18 Aug

গন্ধবাবা

লিখেছেন:দেবাশিস মজুমদার


তাতাই গাছেদের সব কথা জানে। ওর বাড়ির লোক আর পরিচিত লোকেরা অন্তত তাই জানে। তাতাইয়ের ভাল নামটা কমজোরি হয়ে হয়ে কিভাবে হারিয়ে গেছে ও নিজেও সেটা বুঝতে পারে না। বাড়ির পেছনের কয়েক বিঘা জমিতে দাদুর সখের বাগানে যত গাছ  আছে  সবই যেন ওরই  বন্ধু। ওদের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা ও যেন দেখেই বুঝতে পারে। আর ওরাও যেন ওকে বুঝিয়ে দিতে পারে ওদের চাহিদাগুলো। ওদের আশ্রম স্কুলের জীবনবিজ্ঞানের স্যার উজ্জ্বলবাবু ওকে তো ‘বলাই’ বলেই ডাকেন। গাছের পরিচর্যা, গাছেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য ওর স্কুলে মহারাজরা, বিশেষত শান্তনু মহারাজ ওকেই এখনও ভরসা করেন। ওর এই জ্ঞানযোগ ও কর্মযোগের একমাত্র সঙ্গী খোকা। যে ওর সঙ্গে বাগানে আঠার মতো সেঁটে থাকে। স্কুলের পরীক্ষা বা বোর্ডের পরীক্ষার আগে কয়েকদিন বাদ দিয়ে বাকি সময় বাগানে গেলেই দেখা যাবে তাতাই আর খোকাকে। খোকা আগে একটা গেস্ট হাউসের নার্সারিতে মালির কাজ করত। আসলে ওই নার্সারিতে এসেছিল খোকার দাদু, তাতাইয়ের দাদুর আমলে। সেখান থেকেই খোকাদের বাগানে আসা।

খোকাই ওকে প্রথমে জানিয়েছিল ওদের গ্রামের গন্ধবাবার গন্ধ মাহাত্ম্যের কথা। এই গন্ধবাবার গায়ের গন্ধ নাকি বহু দূর থেকে লোকে পেত। আর লোক বুঝে নাকি গন্ধ বদলাত। যেমন কেউ গাছ কাটতে এলে এমন পচা গন্ধ গাছের পাশে ছড়িয়ে যেত যে গাছ কাটিয়েরা মুখ চাপা দিয়ে পালাত। আর বৃক্ষপ্রেমীরা তাদের মনের গন্ধ অনুযায়ী রকমারী সুগন্ধ পেত গাছেদের আশেপাশে। এই গন্ধবাবাকে চোখে নাকি দেখতে পাওয়া যেত না বা তার সামনে গেলেও কোনও গন্ধ পাওয়া যেত না। গ্রামের গড়খাই পেরিয়ে জঙ্গলের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক নদীনালা খালবিলের ভেতরে ছিল একটা বট অশ্বত্থের জোটবদ্ধ বিশাল গাছ। একটা আর একটার সঙ্গে কিভাবে জড়িয়ে আছে বোঝা দায়! পরস্পরকে জড়িয়ে থাকা কয়েকশো বছরের ঝোপড়া গাছটা নাকি অসীম ক্ষমতা ধরে — খোকার দাদু খোকাকে বলেছিল। তার দাদু আবার তাকে। তা তাদের সেই দাদুর দাদুর আমলে রেওয়াজ ছিল —  কোনও সমস্যায় পড়লে ওই গাছটার কাছে গিয়ে সমস্যাটা জানিয়ে চলে আসা। ব্যস তাহলেই কেল্লাফতে। ঠিক মিলে যেত সমাধান। তবে হ্যাঁ, শর্ত একটাই ছিল — ঘরোয়া সমস্যা, স্বামী স্ত্রীর সমস্যা, ঝগড়াঝাটি মারামারি শত্রুতা, ভাল টাকা পয়সা  এসব চাইলেও কোনও সমাধান মিলত না। সোজা কথায় গৃহীর গাছবাবা নয়, সংসারবিমুখ পাক্কা সাধুবাবা — যে সমস্যা শোনে চাষীর, মাঝির বা মালির। যেমন চাষীর বৃষ্টির দরকার গিয়ে বলে এল। দেখা যাবে কয়েকদিনের মধ্যে ঠিক বৃষ্টি নামবেই। কথা শুনেই তাতাইয়ের মনে পড়ল পেলিং-এ দেখা বৃষ্টি কামনায় গুম্ফা সাধুদের ‘বুমকারা’ উৎসব পালনের কথা। মাঝির কাছে ঝড়ের খবর আছে — দূরে নৌকা ভাসাবে, ভাবনা কি — গিয়ে বলে এল। ঝড় বৃষ্টি উধাও। কোনও মালির পেয়ারের কোনও গাছ  কাটার পরিকল্পনা হয়েছে কিংবা গাছ অসুস্থ জানিয়ে এল গন্ধবাবাকে। সমস্যা সমাধান। তবে ব্যক্তিস্বার্থে গন্ধবাবা অচল। তার একমাত্র শক্তি গন্ধ মাহাত্ম্য। একেবারে অহিংস পদ্ধতি। কটূগন্ধ কতরকম ভাবে যে  ক্ষেত্রস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে কার্যোদ্ধার করে তা কেই বা বলতে পারে। বিনিময়ে কিছুই দিতে হয় না গন্ধবাবাকে। শুধু কার্যোদ্ধার হলে গন্ধবাবাকে স্মরণ করে যে কোনও একটা ফুল বা ফলের গাছ এ পৃথিবীর কোথাও বসিয়ে দিলেই হল। কতদূর দূর থেকে খবর পেয়ে চাষী, মাঝি-মাল্লা, মালির দল তাদের গ্রামে আসত। তার ঠিক ঠিকানা নেই।

