11 Oct

শতায়ুর গর্ব, আমার আকাশবাণী

শতায়ুর গর্ব, আমার আকাশবাণী/ জাগরণ চট্টরাজ / গল্পের সময়

আমার আকাশবাণীতে প্রথম পা রাখা ১৯৮৪ সালের ১৫ই এপ্রিল। সেদিনটার কথা আমার এখনও মনে আছে। যুববাণীর ঘরে নিয়ে গিয়ে প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ প্রদীপ মিশ্রের সঙ্গে আমায় আলাপ করিয়ে দিলেন আমার সাংবাদিক বন্ধু প্রদীপ দে। বললেন প্রদীপদা, ও জাগরণ, আমার বন্ধু টুকটাক লেখালেখি করে। ওকে যদি কিছু ওবি প্রোগ্রামের জন্য কাজে লাগানো যায় একটু দেখুন না। তার আগে বলে রাখি ওবি (OB) প্রোগ্রাম মানে আউট ব্রডকাস্ট প্রোগ্রাম। মূলত স্টুডিওর বাইরে থেকে রেকর্ডিং করে এনে সেটাকে বড় স্পুল টেপে ট্রান্সফার করে তার সঙ্গে স্ক্রিপ্টিং করে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মাপে এডিটিং করার পর তাকে প্রচার যোগ্য করে তোলা। তো যাই হোক এইভাবেই শুরু এবং  ধীরে ধীরে আকাশবাণীর সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে পড়া। আর এরপর দিনে দিনে বাড়তে থাকল আমার কাজের পরিধি। যুববাণী থেকে গেলাম বাংলা কথিকা বিভাগে সেখানেও নানান ধরনের ইন্টারভিউ নানান ধরনের অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মধ্যে দিয়ে আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেকখানি পূর্ণ হল। হাত পাকালাম অডিও এডিটিং-এ। একটি নির্দিষ্ট সময় বন্ধনীর অনুষ্ঠানকে কিভাবে আরো আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, কিভাবে আরো শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানো যায়।

ঠিক এই সময়ই মানে ১৯৯০ সালের  মাঝামাঝি দেশের জাতীয় সংহতির ওপর একটি পাঁচ মিনিটের সিরিজ প্রোগ্রাম তৈরির ভার পড়ল আমার ওপর। যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সবার আগে ভারত’। সপ্তাহে তিন দিন সেই প্রোগ্রাম সম্প্রচারিত হবে সকাল আটটায়। সেই প্রোগ্রামে থাকতে হবে বাইরে থেকে রেকর্ড করে আনা সেলিব্রেটিদের ইন্টারভিউ। তৈরি করা হলো সেই প্রোগ্রামের সিগনেচার টিউন। আমার এখনও মনে আছে সেই প্রোগ্রামের প্রথম সেলিব্রেটির ইন্টারভিউ ছিল বিশ্ব বিখ্যাত সেতার বাদক রবি শংকরের। তখন উনি কলকাতায় কয়েক দিনের জন্য এসেছিলেন। একজন স্বনামধন্য তবলা শিল্পীর মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে যাওয়া হল রবিশঙ্করের কাছে। শুরুটা তো এইভাবেই হলো তারপর একে একে আরও অনেক যশস্বী মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি। তবে এই ‘সবার আগে ভারত’ করতে গিয়ে যে দুজন মানুষের সঙ্গে আমার যোগাযোগ করতে গিয়ে দুটি মজার ঘটনা ঘটেছিল সেটাই এই পর্বে আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। সরাসরি চলে আসি প্রথম ঘটনায় –

হ্যালো!

নমস্কার, আনন্দবাজার পত্রিকা ।

নমস্কার, আমি অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে জাগরণ চট্টরাজ বলছিলাম,একটু কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলা যাবে?

গল্পের সময়

ওপাশ থেকে উত্তর এলো, একটু অপেক্ষা করুন, দিচ্ছি।

একটু পরেই সেই চেনা জলদ গম্ভীর গলা ভেসে এলো, হ্যালো! শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলছি।

হ্যাঁ শক্তিদা আমি আকাশবাণী থেকে বলছিলাম, আমাদের একটা অনুষ্ঠান ‘সবার আগে ভারত’ মানে ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশনের ওপরে সেই জন্য আমরা একটু আপনার ছোট্ট একটা ইন্টারভিউ নিতে চাইছিলাম। বেশি না জাস্ট পাঁচ মিনিটের জন্য। টেলিফোনের ওপার থেকে উত্তর এলো ঠিক আছে, “কাল দুপুর তিনটের সময় চলে আসুন”।

পরের দিন হাতে টেপ রেকর্ডার নিয়ে হাজির হলাম আনন্দবাজার অফিসের রিসেপশনে, রিসেপসনিস্টকে নিজের পরিচয় দিয়ে শক্তিদার কথা বলতেই বললেন যান থার্ড ফ্লোরে চলে যান। আমি তো মহানন্দে লিফটে করে চলে গেলাম যথাস্থানে,  গিয়ে দেখি এ যেন চাঁদের হাট। একদিকে বসে আছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, একদিকে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় অন্যদিকে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায। আছেন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী আর ছোট্ট একটি কাঁচের ঘরের মধ্যে বসে লেখালেখি করছেন দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ। অবশ্য এ প্রসঙ্গে বলে রাখি এর আগেও আকাশবাণীর প্রতিনিধি হয়ে আমি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী,  শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এদের ইন্টারভিউ করেছিলাম। কিন্তু তখন একসঙ্গে এতজনকে দেখা যায়নি। এই প্রথম দেখলাম একেবারে চাঁদের হাট।

