24 Aug

আকাশ অন্ধকার

লিখেছেন:বিনতা রায়চৌধুরী


ছেলে পিনাকী বিয়ে করে বাইরে চাকরি নিয়ে চলে গেছে অনেকদিনই হয়ে গেল। ভারতীর ঘরটা একটু ফাঁকা ফাঁকা ঠিকই কিন্তু বিদ্যাচরণ স্ত্রীকে সেই ফাঁকটা কখনই বুঝতে দেননি। সব সময় স্ত্রীকে সঙ্গ দিতেন। রিটায়ারমেন্টের পর একটা এনজিও-তে জয়েন করেছিলেন তাও সেইসব কাজ কমিয়ে দিয়েছেন।

এই বয়সেও ভারতীর যা কিছু অপূর্ণ আশা সেগুলো পূরণ করার চেষ্টা করেন বিদ্যাচরণ। একটু বাগানের শখ ছিল ভারতীর। বিদ্যাচরণ মালী ডেকে ছাদে বাগান করেছেন। ভারতীর পছন্দমতো সব গাছ লাগানো হয়েছে – গন্ধরাজ, জবা, সাদা গোলাপ ইত্যাদি।

প্রতিদিন সকালে একসঙ্গে চা খান দুজনে। গল্প করেন। একজন কাজের লোকও রেখেছেন জোর করে। সে রান্না এবং আর সব কাজ করে। ভারতী প্রথমে রাজি হননি, ‘কী দরকার? মাত্র তো দুজনে আমরা, আমিই করে নিতাম’।

‘না, তুমি আরাম কর। আমার আর পিনাকীর জন্য তুমি সারাজীবন অনেক পরিশ্রম করেছ’।

‘না, না। ও আমি আনন্দ করেই করেছি। পিনাকী বড় হয়েছে, মানুষ হয়েছে। আর কী। এতেই আমি সার্থক।’

‘তোমার পিনাকী বড় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ হয়েছে কিনা কে জানে?’

‘ওকি কথা বলছ?’

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বিদ্যাচরণ, ‘আমেরিকাবাসী হয়েছে আজ কতদিন! আমাদের নিয়ে যাওয়ার কথা একবারও বলেনি। ফোনও নিয়মিত করেনা।’

‘কেন, এই তো গত সপ্তাহেই ফোন করল। কত কথা হল’।

‘সেও তো পাঁচদিন হয়ে গেল। তাছাড়া বৌমা একবারও কথা বলে?’

‘কী যে বল না, রোজ ফোন করবে নাকি? পয়সা লাগে না বুঝি! আর বৌমা হয়তো ব্যস্ত ছিল।’

‘তুমি আর নিজের ছেলের দোষ ঢেকোনা ভারতী। বৌমা বাপের বাড়ীতে একদিন অন্তর একদিন কথা বলে। আমি জানি, জনার্দনবাবুর সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল, সে নিজে বলেছে’।

ভারতী মনে মনে ভাবল নিজের ছেলের দোষ ঢাকব না তো কী করব। সত্যি, পিনাকী ব্যবস্থা করলে একবার আমেরিকাটা দেখে আসতাম। উনি যে সেই আশাতেই পাসপোর্ট করিয়ে রেখেছেন, সে কী ভারতী জানে না?

এভাবেই চলছিল বিদ্যাচরণ আর ভারতীর সংসার।

সপ্তাহে একবার কী দুবার ছেলের সঙ্গে ফোনালাপ। বৌমার আন্তরিকতা শূন্য মিষ্টি কয়েকটি কথা। এতেই সন্তুষ্ট ছিল কর্তা-গিন্নি। মাসে মাসে বিদ্যাচরণ শখ করে সিনেমার টিকিট কেটে আনতেন। প্রথমজীবনের মতো সেজেগুজে দুজনে বেরোতেন। বিদ্যাচরণ বলতেন, ‘একটু লিপস্টিক লাগাও না, লিপস্টিক লাগালে তোমার মুখটাই পালটে যায়। বেশ সুন্দর লাগে’।

লজ্জা লজ্জা মুখে বলতেন, ‘লাগাব? না থাক, ছেলের বৌ এসে গেছে। এখন আবার লিপস্টিক?’

‘ছেলের বৌ কী দেখতে আসছে লিপস্টিক লাগিয়েছ তুমি? যে দেখছে, যার দেখতে ভাল লাগে, তার জন্য লাগাও’।

হেসে ফেলে ভারতী। লিপস্টিক লাগিয়ে নিজেই অবাক হয়ে যায়। সত্যিই তো বেশ লাগছে।

টিভি দেখতে অত ভালবাসেন বিদ্যাচরণ। বরং পুরনো গ্রামাফোনটা চালিয়ে রবীন্দ্রনাথের শ্যামা, শাপমোচন শুনতে ভালবাসেন। ভারতীও আনন্দ পায়। অনেকসময় ভারতী ভেবে দেখেছে, পুত্র সন্তান জন্মালে সবাই ধন্য ধন্য করে – বলে ছেলে হয়েছে, এ তোমারই ধন। কন্যাসন্তান হল অপরের সম্পত্তি। যত যত্নেই মানুষ কর, শেষ পর্যন্ত নৌকাতেই ঠেলে দিতে হবে। আর সেই যে নাম-গোত্র পালটে সে পাড়ি দেবে – সে যাওয়া চলে যাওয়াই। এখন যেন কেমন মনে হয় ভারতীর, কে জানে একটা মেয়ে থাকলে সে হয়তো বুড়ো বাবা-মায়ের উপর একটু বেশি টান দেখাত কিনা? সে ছেলে তো হয়েছিল, সে তো দূরে চলেই গেল। থাকল না তো কাছে।

