05 Mar

সেইসব বই… সেইসব দিন… আর সেই সোভিয়েত…

লিখেছেন:চিন্ময় ভট্টাচার্য


আজ পিছন ফিরে সেসব দিনের কথা মনে করলে, মনে হয় সে যেন এ জন্মের কথা নয়, সে যেন এ পৃথিবীর বাস্তব নয়। অন্য এক জগ, অন্য এক জন্মের কাহিনি। অথচ বেশি দিন আগের কথা তো নয়। গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষ, নব্বইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত সে সব স্বর্ণখনি আসত আমাদের হাতে। বলা বাহুল্য অতি সুলভ মূল্যে। সে মূল্য এতটাই কম যে মাঝে মাঝে মনে হত এই দামটা নিচ্ছেই বা কেন? এত অল্প পয়সা নিয়ে ওদের হবেটাই বা কি। বলছিলাম সোভিয়েত ইউনিয়নের বইয়ের কথা। তখন ঠান্ডা যুদ্ধের দিন। গোটা পৃথিবী ভাগ হয়ে আছে আমেরিকা বনাম রাশিয়ায়। আমরা এ বাংলার বাসিন্দা জন্মগতভাবেই বাম ঘেঁষা, কাজেই আমাদের সমর্থন বরাবরই পেয়ে এসেছে রাশিয়া থুড়ি সোভিয়েত ইউনিয়ন। রাজনৈতিক কারণ যদি হয় বাম ঘেঁষা স্বভাব, তবে বাস্তবগত বা সামাজিক কারণও বলা যেতে পারে, তা হল সোভিয়েতের সেইসব বই।

সেসব বই হাতে ধরলেই মন ভরে যেত, ফিনফিনে কাগজ আর রং বাহারি ছবির দৌলতে। তখন নিউজ প্রিন্টের যুগ। সকালবেলা আনন্দবাজার বা যুগান্তর, যে খবরের কাগজ হাতে আসে তা ধূসর, মলিন, কাগজ হাতে নিয়েই পড়ার যাবতীয় ইচ্ছে চলে যায়। মাঝে মাঝে চকচকে এক একটা পাতা হাতে চলে আসত, সেদিন খবরের কাগজ পড়ার উৎসাহও যেত বেড়ে। পড়ার বা গল্পের বইয়ের অবস্থাও তথৈবচ। হাতে কম্পোজ করা ভাঙা ভাঙা টাইপ, অর্ধেক সময় ‘ভ’ নাকি ‘ঙ’ তাই বুঝতে দীর্ঘ গবেষণা করতে হত। পুরো বাক্য উদ্ধার করা ব্যাঙের পৌস্টিকতন্ত্র বার করার থেকেও শক্ত ছিল। প্রতিদিনই একাধিক মূদ্রন সংশোধনী। সেইসব দিনগুলোতে সাত সাগর পেরিয়ে আসা সোভিয়েত বই আমাদের, অন্য জগতে নিয়ে যেত। হাতে নিলে মনে হত অল্প কয়েক পাতার বই, উজ্জ্বল, মসৃণ, গ্লসি পেপারে ছাপা সোভিয়েত দেশ, সোভিয়েত ইউনিয়ন, সোভিয়েত নারী পত্রিকার পৃষ্ঠা সংখ্যা, আমাদের ভারতীয় প্রকাশনায় অভ্যস্ত হাত চট করে বুঝতে পারত না। প্রতি পাতায় ধবধবে ফর্সা, হাসিখুশি সোভিয়েত যুবক যুবতীর ছবি, রাশিয়ার অজানা দ্বার, যেন বা এক রূপকথার দেশের রহস্য চিচিং ফাঁক মন্ত্রে ধরা দিত বইয়ের দু মলাটের মাঝে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন, সোভিয়েত নারী পত্রিকা দুটি ছিল আকারে কিছুটা বড়। পড়বার পর তার আরও এক দুরন্ত উপযোগিতা ছিল। আমাদের স্কুলের যাবতীয় বই, খাতা মলাট দেওযা হত ঐ গ্লসি পেপার দিয়ে। সহজে ছিঁড়ত না। সারা বছর সেইসব পাঠ্যবইয়ে সোভিয়েতের উপস্থিতি পাঠ্যবইয়েরও মর্যাদা অনেকটা বাড়িয়ে দিত। নীরস পাঠ্যবইও সরেস হয়ে উঠত। আর ছিল গল্পের বই। গল্পের বইও যে ওরকম হতে পারে, নিজের হাতে নিয়ে না পড়লে বোধহয় এখনও বিশ্বাস হতো না। একটা গোটা পাতায় লেখা অল্প, ছবি অনেক বেশি। কি সব ছবি, সেসব ছবিই আমাদের সেই সময়, নিয়ে যেত অজানা, না বলা রূপকথার দিকে। বই, বইয়ের অঙ্গসজ্জা, বিষয়ের মতোই ছিল বইয়ের নাম। রুই মাছের ড্রাগন গেট অতিক্রম, জল কেন ভেজা, হাতির ওজন কত, দাদুর চশমা, দাদুর দস্তানা সঙ্গী ছিল একেবারে ছোট বয়সে।

