14 Oct

গুড টাচ ব্যাড টাচ

লিখেছেন:সমীর ঘোষ


বালি স্টেশনে ব্যান্ডেল লোকালটা ঝমঝম করে ঢুকে পড়ে একটু স্থির হতেই, হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়ল সুরমারা। আর্য চেঁচিয়ে বলল সবাই উঠেছো তো?

ওদিক থেকে মিতালি উত্তর করলো, হ্যাঁ হ্যাঁ আমরা সবাই উঠেছি,তোমরা?

আবির জিজ্ঞাসা করল,  মা কোথায়? রিঙ্কিতা তোমাদের ওখানে আছে তো?

হাওড়া থেকে ছাড়া রাত্রি নটা ত্রিশের ব্যান্ডেল লোকাল বালি এল প্রায় দশটায়। ট্রেনে আজ যেন বেশি ভিড়। এমনিতে কামরায় প্রচুর লোকজন আগেথেকেই ছিল। তার উপর বালিতে উঠে পড়ল একগাদা প্যাসেঞ্জার। সুরমারা গিয়েছিল অনুষ্ঠান বাড়িতে । বৌমার বোনের ছেলের দশ বছরের জন্মদিন। পয়সা থাকলে মানুষ কী না করতে পারে। বৌমার বোন লিপিকা নিজে একটা বিউটি পার্লার চালায়। আর হাজব্যান্ডের প্রোমোটারি ব্যবসা । উত্তরপাড়া-বালি-বেলুড় তল্লাটে একের পর এক ফ্ল্যাট বানিয়েই চলেছে। ছেলের জন্মদিনে নিমন্ত্রিত সাতশো ছাড়িয়ে গেছে। এলাহি বন্দোবস্ত। সুরমা যাবেন নাই বলেছিলেন। এই বয়সে আর বেশী ধকল  নিতে পারেন না । আর্য আর আবীরের বাবা হঠাৎ বাস এক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছেন। তখনও রিটায়ারমেন্টের বছর দশেক বাকি অভীকবাবুর। অভীকবাবু মানে অভীক বসু। সুরমা তখন পঞ্চাশ। সুন্দরী, শিক্ষিত হয়েও তিনি একেবারেই গৃহবধু । দুই ছেলেকে মানুষ করার গুরুদায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। অভীক চাকরি করতেন রেলে। সংসারে অভাব তো ছিলই না বরং শেওড়াফুলিতে অভীকের বিশাল পৈত্রিক বাড়িতে ওদের জীবনযাত্রা বেশ সচ্ছল ছিল। দুই ছেলের ভালো স্কুলে লেখাপড়া, চাকরি পাওয়া, বিয়ে দেওয়া, হাঁড়ি-ঘর-আসবাব  আলাদা করে দেওয়া – এতসব দুজনে মিলে ভেবেচিন্তে আলোচনা করে করেছেন ওরা। সবই ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু হঠাৎ ছন্দপতন ঘটে গেল অভীকের মৃত্যুতে। জীবনসঙ্গীর করা চাকরির সুবাদে মোটা পেনশনের বন্দোবস্ত থাকলেও মানসিকভাবে একা হয়ে গেলেন সুরমা । আত্মীয় স্বজনের বাড়ি যাওয়া প্রায় বন্ধই করে দিলেন । আর্যর ছেলে আখ্যানের বয়স এখন কুড়ি বছর। সে ছিল দাদুর খুব প্রিয়। আখ্যানকে স্নেহের বন্ধনে আগলে রাখলেও ছোট ছেলের কন্যা সন্তানের মুখ দেখে যেতে পারেননি অভীক। অভীকের  মৃত্যুর পাঁচ মাস পরেই জন্ম রিঙ্কিতার। ছোটবেলা থেকে তার ঠাকুরমাই সব। এক জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে অন্য সঙ্গী রিঙ্কিতাকে তাকে কাছে পেয়ে জীবনটাকে অন্যভাবে গড়ে নিতে চেয়েছেন সুরমা।