তবু ভারতী মনে মনে কোন ক্ষোভ চেপে রাখে না। তার আকাশ পরিস্কার। কোথাও একটু অন্ধকার নেই। কাজের চাপে ছেলে তো দূরে থাকবেই। কিন্তু সে তো আমার হৃদয়ের কাছেই আছে। মনের একেবারে পাশটিতে। চোখ বুঁজলেই এখনও তিনি পিনকুর নিঃশ্বাসের আওয়াজ শুনতে পান। ছোট্ট পিনকুর গায়ের গন্ধও যে তার সর্বশরীরে জড়ানো আজও। উনি ছেলের ওপর অভিমান করেন, করতেই পারেন। কিন্তু ভারতী যে মা, যে কোনও হিসেব-নিকেশ জানেনা। ছেলে যেখানেই থাকুক, ভাল থাকলেই খুশি।

হঠাৎ বিদ্যাচরণ চলে গেলেন। ওপার থেকে এমন একটা অতর্কিতে ডাক আসবে স্বামী-স্ত্রী কেউ বোঝেনি। বুকে ব্যথা ব্যথা বলতে বলতেই  জ্ঞান হারালেন। পাশের বাড়ির লোকেরা হাসপাতালে নিয়ে গেল। ভারতীও ছুটলো সেই সঙ্গে। খুব বেশি আত্মীয়-স্বজন ওদের ছিলনা। তবু দু-একজন এখানে ছিল, তাদের খবর দেওয়া হল। তারা ছুটেই এল, আর খবরও দিল পিনাকীকে।

তিনদিন হাসপাতালে ছিলেন বিদ্যাচরণ। পরপর নাকি কয়েকটা স্ট্রোক হয়, সামলাতে পারেননি। ভারতীর হাত ধরে শেষ কথা বলেছিলেন, ও বাড়িতে তুমি বেশ থাকতে পারবে। আমিও থাকব তোমার কাছে কাছে।

কথাটার সম্পুর্ণ মানে বুঝতে পারেনি ভারতী। কর্তা কী বুঝে ওকথা বললেন! চোখের জল বাঁধ মানছিল না। বিদ্যাচরণ হাসলেন অল্প। হাত দিয়ে ঠোট দেখালেন, লিপস্টিক মাখতে বলছেন। অমন মজা করতেন সবসময়। ভারতী মন খারাপ করলেই বলতেন, ‘একটু লিপস্টিক মাখো দেখি’। তারপরদিনই সবশেষ।

পিনাকী এল। কিন্তু শেষ দেখা দেখতে পেল না। মুখাগ্নিও করতে পারেনি। শোকে বুক বেঁধে ভারতীকেই এই কাজ করতে হয়েছে।

পিনাকী এল আরও পাঁচদিন পরে।

সদ্য স্বামীহারা ভারতীর মনটা ভিজে গেল। ছেলেকে একেবারে আঁকড়ে ধরল সে। অপত্যস্নেহে বাঁধ ভাঙা বন্যার মতো আছড়ে পড়ল। বহুদিন পর মাতা-পুত্রের মিলন হল চোখের জলে। ভারতী বার বার বলতে লাগল, ‘তোর বাবা থাকতে যদি একবার আসতিস পিনাকী। কত খুশি হতেন। টানা তিনটে বছর তোকে একবার চোখের দেখাও দেখতে পাননি। পুরুষ মানুষ, মুখে কিছু প্রকাশ করতেন না, কিন্তু ছেলের জন্য তাঁরও যে কত মন কাঁদত, সে ভারতী ছাড়া কে বুঝবে?

পিনাকী খুব ভক্তিভরে বাবার কাজ করল।

ছেলে আর মা সবসময় পাশাপাশি। কতদিন পরে। ভারতী ভাবল, ভগবান সব একসঙ্গে কাউকে দেন না। স্বামীর সঙ্গে খুবই সুখে কাটিয়েছেন, এখন ছেলেকে পাশে পেয়েও মনটা ভরে যাচ্ছে। কিন্তু দুটো একসঙ্গে হল না!

