03 Oct

দিব্যেন্দু পালিতের মুখোমুখি

লিখেছেন:সাক্ষাৎকার নিয়েছেনঃ অনিন্দ্য সৌরভ


[ সাক্ষাৎকারটি উত্তরবঙ্গ থেকে প্রকাশিত ‘চিত্রকল্প’ পত্রিকায় ২০১৯ সালে প্রকাশিত।সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর।লেখক,অনুবাদক অনিন্দ্য সৌরভের সৌজন্যে তা ‘গল্পের সময়’-এর পাঠকদের জন্য তা ফের প্রকাশিত হল।]

অনিন্দ্য :   লেখার সময় আপনার উপন্যাস কি অতর্কিতে বাঁক নেয়,  নাকি সমস্তটাই আগে থেকে ছকে নেন ?

দিব্যেন্দু :  যে কোন লেখাই স্থিরীকৃত পথে না- চলার সম্ভাবনাই বেশি ।

অনিন্দ্য : আপনার সমস্ত উপন্যাসের ক্ষেত্রেই এমন ?

দিব্যেন্দু :  আমি কোনো বাঁধাধরা ছকে লিখি না  যে কোনও লেখাই যেভাবে শুরু করা হয় তারপরে বদলাতে থাকে।  এমনকি লিখতে লিখতেও বদলে যায়  ।

অনিন্দ্য :  ১৯৭১-১৯৮২ কালপর্বে প্রকাশিত উপন্যাসগুলিতে (সন্ধিক্ষণ, সম্পর্ক, আমরা, বৃষ্টির পরে,  বিনিদ্র, চরিত্র, একা, অহংকার, সবুজ গন্ধ) সেই সময়ের পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক– রাজনৈতিক ঘটনাবহুল উত্তালতার তেমন ছায়া পড়েনি। বাইরের প্রতি মুখ ফিরিয়ে রচনাগুলিতে বিধৃত হয়েছে মানুষের অন্তর্জীবনের  কথা ।— বৃহত্তর সমাজজীবন আপনাকে আকর্ষণ করত না ?

দিব্যেন্দু :  আমার মনে হয় এটা ঠিক না।  তার কারণ ‘সহযোদ্ধা’ আমার প্রথম পর্বের উপন্যাস এবং বহুপঠিত । ‘সহযোদ্ধা’র বিষয় রাজনীতি ।সেইসময় নকশাল আন্দোলন প্রবলভাবে সক্রিয়। নকশাল আন্দোলনের প্রভাব ওই উপন্যাসের ওপর পড়েছে।

অনিন্দ্য :  আপনার গল্প– উপন্যাস পড়ে মনে হয়,  শহুরে মধ্যবিত্তদের নিয়ে আপনি বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন । গ্রামজীবন আপনার সাহিত্যে কার্যত অনুপস্থিত,  এমন কী ইতিহাসের পটেও কখনো উপন্যাস লেখেননি।  কী লিখব যেমন ভেবেছেন,  তেমনি কি লিখব না , তা-ও কি ঠিক করে রেখেছেন?

দিব্যেন্দু : লেখার সমগ্রতার কথা ভাবলে কী লিখব আমাকে যেমন ভাবায়, তেমনি কি লিখবো না তাও আমাকে ভাবতে হয়। আমার মনে হয় যে কোন সৃষ্টিশীল লেখক সচেতনভাবে যখন লেখেন তখন কী লিখব এবং কী লিখব না— এই  দুই প্রশ্নই তাঁকে চিন্তিত  করে।

অনিন্দ্য : তাহলে বিষয়বস্তু নিয়ে প্রথম থেকেই নির্দিষ্ট ভাবনা থাকে ?

