05 Mar

সত্যজিৎ- এর গল্প – মননে সান্দ্র বেদনার্ত

লিখেছেন:তন্বী মুখোপাধ্যায়


জীবনের সব স্বাদ যদি নাও পাওয়া যায় বিচিত্র কয়েকটির অভিজ্ঞতা হয় তাও জীবন সার্থক। অপরিসীম এই গ্রহটির প্রাণবৈচিত্র্য। যখন গল্প লিখছেন মুগ্ধ বিস্মিত সত্যজিৎ মনে হয় কৌতুকপ্রবণ পৃথিবীর রসলীলার  ভাণ্ডারটি ছেলেমানুষদের সামনে তুলে ধরতে বদ্ধপরিকর । দেখা যায় বা দেখা যায় না এই তর্ক বহুদূর তাঁর গল্পের বেড়াজাল থেকে, শুধু হেঁটেই যাওয়া তার জন্য, যাকে না বোঝা গেলেও যা দেখা দিতে পারে।সে বড় সত্যির লুকিয়ে থাকার যাদুকরি সম্ভাবনাতে আতুর ও মেদুর আমাদেরবস্তুবিশ্ব। হরেক প্রাণি, রকম- রকম গাছ, কত পাখি, এবং হাজার প্রকার ব্যক্তি পরিবৃত জগৎ।বৈচিত্র্যকে আশ্চর্য বলে ধার্য করেন সত্যজিৎ রায়। গল্পে গল্পে জীবন্ত হয়েছে সেই প্রমাণ।

সত্যজিৎ রায়ের গল্পের ভূত, রাক্ষস, গণৎকার, ত্রিকালজ্ঞ, অন্য গ্রহের প্রাণি সকলেই এই ভাল-মন্দের বাস্তবে জড়ানো। আলাদা কোন নান্দনিকতা নেই এ গল্পে। রাজকুমারী অসূর্যম্পশ্যা বলে তার দুধে আলতায় গায়ের রঙ। ব্যারাম সারে এক ধরনের গাছের পাতা খেলে।কিন্তু মড়কের সময় রোগীর কাছে ওষুধের মহিমা কী তা তো রাজা নিজে প্রায় দুরারোগ্য অসুখে ভুগেই উপলব্ধি করতে পারেন।

