09 Feb

রতনবাবুর রাশিফল

লিখেছেন:পূষন


[১]

রতনবাবু খুব কম বয়সেই বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন যে তিনি প্রচন্ড স্মার্ট। তাই মোটামুটি সাবালক হওয়ার পর থেকে পরের বুদ্ধি বা ব্যক্তিসত্তার উপর তার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাভক্তি কখনই দেখা যায় নি। ‘নিজে’-র বাইরে আর ‘নিজের’-টা ছাড়া বাকী সবই তার কাছে অপাংক্তেয় অথবা বাড়াবাড়ি। এই ধরনের মানসিকতা যারা রাখেন তারা মারাত্মক সাবধানী হন। রতনবাবুও তেমন। সারাদিন হিসেব-নিকেশ নিয়ে লেগে আছেন। রিক্সাওয়ালাকে পুজোর সিজনবাবদ ভাড়াপিছু দু’টাকা বেশী দেওয়ার ফলে এবং ব্যাঙ্কের সুদের হার ১৫ বেসিস পয়েন্ট কমে যাওয়ার দরুন আগামী মাসে ৩২ টাকার বদলে ২৮ টাকা প্রতি কেজির চাল আনা দরকার — এই রকম বেশ কিছু হিসেব তার মাসকাবারির খাতায় খুঁজে পাওয়া যায়। আগাম জানান দিয়ে, মানে ওই গেটের আওয়াজ-টাওয়াজ করে রতনবাবু রাস্তায় বেরোলে এলাকার ‘নাদান’ ছোকরারা স্রেফ ভ্যানিশ হয়ে যায়। কেননা গায়ে-পড়ে হিতাহিত জ্ঞান দেওয়ার ব্যাপারে রতনবাবুর দরাজ মন। এলাকায় গুজব আছে, একবার পাড়ার লোকজন একসাথে সাবধান হয়ে পড়েছিল এবং সেইসময়ে টানা কয়েকদিন কাউকে প্রাণ ভ’রে জ্ঞান দিতে না পারায় নাকি রতনবাবুর বি.পি.-টিপি বেড়ে একদম যা-তা ব্যাপার। শেষে ডাক্তার পর্যন্ত ডাকতে হয়েছিল। এত সবের উপর রতনবাবুর আরেকখানা বিশেষত্ব আছে। তিনি দৈনন্দিন রাশিফলে মারাত্মক বিশ্বাস করেন। রাশিফলের ব্যাপারে আমরা যে যা-ই ভাবি না কেন, রতনবাবুর রাশিফল নাকি একেবারে  হাড়ে-হাড়ে মিলে যায়। উনি বহুবার নাকি প্রমাণ মিলিয়েও দেখেছেন। কে জানে! সে যাই হোক, মোটকথা হচ্ছে সকালের খবরের কাগজখানা হাতে পেয়েই দুরু-দুরু বক্ষে প্রথম যে তিনখানা জিনিস রতনবাবু খুঁটিয়ে দেখেন তার মধ্যে পয়লা নম্বর হচ্ছে সেদিনকার রাশিফল কি বলছে, তারপর বাজারে সোনার রেট কত হল আর সবশেষে হচ্ছে মাঝের পাতায় ব্যাঙ্কের সুদের হার নিয়ে কিছু লিখেছে কিনা।