ট্রেনটা ছেড়ে দিলেও গুঁতোগুঁতিটা কমছে না। বালি থেকে কায়দা করে সুরমাকে ট্রেনে আগে উঠিয়ে দিয়েছে আর্য। কামরার  অন্য দরজা দিয়ে উঠেছে আবির ও তার বউ অনিন্দিতা। সঙ্গে রয়েছে আর্যর বউ মিতালি। ছোট্ট রিঙ্কিতাকে কিছুতেই কাছ ছাড়া করতে চাননা সুরমা । তাই ভিড়ের মধ্যে নাতনিকে বুকে জড়িয়ে কোনওরকমে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। শেওড়াফুলি থেকে বিকেলে ওরা যখন যায় তখন ট্রেন দারুন ফাঁকা। যেন সিটগুলোয় শুয়ে যাওয়া যায় । যাওয়ার সময় সঙ্গে আখ্যান ছিল। সে আজ মাসির বাড়িতেই থেকে গেল। দিন দুই কাটিয়ে ফিরবে। উত্তরপাড়া আসতেই এক ধাক্কায় কিছু লোক নেমে গেল । রিঙ্কিতাকে নিয়ে সুরমা ঠেলাঠেলির মধ্যেই ঢুকে পড়তে পারলেন দুটো বসার রো-এর মাঝে চ্যানেলের মধ্যে । ঢুকে পড়তে পারল  আর্যও। পাটভাঙা নতুন শাড়ি পরে অনুষ্ঠান বাড়ি গিয়ে গলদঘর্ম অবস্থা সুরমার। ঘামছে রিঙ্কিতাও। সুন্দর লাল সাদা রঙের ফুল ফুল কাজ করা ঘাঘরা পড়ে সে যেন ডানা কাটা পরী। হঠাৎই জায়গা পেয়ে গেলেন সুরমা । তাঁকে বসতে দিয়ে উঠে পড়লেন এক ভদ্রলোক। এমনিতেই শরীরের ধকল আর নিতে পারছিলেন না। বসার জায়গা তৈরি হতেই কোনও দিক না তাকিয়ে বসে পড়লেন সেখানে। বুঝলেন তার বসার পক্ষে জায়গাটা নিতান্তই ছোট । কিন্তু বসাটা তার খুবই জরুরী। এই বয়সে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে কোমর টনটন করে। রিঙ্কিতাকে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে বসতে গিয়েই বুঝলেন বসার জন্য খুব সংক্ষিপ্ত জায়গাই অবশিষ্ট রয়েছে তার জন্যে। তবুও তিনি উঠলেন না।

এভাবে হৈ চৈ  করে  কারোর বাড়ি যাওয়া বা অনুষ্ঠান বাড়ি যাওয়া একেবারেই ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু বড় বৌমার  বোন লিপি ছাড়বার পাত্রী নয়। যেতেই হবে । বাড়ির সকলে হৈ হৈ করে উঠল। ছোট ছেলে বলল কেন যাবে না মা তুমি? অনেক বছর তো হল বাড়ি থেকে বের হও না। কারোর বাড়ির অনুষ্ঠানে যাও না। লোকে কি ভাবে বলোতো? ছোট বৌমা অনিন্দিতা বলল এভাবে নিজেকে এক্সপ্লয়েট করার কোনও মানে হয় না। বাবা তো পাঁচ বছর আগে চলে গেছেন । তাহলে আপনার জীবন থমকে যাবে? এখনো কত ইয়ং আপনি।

সুরমা এসবে কান দিতে চান না । তিনি জানেন সাজলে গুজলে এখনও তাকে বেশ সুন্দরী দেখায়। এই পঞ্চান্নতেও মনে হয় যেন পয়তাল্লিশ। বউমাদের পাশে যেন দিদির মত লাগে । কিন্তু তাতে কি? তাঁর এসব সাজগোজ, উৎসব-অনুষ্ঠান ভালো লাগেনা।