রূপকথা মানে রহস্য, আবার রহস্যকথা মানে জট খোলা। বস্তুবিশ্ব সব রহস্যেরই আধার; গল্পের মধ্যে সমস্ত কারণ যদি প্রথমে নাও বোঝা যায় তাদের পরিণামের মধ্যে বাস্তবতা বিলক্ষণ বোঝা যায়। হঠাৎই চরম অবিশ্বাস্য গল্পের এক-একটি ঘটনা শুনে অননুভূত সচেতনতা জন্মায়। রূপকথাধর্মিতাও এমন আধুনিক বোধকে অবলম্বন করে থাকে আসলে। শিশু- কিশোরেরাও তার সত্যকে একদিন জানে। কল্পনা বলে ভাবার প্রয়োজন নেই এমনি ভূগোল থেকে সরাসরি গল্পে বনের পরে মাঠ, মাঠের পরে নদী,বা পুরনো কেল্লার ব্যতিক্রমহীন অস্তিত্ব নজরে পড়ে। এই গল্পকে ভাবা যায় না শিশুদের প্রতি স্তোকবাক্যরূপেও, কেননা গল্পের উপাদানে কার্যকারণের প্রকৃতিগত শক্ত বাঁধন রয়েছে। রাজকন্যাও পুঁথিগত বিদ্যাতেই যথার্থ শিক্ষিত হয়ে রয়েছেন এ জাতীয় ভুলে এই গল্প সায় দেয় না।  যে মেয়ে বই পড়লেন অথচ সূরযের উষ্ণতা অনুভব করলেন না, প্রকৃতির রূপ দেখলেন না চক্ষু দিয়ে, পাখির ডাক শুনলেন না কানে,তাঁর শিক্ষাতে বিরাট গলদ রয়ে গিয়েছে। তাঁকে সম্পূরক ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষের স্বাভাবিক জীবনে বিচরণ করতে দিতে হবেই। যে ব্যবস্থা মানুষের জীবনে অপূর্ণতাকে ভবিতব্য করে দেয় তা জাতিকে সতেজে স্বীকৃতি পেতে দেবে না, সত্যজিৎ রায় বিশ্বাস করতেন। অথব কোন কারণে কোন দেশের প্রকৃতির ছোট প্রাণি বিলুপ্ত হচ্ছে দেখতে পাই, সে ব্যবস্থা নেতির পক্ষপাতীই নয়, সেতন্ত্র সব ভারসাম্য নষ্ট করা, অচলায়তন; তাকে যে ভাঙতেই হবে।সহানুভূতিশীল হৃদয়ের পক্ষে রাক্ষস রাজ্যকে পাখিশূন্য করে দেবে তা মেনে নেওয়াটা অসম্ভব সেজানা কথা। কিন্তু নিরঙ্কুশ রাক্ষুসে অধিকার ঘোষিত হয়যখন, অমানুষিক শক্তির জয় হয় তখন কিন্তু অচিরেই  সর্বাতিশায়ী প্রকৃতি বিকলাঙ্গ মূক হয়ে পড়ে।পার্থিব জীবনের অঙ্গহানি থেকে তাকে রক্ষা না করার জন্য অনেক বড় মূল্য দিতে হয়।মানুষেরই মধ্যে রাক্ষস থেকে ইতিমধ্যে ডোডো প্রভৃতি প্রকৃতির কত প্রাণি ও পাখিকুলকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে।সুষম সহজ বাঁচায় প্রতিবন্ধক্তা জন্মায় নির্বিচারে গাছ কাটলে কিংবা বন্যপ্রাণি হত্যা করলে এসত্য আমরা জানলেও অনুধাবন করি না। আমার মত আর একটা রাক্ষস দেখলে বুঝি নিজেদের চিনতে পারি।

অল্পায়ত জায়গাতে সত্যজিৎ রায়ের গল্প শাখাপ্রশাখা ফুল ফলকে চিনিয়ে দেয়। ছোট জায়গাতে কোনক্রমে গল্পকারের কুলিয়ে গেলেই গল্প বলা শুরু হয়।সবরকম বাহুল্য বাদ দিয়ে শুধুই নির্মেদ ঘটনাক’টি এবং প্রতিক্রিয়াতে আমরা মন দিতে পারি। মনে হয় ছবি আঁকতেন তো সত্যজিৎ রায় ফলে তাঁর কাহিনীর ফ্রেম ছিল নিখুঁত, পরিমাপসিদ্ধ ছিলেন, নির্বাচন করে নিতেন সেই চরিত্র, যাদের লক্ষণ বিশেষ ভাঁজগুলি। প্রায়শই একখানি চরিত্রই আসল একখানি গল্প। চরিত্রকে ফিগার বলতে উসখুস করে মন। আমাদের পৃথিবীর বোধের দেশে এঁরা সকলেই অভিনব বটে আবার অভাবের পরিপূরকও। আর্টিস্টের চোখে ঘনিয়ে এসেছে বর্ণান্ধতা, নিরাশ মুহূর্তেও একফালি আশার রশ্মি লেখক উপহার দিয়েছেন। শিল্পী সেই অন্ধকার দিনে পাশে পেয়েছেন তাঁর সমঝদার বন্ধুকে কাহিনীতে তার সমঝদারিত্ব পরম ইতিবাচকতার ইশারা জানায়।