এহেন রতনবাবুর কাছে সহসা তার এক বন্ধুর মেয়ের বিয়ের নেমন্ততন্ন এসে হাজির। অন্য কেউ হলে তিনি যেতেন না। গিয়ে শুধু খেলেই তো হল না, খরচা আছে। কিন্তু যে নিমন্ত্রণ করেছে সে রতনবাবুর খুব পুরোনো আর অন্তরঙ্গ বন্ধু। বিজন মালাকার। সে-ই কবেকার হাইস্কুলের সময় থেকে পরিচয়। প্রায় চল্লিশ বছরের সম্পর্ক। রতনবাবুর না-গেলেই-নয়। রতনবাবুর স্ত্রীও প্রথমটায় যেতে রাজী ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঝগড়া ক’রে তিনি আর গেলেন না। স্ত্রী চেয়েছিলেন সামান্য হলেও সোনার কিছু উপহার দিতে। কিন্তু রতনবাবু কিছুতেই দেবেন না। তিনি ঠিক করেছেন সুদর্শন কোন খামে ভরে চুপচাপ দু’ হাজার এক টাকা নগদ দিয়ে দেবেন। এই বাজেট কিছুতেই তিনি লঙ্ঘন করবেন না। নিজেদের কোন ছেলেমেয়ে নেই বলে এইসব বিষয়ে তার স্ত্রী ইমোশনাল ফুল হতে পারেন, কিন্তু রতনবাবুর মত স্মার্ট লোককে তেমনটা শোভা পায় না। তাছাড়া পুরোনো দিনের বন্ধুদের কাছে গরীব সেজে থাকাটাই স্মার্টনেস। স্ত্রী সেটা না বুঝলে কি আর করা?!

কিন্তু যাওয়ার দিন ভোরবেলায় পেপার খুলে চোখ বোলাতেই ভুরু কুঁচকে গেল রতনবাবুর। রাশিফলে লিখেছে, তার অত্যন্ত দামী কোন জিনিস আজ খোয়া যাবে। এ তো একেবারেই ভালো কথা নয়! তিনি সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবান জিনিসের হিসেব করতে বসে গেলেন। কিন্তু হায়! মূল্যহীন জিনিস আর কোথায়? সবই তো অমূল্য মনে হচ্ছে! তাও অনেক ঝাড়াই-বাছাইয়ের পরে মোটের উপর তিনখানা জিনিসকে রতনবাবু সবচেয়ে মূল্যবান বলে চিহ্নিত করলেন। প্রথমটা তার বাড়ির দলিলপত্র। তখনি আলমারি খুলে সব কাগজপত্র বের করে দেখে নিলেন রতনবাবু। না, সব ঠিক আছে। যাক! এরপরেই রতনবাবুর মনে এল এক বিমা কোম্পানিতে করা তার আঠারো লাখ টাকার একটা টার্ম ইনভেস্টমেন্টের কথা। এই রে! এজেন্ট ব্যাটা অনেকদিন বাড়ি আসেনি। সেরেছে! লুকিয়ে কোথাও পালায় নি তো? ওরে বাবা! এখুনি ফোন করা দরকার! প্রথমবার ওপার থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠে ‘…আউট অফ নেটওয়ার্ক’ শুনে হৃদকম্প শুরু হয়ে গেল রতনবাবুর। সর্বনাশ! আবার ডায়াল করলেন। একটু সময় ‘বিপ বিপ’ শব্দ এলেও শেষপর্যন্ত কানেক্ট হল কলটা। রিং হচ্ছে। ধড়ে প্রাণ এল রতনবাবুর। দু’-তিনবার রিং হওয়ার পরে ফোন রিসিভড হল।

— ‘হ্যাঁ, বলুন রতনবাবু!’

— ‘হ্যাঁঅ্যাঅ্যা… কি খবর সমীর?… অনেকদিন আসছ না এদিকে! তাই ফোন করলাম…’

— ‘আরে না, আসলে বাড়িতে মিস্ত্রী লেগেছে। দোতলা হচ্ছে তো, তাই ব্যস্ত চলছি। সেইজন্যই আর কি…’

বাব্বা! কত্ত টাকা! দোতলা করছে!…নাহ, ভূমিকা আর না বাড়ালেই ভালো। ডাইরেক্ট পয়েন্টে এলেন রতনবাবু, ‘বলছি… আমার পলিসিটা ঠিকঠাক আছে তো? মানে, কোন আপডেট আসছে না তো… একটু চিন্তা হচ্ছিল।’

হাল্কা হাসির শব্দ এল ফোনের ওপার থেকে। সমীর বললেন, ‘কোন চিন্তা নেই আপনার। কোম্পানি সময়মত নিজের কথা রাখবে। আপনি খালি সার্টিফিকেটটা যত্ন করে রেখে দেবেন। বাকীটা আমি দেখে নেব। ঠিক আছে?’

