19 Mar

আত্মহত্যা

লিখেছেন:আশাপূর্ণা দেবী


বিছানাটা ময়লা; বালিশটা তেলচিটে, তোশক থেকে বিশ্রী একটা ভ্যাপসা গন্ধ উঠছে … সারা বর্ষা রোদে পড়েছে কি না সন্দেহ। …  এ বিছানায় শুয়ে বরং লাখ টাকার স্বপ্ন দেখা যায়, কিন্তু স্বপ্ন দেখা যায় না সুদুর্লভ প্রিয়ার।

মেসের বিছানা নয় – বাড়িরই, তবে বাড়িতেও, মানে মোহনদের মতো বাড়িতে এর চাইতে ভাল কিছু আশা করা যায় না। শোবার জন্যে যে হাত চারেক জমি পেয়েছে এই যথেষ্ঠ।

অথচ বিছানা ছাড়া আর কোথায় পারে মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণ এলিয়ে দিয়ে কল্পনার রাশ ছেড়ে দিতে? … দৈনন্দিন জীবনের প্রচণ্ড সংগ্রামের ক্ষেত্রে কোথায় প্রতিষ্ঠা করবে মানসী মূর্তির?

জীবনলীলা নয়, জীবনযুদ্ধ!

সংসারকে আর এখন ‘তরণী’র সঙ্গে তুলনা করা চলে না এবং তুলনা করা যায় পাঁকে পুঁতে যাওয়া চাকা-ভাঙা গরুর গাড়ির সঙ্গে। … সেকালের লোকের সংসার করা মনে করলে হাসি পায়। পঞ্চাশ টাকা মাইনে পেয়ে দশ-বারোটি ষষ্ঠির বাছাকে মাছ-ভাত খাইয়ে পুষেছে, বিয়ে দিয়েছে গোটা পাঁচেক মেয়ের, দান-ধ্যান, তীর্থধর্ম, অনুষ্ঠানের ত্রুটি রাখেনি কিছু।

ধীরে-সুস্থে বেঁচে থেকেছে – মরণকালেও তাড়াহুড়ো করেনি। সজ্ঞানে গঙ্গাযাত্রা করে ইষ্টনাম জপ করতে করতে ধীরে-সুস্থেই মরেছে। সেকালের লোক রক্তের চাপ বেড়ে ফুটপাথে হুমড়ি খেয়ে পড়ে মরত না। যেমন মারা পড়লেন সেদিন মোহনের বাবা – অফিস ফেরৎ টিউশনি করতে যাবার পথে। তবু মোহনের বাবা রক্তের চাপ বৃদ্ধি অনুভব করেছিলেন তিপ্পান্ন বছর বয়সে – মোহনের মতো তেইশ বছর বয়সে নয়। করেছিলেন – নিতান্তই অর্থাভাবে আর অনাহারে। তবু মোহনের মতো এত অসুখী আর অসন্তুষ্ট কি ছিলেন তিনি? ঠিক উল্টো, তাঁর অল্পে সন্তুষ্টি, তুচ্ছ কারণে আনন্দ প্রকাশ, উচ্চাশাহীন স্বভাব দেখে ঘৃণায় বিরক্তিতে কি রকম বিতৃষ্ণ হয়ে উঠত মন, সেকথা এখনো ভুলে জায়নি মোহন।

বোধকরি মানসরাজ্যে মানসীর বালাই ছিল না বলেই তেলচিটে বালিশটাতে মাথা ফেলতে না ফেলতে অত সহজে ঘুমিয়ে পড়তে আটকাতো না তাঁর। … বিস্মৃতপ্রায় শৈশব থেকে এই একই রকম দেখে এসেছে মোহন।

যাক, আজ তাঁর কথা অপ্রাসঙ্গিক, শেষবারের মতো ঘুমিয়ে পড়বার সময় তেলচিটে সেই তাকিয়াটিও যে জোটেনি তাঁর এ আফসোসে মোহনের মা যতই আছড়া-আছড়ি করুন, মোহন মোটেই কাতর নয়।

