22 Oct

পলেস্তরার আড়ালে

লিখেছেন:আর্জব দে


॥১॥

সুধাংশুর বাড়িতে জোর আড্ডা। সুধাংশুশেখর রায় আজ পা রাখছেন ৬২ বছর বয়সে। জগদীশ সেন বললেন, “সুধাংশু, তোমার চেহারায় বেশ একটা গ্লেস এসেছে।”  জগদীশ সেন সুধাংশুর প্রতিবেশী। আজ ১২ বছর তারা পাশাপাশি বাড়িতে দিন কাটাচ্ছেন। এরমধ্যে একবারটিও তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়নি। এর কৃতিত্ব অবশ্য  জগদীশবাবুরই। জগদীশবাবু ঝুটঝামেলাহীন, নির্বিরোধী, নিরীহ মানুষ না হলে কোনদিন হয়তো দুজনে খন্ডযুদ্ধ বাঁধিয়ে বসতেন। বিকাশ বললে, “গ্লেস আবার কী! ওর ভুঁড়িটি যে হারে বাড়ছে ক’দিন পর না উঁটের কুঁজের মত বেশ একটা জল সংরক্ষণাগার তৈরি হয়ে যায়।” বিকাশরঞ্জন দত্ত সুধাংশুর স্কুলফ্রেন্ড। বছর দুয়েক হয়েছে বিকাশ আর সুধাংশু দুজনেই রিটায়ার করেছেন আইটি কোম্পানী আইওআরসি থেকে। জগদীশও সেখানেই চাকরি করতেন। তবে তিনি অবসর নিয়েছেন আরো কিছু বছর আগে। আড্ডায় রয়েছে চিত্ত দাশগুপ্তও। চিত্ত ডাক্তার। প্রাইভেটে প্র্যাকটিস করে। পসার খুব একটা ভালো না। চিত্ত সুধাংশুর জামাই চিরঞ্জিতের বন্ধু। এবারের জন্মদিনটা এজন্যই সুধাংশুবাবুর কাছে আরো স্পেশাল। মেয়ে অমৃতা কাছে আছে। সুধাংশুর স্ত্রী আশা প্লেটে করে মাংসের বড়া নিয়ে আসে। সুধাংশু টপাটপ দুটো মুখে পুরে দেয়। হাসির রোল ওঠে। চিরঞ্জিত বলে, “আপনার হাইপ্রেসার আঙ্কল। সকালেই ছিল ১৬০/১০০। কী যে করেন না! কিছু হলে লোকে গাল দেবে আমাকে। বলবে আপনার আমেরিকান জামাইটি অত্যন্ত বাজে ডাক্তার। তাই না? তারা তো আর মাংসের বড়ার ঘটনাটা জানবেনা।”

সুধাংশু এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন, কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে বললেন,“অত চিন্তা কোরো না বাবা। সহজে টপকাবো না। বুঝলে?”

অমৃতা সবাইকে কফি সার্ভ করতে করতে বলে,“কথার কী ছিরি!”

খাওয়া শেষ করে জগদীশ উঠে পড়ে। বলে,“চলো সুধাংশু,আমরা তিন বুড়োতে একটু ঘুরে আসি।”

ওরা তিনজনে উঠে পড়ে। পার্কে ষাটোর্ধ্বদের বসার জায়গা করা আছে ছোট একটা দিঘির পাশে। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটির পর সেখানে গিয়ে তিনজন বসে। জগদীশবাবু বলেন, “সত্যি কী বিচিত্র জীবন আমরা কাটিয়েছি আইওআরসিতে। কত ঘটনা, কী রোমাঞ্চ। আশ্চর্য!”

সুধাংশু বলে,“সে আর বলতে।”

জগদীশ বলেন,“সত্যি। অরুণের কোটি টাকার স্ক্যাম, অচিন্ত্যর মৃত্যু। কী সাংঘাতিক!  শুধু কী তাই। পুলিশ আজ পনেরো বছর হয়ে গেল অরুণকে ট্রেস করতে পারলোনা। মাঝখান থেকে সঞ্জীবটা, ইস!” বিকাশের দীর্ঘশ্বাস পড়ে।

জগদীশ বলে,“সত্যি অমন একটা ব্রাইট ছেলে…”

সুধাংশু হঠাত্‍ অদ্ভুত গলায় বলে,“বিকাশ, আমার মাথাটা দপদপ করছে। রগগুলো মনে হচ্ছে ছিঁড়ে যাবে।”

জগদীশ হাতের বোতলটা দিয়ে বলে, “জলটা একটু খাও।”

সুধাংশু জলটা খেয়ে কিছুটা শান্ত হয়। ওরা বাড়ি ফিরে আসে। সুধাংশুর শরীর খারাপ হয়েছিল জানতে পেরে চিত্ত আর চিরঞ্জিত সুধাংশুকে ঘরে এনে শুইয়ে দেয়। চিত্ত বলে, “কাকিমা, ওনাকে ওষুধগুলো দিয়েই দিন। আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া ভাল।” আশা ওষুধগুলো খাইয়ে এসি ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। চিত্ত ঘরে থেকে যায়। সে রাতে হার্ট অ্যাটাকে সুধাংশুর মৃত্যু হয়।

॥২॥

“মৃত্যুর তিনমাস পর আপনার হঠাত্‍ই কেন মনে হল যে ব্যাপারটার তদন্ত হওয়া উচিত?” প্রশ্নটা যে করল সে আশার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। মাথার পেছনের কাঁচাপাকা চুলে তার বামহাতটা রেখে সে তাকিয়ে আছে জানলার বাইরে। পরনে পাঞ্জাবি।

“জানিনা নবীনবাবু, জানিনা। আমি আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারবনা। কিন্তু আমার যেন মনে হচ্ছে কোথাও একটা ফাঁক আছে। কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে।”

“হতেও তো পারে আপনার সন্দেহ অহেতুক। বডির পোস্টমর্টেম হলোনা, এমনকি বডিটা দেখতেও পেলাম না। আমার পক্ষে অন্ধের মত এ কেসের তদন্ত করা সম্ভব নয়।”

“আপনাকে আমি ফর্টি থাউজ্যান্ড অফার করছি। টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড অ্যাডভান্স।” নবীন হাইপাওয়ারের চশমাটার গ্লাসদুটোতে ফুঁ দিলেন। তারপর বললেন, “ওকে।”

নবীন রিটায়ার্ড জার্নালিস্ট। তাঁর স্ত্রীর চাকরির আর বছর দুয়েক বাকি। ছেলেটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। তাঁর ইচ্ছে বিদেশে পিএইচডি এবং পোস্ট ডক্টরাল করার। সে কারণেই নবীন শখের গোয়েন্দাগিরি করতে শুরু করেন এবং অল্প দিনে বেশ নাম কামিয়ে ফেলেন। কোথাও কোনো জটিল কেসের সন্ধান পেলেই ইন্সপেকটর ভূষণ দস্তিদার ওনাকে ডাকবে অ্যাসিস্ট করতে। যদিও শেষপর্যন্ত ভূষণবাবুকেই অ্যাসিস্ট করতে হয় নবীনকে।

নবারুণ বলে, “আপনি এরকম কেন বলুন তো।”

“কীরকম?”