কয়েকবার ‘হুম’ বলে কথা শেষ করেই ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটটা চেক করে নিলেন রতনবাবু। আলমারির অন্ধকার লকারের ভেতরে সেটাকে একদম সেফ অ্যান্ড সাউন্ড দেখে মনটা একটু শান্ত হল রতনবাবুর।

ঝামেলা বাধল তিন নম্বর জিনিসটা নিয়ে। তার স্ত্রীর বিয়ের গয়না। সেগুলো ব্যাঙ্কের লকারে রয়েছে। আজ শণিবার। ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাতেই মনটা তেতো হয়ে গেল রতনবাবুর। এহে! আজ তো ইভেন স্যাটারডে! ব্যাঙ্ক বন্ধ। সোমবারের আগে গয়নার মুখ দেখা যাবে না। সরকারি সংস্থার উপর অনাস্থার কোন কারণ নেই, কিন্তু ‘স্মার্ট’ রতনবাবুর মতে, হালফিলের নোটবাতিলের পর থেকে সেই ভরসাটা আর রাখা চলে না। হুট করে কখন কি বন্ধ হয়ে যায় তা বোঝা মুশকিল! মাঝেমাঝে গভীর রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে উঠে বসেন তিনি। ভোর সাড়ে তিনটের সময় টিভি খুলে সব নিউজ চ্যানেলের হেডলাইনস চেক করে নিয়ে তবে ফের শুতে যান তিনি। এটাই তো স্মার্টনেসের পরিচয়! কিন্তু আপাতত তাকে ভরসা রাখতেই হবে। তারপর সটান সোমবার ব্যাঙ্কযাত্রা। আজকালের জার্নির কারণে কোন জরুরী খবর যাতে মিস না হয়ে যায় সেইজন্য মোবাইলে একটা বিখ্যাত নিউজ অ্যাপ ইনস্টল করে নিলেন রতনবাবু। এখন এর বেশি আর কিছু করা সম্ভব নয়।

এর সাত-আট ঘন্টা পরে স্ত্রীকে বারবার খবরের চ্যানেল ফলো করতে বলে বন্ধুর বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হলেন রতনবাবু। মনের ভেতর অসন্তোষটা কিন্তু থেকেই গেল।

[২]

এই মুহূর্তে হাসনাবাদ লোকালের ভিড়বিহীন এক কামরায় বসে আছেন রতনবাবু। অনেক রাতের লগ্নে বিয়ে, তাই তাড়া বিশেষ ছিল না। বিকেল পাঁচটায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি। তারপর তিরিশ মিনিট বাসে করে স্টেশনে এসে এই ট্রেনে চেপেছিলেন। হিসেব মত রাত আটটার মধ্যেই নির্দিষ্ট স্টেশনে পৌছানোর কথা ছিল। কিন্তু লাইনে আচমকা ফাটল দেখা যাওয়ায় মাঝপথেই ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়ে। প্রায় দুই ঘন্টা পরে ফের যাত্রা শুরু হয়। আর এসব ক্ষেত্রে যেমন হয়। বাকী রাস্তাটাও ট্রেনটা ধুঁকতে ধুঁকতে চলল। ফলে রতনবাবু যখন বিজনের বাড়ির স্টেশনে নামলেন তখন রাত্রি দশটা বাজে। ট্রেন থেকে নেমেই আবার সে-ই অস্বস্তিটা রতনবাবুর মনে ফিরে আসল। আসলে যবে থেকে তিনি এখানে আসার নেমন্তন্নটা পেয়েছেন তবে থেকেই একটা খচখচানিটা তিনি মনে মনে টের পেয়ে আসছেন। যেসব জায়গায় পুরোনো দিনের ছবি আর ঘ্রাণ লেগে থাকে সেখানে ফিরে যাওয়া স্মার্টনেসের পরিপন্থী বলেই মনে করেন রতনবাবু। যে যায় সে আর আসে না — তা সে মানুষ হোক আর অতীতের দিনই হোক। এইসব জায়গায় না যাওয়াই ভালো! তার উপর আজ আবার ওই রাশিফল! ইস, গয়নাগুলোর কিছু হয়ে গেলে … এতক্ষণ অবশ্য ট্রেনলেটের বিরক্তিতে এই চিন্তারা কিছুটা চাপা পড়ে ছিল। কিন্তু এখন চোখের সামনে বিরাট মাপের হলুদ সাইনবোর্ডে বড়-বড় কালো হরফে লেখা স্টেশনের নামটা দেখে কোথা থেকে সেই অস্বস্তির বোঁচকাটা যেন আবার তার বুকে এসে দোদুল্যমান পেন্ডুলামের মত ঝুলে পড়ল।