এই বাবা নাকি স্বপ্নে টপ্নে কখনও দেখা দেন না। বিপন্ন মানুষ প্রকৃতির কাছে পর্যদুস্ত হলে বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকাতে তার কাছে গেলে বা তার কথা ভাবলে শুধু গন্ধ মাহাত্ম্যে তার উপস্থিতি জানান দিয়ে তাকে উদ্ধার করাই তার প্রধান কাজ। বিপন্ন মাঝি চাষীরা নানা গন্ধে নাকি তার উপস্থিতি টের পেত এবং বিপন্মুক্ত হত। এটাই ছিল স্থানিক বিশ্বাস। তাতাই ভাবল কয়েকদিন আগে ভয়াবহ ঝড় আমফানে তাদের সখের বাগানটা তছনছ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমগাছের। সাতটা আমগাছ গোড়া থেকে উপড়েছে। তার মধ্যে পাঁচটা ওদের দাদুর হাতে লাগানো লক্ষ্মণভোগ। এই পাঁচটা গাছই ছিল ওর প্রাণের সম্পদ। সিঁদুরে লাল হলুদ আর সবুজ রঙ এর মিশেলের পাকা আমগুলোর মিষ্টত্ব কেউ কখনও কোনও তুলনা দিয়ে বোঝাতে পারবে না। ও ছোটবেলা থেকে বাড়ির ওই আম ছাড়া বাইরের অন্য কোনও কেনা আম কখনও মুখে দেয়নি। গাছ উপড়ে বাগানকে যত না ফাঁকা করেছে তার চেয়ে বেশি ফাঁকা করেছে তাতাইয়ের হৃদয়টাকে। এর ওপর আছে তার ছোটকাকুর বন্ধু পাশের পাড়ার গুড্ডু প্রোমোটার। যে তাদের শরিকি বিবাদের সুযোগ নিয়ে বাড়ির পিছনের বাগানের অর্ধেকটা আত্মসাৎ করতে চাইছে। বাপমরা তাতাই এই মনমরা অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে খোকাকেই ধরল — গন্ধবাবার কাছে একবার যাওয়া যায় খোকাদা?