পিনাকীর ছুটি ফুরিয়ে গেছে। তাছাড়া রিনিও আসতে পারেনি। এই নিয়ে ভারতী একটু মন খুঁত-খুঁত যে করেনি তা নয়। পিনাকী বলেছে, ‘মা, হঠাৎ করে ওর অফিসে ছুটি পাওয়া সম্ভব হয়নি। তাছাড়া টুকাইয়ের স্কুল। একটু বোঝার চেষ্টা কর। অভিমান কোরোনা। বাবার জন্য রিনি মনে মনে যথেষ্ট কষ্ট পেয়েছে।

রিনি ফোনে কয়েকবার কথা বলেছে এর মধ্যে। ভারতী যেন তাতেই অনেকটা খুশি। তবু একবার বলে ফেলল, ‘শ্বশুরমশাইয়ের কাজে তুমি এলে খুব খুশি হতাম’।

‘জানি। কিন্তু পারলাম না। এখানে অফিস, ছেলের স্কুল। তাছাড়া আমার বাবা-মা এখানে আসছেন শিগগিরই। কি করে যাব’?

ভারতী আর কিছু বলেনি। পিনাকী এই শেষ কথাটার মানে বোঝেনি। চেপে গেছে। ভারতীও ছেলেকে এ বিষয়ে কিছু বলেনি। যা বোঝার বুঝেছে নিজে।

দেখতে দেখতে ছেলের ফিরে যাবার দিন চলে এল।

ভারতীর খুব মন খারাপ। বিদ্যাচরণের অভাব যেন নতুন করে বুকে থাবা বসাচ্ছে। এ কটা দিন তাও পিনাকীকে নিয়ে, অন্যান্য স্বজন ও প্রতিবেশীদের আনাগোনায় কেটে গেছে। এবার যে শুধু শূন্যতাই শূন্যতা।

পরিণত বয়সে স্পাউস একজন কেউ চলে গেলে, যে পড়ে থাকে তার যে কী অবস্থা হয়, সে শুধু সেই জানে, যে পড়ে থাকে।

এই বাড়িটায় একা একা ভারতী কী করে থাকবে? তিনি বলে গেলেন, তুমি বেশ থাকতে পারবে। বললেই হল। আবার বলে কিনা আমি থাকব পাশে পাশে।

পিনাকী মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অনেক আশ্বাস দিল, ‘মা, আমি মাসে মাসে আসব। কথা দিচ্ছি। রোজ তোমাকে ফোন করব। একা থাকবে। সাবধানে থাকবে। ভারতী ঘাড় নাড়লো।

পিনাকী প্রতিবেশীদের বলে গেল, ‘মাকে একটু দেখবেন’।

সবাই বলল, ‘নিশ্চয়ই-নিশ্চয়ই। যখন দরকার হয় বলবেন। আমরা চলে আসবো’।

ভারতী ঘাড় নাড়লো।

ভারতীর বাড়িতে যে ঠিকে মেয়েটি কাজ করত, তাকেই দিনরাত্রির জন্য বহাল করা হল। মাঝে দু-একটা পুরোনো বাড়িতে কাজ সেরেই সে রাতে চলে আসবে ভারতীর কাছে। ব্যবস্থাপনায় কোনও ত্রুটি রইল না।

পিনাকী যাওয়ার আগে বলল, দেখো মা, সবাই তো তোমার নিজের হাতে গোছানো, কিছু অসুবিধে হবে না। একা থাকতে ভাল লাগেনা কারোরই, তবু দেখো, তোমার অভ্যাস হয়ে যাবে। আমরা তো আছিই। দূরে হলেও আছি’।

ভারতী ঘাড় নাড়লো।

শূন্য বাড়িতে প্রথমদিন ভারতী সকালবেলায় কিছুতেই এক কাপ চায়ের জল বসাতে পারলো না। হাতে উঠলই না। পুরনো অভ্যাস দু-কাপ চা করল। একেবারে আগের মতো বারান্দার ছোট টেবিলে সকালের টাটকা খবর কাগজের পাশে কাপদুটি রাখল। কোলের ওপর কাগজটা টেনে নিয়ে পুরনো অভ্যাসমতো হেডিংগুলো জোরে জোরে পড়তে আরম্ভ করল। এরকমই রেওয়াজ ছিল। চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভারতীর মুখে খবরের হেডিং শোনার মজাটা উপভোগ করতেন বিদ্যাচরণ।

আজও কয়েকটা হেডিং পড়ার পর ভারতী অনুভব করল, পাশে বসে কেউ তার সংবাদপাঠ শুনছে না। কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলে রাখল সে। এবার চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আকাশের দিকে তাকালো। আজও আকাশ পরিষ্কার – নীল ঝকঝকে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের টুকরো টুকরো ছবি মনে ভেসে উঠতে লাগলো। না, মানুষটা কোনোদিন তাকে কষ্ট দেয়নি। তাই তো সে চলে যাওয়ার পরও ভারতীর আকাশ পরিষ্কার। নির্দোষ। নিখুঁত।

অনেকক্ষণ পর চোখ পড়ল পাশের ভর্তি চায়ের কাপটির ওপর। ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। সর পড়ে গেছে চায়ের ওপরে। অভিমানে ভরে উঠল মন, তবে যে বলেছিলে কাছেই থাকবে। তারপর নিজেকেই বোঝাল, হয়তো আছে। তাই বলে পঞ্চভুতে মিশে যাওয়া মানুষটি তো আর চা-পান করে নিজের অস্তিত্ব জাহির করতে পারেনা। এইটুকু বুদ্ধি যে ভারতীর আছে।

