14 Apr

পয়লা বৈশাখ,পুরোনো ক্যালেন্ডার ও পলেস্তারা খসা দেওয়াল

লিখেছেন:সুসমীর ঘোষ


SUSAMIR GHOSH KHOSHKHOBOR CARD

আমাদের ঘরে এখন আর কোনও ক্যালেন্ডার নেই। ফ্ল্যাট নামক থাকার জায়গায় প্লাস্টার খসিয়ে একটি পেরেক পোঁতারও অনুমতি নেই। ফ্ল্যাটে ওই ঝুলন্ত ক্যানভাসটির থাকার অযোগ্যতা নির্ধারণ করে একটা ঘোষণাপত্র প্রচার করে দেওয়া হয়েছে কবেই। এমনিতেই এখন আর পয়লা বৈশাখ বা ইংরেজি নতুন বছর এলে হাতে হাতে ক্যালেন্ডার ঘোরার চল নেই সেভাবে। একদিকে খরচের বহর আর অন্যদিকে ক্রেতার ক্যালেন্ডারের প্রতি অনীহা – কোনটা বছরভরের সঙ্গীটিকে প্রায় বিলুপ্তির পথে পাঠাতে চলেছে তা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার বিষয় হতে পারে।

তবে ছোটবেলার আমাদের ঘর থেকে  ক্যালেন্ডারের  ফিরে যাওয়ার কোনও উপায় ছিল না। বাংলার  যেকোনও প্রান্ত থেকে তো বটেই, এমনকি  রাজধানী দিল্লি বা সাবেক সোভিয়েতের মস্কো থেকে আসা ক্যালেন্ডারও শোভা বাড়াত আমাদের ঘরে।  সেই হরেকমাল পাঁচসিকের সময়ে হরেক রকম ক্যালেন্ডারময়ই ছিল আমাদের জীবন।

খুব ছোটবেলায় ১লা বৈশাখের প্রথম ক্যালেন্ডারটি আসত আমাদের বাঁধাধরা কাপড়ের দোকান থেকে। বৈশাখের সেই বিকেলে রোদের জ্বালাতন একটু কমলে পাউডার- টাউডার মেখে বাবার হাত ধরে হাজির হতাম বটতলার ‘দেশী বস্তু প্রতিষ্ঠানে’। আমাদের ছোট্ট শহরে সেই আলো ঝলমল দোকানে  আমাদের নেমতন্ন আছে দেখে ভারি আনন্দ হত। আরও আশ্চর্য  লাগত  ফুল মালা সাজানো  দোকানে হাসিমুখে অভ্যর্থনার বহর দেখে।

দেখতাম একজন মোটা মতন লোক মুখভর্তি  হাসি ঝুলিয়ে, হাত জুড়ে নমস্কার করেই চলেছেন। তিনিই ডেকে দিতেন বাবার নাম। নতুন খাতায় নাম তোলার জন্য  বাবা ‘এক টাকা’ এগিয়ে দিতেই চলে আসত বড় মিষ্টির প্যাকেট আর ক্যালেন্ডার।পরে জেনেছি উনিই দোকানের মালিক।সব কাস্টমারের নাম মুখস্ত। আজ যে হালখাতা। পুরোনো ক্রেতাকে হাসি আর মিষ্টির প্যাকেটে মাত করে আরও একবছরের জন্য নিশ্চিত করার দিন।ওই টোকেন ‘একটাকা’ তো নিয়ম মাত্র।

সে প্যাকেটে আর ক্যালেন্ডার পেয়ে আনন্দ আর ধরত না। বাড়িতে মা, দিদি, দাদা অপেক্ষা করে আছে সেসবের জন্য। প্রথমেই কী ক্যালেন্ডার করেছে, কী ক্যালেন্ডার করেছে বলে খুলে ফেলা হত ওই কাগজের রোল। সাবধান থাকতে হত টিনজাতীয় উপরের ক্লিপটি নিয়ে।একটু বেচাল  হলেই খোঁচা খেতে হত আঙুলে। ক্যালেন্ডার  খোলার মুহূর্তে অভিজ্ঞতার  নিরিখে বাবা-মা বলত – কালি ঠাকুরের ছবিই হবে নিশ্চয়। আর হতও তাই, দেশী বস্ত্র প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে নানা ভ্যারাইটির কালি  ঠাকুরের ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডার হাজির হয়ে যেত আমাদের বাড়িতে।