“ঠিক প্রাইভেট ইনভেষ্টিগেটর টাইপ নন।”

“তা সে টাইপটা কেমন শুনি।”

“এই ধরুন আপনি সিগারেট-চুরুট খাননা। ব্যাচেলর নন।”

“ব্যোমকেশ বুঝি ব্যাচেলর?”

“ব্যাচেলর না হলেও এরকম এমএসসি পড়া ধেড়ে ছেলে তার নেই। আর সত্যবতীকেও মোটেই ট্রামে বাসে ঘাম ঝরিয়ে অফিস যেতে হয়না।”

“তুমিই কী পারফেক্ট নবারুণ?”

“অবশ্যই।”

“নেভার। ইউকে থেকে ফিজিক্সে ডক্টরেট হয়ে ফিরে এসে বাংলার অন্যতম সেরা কলেজে যে অধ্যাপনা করায় তার মগজাস্ত্রটির আয়তন কোনো ডিটেকটিভের থেকে এক সিসিও কম নয়।”

“মানে শখের অ্যাসিস্টেন্টটিও ঠিক বাংলা নভেলের পক্ষে পারফেক্ট নয়?”                                                                                     “কেন নয় জানো?”

“না।”

“পারফেকশনটা রিয়্যালিটি নয় বলে।”

নবীনের ছেলে ঘরে ঢোকে। নবীন বলেন, “এই মাকে বলে দিস তো আজ থেকে কদিন নবারুণের ঘরে থাকবো।” এ বাড়ির ওপরতলায় নবীন পরিবার নিয়ে থাকেন। নিচের তলায় থাকে প্রফেসর নবারুণ দে। কোনো কেস হাতে পেলে তার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত নবারুণের সাথে সেকটা দিন থেকে যান নবীন। নবারুণ নবীনের ভাড়াটে। কিন্তু মাসশেষে কড়কড়ে তিনহাজার টাকার নোটে সম্পর্কটা থেমে থাকেনি। বরং নবীন গোয়েন্দা, নবারুণ অ্যাসিস্টেন্ট থেকে সে সম্পর্কটা নেমে এসেছে দাদা-ভাইয়ে।

॥৩॥

“আপনি ইন্ডিয়াতে এলেন কবে?”

“এবছরই।”

“আর আমেরিকা গিয়েছিলেন কবে?”

“নাইন্টি ওয়ানে।আমার বয়েস তখন  বছরচারেক।”

“এ ডিসিশনের কারণ?”

“এমনিই। আমেরিকায় মাসি থাকতেন। মা-ই চেয়েছিল আমি ওদেশে থেকে পড়ি।”

“ফিরে আসার পর কোনও পার্থক্য চোখে পড়ল?”

“শহরটা খুব পাল্টে গেছে। আর বাবা-মার মধ্যেও আমূল একটা পরিবর্তন। যেন আলাদা দুটো মানুষ। জানিনা স্ট্রেসের জন্যই কিনা।”

“পড়াশোনা কদ্দুর?”                                                                                                                                                            “ইংলিশে ডক্টরেট করে বছরপাঁচেক হল পড়াচ্ছিলাম।”

“চলে এলেন কেন?”

“চিরঞ্জিত এখানে শিফট করতে চাইলো। বললো ফিরে এসে প্রাইভেটে প্র্যাকটিস করবে। আমি আসতে চাইছিলাম না। এত ভালো চাকরি ছেড়ে চলে আসা শুধু প্রাইভেট প্র্যাকটিসের আশায় ঠিক সাহস পাচ্ছিলাম না। তবে বাবা বারবার বলছিল। মা-ও চাইছিল। চলে এলাম।”

“চিরঞ্জিতকে একটু পাঠিয়ে দেবেন।”

“আচ্ছা।” অমৃতা ঘর থেকে বেরতে যায়। নবীন বলে, “টিম নিউবার্নের কী বই পড়ছিলেন?”

“ক্রিমিনোলজি।”

“ইন্টারেস্টিং।”

“আসি।”

অমৃতা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। নবীন কফির কাপে চুমুক দেয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চিরঞ্জিত প্রবেশ করে।

“আসুন। আপনাকে দু-একটা প্রশ্ন করবো।”

“করুন।”

“আপনি এখানে চলে আসতে চাইলেন কেন?”

“আসলে আমার বন্ধু চিত্ত প্রাইভেটে একটা জায়গায় প্র্যাকটিস শুরু করল। কাছেই একটা মেডিক্যাল স্টোরে। তা ও বললো এখানে ভালো চান্স আছে। আর ওই স্টোরেই ওর পাশের চেম্বারটাই খালি পড়ে আছে। দেশে ফেরার এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইলাম না। সত্যি বলতে কী আমি একটু ঘরকুনো।”

“সুধাংশুবাবুর মৃত্যুর পর হঠাৎ দেশ ছেড়ে চলে গেলেন কেন?”

“আঙ্কলকে আমি ভীষণ ভালবাসতাম নবীনবাবু। উনি আমারই চিকিত্‍সাধীন ছিলেন। ওনার মৃত্যুর ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতেই আমি আড়াই মাসের একটা ছুটি নিয়ে ইউএসএতে কাটিয়ে এলাম।”

“আশাদেবীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য সে সময়টা আপনার থাকা উচিত্‍ ছিল না কী?”   “সেজন্যই অমৃতা থেকে গেল। ইভন আমাকে অমৃতাই বলেছিল কিছুদিন বাইরে থেকে ঘুরে আসতে। ও মায়ের দিকটা দেখে নেবে বলাতেই আমি গেলাম আরকি।”

“আচ্ছা আপনার সাথে অমৃতার পরিচয় হয় কীভাবে?”