দিব্যেন্দু : যে বিষয় নিয়ে লিখব সেটাই আগে আসে কিন্তু লিখতে গিয়ে কি লিখব না- এটাই আমি ভাবি ।

অনিন্দ্য : যেহেতু আপনার কোনও ঐতিহাসিক উপন্যাস নেই তাই মনে হয়েছে কেবল সমকালীন জীবন নিয়েই আপনি লিখেছেন।

দিব্যেন্দু : প্রত্যক্ষভাবে ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে আমি লিখিনি।  কিন্তু আমার উপন্যাসে ইতিহাস নিহিত। নকশাল আন্দোলনের ঘটনা নিয়ে আমি লিখেছি ।

অনিন্দ্য :  সেটা এখন ইতিহাস , লেখার সময় তা সমকালীন ঘটনা ছিল।

দিব্যেন্দু : তার তো ঐতিহাসিক পটভূমি আছে।

অনিন্দ্য : আপনি বৃহৎ আকারের , ৩০০- ৪০০ পাতার উপন্যাস লেখেন নি । তেমন কোনও প্রস্তাব  পাননি,  নাকি না – লেখার অন্য কোনো কারণ আছে ?

দিব্যেন্দু :  আপনাকে খুলেই বলি । লেখার বিষয়ে আমি খুব সচেতন । বড় সাইজের উপন্যাস লিখতেই হবে আমি সেটা মনে করি না। লেখা প্রথমত যা দাবি করে , আমি সেভাবেই লিখি।

অনিন্দ্য :  তেমন কোনও প্রস্তাব কি আসেনি ? আপনার সমকালীনরা….

দিব্যেন্দু : একটা কথা পরিষ্কার  করা দরকার ।বড় উপন্যাস লিখতেই হবে , এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।  এর প্রয়োজনীয়তাও আমি বোধ করি না। সত্যি কথা বলতে কি,  আমার সমকালেই অনেক উপন্যাস লেখা হয়েছে যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাড়ানো হয়েছে।  আরও একটা ব্যাপার,  ধারাবাহিক উপন্যাস লেখার একটা প্রচলন বাংলা সাহিত্যে রয়েছে। বড় কাগজগুলো ধারাবাহিক উপন্যাস লেখানোর জন্য লেখকদের প্ররোচিত করে । সেক্ষেত্রে দেখা গেছে যে অনেক লেখা যা দাবি করে না, এমনভাবে, অপ্রয়োজনীয় বিষয়েকে টেনে এনে, রচনার দাবি না- মেনে বাড়িয়ে লেখা হয়েছে।  নাম করছি না কিন্তু আমাদের সময়ে ‘দেশ’ ইত্যাদি পত্রিকায় যেসব ধারাবাহিক উপন্যাস লেখা হয়েছে সেখানে অতটা লেখার প্রয়োজন ছিল না । যে লেখকরা লিখেছেন, তাঁরা নিজেরাও তেমন যুক্তি দেখাতে পারেন নি যে কেন অত বড় হল।  লেখা বড় হতে হবে তার কি মানে আছে ! যাকে ‘প্রিসিসন’ বলে আমি সেটাতে বিশ্বাস করি। লেখা যত স‌ংহত হবে ততই ভাল। আলবেয়ার কামুর লেখা পড়ে দেখবেন,  প্রয়োজনের বাইরে উনি যাননি। যাকে ‘প্রিসিসন’ বলে সেটা ওঁর লেখায় খুব বেশি এবং খুব শিল্পসম্মত লেখা।  বড় লেখক অপ্রয়োজনে বাড়িয়ে লেখেন না।

অনিন্দ্য : আপনার উপন্যাসের বিশেষত প্রথম খন্ড ‘দশটি উপন্যাস’ — এর চরিত্ররা অনেকেই বড় চাকরি করে।  তাদের রক্তে মিশে থাকে প্রতিদ্বন্দিতা–  অন্য প্রতিষ্ঠান আর সহকর্মীদের সঙ্গে ।  উন্নতি, অর্থ উপার্জন তাদের একমাত্র লক্ষ্য।  বলা যায় , তাদের আসল বিবাহ – কেরিয়ারের সঙ্গে । পরিণামে চরিত্রগুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়,  স্ত্রী-র সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা থাকে না । সম্পর্কহীন শূন্যতায়  রামতনু আত্মহত্যার কথা ভাবে (সম্পর্ক)। শিশির কিছু পেতে গিয়ে অনেক কিছু হারায়, তার নিঃসঙ্গ স্ত্রী শীলা আত্মহত্যা করে (একা) । মানুষের একাকিত্বের সমস্যা নিয়ে আপনি অনেক লিখেছেন।–  আমার প্রশ্ন,  এই বিচ্ছিন্নতা , একাকীত্ববোধ আমাদের শহুরে- শিক্ষিত – স্বচ্ছল সমাজে কি এতই প্রবল যে বেশিরভাগ উপন্যাসে আপনি এই প্রসঙ্গকে প্রাধান্য দিয়েছেন ?

দিব্যেন্দু :  মানুষের জীবনে বিচ্ছিন্নতা আছে , আধুনিক জীবনে তো বটেই। আমার লেখায় ওটা প্রাধান্য পেয়ে থাকলে তার উৎস এটাই ।মানুষের জীবন‌ই তাকে ওইভাবে গড়ে তুলেছে।বিশেষ করে আধুনিক কালে বিচ্ছিন্নতা , একাকীত্ব মানুষকে তার মূল মানবিক স্রোত  থেকে অনেকটাই সরিয়ে দিয়েছে । বিচ্ছিন্নতা ছাড়া আমি অন্যান্য বিষয় নিয়েও লিখেছি।  আমার যে উপন্যাসটি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছে– ‘অনুভব’….

অনিন্দ্য:  ‘অনুভব’ কলগার্লদের সমস্যা নিয়ে….

দিব্যেন্দু : ঠিক কলগার্লদের সমস্যা নিয়ে নয়। মেয়েদের একাকিত্বের ওপরে প্রাধান্য দিয়েছি। এটা করতে গিয়ে কলগার্লদের প্রসঙ্গ এসে গিয়েছে।

অনিন্দ্য : ‘দশটি উপন্যাস’ প্রথম খন্ডের রচনাগুলিকে কেউ যদি বড় গল্প বলেন, আপনার আপত্তি হবে কি?  কারণ কেবল বিষয়বস্তু নয়,  আকারের দিক থেকেও বড় গল্পের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন লেখাগুলি !

দিব্যেন্দু : সাইজের  ওপর নভেল নির্ভর করে না। আমি আলবেয়ার কামুর কথা বলেছি। কামুর ‘আউটসাইডার’, ‘ফল’ উপন্যাসগুলো   সাইজে ছোট—  তাহলে সেগুলো উপন্যাস নয় তা তো বলা যাবে না । ‘নভেলেট’  বলা যেতে পারে।

অনিন্দ্য : পঞ্চাশের দশকের কথাকারদের অনেকের লেখায় নারীর প্রতি সম্মানভাব সুলভ নয়।  যেমন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়,  শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়।  উল্টোদিকে আপনার লেখায় নারীর প্রতি সম্মানের ভাবনা বেশ স্পষ্ট । দেখতে পাই, ‘ঢেউ’ – এর সীতা,  ‘সোনালী জীবন’ – এর সারা,  ‘ঘরবাড়ি’র জয়া— পরিস্থিতির চাপে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছে।— নারীদের প্রতি আপনার এমন গভীর সহানুভূতি উৎস কি?

দিব্যেন্দু : আমি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি। সেখানে মা -মাসি – দিদা — এদের দেখেছি।  এদের ছাড়াও যারা প্রত্যক্ষভাবে আত্মীয়তার সম্পর্কে যুক্ত নয়– এমন অনেককেই আমি চিনি।  ওদের মধ্যেই আমি নারীর আসল রূপ লক্ষ করেছি । সেই জন্যই এমন কোন অভিজ্ঞতা হয়নি– যাতে নারীর সম্পর্কে কোনো বিরূপ ধারণা প্রবিষ্ট হ‌ই।  বাস্তবেও বাঙালি জীবন দেখে মনে হয় না যে নারীকে অবহেলার চোখে দেখার কোনও কারণ আছে।  আমার স্ত্রীকে দেখেছি, বোনেদের দেখেছি,  আবার যারা বন্ধুস্থানীয়– তাদেরও দেখেছি।  এই ভাবে নারী সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা আমার আছে । তার থেকে বিচ্যুত কোনও ধারণা….