ঘটনা বা স্থান –কালও এক গাল্পিক রসায়নে অদ্ভুতভাবে দানা বাঁধে।দুনিয়ায় উদ্ভূত হতে পারে অসংখ্য পরিস্থিতি, সব অবস্থাকে অনিবার্য করে তোলেন গল্পলেখক ।  সত্যজিৎ রায় সে কাজটি সারেন নিখুঁতভাবে। তবু উল্লেখযোগ্য হ’ল ক্ষণেকের মধ্যে বোঝা  যে সাদাসিধে সত্য-সেও কম রহস্যময় নয়-একজন অতি সাধারণ মানুষেরও কী চমকপ্রদ ক্ষমতা থাকে! সাদামাঠা সমতল বর্তমান কালে অতীত নেমে আসতে পারে।‘বাতিকবাবু’ গল্পে অপরাধ-মনস্তত্ত্ব চমকপ্রদ; ‘ক্লাস্ফ্রেন্ড’ গল্পে বাস্তব প্রমাণ আমাদের চালনা করে অবোধ্যভাবে মোহের মত, সে তত্ত্বও কম চমৎকারী নয়। অনুভব করি; লোডশেডিং গল্পে হয়রানির আয়রনি; ‘ অসমঞ্জবাবুর কুকুর’ গল্পে মানুষের প্রকৃতিতে বা অন্য প্রাণীর প্রকৃতিতে থাকা অবাক করা বিষয়ের অস্তিত্বকে সহজভাবে মেনে নেওয়ার আবেদন প্রভৃতি অবিসমরণীয়। মানুষের কত না বিস্ময় থাকে, তা কি জানেন বিত্তের হিসেবকষা বেত্তারা? গল্পের কাজ প্রভূত সব সম্ভাবনা উদ্ঘাটন করা বলে ভাবতেন সত্যজিৎ রায়। ভবঘুরে জাগলার হারুনদার সঙ্গে কোনদিন পরিচয় হয়ে যাওয়া এক মোটামুটি ধনী পরিবারের ছোট ছেলের জীবনে অভাবনীয় পাওয়া।মনের জগতটাই এই ছোট ছেলেটির আমুল পালটে গেল। তাঁর আঁকা কত শত চরিত্রের মধ্যে আছে ভিন গ্রহের প্রাণী থেকে অশরীরী পর্যন্ত। অত্যন্ত দ্রুত তারা অবিশ্বাস্য ভোল বদলায়। ম্যাজিশিয়ান যেমন জানেন ম্যাজিকে কোন  একটি নির্বুদ্ধিতার ত্রুটিই তাঁকে বিভ্রান্ত করতে সাহস যোগায়, লেখকও জীবনদৃষ্টির ভুল ধরাতে পারেন। কিশোরদের দৃষ্টি সে দিকে আকর্ষণ করে তাদের সচেতন করা কর্তব্য।প্রাপ্তবয়স্কের চোখ খুলে দেওয়ার জন্যেও সত্যজিতের গল্প সমানভাবে উপযোগী।আর রয়েছে বিচিত্র আর্টের শিল্পিদের রেওয়াজসহ প্রতিষ্ঠালাভের আকর্ষণীয় কাহিনী।ছবি আঁকেন কেউ,কেউ ম্যাজিক দেখান, কেউ অভিনয় করতে চান,কেউ বা মেক আপ শিল্প নিয়ে সাধনা করেন। মেক আপ শিল্পী নিজেই বেশবাস বদলে চমৎকার ঘটান। ডাকাতের মেক আপে হুবহু বাস্তব ডাকাতের রূপ নিয়ে আবির্ভূত হলে ব্যাপারটা প্রহসনাত্মক উপসংহার ঘটায়, কিন্ত মনে মনে তাঁর এবম্বিধ লীলার আংশিক সাফল্যে বিমূঢ় বোধ করতে হয়।

