14 Oct

মুন্নারের সেই রাত

লিখেছেন:হিল্লোল ভট্টাচার্য


গল্পটা আমি শুনেছিলাম আমার এক বন্ধু পৃথ্বীশের কাছে। সে আজ থেকে প্রায় বছর দশেক আগের কথা। পৃথ্বীশ সদ্য বিবাহিত তখন, কাছাকাছি সময়ে ওর আর এক বন্ধু, অরিত্রর ও বিয়ে হয়েছিল। পৃথ্বীশ-মৌমিতা আর অরিত্র-সোহিনী, দুই দম্পতি একসাথে বেড়াতে গেছিল কেরালা। মানুষের হনিমুনের মেয়াদ ঠিক কতদিন? জানা নেই বোধহয়,  হীরকরাজের গণৎকার এর মত বলা যায়, “যদ্দিন তদ্দিন”!

তবে, বিয়ের পরে প্রথম বেড়াতে যাওয়া বলে এই সফরটাকে তাদের হনিমুন ট্যুর বলা চলে।

প্রথমে আলেপ্পি – কুমারোকোমে হাউসবোটে নৌকোবিহার,  তারপর পেরিয়ারে এক রাত কাটিয়ে তারা এল মুন্নার। সবুজ মুন্নার, তখনো বেশ সেক্লুডেড, উটি বা দার্জিলিং এর মত অতটা গিজগিজে ভীড় নেই। নিভৃত চা বাগান, উচ্ছল ঝর্ণা, দাক্ষিণাত্যের আনাইমুদি পর্বতশৃঙ্গ এবং প্রিস্টিন ড্যাম লেক – সব মিলিয়ে মধুচন্দিমা যুগলদের জন্য আদর্শ ভ্রমণস্থল ঈশ্বরের আপন দেশের শৈলশহর, এই মুন্নার।

সারাদিন সাইটসিয়িং সেরে তারা তাদের ডেরা, হোটেল ‘দ্য নেস্ট’ এ ঢুকতেই ঝমঝমিয়ে শুরু হল বৃষ্টি। ঈশ্বর কে ধন্যবাদ, দিনের বেলায় আকাশ পরিষ্কার ছিল ফলে ঘোরাটা মাটি হয় নি। এই হোটেলেই খাওয়ার বন্দোবস্ত থাকায় বাইরে বেরনোর প্রয়োজন নেই। ডিনার সেরে অরিত্রদের ঘরেই সবাই মিলে আড্ডা শুরু হ’ল। বর্ষার রাত, একথা সেকথার পর অনিবার্য ভাবেই ভূতের গল্পের প্রসঙ্গ উঠে এল। বাল্যবন্ধু হওয়ার সুবাদে পৃথ্বীশের জানা ছিল যে অরিত্রর স্টকে বেশ কিছু রোমহর্ষক কাহিনী আছে, তাই তাকেই শুরু করতে সবাই অনুরোধ করল। মোবাইলে টর্চ থাকায় আজকাল আর হাতের কাছে মোমবাতি দেশলাই নিয়ে বসার প্রয়োজন নেই। হিল-স্টেশনের রাত, তার ওপর বৃষ্টি হয়ে গেছে বলে বাইরের তাপমাত্রা বেশ কম। সবাই কম্বল মুড়ি দিয়ে এক একটা করে বালিশ হস্তগত বা বলা ভালো বক্ষগত করে ভৌতিক গল্পের আঁচটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করার জন্য একটু ঘনিয়ে এসে বসল।

অরিত্র একটা গলা খাঁখারি দিয়ে শুরু করে।

– ”এ গল্পটা আমার মেজকাকার, আমাদের বাড়ির সত্যি ঘটনা, এক ফোঁটাও বানানো নয়। মেজকাকা মারা গেছেন আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে অর্থাৎ আমার খুব ছোটবেলায়। স্বাভাবিক ভাবেই গল্পটা বড়দের কাছ থেকে সেই বয়সে আমার শোনার কথা না, শুনিও নি। কলেজে পড়ার সময় বাড়ির পুরনো একটা আলমারি ঘাঁটতে ঘাঁটতে মেজকাকার ডায়েরি টা হাতে আসে, সেখান থেকেই ঘটনাটা আমার জানা। আজ পর্যন্ত কারোর কাছেই এর বিন্দুমাত্র উল্লেখ আমি করিনি, তোরাই প্রথম যাদের সাথে এটা শেয়ার করছি।”

শ্রোতাদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে, সবাই উদগ্রীব হয়ে অরিত্রর দিকে তাকিয়ে, অরিত্র বলে চলে,

