
গল্পের সময়ঃ আপনার প্রথম গল্পসংকলন ‘সাতপুরুষের গোরস্থান’ প্রকাশিত হয়েছিল সেই ১৯৯৮ সালে। তার অনেক আগেই আপনি লেখালিখি শুরু করেছিলেন। হঠাৎ গল্প লিখতে শুরু করেছিলেন কেন? একদম প্রথম গল্প কোনটা?
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ আমার গল্প বলার একটা অভ্যাস ছিল ছোটবেলায়। আমাদের তো একদম গ্রামে বাড়ি ছিল, একদম এঁদো গ্রাম যাকে বলে, গরীব ঘর। বাবা তো ওই দেশ থেকে এসেছেন। ওপারে মোটামুটি ভালই চাকরি করতেন। দর্শনা সুগার মিলে সুপারভাইজার ছিলেন। কিন্তু এদেশে আসার পর অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। অথচ আমরা নয় ভাই বোন। আজকে একটা বাচ্চা বড় করতেই অনেকে হিমশিম খায়। যদিও ওই পরিস্থিতিতে আমাদের সেভাবে মানুষ করতে হয়নি। আমরাই কেড়ে কামড়ে খেয়ে বড় হয়ে গেছি।
যাই হোক দাদারা অতটা না হলেও আমি পরিবারের মধ্যে একটু পড়াশুনো করেছি। আর আমাদের গ্রামে অগ্রহায়ণ মাসে প্রতি রবিবারে একটা গল্পের আসর বসত। রবিবার হত ইতু পুজো, গ্রামের মহিলারা আমাদের বাড়িতে এসে জড়ো হত। আমি গল্প বলতাম, ইতুর পাশাপাশি অন্য গল্পও জুড়ে যেত। বাবা একটা বইও কিনে এনে দিয়েছিল। মনে আছে আমি একটা গল্প বারবার বলতাম, উমনো-ঝুমনোর গল্প। বাবারা যে কেমন হয় তার একটা ছবি ধরা ছিল তাতে। এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণীর দুই কন্যাসন্তান ছিল—উমনো এবং ঝুমনো। গল্পটা এরকম – একদিন ভিক্ষে করা চাল-গুড় দিয়ে ব্রাহ্মণী পিঠে বানাতে বসেছেন। তার থেকে তিনি দুটি পিঠে উমনো ও ঝুমনোকে খেতে দেন। এদিকে বাইরে বসা রাগী ব্রাহ্মণ তাওয়ার শব্দ গুনে দড়িতে গিঁট দিয়ে পিঠের হিসাব রাখছিলেন। খেতে গিয়ে পিঠে কম পড়ায় তিনি ভীষণ রেগে গেলেন। ব্রাহ্মণ পরদিন ভোরে দুই মেয়েকে মাসির বাড়ি নিয়ে যাওয়ার নাম করে এক গভীর জঙ্গলে ফেলে আসেন। গভীর দুঃখে জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে উমনো ও ঝুমনো অন্য মেয়েদের ইতু পুজো করতে দেখে এবং উপোস করে সেই পুজো শুরু করে। তাদের ভক্তি দেখে সূর্যদেব (ইতু ঠাকুর) তাঁদের বাবার অভাব দূর হওয়ার বর দেন। ফলে সংসারে সুখ শান্তি ফিরে আসে।
এই ছিল গল্প। যদিও বারবার মনে হত ওই দারিদ্রের মধ্যেও আমার বাবা ছিল অন্যরকম।এরকম অনেক গল্প ছিল যা মেয়েরা মন দিয়ে শুনত। এই সব গল্প বলার প্রবণতা থাকলেও সিরিয়াস গল্পে ঢুকে পড়ি ১৯৭১ সালে। আমার প্রথম গল্প লেখা, তারিখটা এখনও মনে আছে, ২৭ মার্চ। ২৫ তারিখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা, ২৬ তারিখ ভোরে মুজিবুর রহমান গ্রেফতার, সেদিন বা ২৭ থেকেই ওখানে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যায়। তা আমাদের ওখানে সীমান্তের পাশেই একটা গঞ্জ ছিল যেখানে আমরা বাজার করতে যেতাম। সীমান্তের একেবারে কাছেই আমাদের বাড়ি ছিল। তো সেদিন আমি মায়ের থেকে টাকা দিয়ে বাজারে গেছি। দেখি অনেক দূর থেকে ঢেউয়ের মত হাজার হাজার মানুষ আসছে ওপার থেকে। আমাদের গঞ্জ এলাকাটা পূর্ব পাকিস্তানি লোকে ভর্তি ছিল আগেই। তারা ওপার থেকে আসা মানুষজনকে আপায়্যন করতে শুরু করলেও মানুষের চাপে তা যেন ভেঙে পড়ছে। আগত মানুষদের জল-বাতাসা ইত্যাদি দেওয়া হচ্ছে। আমিও দিচ্ছি। আমি যে বাজার করতে এসেছি তা ভুলে গেছি। আমি তখন ১৬, মাধ্যমিক দেব। কিন্তু মার্চে এই ঘটনা হওয়ায় মাধ্যমিক পিছিয়ে গেল জুন মাসে।

তখন বেশ কয়েকদিন ধরে মানুষকে আপ্যায়ন করার জন্য ওখানে যেতাম। মানুষ তো এসেই যাচ্ছে, তারপর কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। সেই প্রথম দিনের কথা বলি। সেদিন একটা মেয়ে, ক্লাস নাইনে পড়ে, থলেতে বই নিয়ে পিতলি গাছের নীচে চুপ করে বসে ছিল। খাওয়া দাওয়া নেই। জিজ্ঞাসা করলাম, সঙ্গে কেউ নেই? ঘাড় নাড়ল। বোধহয় হারিয়ে গেছে এত লোকের মধ্যে। জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু খাবে? আবার ঘাড় নাড়ল। আমি কাছাকাছি আমাদের চেনা দুলালদার দোকান থেকে মিষ্টি আনতে গেলাম। বললাম, ২টো কচুরি আর মিষ্টি দাও, এক্ষুনি। দুলালদা বলল এখনই হবে না রে। দেখছিস না কত ভিড়? তুই সাইডে দাঁড়া, আমি ঠিক ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। কিন্তু কিছুই