তবে  বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে ক্যালেন্ডার প্রাপ্তির সেই ছিল শুরু। এরপর একে একে আসত  ডায়মন্ড জুর্যেলার্স, বাস্তার মোড়ের বইয়ের দোকান, পাড়ার মুদির দোকান ইত্য্যাদি জায়গা থেকে। আমাদের সব জায়গাতেই ছিল খাতায়  কেনাকাটার চল। বাবা মাসের প্রথমে মাইনে পেলেই সে সব শোধ হত একটু একটু করে।এই সব দোকান, ভালবাসার ভাণ্ডার থেকেই আসত নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ কালেন্ডার।তবে তার সিংহভাগই দখল করে থাকত ঠাকুর দেবতার ছবি।

তবে পয়লা বৈশাখের বিকেল বা সন্ধ্যেতেই শেষ নয়,পরেও নানা জায়গা থেকে পথ ঘুরে আসতেই থাকত ক্যালেন্ডার। মিষ্টির প্যাকেট আসা ২য় দিনের পর বন্ধ হয়ে গেলেও কখনও কখনও জ্যৈষ্ঠ বা আষাঢ় মাসেও কারোর কারোর হাত ঘুরে আমাদের বাড়িতে হাজির হত সেই আশ্চর্য কাগজের রোল।

কিন্তু এত ক্যালেন্ডার  নিয়ে  আমরা করতাম কী? আগেই বলেছি বাড়িতে অযাচিতভাবে ক্যালেন্ডার হাজির হয়েছে আর আমরা তা ফিরিয়ে দিয়েছি তা কখনও হত না। আমাদের সেই ভাড়াবাড়িতে আজকের মত দেশলাই বাক্স মার্কা বন্দোবস্তো ছিল না। পুরোনো খিলানওয়ালা, পায়রা, চড়াই আর কাক ঘোরা বাড়িতে ঘরের অভাব ছিল না।ফলে ক্যালেন্ডারের স্থান হত যথাযোগ্য মর্যাদায়।

অর্থাৎ ক্যালেন্ডার লাগানোর জন্য যা দরকার-সেই স্পেসের অভাব ছিল না। বাথরুম আর রান্নাঘর বাদে ক্যালেন্ডার ছিল সর্বত্রগামী। এছাড়া সর্বত্র ক্যালেন্ডারবাজির আর একটা বড় যুক্তি ছিল। তা হল পলেস্তারা খসা দেওয়ালগুলোয় পোশাক পরানো।  আমাদের মোটা দেওয়ালের বাড়িতে ইটের উপর চুনকামের প্রলেপ খসে গিয়ে বালি বের হয়ে নানা দেশের ম্যাপ তৈরি হত। সেই খানাখন্দ, উপত্যকা চাপা দিতেই  দেওয়াল গুলোয় শোভা পেত দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, শ্রীকৃষ্ণ থেকে শিব এমনকী ছিন্নমস্তার ছবি সম্বলিত নানা ক্যালেন্ডার।এরপরেই ক্যালেন্ডারের ছবির বিচারে প্রাধান্য পেতেন শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, মা সারদা। সংখ্যার বিচারে রবীন্দ্রনাথ বা  নেতাজি  কিছুটা পিছিয়ে থাকতেন।