তবু বুদ্ধি দিয়ে হৃদয় কবে প্রশমিত হয়েছে। ভারতী পরদিনও দু-কাপ চা করল। তার পরদিনও, তারপরও ……………।

ওদিকে পিনাকী আমেরিকা পৌঁছেই মাকে ফোন করল।

ভারতী একটু স্বস্তি পেল। যাক, ছেলে কথা রেখেছে। বেশ কিছুদিন কথা হল। ভারতী একবার রিনিকে খুঁজলো। কিন্তু রিনি ফোন ধরল না। পিনাকী বলল, রিনি বাড়ি নেই। কিন্তু ভারতীর মনে হল, একবার যেন রিনির গলা শোনা গেল। পর মুহূর্তে ভাবল, তারই ভুল।

তারপরের সপ্তাহে দু-বার ফোন করল পিনাকী। মায়ের জন্য ছেলে সত্যি চিন্তা করছে। এতদিন বাবা ছিল, সে একরকম। এখন যে মা বড় একা। পরের সপ্তাহে তিনবার ফোন এল আমেরিকা থেকে।

পিনাকী জিজ্ঞাসা করল, ‘প্রতিবেশিরা তোমার খবর নেয় মা?’

এমনি এমনি খবর নেবে কি? দরকার হলে ডাকব। নিশ্চয়ই আসবে।

‘আর মণিকাকা, চামেলী পিসি? আসে তোমার কাছে?’

‘মণি ঠাকুরপো ফোন করেছিল দু-একবার। আর চামেলী এসেছিল একদিন।

‘এই দু মাসে মাত্র একদিন’। অত করে বলে এলাম’।

‘ওমা, সেকি! সকলেই নিজের জীবনে ব্যস্ত। আমার তো অসুবিধা নেই। তোমার বাবার সাজিয়ে দেওয়া বাড়িতে ঠিকই চলে যাচ্ছে দিন’।

দশজনের সংসার গুছিয়ে নিতে হয়, পাঁচজনের সংসারও। কিন্তু একজনের সংসার? সেও একরকম করে গুছিয়ে নেওয়ার আছে। মাস তিনেকের মধ্যে ভারতী তার একার সংসার সামলে নিল। সর্বক্ষণ সে নিজের কল্পনার আয়নায় বিদ্যাচরণকে দিয়ে এই সংসার ভরে রাখত। যাকে দেখতে পাওয়া যায়না, ছুঁতে পারা যায়না, তার যে অস্তিত্ব নেই, একথা  সত্যি নয়। জীবন দিয়ে এই ভাবনাকে উপলব্ধি করেছে ভারতী। করে একরকমের শান্তি পেয়েছে।

তাছাড়া পিনাকী এখন মায়ের খুব খবর নেয়। একদিন নাতিও কথা বলল ফোনে। কিন্তু সেদিন সকালবেলা আমেরিকা থেকে ফোন বাজছে শুনে একটু চমকে উঠেছিল ভারতী। তারপর রিসিভার কানে চেপে তার হৃদপিণ্ড ধক করে উঠল, ‘কেমন আছেন মা’?

‘রিনি? তুমি? অবশেষে মাকে মনে পড়ল?’

‘কী যে বলেন, ফোনে কথা বলতে পারিনা বলে আপনাকে মনে নেই নাকি?

‘না না, সে কথা বলছিনা।‘ একটু আগের ক্ষোভ মুছে ফেলল গলা থেকে ভারতী। তারপর অনেকক্ষণ কথা হল বৌমার সঙ্গে। একেবারে শেষে রিনি বলল, ‘মা, আপনার তো পাসপোর্ট করা আছে না?’

‘হ্যাঁ, কেন বলোতো?’

‘আমরা ভাবছিলাম, যদি আপনাকে আমরা এখানে পার্মানেন্ট নিয়ে আসি? ও সবসময় আপনার জন্য দুশ্চিন্তা করে। এতদিন দুজনে ছিলেন, ঠিক ছিল। এখন একা একা অতদূরে আপনাকে ফেলে রাখার মানে হয়না’।

ভারতীর চোখে জল এসে গেল। তার জন্য ছেলে-বৌমা এতটা ভেবেছে? সে ভাব গোপন করে বলল, ‘না-না। আমার এখানে কোনও অসুবিধা নেই। তোমরা ভাল থাকো, সুখে থাকো। তাতেই আমার শান্তি। এই তো দেখতে দেখতে দুটো মাস কেটে গেল। এরপর আমারও একদিন যাওয়ার সময় এসে যাবে’।

এইজন্যই আপনার ছেলে আপনাকে বলতে চায়নি। ও সমানে বলেছে, দেখো মা কিছুতেই রাজি হবেনা। কেন মা, শেষ জীবনে ছেলের কাছে থাকাটা ভাল নয়?’

ভারতী খুব খুশি খুশি হাসল।

এরপর মাঝে মাঝেই পিনাকী ভারতীকে ওখানে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে। রিনিও বেশ কথাবার্তা বলে এখন। বরং ছেলের চেয়ে বৌমাই বেশি কথা বলে। ভাল লাগে ভারতীর। খুব আপন-আপন লাগে।

এইরকম চলতে চলতে একদিন পিনাকী বলেই ফেলল, ‘আমি এবার যাচ্ছি, মা কলকাতায় বাবার বাৎসরিক কাজ সেরে তোমাকে না নিয়ে আর ফিরছি না। ব্যস, বলে দিলাম’।

ভারতীর আর না-না বলতে ইচ্ছে হল না। এখানে সত্যি সত্যি বড্ড একা লাগে।

যতই সে ছেলে-বৌকে বলুক, আমি খুব ভাল আছি। আসলে একা থাকতে মোটেই ভাল লাগেনা। তাছাড়া আমেরিকা যেতে ইচ্ছেও করছে। নতুন দেশ, ছেলে-বৌয়ের সংসার। একটু যে টানছে না তা নয়। বেড়ানো-টেড়ানো তো কিছুই হয়নি জীবনে। ভালবেশে ওরা যখন ডাকছে, চলে গেলে ক্ষতি কি? এখানে তো কোনও পিছুটান নেই।

পিনাকী এবার এসে একেবারে ধরে বসল। যেতেই হবে। ভারতী বলল, ‘এই বাড়ির কী হবে’?

‘বাড়ি? বাড়ি দিয়ে আর কী হবে? বেচে দেব। তোমার টাকা তোমার নামে রেখে দেব’।

‘তাই? সে কী সম্ভব’।

‘খুব সম্ভব’।

সত্যিই পিনাকী বহাল খদ্দের দেখে বাড়ি বিক্রির ব্যবস্থা করে ফেলল।

ভারতীকে কোনও চিন্তাই করতে হল না। শুধু কয়েকটা সই দিতে হল মাত্র। কিন্তু একটা জায়গায় অসুবিধা হল, ভারতী বলল, ‘এ বাড়ির আসবাবপত্র কি করবি’?

‘সে তো বাড়ির সঙ্গেই বিক্রি করে দিচ্ছি’।

‘ও, তাই? এরকম হয় বুঝি? আচ্ছে শুধু খাটখানা সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যায়না?’

‘খাটখানা? হাঃ হাঃ হাঃ’

ভারতী লজ্জায় ব্যাকুল হয়ে পড়ল, ‘ খুব বোকা বোকা কথা হয়ে গেল না? ঠিক আছে ঠিক আছে বেচেই দে।তবে মণিঠাকুরপোকে কিছু আসবাব দিয়ে দিলে হত। তো বাবার স্মৃতি’।

‘ওভাবে দেওয়া যায়না। বাড়িটা বিক্রিই হচ্ছে উইথ ফার্নিচার। আর মণিকাকাকে এখন এসব বলতে গেলে নানা কৈফিয়ত দিতে হবে’।

‘আমি একেবারে চলে জাচ্ছি, কারও সঙ্গে দেখা করে যাব না? চামেলী বাড়ি বদল করেছে, ওর নতুন ঠিকানা জানিনা। কিন্তু মণিঠাকুরপোকে খবর দিলে নিজেই এসে দেখা করে যেত’।

‘ওসব তালে একেবারে যেওনা মা। আর অত সময়ও নেই’।

ভারতী ঘাড় নাড়ল। ছেলের সঙ্গে তর্ক করে তার মন নষ্ট করতে ইচ্ছে করল না। তবে মণিঠাকুরপোকে একবার ফোনে অন্তত তার বিদেশযাত্রার কথাটা বলতে ইচ্ছে হল। কিন্তু ফোনের নোটবইটা কোথায় গেল? এখানে, এই টেবিলেই তো ছিল। মণিঠাকুরপোর ফোন নম্বর তো মুখস্থ নেই তার।

অনেক খুঁজেও নোট বইটা পেল না ভারতী। বিদ্যাচরণ অনেকবার তাকে মোবাইল ফোন কিনে দিতে চেয়েছেন, ভারতী নেয়নি। বলেছে, ‘আমি কী বাড়ি থেকে একা একা তেমন বেড়োই? আমার মোবাইল কী কাজে লাগবে? আমার ওই ল্যান্ড ফোনই ভাল। কতই না ফোন করি! যাকগে, কী আর করবে ভারতী। ছেলের সঙ্গে আমেরিকায় যাচ্ছে এই আনন্দের খবরটা আর দেওয়া হল না কাউকে। বেশ তাড়াতাড়ি সব ব্যবস্থা করে ফেলল পিনাকী। টেলিফোন, ইলেক্ট্রিক মিটার সব স্যারেন্ডার করা হল। কয়েকটা সই দেওয়া ছাড়া আর কুটোটিও নাড়তে হল না ভারতীকে। গলায় সরু চেন আর হাতের দু’গাছা চুড়ি, যা সবসময় পরে, সেটুকু রেখে তার গয়নার বাক্সটাও ছেলের হাতে তুলে দিল সে।

পিনাকী একটু কিন্তু কিন্তু করল, ‘এসব কেন নিচ্ছ মা’?