মোটামুটি কার্যকারণের মূল অন্বেষণ যে কোন কৌতূহলী মানুষের উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। সুকুমার রায়ের মতো সত্যজিৎ রায়ের লেখায়ও চেনা বিষয়ের অজানা নিয়ম উদ্ঘাটনের পথ দেখা যায়। জট ছাড়ানোয় তাঁর মুন্সিয়ানা শুধু ফেলুদা কাহিনীতেই দেখা যায় নি- শিশু –কিশোরদের বুদ্ধির ব্যায়ামে নামিয়ে এনেছে তাঁর অনেক গল্প। জট বা রহস্য যেন পৃথিবীর বড়ো বৈশিষ্ট্য। অনেক কিছুই তার ভেতরের বৈশিষ্ট্যে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। নিত্য অভ্যাসের জন্য কত আশ্চর্য দৃশ্য আমরা দেখেও দেখিনা, শুনেও খেয়াল করি না- এই জড়ত্বকে ধূলিসাৎ করে চলতে শেখানো আমাদের এই লেখকের কাজ । সদাসর্বদা জিজ্ঞাসা জীবনের অনেক যুদ্ধে শ্রেয়স্কর বিধান দেয়।সে কাজের দায়িত্ব পালন করেন ধারাবাহিকভাবে তাঁর ফেলু মিত্তির, প্রফেসর শঙ্কু, তারিণীখুড়ো প্রভৃতি মুখ্য চরিত্র। হাত –পা জ্ঞান- গম্যি পেটের মধ্যে পুরে কুয়োর ব্যাঙ হয়ে যখন আমরা কাল কাটাচ্ছি তখনই  আমাদের সামনে বাস্তবিক কোনও না-দেখা, না-চিন্তা করা উত্তরণকে বকলমে সুবোধ্য সমাধানকে হাজির করেন সত্যজিৎ রায়। ‘পুরস্কার’ গল্পে আর আরও এরকম আরো কিছু কিছু গল্পে ঘটনা  পরিহাসের মত আবির্ভূত হয়।শ্লেষাক্ত কষায় জীবনরস সত্যজিৎ রায় দক্ষতার সঙ্গে পরিবেশন করে গেলেন এত আয়াসহীন লেখায় যে আমরা তাঁর লেখাকে চেনা বিশেষণ দিতে পারিনি।

সত্যজিতের ভূতের গল্পগুলি তাঁর স্বকীয়তামণ্ডিত। পৃথিবীতে যদি শরীর থাকে,শরীর যিনি ধারণ করেছেন, তাঁকেও আমরা দেখতে পাই, তাহলে যুক্তির খাতিরে আমরা ‘অশরীরী’ অবস্থা থাকতে পারে বলে স্বীকার করতে বাধ্য। যেমন এ জাতীয় কিছুই প্রকৃত নেই হ’তে পারে; তেমনি কিছু আছে তাও সম্ভব।উৎপত্তি হ’লো ভূতের গল্পের।আত্মার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিয়ে নানা মতও বর্তমান। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা সম্পূর্ণ বাতিল করে নেহাতই দূর যৌক্তিক সম্ভাবনাকে গল্পকার সাজিয়ে নিচ্ছেন। প্রাণ নেই দেহ আছে, মানে কঙ্কাল- সেও এক রকম অশরীরী সম্ভাবনা।গল্পের সংলাপে মন দেওয়া যাক।

“… কঙ্কাল আর ভূত যে এক জিনিস সেটাতো জানতাম না,’ বলল ন্যাপলা। ‘তুই আর কী জানিস রে ছোকরা? এক জিনিস না হ’লেও একেক সময় এক হয়ে যায়।অন্তত আমি যে ঘটনার কথা বলতে যাচ্ছি তাতে তাই হয়েছিল।‘(তারিণীখুড়ো ও বেতাল) গল্পটির অন্বিষ্ট ভূতের গল্পের রোমাঞ্চ। ভূত ভালো আর ভূত স্বাধীন, ভূত দুষ্টের দমনও করে। নতুন কিছু তা নয়, ভাবায় তাও,কোনটা থাকলে ভাল হয়।