একটু বড় হলে হাতে এল ম্যাক্সিম গোর্কি, নিকোলাই অস্ত্রভস্কি, আন্তন সেমিওনিচ মার্কারেঙ্কোরা। তখন সেসব বই পড়ে মনে হত- আছে সে এক রূপকথারই দেশ। সোভিয়েতে যাঁরা থাকে, নিদেনপক্ষে সে দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও যাঁদের হয়েছে, তাদের সৌভাগ্যে হিংসেয় জ্বলে উঠত মন। শৈশব, কৈশোরত্ব পার হয়ে রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে হাতে খড়ি হওয়ার সময় হাতে এল মার্কস-এঙ্গেলস রচনাবলী, লেনিন কালেকটেড ওয়ার্কস। তারই সঙ্গে গোগল, দস্তায়ভস্কি, তুর্গেনভরা। ওরকম ছাপা বই অত সস্তায়! বাজি রেখে বলতে পারি, সারা জীবন পড়বেন না নিশ্চিত জেনেও অথবা বামপন্থী না হয়েও অনেক বাঙালি, সেসময় সংগ্রহ করে রেখেছিলেন, ডস ক্যাপিটাল, কি করিতে হইবে, কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার। শুধুই সেসব বইয়ের ছাপা এবং কাগজের মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হয়ে। তখন আমাদের নাগালে আমেরিকা অথবা ইউরোপের অন্য দেশে ছাপা বই খুব একটা আসত না। এর ওর মুখে গল্প শুনতাম, সেসব বই ছাপা ভালো, তবে দাম শুনলে ছ্যাঁকা খেতে হবে। মার্কিন নয়, ছোটবেলা থেকে সোভিয়েত প্রীতির সেও ছিল এক মস্ত কারণ।

ভেবেছিলাম, সারা জীবন বোধহয় এরকম স্বপ্নের ঘোরেই থাকবে। অতি সস্তায় পড়া হয়ে যাবে বিশ্ব সাহিত্য। তখন বিশ্ব সাহিত্য বলতে শুধুমাত্র সোভিয়েত কেন্দ্রিক বইই বুঝতাম। তবে সে স্বপ্নের ঘোর কেটে যেতে লাগল নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকেই। সোভিয়েতের পট পরিবর্তনের প্রভাব পড়ল বইয়ের জগতেও। অতি সস্তায় শুধুমাত্র জাহাজ মাশুল নিয়ে রাশি রাশি বই পাঠানাও বন্ধ হয়ে গেল। পরে জানলাম বন্ধ হয়ে গেল সেসব বই ছাপানোও। তারফলে যাঁরা যত্ন করে বই পড়তেন, বই পাওয়ার পর শুরুতেই মলাট দিয়ে দিতেন, শুধুমাত্র তাদের কাছেই রয়ে গেল সেসব মহামূল্যবান মণিমাণিক্য। আজ তাঁদের হাতের কাজে হিংসে হয়। আর যদি, আজকে এই ২০২২ সালে পুটিনের রাজত্বকালে, যদি হাতে পড়ে সোভিয়েত জমানার একখানা বইও, মুহূর্তে ফিরে যাই সে রূপকথার দেশে, গোটা ছোটবেলাটাই এসে হাজির হয় বইয়ের পাতায়। সোভিয়েতের পতন হয়েছে, কিন্তু সেসব স্মৃতি…কভি আলবিদা না কহনা..।

[বানানবিধি/মতামত লেখকের নিজস্ব]

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2022 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