বসে থাকতে থাকতেই একটা অস্বস্তি অনুভব করলেন সুরমা। কারও একটা হাত তার পিঠে লাগছে। এমনিতেই ট্রেনটায় ভিড় এখনও কমে নি। চ্যানেলে লোক ভর্তি। ছোট্ট রিঙ্কিতাকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে কোনরকমে একটু এগিয়ে বসলেন। তাঁর  বসা সিটে আর কে কে বসে আছে তা তিনি দেখতেও যেমন পাচ্ছেন না তেমন তার চেষ্টাও করছেন না তিনি। হতে পারে হাতটা অনিচ্ছাকৃতভাবে এক-দুবার লেগে গেছে । ট্রেনে বা বাসে এরকমটা হতেই পারে। স্বামীর সঙ্গে যখনই রাস্তায় বের হতেন তখনই একগুচ্ছ টেনশন নিতেন অভীক। বলতেন  নারীর মর্যাদা,সম্মান রক্ষা করার দায় একজন পুরুষ মানুষ হিসেবে আমারও । সমাজ, নারী-পুরুষ সম্পর্ক,  সংসার এই সব নিয়ে অভীকের নানা রকম ভাবনা বেশ ভালো লাগত সুরমার । মনে হত অভীক আর পাঁচটা গড়পড়তা পুরুষের মত নয় । ওর ভাবনার একটা গুরুত্ব আছে । সততা আছে। ভালোলাগা আছে। তবে সংসার জীবনে মন কষাকষি ঝগড়া যে হয়নি তা নয় । তবে তা কোনোদিনই মাত্রা ছাড়ায় নি। নিজেকে কখনো পুরুষ বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেননি অভীক। অভীকের সঙ্গে যখন বাইরে বেরোতো তখন যেন একটা ভরসা তার সঙ্গী হয়ে পাশে পাশে হাঁটত। আবার পেছনে হাতের স্পর্শ টের পেলেন সুরমা। একটা হাত এমনভাবে রাখা যেন তা সুরমার একটু হালকা নড়াচড়া হলেই তার শরীরের স্পর্শ পেয়ে যাবে । ক্রমশ হাত আরও গভীর স্পর্শ নেওয়ার চেষ্টা করছে । ভিড়ের মধ্যে অস্বস্তি বাড়তে লাগল। সামনেই হাতল ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর্য। সুরমার দিকে তাকালো। চোখের ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল বসতে অসুবিধা হচ্ছে না তো?

অস্বস্তিটা জানান দেবার চেষ্টা করলেন না সুরমা। রিঙ্কিতাকে  নিয়ে একটু নড়েচড়ে বসলেন তিনি । হাতটা টুক করে সরে গেল পিঠ থেকে ।

সুরমা জানেন দিনকাল ভালো নয় । তবুওতো আজকের মেয়েরা অনেক এগিয়ে গেছে, পৃথিবী শাসন করছে। তার দুই বৌমাই তো দুই বেসরকারি অফিসে ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঁচু পদ সামলায়। হম্বিতম্বি কম নয় । কিন্তু মেয়েরা এত এগোলেও সমাজ বদলাচ্ছে কই?  অত্যাচারিত মেয়েদের সংখ্যা প্রচুর । সুরমা ঘরে বসে থাকলেও নিয়মিত খবরের কাগজ  পড়েন, টিভিতে নিউজ দেখেন। প্রতিদিনই মেয়েদের উপর হয়ে চলছে বর্বর অত্যাচার । শ্লীলতাহানি ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে । কিভাবে পুরুষ মানুষ নিজেদের? খাবলে খাবলে মাংস খেয়ে গোটা নারী জাতিকে শেষ করে দেবে? এসব দেখেই কী আর ঘর থেকে বেরোতে ইচ্ছে করে না সুরমার? পিছনের হাতটা আবার অসভ্যভাবে স্পর্শ করছে সুরমার দেহ। এবার আরও সরাসরি, আরও ডোন্ট কেয়ার মনোভাব নিয়ে । রাগে মাথা গরম হয়ে উঠতে লাগল সুরমার। এখন তাঁর বয়স পঞ্চান্ন। এই প্রায় বৃদ্ধা বয়সের এক নারী শরীরকেও ছাড়বে না পুরুষের কামুক হাত। ভাবল, হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে হাতের মালিককে উচিত শিক্ষা দিয়ে দেয়। কিছু মাথায় এল অন্য কথা । সামনে আর্য দাড়িয়ে। মায়ের শরীরে যে একটা হাত খেলা করছে এই ভিড়ে সেটা তার জানার কথা নয় । হইচই করে হঠাৎ কিছু করে ফেললে যদি সিনক্রিয়েট হয়ে যায়।  কামরা ভর্তি  লোক আর ছেলে, বৌমা, নাতনির সামনে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে । কাগজে বা লোক মুখে ট্রেনে-বাসে এমন ঘটনার কথা শুনেছে বটে কিন্তু বাস্তবে কখনো এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। সুরমা আরও সরে বসার চেষ্টা করলো। হাত আবার সরে গেল। ছোট্ট রিঙ্কিতাও একটু বেশী ছটফট করছে । ও কি ঠাকুমার অসুবিধেটা ফিল করতে পারছে । আর্যর ছেলে আখ্যানকে কোলে পিঠে করে বড় করেছিল দাদু অভীক বসু।  আর ছোট ছেলে আবিরের মেয়ে রিঙ্কিতার অনেকটা সময়ের সঙ্গী সুরমা। তার ভালো মন্দের দায়-দায়িত্ব অনেকটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। আর মেয়েটাও ঠাকুমাকে কাছছাড়া করতে চায়না । বাবা মা বকলে সুরমাই তার নিশ্চিত আশ্রয় । সুরমাকে অগ্রাহ্য করে রিঙ্কিতাকে শাসন করার সাহস আবির বা অনিন্দিতা কেউই পায় না। এক এক সময় বড় আদরের রিঙ্কিতার জন্যও ভয় হয় সুরমার। খবরের কাগজ বা টিভিতে শিশু ধর্ষণের খবর গুলোয়  গা শিউড়ে ওঠে। শিশুরাই তো আজ এই সোসাইটিতে সবচেয়ে বড় সব সফট টার্গেট।