অনিন্দ্য : নারীর ইতিবাচক দিকটিই আপনি নিজের জীবনে দেখেছেন।

দিব্যেন্দু: প্রায়ই ইতিবাচক। তার মানে এই নয় যে সবাই ভাল ।  আমার লেখাতেও  তেমন হয়নি। নারীর ভালো-মন্দ দুই -ই আছে কিন্তু ভালটাই বেশি।

অনিন্দ্য : ‘অনুভব’ উপন্যাসে কলগার্লদের সমস্যা বিধৃত হয়েছে।  অনেকদিন ধরে কিছু কিছু মহল থেকে দাবি উঠেছে,  শ্রমিক হিসেবে তাদের আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে। — আপনি কি এই দাবি সমর্থন করেন?

দিব্যেন্দু : আপনি ভাগ্যে বিশ্বাস করেন?

অনিন্দ্য :  অনেকটা।  ভাগ্যের ভূমিকা জীবনে আছে।

দিব্যেন্দু: ভাগ্যের  ভূমিকা জীবনে আছে — ঠিক বলেছেন।  এটা খুব দুর্ভাগ্য যে কেউ কলগার্ল হয়।  কেউ আবার চেষ্টা করেও ওই দুর্ভাগ্য এড়াতে পারে না । তাদের আন্দোলনের মধ্যে সত্য যতটা আছে প্রয়োজনীয়তাও ততটাই আছে।  সেটাকে সমর্থন না করার কোনও কারণ নেই।

অনিন্দ্য : কলকাতার অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের নিয়ে আপনি গল্প- ‘রুথ’ আর উপন্যাস ‘সোনালী জীবন’ লিখেছেন।  এই সম্প্রদায়ের সমস্যা বাংলা সাহিত্যে সচরাচর উঠে আসে না।– অ্যাংলো- ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে কি আপনার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল ?

দিব্যেন্দু : আমি যে চাকরি করেছি তার অনেকটা অংশেই সেই সব মেয়েদের দেখেছি যারা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজ থেকে এসেছে। তাদের জীবন আমি অনেকটাই দেখেছি।

অনিন্দ্য : তাঁদের সঙ্গে আলাদাভাবে মেলামেশা?

দিব্যেন্দু : আলাদা ভাবে মেলামেশা নয়, তাদের চিনি ভাল করে। কলকাতার রিপন স্ট্রিট অঞ্চলে অ্যাংলো- ইন্ডিয়ানদের বসবাস । ওরা কীভাবে জীবন যাপন করে তা আমি প্রত্যক্ষভাবে দেখেছি।  সুতরাং না -জানার কোনও কথা নয়।

অনিন্দ্য : ‘হিন্দু’ গল্পটি কি বারবি মসজিদ ভাঙার ঘটনার অভিঘাতে লিখেছিলেন? কারণ গল্পটি সেই সময়ে লেখা।

দিব্যেন্দু : আমি না বলব না,  হ্যাঁ- ও বলব না। ‘হিন্দু’তে যে অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে সেটা বাস্তব ঘটনা । আমি মনে করি ‘হিন্দু’ ভাল গল্প। যথেষ্ট যত্ন নিয়ে লিখেছি।

অনিন্দ্য : কলকাতা ১৯৬৭,  মানুষের মুখ, স্যার ইত্যাদি গল্প আর সহযোদ্ধা,  উড়োচিঠি,গৃহবন্দী  উপন্যাসে নকশাল আন্দোলনের উত্তাল সময়ের কমবেশি উল্লেখ আছে।  আপনি সেই আন্দোলনের পক্ষে না বিপক্ষে, লেখাগুলি পড়ে তা বোঝা যায় না ।–এত কাল পর , আপনি কি এ নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে চাইবেন? সেই সময় এখনতো ইতিহাস হয়ে গেছে।

দিব্যেন্দু : নকশাল আন্দোলন ইতিহাস হিসেবে মুছে যাবার না। সেই সময়ের নকশাল আন্দোলনকে আমি এক অর্থে সমর্থন করি। ‘সহযোদ্ধা’র কথা যদি বলেন, নামটির ভিতরে প্রত্যক্ষভাবে ‘অ্যাটাচমেন্ট’ রয়েছে। আদিত্য রায় এড়িয়ে যেতে পারেন নি। এইটুকুই বলবার।

অনিন্দ্য : মাছ , আলমের নিজের বাড়ি গল্পে দেশভাগের প্রসঙ্গ গুরুত্ব পেয়েছে ।–আপনার মতে, দেশ ভাগ কি অনিবার্য ছিল না কি তা এড়ানো যেত ?

