09 Feb

চাপ

লিখেছেন:সমীর ঘোষ


অনুপমবাবুর ছেলের স্কুলে খুব পড়াশুনোর চাপ। অনুপমবাবু ও তার স্ত্রী চয়নিকা বহু খুঁজে খুঁজে ছেলের জন্য এমন একটা স্কুল পেয়েছেন। স্কুলটা ইংলিশ মিডিয়াম। গোটা তল্লাটে স্কুলটার খুব নামডাক। বাজার, স্টেশন বা যে কোনও জায়গা থেকে শুধু নাম বললেই হল। সাঁই করে পৌঁছে দেবে যেকোনও টোটো বা অটোওলা। গতবছরই চোখের সামনে তরতরিয়ে উঠে গেল স্কুল বিল্ডিংটা। স্কুল তো নয় যেন পাঁচতারা হোটেল। সাদা রঙের কারুকার্য করা বাড়ি, সামনে বাগান, তাতে ফোয়ারা, অ্যালুমিনিয়ামের ফ্রেম দেওয়া কাঁচের জানলা, এসি রুম, জিমনাসিয়াম, টেনিস কোর্ট, সুইমিং পুল কী নেই। আছে কাঁচে ঢাকা ক্যান্টিন। সেখানে কেক,বার্গার, স্যান্ডুইচ, পিৎজা ইত্যাদি আধুনিক খাবার দাবার পাওয়া যায়। গোটা স্কুল চত্বরটাই ফ্রি ওয়াইফাই জোন। বন্দোবস্তই  আলাদা। এলাকায় এমনধারা স্কুল একটাও নেই। অনুপমবাবুর ছেলে অস্মিত ক্লাস টু-তে পড়ে। আগে ও যে স্কুলে পড়ত সেখানেও পড়াশুনোর খুব চাপ ছিল এবং এবিষয়ে খুব নামডাক ছিল। তবে স্কুলটা দেখতে খুব একটা ভাল ছিল না। কী রকম যেন এলোমেলো গাছপালা দিয়ে ঢাকা। ম্যাড়মেড়ে দেওয়াল। এসি – ফেসি কিছুই ছিল না। সে তুলনায় এই স্কুলটা ঝকঝকে। লোককে বড় মুখ করে বলার মত ব্যাপার। চাপও তুলনায় বেশি। শোনা গেছে আগের স্কুলটায় নাকি এক ক্লাস আগের পড়া পড়িয়ে দেওয়া হত। অর্থাৎ অনুপমবাবুর ছেলে যখন ক্লাস ওয়ানে পড়ছে তখন তাকে নাকি ক্লাস টু এর সিলেবাসের পড়া পড়িয়ে দিচ্ছেন ম্যাডামরা। ছেলেতো বাড়িতে কেঁদেকেটে একাকার। কিছুই তার মাথায় ঢোকে না। টিউটর ম্যাম এসে রোজ কমপ্লেন করে। রিমলেস চশমার ভেতর দিয়ে কড়া চোখে তাকায় ছাত্রের দিকে। স্কুলে ছেলেকে দিতে গিয়ে স্কুলের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে অনুপমবাবু বা তার স্ত্রী প্রায়ই এবিষয়ে অন্য অবিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। অনুপমবাবু হয়ত বললেন – কী পড়াশুনোর চাপ দেখেছেন ? আমার ছেলে তো কিছু ধরতেই পারছে না। মনে হচ্ছে টিউটর আরও বাড়াতে হবে।

উত্তরে অস্মিতদের সঙ্গে একই ক্লাসে পড়া নিকিতার মা সুদীপ্তা বাসু বললেন, আরে জীবনটাই একটা লড়াই। টোটালি গেম। প্রতিটি মুহুর্তই চ্যালেঞ্জিং। চাপের মধ্যে দিয়েই তো বের করে আনতে হবে গেমটাকে।

আর্যদীপের বাবা বললেন, স্কুলে পড়াশুনোর যদি একটু চাপই না থাকল তাহলে আর ভাল স্কুল কিসের ? এলেবেলে,ন্যাতানো সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে দিলেই হয়।

সুকন্যার মা তখন তখন কিছুটা হয়ত গর্বিত হয়েই বললেন – এই স্কুলে সত্যি খুব চাপ, এবার একটা স্পেশাল টিচার দিতে হবে দেখছি।

 

