20 Jun

আউল গোঁসাই এর সমাধি

লিখেছেন:সৌমিত্রশঙ্কর সেনগুপ্ত


সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছি। দ্বারিকবাবুর সঙ্গে কথা হয়েছে সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে বিজুরি গ্রামের সামনে রাস্তায় দাঁড়াবেন। সাঁইথিয়া হয়ে পৌঁছতে এক ঘন্টার সামান্য বেশি সময় লাগে। কিন্তু আমি ঠিক করেছি পাকা সড়ক না ধরে সাংড়া আর হাতোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের গ্রামগুলোর মধ্য দিয়ে গিয়ে সিউড়ি সাঁইথিয়া সড়কে উঠব। সপ্তাহখানেক আগে ঈশ্বরপুর-হাতোড়া রাস্তা মোরাম বোল্ডার দিয়ে তৈরী করা হয়েছে। কাজ কেমন হল সেটাও দেখা হয়ে যাবে। রথ দেখার সঙ্গে কলা বেচা আর কি!

গন্তব্য ময়ূরাক্ষীর দক্ষিণ তীরের কুনুরি, বিজুরী, পারিসর, ডিহিকোপা এইসব গ্রাম। কিছুকাল আগে সত্যনারায়ণ দাসের লেখা বীরভূমের গ্রামনাম বইটা হাতে এসেছে। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক তিনি। অত দূরে শিক্ষকতা করতে করতেও নিজের জেলার গ্রামনামের চর্চা থেকে সরে আসেননি। দেখলাম তিনি লিখেছেন কুনুরি গ্রামনামটির অন্তপদ উড়ি/উরি প্রত্নদ্রাবিড় ভাষার চিহ্ন বহন করছে। ডিহিকোপা গ্রামের ডিহি শব্দটির উৎস অস্ট্রিক, কিন্তু কোপা আবার দ্রাবিড় ভাষা থেকে এসেছে। কোপা মানে বৃক্ষ হতে পারে আবার বন কিংবা কাঠও হতে পারে। মানুষ তো এককালে নদী আর বনের পাশেই ঘর বাঁধত, গ্রাম বসাত। বনের গাছ প্রাণী পতঙ্গ তাদের অনেক প্রয়োজন মেটাত। মানুষ জঙ্গল সাফ করে, ডাঙাডহর কেটে চাষের জমি তৈরি করত। বাস করার জন্য বেছে নিত একটু উঁচু জায়গা। দেখলাম, বইটিতে পারিসর গ্রামের কথাও এসেছে। দ্রাবিড় ভাষায় পার কথাটির অর্থ নুড়িপাথর, আর সর মানে বসতি। এখানে কি কোনওদিন নুড়িপাথরের উচ্চভূমি ছিল? খুঁজতে খুঁজতে সে তথ্যও মিলল শেরউইলের রেভিনিউ সার্ভে রিপোর্টে। খটঙ্গা পরগণার পূর্বদিকের ভাগে ময়ূরাক্ষী বরাবর সাঁইথিয়া পর্যন্ত নাকি নুড়িপাথরের উঁচু স্তর আছে। সেখান থেকে ঢাল নেমে গেছে ময়ূরাক্ষীর খাতের দিকে। কয়েক হাজার বছর আগে দ্রাবিড় ভাষাভাষী মানুষেরা মোর নদীর তীরে নুড়িপাথরের উঁচু ডাঙায় গ্রাম পত্তন করেছিল। তার সাক্ষ্য রয়ে গেছে পারিসর গ্রামনামে। কী আশ্চর্য সমাপতন!

কোন এক অবসরে সদ্যপড়া বইতে পাওয়া গ্রামনামের কথা বলছিলাম। বিজুরি গ্রামের দ্বারিক বাবু সেখানে ছিলেন। বললেন, একদিন সকাল সকাল চলে আসুন আমাদের গ্রামে। দেখার মতো অনেক কিছু আছে। দ্বারিক চক্রবর্তী মাঠপলসা গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান। সিপিআই দলের প্রার্থী হিসেবে জিতেছেন। অল্প বয়স, উৎসাহী মানুষ, বেশ চালাক চতুরও।

