14 Jan

দুটি গল্প

লিখেছেন:সিদ্ধার্থ সান্যাল


গুরুগ্রামের গ্রেগর সামসা

সকালে রোজকার প্রথামতো গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-এর নির্জন রাস্তায় দুজনে হাঁটছি….বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে…. মেজাজটাও বেশ মানানসই…..সপ্তাহান্তটা  কিভাবে সুভালাভালি কাটানো যায় তাই নিয়ে দুজনের মধ্যে একটা মতান্তর প্রায় পেকে উঠেছে……এমন সময় হঠাৎ রাস্তার পাশের রাধাচূড়া গাছ থেকে আমাদের পূর্বপুরুষদের একজন  খ্যাঁচম্যাচ মুখভঙ্গি করে নেমে এসে আমার বাঁহাত ধরে ঝুলে পড়লো…..হঠাৎ একিরে বাবা !! সেই না দেখে সেদলের আর একজন সদস্য তীরবেগে পাশ থেকে এসে অর্ধাঙ্গিনীর পা ধরে……বোধ হয় ক্ষমাভিক্ষা করতে লাগলো……তারপর যা হলো তাকে সাদা নারান গাঙ্গুলীয় বাংলায় বলে ‘কাকস্য পরিবেদনা’ !! যাই হোক আমার শূন্যে উপর্যুপরি পদাঘাত, কিছু লোষ্ট্রনিক্ষেপ ও স্ত্রীর তীক্ষ্ণ চিৎকারে পূর্বপুরুষগণ বিচিত্র মুখভঙ্গি ও অমানুষিক শব্দপ্রয়োগের  সঙ্গে সঙ্গে  পশ্চাদপসরণ করলো ! অপাঙ্গে দেখি শাখামৃগপ্রবরের অমানবিক করমর্দনের  দুশ্চেষ্টায় আমার দক্ষিণ বাহুমূলে নখরাঘাতে প্রায় দেড় ইঞ্চি প্রমান রক্তনিশান আর আমার অর্ধাঙ্গিনী এই ক্ষণযুদ্ধে বিনা ক্ষয়ক্ষতিতে জ্বাজ্জল্যমাণ !

বাড়িতে ফিরে স্ত্রী উবাচঃ….”বাড়িতে টেডভ্যাক আছে…..লাগিয়ে দিচ্ছি ! কিন্তু তোমার এন্টিরেবিস ইনজেকশন নিয়ে নেওয়া উচিত……কারণ সবসময়-ই তো আমার সঙ্গে খিঁচিয়ে খিঁচিয়ে কথা বলো….রোগের  সিম্পটম  দেখা দিয়েছে কিনা সময়মতো বুঝতে পারবোনা..হে হে হে” !

পঁয়তিরিশ বছরের জীবনসঙ্গিনীর এহেন হৃদয়হীন কথায় আমি গোমড়ামুখে টেডভ্যাক নিয়ে বসে থাকলাম…ইনজেকশনের ব্যথা বাঁদরামির নখরাঘাতের থেকে বেশী মনে হতে লাগলো !

চব্বিশ ঘন্টা কেটে গেছে……কোথাও কোনো ব্যত্যয় নেই……আজ সকালে আমাদের কলোনির মধ্যেই সন্তর্পণে (  ‘মাঝে মাঝে  তব দেখা পাই’…হেথায়-ও ) প্রাত্যহিক ঘোরাঘুরি সম্পন্ন হলো ! কেবল আজ সকালের ব্রেকফাস্ট-এ ……সাধারণতঃ খাই-ই না……খুব উৎসাহের সঙ্গে একটা পুরো কলা খেয়ে নিলাম……কেন ঠিক বুঝতে পারছি না !