ফুটপাথে পড়ে মারা যাওয়ার জন্য যেটুকু বা আড়ম্বর জুটেছিল – মৃত্যুকালে, ভ্যাপসাগন্ধওলা স্যাঁৎসেতে এই ঘরে শুয়ে ভুগে মরলে সেটুকুই কি জুটত? লাভের মধ্যে হয়তো মোহনের মা আর বোনের গায়ে যে সোনার ছিটেটুকু ছিল – যেত বিক্রমপুরে, দারিদ্র আর ব্যাধির সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে জীবনীশক্তি আসত ক্ষয় হয়ে, আর মোহনের মাথায় চাপত আরও কিছু ঋণভার।

এসব চিন্তার ফলাফল উচ্চারণ করলে আর ভদ্রসমাজে মুখ দেখাতে হবে না মোহনকে। – ‘নরাধম’ ‘পাষণ্ড’ ‘অকৃতজ্ঞ’ ‘বেইমান’ প্রভৃতি বিশেষণগুলো তবে আছে কি করতে?

কিন্তু চিন্তা করতে দোষ কি?

ওই একটিমাত্র বিষয়ে চিরদিনই স্বাধীনতা থাকবে মানুষের। মনে মনে তাই বাপের সদ্বিবেচনার প্রশংসা না করে পারে না মোহন।

যাক এসব বিগত ইতিহাস।

বর্তমানে একটা দেশী ব্যাঙ্কে যৎসামান্য মূল্যে নিজেকে ভাড়া দিয়েছে মোহন। এটা অবশ্য ওর নিজের সুচিন্তিত মতামত। এই চাকরিটা যে মোহনের ভবিষ্যৎ ভাগ্যের নিয়ামক এমন জঘন্য কথা ও ভাবতেই পারে না, সাময়িক একটা ভাগ্য-বিপর্যয় ছাড়া আর কিছু নয়। … ‘দাসত্ব-শয়তানে’র কাছে নিজের আত্মাকে বিক্রি করে ফেলবে মোহন? অসম্ভব।  … নিতান্ত বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে কিছুদিনের জন্যে ভাড়া দিয়েছে নিজেকে।

বাপ মারা যাবার পর যেমন ভাড়া দিয়েছে বাড়ির দু’খানা ঘর।

সাময়িকভাবেই হোক আর যাই হোক – ‘দশটা-পাঁচটা’ অফিস তাকে করতেই হয়, আরও ঘণ্টা তিনেক সময় ব্যয় হয় বি-কম ক্লাসটা বজায় রাখতে, অবসর এই রাত্রে।

যম-যন্ত্রণা ভোগ ক্রবার অবসর।

ঊষসীর মুখটা মনে পড়তেই নিজের উপর রাগে আপাদমস্তক জ্বলে গেল। এই বিছানায় শুয়ে – প্রিয়া-মূর্তির ধ্যান! … ছি ছি! মনে মনে যেন হাত দিয়ে সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখটা মুছে ফেলে উঠে পড়ল মোহন। … ভাঙা একখানা হাতপাখা নিয়ে নাড়তে লাগল বসে বসে। পাখার পক্ষ-সঞ্চালনে বাতাসটা না হোক, শব্দটা হচ্ছিল দস্তুরমতো জোরাল।

প্রত্যেক রাত্রে মনে করে সকালে উঠে আর কিছু না হোক একখানা পাখা কিনে আনবে, কিন্তু সকালে উঠে কোনওদিনই আর সেই তুচ্ছ বস্তুটার কথা মনে থাকে না।

সশব্দ বাতাসে বিরক্ত হয়ে ঠিক পাখাখানা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেবার মতো মনের অবস্থায় হঠাৎ মেঝের বিছানা থেকে জয়ন্তীর কণ্ঠস্বর বেজে উঠল –  এই আরম্ভ হলো দাদার পাখার ঠকঠকানি! বাবা! সারাদিন খেটে-খুটে এসে একটু যে ঘুমবো তার জো নেই।