দিব্যেন্দু : দেশভাগ যখন হয়েছিল তখন আমার বয়স খুব কম। তবে নিশ্চয়ই অনিবার্য ছিল। তার কারণ জহরলাল নেহেরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ– এঁরা সেই সময় রাজনীতির কাণ্ডারী ছিলেন।  এরা যেভাবে ইতিহাসকে  বিবৃত করেছেন, তা থেকে মনে হয় দেশভাগ এড়ানো যেত না ।

অনিন্দ্য : আপনার উপন্যাসগুলোতে অবিরল বৃষ্টি পড়ে যায় । ‘সিন্ধু-বারোয়াঁ’ থেকে আরম্ভ করে ঢেউ, ঘরবাড়ি,  অনুভব, আড়াল, সোনালী জীবন, স্বপ্নের ভিতর, অন্তর্ধান, সহযোদ্ধা, সিনেমায় যেমন হয়— সর্বত্রই বৃষ্টি। গৃহবন্দীর পটভূমি অংশত বোম্বে, সেখানেেও ঝরে চলেছে বৃষ্টি। ‘রাইন নদীর জল’ সহ অনেক ছোটগল্পেেও অর্থপূর্ণভাবে বৃষ্টির  উপস্থিতি লক্ষ্য করি।– বৃষ্টি কি আপনার খুব প্রিয়?

দিব্যেন্দু:  বৃষ্টির অনুষঙ্গ বারবার ব্যবহার করেছি বিষয়ের প্রয়োজনে।

অনিন্দ্য : আপনার লেখায় বৃষ্টি একটা ‘কমন ফেনোমেনা’র মত হয়ে গেছে।

দিব্যেন্দু:  ‘বৃষ্টির পরে’ আমার প্রথম দিকের উপন্যাস। মফ‌ঃস্বল নিয়ে লেখা। আপনি ভাগলপুর গেছেন।  সেখানকার প্রত্যক্ষ ধারণা থাকলে বুঝতে পারবেন, এর পটভূমি ভাগলপুর— সেই গঙ্গা আছে।

অনিন্দ্য :  নারী -পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের টানাপোড়েন আপনার অনেক গল্প -উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয়। যেমন মুন্নির  সঙ্গে কিছুক্ষণ, ট্রেনে, মহাদশায়,   সিঁড়ি, আবহাওয়া প্রভৃতি গল্প আর গৃহবন্দী, অবৈধ,আড়াল, সিনেমায় যেমন হয়, ঘরবাড়ির মতো উপন্যাস। এ সমম্ত লেখার  সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যৌনক্রিয়ার বর্ণনায় আপনি অত্যন্ত সংযত থেকেছেন। আপনার শ্রদ্ধাভাজন লেখক সমরেশ বসু এ বিষয়ে বেশ খোলামেলা ছিলেন।– আপনি কি বিতর্কের ভয়ে তেমন বর্ণনা এড়িয়ে গিয়েছেন ?

দিব্যেন্দু : অপ্রয়োজনে বাড়িয়ে লেখা, বর্ণনা করা আমি পছন্দ করিনা। আলবেয়ার কামুর লেখা  আমাকে অনেকটা প্রভাবিত করেছে। কীভাবে লিখতে হয় সেটা আমি কামুর কাছে অনেকটা শিখেছি।

অনিন্দ্য : সেজন্যই যৌনতার বর্ণনা আপনার লেখায় নেই ?