তবে এলাকায় অধিক চাপযুক্ত নতুন স্কুলটা  চালু হতেই – পুরোনো স্কুলটা থেকে বেশ কিছু স্টুডেন্টস পটাপট ভর্তি হয়ে গেল সেখানে। আরও ভাল স্কুল, পড়াশুনোও খুব চাপের এমন বিজ্ঞাপন সামনে আসতেই অনুপম বাবু ও চয়নিকাও ছেলেকে ভর্তি করে দিলেন নতুন স্কুলে। এই ভর্তির ফলে সরাসরি পাঁচ প্রস্থ চাপের চক্রবুহ্যে ঢুকে পড়লেন তারা। প্রথমত, দেখা গেল আগের স্কুলের তুলনায় এই স্কুলে পড়াশুনোর চাপ আর দু-ডিগ্রি বেশি। আগের স্কুলে যদি এক ক্লাস উঁচু সিলেবাসের বই পড়ানো হত, এখানে পড়ানো হয় দু – ক্লাস উঁচুর। পড়াশুনো সব মাথার উপর দিয়ে যেতে লাগল অস্মিতের। তার সব রুটিনে বাঁধা। একটুও নড়চড় হওয়ার উপায় নেই। অবশ্য  অনুপমবাবু ও চয়নিকা দেবী এতে খুশিই হলেন। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া হয়ই না। না যেতে পারার একটা জুতসই কারণও পাওয়া গেল। কেউ ফোন করলে বলেন, জানো তো ছেলেটার নতুন স্কুল আর ওদের স্কুলে পড়াশুনোর খুব চাপ। ফলে একটুও সময় পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও যাওয়ার।

দ্বিতীয়ত এই স্কুলের মাইনে আগের স্কুলের দ্বিগুন। এর ফলে পকেটে চাপ বাড়ল অনুপমবাবুর।

তৃতীয়ত স্কুলের পরামর্শ মেনে গোটা বাড়িতে এসি লাগাতে হল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্কুল থেকে এসে অস্মিতকে বাড়িতে যাতে তাপমাত্রা জনিত সমস্যায় না পড়তে হয় সে জন্য এই ব্যবস্থা।

চতুর্থত প্রতি মাসে গার্জেন মিটিং হয়। সেখানে স্কুলের ম্যাডামরা টকাটক ইংরাজিতে কথা বলেন। অনুপমবাবু ও চয়নিকা হাই–হ্যালো–ইয়েস–নো এই সব স্মার্টলি বললেও তারপরই মিইয়ে যান। এজন্য বাড়িতে নিজেদের জন্য স্পোকেন ইংলিশ টিউটর রাখতে হল। চাকুরিজীবী অনুপমবাবুর মাস মাইনের খরচের খাতায় চাপ আরও বাড়ল। তবে ভাল স্কুলের বিনিময়ে এসব স্যাক্রিফাইস কিছুই নয়।

পঞ্চম চাপ এল আরও পরে। ছেলের নতুন স্কুল হওয়ার পর থেকেই কেমন যেন খিচিমিচি শুরু হয়ে গেল সংসারে। এখন আর একটুও অগোছালো জামা–প্যান্ট পরে স্কুলে যেতে পারে না অস্মিত। প্রতিদিন ইস্ত্রি করা পোশাক চাই। চয়নিকা একদিন খিঁচিয়ে উঠল অনুপমকে। বলল, তুমি একটা ‘ধম্মের ষাঁড়’। একটা ইস্ত্রিও করতে পারো না। আমার বাবারা কী সুন্দর ঘরেই ইস্ত্রি করত। দুটো পয়সা তো বাঁচে। অনুপমবাবুদের সমস্যা শুনে অভয় দিলেন পাড়ার লন্ড্রিওয়ালা। বললেন,চাপ নেবেন না বাবু। প্রতিদিন জামাকাপড় ইস্ত্রি করে দেব। শুধু একটু রেটটা বাড়িয়ে দেবেন। অফিসে অনুপমবাবুর পাশের টেবিলে বসে কাজ করেন দেবোপমবাবু। সংসারের দুঃখ, কষ্ট, মান, অভিমান প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে তার সঙ্গেই শেয়ার করেন অনুপমবাবু। এমন পরিস্থিতির কথা শুনেই দেবোপমবাবু বললেন, চাপ নেবেন না। আমি প্রতিদিন চাপমুক্তি ঘটাতে ধ্যানে বসি। আপনাকেও শিখিয়ে দেব কায়দাকানুন। কত্তা–গিন্নি মিলে রোজ সকালে করবেন, দেখবেন অনেক রিলিফ পাবেন।