বাড়িসুদ্ধ সকলকে একঘরে শুতে হয়।

ঘর ভাড়া দেওয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণাম হিসেবেই মেনে নিতে হয়েছে এটাকে। দারিদ্রের অনেক অসুবিধার মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য লাগে এইটে, তবু বিদ্রোহ করবার মুখ নেই। সারামাস ছুটোছুটি করে, আর নিজের জীবনীশক্তি ক্ষয় করে, মোহন সংসারের যেটুকু সাশ্রয় করে, বালির আস্তর-খসা ইঁট বার করা দীর্ঘ ব্যবহারে ক্ষয়প্রাপ্ত ঘর দু’-খানা যদি চুপচাপ বসে থেকে প্রায় ততটাই করে, অসুবিধে একটু সহ্য করে নিতে হবে বৈকি।

ঘর দু’-খানা তো খায়ও না, পরেও না। সাত-সকালে উঠে ওর জন্যে কারুর অফিসের ভাত রাঁধতেও হয় না, সে হিসেবে ওর চেয়ে মোহনের দাম কম। তাই সারা ঘর ভর্তি বিছানা মাড়িয়ে মাড়িয়ে চোখকান বুজে নিজের তক্তপোশটার ওপর উঠে এসে শুয়ে পড়া ছাড়া গতি কি।

কিন্তু মুখরা জয়ন্তীর জ্বালায় এক এক রাত্রে বাড়িটায় আগুন লাগিয়ে দিয়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে। … আশ্চর্য। দেশজোড়া হাঙ্গামার ফলে কত পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল – কত সুখী আর সমৃদ্ধ পরিবার! … আর মোহনদের এই জরাজীর্ণ বাড়িখানার একটা ইঁটও খসল না।

পাখাখানা ফেলে দেবার ইচ্ছে সত্ত্বেও জয়ন্তীর প্রতিবাদের প্রতিবাদকল্পে আরও জোরে নাড়তে থাকে মোহন।

– মা, দেখছ? জয়ন্তী মুখ-ঝামটা দিয়ে ওঠে – ইচ্ছে করে আরও বাড়ানো হচ্ছে বাবুর।

– কি করবে বল – তরুলতার শ্রান্ত আপোসসূচক কণ্ঠস্বর যেন অন্ধকারের মধ্যে উপায় হাতড়ে বেড়ায় – কি করবে? … এই গরমে পাখা না নেড়ে থাকতে পারে মানুষ? সারাটা দিন খেটেখুটে –

– না – পারে না! আমরা তো আর মানুষ নই? সারাটা দিন গদি পেতে শুয়ে থাকি যে – বেটাছেলের খাটুনি আবার খাটুনি! ঝি-রাঁধুনির কাজ থেকে জুতোসেলাই চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত করতে হলে বুঝতাম। … ফুলফোর্স পাখার তলায় চেয়ারে বসে অমন শৌখিন কাজ সবাই করতে পারে।

মোহন বিদ্রূপতিক্ত স্বরে বলে ওঠে – একদিন না হয় কাজটা বদল করে দেখুন না মহাশয়া? তা সে তো এ, বি, সি, ডি লিখতে কলম ভেঙে যাবে।

সঙ্গে সঙ্গে মুখরা জয়ন্তী ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে – যাবে – সেটা আমার পক্ষে ততটা লজ্জার নয়, যতটা তোমাদের। বুঝলে? আকাশে থুথু ছুঁড়লে নিজের গায়েই পড়ে তা মনে রেখো।

– রাখব বই কি। কত কিই মনে রাখছি অষ্টপ্রহর, আর এইটুকু রাখব না?

– চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলো না দাদা, শুনলে গায়ে বিষ ছড়ায়। বাবা নেই, আমাদের স্বচ্ছন্দে রাখবার দায়িত্ব তোমার, তা জানো?

– খুব জানি। মোহন হেসে ওঠে – শুধু স্বচ্ছন্দে রাখবার? মার বাতের চিকিৎসা করাবার, – খুকির পেটের পিলে সারাবার – শোভনকে বিলেতে পাঠাবার – আর তোমাকে রাজপুত্র খুঁজে এনে বিয়ে দেবার – এসব দায়িত্ব?

– নিশ্চয়ই তো। … জয়ন্তীও যে বিছানায় উঠে বসেছে অন্ধকারেও টের পাওয়া যায় – অন্ধকারের ওপর যেন কেটে কেটে বসছে তার কথাগুলো – ভেঙচাতে লজ্জা করে না তোমার? মানুষ যদি হতে, তাহলে মনের ঘেন্নায় মাটিতে মিশিয়ে থাকতে।

– জয়া, কি হচ্ছে! তরুলতা ধমকে ওঠেন – ধমকের সুরে নয়, অসহায় সুরে। মেয়েকে এঁটে ওঠবার ক্ষমতা তাঁর নেই, শুধু প্রতিবাদ না করলে নয় বলেই করা।

– আহা বলুক বলুক – মোহনের তীব্র ব্যঙ্গ যেন ছুরির ফলার মতো ঝলসে ওঠে – কথা বলতে তো ট্যাক্স লাগে না! গভর্নমেন্ট-কন্ট্রোলও নেই ওতে – বলুক না যত খুশি।

– আমাকে ঠাট্টা করে নিজের ত্রুটি ঢাকতে চেষ্টা করছ, কিন্তু মনে রেখো দাদা, জগতে তুমি একাই বুদ্ধিমান নয়।

– আচ্ছা, তুইও খুব বুদ্ধিমান – তরুলতা অনেক কষ্টে কণ্ঠে একটু কর্তৃত্বের সুর আমদানি করেন – এখন শো দিকি। ও বেচারা সারাদিন আপিসের খাটুনি খেটে …  আবার পাশের পড়া পড়ে – এই একটু শুয়েছে, লাগতে গেল ওর সঙ্গে। …  গরমে সারা হয়ে যাচ্ছে, পাখা নাড়বে না! তোর যেন সবই জবরদস্তি। অতবড় ছেলে – এই ভেড়ার গোয়ালে শোওয়া, কম কষ্ট?

– কষ্ট করতে কে বলেছে? আনুক না মাসে পাঁচশো টাকা করে, রাজার হালে থাকবে। তুমি খালি দাদার দিকটাই দেখতে পাও, শোভনটার কথা ভাব দিকি? ওইটুকু ছেলে কী না করছে সংসারের? দাদা কোনওদিন দু’পয়সার জিনিস কিনে এনে উপকার করেছে তোমার? কী যেন এক লাটসাহেব বিলেত থেকে এসেছেন – তোমাদের বাড়িতে থেকে কেতাত্থ করছেন তোমাদের! দেখতে পারি না ওই নবাবি। হাড় জ্বলে যায়।

– তোমাদের  কথাগুলিও ঠিক অন্যের কানে মধুবর্ষণ করে না, বুঝলে? এখন দয়া করে থামবে? না পার্কের বেঞ্চে গিয়ে শুতে হবে? – মোহন ঠাণ্ডা গলায় বলে।

– যাও না, কে বারণ করেছে – জয়ন্তী ধুপ করে শুয়ে পড়ে আবার – তবু তো পার্কের বেঞ্চিও আছে তোমাদের, আমাদের তো ক্যাওড়াতলা ছাড়া আর জায়গা নেই।

তরুলতা বিরক্ত ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, তোর আজকাল কী মুখই হয়েছে জয়া! উনি গিয়ে পর্যন্ত তুই যেন কী হয়ে গেছিস!