পেলাম না, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মিলল শালপাতায় মোড়া কয়েকটা জিলিপি। কিন্তু তা নিয়ে যখন এলাম তখন দেখি মেয়েটা নেই। আমার খুব মনখারাপ হয়ে গেল। অনেক খুঁজলাম, পেলাম না। মানুষেরা পলাশিপাড়া, তেহট্ট, বেতাইয়ের দিকে মাথায় ঝাঁকা, বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে চলছে। আমিও খুঁজতে গেলাম, দেখতে পেলাম না। হারিয়ে গেল সে। নামটা মনে আছে রুখসানা খাতুন। কুতুবপুর হাই স্কুলে পড়ত সে। বাড়ি ফিরে এসে ওকে নিয়ে একটা গল্প লিখেছিলাম। ভালবাসার গল্প, প্রেমের গল্প। সে গল্প কোথাও কোনোদিন ছাপা হয় নি। খাতাতেই ছিল। ৭১ সাল থেকে সেই খাতায় থেকে যাওয়া গল্প ৫২ বছর পর ২০২৩ সালে স্থান পেল আমার ‘শেষ দাঁড়ি’ নামের শেষ গল্প সংকলনে। গল্পের নাম ‘ঘুরে বেড়াও কোন বাতাসে’। তো বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হল ১৬ ডিসেম্বর আমরা খুব উৎসব করেছিলাম এলাকায়। ওই পিতরি গাছের তলায় আলো দিয়ে সাজানো হয়েছিল। তখন সকলে দলে দলে ফিরছে। আমি খুঁজছিলাম রুকসানাকে। কিন্তু অত ভিড়ের মাঝে, পাই নি। হারিয়ে গেছে নাকি বেঁচে নেই তা জানতে পারলাম না। সেবার প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ৭১-এ অস্বাভাবিক বন্যা, তেমনি খরা, দুর্ভিক্ষ। অনেক মানুষকে রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখেছি।
গল্পের সময়ঃ তাহলে এটা তো ছিল খাতায় লেখা প্রথম কিন্তু অপ্রকাশিত গল্প। তবে প্রথম গল্প লোকে জানল, অর্থাৎ প্রকাশ হল, সেটা কোনটা?
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ প্রথম প্রকাশ হওয়া গল্প ১৯৭২ সালে, সেটাও আবার একটা দেওয়াল পত্রিকায়। সে অর্থে লোকে জানল যে একটা গল্প লিখেছি। গল্পটার নাম ছিল ‘শিউলিফুল’। আমাদের গ্রাম ছিল বেশ সংস্কৃতি সম্পন্ন গ্রাম। সেবার গ্রামের মানুষজন ঠিক করল একটা ওয়াল ম্যাগাজিন হবে। তা সম্পাদক কে হবে? একটা মিটিং-এ সকলে আমাকে মনোনীত করে বসল। সেই শুরু। সেই দেওয়াল পত্রিকা ১৯৭২ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বের হয়েছিল। আবার মাঝে সেই পত্রিকা ছাপা হয়েও প্রকাশ হয়েছে।সেই পত্রিকায় ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘শিউলিফুল’ গল্পটি আমার প্রথম গল্পের বই ‘সাত পুরুষের গোরস্থান’ (১৯৯৮) এর প্রথম গল্প হিসেবে স্থান পেয়েছিল। অর্থাৎ ১৯৭২ সালে লেখা গল্প প্রথম মুদ্রিত হল ১৯৯৮ সালে। বলা দরকার ‘সাত পুরুষের গোরস্থান’ বইয়ের প্রচ্ছদ করেছিলেন এই সাক্ষাৎকার নিতে আসা শিল্পী পার্থ প্রতিম রায়।
তবে এই বইটার কিছু গল্প আমার নিজের কাছেই স্মরণীয় বা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। তখন সদ্য সদ্য দেশ স্বাধীন হয়েছে। সরকারিভাবে না হলেও একটা নিয়ম চালু হয়েছিল যে ওদিক থেকে আসা মাস্টার আমাদের স্কুলে মাস্টার হবে। ওদিকের পোস্টমাস্টার এখানেও পোস্টমাস্টার হবে। তখন তো কাঁটাতার ছিল না, ফাঁকা জমি, নো-ম্যানস ল্যান্ড। আমাদের বাড়ি থেকে সীমান্ত ছিল তিন মাইল। শুনেছি বাবারা ওপারের ট্যাংরামারি কুতুবপুর থেকে গরুরগাড়িতে এপারে চলে এসেছিলেন। মাঝখানে আটকিয়েছে। কোনও সোনাদানা আনতে দেয় নি। যদিও আমার জন্ম এদেশে ১৯৫৫ সালে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা। বাবারা চলে আসে ১৯৫০ সালে। মাঝে তিনটে বছর ঠাকুরদা-বাবারা ভেবেছে আসবে কী আসবে না। যদিও তখন কোনও বিশেষ অসুবিধে হয় নি। সেখানকার মুসলিমরা বাবাদের বলেছিল যে আপনারা থাকুন। কিন্তু একটা যেন মানসিক বিভেদ হয়ে গিয়েছিল। ওটা মুসলমানদের দেশ আর এটা হিন্দুদের দেশ। সেইজন্যেই বাবারা চলে এসেছিল। তখন রাজাকার ছিল। ওরা যা এদেশে আসত সে সব চেক করত। মায়ের কাছে একটা লক্ষ্মী মুর্তি ছিল। পেতলের, সিঁদুর দিয়ে মাখানো।ওরা চেক করেছিল সোনার কিনা? মা যা কিছু কাঁসা রুপো মাটিতে পুঁতে এসেছিল। বলা হয়েছিল আমরা টেম্পোরারি যাচ্ছি, আবার ফিরে আসব। যদিও সে ফেরা আর হয় নি। ১৯৭১ সালে আমার কাকা গিয়েছিল বাংলাদেশে, গ্রামের বাড়িতে। সেই সব পুঁতে রাখা জিনিসের খোঁজ করেছিল। কিন্তু কিছু পাওয়া যায় নি।
গল্পের সময়ঃ এ তো বয়ে চলা ইতিহাস, তা ওই ‘শিউলিফুল’ গল্পটার প্রেক্ষাপট কী?