এই স্টেশনখানা হাতের তালুর মত চেনা রতনবাবুর। তিনটে বছর এই এলাকায় কাটিয়ে গেছেন তিনি। মেসে থেকে পাশের জংশনের এক নামী কলেজে তিনি কমার্সে ব্যাচেলার্স করেছেন। এই পাড়াগাঁ এলাকায় ভাড়া কম, তাই এখানে থেকেই রোজ দশ মিনিটের ট্রেন জার্নি করতেন অর্থসচেতন রতনবাবু। সেই সময়ে এই স্টেশনের বেঞ্চে বসে বন্ধুদের সাথে প্রচুর আড্ডা মেরেছেন তিনি।চা, সিগারেট, চপ-মুড়ি, ঘুগনির সাথে রাজনীতি, খেলা, মেয়ে-দেখা সব দেদার চলত সেই সময়ের বিকেলগুলোয়। আজকে যে বন্ধু নিমন্ত্রণ করেছে সেই বিজন এই এলাকারই ছেলে। তার উপর স্কুল-হোস্টেলের বন্ধু, তারপর সেম কলেজ। তাই বাকী বন্ধুরা পরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেলেও ওর সাথে রতনবাবুর হৃদ্যতা কোনদিনই মলিন হয় নি। সেই সূত্রেই তো বাড়ি থেকে এত দূরে আজ এসেছেন রতনবাবু। কড়কড়ে দু’হাজার গচ্চা যাবে — এটা জেনেও এসেছেন।

এইরকম স্মৃতিমেদুর জায়গায় ফিরে আসলে সাধারণ মানুষ নস্ট্যালজিয়া অতিক্রম করতে পারে না। কিন্তু আমরা আগেই জেনে গেছি, রতনবাবু স্মার্ট। হয়ত সেই কারণেই স্ত্রীর গয়নার চিন্তাটাই খালি তার মন থেকে যাচ্ছে না। একটু আনমনাভাবেই স্টেশনের দিকে তাকালেন রতনবাবু। খাঁখাঁ করছে রাতের স্টেশন। ডিসেম্বরের কুয়াশায় দূরের সিগনালগুলোকে অজানা কোন নক্ষত্রলোকের দ্যুতি বলে মনে হচ্ছে। বেশ ঠান্ডা পরেছে। কলকাতার চেয়ে এই জায়গা অনেকটাই ফাঁকা, সব ট্রেন দাঁড়ায়ও না। ট্রেন অ্যানাউন্সমেন্টের মা-বাপ নেই। অনেক থ্রু ট্রেন তো না জানিয়েই যাতায়াত করে ফেলে। এমনিতেই জনবসতি বেশী নয়, তার উপর যারা থাকেন তাদের অধিকাংশই কৃষিজীবী। সেইজন্যই হয়ত এই শণিবারের রাতে দু-চারটে বিশ্রামরত কুকুর আর কয়েকজন চাদরমুড়ি দেওয়া পাগল অথবা ভিখিরি ছাড়া প্ল্যাটফর্মে আর কেউ নেই। দ্রুত পা চালালেন রতনবাবু। আর দেরী করা ঠিক হবে না। এই প্ল্যাটফর্মের পেছন দিয়ে রেললাইনের দৈর্ঘ্য বরাবর কিছুটা পথ গেলেই বিজনদের বাড়ি। পথ মানে ঝোপঝাড়ের বুক চিরে বেরিয়ে আসা লম্বা একটা সরু সমতল জমি। অনেকটা ঘন চুলের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসা সূক্ষ্ম সিঁথির মত ব্যাপারটা। বর্ষায় সেটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না, বড় বড় ঘাস আর জঙ্গলে ঢেকে যায়। শরতের শেষে ফের জেগে ওঠে এই শর্টকাটটা। যেমন এখন আশা করছেন রতনবাবু। তবে রাস্তাটা হয়ত একটু অন্ধকার পড়বে, কিন্তু পাঁচ মিনিটের জন্য ওটুকু ম্যানেজ করাই যায়। নাহলে পুরো ঘুরে ঘুরে যেতে হবে। টাইম লাগবে। সেই রাস্তাগুলো ঠিকঠাক মনে করাও এখন বেশ ঝামেলা।