‘ওমা, রিনিকে দেব, নাত বৌ এলে তাকে দেয়। আমি কী এই বয়সে গয়না পরার জন্য নিচ্ছি’?

পিনাকী হাসল। ভারতীও হাসল।

দেখতে দেখতে যাওয়ার দিন এসে গেল।পিনাকী বলল, ‘খুব দরকারি জিনিস, তোমার যা সব সময় লাগে, সেটা শুধু একটা হাত ব্যাগে নাও। বাকি তোমার সব কিছু আমার লাগেজের সঙ্গে প্যাক করে নিচ্ছি’।

ভারতী তাই করল। যাওয়ার আগের দিন কর্তার ফটোর সামনে গিয়ে কতবার ভারতী বলেছে, ‘ছেলের সঙ্গে আমেরিকায় জাচ্ছি। কেমন যেন স্বপ্নের মতো লাগছে গো। এত যত্ন করে নিয়ে যাচ্ছে পিনাকী। ততবারই কর্তার ছবির মুখখানা অন্ধকার লেগেছে। ভারতী বুঝেছে, এ তাঁর অভিমান। আমেরিকা যাবে ছেলের কাছে, এ তো তাঁর খুব সাধ ছিল। ছবিখানা নামিয়ে সঙ্গে নিয়ে নিল ভারতী। মনে মনে বলল, ‘তুমিতো যাবে আমার সঙ্গে’।

সকালের দিকেই প্লেন। ভারতী ভোর ভোর উঠে সব গোছ-গাছ করে নিয়েছে। একটু জলখাবার করল। পিনাকী রয়েছে, একেবারে শুধু মুখে বাড়ি থেকে বেরোবে? তার একার হলে কোনও ব্যাপার ছিল না। তাছাড়া এতদিনের ঘরকন্না, ছাড়ি ছাড়ি করেও ছাড়তে কষ্ট হয়। আজই নাকি যারা কিনেছে তাঁরা এই বাড়ির দখল নেবে। চাবি হ্যান্ডওভার হয়ে গেছে।

এয়ারপোর্টে ঢুকে মন ভরে গেল ভারতীর।

সত্যি, কোনওদিন কী ভাবতে পেরেছিল, এখানে আসবে। প্লেনে করে যাবে। এত আনন্দ হচ্ছে। সকালবেলাও পুরনো বাড়িটা ছাড়তে মায়া লাগছিল, এখন সে সব মুছে গেছে। শুধু স্বামীকে মিস করছে ভারতী। দু’জনে একসঙ্গে গেলে কী ভালো না হত। একটা চেয়ারে বসে এসব ভাবছে ভারতী। পিনাকী বারবার উঠে যাচ্ছে। মালপত্র দিয়ে এল কোথায়। নানা কাজ করছে। আবার এসে বসল পাশের চেয়ারে। একটু পরে মাকে বলল, ‘তুমি এখানটায় বসো। আমি কাজ সেরে আসছি। নতুন কত নিয়ম হয়েছে। বার বার কাগজপত্র চেক করছে। প্লেন লেট আছে কিনা, তাও দেখছি’।

ভারতী মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে, আমি তো বসেই আছি’।

হাত ব্যাগটা তুলে নিয়ে পিনাকী এগিয়ে গেল।

ভারতী বসে আছে অনেকক্ষণ ধরে। শুনেছিল সকালের ফ্লাইট। সকাল তো পার হতে চলল। খিদেও পাচ্ছে। পিনাকী এলে ওকে নিয়ে খাবার ব্যাবস্থা করতে হবে। তার কাছে যা টাকা আছে তাতে কফি-টফি কিনে খাওয়া যেতেই পারে। না থাক, ছেলেটারও তো খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই। আহারে, মাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য কতই না ঝামেলা পোহাচ্ছে। প্লেন কত লেট কে জানে?

দুপুরও গড়াতে চলল। ছেলের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে।

এরমধ্যে অফিসার গোছের একটি ছেলে এসে জিজ্ঞাসা করে গেছে, ‘আপনি কোন ফ্লাইটে যাবেন। একা একা বসে আছেন দেখছি। সাহায্য করতে পারি’?

‘না-না, আমি একা নই। আমার সঙ্গে আমার ছেলে আছে’।

‘ও স্যরি। চলে গেল ছেলেটি। ভারতী ভাবল, তখন ওকেই একবার পিনাকীর কথা বললে হত।

আর কতক্ষণ বসে থাকতে হবে? পিনাকী নিশ্চয়ই কোনও ঝামেলায় পড়েছে। কে জানে তার সই-টই মিলছে না হয়তো। কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। পাসপোর্টটাও তো পিনাকী সঙ্গে রেখেছে। এবার ছেলের জন্য দুশ্চিন্তা হতে লাগল। কোনও বিপদ আপদ হল না তো! একেবারে ছটফট করছে মনটা। হঠাৎ ভারতী দেখল সেই অফিসারটি একটু দূর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

‘শোনো বাবা, এই যে, একটু শুনবে’?