“আমি এমবিবিএস কমপ্লিট করে আমেরিকা গেছিলাম ট্যুর করতে। তিনমাস ছিলাম। আমি যেখানে উঠেছিলাম তার পাশেই থাকতো অমৃতা। ওখানেই আলাপ-পরিচয়।” “বিয়ে হল কবে?”

“এবছরই। এখানে। রেজিস্ট্রি করে। ওখানে লিভ-ইনে ছিলাম।”

“আমেরিকায় প্র্যাকটিস করতেন?”

“না। ঠিক সুবিধা করে উঠতে পারিনি। তাইজন্যেই এখানে আসা।”

“আপনি এখন যেতে পারেন।” চিরঞ্জিত বেরিয়ে যেতেই আশা এসে ঘরে ঢোকে। নবীন বলেন, “দেখুন, আমরা এমন একটা সময় তদন্ত শুরু করেছি যখন অনেকটা সময় চলে গেছে। আপনাকে আগেও এ কথা বলেছি। আপনি যদি আপত্তি না করেন আমি আর নবারুণ কদিন সুধাংশুবাবুর ঘরে থাকতে চাই।”

“বেশ তো। ওনার মৃত্যুর পর সে ঘর আর খোলাই হয়নি। আমি ঝাড়পোছ করে রাখবো’খন। আজ বিকেলেই তবে চলে আসুন বাক্সপ্যাটরা নিয়ে।”

“আচ্ছা। আর শুনুন। আড়ি পাতার অভ্যাসটা খুব খারাপ। ওটা চালিয়ে গেলে আমাদের তদন্তে অসুবিধা হবে। সন্ধ্যার দিকে বিকাশবাবু আর জগদীশবাবুকে একটু আসতে বলবেন। দরকার আছে।”

 

॥৪॥

সুধাংশুবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে নবীন ট্যাক্সি ধরল। ধর্মতলার দিকে রওনা দিয়ে নবারুণ বললো, “ধর্মতলায় কী চিত্তর চেম্বার?”

“ইয়েস স্যার।” নবীনের কপালে ভাঁজ, ঠোঁটের কোণে হাসি, বামহাতটা মাথার পিছনে রাখা। এর মানে নবীন ভাবছে। চিত্তর চেম্বারে ঢুকে নবীন নিজের পরিচয় দেয়। চিত্ত জানতো যে নবীন এ ব্যাপারটা তদন্ত করছে। সে খাতির করে বসালো। চেম্বার সুন্দর করে সাজানো। কিন্তু পেশেন্ট নেই। নবারুণ বললো, “পসার কম বুঝি?”

“না না, কী যে বলেন! সকালে কুড়িজন পেশেন্ট দেখলাম। রাতে আবার পনেরোজন। বড্ড চাপ যাচ্ছে।”

“আচ্ছা সুধাংশুবাবুর প্রেসার হাই ছিল। কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা কী ছিল?”

“না বললেই চলে।”

“তাহলে ওনার মৃত্যুতে আপনার মনে কোনো প্রশ্ন আসেনি?”

“একেবারেই না। সবকিছুই যদি আগের থেকে প্রেডিক্ট করা যেত তাহলে তো আর…” কথা কেড়ে নিয়ে নবীন বলেন, “সরকারি কলেজে চাকরি পাননি?”

“চেষ্টা করিনি।”

“কেন?”

“এমনি।”

“চিরঞ্জিতের সাথে কদিনের পরিচয়?”

“বহুদ্দিনের।”                                                                                                                                                                            “ক’বছর?”

“তা তো মনে নেই। তবে আমার বয়সেরই কাছাকাছি বছর ধরে নিন।”                                                                                       “আপনার বয়স?”

“ছাব্বিশ।”

“তাহলে চিরঞ্জিতের থেকে আপনি বেশ ছোট?”

“যদিও অঙ্কের দৌড় টুয়েলভ অবধি তবুও সরল পাটিগণিত তো তাই বলে।”

“কীভাবে আলাপ?”

“আমাদের বাড়িতেই মানুষ। বাবা ওকে অরফানেজ থেকে এনেছিল।”

“চিরঞ্জিতের বাবা-মাকে দেখেননি?”

“প্রশ্নটাই বোকা বোকা। তাও বলতে হয় তাই বলছি এর উত্তর না।”

“অ্যাডাপ্ট করেছিলেন?”

“তাহলে তো ভাই বলতাম দাদা। বলছিই তো ন্যাংটোবেলার বন্ধু, একসাথে মানুষ, এখন আমার বেস্ট ফ্রেণ্ড। গোয়েন্দা হয়ে এটুকু মাথায় না রাখলে আপনাদের পূর্বসুরি টিকটিকিদের মান থাকবে তো মশাই!”

“আপনি কোথা থেকে পড়েছেন?”

“ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজ। ওই দেখুন সার্টিফিকেট ল্যামিনেশন করে দেয়ালে টাঙিয়ে রেখেছি। ভাবছি এবার থেকে প্রতিদিন ফুলচন্দন দিয়ে পুজো করবো। কাজে তো আর লাগবেনা।”

“আসি। একটা কথা শুধু মনে রাখবেন যে সেদিন রাতে সবাই বেরিয়ে যাবার পর ওঘরে আপনি একা সুধাংশুবাবুর সাথে ছিলেন। ফলে প্রাইম সাসপেক্ট আপনিই।” “দেখুন বেশি পেঁয়াজি মারলে…”                                                                                                   “শুনুন চিত্তবাবু, সুধাংশুবাবুর প্রেসক্রিপশন থেকে জেনেছি আপনি ওনাকে প্রোকার্ডিয়া দিতেন। যে ওষুধ এফডিএ-র বিপজ্জনক ওষুধের তালিকাভুক্ত সে ওষুধ দিয়ে আপনি কী করতে চেয়েছিলেন? স্লো পয়জনিংয়ে সুধাংশুবাবুর মৃত্যু। তাই তো?”

