
“কবিতা ও আনন্দ” প্রবন্ধে বিনয় মজুমদার লিখেছেন “কবিতা হচ্ছে চিরস্মরণীয় বাক্য সমষ্টি যা হুবহু মুখস্থ করা যায়” এটাকেই তিনি কবিতার সংজ্ঞা বলেছেন। পড়বার সময় থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মনে রাখে। যে পরম্পরায় কবিতাটি পড়েছে সে সেই পরম্পরায় মনে রাখে।
কবির সঙ্গে আমায় সহমত হতে হবে এমন কোনও কারণ আছে বলে মনে হয় না। আর সহমত না হলেও কারও কিছু যাবে বা আসবে তাও নয়।
কিন্তু একটা ব্যাপারে আমার মনে একটা খটকা থেকেই গেছে সেটা হল মায়ের মুখে শোনা সেই ছেলেবেলার ছড়া বা পদ্য, বৈষ্ণব পদাবলীর পদ, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলের পংক্তি বা বাক্যসমষ্টি আজও হুবহু আমার মনে আছে। অথচ বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, এমনকি বিনয় মজুমদারের কবিতাও আমি মুখস্থ বা মগজস্থ রাখতে পারিনি। যদিও এটা আমার মতো মুখ্যু মানুষের দুর্বলতা ছাড়া কিছু নয়। কবি বিনয় এ কথাও বলেছেন যে আনন্দদায়ক বল…
অতিসহজ বোধ্য হয় না। ফলে যত সময় যায় সেগুলি নতুন ভাবে প্রকাশিত হয়। কবি বিনয় যখন “ফিরে এসো চাকা” লেখেন তখন চাকাকে ফিরে আসার আকুল আমন্ত্রণের আপাত সরল এক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। এখনও তৎকালের অনেকেই সেই ব্যাখ্যাই অতি নিখুঁত যুক্তি দিয়েই বলেন। যদিও সেই ব্যাখ্যার কিছুটা পরে অন্য অর্থে পরিবর্তন করা হয়েছিল। যেমন জীবনানন্দের কবিতায় হয় আজও বনলতা সেন এর মত কবিতার হিসাব মেলানো যায় না। আর বিনয় নিজেই মনে করতেন’ কবিতার মানে যদি পুরো বোঝা না যায় তবে কবিতা খুব আনন্দ দেয়’। তিনি আরও জোর দিয়ে বললেন’ যাতে মানে অনন্তকাল পুরো জানা না যায়”। উদাহরণ হিসেবে তিনি “গীতা” গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছেন।
ফলে সেই কবিতা নিয়ে পাঠক বা আলোচক কিছু জ্ঞান সৃষ্টি করে আনন্দ পায়। তবে সহজবোধ্য না হলেও কবিতা পাঠ করে আনন্দ উদ্রেককে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন বারবার। তিনি মনে করতেন জীবনযাপনকালে কবিতা ব্যবহার করেও আনন্দ পাওয়া যায়। একটা ভালো কবিতার যতদিন যায় তত ঔজ্জ্বল্য বাড়ে কারণ তা নব নব রূপে আসে, নব নব মাত্রায়, অর্থে। বিশ্বচরাচরের কত কিছু আবিষ্কার করে কবিতায় বলে যান একজন প্রকৃত কবি। সেই জন্যেই সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি। সকলেই আবিষ্কারক নন। সকলেই আমিতে পৌঁছাতে পারেন না। হিসাব মেলানো খুব কঠিন কাজ।