প্ল্যাটফর্মের শেষে এসে কিন্তু রতনবাবুর বুকটা ধক করে উঠল। সামনের পথটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। রতনবাবু জানেন, সামনের দিকে প্রায় তিনশো মিটার দূরে একটু উঁচু জমির উপর দিয়ে পাকা রাস্তা আরম্ভ হয়েছে। সেইদিকে তাকালে দেখা যায় একটা লাইটপোস্ট কপালে টিমটিমে একখানা হলদেটে আলো আর এক মুঠো  কুয়াশা নিয়ে একরাশ ঝোপের ভেতর থেকে গৃহস্থের বাড়ির ছাদের আকাশপ্রদীপের মত দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার আগে পর্যন্ত আদৌ কোন চলার মত রাস্তা আছে কিনা তা পূর্বজ্ঞাত না থাকলে বলা মুশকিল। লাইটপোস্টটা থেকে আরও কিছুটা দূরে বিজনদের বাড়ির রোশনাই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থেকেই চোখে পড়ল রতনবাবুর। এইটুকু তো! ও কিছু হবে না — এই ভেবে এগিয়ে গেলেন তিনি। একসময় এখান দিয়ে কম তো যান নি!

মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে বেশ দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করছিলেন রতনবাবু। কিন্তু পায়ে-চলা পথে জন্মানো শুকনো আগাছার জঙ্গল মাঝে মাঝেই তার পা জড়িয়ে ধরছিল। অনেকটা যেন নিষেধ করছে সামনে যেতে।

‘তুই কে রে?’

প্রচন্ড থতমত খেয়ে গেলেন রতনবাবু। কে, কে রে সামনে?! ঘটনার আকস্মিকতায় হাতের আলোটা প্রথমে কেঁপে উঠল আর তারপরে আপনা থেকেই অনুসরণ করল সেই শব্দগুলোর উৎসের অভিমুখকে। আর সেই আলোতে রতনবাবু যে মুখটা দেখলেন সেটাকে চিনে নিতে বেশীক্ষণ সময় লাগল না তার। আজ পঁয়ত্রিশ বছরের অন্তরাল সরিয়ে আচমকা যেন উঁকি মেরেছে এই মুখ। এ তো ভোম্বলদা! সেই অল্প হাঁ-করা মাংস-জমা ফর্সা থপথপে মুখ, খসখসে গলার আওয়াজ, জড়তাপূর্ণ কন্ঠস্বর, মাথায় হাতে গোনা কয়েকটা খাড়া খাড়া চুল, সেই ঘোলাটে দৃষ্টির চোখ …না, একটুও পালটায় নি ভোম্বলদা! বিস্ময়ের ঘোরের মধ্যেই এক নিমেষে অনেকগুলো বছর পিছিয়ে গেল রতনবাবুর মনটা।