“দ্যাখ নবীন, প্রোকার্ডিয়া ব্যান হতে পারে মানে হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখনো কিন্তু ব্যান হয়নি। প্রোকার্ডিয়ার কাজ কী? রক্তচাপ কমানো। ওনার হাইপ্রেসার ছিল। ফলে ঠিকঠাক ডোজে প্রোকার্ডিয়া খেলে উনি যদি মারাও যান তাহলে সে দায় ডাক্তারের নয়। আর মনে রাখবি সুধাংশুকে প্রোকার্ডিয়া দিয়েছিল চিরঞ্জিত, চিত্ত নয়।” হঠাত্‍ই চিত্ত উঠে দাঁড়ায়। চিত্‍কার করে বলে, “গেট আউট অফ হিয়ার ” নবীন নবারুণকে নিয়ে বেরিয়ে যায়।

 

॥৫॥

চিত্তর ঘটনাটার পর সারাটা দুপুর নবারুণের মাথা গরম হয়েছিল। ওর বাপের বয়সী একজন ডিটেকটিভকে গালাগাল দিয়ে তুই করে কথা বলে গেল! নবীন ফিরেই ভূষণবাবুকে ফোন করেছেন। চিত্তর মত ছেলে যে কেসের সাসপেক্ট সেখানে পুলিশের সাহায্য লাগবে বইকি। সন্ধে নাগাদ ওরা সুধাংশুর বাড়িতে পৌঁছে গেল। আশা অপেক্ষাতেই ছিলেন। চাকর ভোম্বল এসে জিনিসপত্র দোতলায় নিয়ে গেল। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে ওরা নীচে এসে বসলো। জগদীশবাবু আর বিকাশবাবু চলে এসেছেন। জগদীশবাবুর বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল। রাত সাড়ে নটায় কোনো একটা ইউরোপিয়ান ফুটবল টুর্নামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আছে। তিনি আবার খেলাপাগল। তাই তাঁর সাথেই আগে বসা হল।

“আপনি বিবাহিত?”“ছিলাম। স্ত্রী গত হয়েছেন বছরতিনেক হল।”

“আইওআরসি  তে আপনার পদ কী ছিল?”

“২০০৫ থেকে আমি ম্যানেজার ছিলাম।”                                                                                                                                      রিটায়ার করলেন কবে?”                                                                                                                                                             “২০১২।”                                                                                                                                                                                “সুধাংশুবাবু আর বিকাশবাবু সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?”                                                                                                          “বিকাশ নাইন্টি ওয়ান থেকে কোম্পানিতে কাজ করত। অত্যন্ত কাজের লোক। আর সুধাংশু জয়েন করে ২০০৭ কিংবা আটে। সুধাংশুর চরিত্র খারাপ ছিলনা। কাজও ভালো জানতো। কিন্তু অসম্ভব মেজাজ ছিল।”

“ ওয়েট এ বিট। ওইসময় সুধাংশুবাবুর বয়স পঞ্চাশের দোরগোড়ায়। ওইসময় আইটি কোম্পানিতে চাকরি জোটালেন কিভাবে?”

“একটা আইটি কোম্পানীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সত্যিই অস্বাভাবিক। আসলে এর পিছনে বেশ কিছু কারণ আছে নবীনবাবু। প্রথমত, ওর অস্ট্রেলিয়াতে প্রায় বছর পঁচিশেক কাজের এক্সপিরিয়েন্স ছিল। দ্বিতীয়ত, অরুণের ওই ঘটনাটার পর অরুণ আর সঞ্জীবের দুটো পোস্ট ভ্যাকেন্ট ছিল প্রায় দুবছর। ওই দুবছর আমাদের সবচেয়ে কঠিন সময়। আমাদের সবার চাকরিই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। কোম্পানীর রেপুটেশন এমন তলানিতে এসে নেমেছিল যে কেউ জয়েন করতে চাইছিলো না। তিন, বিকাশের সাথে ওপরতলার লোকেদের, ইউনিয়নের দারুণ সম্পর্ক ছিল। ওই চ্যানেল দিয়েই ও সুধাংশুকে ঢোকায়। বিকাশ অবশ্য এভাবে অনেককেই চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সুধাংশু ওর পুরোনো বন্ধু। ফলে ওর জন্য চেষ্টাটা একটু বেশিই ছিল।”

জগদীশবাবুর লম্বা ফিরিস্তি শোনার পর নবীন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।

“অরুণের ঘটনাটা যদি একটু খুলে বলেন।”

“কাগজে পড়েননি?”

“পড়েছিলাম। কিন্তু তখন তো ভাবিনি এই লাইনে কোনোদিন আসবো। কাজেই সিধুজ্যাঠার মত কাগজের কাটিং জমিয়ে রাখিনি।”

“বলছিলাম ন’টা তেইশ বাজে। এটা বলার পরে ছুটি তো?”

“আজকের মত।”

“বেশ তবে বলি শুনুন। তখন ২০০৫। আমি তখনো ম্যানেজার হইনি। ইনফ্যাক্ট ওই ঘটনাটা না ঘটলে আমার হয়তো আর ম্যানেজার হওয়া হতনা। অরুণ রায় ছিল একদম ঠান্ডা মেজাজের মানুষ।”

“একটু ইন্টারাপ্ট করছি। তখন ম্যানেজার কে ছিলেন?”

“অচিন্ত্য দাশগুপ্ত।”

“প্লিজ কন্টিনিউ।”

“অচিন্ত্যবাবু বুঝতে পারেন ট্রেজারি থেকে টাকা সরানো হচ্ছে কোনোভাবে। অরুণ তখন ক্যাশিয়ার। তা একদিন অফিস শেষে অচিন্ত্যবাবু অরুণ, বিকাশ, সঞ্জীব আর আমাকে নিয়ে বসলেন।”

“তিনটে প্রশ্ন করব। এক, সঞ্জীব কে? দুই, তাঁকে মিটিঙে ডাকার কারণ কী? তিন, আপনাকে আর বিকাশবাবুকেই বা আলাদা করে কেন ডেকেছিলেন?”