“দোষটা আমারই; ভূত দেখা দেবে কি অদৃশ্য থাকবে সেটা ভূতের মর্জির উপরই নির্ভর করে।আমি অদৃশ্য থাকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু অন্যমনস্কতার ফলে ভুল করে দেখা দিয়ে ফেলেছিলাম।এই ঘটনার পরে বুঝতে পেরেছিলাম যে, আগুনে পুড়ে শরীর আর মুখের যে অবস্থা হয়েছিল, ভূত হয়েও সেই অবস্থাটাই রয়ে গেছে।‘ (আমি ভূত) পুরোদস্তুর ভূতের গল্প । আবার তীক্ষ্ণ ফল্গু ব্যঙ্গের দংশন এড়ানো সম্ভব নয়।ভূত স্বাধীনতা চায়-কিন্তু তার নিরুপায় দিকভ্রমের জন্যই সে জীবিত মানুষের আততায়ী। একই স্থানে বন্দী,ভয়ানক চেহারা,, নির্বান্ধব কালযাপন, বিভীষিকা ভূতকে সদাসর্বদা অনপনেয় কালিমালিপ্ত রেখেছে। আকস্মিক দুর্ঘটনা কী তীব্র অভিশাপ বিস্তার করে সে কষ্টের কথা লুকিয়ে আছে এই ভূতের আত্মকথাটিতে।

“এটাও কি ভূতের গল্প ? ’ন্যাপলা জিজ্ঞেস করল।উত্তর পেল ‘না ভূত নয়।তবে ভূত বলতে তো শুধু প্রেতাত্মা বোঝায় না,ভূতের আরও মানে আছে। একটা মানে হল অতীত, অর্থাৎ যা ঘটে গেছে।ভবিষ্যতের উল্টো।সেই অর্থে এটা ভূতের গল্প বলতে পারিস।“(জুটি) মোটেই ভূতের গল্প নয়। ট্র্যাজেডিও নয়। মিলনান্ত এ গল্পে কিন্তু পুরোনো হারিয়ে যাওয়া সব কিছুর জন্য সমাদর- সম্মান অনুভব করানো হয়েছে। পুরোনো সংস্কৃতির পুনরানুভব এক পরম প্রাপ্তি।

আবার ভূতের গল্প প্রায়ই অতীতের সমাজব্যবস্থা , মনোভঙ্গি , ধ্যানধারণা প্রকাশের  কোনো বিশেষ উপায় হ’য়ে উঠেছে। ‘নীল আতঙ্ক, ‘কনওয়ে কাস্ লের প্রেতাত্মা’,’লখ্নৌর ডুয়েল’ইত্যাদি গল্প তার প্রমাণ। অতীতে অবিচার হ’য়েছে যাদের ওপর, তারা এই সব গল্পে ঐতিহাসিক আবহ লাভ করেছে। তারা অত্যাচার করেছে কেউ, মুক্তি নেই তার।কেউ বা অত্যাচারিত হয়েছে সেও তার নালিশ থেকে নিবৃত্ত হয় নি।যে পাখাঢুলানীকে পাখা থেমে যাওয়ার জন্য নিষ্ঠুর আঘাত করা হয়েছিল , সে কি মানুষ ছিল না? জ্বলন্ত  প্রশ্ন তার অবিরাম পাখা টেনে যাওয়ায় সোচ্চার প্রতিবাদের থেকে বেশি তীব্রতা পেয়েছে। লেখক সমাজ সমালোচক নিছক নন, ভূতের গল্প বলে এগুলো বেশী মর্মান্তিক, আবার শ্লেষের বাণে বিদ্ধ করাই এদের উদ্দেশ্য।এই প্রশ্ন নিয়ে তার অশরীরী অস্তিত্ব  তার বিরুদ্ধে হওয়া নিষ্ঠুরতাকে সপ্রমাণ করতে  পাখা টেনেই চলেছে, আমাদের স্নায়ু বিচলিত করে তোলে আবহ ও অনুভূতি।এসব গল্প সচেতনতার মাত্রা পরিবর্তন করবার জন্য লেখা হয়েছে।এ সব গল্পে কোন ভৌতিক ঘটনা নেই, আছে মানুষের জীবন সমাজ চাহিদা, সুখ-দুঃখ মানব-প্রকৃতির কথা।

