18 Mar

ঝরা পালকের কবি, আপনাকে…

লিখেছেন:ঋভু চৌধুরী


“তুমি তো জানো না কিছু – না জানিলে,

আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে;

যখন ঝরিয়া যাবো হেমন্তের ঝড়ে –

পথের পাতার মতো তুমিও তখন

আমার বুকের ‘পরে শুয়ে রবে?

অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন

সেদিন তোমার!

তোমার এ জীবনের ধার

ক্ষ’য়ে যাবে সেদিন সকল?

আমার বুকের ‘পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল,

তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই?

শুধু তার স্বাদ

তোমারে কি শান্তি দেবে?

আমি ঝ’রে যাবো – তবু জীবন অগাধ

তোমারে রাখিবে ধ’রে সেদিন পৃথিবীর ‘পরে,

– আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে। ”

বহুদিন স্বপ্নে দেখেছি  ধলেশ্বরী নদীর চড়ায় চিলের কান্নার মত তীক্ষ্ণ আর গভীর বিষাদী এক আলো নত হয়ে আছে। কলমি লতায় লেগে ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে অস্তরবিরশ্মি মাখা জল। আর প্রাচীন মাছের দল সারাদিন ঘাই মেরে মেরে অবসন্ন ফিরে যাচ্ছে শ্যাওলা ঘেরা সবুজ অন্ধকারে। যাবার সময় ঠুকরে ঠুকরে খেয়ে গেছে আমার পা। পরিবর্তে দিয়ে গেছে রুপোলি আঁশের শরীর, বহুবর্ণ লেজ। এখন ফেরবার পথ নেই কোন। এখন আমি কী করে নাগাল পাবো তোমার?  আমার সাথে মিলতে গেলে তোমাকেই যে খুঁজে খুঁজে আসতে হবে দিনান্তের সূর্য আর আমার দুঃখরঙে রাঙা হয়ে ওঠা এই নদীর কিনারে। কে তোমায় পথ বলে দেবে? দেখি এক ভূতগ্রস্ত কবি বহু দূরে হেঁটে যাচ্ছেন একা- উসকোখুসকো চুল, অবিন্যস্ত পা। ঘিঞ্জি শহর থেকে ট্রামলাইনেরা আলপথ হয়ে মিশে যাচ্ছে হেমন্ত কুয়াশায়, দিকচক্রবালে। এবং নীহারিকা পার হয়ে আসা একটা ট্রাম ঝমঝম শব্দ তুলে বধির করে দিচ্ছে সমস্ত চরাচর। ভেঙে চৌচির হয়ে যাচ্ছে নদীবক্ষের টলটলে জল, প্যাঁচার পাটকিলে চোখের মত দৃশ্যপট,  আমার শেষ না হওয়া স্বপ্ন।

ওই উন্মন কবি একা খবর রাখেন কোনখান থেকে আসে অবসাদী হাওয়া, যুগান্ত পার করা অপেক্ষার ঢেউ, আমার বিষাদভার এবং তোমার ওই ফিরে আসবার পথের ঠিকানা। তাকেও আর খুঁজে পাই না কোত্থাও।

ঘুম ভেঙে উঠে আমি বহুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকি। ক্রমশ হেমন্তের দিকে যাত্রা করছে জীবন। একে একে খসে যাচ্ছে সম্বৎসরের হলুদাভ পাতা, স্মৃতি ও স্বজনেরা। ঝরে যাচ্ছে অভ্যন্তরের কত সুকুমার, অকপট, সরল উৎসাহ। জীবনানন্দ, এই পড়ে আসা দিনে আমি চুপিচুপি গিয়ে বসছি আপনার কবিতার কাছে । অক্ষরমালার থেকে ঝরে পরছে বিন্দু বিন্দু  রক্ত। জেগে উঠছে অনিরুদ্ধ মায়া। বোঝা না বোঝার কুহকী অস্পষ্টতায় আমি দেখছি উদাসীন ঘাসের প্রান্তর, সাপের খোলস, নীড়, শীত। এবং অপেক্ষার পঁচিশ বছর। দেখছি দারুচিনি দ্বীপের ভেতর বহুকাল ধরে হন্যে হয়ে খুঁজে চলা মুখ। চিনে নিতে শিখছি কেমন করে –

“শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে

অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের খেতে;

মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার- চোখে তার শিশিরের ঘ্রান

তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান…”

আপনি আমার অবসাদ কে গচ্ছিত রাখুন জীবনানন্দ। আপনার ঝুলির মধ্যে তারা কিছুটা আশ্রয় পাক। ছায়া পাক। পাক কিছু আদরের ওম। তারপর একদিন ঠিক তাদের চোখ ফুটে যাবে। শরীরে জন্ম নেবে ধূসর পালক। এবং অনভ্যস্ত দুটো ডানাও শিখে নেবে অনুপুঙ্খ উড়ান কৌশল। যত দিন যায় অবসাদে ন্যুব্জ হতে থাকা দেহ আর মন আকুল অপেক্ষা করে এই মুক্তির। সবকিছুরই তো একটা সমাপতন-কাল থাকা দরকার। অবসাদেরও।

হেমন্তের কাছে কত কী শেখে মানুষ। শেখে কেমন ভাবে আলগা করতে হয় মুঠি। শেখে রিক্ততার মধ্যেই নিহিত আছে আরম্ভের বীজ। হে আমার হেমন্তের অপরাজিত কবি, আপনার কাছে আমার এজন্মে অপরিমেয় ঋণ। আপনি শিখিয়েছেন কেমন করে নিজের চারদিকে ঘনিয়ে নিতে হয় অভেদ্য ‘চুপ’। এতখানি ‘চুপ’ যে মনে হয় তার মধ্যে শোনা যাবে প্রজাপতির ডানার শব্দ, নক্ষত্রের নূপুরধ্বনি। আপনি না থাকলে হয়তো দেখতেই পেতাম না কেমন করে

“পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে;

পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে;

পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দু’জনার মনে;

আকাশ ছড়ায়ে আছে শান্তি হয়ে আকাশে-আকাশে।”

ভাগ্যি এই দেখার আলোটুকু আমার মধ্যে চারিয়ে দিয়েছিলেন আপনি। এই আকাশখানা বুকের ভেতর নিয়েই ফুরিয়ে আসছে আয়ু, অপেক্ষার দিন, পথ চলার ক্লেশ।  আর নতুন খড়কুটো নিয়ে বাসা বাঁধছে এক পবিত্র বিশ্বাস। নিজেকেই নিজে মন্ত্রের মত শুনিয়ে যাচ্ছি–  ‘পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দু’জনার মনে; /আকাশ ছড়ায়ে আছে শান্তি হয়ে আকাশে-আকাশে।’ ধীরে ধীরে কেমন শান্ত হয়ে আসছে আমার মন। হেমন্তের মতন নির্লিপ্ত। নির্ভার। মহীয়ান।

জীবনানন্দ, সেই যে অসমাপ্ত স্বপ্নখানা বারবার ফিরে আসে ঘুমের ভেতর- ভুল জীবনে ঢুকে পরে আমি হারিয়ে ফেলছি ফেরার পথ। তাকিয়ে আছি দূরে- কেউ এসে নিয়ে যাবে একদিন এই অপেক্ষায়। আমি জানি আর কেউ পথ খুঁজে পাক বা না পাক আপনি বারবার ফিরে আসবেন আমার কাছে। এ মহাপৃথিবীর যাবতীয় শোক ও সন্তাপ, ক্ষুধা ও পিপাসার ওপর যখন টলমল করবে নীল কস্তূরী আভার চাঁদ আর জঙ্গল থেকে নখ-দাঁতের ভয় ভুলে একে একে বাইরে বেরিয়ে আসবে চন্দ্রাহত ঘাই হরিণের দল আমরা এসে বসবো আদিগন্ত মধুকুপী ঘাস-ছাওয়া মাঠের ওপর। রাতচরা পাখিদের আহ্বানে সেদিন আমাদের সব জমা দুঃখরাও অগুন্তি জোনাকি হয়ে মিলিয়ে যাবে নির্জন হেমন্তের বন বনান্তরে।

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