যতদিন যাচ্ছে তাতাইয়ের একটা সমস্যা বাড়ছে। গাছের মৃত্যু, পুকুরের সমাধির খবর পেলে শরীরের মধ্যে একটা কষ্ট শুরু হচ্ছে। ওদের মিষ্টি মফস্বল শহর সহজপুর আজ তার চরিত্র হারিয়ে প্রায় উপনগরী। গোটা কতক বাগান ঘেরা বাড়ি আছে যা সাকুল্যে দশটাও হবে না। পুকুর ছিল কত, সব গেছে বহুতলের নীচে। তাতাই ওই জন্য খুব প্রয়োজন না থাকলে সাইকেল নিয়ে শহরে ঘোরাফেরা করে না। ওর বিকেল কাটে খোকা, খোকার এক গ্রামতুতো বন্ধু ভবা আর ওদের পারিবারিক বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু তুহিন জ্যেঠুর সঙ্গে। এই তুহিনবাবু ভদ্রলোক বৃদ্ধ হয়েও বৃদ্ধ নন। পঁচাত্তর পার করেও শরীরে পঞ্চাশের ছাপকে ধরে রাখতে পেরেছেন। যোগব্যায়াম, গাছ, বই আর গান বাজনা নিয়ে অকৃতদার ভদ্রলোকের জীবন। খোকার গ্রামতুতো বন্ধু ভবা থাকে সহজপুরের শেষ মাথায়। সেও মালি, তবে বড় গেস্টহাউসের। খোকাদের বাড়ি থেকে দশ মাইল দূরে সান্যালদের যে দশবিঘা বাগান বাড়ির গেস্ট হাউসটা আছে তার প্রধান মালি ভবা। খোকাও মাঝে মাঝে কাজ পায় সেখানে। রাতে ও আর ভবা সেখানেই থাকে আর পাহাড়াদারের কাজ করে বাগানটার। বাগানটা খুব প্রিয় তাতাইয়ের। গঙ্গার পাড় জুড়ে কত্ত গাছ গাছালি। বাগানের প্রতিষ্ঠাতা দ্বারিক সান্যাল ছিলেন সৌখিন মানুষ। উত্তরবঙ্গে ছিল কাঠের ব্যবসা। অগাধ পয়সা না উড়িয়ে তখনকার দিনে মফস্বল শহরে গঙ্গার ধারে সস্তায় জমি কিনে গাছগাছালি বসিয়ে এই বাগানবাড়িটা তৈরি করেছিলেন। কত দুষ্প্রাপ্য গাছ যে বসিয়েছিলেন তার ঠিক ঠিকানা নেই। ওদের গ্রাম রতনপুর থেকে  খোকার দাদু ওখানেই মালি হিসেবে কাজে আসে। আর ওখান থেকেই তাতাইদের বাড়ি। কারণ এই দ্বারিকবাবু আর তাতাইয়ের দাদু ছিলেন হরিহর আত্মা। ফলে মালি বিনিময়ে তারা ঘটিয়েছিলেন গাছ বিনিময়ের মতো সখ করে। এখনও ওই পুরনো দিনের বাগান বাড়িটাতে একটা নৌকা যত্নে রাখা আছে। নৌকাটার যত্নআত্তিও করে খোকা ভবারা। মাঝে মাঝে জলপথে ওরা বেড়াতে বেড়োয় তাতাই আর তুহিনবাবুকে সঙ্গে নিয়ে। আসলে সান্যাল বাড়ির সবাই প্রায় বিদেশের বাসিন্দা। দুই একজন কলকাতার দিকে থাকে। তারাও তাতাইদের কাছে বাড়িটার দেখভালের দায়িত্ব ছেড়ে হালকা হয়ে আছে বয়সের কারণে। ফলে খোকা, ভবা, তাতাই, তুহিনবাবুর স্বর্গরাজ্য এই বাগানবাড়িটা। বেশিরভাগ দিনের বিকেলবেলা কাটে এই গাছপালার ঘেরাটোপে। একবার ওরা গিয়েছিল ব্যান্ডেল ছাড়িয়ে শ্রীপুর গ্রামে। ভবার একটা নৌকা কেনার খুব শখ। জলে ভেসে থাকতে নাকি ওর খুব ভাল লাগে। তাই তাতাইয়েরও মনে হয়েছিল ওকে দিয়ে নৌকা কেনালে ও বেড়াতে পারবে। তাই দাম-দর করতে যাওয়া। হাজার হাজার গাছে ঘেরা সেই গ্রাম। তাতাইয়ের এই গাছগাছালি জলজঙ্গল ভাল লাগাকে সবাই খুব ভাল ভাবে নেয় না। বাড়িতে পাড়ার নানা কথা ওঠে এই বাপমরা ছেলেটিকে নিয়ে। কিছু কথা ওর কানেও এসেছে। ছেলেটা একটু পাগলা গোছের কিমবা মনে হয় ‘স্লাইট অ্যাব’। এই সব কথা যত জেনেছে তত ওর ভালই লেগেছে। লোকের আলোচনা সমালোচনায় কিরকম জীবিত আছে ও। তবে এরা তো কেউ ওর বাড়ির ছোটকাকার মতো কথায় কথায় কথা শোনায় না।