ট্রেন কিছুটা হলেও হালকা হয়েছে। দূর থেকে আবির চেঁচিয়ে বলল শ্রীরামপুর আসছে, এরপর শেওড়াফুলি । একটা স্টেশন আসছে আর প্যাসেঞ্জারদের উঠানামার ফলে কামরার মধ্যে নড়াচড়া চলছে । কিন্তু সুরমাদের বসার সিটে কেউই উঠছে না। মাঝেমধ্যেই অশ্লীল হাতের স্পর্শ টের পাচ্ছেন সুরমা। শ্রীরামপুর চলে যেতেই এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালেন সুরমা। পিছনে ঘুরতেই দেখলেন একটা হাত অপ্রস্তুত হয়ে লুকোবার পথ পাচ্ছে না । কিন্তু একি? এ কার হাত? এ তো একটা বাচ্চা ছেলে।  বয়স বড়জোর উনিশ বা কুড়ি । নাতি আখ্যানের সমবয়সী। পোশাক দেখে তো মনে হয় ভদ্র ঘরের ছেলে। এইরকম একটা টিন-এজ ছেলের হাত অসভ্যভাবে খেলা করছিল তার শরীরে? রাগে- অপমানে গা রি রি করতে লাগল সুরমার। ট্রেন  শেওড়াফুলিতে ঢুকছে। লম্পট ছেলেটা কেমন যেন নির্বিকার । যেন কিছুই হয়নি । এত বড় বয়স্ক মানুষের সঙ্গে এই রকম আচরণ করেও কোনও তাপ উত্তাপ নেই। এতদিন এইসব ঘটনার বিরুদ্ধে নীরবেই একটা প্রতিবাদ মনে মনে পুষে এসেছেন সুরমা। কিন্তু নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এরকম ঘটনায় কেন তিনি কিছুই করতে পারছেন না? প্রশ্নটা নিজের মনের মধ্যেই ঘুরতে লাগলো তাঁর। আসলে বুঝতে পারছেন বাস্তবটা বড় কঠিন । যেসব প্রতিবাদের কথা পড়েন বা শোনেন তার পেছনে যে কতটা সাহস লুকিয়ে থাকে তা যেন অনুভব করতে পারছেন আজ। একরাশ বিরক্তি নিয়েই ট্রেনের দরজার দিকে এগোতে লাগলেন সুরমা। সামনে রিঙ্কিতা আর আর্য। প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকলেই সকলের নামার পালা। হঠাৎ কি মনে হল ঘুরে দাঁড়ালেন সুরমা। আশপাশের সকলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে একেবারে হাজির হলেন বসে থাকা নির্বিকার ছেলেটির সামনে। হাতে থাকা ছোট ফ্যান্সি ব্যাগটাকে  কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে পরপর থাপ্পড় কশাতে লাগলেন ছেলেটির গালে। চিৎকার করে বলে  উঠলেন – লজ্জা করে না, একজন বয়স্ক মহিলার সঙ্গে এরকম অসভ্যের মত ব্যবহার করতে?