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ সে গল্প ১৫ অগস্টকে ঘিরে। স্কুলের মাস্টারেরা বলেছিল ১৫ অগস্ট সকলকে ফুল নিয়ে আসতে হবে। সে সময় ফুল বলতে শিউলি ফুল। আর কোনও ফুল তখন ফোটে না। আমার ছোড়দি বাড়িতে বাবা- মাকে বলে রেখেছে তাকে ভোর বেলায় ডেকে দিতে হবে। ভোরে ফুল না তুললে সকলে নিয়ে নেবে। তা কোথায় পাওয়া যাবে সে ফুল? দিদির এক বান্ধবী জোহরান জানিয়েছিল ওদের মসজিদের কাছে একটা শিউলি ফুলের গাছ আছে, সেখানে কেউ যায় না, ফলে ফুল পাওয়া যাবে।
এদিকে দিদির আর এক বন্ধু সুরুচি বলে, আমাদের ওই ইঁটভাটার কাছে অনেক শিউলি ফুল পাওয়া যাবে – আমরা ভোরে গিয়ে তুলব। এবার দিদি করেছে কী যাতে ফুল কেউ তুলে না নেয় সে জন্য অন্ধকার রাতেই ভোর ভেবে ভুল করে চুপি চুপি শিউলি ফুল তুলতে গেছে। দিদির বয়স তখন ছয় কি সাত। মাঝরাতে সেখানে গিয়ে ঘাবড়ে গেছে। দেখে একটা ফুলও নেই। গাছে ঝাঁকা দিয়েও ফুল পড়ছে না। আসলে ফুল তো ভোরবেলায় ফোটে। এদিকে বাড়িতে হইচই পড়ে গেছে। মা দেখে দিদি বিছানায় নেই। সকলে ইঁটভাটার কাছে গিয়ে দেখে দিদি খুব মনমরা হয়ে বসে আছে। তখন ১৫ অগস্ট মানে বর্ডার এলাকায় একটা বিরাট উৎসব।ও ভাবছে সব ফুল সুরুচি নিয়ে চলে গেছে, এবার স্কুলের মাস্টারমশাই কী বলবেন? বাবা ওকে অনেক বুঝিয়ে কোলে করে বাড়ি নিয়ে এসে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।এরপর যখন ঘুম ভাঙে তখন অনেক বেলা। স্কুলে যেতে হবে। মাকে যখন জিজ্ঞাসা করছে যে আমার তো ফুল আনা হল না। তখন দেখে গোটা ঘটনা শুনে তার মাথার কাছে সুরুচি এক চুপড়ি ভর্তি ফুল দিয়ে গেছে। এখান থেকেই আমার শিউলিফুল গল্পের অনুপ্রেরণা। সে গল্পে এক মুসলিম ছেলে, তার গোটা গায়ে শিউলিফুল। হাতে, মাথায়, মুখে শিউলিফুল। সে সবাইকে ফুল দিচ্ছে, তাতেও তার ফুল ফুরোচ্ছে না।
গল্পের সময়ঃ আর কোন কোন বিষয় আপনাকে গল্প লিখতে গিয়ে ভাবিয়েছে?
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ আমার যেটা মনে হয়েছে, বা আমি খুঁজে পাই নি – সেটা হল গণধোলাই বা গণপিটুনি নিয়ে সেভাবে কোনও গল্প লেখা হয় নি। আমি রাস্তাঘাটে দেখেছি, একদিন শ্রীরামপুর স্টেশনে একটা বাচ্চা ছেলেকে চোর বলে কীভাবে মারছে। একজন চেনা রেলের লোককে খবর দিলাম, যদি কিছু করতে পারে এই ভেবে।
আবার একদিন আমি আর আমাদের বন্ধু বিলয় ট্রেনে যাচ্ছি, এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ জমে গেল। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতির বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে নানা জ্ঞানগর্ভ কথা হল। বললেন চারিদিকে অবক্ষয়, দেশ রসাতলের দিকে যাচ্ছে। তাঁকে বেশ ভাল লাগল আমাদের, ব্যাঙ্কে চাকরি করেন। আমরা হাওড়া স্টেশনে নেমে দেখি এক পকেটমার ধরা পড়েছে। সকলে যে যেমন পারছে পিটছে। এমন সময় ওই লোকটা আমাদের কাছে তাঁর ব্রিফকেসটা গচ্ছিত রেখে সেখানে গিয়ে ধরা পড়া ব্যক্তিকে মারধর করে চলে এলেন। আমরা প্রশ্ন তুললাম, আপনি মারলেন কেন? আপনি কী করে জানলেন ও দোষী। বিকারহীনভাবে লোকটা জানিয়ে দিলেন ও দেখলেই বোঝা যায়। এই হল পরিস্থিতি। তা এসব নিয়ে গল্প সেভাবে আমার চোখে পড়েনি। দাঙ্গা নিয়ে অনেক গল্প আছে। সংকলনও আছে। কিন্তু গণপিটুনি নিয়ে গল্প দেখিনি। আমার একটা গল্প আছে। যার নাম ‘বুদির কেল্লা’। আকাশবাণী ভবনের সামনে একজনকে খুব মারধোর করতে দেখে লিখেছিলাম।