জগতের কক্ষ থেকে কক্ষান্তরে বিস্ময়কর সামগ্রী আছে, সত্যজিতের গল্পের হাত ধরে আমরা এই গ্রহরূপ মিউজিয়মের এক কামরা থেকে যেন আরেক কামরাতে ভ্রমণ করি। আশ্চর্য –এই বিচিত্র পৃথিবী কেন যে কিছু মানুষকে কোনভাবেই আকর্ষণ করতে পারেনি। তাঁরা যদি অন্তত এই গল্পগুলোর মহলে এসে ঘুরতেন, কৌতূহলে বিস্মিত হতেন।পাঠকদের জড়ত্ব থেকে মুক্ত করেন গল্পলেখক সত্যজিৎ রায়।অসীম প্রকারের রঙবদলের রকমফের অবিশ্রান্ত সৃষ্টি চলছে এখানে। প্রতি গল্পেই যেখানে নজর পড়েনি সেখানে নজর দিলে অদ্ভুত কিছু দেখা যেত বলে প্রমাণ করেছেন লেখক। চিন্তার বাইরে থাকা সম্ভাবনাটি রোজকার সোজা সরল বাস্তবের মোড়ক খুলেই লেখক আমাদের সামনে অবাক করা উপহারের মতো খুলে ধরেন।বুদ্ধির ঝিলিকে চমকপ্রদ ঘটনার স্পর্শকাতরতা লক্ষ করতে পারি। আগ্রহ, সন্দেহ দূর করার সচ্চেষ্টা থাকলে কত পর্দা সরিয়ে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছনো যায় অর্থাৎঈপ্সিত দৃশ্যটি দেখা যায়। বিদঘুটে পরিস্থিতির সঙ্গে মোলাকাত করার সাহস ছিল তারিণীখুড়োর। রহস্য উন্মোচিত হয় ফলে শ্রোতারা যেমন অবাক হয় একজনের জীবনের এতরকম অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে জেনে তেমনি  দেশ কালের সঠিক জ্ঞান ধোপে টিঁকে যায়,শ্রোতারা এই কাহিনীতে গল্পের চেয়েও মজাদার বিষয় জানতে পারে। আসলে তারা জানতে পারে সম্ভাব্যতার একরকম গাণিতিক উপস্থাপনাকে।‘নরিস সাহেবের বাঙলো’ গল্পের মধ্যে ইতিহাস আবিষ্কারের তৃপ্তি আছে, কিন্তু সাহেব সেজে অপমানিত বাঙালির আত্মহত্যা পুরো বিষয়টিতে অনপনেয় পাণ্ডুরতা রেখে যায়। অনেক বছর পরে সাহেবের জাত্যাভিমানের ঔদ্ধত্যকে যেমন ঘৃণা হয়, তেমনি মাতৃভাষায় কথা বলে দেশী সাহেবের ভূত তার পূর্বতন অপমানকে যেভাবে ধুয়ে ফেলতে পারে, তাতে স্বস্তিবোধও জন্মায়।

এই  শুধু নয়, সত্যজিৎ রায় বিশ্বের জ্ঞানরাজির ওপর মানবের অধিকার স্থাপিত হোক তাই চাইতেন। জ্ঞানের পিপাসা যে সমাজে নেই সেখানে প্রোফেসর শঙ্কুর মতো বিরাট বিজ্ঞানীর জন্ম হবে না। শঙ্কুর কল্পবিজ্ঞানের গল্প খুদে বৈজ্ঞানিকের মনকে মহাবিশ্বের নাগরিক করার চেষ্টা করে আগে। নাহোক অনেক জানার নেশায় বিভোর নাহয়েও বিশ্বের জ্ঞানরাজ্যের ওপর সুস্থ সবল অধিকার কায়েম  করা থেকে বিরত হলে ব্যবহারিক জীবনেও সংকট কাটানো কঠিন। তাঁর লেখা গল্প ‘অভিরাম’ একখানি ভূতের গল্প। নিজে ভূত হয়ে অভিরামের বাবু ভূতের ভয় কাটালেন। অজানাকেই বড়ো অন্তরায় বলে চিনি এবং পদে পদে ঠেকে শিখি।অভিরামের গলায় ছিল সরল জীবনবোধের জিজ্ঞাসুদের সাধারণ প্রশ্ন-‘ভাল ভূত হলে ক্ষেতি কী?’ অভিরামের মনে হয়েছিল-“তবে হ্যাঁ ভূত মানেই যে খারাপলোক হবে এটা আমি মানি না।“ গল্পের প্রকৃত শ্রোতাকেও সব সম্ভাবনাকেই আমল দিতে হয়, না হলে বন্দীদশা।যেযে পথে মন মালিন্য মুক্ত হয় সে সে পথকেই সত্যজিতের গমনপথ মনে হয়েছে। গল্প পরিবেশন করেছেন মজার আর কাজের মধ্যে কাউকেই খাটো নাকরে।

