
‘গল্পের সময়’-এ লিখতে হবে। এটা বেশ কঠিন কাজ। সেই ইতিহাস এর সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের আকাশবাণী ভবন তাকে নিয়ে লেখা কি সহজ। শত বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে এই বাড়িটি। সেই সাদা কালো ডোরা কাটা দাগ পেরিয়ে সেই লোহার গেট পার হয়ে সেই বাড়ীতে পা দিয়েছিলাম যুববাণীর ঘরে কত সালে ভুলেই গেছি যে। কত বছর আগে মনে হয় চল্লিশ বছর তো হবেই মনে হয় নাকি কে জানে। সেই ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়ীতে। সেই আকাশবাণী ভবন এর গরিমা বোঝার বয়স হয়নি তখন কিন্তু যুববাণীর ঘর তখন জমজমাট। মানস মিশ্র প্রোগাম এক্সিকিউটিভ। সেই দেড়শো বা একশো পঁচিশ টাকার চেক পেলাম যেদিন মা খুব খুশী হলো। সরকারী চেক একদম কী সুন্দর একটা অনুভূতি। রেডিও প্রোগ্রাম করে সেই গ্রাম থেকে বলছি অনুষ্ঠান করে দু মাস পর ডিউটি রুম থেকে সই করে চেক নিলাম। আমার বন্ধু ভজন গেছিল সেই অনুষ্ঠানে দিয়ারার গোবিন্দপুর গ্রামে। সেই একটা টেপ রেকর্ডার নিয়ে অনুষ্ঠান রেকর্ড করলাম যে।
আকাশবাণীর স্মৃতির এই ছবি অমলিন আমার জীবনে। যে জীবনে বিজ্ঞান বিভাগ, স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ বিভাগ ছিলো জড়িয়ে। যে জীবনে নুরুল আলমদা ছিলেন, স্বাতী চট্টোপাধ্যায় ছিলেন। খুব সম্ভবতঃ কাজীদার হাত ধরে না হলেও তাঁর কথা শুনেই হাজির হওয়া যুববানীর ঘরে তখন কী ভীড় মানস মিশ্র প্রোগাম এক্সিকিউটিভ যে। সেই কত যে স্মৃতির ভিড় উপচে পড়ে আজ এই বুড়ো হয়ে আর আকাশবাণীর শতবর্ষে এসে। সেই ক্যাজুয়াল কর্মী হয়ে যাওয়া। সেই আকাশবাণী কলকাতার বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত সব ছেলে মেয়ের দল তখন কিলবিল করছে যে। সরকারী এই সিস্টেম কে বাঁচিয়ে রাখতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে কত জন। মনোজ কর তো আজও কাজ করে শুনেছি ওর কাছে। না সারা জীবন কাজ করেও আর কাজ পাকা হয়নি মনোজের এটাই যে আফশোষ তাঁর।
কত সব বিখ্যাত জনদের সাথে দেখা হওয়া। সংবাদ পড়ছি বরুণ মজুমদার। খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়। খবর পড়ছি দাড়িওলা তরুণ চক্রবর্তী। ছন্দা সেন। প্রণতি ঠাকুর। এমন হাজার নাম আজ মনে পড়ে যায়। সে এক যুগ বটে আকাশবাণীর। সেই নেম প্লেট ঝোলানো থাকতো সুনীত চক্রবর্তীর। কত যে আনন্দ করে কাজ করেছি ওই মিডিয়ায়। স্বপ্নময় চক্রবর্তী, থেকে শুরু করে বাংলা বিভাগের সমরেশ ঘোষ মনে হয়। সেই কৃষ্ণ শর্বরী দাশগুপ্ত তখন কাজ করেন। অঞ্জন পাল। হীরক রায় মনে হয়। খবর পড়েন সংযুক্তা