নতুন স্কুলের কেরামতিই আলাদা। অস্মিতের কাকার ছেলে সুস্মিত একই ক্লাসে পড়ে, কিন্তু অন্য স্কুলে। সুস্মিতদের ক্লাসে বারোটা বই থাকলেও অস্মিতদের বইয়ের সংখ্যা চব্বিশ। সমপরিমান খাতা। বিভিন্ন বিষয় বুঝিয়ে দিতে চারটে প্রাইভেট টিউটর, দিদিমণি। টিউশনির পড়া শেষ করে সাঁতার, আঁকা ক্লাসে যেতে নাভিশ্বাস উঠছে অস্মিতের। এতে অবশ্য ওর বাবা – মা খুশি। একটু চাপ না থাকলে কী পড়াশুনো হয় ? ভবিষ্যতের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়? কিন্তু অস্মিতের সমস্যা বাড়তেই থাকল। ওর যখন তখন ঘুম পায়। মাথা ব্যাথা করে। কিছুই মনে রাখতে পারে না। একটু বেশি খিটখিট করে। সমস্যা ক্রমশ ডালপালা মেলতেই কী মনে করে অস্মিতকে পারিবারিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন অনুপমবাবু। যেতেই ডাক্তারবাবু বললেন,অনুপমবাবু চাপ নেবেন না। আমি আমার বন্ধু এক মানসিক চিকিৎসকের নম্বর দিচ্ছি। ছেলেকে নিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করুন। সব ঠিক হয়ে যাবে।

ছেলের শিক্ষার জন্য গাদাগাদা খরচ,প্রতিদিন নতুন টিউটরের খোঁজ, দৌড়োদৌড়ি, যোগব্যায়াম,ধ্যান এসবকে চাপ বলে মনেই করেন না অনুপমবাবু ও চয়নিকা। এসব তো পথ চলারই অঙ্গ। বড় হয়ে ছেলে যখন সিঙ্গাপুর থেকে সানফ্রানসিসকো ছুটোছুটি করবে, বা  নিদেনপক্ষে গুরগাঁও বা বেঙ্গালুরুতে গিয়ে মোটা মাইনে ব্যাংকে ঢোকাবে তখন সব বিনিয়োগ উশুল হয়ে যাবে। তাইতো শিশুবেলা থেকেই নামী স্কুলে দামী শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা। যাইহোক পারিবারিক ডাক্তারের পরামর্শ মেনে মনের ডাক্তারের কাছে ছুটে গেলেন তারা। কী জানি ওষুধ খেয়ে যদি একটু মাথাটা খোলে। আরও বেশি পড়াশুনো মাথায় নিতে পারে।

ডাক্তারের চেম্বারে কায়দাকানুন বেশ ভালো। সেখানে ঢুকতেই খুব জোরে চালানো এসির ঠান্ডার স্রোত বয়ে গেল শরীরে। সামনেই রিসেপসনে তিন সুন্দরী বসে। তিন জনের কাজ তিনরকম। একজন শুধু শিশুদের, একজন বয়স্কদের আর একজন পুরনো রোগীদের কাগজপত্র তৈরি করছে। ওয়েটিং রুম  জুড়ে নানা রকমারি সৌখিন চেয়ার পাতা। দেওয়ালে কত কারুকার্য। অপেক্ষায় থাকা মানুষ গুলোও কেমন যেন চরম সেজে এসেছে। যেন এক্ষুনি যাত্রাদলের সংলাপ বলতে বলতে মঞ্চে প্রবেশ করবে। বাইরে থেকে বাহারি পোশাক দিয়ে ঢাকা থাকা প্রত্যেকের মনের ভেতর এত অসুখের বাস ? ভাবতেও আবাক লাগে। যাইহোক আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করাই ছিল। কিছুক্ষণ পরেই ডাক পড়ল সপুত্র অনুপমবাবুদের। ছোট্ট অস্মিতকে নানাভাবে পরীক্ষা করলেন ডাক্তার বাবু। লিখতে দিলেন, আঁকতে দিলেন, গানও গাওয়ালেন। কথা বললেন অনুপমবাবুদের সঙ্গেও। সব শেষে বললেন পাঁচতারা স্কুল থেকে এক্ষুনি ছাড়িয়ে আনতে হবে অস্মিতকে। ভর্তি করতে হবে একেবারে সাধারণ একটা স্কুলে। পারলে যে স্কুলে বাচ্চারা একসঙ্গে পাত পেড়ে দুপুরের খাবার খায়, লিক হয়ে যাওয়া ছেঁড়া ফাটা বল নিয়েই মহানন্দে ফুটবল খেলে, জামা-প্যান্টে ধুলো মেখে বাড়ি ফেরে, সেই স্কুলে।

বলেন কী ডাক্তার বাবু ? অনুপম বাবু ও চয়নিকা দুজনেই বিস্মিত। একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন। এলাকায় তাদের একটা স্ট্যাটাস আছে। তাদের ছেলে কিনা যাবে ওইসব এলেবেলে খিচুড়ি স্কুলে ? পাড়া প্রতিবেশীরা কী ভাববে? আত্মীয়স্বজন কী বলবে? ছেলেকে নামী স্কুলে দামী পড়াশুনো শেখাতে এতদিন যাবতীয় চাপ অনায়াসে সামলেছেন দুজনে। এবার সত্যি সত্যি চাপে পড়লেন তারা।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