– “মেজকাকা খুব নামকরা ডাক্তার ছিলেন, বিয়ে থা করেন নি, যাকে বলে নোবল ব্যাচেলর।ডায়েরিটা হাতে পাওয়ার আগে, বড় হবার পর, দাদা দিদি বা কাজিনদের কাছে শুনেছিলাম, মেজকাকা একটি মেয়েকে গভীর ভাবে ভালোবাসতেন, তার নাম ছিল হৈমন্তী। খুব অল্পবয়সে এক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মেয়েটি মারা যায়, সে সময় মেজকাকা ডাক্তারি পড়তে ইউ.কে গেছিলেন, তাঁকে কিছু জানানো হয় নি। ফিরে এসে এই খবর পেয়ে শোকে প্রায় পাগলের মত অবস্থা হয় তাঁর। নিজে এতবড় ডাক্তার হয়েও সবথেকে কাছের মানুষটির অন্তিম অবস্থায় কোনো কাজে আসতে পারেন নি – এই অনুশোচনা মেজকাকাকে আজীবন দগ্ধে মেরেছে। বাড়ি থেকে অনেকবার বিয়ের চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি পরিষ্কার না করে দিয়েছিলেন।  হৈমন্তী ছাড়া অন্য কাউকেই সে আসনে বসানো তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।ডায়েরিটা পড়ার পর গল্পের আগা মুড়ো সব জুড়ে ব্যাপারটা আমার কাছে ক্লিয়ার হয়। মেজকাকা ডায়েরি তে লিখেছেন,

– “কেউ যদি খুব গভীর ভাবে কিছু চায়, তাহলে তা পাওয়া সম্ভব, একান্তই সম্ভব এবং সেটা শুধুমাত্র জাগতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, পারলৌকিক জগত ও অতীন্দ্রিয় উপলব্ধির বিষয়েও এ কথা সত্যি। আত্মা অবিনশ্বর, আমি সে প্রমাণ পেয়েছি। আমি হৈমন্তীর উপস্থিতি টের পাই, খুব সূক্ষ্ম হলেও একটা আবছায়া অস্তিত্ব, অনেক চেনা মৃদু একটা গন্ধ সারাক্ষণ আমাকে ঘিরে থাকে। নিশুতি রাতে চেম্বার থেকে বা রুগী দেখে ফেরার সময় মনে হয় একটা ছায়াময় অবয়ব আমার সঙ্গে আসছে, ঘাড় ঘোরালেই দেখা যাবে। আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যেন তার মুক্তি। ধ্যানের সময় ও মনোসংযোগ আরো বাড়াতে হবে… ”

এর দিন কয়েক পরে মেজকাকা লিখেছেন,

-“গত রাত্রে হৈমন্তীর উপস্থিতি সম্পর্কে আমি নিঃসন্দেহ  হলাম। ধূম জ্বর ছিল, বাড়িতে অন্য কেউ ছিল না ফলে আমার ঘরে কারো ঢোকার সম্ভাবনা নেই। ঘোরের মধ্যেও একটা খুব চেনা স্পর্শ টের পেলাম। কে যেন পরম মমতায় আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তারপর জলপট্টি দেওয়া হচ্ছে, সেটাও অনুভব করলাম। যদি এটা ডিল্যুশন ই হত তাহলে পরদিন সকালে আমার মাথার পাশে রাখা একটা জল ভর্তি ঘটি আর আমার ভেজা গামছাটা কীসের ইঙ্গিত বহন করছিল?”

দু দিন পরের পাতায় লেখা,

-“অবশেষে সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটল! আমার এত দিনের সাধনায় সাফল্য এল। অনেক রাত অবধি ধ্যান করছিলাম, মনোনিবেশটা খুব তীব্র ছিল, হৈমন্তী ছাড়া মাথায় আর কোনো ভাবনার স্থান নেই। হঠাৎ কোনো ঝড় বাতাস ছাড়াই, জানলা দরজাগুলো একবার কেঁপে উঠল। চমকে পেছনে ফিরে দেখি, হৈমন্তী দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে, আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। দু এক পা এগিয়ে আসল সে, এখন সম্পূর্ণ ভাবে তার ত্রিমাত্রিক রূপ উপলব্ধি করতে পারছি, পায়ের আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, তার পারফিউমের মিষ্টি গন্ধ, নিঃশ্বাসের শব্দ আমাকে ছুয়েঁ যাচ্ছে, খুব কাছে চলে এসেছে সে, হাত বাড়ালেই তাকে স্পর্শ করতে পারব…”

 

ঠক ঠক করে দুবার হোটেল ‘দ্য নেস্ট’ এর ২০৪ নম্বর ঘরের দরজায় সজোরে আওয়াজ ক্লাইম্যাক্সের ছন্দপতন ঘটালো। এতক্ষণ সবাই তন্ময় হয়ে অরিত্রর গল্প শুনছিল, এই জোরালো শব্দে হতচকিত হয়ে মিনিট খানেক এ ওর মুখের দিকে তাকালো।

এত রাত্রে কে? হোটেলের কেউ বা রুম সার্ভিস এলে ল্যান্ড ফোনে কল করে বেল বাজিয়ে আসে। পৃথ্বীশ আর অরিত্র দরজা খুলে অবাক হয়। কেউ কোথ্বাও নেই, করিডর সম্পূর্ন ফাঁকা। জাস্ট কেউ অন্য ঘরে ঢুকেছে বা সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেছে সেটাও মনে হ’ল না।