– বেশ তো, বাবার সঙ্গে আমাকেও দিলে না কেন বিদেয় করে, হাড়ে বাতাস লাগত তোমাদের! দজ্জাল দস্যি লক্ষ্মীছাড়িকে রাখবার দরকার কি?

তীক্ষ্ণ স্বর ভারী হয়ে আসে।

– আর কি, এইবার আরম্ভ কর ফোঁসফোঁসানি! … যা খুশি বললাম আর বেগতিক দেখলেই কেঁদে জিতলাম – মেয়েমানুষ হওয়া মন্দ নয়।

পাখাটা ফেলে দিয়ে মোহন বিছানা থেকে নেমে পড়ে। ছোট ভাইবোনদের হাত-পা মাড়িয়ে কোনওরকমে এগোয় দরজার দিকে!

– কোথায় যাচ্ছিস?

তরুলতা উঠে আর্তস্বরে প্রশ্ন করেন।

– ভয় নেই, ক্যাওড়াতলার দিকে নয়। … মোহন হেসে ওঠে – নিশ্চিন্তে থাকো, শেষ পর্যন্ত এই ভেড়ার গোয়ালেই ফিরে আসব। শুধু বাইরের হাওয়া একটু লাগিয়ে আসি মাথায়।

– সাধ করে বলি ‘নবাব’! আর একবার জয়ন্তীর গলা শোনা যায় – এতগুলো লোক ঘুমোতে পারে এই ঘরে, ওঁর আবার রাতদুপুরে মগজে হাওয়া লাগাতে না গেলে হয় না।

– জয়া! ফের? … তরুলতা হঠাৎ হাত বাড়িয়ে মেয়ের চুলের ঝুঁটিটা নেড়ে দেন, বোধকরি বেশি ভীরুরাই মরিয়া হয়ে উঠে হঠাৎ একটা দুঃসাহসের কাজ করে বসতে পারে। তাই – তীব্রস্বরে বলেন – কেবল কথার ওপর কথা? তোর কেন মরণ হয় না লক্ষ্মীছাড়ি!

অন্ধকারে জয়ন্তী হেসে ওঠে – আঃ, গেল খোঁপাটা। আমার মরণ হলে তোমার সুখটা কিছু বাড়বে মনে কর? বাতের ব্যথায় তো নড়তে পার না। নইলে মরে একবার দেখতে ইচ্ছে করে।

– অত সোজা নয়। মোহনের তীব্রস্বর যেন অন্ধকারের বুকে নিদারুণ রেখা টেনে টেনে চলে – মরা অত সোজা হলে আর ভাবনা ছিল না। এ বাড়ির কারুরই বেঁচে থাকবার রাইট নেই, বুঝলি? তোর নয়, আমার নয়, মার নয়, শোভন, খুকি, কারুর নয়। তবু বাঁচতে হবে। বাঁচা নয় – বেঁচে থাকা। পৃথিবীর ধান-চালের ভাগীদার হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে মাথা খুঁড়ে খুঁড়েও বেঁচে থাকতে হবে। গলায় দড়ি!

ছেঁড়া চটিটার শব্দ হয়।

সদর দরজা খোলার শব্দর সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যায় সে শব্দ।

তরুলতা বাতগ্রস্ত পা-টাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি উঠতে গিয়ে বসে পড়ে গোঙাতে থাকেন … আর গালি পাড়েন মেয়েকে। … সর্বনেশে মেয়ে! তোর জ্বালাতেই ও একদিন আত্মঘাতী হবে।

– আত্মঘাতী হওয়া অত সোজা নয় মা। শোও দিকি স্থির হয়ে।

– তুই আর বলবি না কেন দস্যি! মায়ের প্রাণ তো নয়! … তরুলতা হতাশভাবে বলেন – কি মতলবে বেরিয়ে গেল তাই বা কে জানে –