সিংহ বলে একজন। অগ্নিভ দা গানের লোক। সেই অসীমা মুখোপাধ্যায় এর অধীনে কাজ করেছি আমরা সেই সময়। সেই মনোজ গিরি হারিয়ে গেছে কোথায় কে জানে। বনানীদির বয়স হয়েছে। সেই নারায়ণ দা আর ওয়ামিক ভুলে গেছে আকাশবাণীর সেই চেনা পথ চেনা রাস্তা। কৃষিকথার সেই সিঙ্গুর বা কোন জায়গার ছেলে ছিলো তাকে দেখলাম ইন্টারভিউ নিতে গলায় কার্ড ঝুলিয়ে তুহিন নাম ওর সে আজও আছে যে।
১৯৯০ এর থেকে দু হাজার ছাব্বিশ মিডিয়ার এত ওলট পালট হলো। গদি মিডিয়ার স্ট্যাম্প লেগে গেলো। আকাশবাণী কলকাতা দাঁড়িয়ে রইলো তাঁর নিজের স্ব মহিমায়। আজ এইসব কথা মনে পড়ে যায় আমার শতবর্ষের সামনে এসে দাঁড়িয়ে। যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে ক্যাজুয়াল কর্মী হয়ে কাজ করলো। ছয়দিন কাজ করে নয়শো টাকা পেয়ে মাস চালালো সংসার চালালো তারা সব ভেবেছিল একদিন যদি স্থায়ী হয়ে যায় কাজটা তাহলে তো জীবন বেঁচে যেতো অনেকের সেই সময় যখন আমরা সদ্য কাজ শুরু করেছি যে। না, দশ বছর কাজ করে বুঝতে পারলাম সেটা হবার নয় আর। যাঁরা সব অফিসার সেই বিখ্যাত সাংবাদিক ডক্টর অমিত চক্রবর্তী। সেই শান্তনু পালোধী এনারা সব কেউই আর এই সব নিয়ে ভাবেননি কোনওদিন কে আর আকাশবাণীর ক্যাজুয়াল কর্মীদের নিয়ে ভাবতে চায় বলুন তো। নিজেরা কাজ করেছেন বছর বছর মোটা বেতন পেয়েছেন আর কী। এই সব অস্থায়ী জীবনের কর্মীদের জন্য আজ আর কে ভাবে বলুন, বড় পদের কর্মী সব এনারা কেন্দ্রীয় সরকার এর কর্মী। যদিও আকাশবাণীর এই ক্যাজুয়াল কর্মীরা অনেক কাজ সামলে দিয়েছে যে সব সময়।
কতদিন যে এই রাস্তায় যাওয়া হয়নি আমার। সেই লম্বা করিডোর ধরে হাঁটা হয়নি হাইকোর্ট আর বিধানসভার সামনের পথ দিয়ে। শীতের রোদ পড়েছে লম্বা বারান্দায়। সেখানে বিদিশা হেঁটে আসছে স্টুডিও থেকে। হাতে টেপ নিয়ে রেকর্ডিং শেষ করে। সেই সময় কতজনের যে অল্প কিছু রোজগার এর ব্যবস্থা করে দিল এই আকাশবাণী ভবন। আমাদের সাংবাদিকতার জীবন যাপন শুরু হলো এই জায়গা থেকেই। স্বাতীদি আমায় কাজ দিয়েছিলেন। বুঝেছিলেন দরকার আছে ওর কাজের। মাত্রও দেড়শো বা আড়াইশো টাকা সেটা যে কত সংসারে সাহায্য হত কে জানে সেই সময়ে। সেই আকাশবাণী কলকাতার ক্যান্টিন। সেই হৈ চৈ করে কাজ করা আমাদের সবার। কতজনের সাথে যোগাযোগ আর আলাপ হওয়া শুরু আর ভালবাসার শুরু। সেই জাগরণদা কথা মনে পড়ে। সেই শাশ্বতীদির কথা মনে আছে। সেই মাঠে বসে মিটিং করা যদি স্থায়ী হয়ে কাজ করা যায় এই জায়গায় চাঁদা দেওয়া সেই আশায় সবাই মিলে কোর্টে লড়তে। না সে সব আর কিছুই হয়নি বাস্তবে কী আর করা যাবে।