তখন কলেজে পড়েন রতনবাবু। যে পাড়ায় তার মেস ছিল সেখানকারই একটা বাড়িতে থাকত রতনবাবুর চেয়ে বয়সে একটু বড় ভোম্বলদা।কি যেন একটা অটোজোমঘটিত রোগ ছিল ভোম্বলদার। সেইজন্যই জন্মসূত্রে একটু বিটকেল চেহারা আর সামান্য মন্দীভূত মগজ পেয়েছিল সে। যে বাড়িতে ভোম্বলদা থাকত সেটা ছিল এক বুড়ির বাড়ি। সেই বুড়ি নাকি ভোম্বলকে খুব ছোট অবস্থায় রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছিল। গন্ডা আষ্টেক হাঁস-মুরগী ছাড়া বুড়ির কেউ ছিল না। এরপর ভোম্বলকেও সে পোষ্য করে নিল। বুড়ি ছিল যেমন সজাগ তেমনি মুখরা। ওর হাঁস-মুরগীর উপর কারও নজর দেওয়ার দুঃসাহস ছিল না। তবে এই ভোম্বল কিন্তু এলাকার খুব বিখ্যাত মুখ ছিল। সহজ-সরল, হাসি-খুশি। কেউ কারও অনিষ্ট করেছে শুনলে মাথা দুলিয়ে পন্ডিতের মত বলত, ‘ভগবান সব দেখছে। যে যেমন করছে ঠিক তেমনটা তার সাথেও ঘটবে। আজ না হোক, কাল। ঘটবেই ঘটবে।’ এলাকার সকলের বহু কাজ সে হাসিমুখে করে দিত। পয়সা দিলেও নিতে চাইত না। খেতে খুব ভালবাসত বলে পয়সার বদলে উপকৃতরা তাকে পছন্দসই খাবার এনে দিত। বাড়ির হাঁস-মুরগীগুলোকে ভাইবোনের মত ভালোবাসত ভোম্বল। সারাদিন খেলত ওদের সাথে। বিজনের সূত্রে রতনবাবু এবং তার দলের বন্ধুদের বেশ ভাব ছিল ভোম্বলের। স্টেজের জোকারের সাথে সিটে বসা দর্শকের মত ভাব।

কিন্তু সংসারে আনন্দের দিন আর দীর্ঘজীবী ক’ই? রতনবাবুর থার্ড ইয়ার চলাকালীন সেই বুড়ি একদিন সকালে মারা গেল। ভোম্বলের সেকি কান্না! নিজের ছেলেও এমন কাঁদত কিনা সন্দেহ! রতনবাবু অন্যান্য বন্ধুদের সাথে শ্মশানে গিয়েছিলেন সেইদিন। বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে পার হয়ে গিয়েছিল। তখনও শীতকাল ছিল। সারাদিনের পরিশ্রমের পরে সব বন্ধুরা একসাথে গোল হয়ে বসে আগুন পোহাতে পোহাতে সেই রাতেই ফিস্টের প্ল্যান করে ফেলল। কমবয়সে যেমন হয়। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। শোকবিহ্বল ভোম্বলের অজান্তে সেইরাত্রেই বুড়ির একটি মুরগী তালাবিহীন খাঁচার সুযোগে তার মালকিনের অনুগামী হল।

ভোম্বল অবশ্য বিষয়টা ধরতে পারল না। কিন্তু প্রতি মাসেই যখন তার প্রিয় বন্ধুদের সংখ্যা এক এক করে কমতে লাগল তখন ব্যাপারটা তার নজরে এল। তারপর বিষয়টা বুঝতে পেরে তার মৃত বন্ধুদের শোকে কান্নাকাটিও করতে ছাড়ল না ভোম্বল। কাউকে সে ধরতে পারল না ঠিকই, কিন্তু তার অসন্তোষের কথা সে সকলকে জানিয়ে বেড়া’ল। চোরকে ধরতে পারলে সে যে তাকে দেখে নেবে — এটাও প্রচার করে দিল।