“সঞ্জীব হচ্ছে সঞ্জীব দত্ত। আমাদের কোম্পানিতে জয়েন করেছিল। ইয়ং ছেলে। কাজের ব্যপারে অসাধারণ দক্ষ ছিল। আসলে হবে নাইবা কেন? আইআইটি থেকে এমটেক করেছে। তাও নিজের স্কলারশিপের টাকায়। অসম্ভব ব্রাইট ছেলে। আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর, সঞ্জীব ছিল অচিন্ত্যবাবুর বিশেষ পছন্দের ছেলে। আর আমাকে মিটিঙে ডাকার কারণ আমি তখন অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজার। বিকাশের কথা তো বললামই। ওর স্পেশাল কিছু কানেকশন ছিল যেটা কোম্পানীর পক্ষে খুব গুরুত্বপূর্ণ। যাইহোক, কথায় কথায় অরুণ আর অচিন্ত্যর মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য চালাচালি শুরু হল। তারপর দুম করে একটা ভাঙা পার্টস তুলে অরুণ অচিন্ত্যকে ছুঁড়ে মারে। অচিন্ত্যর মাথা ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। কিন্তু সেটা গিয়ে লাগে সঞ্জীবের ডানহাতে। ছোটবেলায় কোন একটা অ্যাক্সিডেন্টে ওর ওই হাতে চোট ছিলই। এমন একটা স্পট ছিল যেখানে আঘাত লাগলে পুরো হাতটাই প্যারালাইজড হয়ে যাবে। আঘাতটা লেগেছিল ঠিক সেখানেই। রাগে পাগল হয়ে অচিন্ত্য ছুটে গেল অরুণের দিকে। কিন্তু অরুণ খুব ডেনজারাস। রেগে গেলে ও কী হতে পারে সেদিন দেখেছিলাম। একটা লোহার শিক পড়েছিল কোণায়। শিকটা তুলে নিয়ে সোজা ঢুকিয়ে দিল অচিন্ত্যর পেটে। স্পট ডেড। আমরা নড়তে সাহস পাইনি। কাজটা করে ফেলার পর ও বোঝে ব্যাপারটা খুব সাংঘাতিক হয়ে গেছে। আমাদের শাসিয়ে বেরিয়ে যায়। সিকিউরিটি গার্ড অনেক পড়ে আসে। ওরা চিত্‍কার চেঁচামেচি শুনেছিল। কিন্তু ভেবেছিল কাজের ব্যাপারেই কথা হচ্ছে।”

“তারপর?”

“তারপর অরুণকে নাকি পুলিশ ধরার চেষ্টা করেছিল। পারেনি। আমরাই ডায়েরি করেছিলাম। আর সঞ্জীব ওই অবস্থাতেই চাকরি ছেড়ে দিল। কয়েকবার আমরা ওর বাড়িতে গেছিলাম। বুঝতে পারতাম ও ভেতরে ভেতরে ভীষণ ডিপ্রেসড। তারপর একদিন শুনলাম সুইসাইড করেছে। একা থাকতো। তাই বোধহয় নিতে পারেনি এই শকটা।”

তিনজনেই ওরা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। হঠাত্‍ই নবীন বলেন, “নটা ছত্রিশ।”

“ও আসি আজ তবে” বলে তড়িঘড়ি বিদায় নিলেন জগদীশবাবু।

 

॥৬॥

“সুধাংশুবাবু অস্ট্রেলিয়া থেকে ফেরার কথা হঠাত্‍ই ভাবলেন?”

“কতকটা তাই।”

“ওখানকার সিটিজেনশিপ ছিল?”

“নিশ্চয়ই।”

“ফেরার পর?”

“ইন্ডিয়ার।”

“আপনি বুদ্ধিমান লোক। তাই আপনাকে একটা প্রশ্ন করছি। অরুণের পালানো,সঞ্জীবের মৃত্যুর সাথে সুধাংশুবাবুর মৃত্যুর কোনও যোগ আছে?”

“প্রথমটা আমারো এই সন্দেহটা হয়েছিল। কিন্তু কোনো লিঙ্ক খুঁজে পেলাম না। সো, আমার মনে হয়না।”

“আপনি সুধাংশুবাবুর অনেকদিনের বন্ধু। স্কুল, কলেজ সবই একসাথে?”

“নো। স্কুলে একসাথে। আই মিন প্রাইমারিতে।”

“কোথায় পড়তেন?”

“অস্ট্রেলিয়ায়।”

“আই সি।”

“মেলবোর্নে কিডস স্কুলে একসাথে পড়তাম। তারপর আমি চলে আসি ইন্ডিয়ায়। সুধাংশুই ওখানে আমার একমাত্র ভারতীয় বন্ধু। ফলে যোগাযোগটা থেকে যায়।” “জগদীশবাবুর সাথে পরিচয় কোথায়?”

“আইওআরসিতে।”

“আপনি অরুণ, অচিন্ত্যর ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন?”

“ও বাবা! সেইসময় আমি সাক্ষাত্‍ সেখানেই উপস্থিত। পুরোটাই আমি চাক্ষুস দেখেছি।”

“অচিন্ত্য, সঞ্জীব আর অরুণের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?”

“ভালোই। অচিন্ত্যবাবু তো ম্যানেজার ছিলেন। ফলে শ্রদ্ধার জায়গাটা বেশিই ছিল। আর সঞ্জীব খুব ব্রাইট ছেলে। ওকে ভালবাসত না এমন কেউ ছিলনা। অরুণের সাথে আমার পরিচয় ছোটবেলায়। ও-ও কিডস স্কুলে পড়তো। তবে ওরা ইন্ডিয়াতে শিফট করে অরুণ হাইস্কুল পাস করার পর। এখানে আমি আর ও সেম কলেজে পড়তাম। তবে ওর সাথে তেমন বন্ধুত্ব কোনদিনই ছিলনা।”

“তার মানে সুধাংশুবাবু প্রাইমারিতে আপনার একমাত্র বন্ধু নয়?”

“অরুণ জাস্ট সহপাঠী।”

“বেশ। আপনি বিবাহিত?”

“দেবিকার সাথে বিয়ে হয়েছিল। বড় ছেলে জন্মাবার দুবছর পর ও যখন আবার প্রেগন্যান্ট হয় তখনই ওর সাথে আমার মনোমালিন্য তুঙ্গে পৌঁছেছিল। ওই অবস্থাতেই ও ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায়। তারপর ছেলেকে একদিন স্কুল থেকে নিয়ে আসার সময় গাড়ি চাপা পড়ে দেবিকা আর আমার ছেলে মারা যায়। অরুণ চিঠি দিয়ে আমায় জানিয়েছিল।”

“অরুণ?”

“না। এ সেই অরুণ নয়। অরুণ মানে অরুণ সামন্ত। দেবিকার ভাই।”

“আচ্ছা এর মধ্যে সুধাংশুবাবুর সঙ্গে জগদীশবাবুর ঝগড়া হয়েছিল?”