তাঁর আমন্ত্রণেই যাওয়া। নতুন মোরাম রাস্তা দিয়ে কয়েক কিলোমিটার যাওয়ার পর ক্যানেল পারের ইনস্পেকশন রোডে উঠলাম। মাত্র এক বছর আগে এই অঞ্চলে এসেছি, তাই চিনতে চিনতে যাওয়া।  উল্টোদিকে সম্পন্ন বড় গ্রাম দেরপুর, অমরপুর। তারপর ক্যানেল পেরিয়ে মহিষাডহরী গ্রাম পার হয়ে অন্ডাল যাওয়ার রেললাইন টপকে সিউড়ি-সাঁইথিয়া সড়ক।  কথামতো গ্রামের সামনে রাস্তার পাশেই পেয়ে গেলাম দ্বারিকবাবুকে। গ্রামগুলো পাশাপাশি  সড়কের দু’পাশে। বললেন, চলুন কুনুরি দিয়েই শুরু করা যাক।

সাঁইথিয়া-সিউড়ি সড়কের বাঁ হাতে কুনুরি গ্রাম। সেখানেই আউল গোঁসাই এর পীঠ। আড়ম্বরহীন বললেও কম বলা হয়; রিক্ত! পোড়ামাটির চতুষ্কোণ বেদী। একদম নিচের ধাপের বেদীটি বড়। তার উপরের ধাপদুটি ক্রমাগত ছোট হয়েছে মাপে।

আউল গোঁসাই এর সমাধি

জানা গেল ঈশ্বরপুরীর শিষ্য কাশীশ্বর গোস্বামী বৃন্দাবন থেকে এসে কুনুরি গ্রামে বসবাস শুরু করেন ষোড়শ শতকের কোন এক সময়। তার দুই পুত্র। কনিষ্ঠ বাউল গোঁসাই ধর্মপ্রচারের জন্য চলে যান সিউড়ি থানার নরুই গ্রামে। বড় ছেলে থেকে যান কুনুরিতে। তিনি আউল গোঁসাই নামে খ্যাত। আউল গোঁসাই নাকি জীবন্ত সমাধি নিয়েছিলেন।

আউল গোঁসাই নামটি বড় সহজ। কিন্তু প্রশ্ন জাগে এমন নাম কেন! স্থানীয় মানুষেরা জানেন না। অনেক প্রজন্ম ধরে তাঁরা এই সমাধি দেখে আসছেন। আউল বাউল কর্তাভজা – এ সবই সাধক সম্প্রদায়। আর গোঁসাই  শুনলে মনে আসে চৈতন্য ধর্মভাবনার কথা। কবে কোনকালে দুটি ধারা এসে বীরভূমের কুনুরি গ্রামে এক সাধকের সমাধিতে মিলে গিয়েছে। কীর্তনের ভাঙা সুর যেমন মিশে যায় বাউল গানে।

মনে পড়ল কবিওয়ালা লম্বোদর চক্রবর্তীর পরিবার এই কুনুরি গ্রামেই বাস করত। সে কথা বলতে দ্বারিকবাবু বললেন তাঁদের বাড়ি এখনও এখানে আছে, আত্মীয়রাও আছেন। লম্বোদরের বাস্তুভিটেতে আলাপ হল তাঁরই এক উত্তরপুরুষ দানীশ চক্রবর্তীর সঙ্গে। তিনি কিছু কিছু মনে রেখেছেন পূর্বজদের কথা। উনিশ শতকের মাঝামাঝি কুনুরি গ্রামে টোলের পণ্ডিত ছিলেন সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী। সতীশচন্দ্রের কাকা উপেন্দ্রলালের পুত্র লম্বোদর। উপেন্দ্রলাল কুনুরি গ্রামের পাট উঠিয়ে রামপুরহাটের কাছে খরুন গ্রামে চলে যান। লম্বোদর চক্রবর্তী (১৩১১-১৩৭৬) ছিলেন প্রবাদপ্রতিম কবিয়াল। কুড়ি বছর বয়স থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লম্বোদর সারা বাংলায় হাজার হাজার কবিগানের আসর মাতিয়েছেন। তাঁর যোগ্য পাল্লাদার ছিলেন কবিগানের কিংবদন্তি গুমানি দেওয়ান।

সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর প্রসঙ্গে জানা হল আরো অনেক কথা। পাশের ডিহিকোপা গ্রামে টোল চালাতেন প্রমথ মিশ্র। অনাদি চতুষ্পাঠী। ডিহিকোপার সেই টোল খ্যাতির শীর্ষে ওঠে হরিচরণ ভট্টাচার্যের সময়। ডিহিকোপার পণ্ডিতমশাই নামে সবাই তাঁকে এক ডাকে চিনত। আদিতে তাঁর বাড়ি ছিল আমোদপুরের কাছে কুসুমযাত্রা গ্রামে। নিজেকে বলতেন অনাদি চতুষ্পাঠীর স্বেচ্ছা-শিক্ষাদাস। ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাঁর আয়োজনে গ্রামের শিক্ষাসত্রে আহার বাসস্থান অধ্যয়নের সুযোগ পেয়ে শত শত বিদ্যার্থী ব্যাকরণ কাব্য স্মৃতিশাস্ত্রে কৃতবিদ্য হয়েছেন।

নবরত্ন ঢিবি

পাকা সড়ক পেরিয়ে উল্টোদিকে বিজুরি ও পারিসর গ্রাম। দ্বারিকবাবু আলাপ করিয়ে দিলেন  অতুলশিব সাহার সঙ্গে। অতুলবাবু শিক্ষক। তার বাবা এক কালে কাটোয়ার জমিদারদের সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন। গ্রামের খবরাখবর অতুলবাবুর নখদর্পণে,  পুরনো কথাও। তাঁর কাছে শুনলাম চন্দ্রচূড় শিব মন্দির, রঘুনাথ গোঁসাইয়ের সমাধি আর নবরত্ন ঢিবির কথা। কোনও এক কালে এক মৈথিলী ব্রাহ্মণ পরিবার এই অঞ্চলের অনেকগুলি মৌজার জমিদারি স্বত্ব পেয়েছিলেন। তখন নাকি ময়ূরাক্ষী নাব্য ছিল। বড় নৌকা পসরা সাজিয়ে চলে যেত কাটোয়া পর্যন্ত। চন্দ্রচূড় শিবমন্দির ওই মৈথিলী ব্রাহ্মণ পরিবারের। বড় রাজাদের মত তাঁরা পণ্ডিতের সভা বসাতেন। সেই সভার জন্য তৈরি চাতাল ময়ূরাক্ষীর বানে ভেঙে গেছে। থেকে গেছে নবরত্নের ঢিবি এই নামটি।

চন্দ্রচূড় মন্দির

দ্বারিকবাবুর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে নদীর পথে নামলাম। শিবমন্দির দেখা হল। গোঁসাইবাগানের রঘুনাথ গোস্বামীর সমাধিও। এই নামে তো খ্যাতিমান একজন ছিলেন; ষড়গোস্বামীর অন্যতম। কিন্তু তাঁর সমাধি তো এখানে থাকার কথা নয়। হয়তো একই নামে অন্য কেউ! কিংবা শিষ্যপ্রশিষ্য প্রজন্মবাহিত হয়ে তাঁর স্মৃতিপূত কোন কিছু এতদূর এসে পৌঁছে ছিল। সেই বস্তুটির আশ্রয় হয়েছে এখানের মাটিতে, তৈরি হয়েছে সমাধি, এমনও তো হতে পারে?

গ্রাম থেকে অনেকটা নিচের ঢালে ময়ূরাক্ষী। আসন্ন শীতের হালকা হাওয়া। রোদ উঠেছে। যেন অন্য কোনও জগতের আলো এসে পড়েছে এখানে। কয়েক মাইল পশ্চিমে দুই ভাগ হয়ে যাওয়া ময়ূরাক্ষীর দুটি ধারা এইখানে এসে আবার মিলে গেছে। মাঝখানে চর রেখে নদী দুভাগ হয়, আবার মিলে যায়। রাঢ় অঞ্চলে এই দুভাগ হওয়ার নদীর ছোট ধারাটিকে বলে কাণা। আমরা এসে দাঁড়িয়েছি কাণা ময়ূরাক্ষীর তীরে। একটু দূরে বিশাল চর বহু শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সেই চরে আছে ছটি গ্রাম। আমাদের ঠিক মুখোমুখি গোবিন্দপুর আর কুলতোর। প্রথম শীতের রোদে ঝলমল করছে।

নদীর পাড় থেকে আবার উঠে আসি গ্রামের দিকে। টুকরো টুকরো জনপদ ঘিরে কত জনশ্রুতি। পাশের গ্রাম হরিশকোপার নীলকুঠি ঘিরে কত গল্প। প্রতিবেশী গ্রামগুলিতে মুসলমান জনবাহুল্য। মাঝখানের জনবসতিগুলিতে লক্ষ্মীজনার্দন, শিব, মনসা, সর্বমঙ্গলা। রঘুনাথ গোস্বামীর সমাধি, আউলগোঁসাই, বাউলগোঁসাইয়ের পীঠ। কুনুরি গ্রামের কালাচাঁদ মন্দিরে কোজাগরী পূর্ণিমাতে রাস উৎসব, আষাঢ় মাসে রথযাত্রা। সহাবস্থানের এই ঐতিহ্যও তো প্রথম শীতের রোদের মতোই ঝলমলে।

চিত্রগ্রাহক- পল্লব চক্রবর্তী

[মতামত ও বানানবিধি লেখকের নিজস্ব ]

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2022 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