আর একটা গল্প, যার নাম ‘সাত পুরুষের গোরস্থান’। তখন দেশভাগে সকলে তো পারাপার করেন নি। একটা পাড়া ছিল মুসলিমদের। জহিরুল মিয়াঁ, তাঁর ছেলেমেয়েরা সেখানে থাকত। সকলের সন্দেহ তারা পাকিস্তানি। ওরা এখানে আছে, জমি – জায়গা বিনিময় করতে পারে নি। এখানে একটা কথা বলা দরকার যে আমরা কিন্তু বিনিময়ে এদেশে এসেছি। মুসলমানেরা আমাদের জমি আর আমরা মুসলমানদের জমি বিনিময়ে পেয়েছিলাম। আমি যে জায়গাটায় জন্মে ছিলাম সেটা একটা মাটি। সেখানে একটা কুয়ো ছিল। ওই কুয়োর পাশে আমার জন্ম। ১৯৫৫ সালের ২৭ অগস্ট। সেই কুয়োয় সুন্দর হস্তাক্ষরে বাবা রঙ দিয়ে লিখে দিয়েছিল ‘ওঁ শ্রীবিষ্ণু’। আর ঠিক উল্টোদিকে আলকাতরা দিয়ে লেখা ছিল ‘এলাহি ভরসা’। সেখানেও একজন কেউ জন্মেছে, ওই কুয়োর ধারে।
যাইহোক জহিরুলরা একটা গ্রুপ ছিল ওখানে। তা সবাই সন্দেহ করত পাকিস্তানি হিসেবে। ভারত পাকিস্তান খেলা হলে ওরা বড় গোস্ত খাবে বলে প্রশ্ন করত।একদিন মনে আছে বিশ্বকাপের খেলায় সেমিফাইনালে ভারত পাকিস্তানের কাছে হেরে গিয়েছিল। কিন্তু ওরা সেভাবে উল্লাস করে নি। আর পরে ফাইনালের দিন শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে পাকিস্তান জেতার পথ ধরতেই জহিরুলদের পাড়ায়( দক্ষিণপাড়া) হাউই-বাজি ইত্যাদি পোড়ান শুরু হল। ওরা বেলতলায় উৎসব করবে ঠিক করল। এসব দেখে অসুস্থ জহিরুল (তখন সে খুব অসুস্থ) ছেলেদের বলল এসব আমি একদম মেনে নেব না। এখানে আমাদের সাত পুরুষের বাস। আমাদের গোর সতী ঠাকুরের মাঠে। আমাদের কাছে পাকিস্তান বলে কিছু নেই। এই গ্রাম, আর গোরস্থান –এর বাইরে আমাদের আর কিছু নেই। তোরা এরকম করলে আমি সব ছেড়ে-ছুড়ে দিয়ে চলে যাব। এমন ঘটনার রাতেই জহিরুলের মৃত্যু হয়।এ আমার নিজের গ্রামের ঘটনা। তা নিয়েই গল্প। আর সেই গল্পের নামেই বই ‘সাত পুরুষের গোরস্থান’।
আর এই বইয়ের শেষ গল্প- সেটাও একটা ঘটনা। ওরা সাঁওতাল বা যাযাবর কিছু হবে। সেবার একদল লোক একটা সরকারি জায়গায় এসে থাকতে শুরু করল। আমরা জানতাম একদিন চলে যাবে। তা ওরা থেকে গেল। ওরা যে কী কাস্ট তা নিয়ে বিডিও-এসডিও অনেক হয়েছে। ওরা সাপুড়ে, না বেদে কে জানে। ওরা নিজেদের কোনও কাগজপত্রও দেখাতে পারে নি যে তারা কারা। কোনোদিন পড়াশুনোর কোনও চল ছিল না।
কিন্তু সেখানে থাকতে থাকতে তাদের ভাষাও পাল্টে গেল। ওদের ছেলেদের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব হল। ওরা সাপ খেলা দেখাত। বড় করে মনসা পুজো করত। নিজেরা পালাও করত – মনসা মঙ্গল, চাঁদ সদাগর এসব নিয়ে। প্রতিবার একই পালা হত, আমরা তাও যেতাম বাড়ির কাছে বলে। হঠাৎ ওদেরই কিছু ছেলে প্যান্ট-শার্ট পরে একেবারে অন্যরকম হয়ে গেল। দিনে দিনে মনসা পুজোও নাচ-গানকে সঙ্গী করে আলো ঝলমলে আধুনিক হয়ে উঠল। সারা রাত হিন্দি সিনেমা। নানা জায়গা থেকে লোক আসছে সেসব দেখতে। যদিও আসল মনসার থানে ভিড় নেই। সেখানে ওদের আসলে যিনি প্রধান যার নাম অভিলাষ গান গাইছেন।
যেই হাতে পূজি আমি দেব শূলপাণি,
সেই হাতে নাহি পূজি চ্যাং মুড়ি কানি।
গান হচ্ছে কিন্তু কেউ সে গান শুনছে না। সবাই চলে গেছে একটু দূরে আধুনিক পুজোর কাছে। আর এদিকে সংস্কৃতিকে ধরে রাখা বয়স্ক অভিলাষ ঢোলক বাজাতে বাজাতে সেখানেই পড়ে গেল। মৃত্যুও হল। আসলে গল্পের প্রেক্ষাপট ছিল কীভাবে একটা সম্প্রদায় বদলে গেল তা নিয়ে। বদলে গেল ঠিকই, কিন্তু আসলে ভাল কিছুই হল না। আমি তো ওখান থেকে অনেক দিন চলে এসেছি।এখন শুনতে পাই তাদেরই এক মেয়ে পঞ্চায়েতের প্রধান হয়েছে।

গল্পের সময়ঃ আপনি তো সরকারি চাকরি করেছেন, উচ্চপদে ছিলেন। এরই পাশাপাশি মানবাধিকার আন্দোলন করেছেন। বিজ্ঞান আন্দোলন করেছেন। এসব কি আপনার গল্পে কোনো প্রভাব ফেলেছে?