কয়েকদিন হল ওর সঙ্গে কথা কাটাকাটি শুরু ওর শখের বাগানটা গুড্ডু প্রোমোটারের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে। নিজের সিদ্ধান্তে ছোটকাকা যখন এগোচ্ছিল অন্যান্য শরিকদের হাতে নিয়ে তখন তাতাই ওকে ডেকে বলেছিল — কত পুরনো পুরনো গাছ মারা যাবে গো! তোমার কষ্ট লাগবে না? ব্যঙ্গের হাসিটাকে আরও ছড়িয়ে দিয়ে একটা অশ্রাব্য শব্দ ছুড়ে বাইকে স্টার্ট দিয়ে ওর বৃক্ষপ্রেমকে প্রায় মাটিতে পিষে দিয়ে গিয়েছিল ছোটকা। এরপর যখন আমফানে বড় বড় সাতটা আমগাছের গোড়া ওপড়ালো আর খোকা, ভবা, তুহিনবাবুকে সঙ্গে নিয়ে গাছপালা ছেঁটে, ঘুরিয়ে গোড়ায় মাটি জুগিয়ে নতুন করে পোঁতার বন্দোবস্ত করেছিল, তখনই লাগল গোলমাল। ছোটকা হিসেবটা মেপেছিল।

তাতাইয়ের জীবনে এটা নতুন নয়। এর আগেও হয়েছে। গতবছর যখন আমাজনের জঙ্গলে আগুন লাগল, হাজার হাজার বনভূমিকে পুড়ে যেতে দেখল টিভিতে। দলে দলে পশুকে জ্বলন্ত দগ্ধ হতে বা পালাতে দেখল তখন ও চুপ করে বসে থাকত। ওর মনে খুব একটা কষ্ট হত। সে কষ্টটা কাউকে বলতে পারত না। ওর মা বুঝতে পারত। জিজ্ঞাসা করলে উত্তর পেত না কিছু। কিন্তু খোকাকে, ভবাকে ডেকে এনে ছবিগুলো দেখাত। ওর সঙ্গে থেকে থেকে খোকা, ভবাদের মধ্যেও কিরকম একটা গেছো মনোভাব হয়ে গেছে। এরপর কয়েকমাস বাদে আবার যখন শুনল অস্ট্রেলিয়ার জঙ্গলে আগুনের কথা, ও সত্যি সত্যি ভেঙে পড়েছিল। সারাদিন ঘুরে ফিরে আপনমনে বারবার বলত কি যে হচ্ছে কে জানে। পৃথিবীটার কি হবে কে জানে। বড় পুরনো পুরনো গাছ হয়তো বা পৃথিবীর বয়সি বা তার চেয়ে কিছু ছোটো স্রেফ পুড়িয়ে দিল…। তুহিনকাকু বা স্কুলের শান্তনু মহারাজকে মাঝে মাঝেই ফোন লাগাত আর বলত, কত গাছ পুড়ল আর কেউ তো কোনও প্রতিবাদ করল না। কি যে হবে পৃথিবীটার! কে জানে!

