23 Jun

আলেকজান্দার আর একটি কাক

লিখেছেন:বিজয়দান দেথা


সামান্য মানুষের মতো জ্বরে কাবু হয়ে পড়লে সম্রাট আলেকজান্দারের মহত্ব রইল কোথায়?  প্রশ্নটা নিয়ে বেশি চিন্তাভাবনার সাহস না  হওয়ায় শুয়ে শুয়েই তিনি অষ্টধাতুর ঘন্টা বাজান । মুহূর্তের মধ্যে এক গ্রিক সৈন্য এসে হাজির। বর্ম আর শিরস্ত্রাণে  আচ্ছাদিত সৈন্যেটির ডান হাতে তরোয়াল, বাঁ হাতে বল্লম। তিনবার কুর্নিশ করে সে আদেশের অপেক্ষায় থাকে। রুগ্ন আলেকজান্দার চোখ খুলে কিছু বলতে চাইলেও কাশির দমকে দমকে ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না। সৈনিকটি যন্ত্রের মতো এগিয়ে আসে। সম্ভ্রমের সঙ্গে রুপোর পিকদানি হাতে নিয়ে পালঙ্কের কাছে এসে দাঁড়ায়। তিন-চারবার কেশে পিকদানিতে মুখের কফ ফেলে  রুগ্ন সম্রাট ফের শুয়ে পড়েন। তাঁর মতো সম্রাটের মুখ থেকেও সামান্য মানুষের মত নোংরা  কফ বেরোয়! সৈনিকটি তাঁর ঠোঁটে লেগে থাকা কফটুকু মুছে দেয়, রুপোর ঝারির জল দিয়ে কুলকুচো করায়। ক্লান্ত চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আলেকজান্দার আদেশ দেন, ‘তিনদিন’ হয়ে গেল, গ্রিক ওষুধ কোনো কাজে  দেয়নি।  চিকিৎসকদের মাথা কাটার আগে পাঞ্জাবে সর্বত্র খোঁজ নিয়ে কোনো অভিজ্ঞ চিকিৎসককে ডেকে আনো। জ্বর কমছে না,  মাথা ব্যথাটা  আরও বেড়েছে। পাচন গিলে- গিলে ঘুমের একেবারে দফারফা ! দ্রুত ব্যবস্থা করো।  সন্ধ্যের আগে এদেশের চিকিৎসক না এলে সব ক’টাকে মেরে ফেলব। আমি জ্বরে কাবু হয়ে শুয়ে রয়েছি আর তোমরা কিনা সুস্থদেহে ইচ্ছে মতো ঘুরছ।  নির্লজ্জ বেহায়ার দল! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি দেখছ, যাও ।

প্রায় আধঘন্টা পর সৈনিকটি ফিরে এলে আলেকজান্দার চোখ খুলে জিজ্ঞেস করেন, ‘সবাইকে জানিয়ে দিয়েছ?’

‘ তার প্রয়োজন হয়নি, প্রভু!’  সৈনিকটি নতমস্তকে উত্তর দেয়, ‘ ভারতবর্ষের একজন নামকরা বৈদ্য স্বেচ্ছায় এসেছেন।’

মুখে হাসি ফোটাবার চেষ্টা করেও আলেকজান্দার ব্যর্থ হন। বিস্মিত হয়ে বলেন, ‘কী বিচিত্র এই দেশ!  কত দেশ জয় করলাম, এমন দেশ দেখিনি।’  হঠাৎ জ্বরের কথা মনে পড়তেই জিজ্ঞেস  করেন,  ‘উনি কোথায়? ওঁকে সঙ্গে আননি কেন?’

