16 Jul

একটু শীতের জন্য

লিখেছেন:সমীর ঘোষ


হা-হুতাশ করে করে ডিসেম্বর শেষ। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ শেষ হতে চললেও এখনও তেমন শীত পড়ল না। ফি বছরই শীতের জন্য হাহাকার চলে সুতপনদের। আলমারিতেই তুলে রাখতে হয় নামী – দামি শীতের পোশাক। অথচ সুতপন এখন ভাবে, ছোটবেলায় কত্তো শীত ছিল। জামাকাপড়ের সেরকম জোগাড় না থাকায় স্কুলে যেতে হি হি করে কাঁপতে হত। ঠাণ্ডায় দাঁতে দাঁতে কাঁপুনি ধরে ঠক ঠক করে আওয়াজ হত। মফঃস্বলের টিনের চাল দেওয়া বাড়িতে রাতে লেপ, মায়ের হাতে তৈরি কাঁথার ভেতর ঢুকেও শীত কমতো না। কলতলায় চান করতে গেলে হোহো হিহি আওয়াজ এমনিই মুখে চলে আসত। অথচ এখন শীতই নেই। শীতের দেখা নেই বলে কাগজে লেখালিখিও কম হচ্ছে না। একসময় শীতের রাতে ঘুম না হওয়া সুতপন এখন মোটা মাইনের সরকারি চাকুরে। সে ছোটোবেলা থেকেই একটু শীত কাতুরে। মা বলত – তুই অল্প শীতেই কাতর হয়ে পড়িস। অথচ বড় হয়ে ঘটেছে ঠিক এর উল্টোটাই। সে এখন একটু শীতের জন্যই কাতর হয়ে পড়ে। কলকাতায় একটু গরম পড়লেই বউ মৌপিয়া এবং ছেলে বাবানকে সঙ্গে নিয়ে দার্জিলিঙ বা সিমলা চলে যায় সে। অফিসে কাজের সময় তো বটেই এমনকি বাড়িতেও এসি ছাড়া থাকতে পারে না সুতপন।
সারা বছর গরমের সঙ্গে লড়াই করে একটু প্রাকৃতিক ঠাণ্ডার জন্য ডিসেম্বর-জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকে সুতপনরা। ছোটবেলার কষ্ট নয়, ঠাণ্ডাকে জমিয়ে উপভোগ করতে সুতপন ঘরে রুম হিটার বসিয়েছে, বাথরুমে বসিয়েছে গিজার। বাড়ির সকলের জন্যই ঠাণ্ডা রুখতে কেনা আছে জবরদস্ত জ্যাকেট, সোয়েটার, ওভার কোট। কিন্তু আজকাল কিছুই কাজে লাগে না কলকাতায়। শুধু কলকাতা নয়, গোটা পৃথিবী থেকেই নাকি শীত পালাচ্ছে। ক্রমশ গরম হয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। গলে যাচ্ছে আন্টার্টিকার বরফ। পালটে যাচ্ছে আবহাওয়া। প্যারিসে না কোথায় একটা সদ্য হয়ে যাওয়া জলবায়ু সম্মেলনে এই নিয়ে নাকি উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বিস্তর চেঁচামেচিও হয়েছে। অফিসে কাজের ফাঁকে একদিন সুতপনদের এই সব বুঝিয়েছিল অফিসের বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ আদিত্য আদক। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানের বিচিত্র কাজকর্মের নানারকম ব্যাখ্যা সময়ে সময়ে নিজে থেকেই ভাষণ দেওয়ার মত বলতে থাকায় আদিত্যবাবুর নাম ‘বিজ্ঞান বিচিত্রা’। আর একজন আছেন অনিন্দ্যসুন্দর মজুমদার। ইনি সাহিত্যের সব খবরাখবর রাখেন। বলেন বাংলা সাহিত্যের গতিবিধি সর্বত্র। শীতের আকুলতা-মেদুরতা নিয়েও কম লেখালিখি হয়নি বাংলায়। ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’ লিখে বিখ্যাত হয়ে গেছেন কবি ভাস্কর চক্রবর্তী। ‘ যে বছর শীত কম পড়ায় আমরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম’ নামে দারুণ গল্প লিখেছেন গল্পকার বিষ্ণু বিশ্বাস।