সে’বার কলেজ শেষ হওয়ার দিন রাত্রে ভোজের প্ল্যান হল। পরেরদিন যে যার বাড়ি ফিরে যাবে, তাই সকলেই একদফা চুটিয়ে আনন্দ করে যেতে চায়। সিগারেট, বাংলার আয়োজন করাই ছিল। লাগবে খালি হাঁস বা মুরগী। হাঁস হলে ভালো, মুরগী তো আগেও হয়েছে। রতনবাবু আর বিশু বলে আরেকটা ছেলের ঘাড়ে দায়িত্ব এল ভোম্বলের বাড়ি থেকে হাঁস বা মুরগী তুলে আনার। কেননা এই কাজ আগেও তারা করেছে। যাই হোক, সেদিন রাত নটার সময় তারা দু’জন গেলেন সেই কাজে। কিন্তু রতনবাবুরা জানতেন না যে সেই রাত্রে হয়ত একাকিত্বের হাত থেকে বাঁচতে ভোম্বলও হাঁস-মুরগীর ঘরে ঠাঁই নিয়েছে। রতনবাবুরা অন্ধকারে অসুরক্ষিত খাঁচার দরজা খুলে যে-ই না একটা মুরগী ধরেছেন অমনি সেটা কক-কক করে শব্দ করে উঠল, আর সাথে সাথে ‘কে রে, কে রে’ বলতে বলতে মেঝে থেকে তড়াক করে উঠে বসল ভোম্বল। এটা প্ল্যানে ছিল না। হঠকারিতায় রতনবাবুর মুখ দিয়ে ‘পালা, পালা’ কথা দুটো বেরিয়ে পড়ল। যাদের কোন বা কয়েকটা ইন্দ্রিয় দুর্বল, তাদের বাদবাকী ইন্দ্রিয় মাত্রাতিরিক্ত সজাগ হয়। ভোম্বলেরও হয়ত তাই ছিল। সেই কারণেই শুধু ওই মৃদু গলার আওয়াজেই সে অনন্ত বিস্ময়ের সুরে বলে উঠল, ‘রতন! তুমি?’

মুরগী ফেলে চোঁ-চা দৌড় দিয়েছিলেন রতনবাবুরা। তারা ভেবেছিলেন ভোম্বলদা হয়ত পিছু পিছু আসবে। কিন্তু ভোম্বল সেই রাত্রে আর আসেনি। হয়ত হাঁস-মুরগীর সংখ্যা না কমা-ই এর কারণ ছিল। পরেরদিন খুব ভোরের ট্রেনে বাড়ির দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন রতনবাবু। ভোম্বলের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়নি তাকে। কিন্তু পরে তিনি খবর পেয়েছিলেন, ভোম্বল নাকি এসেছিল। মেস ফাঁকা পেয়ে বিজনদের বাড়ি গিয়ে খুব তম্বি করেছিল ভোম্বলদা। বিজনদের বাবা-কাকার সাথে তর্কে না পেরে কাঁদতে কাঁদতে বৃথা আস্ফালন সহযোগে বলে এসেছিল, ‘আমার ভাইবোনকে এভাবে মেরে ফেলল ওরা? … কেন মারল? …কেন!! … ঠিক আছে, ভগবান সব দেখছে! সব দেখছে। যে যেমন করবে ঠিক তেমনটাই তার সাথে ঘটবে… ঘটবেই ঘটবে!’

এরপরে রতনবাবু এই এলাকায় আর আসেন নি। ও না, একবার এসেছিলেন। এই বিজনের-ই বৌ-ভাতে। কিন্তু সেবার তো তিনি শুনেছিলেন …

তাই তো! আর ভাবতে পারলেন না রতনবাবু। ভোম্বলদা তো বেঁচে নেই! সেইবার বিজনের মুখে রতনবাবু শুনেছিলেন, ভোম্বলদাকে বহুদিন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সে নাকি মরে গেছে। তাছাড়া এর মধ্যে পাশের রেললাইনে একটা বডি কাটা পরেছিল। এত খারাপ অবস্থা ছিল যে চেনা পর্যন্ত যায়নি। ওটাকে ভোম্বলের বডি বলে প্রায় সকলেই মেনে নিয়েছিল। কেননা শেষদিকে অনেকেই ভোম্বলকে রেললাইনের ধারে বসে অদ্ভুত সুরে গান গাইতে দেখেছে। ‘পাগল’-এর এমন পরিণতি খুব অস্বাভাবিক কি? … আর হ্যাঁ! কিছুদিন আগে বিশুও তো নাকি একরাত্রে অন-ডিউটি হার্টফেল করে …