‘বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, হুজুর। আপনার আদেশ পেলেই নিয়ে আসব।’

‘বাজে কথা বোলো না।’  সম্রাট এবার বেশ ক্ষিপ্ত,  এতেও আদেশ দিতে হবে!  ঘটে বুদ্ধি পেয়েছো কি করতে? যাও , শিগগির নিয়ে এসো।’ তাঁর গলার আওয়াজ শুনেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বৈদ্য ভেতরে প্রবেশ করেন। মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেন, ‘ডাকার দরকার নেই। ঘটের বুদ্ধি প্রয়োগ করে নিজেই চলে এসেছি।’

আলেকজান্দার ওঁকে দেখে চমকে ওঠেন- ধপধপে সাদা দাড়ি, মাথা ভরতি সাদা চুল। উন্নত নাসিকা,  স্নেহসিক্ত দু-চোখ । যেন কোন দেবদূত  আবির্ভূত হয়েছেন। কয়েক মুহূর্তের জন্য সম্রাট নিজের অসুখের  কথা ভুলে যান। পর্যাপ্ত আলো রয়েছে ঘরটিতে। ওদিকে বৈদ্যও বিছানায় শুয়ে থাকা রুগির চোখ-মুখ গভীর  ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন – গ্রিক দেবতার মতো প্রদীপ্ত  মুখমন্ডল অসুখে সামান্য ক্লান্ত। দীর্ঘদেহী যুবকের দু-চোখে গর্বের ঝিলিক ।

আলেকজান্দারের চোখে ক্ষণিকের জন্য গুরু  অ্যারিস্টটলের স্নেহার্দ্র দৃষ্টি  ভেসে ওঠে। তবে পরক্ষণে কাশির ধমক শুরু হতেই নাড়ি দেখানোর জন্য হাত এগিয়ে দেন। প্রবীণ বৈদ্য ঘাড় নেড়ে জানান, ‘শরীর আর চোখ- মুখ দেখেই অসুখটা ধরে ফেলেছি -অন্তর্জ্বর।  সাতাশ দিনের আগে নামবে না।’ খানিকক্ষণ থেমে ফের বলেন,  ‘এতদিন কি কি খেয়েছেন তার আলোচনা করে লাভ নেই। তবে আজ থেকে গুরুভোজন , মদ -মাংস সব বন্ধ । জ্বর নেমে যাবার পরেও যেমন বলব,  অন্তত ছ- সপ্তাহ ধরে তা কি ঠিক মেনে চলতে হবে।  নইলে অসুখটা ফিরে আসার ঝুঁকি থেকে যাবে।’ শুনে বিশ্বজয়ীর বুক কেঁপে ওঠে। যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের নৃশংস হত্যাকারী নিজেই মৃত্যুভয়ে ভয়ানক ভীত হয়ে পড়েন।  কিছুটা সংকোচের সঙ্গে জিজ্ঞেস করেন, ‘ঝুঁকি?  সামান্য জ্বরে  আবার কিসের ঝুঁকি! যা বলতে চান ,সোজাসুজি  বলুন।’

‘সামান্য জ্বর নয়। তিনদিন ধরে যে ভুল চিকিৎসা হয়েছে তারও ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে। যদি নিয়ম মেনে চলেন, তবে চিকিৎসা শুরু করব, নইলে নয়।’

বৈদ্যের কথাগুলো উপস্থিত দুজনের কারও  সহ্য হয় না। সৈনিকটি তরোয়ালখানা শক্ত করে চেপে ধরে। আলেকজান্দার সগর্বে বলে ওঠেন, ‘সম্রাটের আদেশ অমান্য করার অর্থ জানেন? আমি আলেকজান্দার। আমার বীরত্বের কথা কি শোনেননি?’

‘অনেক শুনেছি, চোখেও দেখেছি।’ প্রবীণ বৈদ্য নির্ভয়ে বলেন, ‘পাঞ্জাবের নৃশংস নরসংহারের  কথা কেউ ভুলতে পারে!’

সম্রাট এবার গভীর চিন্তায় ডুব দেন । বৈদ্যও অভিজ্ঞ চোখে তাঁকে  নিরীক্ষণ করতে থাকেন। তিনি কিছু বলার আগেই আলেকজান্দার কৌতুহল প্রকাশ করেন, ‘তবু আপনি স্বেচ্ছায় আমার চিকিৎসা করতে এসেছেন, কারণটা ঠিক বুঝতে পারছি না।

এবার বৃদ্ধের ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে, দু-পা এগিয়ে এসে তাঁর চোখে চোখ রেখে বলেন, ‘না বোঝার কোন কারণ নেই। দেশের প্রতি আমার ভালোবাসা আর রুগির প্রতি আমার কর্তব্যবোধ-  দুটো ভিন্ন বিষয়। দুটোকে এক করে দেখলেই জটিলতার সৃষ্টি হয়।’

‘রুগি!  কে রুগি?’ মনে গভীর আঘাত পেলেন আলেকজান্দার। তথাপিও ঔদ্ধত্যের সঙ্গে জানান, আমি সম্রাট আলেকজান্দার। আপনার কি কান্ডজ্ঞান লোপ পেয়েছে?’