– কিছু মতলব নয় মা, কেন ভাবছ? গোটা দুই সিগারেট ধ্বংসে এখুনি ফিরে আসবে মাথা ঠান্ডা করে – দেখ।

মেয়ের ভবিষ্যৎবাণীতে তরুলতা আশ্বস্ত হতে পারেন না। প্রথমে গজগজ করেন, তারপর কান্না জুড়ে দেন। কিন্তু জয়ন্তীর ভবিষ্যৎবাণীটা সত্যিই মাঠে মারা যায়। সে-রাত্রে আর ফিরে আসে না মোহন, পরদিন সকালেও না।

টাকা, টাকা! অনেক টাকা … অজস্র টাকা!

পার্কের রেলিং টপকে ঢুকে একটা বেঞ্চ দখল করে আকাশমুখী হয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকে মোহন। মাত্র মাসে পাঁচশো টাকা নয় … অজস্র টাকা। বাড়ির প্রত্যেকটি ইঁট কাঠ পর্যন্ত যেন তারস্বরে চিৎকার করছে … ‘টাকা চাই টাকা’।… কী কুৎসিত মুখভঙ্গি জয়ন্তীর! মায়ের মুখে কী মৌন তিরস্কারের ভঙ্গি!

চোখের সামনে নেই ঝুলকালি পড়া কড়িবরগা যে, সমস্ত কল্পনা ব্যাহত হয়ে ফিরে আসবে। তারাভরা খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে কল্পনার রাশ ছেড়ে দিতে বাধে না। কল্পনা করে মোহন, সেই ঐশ্বর্যের। গোনাগাঁথা টাকা নয়… দু’হাতে মুঠো মুঠো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলা যায়, এত টাকা! সেই টাকায় মুখ বন্ধ হবে জয়ন্তীর, কৃতার্থ অনুগত হয়ে থাকবে সদা-বিরক্ত উদ্ধত ছোট ভাইবোনেরা। … শোধ করা যাবে মাতৃঋণ… উদ্ধার করা যাবে নিজের আত্মাকে… কেনা যাবে ঊষসীকে। কেন নয়? কী না হয় টাকায়? ঊষসীকে কেনা যায় টাকায়। শুনতে খারাপ হলেও প্রখর সত্য। নির্লজ্জ সত্য।

শুধু অর্থটা চাই যথেষ্ট। কিংবা আরও বেশি। … যথেষ্টর অতিরিক্ত।

সেই টাকা যদি ওই ‘ঊর্ধ্বলোকে থেকে ঝর ঝর করে ঝরে পড়ে।… পড়লে অবশ্য মোহনের পক্ষে চমৎকার হতো, কিন্তু ঊর্ধ্বলোবাসীরা’ অত বোকা নয়।… টাকার বদলে ঝরঝর করে খানিকটা স্নিগ্ধ বাতাস বর্ষণ করলেই যদি তখনকার কাজ চলে যায়, মন্দ কি?

সমস্ত দাবি আর সমস্ত প্রশ্ন বিস্মৃত হয়ে অন্তত তখনকার মতো তো শান্ত হয়ে গেল মোহন!

ঘুম ভাঙল… একেবারে ভোরে।

উঠে চারদিক তাকিয়ে দেখলে আশে-পাশে ছড়ানো আছে কি না টাকা … প্রত্যেকটি কোণ আর বেঞ্চির তলা, গাছের গোড়া আর ঘাসের ফাঁকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলে – হাজার টাকার নোটের গোছা ফেলে গেছে কি না কেউ।

পেলে পরে ভগবানে বিশ্বাসী হয়ে উঠবে মনস্থ করেছিল … হলো না বিশ্বাসী হওয়া!