ওর এই ফোনের কথা কোনও দিন বোধহয় শুনতে পেয়েছিল ওর নতুন রাজনীতিতে নামা ছোটকাকা। একদিন বেড়িয়ে যাওয়ার আগে সামনে এসে বলল, খুব প্রতিবাদ শিখেছিস! কোথাও কেউ জঙ্গল পোড়াল তাতে তোর যদি এত দুঃখই হয় তাহলে জঙ্গলে গিয়ে থাকলেই পারিস। চলে যা না সুন্দরবনে। খোকা ভবাকে সঙ্গে নিয়ে যা, খাড়িতে বসে মাছ ধরবি আর রাতে গাছে শুবি। শুনে তাতাইয়ের কী যে আনন্দ হয়েছিল বলতে পারেনি কাউকে, বোঝাতে পারেনি কাউকে। সত্যি সত্যি ও তো ওখানেই যেতে চায়। ওখানে গেলেই ও গেছোবাবার কাছে যেতে পারবে।

কিন্তু পরের দিনে ছোটকার কথাটা ওর খারাপ লেগে গেল। বিশ্রী আওয়াজ করে বাইকটা বাগানে ঢুকিয়ে বাইক থেকে নেমে বলেছিল, শোন এই যে গাছ গাছ করিস না, জানবি যত জঙ্গল তত মশা। বাজে পোকামাকড় এই সব ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার আড্ডা। জল জমবে, কাদা হবে, হয় ডেঙ্গু নয় ম্যালেরিয়া। অবশ্য তোর মতো জংলীকে কামড়াবে কিনা জানিনা।

গাছকে ভালবেসে জংলি বদনাম পাওয়ায় মনটা একটু খচ খচ করে উঠেছিল। সেই ছোটকাই যখন লকডাউন ঘোষণা হল তখন বিকেলে বাগানে একা একা ঘুরত আর ফোনে বক বক করত দলের ছেলেদের সঙ্গে কোন ফ্ল্যাটে কোন ছেলেকে করুণা করেছে তার হিসেব নিকেশ বুঝত। আসলে ভবা আর খোকা করোনাকে ‘করুণা’ করে দিয়েছে নিজেদের জিভের টানে। আর সেটা কিভাবে মাধ্যমিক পাশ ছোটকার মুখে বসে গেছে সেটা শত চেষ্টা করেও বুঝতে পারেনি তাতাই। তারপর মাঝে মাঝে নেতাদের বলত — ‘আমাকে নিয়ে ভাববেন না। দিব্যি আছি। খাচ্ছি দাচ্ছি আর বাগান পায়চারি করে সময় কাটছে। চারদিক ফ্রেশ এয়ার। ওসব ভাইরাস টাইরাস এসব ফ্রেশ এয়ারে নেই। থাকতেও পারবে না।’ তাতাই এসব কথা শুনে নিজেই বুঝতে পারে না এরা কি চায়!