 

মাদার্স ডে 

সন্ধ্যে রাস্তার প্রচন্ড ট্রাফিকের মধ্যে গাড়ি চালাতে চালাতে এখন সুকান্তর মনে একটা অপরাধবোধ কাজ করছে ! কাল থেকে ও মনে করে রেখেছিল আজ সকালে উঠেই  ফেসবুকে একটা জবরদস্ত স্ট্যাস্টাস দেবে মাকে নিয়ে, মানে মাতৃজাতির ভালোবাসা,  সন্তানের প্রতি তাদের অবিরল মমতা  নিয়ে ! আর অফিস থেকে লাঞ্চের সময় বেরিয়ে গিয়ে  কিনে আনবে মা’র জন্য কোনো একটা সুন্দর  গিফট ! সত্যি, গত দুদিন ধরে ফেসবুকে মাদার্স ডে নিয়ে যা চলছে ! সুকান্তর মনে হচ্ছে  এই দেশের সব মায়ের ছেলেমেয়েরা কি এই ফেসবুকের আর আর্চির দোকানের অপেক্ষায় ছিল এতদিন, যাতে করে তারা নিজেদের মায়ের প্রতি তাদের ভালোবাসা ঢাক পিটিয়ে প্রচারের দরবারে হাজির করতে পারে !

কিন্তু কাল রাতে হেডকোয়ার্টার থেকে আসা একটা ই-মেল্ সুকান্তর সব হিসেব গুলিয়ে দিল !  সেই যে কাল রাত নটার পর থেকে তার মন জুড়ে ছিল এম ডির একদিনের কলকাতা ভিজিট  আর ইন্সপেকশন……এই একটু আগে এয়ারপোর্ট-এ তাঁকে বাই বাই করা পর্যন্ত সুকান্তর মাথায় আর কিছুই ছিল না ! সারাদিনের প্রচন্ড ব্যস্ততার পর এই এখন বাড়ি ফেরার সময় তার মনে পড়ল আরে আজ তো মাদার্স ডে……মার জন্য তার আগে থেকে প্ল্যান করা কাজগুলো তো কিছুই করা হয়নি, না দিয়েছে কোনো চাবুক স্ট্যাটাস, না কিনেছে গিফট…….ছি ছি এখন বড়ো খারাপ লাগছে সুকান্তর, অপরাধী লাগছে নিজেকে !

গরমটাও আজ পড়েছে খুব ! নিজের ঘরে ঢুকে  এসি আর ফ্যানটা একসঙ্গে চালিয়ে দিল সুকান্ত ! ক্লান্ত লাগছে খুব….একটু জিরিয়ে নিয়ে মার ঘরে যাবে, ভাবলো সে ! খাটের  ওপর চিৎ হয়ে শুতেই সারাদিনের পরিশ্রমে চোখটা কখন লেগে গেছে বোঝেনি সুকান্ত…….চটকাটা ভেঙে গেলো মাথায় একটা কোমল হাতের স্পর্শ পেয়ে……মা কখন খাটের কিনারে এসে বসেছেন …..রোজকার মতো ধীরে ধীরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন ! সুকান্ত পাশ ফিরে মার দিকে মুখ ফিরিয়ে মা-র হাতটা নিজের হাতে টেনে নিয়ে বললো…..’মা জানো আজকের দিনটাকে বলে মাদার্স ডে’……মাতৃ দিবস ! আজ তুমি নয়…আজ হচ্ছে আমার দিন…..তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা আর মমতা প্রকাশের দিন……বলো আজ তোমাকে কি……’ সুকান্তর কথার মাঝেই ওর সত্তর বছরের বিধবা মা হাসতে হাসতে বললেন,  ‘তাই না কি রে ! তা কবে থেকে এটা শুরু হল’ ?……এই বলে উনি হাসিমুখে আবার সুকান্তর মাথার চুলে বিলি কাটতে লাগলেন ! সুকান্ত কয়েক মুহূর্ত চুপ করে মায়ের মুখের দিকে দেখলো তারপর আবার চোখ বন্ধ করে মার হাতটা নিজের হাতে মধ্যে  নিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো !

 

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