‘না, পুরোমাত্রায় আছে। তাই না ডাকতেই এসেছি। অন্য কোনো কান্ডজ্ঞানের প্রয়োজন আমার নেই। এবার দয়া করে অবান্তর কথা বন্ধ করুন ।ওষুধপত্র অবশ্য সঙ্গে এনেছি। তবু দু-একটা ঔষধির জন্য আমাকে অরণ্যে যেতে হবে’।

অনুমতি না নিয়েই বৈদ্য বেরিয়ে এলেন। আলেকজান্দার তক্ষুনি  আদেশ দেন- ‘শোন, দুজন সৈনিক সারাক্ষণ ওঁর সঙ্গে থাকবে।’

‘ আজ্ঞে, জাঁহাপনা।’

জাঁহাপনা  এবার স্বগতোক্তি  করেন,  ‘এদেশের মানুষ সত্যি বিচিত্র। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা– সবাই যেন দার্শনিক। গুরু অ্যারিস্টটল গ্রিক ছাড়া অন্য সবাইকে জন্মজাত ক্রীতদাস মনে করেন, যাদের নিলামে বিক্রি করে দেওয়াই সংগত।  অথচ এরা… পুরুর সঙ্গে সন্ধি  করে স্থায়ীভাবে এদেশে থেকে গেলে বেশ হয়।’

পেশাগত দক্ষতার শীর্ষে থাকলেও প্রবীণ বৈদ্য রাজনীতির জটিলতা তেমন বোঝেন না। তাই নিজেই অরণ্যে গিয়ে পাচন তৈরি করে আনেন। ঝিনুকে ভরে এনে আলেকজান্দারকে অনুরোধ করেন, ‘তিন ঘন্টা পরপর আমি নিজেই আপনাকে ওষুধ খাওয়াব।’

তক্ষুনি রক্ষী  ছুটে এসে হাত থেকে ঝিনুকটা  কেড়ে নেয় । রুক্ষ ভঙ্গিতে বলে, ‘এটা আগে আপনাকে পান করতে হবে, এটাই নিয়ম।’

নিজের দুর্বলতা গোপন করার উদ্দেশ্যে আলেকজান্দার উঠে বসেন।সরল শিশুর  মতো বৃদ্ধের দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলেন, ‘এতে প্রাণঘাতী বিষ নেই তো! ‘ তবে  পরক্ষনেই ঠোঁটে অলৌকিক হাসি ফুটিয়ে তোলেন, ‘আপনার হাতে অবশ্য বিষ খেতেও আপত্তি নেই। মা অলিম্পিয়াস শৈশবে ঠিক এইরকম ঝিনুকে করে ওষুধ খাওয়াতেন।’ বলেই শিশুর মতো মুখ খোলেন, বৃদ্ধও তাঁকে পাচন খাইয়ে দেন। আশ্চর্যের ব্যাপার যে তরুণ সম্রাট সরল শিশুর মতো ঝিনুকের ওষুধ চাটতে শুরু করেন। দিগ্বিজয়ের  বর্বর তৃপ্তির চাইতে ভিন্ন এক ধরনের সাত্ত্বিক আনন্দের অনুভূতিতে তাঁর  হৃদয় পূর্ণ হয়ে ওঠে । ইচ্ছে  থাকলেও তখন বিছানায়  শুলেন না। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর পর  ফের নিজের বালকোচিত কৌতুহল প্রকাশ করেন, ‘আপনি আমার অসুখের খবর পেলেন কিভাবে? যতদূর জানি, আপনাকে কেউ জানায়নি।’

‘দূরদূরান্তের পাখিরা যেভাবে জলের খোঁজ পায়, ভ্রমর ফুলের আর মৌমাছি পরাগের খোঁজ পায়।’ প্রবীণ বৈদ্য মুখে হাসি ফুটিয়ে আরও বলেন, কাক – শকুনে যেভাবে মুমূর্ষ পশুর খোঁজ পায়।’