এই করুণার বাজারে তাতাই খোকাদের গ্রাম রতনপুরে জলযাত্রা করবে বলে ঠিক করেছে। ওদের এই উদ্যোগের প্রধান হোতা তাতাইয়ের মা। লকডাউনের বাজারে খোকা আর ভবার বাড়ির জন্য মন কাঁদল তাতাইয়ের মায়ের। সান্যাল বাড়ির কলকাতার লোকজনের সঙ্গে তিনি নিজেই কথা বলে টাকা পয়সার জোগাড় করলেন। দুটো বাড়ির জন্যই জোগাড় হল চাল, ডাল, তেল,  মশলাপাতি আর কিছু টাকা পয়সা। তাতাই এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। ওর উদ্দেশ্য কিন্তু অন্য, ওর লক্ষ্য স্থির হয়ে আছে রতনপুরের শক্তি – গন্ধবাবার দিকে। আট ঘণ্টা জলযাত্রা চারজনে পৌঁছল রতনপুর গ্রামে। কয়েকঘর মা্লি, চাষী আর তাঁতি নিয়ে জঙ্গল ঘেরা ছোট্ট গ্রাম। প্রায় সমাজ বহির্ভূত একটা গ্রাম। গ্রাম বলা যায় আবার নাও বলা যায়। ওখানকার মানুষ এত ভাইরাস, লকডাউন, ব্যাক্টেরিয়া, কোয়ারেন্টাইন এসব বুঝতেও পারছে না। ব্যাপারটা দেখে আমোদ পেল তাতাই। খোকার এক কাকা বলল, ‘শুনছিলাম বটে শহরে কী একটা রোগ এয়েচে। সব নাকি বন্ধ করে দিয়েছে। কি জানি আমাদের এখানে তো কয়েকটা লোক। এখানে আসেই বা কে? যায়ই বা কে? এখানে বন্ধই বা করবে কি?’ তাতাই বুঝল — ‘খোকাদের করুণা’ এখানে বহুদূরের যাত্রী। দুপুরে পেট পুরে খাওয়া দাওয়া করাল খোকার মা। রাতে এখানেই থাকার কথা। কারণ একদিনে রতনপুর গিয়ে  ফিরে আসা যায় না। অতক্ষণ একটানা নৌকা বাওয়া দায়। তাতাইয়ের মন কিন্তু শেষ বিকেলের রোদে গাছগাছালির ফাঁক বেয়ে খোঁজ চালাচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই কাঙ্ক্ষিত দেবতার দর্শনের আশায়। কখন যাবে তার বহুদিনের আরাধ্যকে দেখতে? ওর মন তখন বলছে বাড়ির সাতটা আমগাছকে বাঁচাতেই হবে। আর বাগানটাকেও। কিছু করার নেই। সারারাতের তারাভরা আকাশে তারা গুণতে গুণতে সে খোকাকে কত বিরক্ত করেছে ঠিক নেই। এভাবেই খোকাদের গোরুর গোয়ালের দুধ আর রুটি খেয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে তাতাইয়েরও মনে নেই। আলো ফোটা ভোরে খোকার চীৎকারে লাফিয়ে ওঠে চারজনই ডিঙি নৌকায়। ডিঙি চলল সরু নালা বেয়ে ধীরে ধীরে। ভোরের আলো যত ফুটছে ওরা প্রবেশ করছে গভীর জঙ্গলে। জঙ্গলের গভীরতা দেখে তুহিনবাবু প্রথমে একটু ভয় পেলেও তাতাই যেন নৌকা মধ্যে ধ্যানমগ্ন মহারাজ। কখন দেখা মিলবে সেই আকাঙ্ক্ষিতের! ভবা আর খোকা একটা অদ্ভুত ভাষায় গান ধরেছে, হয়তো ওদের ভক্তিগীতি। তাতাই তাকাতেই সে বলল — ‘দাদু গাইত।’ এরপর নৌকা যেখানে গিয়ে থামল সেটা একটা দ্বীপই বলা যায়। চারিদিকে ঝুপসা অন্ধকার। আলো আঁধারির মিশেলে জলময় জঙ্গল। হাজার হাজার জলচর পাখির কিচিরমিচির এর মাঝে কোথা থেকে একটা কুবো পাখির ডাক হঠাৎ করে কানের কাছ থেকে উঠছে। নৌকাটা ভেতরে ঢুকতেই কয়েকটা বনটিয়া চমকে সরে গেল। গাছের ডাল ধরে দোল খেতে খেতে বেরিয়ে গেল কয়েকটা বাঁদর। সামনের একটা মোটা গাছে নৌকা বাধল ভবা। নামার আগে হাত ছুঁইয়ে ভূমিতে প্রণাম  সেরে  দুহাত জড়ো করে নমস্কার করল একটু দূরে জলঘেরা আরও বড় দ্বীপের মধ্যে গজিয়ে ওঠা ঝুড়িওয়ালা বটগাছটার দিকে। তাতাই তাকাতেই বোটানিক্সের গাছটার কথা মনে পড়ল। সত্যি ওর পাতা খুব কম ঝুড়ি বেশি। আর এটার পাতাও যত ঝুড়িও তত। ঝুড়ি পাতা সব মিলিয়ে জলের ওপর হুমড়ি খেয়ে আছে বট অশ্বত্থের পাতার ঝোপড়া ডালপালা। গাছটা যে কতদূর বিস্তৃত আন্দাজে বোঝা মুশকিল। তাতাই একদৃষ্টিতে দেখছে। প্রণাম দূরের কথা বরং একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গাছটার দিকে। ও কিন্তু মনে মনে চাইছে গাছটাকে ওর বাগানে বসাত। ঠিক পড়ে যাওয়া আমগাছতলার ফাঁকা জায়গাটাতে। কতক্ষণ এভাবে ছিল জানা নেই। তুহিনবাবু আর খোকার ধাক্কায় ওর সম্বিত এল। খোকা বলল, বলেছ তোমার কথা?

