15 Apr

পরশুরাম ও অন্য গল্প

লিখেছেন:সিদ্ধার্থ সান্যাল


পরশুরাম

সন্ধে থেকে ক্রমাগত গুঁড়ো গুঁড়ো বরফের বৃষ্টিতে চারিদিক সাদা হয়ে এসেছে ।

এখন বোধহয় রাত দশটা হবে।

ডিসেম্বরের শীতের রাত, ঘোলাটে আলোয় আলোকিত রাস্তা নিঝুম ।

কিছুক্ষণ আগেই পলাশ ঘটনাটা ঘটিয়ে ফেলেছে।

এমন নয় যে হঠাৎ উত্তেজনার বশে এমন কাজটা ও করে ফেললো ।

বরং উলটোটাই সত্যি।

মাসের পর মাস পরম প্রিয়জনের রোগশয্যার পাশে বিনিদ্র থেকেছে সে ।

নিরুপায় দর্শকের ভূমিকায় অবর্ণনীয় মানসিক কষ্টভোগের পর গতকয়েকদিনধরেদিনরাতএককরেওঅনেকভেবেছে ।

ভাবতে ভাবতে মনের মধ্যে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করেছে পলাশ ।

আপাত অসম্ভব কাজেরপরিণতির ভাবনায় কখনও কখনও তার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে । অসহায়ের মতো চিৎকার করে কেঁদে উঠতে চেয়েছে সে ।

অকল্পনীয় সেই চিন্তাটা জোর করে মাথা থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছে ।

কিন্তু পারেনি, মায়ের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসার অভিঘাতে বিপন্ন মানুষের মতো অস্থির হয়ে উঠেছে পলাশ ।

জোয়ারের স্রোতের মতো প্রশ্নের পর প্রশ্ন আছড়ে পড়েছে তার মনে ।

সুখের ধারায় সমৃদ্ধ হয়ে এতোগুলো বছর কাটিয়ে এসে একজন প্রাণচঞ্চল মানুষ কি এমন বোধহীন জড় হয়ে কাটাবে জীবনের বাকি বছরগুলো ?

কিন্তু সে কতোগুলো বছর ? কবে এই কষ্টের শেষ ?

চিকিৎসাশাস্ত্র তো পলাশকেসেই কবে-র কোন জবাব দিতে পারেনি…তাহলে ?

বোধহীন মানুষের তো কোন কষ্টের অনুভব নেই….কষ্ট তো সেই মানুষের, যে একান্ত নিরুপায়, শুধুমাত্র দর্শক,অজ্ঞাতভবিষ্যৎ জুড়ে থাকা এই নির্মম দৃশ্যের…তাহলে ?

#

গভীর রাত্রির আশ্রয়ে পলাশের সেই ভাবনার এখন কেমন যেন শান্ত চেহারা।

রাত্রির অন্ধকার আর তার নৈঃশব্দ্যেরও যেন উত্তেজক সুরার মতো এক মাদকতা আছে ।

সব অসম্ভবকেকেমনকরে যেন সম্ভব করে তোলায় তার নিষ্ঠুর উল্লাস।

পলাশের শরীর এখন ভরে আছে দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রাপথের শেষে গন্তব্যে পৌঁছনোরমতো একটা ভাব, একটা অজানা হৃষ্টি ।

কিছুক্ষণ আগে,দীর্ঘদিন ধরে কোমায় আচ্ছন্ন মায়েরনাক থেকে অক্সিজেনের নলটা খুলে দিয়েছিল সে । তারপর শান্তপায়েসে পাশের লিভিং রুমে গিয়ে দুটো ফোন করেছে ।

প্রথমে মা-র ডাক্তারকে, আর পরে পূর্ব লন্ডনের কমিউনিটি ফিউনেরাল সার্ভিসে ।

বেড রুমে ফিরে এসে পরম যত্নে মায়ের নাকে নলটা আবার পরিয়ে দিয়ে কিছু সময় জন্মদাত্রীর নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে রইলো পলাশ, একদৃষ্টে ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পোর্টিকোতে দুটো গাড়ি এসে থামবে ।

পলাশ মায়ের পায়ের পাতা ছুঁয়ে বসে থাকলো কার্পেটের ওপরে…অপেক্ষায় ।

ঘড়ি দেখল সে, রাত এগারটা ।

ঘরের মধ্যে ভয়াবহ নৈঃশব্দ্য ভেঙে কেবল তারহাতঘড়ির টিকটিক শব্দ ।

 

 কুলীন কথা

– ‘হ্যালো…কি করছো ?মিটিং-এব্যস্ত আছো নাকি ?’

– ‘নাঃ…সব  অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যানসেল করে দিয়েছি। একটা খারাপ খবর পেয়ে মনটা  খুব ভারি হয়ে আছে।’

– ‘সেকি ! কি হলো আবার ?’

-‘ কলকাতা থেকে খবর পেলাম আমার প্রথম প্রেমিকা মারা গেছে আজ সকালে। তাইই…’

-( একটু  নীরবতারপর ) ‘ওহ…কি হয়েছিল ? করোনা ?’

– না না।হার্ট এট্যাক…ওই আমার বিয়ের পর থেকেই ওর হার্টটা একটু দুর্বল…’

– ঠিক আছে, ঠিক আছে।অত গিলটি ফিলিং করতে হবে না । আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসো।একজন তো এখনো আছে।’

-‘ নাহ…দুজন। ‘

-‘ মানে ?’

-‘একজন হায়দরাবাদে।অন্যজন এখন নিউজার্সিতে।’

– ( আবার নীরবতার পর ) ‘ওঃ ! আমাকে ধরে তাহলে চারজন !’

-‘ যাহ…কি যে বলো !তুমিতো আমার স্ত্রী।’

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • দেবু on April 20, 2022

    দুটো অণুগল্পই ভালো লেগেছে ।

    মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2022 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