কিন্তু সারাদিন অনির্দিষ্টভাবে ঘুরে বেড়ালেও রাত্রে আর কোথায় যাবে? ভেড়ার গোয়াল ছাড়া? কাল সারারাত খোলা মাঠে শুয়ে, আর আজ সারাদিন অস্নাত অভুক্ত অবস্থায় এলোমেলো ঘুরে জ্বর আসছে যেন। … তাছাড়া ক’দিন আর কামাই করা যায় অফিসের? … বাড়িতে ফিরতে হবে বৈকি।

কিন্তু বাড়িতে যে এমন একটা অদ্ভূত ব্যাপার অপেক্ষা করেছিল ওর জন্যে তা কে ভেবেছিল?

টাকা নয় – একটি পাইপয়সাও নয়, বিনা খরচে মুখ বন্ধ হয়ে গেছে জয়ন্তীর। … দিনে দুপুরে ঘরের খিল বন্ধ করে একগাছা দড়ি গলায় জড়িয়ে জড়িয়ে গলার স্বরটাকে বন্ধ করে ফেলেছে সে।

বাড়ি ঢুকে বাড়িটাকে যেন চিনতে পারে না মোহন।

কোথা থেকে যে এত লোক জড়ো হয়েছে, এও এক রহস্য।

জীবনের কোনওখানে একতিল সমারোহ নেই বলেই কি ব্যালেন্স রাখতে মৃত্যুটা আসছে এমন সমারোহ নিয়ে? … বাবার এলো, এলো জয়ন্তীর।

জয়ন্তী যে আর কোনওদিন কথা বলবে না এইটে ভেবেই ভারি অবাক লাগে মোহনের। … মুখরা জয়ন্তী!

বাতের ব্যথা নিয়ে ছুটে এসে আছাড় খাবার ক্ষমতা নেই বলেই – ছেলেকে দেখে নতুন করে ডুকরে ওঠেন তরুলতা। … মেয়ের ওপর যে একদিনের জন্যে কোনও কর্তব্য করতে পারেননি … খেতে পায়নি, পরতে পায়নি, মায়ের সংসারে দাসীবৃত্তি করতে করতেই যে তার জীবনে ধিক্কার এসে গিয়েছিল, এই কথাটাই ফলাও করে বিলাপ করতে থাকেন তরুলতা … বলেন – বাছা আমার মনের ঘেন্নায় আত্মঘাতী হলো রে মোহন!

মনের ঘেন্না!

ও জিনিসটার বালাই জয়ন্তীরও ছিল নাকি? মূর্খ অশিক্ষিত মুখরা জয়ন্তী, ভব্যতালেশশূন্য সভ্যতাজ্ঞানহীন জয়ন্তী – ঊষসীর মতো মেয়েদের সামনে যাকে বার করাই চলে না – তারও আবার ঘেন্না এত জোরাল হয়?  … গলায় দড়ি দেবার মতো জোরাল! … জয়ন্তীর মতো মেয়েরও মন থাকে? চিন্তাজগৎ থাকে?

মনের ঘেন্নায় মোহন আত্মঘাতী হলো না – হলো জয়ন্তী?

কিংবা জয়ন্তী বলেই সম্ভব হলো।

অশিক্ষিত অসভ্য বলেই বোধকরি ওর আবেগের বাহ্যিক প্রকাশটা এত প্রচণ্ড। সভ্য সুশিক্ষিত মোহন মনের ঘেন্নায় বড়জোর একটা অশান্ত রাত্রি কাটাতে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পার্কের বেঞ্চে পড়ে থাকতে পারে, একটা তিক্ত বিষাদ দিনকে সহ্য করে নিতে এলোমেলো ঘুরে বেড়াতে পারে, তার বেশি নয়!

মনের ঘেন্নাকে পরিপাক করতে না শিখলে আর শিক্ষা কি? সভ্যতা কি?

ভাড়ার মেয়াদ বাড়তে বাড়তে শেষ পর্যন্ত হয়তো শয়তানের কাছেই বিক্রি হয়ে যাবে আত্মা … কিন্তু তাই বলে – আত্মহত্যা? ছিঃ! যেন একটা সস্তা নাটকের বাজে অভিনয়!

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