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ সে নিশ্চই ফেলেছে। যেমন ‘ফুল ফোটার শব্দ’ একেবারে পুরোপুরি বিজ্ঞান আন্দোলনের গল্প। ‘ইউক্যালিপটাস মানুষ’ গল্পটা বনসৃজন ঘিরে। সেটা হল গ্রামে সরকার থেকে খুব ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানো চলছিল। লেখকের গ্রামে থাকা গরীব বন্ধু এর বিপদটা বুঝতে পেরে প্রতিবাদ করছে। সে গ্রাম থেকে শহরে এসে উচ্চ পদে চাকরি করা মানুষ হিসেবে বন্ধুর কাছে উপস্থিত হয়েছে। তার দরকার কাগজে একটি সই- যা এই প্রতিবাদে কাজে লাগতে পারে। যদিও নাম করে ফেলা বন্ধু নিজের প্রচার, পরিচিতি ইত্যাদি তার সামনে তুলে ধরতেই ব্যস্ত। তো তার বাড়িতে থেকেও আসল কথা না বলতে পেরে শহরের বন্ধুকে কিছু না বলেই সে চলে যায়। বন্ধুও অবাক হয়। বউকে বলে বোধ হয় মেয়ের পড়ালেখার সাহায্যে টাকার জন্য এসেছিল। এর কদিন পরে একটা চিঠি আসে। তাতে লেখা আমি ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানোর বিপদ বুঝে তার প্রতিবাদ পত্রে একটা সইয়ের জন্য গিয়েছিলাম। কেরালায় এই নিয়ে খুব প্রতিবাদ আন্দোলন হচ্ছে। যাই হোক কোনো লাভ নেই। তোরা এখন নিজেরাই ইউক্যালিপটাস হয়ে গেছিস।
এরকম ‘ফুল ফোটার শব্দ’ও বিজ্ঞান আন্দোলনের বিষয় নিয়ে গল্প। তবে বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, মানবাধিকার নিয়ে গল্প লিখলেও সাহিত্য চর্চা শুরু অনেক আগে থেকে।সেই ইতু পুজোর গল্পই আমায় লেখালিখির দিকে নিয়ে গেছে। তারপর অনেক কিছু জুড়েছে।
গল্পের সময়ঃ আপনি কী জন্যে লেখেন? সাহিত্য সৃষ্টির জন্যে নাকি এর মাধ্যমে সমাজে কিছু বার্তা দেওয়ার জন্যে?
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ কী কাজে লাগলে ভাবলে অনেক কথা বলা হবে। আসলে আমি বক্তৃতা করতে পারি না সেই জন্যে আমি লিখি।একটা ঘটনার কথা বলব। সেটা একটা উপন্যাস। ‘কঠিনেরে ভাল বাসলাম’ বলে একটা উপন্যাস লিখেছিলাম। উপন্যাস আমি লিখি না। কারণ উপন্যাস সম্পর্কে একটা বিতৃষ্ণা আমার মনে তৈরি করে দিয়েছিলেন রমাপদ চৌধুরি। উনিই আমার প্রিয় লেখক। অসাধারণ নানা গল্প লিখে গেছেন। ওনার গল্পসমগ্র – প্রায় ৩০০টা মত গল্প আছে। তাতে ছোটো গল্প নিয়ে একটা অসাধারণ বর্ণনা আছে। রবীন্দ্রনাথের ব্যখ্যা – ছোটো প্রাণ, ছোটো ব্যথা, ছোটো ছোটো দুঃখকথা নিতান্তই সহজ সরল – তো আমরা জানি। কিন্তু আমার কাছে রমাপদ চৌধুরির ভাবনাটা সেরা মনে হয়েছে। তা কী সেই ব্যাখ্যা। হাফ পাতার একটা গল্প। গল্পের শুরুর গল্প। সেটা হল – রাজা যুদ্ধে চলেছে হাতি, ঘোড়া, সেনা ইত্যাদি নিয়ে। সে এক মহা ব্যাপার। রাজার পিছনে পিছনে যাচ্ছেন ঔপ্যনাসিক। দিস্তা দিস্তা তাঁর কাগজ লাগছে, সঙ্গে ডজন খানেক কলম। ওর সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে একজন ছোটো গল্পকার। ঔপ্যনাসিক গল্পকারকে বলছে কই হে তোমার সঙ্গে পাতা-পেন কোনো কিছুই তো দেখছি না। কী লিখবে তুমি? ছোটো গল্পকার তা শুনে কিছু বলল না। রাজা জিতেছে, ফিরছে। উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি হচ্ছে। এদিকে যুদ্ধে কত ঘোড়া মরল, কত হাতি মরল, কত মানুষ মরল তা একেবারে নিখুঁত বর্ণনা লিখে চলেছেন ঔপ্যনাসিক। এই সময় দেখা গেল ছোটো গল্পকার একটা গাছের তলায় কিছু লিখছে। ঔপ্যনাসিক খোঁটা দিয়ে বলল এত যুদ্ধ হল কিছুই দেখলে না, লিখলে না কেমন লেখক তুমি? ছোটো গল্পকার একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক নব পরিনীতা বধুর দিলে আঙুল দেখিয়ে বলল তার প্রিয় মানুষটি এখনও যুদ্ধ থেকে ফেরেনি। তাঁর দেখা শেষ, ওই খানেই আছে তাঁর আসল গল্পটি।