দিব্যেন্দু : আমার লেখায় যৌনতা যথেষ্টই আছে । তবে অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা নেই । অনেক লেখক ‘Sex for sex sake’  করেন।  এতে বিক্রি, জনপ্রিয়তা বাড়ে। সমরেশ বসু বা ওই পিরিয়ডের অনেক লেখকই যৌনতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন— অপ্রয়োজনেও।  ভাল করেছেন না খারাপ করেছেন– সেটা আমি বলব না। ভাল‌ও করে থাকতে পারেন—- যেমন ‘বিবর’ সম্পর্কে অনেকে বলেন। কিন্তু আমি অপ্রয়োজনে যৌন- বর্ণনার পক্ষপাতী নই।

অনিন্দ্য : কবিতা লিখতে গিয়ে আপনার কি কখনো মনে হয়েছে,  এই ভাবনা নিয়ে একটা ভালো ছোট গল্প লেখা যায় , ফলে কবিতা ছেড়ে দিয়ে ভাবনাটা গল্পের আকারেই প্রকাশ করেছেন,  তেমন কোনও অভিজ্ঞতা কি আপনার হয়েছে?

দিব্যেন্দু :এ নিয়ে আমার মনেই প্রশ্ন আছে। প্রশ্নটা হল,  মাধ্যম হিসেবে কোনটা কে বেছে নেব ! লেখার ভাবনা যখন মাথায় আসে, তখন তার আঙ্গিক  কি হবে,  লিখতে গিয়ে দেখি,  সেটা গল্প চাইছে না কবিতার দিকে বাঁক নিচ্ছে— এই রকম নানা ব্যাপার ঘটে।

অনিন্দ্য : কবিতা লিখতে গিয়ে বিষয়টা গল্পের দিকে চলে যাচ্ছে,  তাই শেষ পর্যন্ত সেই বিষয় নিয়েই গল্প লিখে ফেললেন, তেমন কি ঘটেছে ?

দিব্যেন্দু : না,  তেমন ঘটেনি। দুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম । আমি কবিতাও কম লিখিনি, গোড়া থেকেই লিখেছি।

অনিন্দ্য : বর্ণনা অংশে উপমা- উৎপ্রেক্ষার ব্যাপক ব্যবহার আপনার গদ্যেকে বিশিষ্ট করেছে। তেমন একটি দৃষ্টান্ত, ‘বালিতে বিজবিজ করা ফেনার মতো শীত  ঢুকে পড়েছে শরীরে’ (অবৈধ)  ।– আপনি কবিতা লেখেন বলেই কি অমন চমৎকার উপমা প্রয়োগ করেন ?

দিব্যেন্দু : হয়তো তাই। কারণ দুটো একই লেখক লিখছে। গদ্য লেখকের সত্ত্বা আর কবির সত্ত্বা — দুটোই একসঙ্গে কাজ করে।

অনিন্দ্য : সাহিত্য আকাদেমির ‘মিট দ্য অথর’ অনুষ্ঠানে (২৪.০২.১৯৯৯) সমকালীন লেখকদের সম্পর্কে আপনি বলেছিলেন, ” in content,  technique and language, they were forgiving a difficult path, perhaps morden, they were difining a new regime. ” উদাহরণ দিয়ে বক্তব্যটি পরিষ্কার করবেন কি ?

দিব্যেন্দু : আমরা নতুন যুগের লেখক। আমরা যে সময় লিখতে শুরু করেছি তার আগের সময়ে যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের থেকে অনেক তফাত। সময়টাই সাহিত্যের তফাত গড়ে দিয়েছিল।  আমাদের আগে বিমল কর,  রমাপদ চৌধুরী প্রভৃতি লেখক যা লিখেছেন সেটা ঠিক আমাদের লেখা নয়।  একজন বিশিষ্ট লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।  শীর্ষেন্দুর লেখা সম্পূর্ণ আলাদা। দেবেশ‌ও সম্পূর্ণ  আলাদা । মতি নন্দী তো বটেই।  আমরা নতুন সময়ের লেখক।   নতুন সময়,  নতুন সমাজকে দেখেছি। আমাদের লেখায় সেই বিবর্তনের ছাপ,   যার ভেতর দিয়ে আমরা এসেছি,  পরিষ্কার খুব। যদিও আমি শীর্ষেন্দুর আধ্যাত্মিকতায় ততখানি বিশ্বাসী নই,  আমার বিশ্বাস আলাদা,  তবু আধ্যাত্মিকতাকে আমি উপেক্ষা করতে পারি না। মতি নন্দীতে আধ্যাত্মিকতা বলতে গেলে নেই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আবার সম্পূর্ণ অন্য বিষয় নিয়ে লিখেছে।  দেবেশ অনেকটাই রাজনৈতিক বিষয় এনেছে।  এইভাবে সমসময়ে বাস করেও বিভিন্ন খাতে বয়ে গিয়েছে — এটা আমাদের সময়ের লেখার বৈশিষ্ট্য ।