তবে কিছুই যেত না ফেলা। আমাদের  ক্যালেন্ডারের  সারি অনুযায়ী একটার নীচে রাখা থাকত আর একটা। তার নীচে আর একটা। তার নীচে আরও একটা। আর বাড়ানো উচিত হবে না। অবশ্যই এরপরে থাকত আমাদের নোনাধরা দেওয়াল। তবে এরপরেও একটা ব্যাপার ছিল। মা-বাবার পছন্দের ভাল ক্যালেন্ডার  চলে যেত  ফটো বাধাইয়ের দোকানে। এভাবে আমাদের ঘরে শুধু  ক্যালেন্ডার নয়  বাঁধানো  ঠাকুর দেবতার ছবিরও অভাব ছিল না। বাঁধাই হয়ে এসে সেসব স্থান পেত  ক্যালেন্ডারগুলোর অব্যবহিত উপরেই।

বাঁধানো  ঠাকুর দেবতার ছবির বাইরে ব্যাতিক্রম হিসেবে ছিল একটা স্যামুয়েল  হ্যানিম্যান আর একটা শরৎচন্দ্রের ছবি। বাবা হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস করতেন, ফলে হ্যানিম্যানের ছবির যৌক্তিকতা খুঁজতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছেড়ে কেন শরৎচন্দ্র ফ্রেমবন্দি হয়ে এসেছিল তার ব্যাখ্যা জেনেছিলাম পরে। যদিও আমাদের পাঠ্য বইয়ে তখন ‘ছিনাথ বহুরূপী’র প্রবল উপস্থিতি ওই পাকাচুলের লেখকের প্রতি কেমন যেন আকর্ষণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল।একদিন পাড়ারই এক  কাকিমা ক্যালেন্ডার ও বাঁধানো  ছবির এমন বাহারি আয়োজন  দেখতে দেখতে অড ম্যান আউট  শরৎচন্দ্রের ছবির সামনে দাড়িয়ে মাকে প্রশ্ন করলেন উনি  কি আপনার শ্বশুরমশাই? মা জিভ কেটে বললেন – আরে না না উনি বিখ্যাত লেখক।একটা ভাল  ক্যালেন্ডার এসে যাওয়ায় ওর (পাশে ছিলাম আমি) বাবা তা বাঁধিয়ে ফেলার লোভ সামলাতে পারে নি।

আমাদের পুরোনো ভাড়াবাড়িতে সবচেয়ে আলোচিত ক্যালেন্ডার ও তা থেকে বাঁধানো ছবি ছিল ব্রম্ভার বিশ্বরূপ দর্শন। প্রথমে সেই বিশাল ডাউস ক্যালেন্ডার দেখতে লোক দাঁড়িয়ে যেত। আত্মীয় স্বজনকে বাবা ওই ছবি থেকেই বিশ্ব সৃষ্টির কারবার বোঝাতেন।পরে তা যখন বিরাট আকার নিয়ে বাঁধিয়ে এল তখন  বিশ্ব সৃষ্টির ব্যখ্যা দেওয়া ও  শোনাটা পার্মানেন্ট হয়ে গেল। বাবা অফিস গেলে সে ব্যাখ্যা আমি দিতাম। এত  ঠাকুর দেবতার মাঝে  থেকেও পরবর্তীকালে  কীভাবে যে  নাস্তিকতার পাঠে ঢুকে পড়লাম  সে গল্প পরে হতেই পারে। তবে ছোটবেলার সেই ক্যালেন্ডারময় দিনগুলোর জন্য আজ মনকেমন করে বড়ই। আজ পথ ভুলেও কোনো ক্যালেন্ডার হাজির হয়ে গেলে পাকানো অবস্থাতেই তার ঠাঁই হয় খবরের কাগজের গাদায়, একসময় কাগজ ওয়ালায় ঝোলায় পুরে দেওয়া হবে এই লক্ষ্যে। আজ এইরকম একটা ক্যালেন্ডারের প্রায় বিলুপ্তি  যাত্রার পিছনে আমারও হাত লেগে থাকল এটা ভেবে খারাপ লাগে।

GALPER SAMAY 2026 BOISAKH

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