতাম অন্য কেউ, যখন সত্যি ওদের দেখতে পেতাম, এক দৌড়ে নিচে। দিদিরা নামার আগেই আড়চোখে দেখে নিতাম নতুন প্যাকেট ট্যাকেট আছে তো নাকি! বিশ্রাম টিশ্রাম নেওয়ার শেষে একে একে স্যুটকেশ থেকে বার হতো নতুন জামা, কুমকুম, কাজল, সেন্ট আরও কত কী। তখন কমপিটিশন থাকতো, দাদাভাই না আমার কার জামাটা বেশি ভালো, তা নিয়ে। মহালয়াতে এও আমার এক মজা।

মহালয়ার দুপুরে খাসির মাংস হবেই। গরম গরম মাংস ভাত খেয়ে আর ঘুম নয়, আমরা সবাই মিলে যেতাম দিদার বাড়ি, প্রণাম করতে। আমার দিদার বাড়ি নদিয়ার কৃষ্ণচন্দ্র রাজার বাড়ির উত্তর দেউড়ির ঠিক উল্টো দিকে। সেখানে দেখা হয়ে যেত ছোটমামা, বড়মামা মামিদের আর ভাইবোনেদের সঙ্গে। দিদার বাড়িতে পৌঁছনোর পর প্রণাম করলেই পাওয়া যেত দিদার নিজে হাতে বানানো লাল গোলাপ ফুলের পাঁপড়ি দেওয়া সন্দেশ। আহা কী অপূর্ব স্বাদ, অমৃত একেবারে। এইসময় রাজবাড়িতে যেতাম আমরা ভাইবোনেরা। ভাঙা দেউড়ির ওপরে সিংহ গুলো তখনও ছিল। পুজো আসছে বলে নহবতখানায় চুনের গোলা দেওয়া হত। তার পাশ দিয়ে গিয়ে পৌঁছবো ঠাকুরদালানে। মহালয়ার আগেই ঘোড়ামুখো সিংহর উপরে মা দুর্গার মূর্তিতে এক পোঁচ রঙ চড়ানো হয়ে যেত তখন কুমোরদাদুর। তখনও রাজমাতা মহারাণী জ্যোতির্ময়ী ছিলেন। তাঁকে অবশ্য দেখিনি। রাজবাড়ির ঠাকুর তৈরি দেখে নিয়েই আবার ছুট দিঘির পাড়ে। রাজবাড়ির মাঠে তখন বড্ড চোরকাটা থাকত, লেগে যেত জামায়, তাও যেতেই হবে। দিঘির পাড়ে ছিল থোকা থোকা কাশফুলের ঝাড়। আমার মহালয়া- সেই কাশফুলের মহালয়া।

[বানানবিধি/মতামত লেখকের নিজস্ব]

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • Debashis Roy (Debu) on October 6, 2021

    Khub bhalo laglo. Khub nostalgic hoye porechilam! Purono diner kothagulo khub mone pore. Etai bodh hoi boyos barar lokkhon. Mahalaya’r sokal manei Dadur songe tomar (kokhono kokhono Babua Mamar) amader barite probesh ek guccho kash phul hate niye! ……..sotti khub miss kori tokhonkar dingulo. Miss kori Baba, Maa, Dadu, Didima ke (Didimar toiri nimki ekhono mone pore.
    Anyway, khub bhalo theko sokole.

    ত্রিদিবেশ বন্দ্যোপাধ্যায় on October 27, 2021

    স্মৃতিকথাটি ভাল লেগেছে। হৃদয় থেকে লেখা। অনেক প্রৌঢ় মানুষ নিজেদের খুঁজে পাবেন এই লেখায়। সহজ সরল এই লেখায় একটা হারিয়ে যাওয়া সময়ের ছবি এঁকে দিয়েছেন লেখিকা।

    মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2021 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