অফিসারটি এগিয়ে এসে চমকে উঠল, ‘আপনি এখনও বসে আছেন’?

‘হ্যাঁ, আমার ছেলে এখানে বসতে বলে কাগজপত্র দেখাতে গেছে। এখনও আসেনি।

‘সে কি! কোথায় যাবেন আপনি?’

‘আমি আমেরিকা যাব।‘

‘আমেরিকা? এটা তো ডোমেস্টিক সেকশন। কী কাণ্ড! ছেলে এখানে বসতে বলে কোথায় গেল? আপনারা কী মুম্বই হয়ে যাবেন?

‘সে সব তো আমার ছেলে জানে। সে কোথায় গেল অফিসার? তাকে খোঁজো। নিশ্চয়ই তার কোনও বিপদ হয়েছে। ভারতীর গলায় কান্না এসে গেল। মায়ের জন্য কোন ঝামেলায় পড়ে গেল পিনাকী?

‘আপনার পাসপোর্টটা দেখি। টিকিটটাও দেখাবেন। চেক ইন হয়ে গেছিল?

‘সে তো সব ছেলেই জানে।‘

‘স্ট্রেঞ্জ!’

সেই অফিসার গিয়ে আর একজন মহিলা অফিসারকে ডেকে আনল। সে এসেও প্রথমে কাগজ-পত্র দেখতে চাইল। ভারতী কিছু দেখাতে পারছে না। আঁতিপাতি করে চারদিক দেখছে। পিনাকী কোথায় তুই? সে স্পষ্ট শুনেছে ওই অফিসার বলল, ‘পুলিশ ডাকতে হবে।‘ ভারতী ভেবে পাচ্ছেনা, এরা পিনাকীকে না খুঁজে পুলিশ ডাকছে কেন? তাহলে পিনাকীকে কী পুলিশ নিয়ে গেছে?

কয়েকজন পুলিশও এসে গেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

সবাই ঘিরে ধরেছে ভারতীকে। একজন পুলিশ অফিসার বলল, ‘আপনার বাড়ি কোথায়?

‘বাড়ি? আমার বাড়ি তো আর নেই।‘ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাল ভারতী।

‘ছেলে ছেলে করছেন, কোথায় আপনার ছেলে? কী নাম তার?’ আর একজন জানতে চাইল, ছেলের নাম বলল ভারতী। করুণ স্বরে বোঝাতে চাইল, তার ছেলেকে ডেকে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একজন মহিলা পুলিশ অফিসার বলল, কলকাতায় তার অন্য কোনও আত্মীয়ের কোন নাম্বার দিতে পারবেন কিনা।

ভারতী মাথা নাড়ল।

এবার একজন পুলিশ অফিসার বলল, একটু কঠোর স্বরে, ‘আপনি কাদের সঙ্গে আছেন বলুন তো।‘

‘কাদের সঙ্গে মানে? বলছি তো ছেলের সঙ্গে এখানে এসে বসেছি। সে কাগজপত্র দেখাতে গেছে কিন্তু আর ফিরে আসেনি। তাকে খুঁজে এনে দিন আপনারা’।

মাথা নাড়ল পুলিশ অফিসার। আপাদমস্তক দেখছে তাকে, সঙ্গে মালপত্রের দিকেও তাকালো। ‘আপনার নাম, ছেলের নাম, ঠিকানা সব বলুন। আর ওই হাত ব্যাগ নিয়ে আমেরিকা যাচ্ছেন? অন্য লাগেজ কোথায়?’

নিজের নাম আর ছেলের নামটা বলল ভারতী। ঠিকানা লিখতে গিয়ে বলল, ‘আমার নিজের বাড়ি ছিল কিন্তু সে বাড়ি ছেলে বিক্রি করে দিয়েছে। সেই ঠিকানা দিলে চলবে? তাছাড়া আমার অন্যান্য লাগেজ ছেলের কাছে আছে। শুধু হাতবাগটা নিজের কাছে।’

ভারতীর কথাবার্তা অত্যন্ত অসংলগ্ন শোনাচ্ছিল। অবিশ্বাস্য লাগছিল সকলের। একজন বলল, ‘ওর ছেলের একটু খোঁজ নিতে হবে। সকাল থেকে যে’কটা ফ্লাইট ছেড়েছে তার প্যাসেঞ্জার লিস্টটাতে দেখতে হবে। হয়তো মুম্বই হয়ে বা দিল্লি হয়ে যাবার প্ল্যান ছিল। নাহলে এখান থেকে আমেরিকা কী করে যাবে? পুরো মিথ্যে বলছে বলেও তো মনে হচ্ছে না। তাছাড়া ছেলের খোঁজ কর, সত্যিই সে এই এয়ারপোর্টেরই কোথাও আছে কিনা। আপনি আমাদের সঙ্গে আসুন’।