“দেখুন আমি, সুধাংশুবাবু আর জগদীশবাবু সবসময় একসাথেই আড্ডা মারতাম। আমাদের কারোর সঙ্গেই তেমন কোনো খিটিমিটি হয়নি। তবে একটা কথা বলে রাখি আশাদেবী আর চিত্তকে সুধাংশুবাবু কেমন যেন সমঝে চলতেন।”

“বেশ। আপাতত এটুকুই।”

বিকাশবাবু নবীনকে বিদায়সম্ভাষণ জানিয়ে চলে যায়। নবীন আর নবারুণ তাকিয়ে থাকে সেদিকে। বিকাশবাবু গাড়ি থেকে হাত নাড়ে। নবীন চেঁচিয়ে বলে, “মার্সেডেজ?” “টু টোয়েন্টি ডি আরবান স্পোর্ট” বিকাশবাবুর চিত্‍কার ছাপিয়ে গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা যায়। নবীন গলা নিচু করে বলে, “সাড়ে আঠেরো কিলোমিটার পার লিটার মাইলেজ, দুহাজার একশো তেতাল্লিশ সিসি ইঞ্জিন, ডুয়াল ক্লাচ।”

“বাবা আপনার মাথাতেও থাকে!” এতক্ষণ চুপ করে থাকার পর নবারুণ এই প্রথম কথা বলল। “আচ্ছা আপনি ওকে ওর পলিটিক্যাল কানেকশনের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না যে?”                                                                                                                    নবীন বলে, “গাড়িটার দাম কত হতে পারে?”

“কত?”

“বিয়াল্লিশ লাখ।”

 

॥৭॥

নবীন জামাকাপড় চেঞ্জ করে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখে নবারুণ টিভিতে খেলা দেখছে।

“কী? ইপিএল?”

“হ্যাঁ।”

“জগদীশবাবুর রোগে ধরলো নাকি?”

“জগদীশ জন্মানোর আগে থেকেই ধরেছে।”

“জগদীশবাবু আপনার বাবার বয়সী স্যার।” নবীন হেসে বলে, “যাকগে, কার খেলা?”

“চেলসি ভার্সেস নরউইচ।”

“কী স্কোর?”

“চেলসি লিডিঙ থ্রি টু।”

“আচ্ছা ব্যাপারটা কীরকম বুঝছো?”

“আপনি থাকতে আমি মাথা ঘামাবো কোন দু:খে?”

“কেসটা জটিল। যদি সহজ পথটা বাছি তাহলে বলে দেওয়া যায় ওনার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। ব্যস, আশাদেবীর কুড়িহাজার টাকা জলে।”

“আদৌ কী মৃত্যুটা স্বাভাবিক?”

“সেটাই প্রশ্ন। প্রেসার হাই ছিল ঠিকই কিন্তু অন্য কোনো কমপ্লিকেশন ছিল না। প্রথম প্রশ্ন, ওনাকে প্রোকার্ডিয়া কে দিয়েছে? চিত্ত না চিরঞ্জিত্‍? মনে রাখতে হবে চিরঞ্জিত আসার আগে চিত্ত ট্রিটমেন্ট করতো। দুই, চিত্ত আর চিরঞ্জিতের মধ্যে কেউ যদি মাস্টারমাইন্ড হয় তাহলে মোটিভ কী? চিরঞ্জিতের সম্পত্তির লোভ? না, তাহলে আশাদেবীকে মরতে হবে। চিত্তরই বা কী মোটিভ থাকতে পারে?  তিন, বিকাশবাবুর কথা অনুসারে আশাদেবীকে সুধাংশুবাবু ভয় পেতেন। কিন্তু কেন? চার, অমৃতা এতদিন পর হঠাত্‍ ফিরতে রাজি হল কেন? শুধুই চিরঞ্জিতের কথায়? দেশের টানটা কী অ্যালিবাই হিসেবে যথেষ্ট? পাঁচ, বিকাশবাবু অতি ধুরন্ধর লোক। ওপরমহলে ওঠাবসা আছে। টাকার প্রয়োজন নেই। খামোকা সুধাংশুবাবুর মত ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে যাবেন কেন? তাছাড়া ওদের সম্পর্কও ঠিকই ছিল। বাকি থাকলো জগদীশবাবু। প্রতিবেশীর সাথে বিবাদের জেরে খুন করে বসবেন সেই সাহস কী ওনার আছে? নবারুণ, তোমার খাতাটা বের করো তো।”

নবারুণ খাতাটা ডান হাতে টেনে বের করে। ভেতর থেকে সাদা একটা কাগজ পড়ে যায়। নবীনের দিকে তাকিয়ে নবারুণ বলে,

“শুরুকরছি।এক, অমৃতা।নাইন্টিওয়ান থেকে বাবা-মাকে ছেড়ে আমেরিকায়, তারপর সেখানেই কেরিয়ার গড়বার পর শিক্ষকতা শুরু করে। সেখানেই চিরঞ্জিতের সাথে আলাপ, প্রেম এবং লিভ-ইন। তারপর ফিরে আসা ভারতে। সম্পর্কে সুধাংশুবাবুর মেয়ে। দুই, আশাদেবী। সুধাংশুবাবুর স্ত্রী।  স্বামীর মৃত্যুর তিন মাস পর হঠাৎই কিছু একটা সন্দেহ হয় এবং তদন্তের জন্য নবীনবাবুর কাছে ধরনা দিয়ে পড়েন। বিকাশবাবুর মুখে শোনা যায় কিছুদিন থেকে নাকি স্বামী তাকে সমঝে চলতো। আড়িপাতার অভ্যাস আছে। তিন, চিত্ত। চিরঞ্জিতের বন্ধু। ডাক্তার। চিরঞ্জিত আসার আগে সেই ছিল সুধাংশু বাবুদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান। সুধাংশুবাবুর পরিবারের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। চার, চিরঞ্জিত। ডাক্তার। চিত্তর বাবার কাছে মানুষ। আমেরিকায় থাকাকালীন অমৃতার সাথে অন্তরঙ্গতা। আমেরিকায় পসার জমাতে না পেরে ভারতে ফিরে আসা এবং দত্ত মেডিক্যালসে চেম্বার করা। সুধাংশুবাবুর জামাই এবং সুধাংশুবাবুর চিকিৎসার দায়িত্ব তার হাতেই ছিল। সুধাংশুবাবুর মৃত্যুর পর হঠাৎই বিদেশভ্রমণ। পাঁচ, বিকাশবাবু। আইওআরসিতে চাকরি করতেন। উঁচু মহলে ওঠাবসা আছে। অত্যন্ত ধনী। স্ত্রী-পুত্রের সাথে বিচ্ছেদ এবং গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর স্ত্রী-পুত্রের মৃত্যু। সুধাংশুবাবুকে তিনিই চাকরির ব্যবস্থা করিয়েদেন। অরুণ এবং সুধাংশুবাবুর বাল্যবন্ধু। ছয়, জগদীশবাবু। খেলাপাগল, নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। অচিন্ত্যবাবুর মৃত্যুর পর তিনিই ম্যানেজার হন।সুধাংশুবাবুর প্রতিবেশী।” খাতাবন্ধ করেন নবারুণ আরেকবার শরীরটাকে এলিয়ে দিল বিছানার উপর। এটা ওর কাজ।  কোনো তদন্ত চলাকালীন ওচরিত্রগুলোর ডিটেলস তুলে রাখে এই খাতাটায়।একাধিক কেসের সাসপেক্টেড চরিত্রদের নামে ভরে আছে এই খাতা। খাতার ওপর লেখা “চরিত্র”। নবীন মাথার পিছনে বামহাত দিয়ে ঘরময় হাঁটতে থাকেন। একটা ছবি ঘরে। কালারড ছবি। সুধাংশুবাবু আর আশাদেবীর। ছবিটা হাত দিয়ে সরাতেই একটা চিঠি পায় নবীন। নবারুণকে পড়তে বলে। বহুদিনের পুরোনো হলদে হয়ে আসা চিঠি। নবারুণ চিঠিটি পড়ে। প্রেমপত্র। তাতে প্রেমিকার নীলরঙা চোখ, ঠোঁটের পাশের আঁচিল, কপালে “ই”-র মত কাটা দাগের বর্ণনা বড় কবি সাহিত্যিকদেরও হার মানায়। চিঠিরই পিছনে প্রেমিকার প্রত্যুত্তর প্রেমিককে। প্রেমিক নিজের পরিচয় দিয়েছে “তোমার সেই ‘বহুরূপী নাবিকটি’”। প্রেমিকার আত্মপরিচয় “ঘরপোড়া পাখিটি।” তার নীচে বাংলায় সই ‘আ দা’। নবীন বললো, “এ চিঠি কাদের?”