গল্পের তাল কেটে গেছে তাই অরিত্র একটু পিছিয়ে শুরু করল, কাহিনী ঠিক এক ই জায়গায় পৌঁছতেই আবার দমাদ্দম আওয়াজ পাওয়া গেল দরজায়। এবার পৃথ্বীশ রেডি ছিল, সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে দরজা খুলে হতবাক, আশ্চর্য্য! করিডর সম্পূর্ণ ভোঁ ভাঁ, কাউকে দেখা যাচ্ছে না। এরকম ব্যাখ্যাহীন ঘটনায় সবাই কেমন হতভম্ব হয়ে আছে।

তাহলে কি কোনো বাচ্চা ছেলে দুষ্টুমি করছে?

ম্যানেজার কে ফোন করে ডেকে সব জানালো পৃথ্বীশ।

বিস্মিত ম্যানেজার জানালেন,”স্যার এই মুহুর্তে  কোনো বাচ্চাই নেই এ হোটেলে। ওপরের তলায় আপনাদের দুটো ঘর আর নীচে এক ভদ্রলোক একা রয়েছেন। রুম সার্ভিসের ও কেউ ওপরে আসে নি।”

তবু সন্দেহ নিরসনের জন্য সবাই মিলে নীচের ঘরের ভদ্রলোক কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেল। চোখ কচলাতে কচলাতে আধা ঘুম থেকে উঠে আসা ভদ্রলোক বেশ বিরক্ত ই হলেন ওদের প্রশ্নে। হোটেলের স্টাফরাও সবাই কনফার্ম করল, গত আধঘন্টার মধ্যে কেউ দোতলায় যায় নি!

ঘরে ফিরে এসে সোহিনী বলল, “খেয়াল করেছ, ঠিক যেইখানে হৈমন্তীর আবির্ভাব ঘটছে, গল্পের সেইখানেই বারবার বাধা পড়ছে?”

“ধুর, এসব অলৌকিক কাণ্ডে আমার বিশ্বাস নেই” – জোর গলায় জানায় পৃথ্বীশ।

“লেট’স ডু ওয়ান থিং, আমি দরজাটা খুলে রাখছি তুই আবার গল্পটা শুরু কর, একটু পিছিয়ে”।

দরজা খোলা থাকায় একটু শীত শীত করছে। সেজন্য কিনা বলা যায় না, তবে এবার একটু কাঁপা কাঁপা গলায় আরম্ভ করে অরিত্র,

-”অবশেষে সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটল! আমার এত দিনের সাধনায় সাফল্য এল। অনেক রাত অবধি ধ্যান করছিলাম, মনোনিবেশ টা খুব তীব্র ছিল, হৈমন্তী ছাড়া মাথায় আর কোনো ভাবনার স্থান নেই। হঠাৎ কোনো ঝড় বাতাস ছাড়াই, জানলা দরজা গুলো একবার কেঁপে উঠল। চমকে পেছনে ফিরে দেখি হৈমন্তী দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে, আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। দু এক পা এগিয়ে আসল সে, এখন সম্পূর্ণ ভাবে তার ত্রিমাত্রিক রূপ উপলব্ধি করতে পারছি, পায়ের আওয়াজ পরিস্কার শোনা যাচ্ছে, তার পারফিউমের মিষ্টি গন্ধ, নিঃশ্বাসের শব্দ আমাকে ছুয়েঁ যাচ্ছে, খুব কাছে চলে এসেছে সে, হাত বাড়ালেই তাকে স্পর্শ করতে পারব…”

হঠাৎ সবাই কে চমকে দিয়ে বিছানার ওপর রাখা অরিত্রর মোবাইল বেজে উঠল। কম্পিত হাতে ফোনটা তুলতে গিয়েই একটা আর্ত চিৎকার দিয়ে ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মত ছিটকে পিছিয়ে এল সে। মুখ সম্পূর্ণ রক্তশূন্য, হাত পা ঠকঠক করে কাঁপছে।

ফোন বেজে চলেছে একটানা, নীল স্ক্রিনে লেখা ফুটে উঠছে

” Mejokaka calling”

এই নামে কোনোদিন কোনো কন্ট্যাক্ট সেভড ছিল না তার ফোনে, কারণ তার মোবাইল ব্যবহারের সূত্রপাতের বহু আগেই মেজকাকা প্রয়াত হয়েছিলেন।

টানা তিনবার পুরো রিংটোন বেজে যাবার পরেও যখন তাদের কেউ ই কলটা রিসিভ করল না, তখন একটা টেক্সট মেসেজ, নীল আলোতে মিনিট খানেকের মত স্ক্রিনে পরিস্ফুট হয়েই চিরতরে ফোনটা বন্ধ হয়ে গেল। মেসেজটায় লেখা ছিল,

Some Afterlife affairs are never meant to be disclosed!

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