মাথার চুলগুলো খাড়া হয়ে উঠল রতনবাবুর। নিমেষে ভোম্বলের কথাগুলো মনে পড়তে লাগল তার। মনের অপরাধী সত্তাটা যাবতীয় বোধবুদ্ধির উপর গুরু হয়ে উঠল। সমস্ত স্মার্টনেস ঘামের স্রোতে ভেসে গেল এক পলকে। প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলেন রতনবাবু। সে কি! এ তাহলে কে? ভোম্বলদার ভূ… ওরে বাবা, এ তো দুলতে দুলতে তার দিকেই এগিয়ে আসছে! এক পা পিছিয়ে গেলেন রতনবাবু। পিছন ফিরে দৌড় দেবেন কিনা ভাবছেন, এমন সময় ফের কথা বলে উঠল সেই ছায়ামূর্তি, ‘অ্যাই, কে রে তুই? … সে-ই রতনের মত লাগছে …’

সে-ই গলা! সর্বনাশ! এইবারে সত্যি-সত্যি পেছন ফিরে দৌড়তে লাগলেন রতনবাবু। এই বয়সে যতটা জোরে পারা যায় তত জোরে। কিন্তু অতৃপ্ত এবং প্রতিশোধকামী প্রেতের হাত থেকে কি অত সহজে নিস্তার পাওয়া যায়? একবার পিছন ফিরতেই রতনবাবু দেখলেন, ভোম্বলদা সেইরকম দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে তার দিকে। যেন হাওয়ায় ভেসে আসছে! আর অনতিস্পষ্ট গোঙানির মত স্বরে চিৎকার করে বলছে, ‘তুই কে? দাঁড়া, দাঁড়া! … কে তুই … রতন নাকি? … অ্যাই, কে রে তুই? … কে …’

কোথা থেকে যেন একটা যান্ত্রিক ঘরঘর শব্দ বেশ কিছুক্ষণ ধরেই কানে আসছিল রতনবাবুর। কিন্তু সেটা কিসের বা ঠিক কোথা থেকে ওটা আসছে সেদিকে পাত্তা দেওয়ার অবস্থা এখন তার নেই। সবার আগে এখন পালাতে হবে এখান থেকে! তাকে যে এখন ভূতে তাড়া করেছে! ভোম্বলের ভূত!

দিগবিদিক ভুলে ভোম্বলের অপচ্ছায়ার উপর নজর রাখতে রাখতে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়নোর ফলে রতনবাবু কখন যে রেলের লাইনে উঠে পড়েছেন সেটা তিনি বুঝতেই পারেন নি। আচমকা কিসে যেন ঠোক্কর খেয়ে বড় বড় পাথরের উপরে পড়ে গেলেন তিনি। চট করে আর উঠতে পারলেন না। এবং এরই মধ্যে হুট করে সেই যান্ত্রিক শব্দটা বহুগুণ বেড়ে উঠে তীক্ষ্ণ একটা হুইসেল আর একরাশ উজ্জ্বল হলদে আলো নিয়ে হুড়মুড় করে তার গায়ের উপর এসে পড়ল, আর ……

দুই নম্বর প্ল্যাটফর্ম দিয়ে রাত দশটা সতেরোর থ্রু ট্রেনটা বিকট শব্দ তুলে স্টেশনচত্বর কাঁপিয়ে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেও এক নম্বর লাইনের পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রতনবাবুর ভোম্বলদা। তারপর ‘রতনের মত’ লোকটাকে আর দেখতে না পেয়ে মাথা নীচু করে আগের মতই দুলতে দুলতে ফিরে চলল সে। খুবই হতাশ দেখাচ্ছিল তাকে। নাহ, এই জন্মে তার আর রতনবাবুর নাগাল পাওয়া হল না।

 

অন্যতম দেখার বিষয় হচ্ছে, রতনবাবুর রাশিফলের জোর ছিল বলতে হবে! তার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি আজ শেষ পর্যন্ত কিন্তু সত্যি-সত্যিই খোয়া গেল।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