প্রতিবাদের সুযোগ না থাকায় সম্রাট ওঁর  রুপোলী দাড়ির দিকে সবিস্ময়ে  চেয়ে থাকেন।

পরদিন সকালে আলেকজান্দারকে ওষুধ খাওয়ানোর সময় বৈদ্য জানান, ‘প্রায় পঁচাশি  ঘন্টা ধরে বুক জ্বালা, শরীরে যন্ত্রণা, মাথাব্যথা আর অস্থিরতা থাকবে। তাতে ভয় না পেয়ে মনে সাহস রাখবেন।

আপাতত পথ্য বলতে কেবল তপ্ত বালিতে ফোটানো জল, আধ- সেঁকা বাজরার দলিয়া আর ছাগলের দুধ। তিনদিন পর গোরুর দুধে সেদ্ধ করা ডুমুর খাওয়া যাবে। আমার বিশ্বাস, আপনি আগের চেয়েও স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠবেন ।’

অভিজ্ঞ বৈদ্যের  পূর্ব ঘোষণা মত সম্রাটের শরীর ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে, পঁচাশি  ঘন্টা পর্যন্ত অবস্থার উন্নতি হয় না। তাঁর বাহিনীতে হাজার হাজার সাহসী সৈনিক আছে যারা ঘামের মতো রক্ত বইয়ে দিতে পারে। আক্ষরিক অর্থেই নিবেদিতপ্রাণ। তাদের কেউ বিশ্বজয়ী সম্রাটের অসুখে সাহায্য করতে পারেনি। তাঁকে একাই সমস্ত কষ্ট ভোগ করতে হয়। বুকে যেন আগুন জ্বলছে। হাতে- পায়ে জ্বালা , পেট উথালপাতাল করে । সম্রাট অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করেন। অর্ধচেতন অবস্থায় এমন সব অনুভূতির মুখোমুখি হন, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় ।সারা বিশ্বে  গ্রিসের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কথা তখন তিনি ভুলে গিয়েছেন। যাঁর বিজয় -দুন্দুভি, পারস্য, মিশর , সিরিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য -সর্বত্র গুঞ্জন করছে, রোগশয্যায় তিনি একেবারে একা। রানী রুকসানাও একান্ত নিরুপায়।থিবসের নাগরিকরা তাঁর দাসত্ব মানতে অস্বীকার করায় ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পের মতো সমস্ত শহরটাকে নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিলেন । ছয় হাজার  নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করেন। হাজার হাজার নারী এবং শিশুকে ক্রীতদাস রূপে বিক্রি করে দেন। আজ তারা নিজেদের জীবনের হিসাব চাইছে। সত্তরটি নতুন শহরের পত্তনকারি সম্রাট ছোট্ট একটি ঘরে রোগশয্যায় শুয়ে রয়েছেন। হিরে- মুক্তো, সোনা- রুপো –কিছুই তাঁকে নিরাময় করতে পারেনি। থেকে- থেকেই চোখের সামনে আঁধার দেখেছেন।

 

পঁচাশি  ঘন্টার পর যেন দুঃস্বপ্নের অভিশাপ কাটে। আলেকজান্দার বুঝতে পারেন, তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছেন । গ্রিক চিকিৎসায় নিরাময়ের সম্ভাবনা ছিল না । সম্রাট কৃতজ্ঞ চোখে বৈদ্যকে দেখেন আর বৈদ্য সস্নেহে রুগির দিকে তাকান। নীরবতা ক্ষণিকের মধ্যে অনেক কিছু ব্যক্ত করে দেয়, মুখের কথায় যা সম্ভব নয়।