সত্যি, সকলের এত প্রিয় শীত ধীরে ধীরে কোথায় যে চলে যাচ্ছে তা ভেবে পায় না সুতপন। এখন হাহাকার করলেও ছোটবেলায় কিন্তু ওদের কাছে আতঙ্কের কারণ ছিল শীতকাল। খুব পুরনো নোনা ধরা বিশাল বিশাল খিলানওলা একটা বাড়িতে ভাড়া থাকত ওরা। সারা বছর ওদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলত সূর্য। শীতে মেঝেতে বরফসম ঠাণ্ডা আর বর্ষায় ছাদ চোঁয়ানো জল মিলত মুফতে। মায়ের ছিল ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস। শীত এলেই বাড়ত হাঁপানির টান।
এখন ডিসেম্বর পড়লেই কাগজের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত শীতের খবর খোঁজাখুঁজি করে সুতপন। মৌপিয়াও জানতে চায় শীত কবে আসবে সে বিষয়ে কোনও লেখালিখি হয়েছে কিনা! প্যাচপেচে গরম আর কাদা থইথই বর্ষা পেরিয়ে বছরের একফালি শীতে মানুষ যে একটু আরাম করবে তাও হবার জো নেই। শীতে কত খাবার দাবার। খেজুরের গুড়, পাটালি, পিঠেপুলি, পায়েস, গাজরের হালুয়া, কড়াইশুঁটির কচুরি – আরও কত কি। ছোটবেলায় দেখেছে শরীর খারাপ নিয়েই মা এসব বানাত সকাল সন্ধে এক করে। এখন অবশ্য এসবের পাঠ উঠে গেছে। শীতকাল এলে একটু দামি হোটেলে বা ফেস্টিভ্যালে এসবের স্পেশাল ডিস খেয়ে আসে সুতপনরা। কিন্তু শীতটাই ঠিকঠাক না পড়লে, একটু এনজয় করতে না পারলে মনটা বড় খারাপ হয়ে যায়।
শীতহীন শীতের এই রকম সকালে খবরের কাগজ খুলেই চমকে গেল সুতপন। রাতের কলকাতায় শীতের ছোবলে মৃত্যু হয়েছে এক ভিখিরি দম্পতির। এক সঙ্গে এরকম মৃত্যু ভারি আশ্চর্যের। অতি গরিব দুই বুড়োবুড়ি ফুটপাথেই থাকত। ভিক্ষা করে জোগাড় করা ছেঁড়া কাঁথাকুঁতি দিয়েও ঠাণ্ডার হামলা সামলাতে পারেনি ওরা। আশপাশের ফুটপাথ বাসীরা জানিয়েছে শীতের ঠেলায় কদিন ধরে কাবু হয়ে পড়েছিল বুড়োবুড়ি। সর্দি কাশিতে ঘড়ঘড় শব্দ হত ওদের বুকে। রাস্তাতেই শুয়ে থাকত ওরা। বারবার গরম চা চাইত। ঠাণ্ডার ছোবল থেকে বাঁচতে হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শও দিয়েছিল কেউকেউ। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। খবরের কাগজের সম্পাদক মশাই কায়দা করে এর একটা ক্যাপশনও জুড়ে দিয়েছেন -‘কারো পৌষমাস, কারও সর্বনাশ’।
ঠাণ্ডায় দুই বুড়োবুড়ির মৃত্যুর খবরটা দেখতে পেয়েছে বাবানও। ছবিটা দেখিয়ে ও প্রশ্ন করল পৌষ মাস আর সর্বনাশের মানে কি বাবা?
ছেলের কথা শুনে মায়ের মৃত্যুর কথা মনে গেল সুতপনের। এই জানুয়ারির ঠাণ্ডাতেই তো অ্যাকিউট নিউমোনিয়ায় মৃত্যু হয়েছিল মায়ের। হাসপাতালে দিয়েও শেষ রক্ষা করা যায়নি। ডাক্তার ধমক দিয়ে বলেছিল ঠাণ্ডায় প্রোটেকশন দিতে পারো নি মা’কে ? তা হলে এরকম সর্বনাশটা হত না।
ছেলের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই হঠাৎ কাঁচ ঢাকা জানলাগুলোর সব কটা খুলে দিল সুতপন। ছেড়ে ফেলল গরমের পোশাক। বন্ধ করে দিল রুম হিটার। বাইরে থেকে হুহু করে ছুটে আসা উত্তুরে ঠাণ্ডা হাওয়া কাঁপিয়ে দিল সুতপনের শরীর। ছেলের ডাক শুনে মৌপিয়া দৌড়ে সে চেঁচামেচি শুরু করে বলল- ভোর বেলায় ঠাণ্ডা লাগিয়ে নিউমোনিয়া ধরাবে না কি?
কারও কোনও কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে সুতপন অনুভব করল দারুণ শীত পড়েছে কলকাতায়।

 

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