এই বর্ণনা পড়েই আমি প্রায় উপন্যাস লেখার প্রয়োজনীয়তা বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। তবুও একটা উপন্যাস আমায় লিখতেই হয়। উপন্যাসটা ব্যতিক্রমী।যখন স্কুলে পড়ি, সেভেন-এইট হবে, আমার এক বন্ধু ছিল আনোয়ার। নকশালবাড়ি হয়ে গেছে। সম্ভবত ৬৯-এর ঘটনা। শহর থেকে এক মাস্টারমশাই এলেন। তিনি নকশালবাড়ির আদর্শের কথা সকলকে বোঝাতেন। আমাদের গ্রাম থেকে স্কুল ছিল অনেক দূর, প্রায় হেঁটে পাঁচ কিলোমিটার যেতে হয়।জল-কাদা-বন পেরিয়ে। তাঁর প্রধান শিষ্য হয়ে গেল আনোয়ার বলে ছেলেটা। সে লেখাপড়ায় এমন কিছু না হলেও খুব বুদ্ধিমান।আমাদের স্কুলে প্রথম হত একটি মেয়ে, সাগরিকা দত্ত। আমি দ্বিতীয় হতাম। আনোয়ার থার্ড কিংবা ফোর্থ হত। কিন্তু আমরা সবাই জানতাম ওই সেরা। ও ইচ্ছে করে পড়ে না, লেখে না। কিন্তু ও প্রচুর জানে। কোথায় রুশ বিপ্লব, কোথায় ফরাসি বিপ্লব, কোথায় চিনে কী হচ্ছে সমস্ত ও আমাদের বলত। আমরা বলতাম তুই এত কী করে জানলি? ও বলত, তোদের একদিন নিয়ে যাব স্যারের কাছে। একদিন দেখছি স্কুলে আলকাতরা দিয়ে নকশালবাড়ি লাল সেলাম, চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান এসব লেখা হয়েছে। তা নিয়ে খুব হইচই। কমিটির লোকজন সব চলে এসেছে। আনোয়ার চুপি চুপি বলল, জানিস আমি লিখেছি। মাস্টারমশাই-এর কাঁধে ভর দিয়ে আমি এসব লিখেছি।
আমরা বললাম এতে কী হবে? ও বলল, সমাজ পাল্টাতে হবে। আমরা বললাম তা বলে স্কুলে? ও বলল স্কুলটাই তো আখড়া প্রতিক্রিয়াশীলদের। এখান থেকেই যত শুরু। এর মধ্যেই একটা ঘটনা ঘটল। আমাদের স্কুলের যিনি সেক্রেটারি, জোতদার ভূপেন (সম্ভবত) দত্ত, যে আবার সাগরিকার বাবা সেই তিনি নকশাল মাস্টারমশাইয়ের হাতে আক্রান্ত হলেন। দত্ত মশাইকে হেসো দিয়ে আঘাত করা হয়। নকশাল মাস্টারের সঙ্গী ছিল জোতদারের বাড়িতেই আশ্রিত এক ব্যক্তি, প্রথমে সেই হামলা চালায়। যে আজকে এপিডিআর করে। দত্ত মশাই আহত হলেও সেদিন প্রাণ যায় নি তাঁর। এর পরেই পুলিশের ভয়ে ওই মাস্টার নদী পেরিয়ে সোজা গিয়ে এক রাতের জন্য আশ্রয় নেন এক আর এস পি নেতার বাড়িতে। পরের দিন পালান শ্রীকাকুলাম, সেখানে ধরা পড়েন। আর এখানে অ্যারেস্ট হয়ে যান আজকের এপিডিআর করা ওই ব্যক্তি।
ওই নকশাল মাস্টারমশাই শ্রীকাকুলামে যে গ্রামে থাকতেন আমিও গেছি সে গ্রামে, ওড়িশায় থাকার সময়। সত্যি বলতে কী একটা সময়ে আমার মধ্যেও একটা আলোড়ন জেগেছিল। সাতাত্তরে বন্দিমুক্তি হিসেবে ছাড়া পেয়ে যান মাস্টারমশাই। ঘটনাচক্রে সেই জমিদারের ঘরে গিয়েই আশ্রয় নেন তিনি।(পরে উন্মাদ হয়ে যান তিনি। যদিও তা ছিল এক প্রেম ঘটিত ব্যাপারে।) তবে সেদিনের আক্রান্ত হওয়া জমিদারের আর্থিক অবস্থা তলানিতে। এদিকে সেই আনোয়ার যে জোতদার, বুর্জোয়া পরিবারের মেয়ে বলে সাগরিকার চরম বিরোধী ছিল-তার সঙ্গেই ওর বিয়ে হয়।এই হল আমার ‘কঠিনেরে ভাল বাসলাম’ উপন্যাসের বিষয়।
গল্পের সময়ঃ আপনার প্রথম দিকের গল্প ছিল একেবারে অন্যরকম- যাকে বলে মারকাটারি। যেমন তার লেখনীর ধার, তেমন তার ব্যপ্তি। কিন্তু একটু পরের দিকে আমরা এমন কিছু গল্প পাই যা সেভাবে মন কাড়তে পারে না। আপনি একটা সংকলনে তার গল্পগুলোকে ‘জালি গল্প’ বলে দাগিয়েই দিয়েছেন। এটা কেন ?
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ আমি নিজের গল্পকে চারভাগে ভাগ করেছি।আমার গল্প বলে নয়, সব ক্ষেত্রেই তাই হয়। যেমন অবক্ষয়, হাহাকার, দারিদ্র – তাই নিয়ে গল্প। স্বপ্নময় চক্রবর্তীর প্রথম দিকের গল্পও তাই। দারিদ্র- দুর্দশা নিয়েই। তারপরে একটা সময় আসে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, প্রতিঘাত। সেটা আমার ক্ষেত্রেও এসেছে। এখনতো আর সেভাবে ভাবিনা। সে ক্ষমতা নেই, মনের জোরও নেই। মনটাও পাল্টে গেছে। ওই নামকোয়াস্তে একটু এপিডিআরের হয়ে রাস্তায় হাঁটলাম, সেটা কোনো ইস্যু নয়। আমার একটা লেখাতে আছে যে যদি কোনো মানুষের ইচ্ছে আছে অথচ সত্যি সত্যি রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে না পারে তার তিনটে পথ খোলা থাকে। এক, সব ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়া। দুই, আত্মোক্তি করা-যে আমি কিছু করতে পারলাম না। আর তৃতীয়ত বন্দুক তুলে নেওয়া। এছাড়া চতুর্থ কোনো পথ নেই। একটা সময়ে সেটাই ভেবেছিলাম, মনে মনে।
আর ওই যে গল্পের চার ভাগের কথা বলছিলাম তার তৃতীয় ভাগ হল ভালবাসা।যুগ যুগ ধরে এ হল অমলিন। ভালবাসা মানুষের চিরকাল থাকবে। আর আছে যৌনতা। সেটা নিয়ে আমি লেখার সাহস পাইনি, লিখিওনি। এই নরনারীর সম্পর্ক নিয়ে আমি আগে কখনও লিখি নি।জালি গল্পের যে সংকলন সেটার মধ্যে আছে নরনারীর সম্পর্ক নিয়ে গড়ে ওঠা গল্প। সবই শোনা গল্প। যেমন আমার অফিসের এক কলিগ বিয়ে করছে সহকর্মী মহিলাকে। শর্ত ছিল সংসার চালাতে দুজনে সমান টাকা দেবে। এইভাবে ফি মাসে ২ হাজার টাকা করে দিয়ে দিব্যি সংসার চলছিল। কিন্তু গোল বাঁধল সন্তান হওয়ায়। খরচ বেড়ে যাওয়ায় দুজনেই ঠিক করল টাকা বাড়িয়ে প্রত্যেকে আড়াই হাজার করে দেবে। বেঁকে বসল মহিলা। বলল আমি যে সন্তানকে দুধ খাওয়াচ্ছি তার দাম কে ধরবে? তাই বাড়তি টাকা পুরুষ বা স্বামীকেই দিতে হবে। এই ছিল গল্প, নাম দুধের দাম। নারী-পুরুষের সম্পর্ক কী হতে পারে তা নিয়ে তৈরি হয়েছে এই বইয়ের গল্প গুলো। কোনোটা বানানো নয় কিন্তু, সব দেখা।
আবার আমার অফিসেরই এক ঘনিষ্ট বন্ধুর গল্প, সাঁকরাইলে থাকত। ওর বউয়ের নাম রূপা। তো আমার বন্ধু হঠাৎ সুইসাইড করে। রূপা অসহায়, তার চাকরি দরকার, একটি মেয়ে। আমি তখন ওয়েলফেয়ারে। রূপার যাতে চাকরি তাড়াতাড়ি হয় সেজন্য উদ্যোগ নিলাম। হয়েও গেল। রূপা প্রথম প্রথম সাদা শাড়ি পড়ে অফিস আসত। আমিই বললাম সাদা কেন? এখন সময় পাল্টে গেছে। তারপর এক বছরের মধ্যেই রূপা পাল্টে গেল। সাদা ছেড়ে রঙিন শাড়ি পরে ও যেন উড়তে লাগল। তো আমাদের আফিস ছিল অনেক বড়।রূপার সঙ্গে আর দেখাই হয় না। সেদিন প্রচুর সেজে অফিসে আসা রূপার সঙ্গে লিফটে দেখা। নানা কথা হচ্ছে, বাড়িতে একদিন আসুন এমন কথাও হচ্ছে। দেখলাম ও একটা দিন ভুলে গেছে। বারবার জিজ্ঞাসা করাতেও মনে করতে পারল না। লিফট থেকে নামার সময় আমি বললাম রূপা আজ ২৯ অগস্ট, কার্তিকের মৃত্যুদিন। এই রকম নানা পারস্পারিক সম্পর্কের গল্প স্থান পেয়েছে ‘জালি গল্প’ – র দুই মলাটের মধ্যে। নর-নারীর সম্পর্ক এক গভীর বিষয়। কিন্তু যৌনতা নিয়ে আমি কোনো গল্প লিখতে পারি নি। লেখার ইচ্ছে ছিল। অভিজ্ঞতাও কিছু ছিল। অনেকেই তো লিখেছেন যৌনতা নিয়ে।কিন্তু লেখা হয় নি।
গল্পের সময়ঃ ঠিকই আপনার গল্পে সমাজ সচেতনতার কথাই থাকত। পরবর্তীকালে অন্যরকম সম্পর্কের কথা পেলাম। কিন্তু গল্প তো গল্পই, তাকে কী ‘জালি গল্প’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া যায়?
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ আসলে এখানে একটা ইঙ্গিত আছে। গল্পগুলো নয়, সম্পর্কগুলো জালি, সেগুলো কোনোভাবেই প্রেম নয়।তাই জালি গল্প।
গল্পের সময়ঃ এখন আর গল্প লিখছেন না? নতুন বা পুরোনো ভাবনা কিছু?
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ না আর গল্প লিখছি না। অসুস্থতা আর কাঁপার কারণে আমি আর হাতে লিখতে পারি না। অনেকে বলেন মুখে বলে মোবাইলে লিখতে। তা আমি করে উঠতে পারি না। তবে আমার শেষ লেখাটায় আমার সেই ছোটবেলা, বাংলাদেশের কথা ফিরে এসেছে। সেই কুতুবপুরের কথা, সেখানের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়স্বজনের কী যোগাযোগ এইসব। ওখানে আমার যাওয়ার ইচ্ছে আছে। আমি কুতুবপুর পর্যন্ত জানি। আমার বাবা, আমার মা কিছু হলেই কুতুবপুরের কথা বলত। হয়ত কাজ করতে করতে দেখল চাঁদ উঠেছে, তখন বলত দেখ দেখ ঠিক যেন কুতুবপুরের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে। আমরা ছোটবেলায় অনেককে জিজ্ঞাসা করতাম, আচ্ছা কুতুবপুরটা কোথায়? অনেকে বলত, এইতো কাছে। কাছেই অথচ আমরা কেন যাই না? আমাদের অঙ্কের মাস্টারমশাই কুতুবপুর স্কুলে পড়েছেন। সেই কুতুবপুর দেশভাগের পর বাংলাদেশে। কুতুবপুর এখনও আমায় ডাকে। সীমান্ত থেকে কুতুবপুরের আলো দেখা যেতে পারে কিন্তু যাওয়া যায় না। আগে ছিল নো ম্যানস ল্যান্ড। এখন ডবল কাঁটাতারের বেড়া। এই কুতুবপুরের গল্প আছে আমার শেষ বই ‘শেষ দাঁড়ি’তে।
গল্পের সময়ঃ কোনো আফসোস নেই, অনেক কিছু লেখা হল না?
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ আফসোস তো আছেই। তবে এক্ষেত্রে আমি হাসান আজিজুল হক, এই উপ-মহাদেশের প্রায় সেরা গল্পকারই বলা হয় যাকে, তাঁর কথা বলতে চাই। তিনি বলেছেন – যা লিখেছি তা, যা লিখিনি তার অনেক কম। না লেখাটা রয়ে গেল অনেক বেশি। একটা জীবনে সেটা লেখা যায় না।এটা আমিও মনে করি। এখনও অনেক গল্প রয়ে গেছে মনের মধ্যে। কিন্তু আর পারব না, শারীরিকভাবেও নয়, মানসিকভাবেও নয়। আমার গ্রাম নিয়েই কত গল্প আছে। আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে একটা নদী যেত, নাম ছিল ভৈরব। বাবারা মাছ ধরত। আমার খুব মনে পড়ে।

গল্পের সময়ঃ রমাপদ চৌধুরী আপনার শ্রেষ্ঠ ছোটো গল্পকার। এছাড়া আর কার গল্প আপনার ভাল লাগে?
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ এক্ষেত্রে আমি স্বপ্নময় চক্রবর্তীর নাম করব। রমাপদ চৌধুরীর গল্পের ভাব, বিষয়বস্তু খুব প্রভাবিত করত। আর স্বপ্নময় চক্রবর্তীর লেখার ভাষা। তবে ইদানিং স্বপ্নময়ের লেখায় আমি আর সেই ভাললাগা পাই না। অনেকদিন আগে সমীর রায়চৌধুরীর একটা গল্প, সম্ভবত ‘গুটেনবার্গের সৈন্য’ আমায় খুব দাগ কেটেছিল। একটা ধর্ষণের ঘটনায় কেউ কোনো প্রতিবাদ করছে না, খুব প্রভাবশালী। তখন একটা ছেলে বলল আমি প্রতিবাদ করব। লোকে বলল, তোমার কী ক্ষমতা? সে বলল আমার আছে গুটেনবার্গের সৈন্য।একটা পত্রিকায় ছাপার হরফে এই নিয়ে ধারাবাহিক লিখতে শুরু করল। আবার প্রতিক্ষণ থেকে প্রকাশিত অমর মিত্রর গল্প সংকলন ‘সাইকেল মেসেঞ্জার’ এক অসাধারণ গল্প, আমার মনে দাগ কেটে গেছে।ওইরকম গল্প খুব কম লেখা হয়েছে বলে আমার মনে হয়।
গল্পের সময়ঃ আমরা প্রায় শেষের পথে। আচ্ছা শর্মিলাদির মৃত্যু (গল্পকার, বিজ্ঞান আন্দোলনের কর্মী ও বিষ্ণু বিশ্বাসের স্ত্রী) আপনার লেখালিখিতে কী রকম প্রভাব ফেলেছে।
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ শর্মিলাকে অনেকগুলো গল্প লিখেছি, যেগুলো না লিখলেও হত। অনেকেই এটা বলেছে, বারণ করেছে। বিশেষ করে একটি গল্প আমার শালিকা শিল্পীকে জড়িয়ে। লেখাটা ঠিক হয় নি। সে গল্প ছেপে বেরিয়ে গেছে অফিস পত্রিকায়। আমি শিল্পীকে বলেছিলাম – তোমায় নিয়ে একটা গল্প। সে বলেছিল আমার কোনো সমস্যা নেই। তবে অনেকে মানতে পারে নি। আর একটা গল্প লিখেছিলাম। তাতে মৃত্যুর পর স্ত্রী ফিরে এসেছে। বলছে ওইভাবে কাউকে বাইকে চড়িয়ে চালিও না। ওখানে যে একটা বাম্পার আছে তা তুমি জানতে না? যেন বাইকের পিছনে বসেই ওর দুর্ঘটনায় ওর মৃত্যুটা হয়েছে। শর্মিলাকে নিয়ে এইরকম চারপাঁচটা গল্প আমার না লিখলেই হত।
গল্পের সময়ঃ শর্মিলা ঘোষ সাহিত্য পুরস্কার – এর পিছনে বিষ্ণু বিশ্বাসের ভূমিকা কী?
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ এর পিছনে আমার ভূমিকা সেরকম কিছু নেই। প্রথম থেকেই এর পিছনে আছে শিল্পী ঘোষ ও গৌতম সরকার। যা করার ওরাও করেছে। আমি মাঝখান থেকে জুড়ে গেছি। আর্থিক ব্যাপারটা আমার। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা, গল্প বাছাই, একসঙ্গে বসা সব ওরা করে। গল্প বাছাই কমিটিতে শিল্পী ঘোষ, গৌতম সরকার ছাড়াও আছে তপন মোদক, সুকুমার ও মোহিত রণদীপ। তবে এই প্রথম এবারের সরিতা আহমেদের গল্পটি নিয়ে আমি সম্মান দেওয়ার জন্য জোর দিয়েছিলাম।
গল্পের সময়ঃ গল্পের সময়ের পক্ষ থেকে আমাদের এতটা সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
বিষ্ণু বিশ্বাসঃ আপনাদেরও আমার লেখালিখি নিয়ে এতটা বিশদে জানতে চাওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

Tags: পার্থ প্রতিম রায়, বিষ্ণু বিশ্বাস, বিষ্ণু বিশ্বাসের সাক্ষাৎকার, সাক্ষাৎকার, সুসমীর ঘোষ
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।