“আমাদের গল্পের নায়ক নায়িকার।”

“কীভাবে বুঝলেন সুধাংশুবাবু আর আশাদেবীর মধ্যেই এ চিঠি চালাচালি?”                                                                                                                                                                                                 নবীন চোখ মেরে বলেন, “ইনটিউশন।”ঘরের দরজায় কেউ নক করলো। নবীন গলা খাঁকড়িয়ে বলেন, “আসুন।”                                                                                                                                                                     “আপনাদের খাবার কী নিয়ে আসবো না আপনারা নিচে যাবেন?”                                                                                                  নবারুণ চাদরের ভিতর থেকে বলে, “নিয়ে এলেই ভালো হয়।”

“বেশ তো।” নবীন এতক্ষণ ভুরু কুঁচকে আশাদেবীর দিকে তাকিয়ে ছিল। এবার বলল, “না, আজ আমরা একটু বাইরে খাব। আপনি ভোম্বলকে বলে রাখবেন। আর এ চিঠি আপনার?” আশাদেবী মাথা নীচু করে লজ্জিত মুখে বললেন, “হ্যাঁ।” আশাদেবী চলে যেতেই নবীন সটান বিছানায় শুয়ে পড়লেন। চোখ বন্ধ করে কিছু ভাবতে থাকলেন। নবারুণ বলে, “দিলেন তো আমার আরামটাকে পন্ড করে। এখন আবার জামা পরো, প্যান্ট পরো। কী ঝক্কি রে বাবা! কাল কিন্তু রোববার নয়। আমাকে কলেজ যেতে হবে।”

“তুমি খেয়াল করেছ?”                                                                                                                                                         “করেছি। চিঠির বর্ণনার সাথে আশাদেবীর বিন্দুমাত্র মিল নেই। আঁচিল উধাও, চোখের মনি কালো। এমনও নয় যে কন্ট্যাক্ট লেন্স লাগিয়েছে। তাহলে তো আর চশমা পড়তো না।”

“তার মানেটা কী? এতটা বদল কী স্বাভাবিক না কি উনি নিজেকে ঢাকতে চাইছেন, লুকোতে চাইছেন, পালাচ্ছেন?”                                “মানেটা ভেরি ইজি। উনি আশাদেবী নন। আচ্ছা একটা লাভ ট্রায়াঙ্গলের গন্ধ পাচ্ছো না? মানে যদি উনি নকল আশাদেবী হন আর আসল আশাদেবী সুধাংশুবাবুকে খুন করেন তাহলে ব্যাপারটা মিলে যাচ্ছে।”

দুজনেই মিনিটপাঁচেক চুপ থাকে। নবারুণ চেঁচিয়ে ওঠে, “গোল।”                                                                                                     “কে দিল?”                                                                                                                                                                        “চেলসি।”                                                                                                                                                                                 “স্কোরার কে?”

“উইলিয়ান।”                                                                                                                                                                           “দ্রোগবা কেমন খেলছে?”                                                                                                                                                           “বোঝা যাচ্ছে বহুদিন হল আপনি খেলা দেখা ছেড়ে দিয়েছেন। দ্রোগবা কবেই চেলসি ছেড়ে দিয়েছে।”                                                 হঠাৎ নবীন উঠে বসে। “নবারুণ, ২০১১তে তুমি কোথায় থাকতে?”

“ইউকে।”

“মনে আছে, চেলসির সাথে নরউইচের খেলা। নরউইচের গোলকিপার তখন রুডি।” “আর বলতে হবেনা। আমি খেলাটা মাঠে বসে দেখেছি। তখন ষাট মিনিট সবে ক্রস করেছে। স্কোর ১-১। কে যেন একটা ক্রস করলো। রুডি গোল ছেড়ে বেরিয়ে এলো ক্লিয়ার করতে। দ্রোগবা হেড করার জন্য লাফাল। ক্ল্যাশ হল দুজনের। দ্রোগবা পড়ে গেল মাটিতে। বাঁচারই আশা কমে গিয়েছিল দ্রোগবার।”

“তারপর? তারপর কী হল? সাবাস ইপিএল। সাবাস দ্রোগবা। নবারুণ, তুমি আমার অগ্নিপুত্রটি দাও তো। আর ভূষণবাবুকে ফোন করে বলো ফোর্স নিয়ে আমাকে ফলো করতে। শ্যামবাজারে মিট করবো। ধর্মতলায় যাবো।” এখানে বলে রাখা ভালো নবীনের অগ্নিপুত্রটি হল স্মিথ এণ্ড ওয়েসন পয়েন্ট থ্রি ফাইভ সেভেন ম্যাগনাম রিভলবার। নবারুণ ব্যাজার মুখে টিভি বন্ধ করে ফোনের দিকে হাত বাড়িয়ে নবীনকে বলল, “জিন্সটা দিন। শালা, একটা প্রেমপত্রের কী তেজ! পুরো আগুন ধরিয়ে দিল।”