রোগভোগ করার পরই অজেয় সম্রাট সুস্থ জীবনের গুরুত্ব বুঝতে পারেন। যেভাবে দিনে মাত্র একবার সূর্য ওঠে, সেইভাবে প্রত্যেক মানুষ একটিই জীবন পায়। এক জীবনে কেউ দুবার বাঁচতে পারে না। আলেকজান্দার এই সত্যের প্রতি কখনো মনোযোগ দেননি। একের পর এক যুদ্ধ জয়ের সাফল্য আর নরসংহারের উন্মাদনায় ভাবার সময় পাননি যে তিনি ও নশ্বর। তাঁর মৃত্যুর পরেও জগতে স্বচ্ছন্দে মানবজীবন প্রবাহিত হবে– ক্ষণিকের তরেও এই পরম সত্য  অনুভব করেননি। নিজের প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি যেন খানিকটা উদাসীন হতে থাকেন। কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারায় তার মনে হয় প্রবীণ বৈদ্যকে জিজ্ঞেস করাই শ্রেয়। তাঁর প্রতি সম্রাটের বিশ্বাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই মনের আশঙ্কা সরাসরি প্রকাশ করেন, আপনি চিকিৎসা না করলে কি আমি মারা যেতাম?’

বৈদ্য প্রশ্নটা প্রশ্নটার অপেক্ষায় ছিলেন। দৃঢ়তার সঙ্গে জানান – ‘না, এখনও আপনার আয়ু ফুরোয়নি।’

‘আর কতটা আয়ু বাকি? বলুন কতটা?’ আলেকজান্দার ব্যগ্র হয়ে জানতে চান।

‘কেন জানতে চাইছেন! ও না জানাই ভাল।’

‘ আমার মৃত্যুর পরেও পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ বেঁচে থাকবে- আমি তা ভাবতে পারি না। আমার অনুপস্থিতিতে জগতে ফুল ফুটবে, লোকে  ফুলশয্যার  আনন্দ উপভোগ করবে , সন্তান- জন্মের উৎসব করবে আর মনের সুখে বৃষ্টিতে ভিজবে- আমি তা চাই না । তুচ্ছাতিতুচ্ছ মানুষ বেঁচে থেকে আনন্দ করবে অথচ আলেকজান্দার মারা যাবে- এ হতে পারে না। ‘

‘এ রকমই হয় ।’  বৈদ্য বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘আপনার পিতা প্রয়াত হয়েছেন, তবু অজস্র মানুষ বেঁচে রয়েছে। এরকমই হয় জগতে- চিরকাল তাই হবে।’

‘উনি মরেননি, ওঁকে  হত্যা করা হয়েছিল।’

‘মৃত্যু একটা অজুহাত চায়।  সময়মতো কোনো একটা অজুহাত পাওয়াই মৃত্যুর পক্ষে যথেষ্ট ।’

‘তবে আমার ক্ষেত্রে কোন অজুহাত খুঁজে পাবে না।’

‘অজুহাত নিজে থেকেই তৈরি হয়, মৃত্যু তাকে খুঁজতে যায় না ।’

এবার খানিকটা গম্ভীর ভঙ্গিতে বৈদ্য বলেন, ‘তুমি কি সত্যিই অমর হতে চাও? আমি অবশ্য হতে চাই না।’

আলেকজান্দার একথার সরাসরি উত্তর দেন, ‘আপনি কিসের প্রলোভনে অমর হতে চাইবেন! আমার অনেক রকম প্রলোভন আছে- অনেক বিজিত রাজ্য , হাজার হাজার ক্রীতদাস , অপরিসীম ধনসম্পদ। আমার আগে এমন কোন সম্রাট আসেনি যে এত বড়ো সাম্রাজ্য আর এত ধনসম্পদের অধিকারী হয়েছে। একদিন হঠাৎ করে মরে যাবার জন্যই কি এত রক্ত ঝরিয়েছে?

বৈদ্য খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলেন , ‘তোমার যখন এত উচ্চাকাঙ্ক্ষা , তোমাকে অমর হবার উপায় বলে দেব। আমি ছাড়া কেউ তা জানে না। কথা দাও, তুমি কাউকে বলবে না।’

আলেকজান্দারের মনে আনন্দের সীমা নেই , যেন তারায় ভরা আকাশ মুঠোর মধ্যে চলে এসেছে। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন- ‘না, কাউকে বলব না । রুকসানাকেও বলব না- যাকে আমি সবচেয়ে ভালোবাসি। তাছাড়া নারীদের অমর হবার প্রয়োজন নেই। যৌবন চলে গেলেই তাদের মরে যাওয়া উচিত। আর একটা কথা, আমি বয়স হলে বৃদ্ধও হতে চাই না। এখন যেমন আছি, চিরকাল যেন এমনই থাকি।’