ভারতীর বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করছে। সে ওদের সঙ্গে সঙ্গে চলল। কী ব্যাপার কিছুই বুঝছে না। পিনাকী যেখানেই থাকুক এভাবে বসিয়ে এতক্ষণ কোথায় যেতে পারে! পুলিশগুলো কোনো ষড়যন্ত্র করেনি তো? আগেই হয়তো পিনাকীকে ধরে রেখেছে, এখন তার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করছে। কিন্তু কী করবে ভারতী। চোখে জল এসে যাচ্ছে তার। সে কিছুতেই এই জায়গাটা ছেড়ে যেতে চাইছে না। যদি পিনাকী এসে তাকে খোঁজে, খুঁজবেই জানা কথা, তাই সে বলেই ফেলল সে কথাটা।

সেই রাগী পুলিশ অফিসার বলে উঠল, ‘আর ছেলের গল্প শোনাবেন না তো। এখন এই হাত ব্যাগটা খুলুন। আমরা দেখব কী আছে ওতে’।

‘কী থাকবে, কী? এখুনি খুলছি। ছিঃ ছিঃ কী যে মনে করেন আপনারা’।

ভারতীর হাত ব্যাগ থেকে পাওয়া গেল কয়েকটা জামা কাপড়, একটা পুরনো সিঁদুর কৌটো। দুশো-তিনশো টাকা। ভারতীর স্বামী বিদ্যাচরণের একখানি বাধাঁনো ফটো আর একটা লিপস্টিক।

একটা কাচের ঘরে ভারতীকে এনে বসানো হয়েছে।

একজন এক গ্লাস জল দিল। একটু পরে এক কাপ কফি। ওরা নিজেদের মধ্যে প্রচুর কথাবার্তা বলছে। ভারতী কিছুই বুঝছে না। হাত বাড়িয়ে জলের গ্লাসটা নিল। একজন মহিলা অফিসার ঘরে ঢুকে তার দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর সঙ্গীদের বলল, ‘এয়ারপোর্টের কোথাও এর ছেলে পিনাকী বসু নেই। লাউডস্পিকারে ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্যজনক লাগছে। এই ভদ্রমহিলার সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের  যোগ আছে বলে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।

হঠাৎ একটা ফোন এল সেখানে। যে ফোনটি ধরেছে তার ভুরু কুঁচকে উঠেছে। ঘন ঘন মাথা নাড়ছে। অন্য সকলের দিকে তাকাচ্ছে, ভারতীকেও দেখে নিল একবার। জোরে বলে উঠল, ‘ভাল করে দেখা হয়েছে? ভারতী বসু বলে কারও নাম কোনও প্যাসেঞ্জার লিস্টে নেই? আর ওর ছেলে পিনাকী বসু? অ্যাঁ! সেকী!’

ফোন ছেড়ে দিয়ে ভদ্রলোক মাথা নিচু করে দু-মুহূর্ত বসে রইলেন। তারপর নিজেদের মধ্যে একটা দ্রুত পরামর্শ সেরে নিলেন। ভারতীর কানে দুটো কথা গেল, বাকি কথা না বুঝলেও ওই কথাদুটো বুঝল। ভীষণ রেগে গেল সে। উঠে দাঁড়িয়ে ধমকে উঠল, ‘কী বলছেন আপনারা? প্রথমে পুলিশ কাস্টডি তারপর কোনও একটা হোমে-টোমে মানে? আপনারা কী রাস্তায় কোনও অনাথ মহিলা কুড়িয়ে পেয়েছেন? আমার নিজেরই দশ লাখ টাকা আছে ব্যাঙ্কে। তাছাড়াও অনেক কিছু। একটা ভদ্র জায়গায় নিয়ে চলুন অন্তত আমারই খরচায়’।

‘কোথায় আছে সে সব? মহিলা অফিসারটি জিঞ্জাসা করল।

‘ছেলের কাছে আছে। তাকে খুঁজে বের করছেন না কেন?’

‘মাসিমা কোথা থেকে বার করব এখানে আপনার ছেলেকে? সে সকালের ফ্লাইটে মুম্বই চলে গেছে সব নিয়ে। আপনাকে একাই বসিয়ে রেখে গেছে।’

ভারতীর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। চোখের সামনে আকাশটা অন্ধকার হয়ে গেছে। মাথার মধ্যে হাতুড়ির ঘা, ‘আমার ছেলে সব নিয়ে চলে গেছে? চলে গেছে আমাকে এখানে বসিয়ে রেখে? সে তো জানে, আমি কিছু চিনি না-জানি না। না-না, আপনাদের কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। না-না …….।’

অফিসারটি মুখ ঘুরিয়ে অন্যান্যদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘পুওর লেডি।’

গল্পটি শারদীয় ‘নবকল্লোল’ ২০১৫-তে প্রথম প্রকাশিত। গল্পকারের অনুমতিক্রমে ‘গল্পের সময়’ -এ প্রকাশিত হল। 

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • Ashis Sanyal on September 26, 2017

    এই গল্পটি কলকাতা এয়ারপোর্ট-এ ঘটা একটি সত্য ঘটনা ( যা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল ) অবলম্বনে লেখা ! ভালো হয়েছে !

    মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