ও না, হ্যাঁ, কি জানি…

বাহ্‌! অসাধারণ — স্বগতোক্তি করে তুহিনবাবু মোবাইল বের করলেন ছবি তুলবেন বলে। খোকা বাধা দিল, খবরদার, মোবাইল নিয়ে ফিরতি পারবেন না বাবু ওসব আধুনিক জিনিস এখানে চলে না। ওরা দুহাত দিয়ে গাছটাকে প্রণাম করে নৌকা ছাড়ল।

খোকারা বাড়ি ফিরে তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া সেরে বাড়ির পথে যাত্রা করল। বাড়ির জন্য নাড়ু মোয়া তক্তি নানা জিনিস নৌকায় তুলতে তুলতে খোকার মা তাতাইকে বলল, কেমন দেখলে গো বাবু আমাদের দ্যাবতাকে? ওই এখানকার গ্রামের মানুষকে বাঁচায়  রেখেছে। কিছু কাচা আমও নৌকায় তুলে দিলেন ভবার মা। সঙ্গে আমতেল, আমের আচার। যদিও বাড়ির লক্ষ্মণভোগ আমের স্বাদ কোথাও পায় না বলে তাতাই বাইরের কোনও আম খেতে চায় না। কিন্তু হাসি মুখে খোকা ভবাদের সব আমই নৌকাবন্দি করল। নৌকা যখন ছাড়ল তখন সূর্য মধ্য গগন থেকে পাটে যাওয়ার পথে। বিকেলের পড়ন্ত রোদে পুড়তে পুড়তে নৌকার ছইয়ের উপর শুয়ে শুয়ে জল আর দাঁড়ের কথাবার্তা শুনছিল তাতাই। ওর মনে কিন্তু গন্ধবাবার গন্ধটা ধরেই রয়েছে। নৌকার আমের গন্ধ কিনা জানি না ও এই জলের মধ্যেও নাক টানলেই যেন মিষ্টি পাকা আমের গন্ধ পাচ্ছিল। এই গন্ধ নিতে নিতে আর সন্ধ্যার আকাশে একফালি চাঁদকে উঠতে দেখল।