প্রবীণ বৈদ্য দার্শনিকের ভঙ্গিতে বেশ খানিকক্ষণ ভাবনাচিন্তা করেন। পরে আচমকা ধীর গম্ভীর গলায় এমন ভাবে কথা বলে ওঠেন যেন ঘরের স্তব্ধ বাতাস থেকে কথা ভেসে আসছে- প্রার্থনা করি , ঈশ্বর যেন তোমাকে সুমতি দেন। এ-ও কি তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে, জন্মের সময় তুমি ঠিক ততটাই অসহায় আর দুর্বল ছিলে, অন্য শিশুরা যেমন হয়। সময় পেয়েই তুমি ধীরে ধীরে যুবক হয়েছ। সময়ের সঙ্গেই অন্যান্য নশ্বর প্রাণীর মতো বার্ধক্য তোমাকেও জরাগ্রস্ত করে দেবে। অকালমৃত্যুর কথা ছেড়েই দিলাম। তবু তোমাকে বোঝাতে চাই, মৃত্যু অনিবার্য বলেই জীবনের এত মহিমা। তুমি যমের দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়ে হাজার হাজার নির্দোষ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটিয়েছ। এর  পরেও তুমি অমর হতে চাও! বলো,  কেন?’

জীবনে এই প্রথম আলেকজান্দারকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে এমন কড়া কথা শুনতে হয় – তথাপি নিজেকে ধরে রাখেন। কারণ তাঁর অমর হবার উপায় কেবল প্রবীণ বৈদ্যই  জানেন। তাছাড়া এই বৈদ্যই তাঁকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন। নিজের যুক্তি যথেষ্ট জোরালো কিনা সন্দেহ থাকলেও আত্মপক্ষ সমর্থনে তিনি জানান, ‘এর কারণ এত বড় সাম্রাজ্য আর এমন অপার ধন-সম্পদের মালিক বিশ্বে  আর কেউ হয়নি। এই প্রলোভনকে উপেক্ষা করতে পারছি না বলেই অমরত্ব চাইছি।’

শুনে প্রবীণ বৈদ্যের সাদা দাড়ি অলৌকিক হাসিতে দীপ্ত হয়ে ওঠে । সম্রাটের কথায় ঘাড় নেড়ে বলেন, ‘আমার আর কিছু বলার নেই। কেন যেন আমার মনে আশা ছিল, মহাজ্ঞানী অ্যারিস্টটলের শিষ্যের ঘটে কিছু বুদ্ধিসুদ্ধি রয়েছে। বেশ, তোমার যখন এটাই শেষ ইচ্ছা, তবে তা অপূর্ণ রাখতে চাই না। তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না। আশ্রমে ফিরে গিয়ে শিষ্যদের উপদেশ দিয়ে আমি স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করব।… এবার মন দিয়ে শোনো। সুমেরু পর্বতের পশ্চিমদিকে একটা লম্বা গুহা আছে। যুগযুগান্ত ধরে একটা বড় শিলা পড়ে রয়েছে তার মুখে। বিশ্বাসী সৈনিকদের সাহায্য নিয়ে সেটা সরিয়ে একা তার ভেতরে প্রবেশ করবে- নির্ভয়ে  আর নিরস্ত্র অবস্থায় । সেইখানে খুব সম্ভবত তুমিই প্রথম মানুষ যার পদচিহ্ন পড়বে।’

আলেকজান্দারের দেহ-মনে তীব্র উত্তেজনা লক্ষ করে বৈদ্য বলে চলেন, ‘অনেক দূর চলার পর দেখতে পাবে একটি ঝর্ণার জল পাশের জলাশয়ে গিয়ে পড়েছে। অদ্ভুত জলাশয় কখনও পুরো খালি  হয় না , আবার সম্পূর্ণ ভরেও  না।  সেখানে অশ্বত্থ  গাছের ডালে বসে একটি কাক সারাক্ষণ চেঁচিয়ে চলেছে -কাঁ -কাঁ -কাঁ । জগতে কেবল সেই অমর- যে প্রতিক্ষণ নিজের অমরত্ব ঘোষণা করছে। সেই ঝরনার জল তুমি সাত অঞ্জলি পান করবে । তারপর তোমার শাশ্বত জীবনের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না।  দৈত্য – দেবতা মানুষ কেউ না। গুহা থেকে সৈন্যদের বেশ কিছুটা দূরে রাখবে। এই শুক্লপক্ষের নবমীর দিন যাত্রারম্ভ করলে ভালো হয়।তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হোক। শুভেচ্ছা রইল।’