অনিন্দ্য : প্রায় পাঁচ দশক আগে আপনাদের অর্থাৎ পঞ্চাশের কথাকারদের আবির্ভাব। এতকাল পরেও প্রধানত আপনারাই  প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য — ব্যক্তিত্ব। দু-তিনজনকে বাদ দিলে পরবর্তীকালের লেখকরা সেভাবে প্রতিষ্ঠা পান নি।– আপনার মতে,  এর কারণ কি ?

দিব্যেন্দু : যা বলেলেন সেটা খুব সত্যি। লেখার ক্ষমতার জোর একটা বড় ব্যাপার।  পরবর্তীকালে যাঁরা লিখেছেন তাঁরা ঠিক নিজেদের অনুভব নিয়ে লিখতে আসেন নি বলে মনে হয়।  তাঁরা পূর্ববর্তী কোনও কোনও লেখককে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন। ফলে নিজস্বতা ততখানি ফুটে ওঠেনি।

অনিন্দ্য : সেটাই কি তাঁদের দুর্বলতার কারণ ?

দিব্যেন্দু:  হতে পারে।  আমাদের কারও ওপরেই পূর্ববর্তী লেখকদের তেমন প্রভাব পড়েনি। আরেকজন ভালো লেখক ছিলেন,  জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী।

অনিন্দ্য : আপনাদের থেকে ‌উনি  সিনিয়র।

দিব্যেন্দু : উনি বিমল কর,  রমাপদ চৌধুরীদের বয়সী।

অনিন্দ্য : সলমন রুশদি বলেছেন,  বই পড়ে উনি যত শিখেছেন,  ভালো সিনেমা দেখেও ঠিক ততটাই শিখেছেন । আপনি “সিরিয়াস” সিনেমার একজন আগ্রহী দর্শক।— সিনেমা কি আপনার সাহিত্য -সৃষ্টিতে প্রভাব ফেলেছে ?

দিব্যেন্দু : আমি গোড়া থেকেই  সিনেমার খুব ভক্ত।  চাকরি জীবনে একটা সময় যখন সংবাদপত্রে ছিলাম,  তখন সিনেমার দায়িত্বেও ছিলাম।  সিনেমা রিভিউ ইত্যাদি করেছি।  ভাল সিনেমা ভাল সাহিত্যকে প্রভাবিত করতে পারে— এটা আমি বিশ্বাস করি।

অনিন্দ্য : প্রত্যক্ষ প্রভাব কি রয়েছে আপনার লেখায় ?

দিব্যেন্দু : না , আমার লেখায় সিনেমার প্রত্যক্ষ প্রভাব নেই।

অনিন্দ্য : সিনেমা কি অন্য কোনও ভাবে আপনার শিল্প চেতনাকে প্রভাবিত করেছে ?

দিব্যেন্দু : হ্যাঁ । আমি মনে করি,   সিনেমা একজন বড় লেখককে অনেক ভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন ধরুন,  অনেকে বলেছেন, ‘সিনেমায় যেমন হয়’  উপন্যাসের এমন একটা নাম আপনি দিলেন কেন ? এরকম নাম তো দেখা যায় না!  আমি বললাম , ‘সিনেমায় যেমন হয়’ ,  ওতে সেরকমভাবেই জীবনকে দেখানো হয়েছে।

অনিন্দ্য : আপনার রচনা নিয়ে মৃণাল সেন, তপন সিংহ , বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সহ অনেক পরিচালক সিনেমা নির্মাণ করেছেন ।— এগুলির মধ্যে কোন সিনেমাটি আপনার বেশি ভাল লেগেছে ?