জ্ঞানের  বিরাট উৎস  নিজের অভিজ্ঞতা। রোজকার জীবন অভিযাত্রীর ও সাধারণ মানুষের এক নয়। গুণগত পার্থক্য বেশ অনুভূত হয়। নানা পেশার নানা শখের সুবাদে ব্যক্তি হন অভিযাত্রী। সম্ভবত নিজের অক্ষের ওপর ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর নক্ষত্র পরিক্রমার সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের অভিযাত্রাকে মেলানো যায়। “বৃহচ্চঞ্চু” বা ‘টেরোডাকটিল’, কিংবা অন্য গ্রহের জীবের মতো কিছু যে থাকতে পারে বলে তিনি বিশেষ কারণে ভাবছেন ,সেই সব কারণগুলো সজীব হলেই গল্পের চেহারা নেবে, শুধু ছোটদের নয় বড়োদেরও অবাক করে দেওয়ার মতো গল্প শোনানো যাবে তা তিনি স্থিরনিশ্চয় করেছিলেন। বন্ধুত্ব নিয়েই তিনি কয়েকটি চমকপ্রদ গল্প লিখলেন। উদ্গ্রীব হ’য়ে গল্পের পরিণাম চিন্তা করতে হয়। নাটকীয়ভাবে শেষ হয় গল্পগুলি, অচিন্ত্যনীয় মোচড় থাকে প্রায়শই।মানবিক সম্পর্ককে বুঝতেন বলেই অনিশ্চয়তার  আপাত ভার নেমে নিশ্চয়তার মিল প্রকাশ পেয়েছে বারংবার।নিঃসংশয় মানবতাবোধের ফলেই শিল্পীর মৃত্যূত্তীর্ণ স্বাধীনতার ভাষা তিনি রচনা করেছিলেন-শিল্পই মৃত্যুর অতীত এই কল্পনা আমাদের প্রবলভাবে মোহগ্রস্ত করে-আমরা শুন্তে পাই  গগন চৌধুরীর স্টুডিও গল্পে “…মৃত্যু না হলে তো তাঁরা আর তাঁদের গণ্ডির বাইরে বেরোতে পারেন না।একমাত্র মৃত ব্যক্তিই তো সম্পূর্ণ মুক্ত, সম্পূর্ণ স্বাধীন।তাঁদের সময়েরও অভাব নেই। ছবি যতক্ষণ না নিখুঁত হচ্ছে ততক্ষণে ঠায় বসে থাকবেন ওই চেয়ারে।“ আশ্চর্য এই ইমাজিনেশন এবং ইন্টেলেক্টকে অনুভব করা শিশু কিশোরের পক্ষে সম্ভব নয় তা তিনি জানতেন,অতএব আজ সত্যজিতের শতবর্ষে আমাদের নির্দ্বিধায় বলা দরকার সত্যজিৎ রায়ের গল্প ব্যাপ্তি ও গভীরতায় রীতিমতো পরিশীলিত প্রাপ্তমনস্কের গল্প। এক ভিন্ন অভিবেদনার শক্তি থাকতে হয় সত্যজিতের গল্পের পাঠকের, যে গল্পচয়ে সমগ্র বিশ্বের আধুনিক মনের উৎপ্রাস কীর্ণ হয়ে আছে।

তন্বী মুখোপাধ্যায়,অধ্যাপক প্রাবন্ধিক ও গল্পকার

[বানানবিধি ও মতামত লেখকের নিজস্ব]

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2022 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