রোগমুক্ত আলেকজান্দারের দেরি করার কোনো কারণ নেই । একুশজন সশস্ত্র সৈনিক নিয়ে বাতাসের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তিনি সুমেরু পর্বতের কাছে এসে পৌঁছোলেন। সৈনিকরা যথেষ্ট বলপ্রয়োগ করে ভারি শিলাখণ্ডটি সরায়।  ভেতরে প্রবেশ করার সময় আলেকজান্দারের মনে দুর্ভাবনা জাগে, পুরুর সৈন্যরা যদি ভেতরে লুকিয়ে আক্রমণ করে! তাহলে একা নিরস্ত্র অবস্থায় কিভাবে তাদের প্রতিরোধ করবেন! মৃত্যুভয়ে  ক্রমেই শিহরিত হতে থাকেন। ভীরুর মত ফিরে আসার ইচ্ছা প্রবল হলেও মৃত্যুভয় কে তিনি অবশেষে ঝেড়ে ফেলেন। না, সেই  দেবদূত শত্রুর সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন না। বরফের মতো উজ্জ্বল সাদা দাড়ি তাঁকে বারবার আশ্বস্ত করতে থাকে, সম্রাটও নির্ভয়ে এগিয়ে চলেন।… সত্যি সত্যি অশ্বত্থের সবুজ ডালে বসে একটি কাক অবিরাম নিজের অমরত্ব ঘোষণা করছে- কাঁ- কাঁ- কাঁ।  পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে মধুর কলকল ধ্বনি ঝংকৃত করে স্বচ্ছ ঝরনা। আলেকজান্দার ভেবে বিস্মিত হন, গুহার এত ভেতরে ম্লান আলোটা আসছে কোথা থেকে! বিস্ফারিত চোখে চেয়ে দেখেন, কত অমূল্য হিরে- রত্ন ছড়িয়ে চারপাশে! রত্নাবলী থেকে যে অপূর্ব দ্যুতি ফুটে বেরোচ্ছে, পূর্ণিমার আলো আর সূর্যালোক থেকে তা ভিন্ন ধরনের। কাকটি ছাড়া কোনো প্রাণী চোখে পড়ে না। কাকটিই কি গুপ্তধনের মালিক! ঝরনার জল জল পান করার পর তিনি গুহার সমস্ত রত্ন হস্তগত করার উপায় বের করবেন । তাঁর কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই।

 

কাকের অবিরাম ‘ কাঁ- কাঁ-কাঁ’ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় । আলেকজান্দার চমকে সেদিকে তাকান, কাকটি সতর্ক হয়ে তাঁর দিকেই চেয়ে রয়েছে। কাকটি কি তাঁর লোভের আভাস পেয়েছে! ঝরনার অবিরাম শব্দও সহসা বন্ধ হয়ে যায়- যেন অদৃশ্য আততায়ীর হাত সেই শব্দকে চেপে ধরেছে। শান্তির অসহনীয় নীরবতা তাঁর কানদুটিকে বিদ্ধ করতে থাকে। এবার আলোটা হঠাৎ নিভে গেলে তিনি ঝরনার কাছে পৌঁছতে পারবেন না, গুহা থেকেও বেরোতে  পারবেন না ।এই অনন্ত অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুকিয়ে মরতে হবে। আলেকজান্দারের চোখের সামনে কুয়াশার মতো কিছু ছড়িয়ে পড়ে– অসচেতনভাবেই পা দুটো ঝরনার দিকে এগিয়ে চলে।