দিব্যেন্দু : আমার মনে হয় বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ‘গৃহযুদ্ধ’ সবচেয়ে ভালো ছবি হয়েছে ।

অনিন্দ্য : আপনি  এক সময় আধপৃষ্ঠা/ এক পৃষ্ঠার অতিক্ষুদ্র কিছু গল্প লিখেছিলেন। চিৎকার, সিগারেট ,কে ? কোথায় —- গল্পগুলি পড়তে গিয়ে বনফুলের লেখা ক্ষুদ্রকায় গল্পের কথা মনে পড়ে যায়।—  বনফুলকে মাথায় রেখেই কি গল্পগুলি লিখেছিলেন ?

দিব্যেন্দু : ওটাকে একটা ‘মিডিয়াম’ হিসেবে ধরেছি।  সেটা করতে গিয়ে বনফুলকে অনুসরণ করা হয়েছে — অস্বীকার করে লাভ নেই । ওই পরিমাপের মধ্যেও যে লেখা যায় সেটা আমি ওঁর লেখা থেকে শিখেছি।  কিন্তু আমার গল্পগুলো অন্য রকমের ।
অনিন্দ্য : আপনার বেশিরভাগ গল্পে বহির্ঘটনার তুলনায় পক্ষপাতিত্ব পেয়েছে অন্তর্ঘটনা।  এ জন্য অনেকে আপনাকে বিমল করের ঘরানার গল্পকার মনে করেন।— এ নিয়ে কোন মন্তব্য করবেন ?
দিব্যেন্দু :  বিমল কর আমার অন্যতম প্রিয় লেখক।  ওঁর লেখা আমার ভালো লাগে। ব্যক্তিগতভাবে ওঁর সঙ্গে আমার খুব ঘনিষ্ঠতাও ছিল।  তার মানে এই নয় যে আমি বিমল কর দ্বারা প্রভাবিত ।
অনিন্দ্য :  আপনি নিজের মতো করে লিখেছেন।
 দিব্যেন্দু : হ্যাঁ। লেখা নিজের পথেই এগিয়েছে।
অনিন্দ্য : বিশ্বসাহিত্যে কার কার লেখা আপনি বিশেষ পছন্দ করেন ?
 দিব্যেন্দু : আলবেয়ার কামু , দস্তয়েভস্কি ।
কামুর শুধু গল্প – উপন্যাসই নয়,  প্রবন্ধও আমাকে খুব প্রভাবিত করেছে । যেমন ওঁর প্রবন্ধের বই ‘মিথ অফ সিসিফাস ‘।
অনিন্দ্য : ২০০১ এ দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক জে.এম.কোয়েটজি’র উপন্যাস ‘ডিসগ্রেস’ – ‌এর আলোচনা প্রসঙ্গে আপনি লিখেছিলেন,  ‘অবাক হব না যদি সামনের কয়েক বছরের মধ্যে সাহিত্যের সেরা পুরস্কারটিও তিনি অর্জন করে নেন’  ।— কোয়েটজি  ২০০৩- এ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।  প্রসঙ্গত মনে পড়েছে, সেই ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ এই পুরস্কার পেয়েছিলেন । অতীতের কিংবা সমকালের কোনও বাংলা সাহিত্যিকের লেখা পড়ে কি আপনার কখনো মনে হয়নি যে এঁর নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত ছিল ?
 দিব্যেন্দু :  মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাওয়া উচিত ছিল।  নরেন্দ্রনাথ মিত্র ছোটগল্পের জন্য নোবেল পেতে পারতেন।
 অনিন্দ্য : আপনার প্রিয় বাংলা উপন্যাস কোনগুলি ?
 দিব্যেন্দু : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ আর রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ ।

[কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃসুমিতা চক্রবর্তী]

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2021 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