বড় মিডিয়ায় নাম লেখালাম আমি ই টিভির জেলা সাংবাদিক হলাম। সেই দেবাশীষ পাল আজ অবসরে চলে গেছেন। মানস প্রতিম দাস মনে হয় বিখ্যাত সাংবাদিক হয়েছেন এই দীর্ঘ কর্ম জীবনে অনেক পেলেন এই ভবনের থেকে। এই তো জামালদা এসেছেন শান্তিনিকেতনে দেখলাম কবিতা পাঠ করছেন তিনি। সত্যিই অসাধারন ছিলো কিন্তু এই আকাশবাণীর স্মৃতির ঝাপটা। সেই যে রেডিও তে খবর দিতেন আমাদের সান্যালদা ব্যাগ করে রেডিও নিয়ে ঘুরতেন তিনি এদিকে ওদিকে হুগলি জেলার প্রতিনিধি হয়ে। হাওড়া জেলার এক সাংবাদিক ছিল কী বেশ নাম তাঁর। খবর এর সময়ে তাঁর ব্যাগে রেডিও বেজে উঠতো। কত আর পয়সা পেতেন তিনি। তবে সম্মান খুব ছিলো বটে বেশ এই কাজ করে সেই আমলে এই গণমাধ্যমে। আজ আর মিডিয়ায় কাজের সম্মান কোথায়।
আজ সেই আকাশবাণীর আজ শতবর্ষের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেজে উঠেছে সেই চেনা বাড়ী। কত ইতিহাস এর সাক্ষী সে। সেই শীতকাল হলেই ইডেনে খেলা দেখার জন্য তিন তলায় উঠে যাওয়া আমাদের। সেই বিজ্ঞান বিভাগ এর দত্তদার কড়া নজর এড়িয়ে। কী একটা বেতার বাণী বই বের হত সেই সময়ে এই বাড়ী থেকে আর বিকেল হলে গমগম করতো ডিউটি রুম এর জায়গা। সেই চেনা ছবি আজ এই বুড়ো বয়সে এসে ঝাপসা হলো যে কী করে কে জানে এতদিনের পরে। এখন নিশ্চয়ই কর্পোরেট এর হাওয়া লেগেছে এই সরকারী মিডিয়ার গায়েও কে জানে। ভালো থেকো তুমি আমাদের প্রিয় এই আকাশবাণী। যেখানে অনেক সুখ আর দুঃখের স্মৃতি লেগে আছে ওই বাড়ীর গায়ে।
তবে সেই আমাদের অস্থায়ী কাজের জীবন। সেই ঠান্ডা স্টুডিও এক দুই তিন। সেই স্পুল নিয়ে দৌড়। সেই ডাক্তারদের আপনার স্বাস্থ্য রেকর্ডিং করা এইসব ছবি তো আজও ঝাপসা হয়েই মনে আছে। শতবর্ষ তো অনেক গুলো বছর পার করে হয়। তবু এই সময়ের কিছু সময় আমরা সবাই মিলেমিশে এই কাজের সূত্রে এক হয়ে কাজ করেছি। নিজেদের কাজ দেখিয়েছি। জীবনের সময় নষ্ট করেছি। অল্প কিছু রোজগার করেছি তবে যদি এই কাজের জায়গায় একটা স্থায়ী চাকরী হতো হয়তো জীবনটাই বদলে যেতো আমাদের। না সেটা আর হলো কই। বিদিশা আজ বিদেশে চলে গেছে। কত জন এর স্মৃতি ঝাপসা ধূসর হয়েছে। আজ এই শতবর্ষে এসে আকাশবানীকে মনে করে বুড়ো বয়সে বেশ ভালই লাগছে। সেই গ্রাম থেকে বলছি। সেই গল্প দাদুর আসর। সেই মহিলামহল। সেই কৃষি কথার আসর। সেই সংবাদ বিচিত্রা। সেই বিজ্ঞানের কথা। সেই আরও কত যে অনুষ্ঠান হত সেই সব কী আর ভোলা যায়। সত্যিই অসাধারন কিন্তু এই আমাদের স্মৃতি। যা আজও অমলিন হয়ে আছে।
[বানানবিধি ও মতামত লেখকের নিজস্ব]

email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।