তো যাই হোক প্রসঙ্গে আসি। ডেস্কে গিয়ে দেখি শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর সিটে নেই। আমি ভাবলাম তিনি হয়তো কোথাও কাছাকাছি গেছেন চলে আসবেন। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর যখন তাঁর দেখা পেলাম না তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ডেস্কের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম সুনীলদা আমি আকাশবাণী থেকে এসেছি শক্তিদা কি এসেছেন? উত্তরে সুনীলদা বললেন হ্যাঁ শক্তি তো এইমাত্র বেরিয়ে গেল, আমি বললাম আসলে ওনার সঙ্গে একটা ইন্টারভিউ এর ব্যাপারে টেলিফোনে কথা হয়েছিল। তখন সুনীলদা বললেন দেখুন হয়তো শক্তি ভুলে গেছে। আপনি এক কাজ করুন কাল টেলিফোন করে তারপর আসুন। অগত্যা আর কি করা যাবে বিফল মনোভাব নিয়ে ফিরে এলাম আকাশবাণীতে। পরের দিন আবার ফোন করলাম, প্রথমে উনি দুঃখ প্রকাশ করে বললেন আমি একটা জরুরী কাজে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর বললেন ঠিক আছে আজ তিনটের সময় চলে আসুন। যথারীতি সেদিন আবার তিনটের সময় হাজির হলাম আনন্দবাজার অফিসে। রিসেপশনে বলে উপরে উঠলাম, গিয়ে দেখি আগের দিনের মতো সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সিট ফাঁকা। এবার আমার আবার হতাশ হওয়ার পালা। কিন্তু বিশ্বাস করুন মনে একটুও রাগ হলো না। কারণ কি জানেন, আমার এক কবি বন্ধু কোন এক সময় বলেছিলেন যে কবি সাহিত্যিকদের উপর কোনদিন রাগ করতে নেই। কারণ তারা সৃষ্টিশীল মানুষ। তাদের মনের হদিশ পাওয়া খুব কঠিন। এই কথা ভাবতে ভাবতে ডেস্ক ছেড়ে বেরিয়ে আসবো ঠিক সেই সময় দেখি একটি কম বয়সী ছেলে শক্তিদের টেবিলে কি একটা কাগজ রেখে গেলো। কি মনে হলো হঠাৎ করেই তাকে জিজ্ঞেস করলাম, শক্তিদাকে দেখেছেন! তিনি মুচকি হেসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আপনি শক্তিদাকে খুজছেন! আমি বললাম হ্যাঁ ভাই। তিনি আমায় সঙ্গে সঙ্গে বললেন আপনি এক কাজ করুন আমাদের অফিসের যে পিছনের দিকের সিঁড়িটা আছে সেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে যান নেমে গিয়ে দেখবেন ওখানে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট আছে। ওখানে যান পেয়ে যাবেন।

আমি শুনেই এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে ছুটলাম ওই সিঁড়ির দিকে। হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে সামনের মেন গেট দিয়ে বেরিয়ে উপস্থিত হলাম কলকাতার সেই বিখ্যাত চাইনিজ রেস্টুরেন্টে। ঢুকে দেখি ঠিক রেস্টুরেন্টের মাঝ বরাবর একটি টেবিলে হাতে সিগারেট আর গ্লাসে পানীয় নিয়ে বসে আছেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। নিজের পরিচয় দিতেই বললেন, ও বসুন। তারপর আমি বসতেই আমাকে বললেন কি খাবেন বলুন, হুইস্কি না …

আমি একটু ইতস্তত করে বললাম না না আমি কিছু খাব না। উনি বললেন তাই হয় নাকি, বলেই ওয়েটারকে বললেন একটা গ্লাসে কোলড্রিংস দিতে। তারপরেই আমাকে বললেন হ্যাঁ বলো তোমার কি বলার আছে?

গল্পের সময়

আমি বললাম, শক্তিদা আমাদের একটা অনুষ্ঠান হয় যার নাম ‘সবার আগে ভারত’ মানে জাতীয় সংহতির নিয়ে, সেই নিয়েই আপনার একটু মতামত জানতে চাইছিলাম। রেকর্ডার অন করতেই শক্তিদা বলতে শুরু করলেন, আমি তোদের মতন সবার আগে ভারত বলি না, আমি বলি সবার জন্য ভারত।

শুরুটা এই ভাবেই হলো। কথা চলছেই, আমার রেকর্ডারের ৯০ মিনিটের ক্যাসেটের দুদিকই ফুল হয়ে গেছিল ওনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বা সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে। উঠে এসেছিল নানান প্রসঙ্গ। ঠিক এই ভাবেই শক্তিদার সঙ্গে প্রথম আমার দেখা প্রথম তার সাক্ষাৎকার নেওয়া।

এরপরের একটি ঘটনা আরো চমকপ্রদ। সেটা সলিল চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার ঘটনা। সে ঘটনা তোলা রইলো পরের পর্বের জন্য।

[ মতামত ও বানানবিধি লেখকের নিজস্ব] 

শতায়ুর গর্ব আমার আকাশবাণী / জাগরণ চট্টরাজ

 

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ ।