21 Jun

হোমওয়ার্ক

লিখেছেন:বিষ্ণু বিশ্বাস


 

সমাজের নানাবিধ দুরাচার, অনাচার, ব্যভিচার রুখবার জন্য ইদানিং আমাদের অনেককেই ভয়ংকর মরিয়া হয়ে উঠতে দেখছি। ভরদুপুরে মনের হরষে মোমের বাতি জ্বালানোর শুভ সংস্কৃতি কিছুদিন আগেও তেমন চোখে পড়েনি। চারপাশের এত অধঃপতন আর অবক্ষয়ের মধ্যে এটা নিঃসন্দেহে এক অতীব ইতিবাচক লক্ষণ বলা যেতে পারে।

কাগজে দেখছিলাম ঝাড়গ্রাম না মাড়গ্রাম কোথায় যেন পুলিশ গ্রামবাসীদের ডেকেডুকে এনে ফুটবল খেলাচ্ছে। পুলিশকে চিরটিকাল শুধু ব্যাটন হাতে এন্তার পেটাতেই দেখেছি। এখন মুরলীধর পুলিশের ছবি দেখে মনটা ভরে গেল।

গত বছর ১৪-ই ফেব্রুয়ারির ঠিক আগে একটি প্রবল প্রতাপান্বিত রাজনৈতিক দলের স্থানীয় মোড়লরা সাফসুরোৎ বলে দিল, ভ্যালেনটাইন ডে-তে কোনোরকম অনাচার তাঁরা সহ্য করবেন না। একটি ছেলেকে আর একটি মেয়েকে আড়ালে আবডালে দেখলেই পাকড়াও করা হবে এবং তারপর অপরাধের গুরুত্ব বিচার করে উঠবোস অথবা নাকখত কিংবা দুটোই। সমাজকে শুদ্ধ করার জন্য কত বড় দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন এই মোড়লগণ তা ভাবলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। সত্যিই তো, একটি ছেলে আর একটি মেয়ে আড়াল আবডাল পেলেই মহা খিটকেল। ভারতীয় সংস্কৃতির বিরোধী কোনো কাজ শুরুতেই রোখা দরকার। ভোট ফোটের ক্যাচাল সামনে ওনারা যে এতখানি গুরুদায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিচ্ছেন – সেটি কম কথা নয়।

খবরের কাগজে পড়লাম উত্তরপ্রদেশ হরিয়ানার খাপ পঞ্চায়েতের কথা। খাপ ! বাপরে বাপ ! কী দাপট ! বেজাত, বেধর্মে আশনাই একেবারেই চলবে না। ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী। বেচাল দেখলেই মাথা ন্যাড়া করে ঘোল ঢালো, নয়তো বেত্রাঘাত।

আমাদের রাজ্য এসব সমাজ শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ায় অনেক পিছিয়ে থাকলেও একেবারে পিকচারে নেই এমনটি বলা যাবে না। রিজওয়ানুর রহমান কেসে খোদ লালবাজারই নেমে পড়ল শুদ্ধিকরণে। আর ওদিকে বুদ্ধিজীবীদের মোমবাতি। কোথাও এতটুকু ফাঁক রইল না। দুদিক থেকে জমজমাট শুদ্ধিকরণ চলল।

আর যে সাধুসন্ত মোহান্ত ভগবৎ – অন্ত প্রাণ ঊর্ধ্বমার্গের মানুষেরা এতদিন ঈশ্বর সাধনায় নিয়োজিত ছিলেন তাঁরাও মহাসমারোহে শুদ্ধিকরণে নেমে পড়েছেন। সেই গেঁড়োয় পড়ে আমার যে কী দিব্যজ্ঞান লাভ হয়েছিল, তাই নিয়েই এবারকার জালি গল্প।

অনেক দিন কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। হাতে পায়ে জং ধরে যাওয়ার উপক্রম। পদ্মরানি বলল, পাহাড় সমুদ্র অনেক হল – চলো এবারে কোথাও একটু সাধুসঙ্গ করে আসি। প্রথমে ঠিক হল কেদার–বদ্রি, তারপর বৃন্দাবন–মথুরা, তারপর পুরী। গড়িমসি করতে করতে শেষপর্যন্ত কোথাও হল না। অবশেষে ঠিক হল হাতের কাছেই আরশিনগর মায়াপুর গেলে বেশ হয়। খরচা কম অথচ দেদার সাধুসঙ্গ আর সেই সাথে নিরালা নিভৃতে পুরোনো পদ্মরানিকে নতুন করে পাওয়া।

একদিন সন্ধের মুখে মুখে দুজনে প্রথমে ট্রেনে নবদ্বীপ তারপর রিক্সায় বড়ালঘাট, সেখান থেকে খেয়াতরিতে গঙ্গা – জলঙ্গি পার হয়ে মায়াপুরে এক বিখ্যাত – আখড়ায় গিয়ে উঠলাম। (নাম বলা যাবে না – কেস খেয়ে যাওয়ার ভয় আছে)। আমার এক পরম হিতাকাঙ্ক্ষী সহকর্মী আমাকে এই বিশেষ আখড়ায় থাকবার জন্য পীড়াপীড়ি করেছিল। এখানকার সন্ধ্যারতি নাকি খুবই আকর্ষণীয় আর গেস্টহাউসগুলিও ভারি চমৎকার। বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে গঙ্গার অপরূপ শোভা দর্শন করলে মনের যাবতীয় কলুষতা দূর হয়ে যাবে। আখড়ার সাধুবাবা ও সাধ্বীমায়েদের ব্যবহারও অতিশয় প্রেমময়। সকাল সন্ধ্যা যখনই দেখা হবে ‘জয় গৌর জয় নিতাই’ ধ্বনির সুমধুর আন্তরিকতা প্রাণ মন জয় করে নেবে।

আমার এই হিতাকাঙ্ক্ষীটির সদুপদেশ এবং উৎসাহবাণীতে প্রাণিত হয়েই আমার এই বিখ্যাত আখড়ায় পদার্পণ। নচেৎ আধুনিক মায়াপুর ও সাবেক নবদ্বীপধামে চলনসই হোটেল বা লজের যোগান নেহাৎ কম নয়।

আখড়ার অফিস ঘরটিতে একজন মাঝারি বয়স্ক গেরুয়াধারী প্রভু মহারাজ একটি জাবদা রেজিস্টারে মনোযোগ সহকারে কী যেন লিখছিলেন। আমি দু হাত জড়ো করে কপালে ঠেকিয়ে ভক্তিভরে নমস্কার করলেও উনি নমস্কার তো দূরের কথা, একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। শুধু আমার দিকে একবার আর পদ্মরানির দিকে একবার সন্দেহজনক দৃষ্টিপাত করেই পুনরায় নিজের কাজ করতে লাগলেন।

পদ্মরানি ধর্মপ্রাণা মহিলা। নিচু হয়েই প্রভুর চরণ স্পর্শ করে নিজের মাথায় ঠেকাল। এবারো কোনো ভাবান্তর নেই। ভাবলাম সাধুসন্ত মানুষ – জাগতিক বিষয়ে উদাসীন। সদাসর্বদা ভগবদ্‌ চিন্তায় মগ্ন, তাই এই ভোলাভালা আচরণ। নিজের কাজ করে চলেছেন অথচ গভীর ভাবসমাধিতে ডুবে আছেন। রামকৃষ্ণদেবেরও নাকি এরকম হত। এইসব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাপার স্যাপার আমাদের মতো ভোগী পাপাচারীর জানার কথা নয়।

অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও যখন কিছুই বললেন না তখন আমি গলা খাঁকারি দিয়ে নরম করে বললাম, বাবা, আমরা দুটো দিন এখানে থাকব বলে এসেছি বাবা। ভক্তজনদের জন্যে যদি একটু ব্যবস্থা করেন –

এইবারে প্রভু একবার অপাঙ্গে আমায় মেপে নিয়ে আবার রেজিস্টার লিখতে লাগলেন।

পদ্মরানি ভক্তিগদগদ গলায় বলল, প্রভু ! প্রভু গো ! একটু কৃপা করে যদি আপনার চরণপদ্মে এ দুজনকে ঠাঁই দেন –

অতঃপর কলম বন্ধ করে প্রভু মহারাজ আমাদের দিকে ফিরলেন। সাধুসন্তদের চোখ মুখ এত কঠিন কঠোর হয় আগে জানতাম না। একবার একটি খুচরো পাপের জন্যে তেহট্ট থানার পুলিশ আমাকে ধরেছিল। অনেককাল আগের কথা। এখনো বড়বাবুর চোখের চাউনির কথা মনে পড়লে শরীর হিম না হলেও এক ধরনের শিরশিরানি অনুভব করি।

কিন্তু সে তো থানা ! চোখের আগুনে – চাউনি, দাঁত কিড়িমিড়ি আর দু – চারটে চড় – থাপ্পর – এ তো জলের মত স্বচ্ছ আর দুধের মতো খাঁটি।

তাই বলে সাধুসন্তদের আখড়ায় এসেও সেই রকম দৃষ্টির সামনে পড়তে হবে আগে থেকে ঘুণাক্ষরে আঁচ করতে পারিনি বলে চোখে কেমন ঘোর লেগে গেল। ঘোর যে অচিরেই ছাড়িয়ে দেবে তখনো আন্দাজে আসেনি।

ভারি গলায় অবিকল যেন তেহট্ট থানার বড়বাবুর স্বর শুনতে পেলাম এতদিন পর।

কোথা থেকে আসা হচ্ছে ?

আজ্ঞে শ্রীরামপুর থেকে। জেলা হুগলী।

উত্তরটি আমিই দিয়েছিলাম। প্রভু মহারাজ এবার পদ্মরানির দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে জানতে চাইলাম, আর তুমি ? তুমি কোত্থেকে আসছ, অ্যাঁ ?

থতোমতো খেয়ে তোতলাতে লাগল পদ্মরানি। আ আ আমি ? আ আমি তো ও ও ওর …

প্রভু মহারাজের গলায় হঠাৎ সিংহ বিক্রম। আমার সঙ্গে চালাকি ! আজ তেরো বছর ধরে আমি এখানে আছি। প্রতিদিন এরকম তিন চারটে কেস আমি হাতেনাতে ধরি। চোখের চাউনি দেখেই আমি ধরতে পারি।

পদ্মরানি কোনো কিছু কূলকিনারা না পেয়ে আনকোড়া বোকার মতো জিজ্ঞাসা করল, কী ধরতে পারেন প্রভু ?

কী ধরতে পারি ? একটু পরেই টের পাইয়ে দিচ্ছি কী ধরতে পারি।

আমি তো আর পদ্মরানির মতো মুরুক্ষু নই। সাতঘাটের সাত কিসিমের জল খেয়ে এতদূর উঠে এসেছি। প্রভু মহারাজের কথার ভাঁজ বুঝে নিতে দেরি হওয়ার কথা নয়। ভুল ভাঙাবার চেষ্টায় কান পর্যন্ত হাসি টেনে বললাম, না না না না না, আপনি যা ভাবছেন তা নয় কিন্তু, আমরা রীতিমতো ধর্মসাক্ষী রেখে –

উনি আমার কথায় কোনো আমল না দিয়ে হাঁক পাড়লেন, কানাই।

হাঁকের বহর দেখেই বুঝে গেলাম এ কানাই আর যেমনই হোক, খুব বংশীবদন টাইপের হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

গেরুয়া খেঁটো ধুতিপরা দশাসই চেহারার কানাই আসতেই প্রভু মহারাজ বললেন এ দুটোকে নিয়ে যা। এগারো নম্বর প্রশ্নপত্রটা দিবি। সময় পনেরো মিনিট।

রীতিমতো পরীক্ষায় বসতে হল। পনেরো মিনিটে পনেরোটি কোশ্চেন। পদ্মরানি অন্য ঘরে। কানাই স্যার খুব কড়া ধাতের ইনভিজিলেটর। অনেকটা আমার ইস্কুলের বঙ্কু স্যারের মতো। পকেটে কাগজপত্র যা ছিল সব কানাই স্যারের কাছে জমা দিয়ে দিতে হল। পই পই করে বলে দিল প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর বাথরুম টাথরুমের নাম করে মোটেই বাইরে বেরুনো চলবে না।

প্রথম দিকে খুব টেনশানে ছিলাম। কিন্তু প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর আমাকে আর কে দেখে ! বারো মিনিটের মধ্যে পনেরোটি প্রশ্নের উত্তর ঝপাঝপ লিখে খাতা জমা দিয়ে দিলাম। বর্তমান বাসস্থান (পুরো ঠিকানা সহ), বাবার নাম, পেশা, স্বামী / স্ত্রীর পেশা, বিয়ের তারিখ, কটি ছেলেমেয়ে, কোন ক্লাসে পাঠরত / রতা, শ্বশুর মশায়ের নাম ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্ন আমার কাছে প্রায় জলভাত মনে হল।

পরীক্ষা দিয়ে খোশমেজাজে বেরিয়ে এলাম। ক্লাস সেভেন পড়ার সময় একবার এইরকম সেন্ট পারসেন্ট অ্যানসার করেছিলাম। তারপর এতদিন পরে আবার।

একটু পরে পাশের ঘর থেকে পদ্মরানি বেরিয়ে এল। এক গৈরিক বসনধারী অল্পবয়সী মহিলা ইনভিজিলেটর উত্তরপত্র এনে কানাই – এর হাতে তুলে দিল। কানাই উল্টেপাল্টে দেখে মহাবিজ্ঞের মতো মাথা নাড়তে নাড়তে প্রভু মহারাজের কাছে জমা দিতে গেল।

পদ্মরানির মুখ কালো। দেখেই বুঝলাম পরীক্ষা ভালো দিতে পারেনি। আমি ফার্স্টবয়ের মতো ফুরফুরে মেজাজে পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই ভেঙে পড়ল।

বিয়ের তারিখটা কিছুতেই মনে পড়ছিল না। সাতই ফাল্গুন আমি জানি কিন্তু ইংরিজিতে ফেব্রুয়ারির একুশ না বাইশ কিছুতেই ঠিক করতে পারলাম না।

ইংরিজিতে যখন এতই কাঁচা তখন বাংলায় লিখলেই তো পারতে !

বাংলায় যে আবার সালটা মনে নেই। ইংরিজিতে ১৯৯৮ – সেটা স্পষ্ট মনে আছে কিন্তু বাংলায় যে তেরোশো কত কে জানে !

আমার এসব সমস্যা নেই। কনফিডেন্টলি ফুল অ্যানসার করে এসেছি। মেজাজটি এতক্ষণ বোমকে ছিল। এখন খোলাতাই হয়েছে। ফস করে একটি সিগারেট ধরিয়ে ফেললাম। একটি টান দিয়েছি কি দিইনি অমনি কোথা থেকে এক ন্যাড়ামাথা সাধু সপ্তম সুরে গালি পাড়তে পাড়তে তেড়ে এল। গালি মানে আমাদের টাইপের কিছু নয়, শুধু ‘জয় গৌর জয় নিতাই’। গলার রেঞ্জ দেখেই বুঝলাম গালিই দিচ্ছে। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই খপ করে আমার কলার চেপে ধরে বলল, জয় গৌর, এখানে সিগারেট ধরালি কেন বল ?

আমি তাড়াতাড়ি সিগারেট ফেলে দিয়ে বললাম, বুঝতে পারিনি বাবা। ন্যাড়া মাথার রোখ তাও যায় না। বলল, আর একবার যদি দেখি, মারব পাচায় এক … জয় গৌর, জয় নিতাই।

পনেরো কুড়ি মিনিট বাদে প্রভু মাহারাজের ঘর থেকে ডাল এল। কানাই এসে এমন চোখ মটকে ডাকল যে বুঝে গেলাম পদ্মরানি নির্ঘাৎ পাশ করতে পারেনি। আমি মাথা উঁচু করে প্রভু মহারাজের ঘরে ঢুকলাম। পিছনে পিছনে কাঁচুমাচু পদ্মরানি।

বলেছিলাম না দেখলেই সব বুঝতে পারি ? কী ? মিলল তো ?

পদ্মরানির হয়ে আমি সাফাই দেওয়া চেষ্টা করি।

বিয়ের তারিখটা লিখতে আমার ওয়াইফ একটু হিসেবের গোলমাল করে ফেলেছে বাবা। আসলে বাংলা তারিখ মেনে আমরা বিবাহ বার্ষিকী পালন করে থাকি। এখানে ইংরিজিতে লিখতে গিয়েই কিঞ্চিৎ ভুলচুক হয়ে গেছে। এইটুকু আপনাকে ক্ষমা করে দিতে হবে প্রভু।

আরে বাবা বিয়ের তারিখ নিয়ে কে বলছে ? বিয়ের তারিখ একদিন দুদিন এদিক ওদিক হয়ে যেতেই পারে। সেটা এমন কিছু নয়। অবশ্য দুজনেই তো দেখছি এখানে বাইশে ফেব্রুয়ারি উনিশশো অট্টআশিই লিখেছ। ঠিকই তো আছে।

পদ্মরানির মুখে এতক্ষণে হাসি ফুটল। কিন্তু প্রভু মহারাজের মুখের কাঠিন্য, দৃষ্টির খরতা হঠাৎ বেড়ে গেল। পদ্মরানিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ছেলে কোন ক্লাসে পড়ে ?

কেন ? ক্লাস সিক্স, আমার ছেলে কোন ক্লাসে পড়ে আমি জানব না ? ক্লাস সিক্স, সেকশন বি, রোল নাম্বার থার্টি ফোর।

খেয়েছে ! আমি প্রমাদ গণি। আমি তো ক্লাস সেভেন লিখে এসেছি। কেন জানিনা আমার মনে হল শিমূল ক্লাস সেভেনে উঠে গেছে।

আমার দিকে এবার প্রভু মহারাজের দৃষ্টি। সে দৃষ্টিতে আগুনের হলকা।

আর এই যে চাঁদু ! তোমার পুত্রবর কোন ক্লাসে পড়ে বাবা ?

আমি কোৎ করে একটা ঢোক গিলে বললাম, আজ্ঞে সামনের বার ক্লাস সেভেন হবে।

বুঝলাম। সেইজন্যে তুমি ক্লাস সেভেন লিখেছ। তা ক্লাস ফাইভ লিখলেও তো চলত বাবা। গতবার তো ক্লাস ফাইভেই ছিল

আমি কী বলি কী বলি ভাবতে ভাবতেই প্রভু মহারাজের বাজখাঁই গলায় গোটা আখড়া কেঁপে উঠল।

কানাই, এই নষ্টচরিত্র দুশ্চরিত্রটাকে সাত নম্বর ঘরে নিয়ে যা। কোনো চাদর বালিশ দিবি না। কাল সকালে থানায় ফোন করে মেজোবাবুকে খবর দিবি আমার নাম করে। জয় গৌর জয় নিতাই।

কানাই যখন আমার জামা খিঁমচে ধরে নিয়ে যাচ্ছে তখন কানে এল প্রভু মহারাজের অপূর্ব প্রেমময় বাণী।

বয়স তো নেহাৎ কম হল না। এখনো ছুকছুকানি গেল না। তীর্থক্ষেত্রে মাগি নিয়ে ফুর্তি করতে এসেছে। ঘেন্না ধরে গেল। জয় গৌর জয় নিতাই।

সাত নম্বর ঘরে ঢুকিয়ে কানাই বাইরে থেকে শিকল তুলে দিল। ঘরের টিমটিমে আলোয় দেখলাম আরো জনা তিন চার মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে।

আমাকে দেখে তাদের মধ্যে একজন সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল, আরে বস্‌ তুমি !

ভালো করে ঠাউরে দেখি আমাদের অফিসের সিনিয়র টি.এ. শ্যামল ঘোষাল।

শ্যামল, তুই এখানে।

আর বোলো না বস্‌। আমাদের অফিসের ঝুমুকে তো তুমি চেনো – বছর দুয়েক আগে কমপ্যাসিওনেট গ্রাউন্ডে জয়েন করেছে। ওকে নিয়ে ঘুরতে এসে ফেঁসে গেলাম। এখানকার রকম সকম তো আমার অজানা নয়। আজ বারো চোদ্দ বছর ধরে আসা যাওয়া। প্রায় একশোটা প্রশ্ন ধরে ধরে মুখস্থ করিয়েছিলাম। এমন গাঁড়োল হাজব্যান্ডের নাম লিখেছে লেট কনকেন্দু দত্ত। কী ক্যাঁচাল বলো তো বস্‌ ! এত সোজা কোশ্চেনের উত্তরটা দিতে পারল না। !

ঝুমু এসেছে ! কই, কোথায় ?

মেয়েদের জন্যে পাঁচ নম্বর ঘর। কাল কৃষ্ণনগর কোর্টে তুলবে। তারপর জামিন হয়তো ভালো নয়তো কেলোর একশেষ। তা বস্‌, তুমিও তো ফেঁসে গেছ দেখছি। ঠিক মতো শিখিয়ে পড়িয়ে আনতে পারোনি ? মালটা কোথাকার ?

গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, না ভাই, দোষটা আমারই। ছেলে কোন ক্লাসে পড়ে বাবা হয়ে সেটাও ঠিকমতো লিখতে পারিনি। আমার জামিন না হওয়াই ভালো।

গল্পটি লেখকের ‘বৃশ্চিক’ প্রকাশিত ‘জালি গল্প’ গল্প সংকলন থেকে সংগৃহীত।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