প্রকৃত কবির মধ্যে থাকে অন্তহীন প্রশ্ন, ফলে তাঁর মনোজগৎ অত্যন্ত গতিশীল হয়। প্রতি মুহূর্তেই তিনি বুঝতে পারেন ‘আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না’। মনোজগৎ গতিশীল হলে তিনি মেতে ওঠেন আবিষ্কারের নেশায়। তখন তিনি সমাজের সাধারণের কাছে নানা বিশেষণে বিশেষিত। সেসব বিশেষণ এখানে উল্লেখ না করাই ভালো। বিনয় মজুমদারকেও সেই সব বিশেষণে অনেক বিশিষ্ট কবিও বিশেষিত করেছিলেন।
আসলে জীবনের বাঁধাধরা ছকটিকে লাথি মেরে গুড়িয়ে দেওয়ার সাহসটি দরকার, তার জন্যে দরকার অন্য এক জীবন দর্শনের। ভিন্নতর জীবন ভাবনার। সেটি ছিল বলে তবেই না বিনয় প্রচলিত স্রোতের মানুষ নয়, গড়পড়তা নয়। তিনি একক আর সেই জন্যে তিনি আদি পিতার সঙ্গেও পাঞ্জা কষতে চান। হেঁতাল যষ্ঠিটি নিয়ে তিনি যেন মনসামঙ্গলের সেই চাঁদবেনে, একা হারিয়ে দিতে চান সব শক্তিকে।
সবাই তাঁর যে ব্যবহারকে পাগলামি মনে করেছে আসলে তা এক মহাজগৎকে ছুঁয়ে থাকা মনের কাজ। সমস্ত ছকের বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁর বহুকৌণিক দর্শনটিকে যাঁরা বুঝেছেন তাঁরা নিশ্চিত জীবনানন্দকে কিছুটা হলেও ছুঁতে পেরেছিলেন। আর সেটা যাঁরা পারেন তাঁদের দূরবীণটি যে খুবই শক্তিশালী তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
বাস্তব জীবনের প্রচলিত ছক জীবনকে নেড়েচেড়ে দেখার সুযোগ দেয় না।
মহাবিশ্বের মহাকাশ ফেঁড়ে নতুন কিছু এনে মানুষকে দেবার সুযোগ দেয় না।
মহাকল্পনার বাস্তব রূপায়ণের সুযোগ দেয় না। আসলে ছক ভাঙতে দরকার যে আত্মশুদ্ধি সেটি না থাকলে ইচ্ছেপাখির সহজ উড়াল হতে পারে না।
বিনয় হলেন সেই কবি, বাউলগানের সেই পাগল যে আমৃত্যু গবেষক যাঁর কাছে যৌনতাও এক ভয়ঙ্কর গবেষণার বিষয়। বিশ্বসংসারের গোপন গোপন সব সৃষ্টি প্রক্রিয়াকে তিনি গুরুবাদী বাউলার মতই নিয়ে এসেছেন মানুষের দরবারে, তা হয়তো আপাত যৌনভাষ মনে হলেও গভীর এক সংকেত বহন করে সেটি। তাই শেষ করি এই পংক্তি দুটি দিয়ে “ডালার প্রথমবার খাতাস্রাব যেই হয় সঙ্গে সঙ্গে সে ডালার নাচা প্রয়োজন/ নিয়মিত না নাচলে সেগুলোর মৃত্যুই হয় সেহেতু সে নাচে/ এবং সবাই তাকে নাচায় সাহায্য করে এটাই এ পৃথিবীর প্রচলিত রীতি”
এই পংক্তি তিনটি কত গভীর কথা বলে দিয়ে গেছে হে পাঠক গুপ্তবোধ থেকে যদি অনুভব করেন একদিন বোঝা যাবে এক প্রকৃত প্রকৃতি পাগলকে। যিনি আমাদের শুনিয়েছেন মহাশূন্যের মহাজাগতিক বিজ্ঞানের কথা। মৃদু গন্ধ পাওয়া যাবে মহাবিশ্বের। আলোর মৃদু মৃদু আওয়াজও আসবে কানে। বড় বিস্ময় তিনি আজও আমার কাছে। তিনি বিনয়… নির্বাচিত এক অসীম…. বিনয় মজুমদার
[ বানানবিধি ও মতামত লেখকের নিজস্ব]

email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।