কোথা থেকে কি হয়ে গেল কেউই বুঝতে পারছেন না।  কামরার অনেকেই হই হই করে উঠলেন । ঠিক কী ঘটেছে ছেলেটাকে সামনে রেখেই সকলকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা চালালেন সুরমা। মায়ের সঙ্গে এরকম ঘটনা ও তার প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের কী ভূমিকায় থাকা উচিত  তা বুঝতেই কিছুটা সময় কাটিয়ে ফেললেন ছেলে বৌমারা। আর অন্যদিকে কৌতূহল তৈরি হওয়ায় কম্পার্টমেন্ট জুড়ে হইচই। যারা কাছাকাছি ছিলেন তাদের কেউ কেউ সুরমাকে সাপোর্ট করলেন । ছেলেটাকে শুয়োরের বাচ্চা, ছোটলোকের বাচ্চা বলে গালাগাল দিতে লাগলেন।  একজন বললেন, ওকে জি আর পিতে দিয়ে দিন। ওপাশ থেকে আওয়াজ উঠল তা বলে ছেলেটাকে মারবেন? এভাবে গায়ে হাত তুলবেন?

চোখে দেখা না গেলেও দূরের একটা জটলা থেকে আওয়াজ উঠল –  ঠেকে গেছে নাকি ? ও ট্রেন বাসে একটু ঠেকে।

অন্য একজন আওয়াজ দিল – ঘরে বসে থাকলেই তো হয় ।

একগাদা হট্টগোলের মধ্যে এসব কি শুনছেন সুরমা? ট্রেন শেওড়াফুলি স্টেশনে ঢুকে গেছে । এবার নামার পালা । ছেলে আর বউরা ইতিমধ্যেই ঘিরে ফেলেছে তাকে । বিধ্বস্ত সুরমাকে কোনওমতে স্টেশনে নামিয়ে আনাই তাদের এই মুহূর্তের প্রধান কাজ । সকলের কৌতূহলী চোখ এখন গিলে খাচ্ছে ওদের । চরম অস্বস্তিতে সুরমার মনে হলো তার জন্যই তো এসব হচ্ছে । হাত পা কাঁপতে লাগলো তাঁর । এ কী ঘটনা ঘটিয়ে ফেললেন তিনি? সিট ছেড়ে উঠে কিশোর ছেলেটার এমন অধঃপতন দেখে মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল সুরমার । শুরু হয়ে গিয়েছিল নিজের সঙ্গে লড়াই । অনেক চেষ্টা করেও নিজের মাথা ঠিক রাখতে পারেননি । তার মনে হল ছেলেটা কে উচিত শিক্ষা দেওয়াটাই সেই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরী কাজ ।

ট্রেন থেকে নেমে ছেলে বৌমারা কিছু বলবার আগেই একটু দূরে একটা কম আলোর জায়গায় একাকী গিয়ে দাঁড়ালেন সুরমা। চেষ্টা করলেন একটা বড় করে শ্বাস নেওয়ার । এমন সময় বাবার হাত ছাড়িয়ে ছুটে এল রিঙ্কিতা । একাকী দাঁড়িয়ে থাকা ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরল সামনে থেকে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল – ট্রেনে তুমি কেন এত রেগে গেলে বলবো? ছোট্ট রিঙ্কিতার  মিষ্টি মুখটা হাতে তুলে ধরে সম্মতি দিলেন সুরমা। তুমি যে আমায় ‘ব্যাড টাচ’,’গুড টাচ’ শিখিয়েছিলে, ট্রেনের কামরায় সেই ‘ব্যাড টাচ’ ছিল তাই না? রিঙ্কিতা জানতে চাইল। চোখের জল আর বাগ মানল না সুরমার। দু-হাতে নাতনিকে জড়িয়ে নিয়ে অঝোরে কেঁদে ফেললেন তিনি।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • Agniswar Chakraborty on October 21, 2018

    খুব ভালো লাগল।

    মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