অমরত্বের লালসায় জলের দিকে হাত বাড়াতেই কাকটির কর্কশ গলা শুনে সম্রাট দাঁড়িয়ে পড়েন,  ‘একটু দাঁড়াও আলেকজান্দার । আমার সম্মতি  ছাড়া  ঝরনা একফোঁটা জল মুখে দিলেই তুমি মারা যাবে। যে ভুলের জন্য হাজার- হাজার বছর ধরে আমি অমরত্বের অভিশাপ ভোগ করছি, তুমি সেই ভুল করো না।   শাশ্বত জীবনে আমি অতিষ্ট হয়ে গেছি। বহু শতাব্দী থেকে মরতে চাইছি, কিছুতেই পারছি না। নিরন্তর ‘কাঁ- কাঁ’- র নিষ্ফল রোদনে আমার কানদুটো আজ সংবেদনশূন্য । যে হীরে – রত্নের প্রতি তোমার এত লোভ , আমি তার মালিক। তুমি যদি মৃত্যু -দেবতার কাছে গিয়ে আমার মৃত্যুর উপায় জেনে আসতে পার, তবে এ সমস্তই তোমার হাতে তুলে দেব। এগুলি কেবলই আমার বিরক্তি উদ্রেক করে। আমার মৃত্যুর পর, যত ইচ্ছে ঝরনার জল পান কোরো। না,  যে তরোয়ালের কোপে তুমি হাজার- হাজার মানুষকে হত্যা করেছ , আমি সেভাবে মরবো না। আগুনে পুড়ে, জলে ডুবে, এমনকি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করতেও আমি অপারগ। ভগবানের মৃত্যু হতে পারে , আমার মৃত্যু নেই। শোনো, মৃত্যুর শর্তেই জীবনের সুখ ভোগ করা যায়। অমরত্বের চেয়ে বড় অভিশাপ আর নেই। দুর্ভাগ্য, আমি সেই চরম যন্ত্রণা ভোগ করছি… তুমি কিসের দুশ্চিন্তা করছ। তোমার হাতে মারা যাওয়া অজস্র মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের তুলনায় এই হীরে-রত্নের মূল্য কানাকড়িও নয়। তুচ্ছ কাক হয়ে আমি যা বুঝতে পেরেছি মানুষ হয়েও তা বুঝতে পারছ না!  বুদ্ধিবৃত্তির সার্থকতা তাহলে কীসে?

‘কাঁ-কাঁ-কাঁ। ‘

খ্যাতির উত্থান- পর্বে,  বিশ্বজয়ীর সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠা সত্ত্বেও আলেকজান্দার একটি কাকের কাছে পরাজিত হয়ে ফিরে এলেন। দুজনের মধ্যে তাহলে মহান কে-  আলেকজান্দার না সেই কাক? প্রশ্নটার উত্তর আজও মেলেনি।

 

রাজস্থানি থেকে ভাষান্তরঃ অনিন্দ্য সৌরভ

[বিজয়দান দেথার জন্ম ১লা সেপ্টেম্বর ১৯২৬, যোধপুর । রাজস্থানি ভাষায় সর্বপ্রথম কথাসাহিত্যিক।  বিভিন্ন ভারতীয় ও বিদেশী ভাষায় অনূদিত হওয়া ছাড়াও তাঁর বেশ কিছু গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র আর নাটক হয়েছে।চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে চরণদাস চোর (শ্যাম বেনেগল), দুবিধা  (মণি কউল), পরিণতি (প্রকাশ ঝা), পহেলি (অমল পালকের) দেশ-বিদেশে পুরস্কৃত।  পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি, ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার আর ‘পদ্মশ্রী’। ২০১১ তে তাঁর নাম ‘নোবেল পুরস্কারের’ জন্য প্রস্তাবিত হয়েছিল। জীবনাবসান ১০ই নভেম্বর ২০১৩।]

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • আশিস সরকার on June 23, 2022

    অসাধারণ অনুবাদ। সাবলীল গদ্য। গল্পটি কে নীতি গল্প বললে বোধহয় খুব ভুল হবে না। একজন মহান লেখকের গল্প অনুবাদ করে, পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্য অনুবাদক এবং যাঁরা পৌছে দিলেন সবাই কে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ।

    ত্রিদিবেশ বন্দ্যোপাধ্যায় on July 2, 2022

    চমৎকার গল্প, সুন্দর অনুবাদ। অনুবাদককে ধন্যবাদ এমন এক জন লেখকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যে।

    মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2022 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