সান্যালদের ঘাটে নৌকা বেঁধে বাড়ি যখন পৌঁছল তখন প্রায় রাত এগারোটা বেজে গেছে। খোকার মায়ের জিনিস নামাতে নামাতেই তাতাইয়ের মা বলল, জানিস তাতাই তোরই জয় হল। যে আমগাছগুলো ভবা আর খোকাকে নিয়ে তুই বসিয়েছিলি তার সব কটাতেই ছোট্ট ছোট্ট পাতা এসেছে। প্রতিমা ভাঙা ডালগুলো থেকে যে কাঁচা আমগুলো এনেছিল সব পেকে গেছে। ওই ঘরটাতে এমনি রেখেছিল, কি করে যে পেকে গেল কে জানে! খাবি একটা? কথাটা শুনে এক লাফে স্নান সেরে তাতাই খাওয়ার টেবিলে। সেই সবুজ, হলুদ আর সিঁদুর রঙ-এ মেশা তিনরঙা একটা আম হাতে নিয়েই ওর মনে পড়ল সেই গন্ধবাবার কথা।

খেয়ে দেয়ে বাগানে একটু পায়চারি করার অভ্যাস বহুকালের। আমগাছগুলোর ফাঁকা জমির পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ও বুঝতে পারল পাকা আমের গন্ধে ম ম করছে চারদিক।অথচ চারদিকে ডালপালা পাতা সব উধাও।কীরকম একটা ঘোর লাগা অবস্থা ওর।

সম্বিত ফিরল একতলার ঘর থেকে ভেসে আসা ছোটকাকার ফোনালাপের কথায়, — কী বলছ গুড্ডুকে নিয়ে গেছে? ও তো কোথাও বের হয়নি গো? আর মুখে মাস্ক তো প্রথমদিন থেকেই ছিল — মনে হয় ভুল শুনেছ। হতেই পারে না…অবশ্য এতটা আমিই বলি কি করে ওদের তো হাজারটা মুখ না। কোন মুখে কি খাবার টানে মাস্ক খুলে ফেলেছিল, কে জানে এখন আর বলে কি হবে…ও ডুবল…আমি ডুবলাম…আমার প্রোজেক্ট তো…

আশপাশের পাকা আমের গন্ধটা   যতটা  তীব্র মনে হচ্ছে কথাগুলো ততটা তীব্র নয়। খুব ঘুম পাচ্ছে তাতাইয়ের। শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল। রাতে শোবার আগে মোবাইল ঘাঁটার অভ্যাস বহুদিনের। ন্যাশানাল জিয়োগ্রাফিটাই একটু দেখে। হঠাৎ একটা খবরে চোখ আটকে গেল তাতাইয়ের। নাসা পৃথিবীর বাইরেও আরেক নতুন পৃথিবীর সন্ধান পেয়েছে। বিজ্ঞানীরা উচ্ছসিত। ধড়মড় করে উঠে বসতে যাবে ফোনটা বেজে উঠল — ফোনের ওপার থেকে তুহিনকাকার কণ্ঠ, শুনেছ?

তাতাই বলল, হ্যাঁ। খবরটা এইমাত্র দেখলাম কাকু।একটা নতুন পৃথিবী । ভাবুন তো একবার কিচ্ছু নেই সেখানে শুধু গাছপালা মাটি আর জল। আমি তো ভাবতেই পারছি না। ওপারে তুহিনবাবু কিছু কথা বলে যাচ্ছিলেন। তাতাইয়ের চোখে ভাসছে জল জঙ্গলে ঘেরা এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন। একটু পরে বলল, থাক, কাল কথা বলব।

তাতাইয়ের মা পাশে আধো ঘুমের মধ্যে থেকে জিজ্ঞাসা করল, নতুন পৃথিবী? কোথায় রে?

তাতাই উত্তেজিত স্বরে বলল, এই পৃথিবীর বাইরে মা। আরেকটা পৃথিবী।

থাক তোর নতুন পৃথিবীর খবর। এখন শুয়ে পর তোর প্রাচীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে দেখতে।

তারপর নিজের মনেই বলল, যারা নিজের পৃথিবীটাকেই রক্ষা করতে পারে না, তারা নতুন পৃথিবীর খোঁজ পেয়ে কী করবে!

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