॥৮॥

ধর্মতলায় দত্ত মেডিক্যালসে চিত্ত বসে। সেখানে পৌঁছে নবীন দেখতে পেল চিরঞ্জিত ওখানেই বসে চা খাচ্ছে। চিরঞ্জিতের কাছ থেকে জানা গেল সাড়ে দশটা নাগাদ চিত্ত প্রতিদিনই পাশের ছোট ক্লাবের মাঠে যায়। একমুহূর্ত নষ্ট না করে নবীন আর নবারুণ সেখানে যায়। গিয়ে দেখতে পায় প্রায় অন্ধকার মাঠটার ঠিক মাঝখানটাতে চিত্ত চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে গান গাইছে, “আকাশভরা সূর্যতারা।” পাশে ব্যাগ, টাই এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। বাতাসে চিত্তর চুল উড়ছে। বামচোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। মিশে যাচ্ছে মাটির শরীরে। ওই তারায় ভরা আকাশের কোলে শুয়ে থাকা আমিটা ছাড়া যেন কেউ নেই চিত্তর, কেউ নেই সারা পৃথিবীতে। নবীন-নবারুণ দুজনেই ভীষণ উত্তেজিত ছিল। কিন্তু এই দৃশ্য দেখে দুজনেরই স্নায়ু শিথিল হয়ে এল। গান শেষ হবার পরে নবীন এসে চিত্তর পাশে বসে। কপালে হাত দিয়ে বলে, “চিত্ত।” নবারুণ নবীনের এ ব্যবহার দেখে অবাক হয়ে যায়।

“কে? ও, নবীনবাবু।” নিজেকে সামলে চিত্ত উঠে বসে, “মাপ করবেন। সকালে আপনাদের সাথে খুব রুড ব্যবহার করেছি।”

“ইটস অলরাইট। আপনার সাথে কিছু কথা ছিল। দয়া করে সকালের মত সব কথার উত্তরেই মিথ্যে বলবেন না। কেননা তিন জোড়া রিভলবার আপনার দিকে তাক করা আছে।”

“রিভলবারের ভয়ে আপনাকে আমি সত্যি কথা বলবো না নবীনবাবু। আজ সারাদিনে তিনজন পেশেণ্ট পেয়েছি। মরে গেলেও খুব একটা ক্ষতি হবেনা।”

“বেশ। তবে নিজের তাগিদেই বলুন নাহয়।”

“নিন ভ্যানতারা না করে শুরু করুন।”

“অরুণবাবু কে?”

“যিনি মাসতিনেক আগে গত হয়েছেন তিনিই।”

“সম্পর্কে তিনি আপনার কে?”

“পিশো।”

“আর অচিন্ত্য দাশগুপ্ত?”

“আমার বাবা।”

“গ্রেট। আশাদেবীর আগের নাম কী ছিল?”

“দেখুন পিসি চাকরিও করতনা। অত বেশি চিনতোও না কেউ। আমাদের ফ্যামিলিতে এক আমিই শেষ জীবিত সদস্য। তাই, নামটির পরিবর্তন হয়নি।”                                                                                                                                                                 “চিরঞ্জিত?”

“সকালে যেটা বলেছি সেটাই সত্যি।”

“চিরঞ্জিত ডাক্তার?”

“না। দত্ত মেডিক্যালসের মালিক।”

“অমৃতা জানে?”

“না।”

“অরুণবাবু ওরফে সুধাংশুবাবুর ট্রিটমেন্ট কে করতো?”

“আমি। কিন্তু ওষুধ লেখা হত দুটো প্যাডে। চিরঞ্জিতের ফেক প্রেসক্রিপশন থাকতো ওর বাড়িতে। ওষুধ যেত দত্ত মেডিক্যালস থেকেই। কিন্তু অন্য দোকান থেকে আনতে গেলে আমার লেখা প্রেসক্রিপশন দিয়ে আমি নিজেই ওষুধ কিনে দিয়ে আসতাম। ওর রেজিস্ট্রেশন নেই। ওটা বানানো।”

“চিরঞ্জিত যে ডাক্তার নয় সেটা কে জানত?”

“কেউ না।”

“সুধাংশুবাবুর মৃত্যুর কারণ?”

“প্রোকার্ডিয়ার ওভারডোজ। ফলত হার্ট অ্যাটাক।”

“বেশ।”

“বেশ নয়, বেশ নয়। আমি যেটুকু জানি সেটুকুই বললাম। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি খুনি। আমি খুন করিনি। বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে আমি খুন করতে পারতাম। কিন্তুআমিকরিনি। আপনি বিশ্বাস না করলে আমায় অ্যারেস্ট করুন। কিন্তু, আমি খুন করিনি।”

“আপাতত তার প্রয়োজন হবেনা। তবে আপনার ফোন নম্বরটা দিন। শীঘ্রই দেখা হবে। আসি।”

 

॥৯॥

রাত প্রায় বারোটায় ফিরে আসে নবীন। তার দু-চার মিনিট পরেই চিরঞ্জিত ফেরে। নবীন দেরি না করে শুয়ে পড়ে। নবারুণ জেগে থাকে। একবার বারান্দায় যায়। দ্যাখে জগদীশবাবু বাড়ির সামনে রাস্তায় পায়চারি করছেন। মুখে উত্‍কন্ঠার ছাপ, সিগারেট খাচ্ছেন।একবার মুখ তুলে বারান্দার দিকে তাকান। নবারুণ হাত নাড়ে। দেখতে না পাওয়ার ভান করেন। কিছুটা আড়ালে চলে যান জগদীশবাবু। নবারুণ ঘরে ফিরে লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে। মনটা উদ্বিগ্ন ছিল ঠিকই কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তির ফলে আর বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারেনা নবারুণ। ঘুমিয়ে পড়ে।

রাত আন্দাজ সাড়ে তিনটে। নবীনের ঘুমের মধ্যে কথা বলার অভ্যেস আছে। নবীন বলে ওঠে, “আলো? আলো কিসের?” নবারুণের ঘুম ভেঙে যায়। বলে, “কিছু না, ঘুমোন।”

হঠাৎ একটা শব্দে চমকে ওঠে নবারুণ। ঘুরতেই তাকিয়ে দেখে একটা হলুদ আলো। বুঝতে পারে আলমারিতে টর্চের আলোতে কেউ কিছু খুঁজছে। নবারুণ চেঁচিয়ে ওঠে, “কে?” ছায়ামূর্তিটি সরে যায়। নবারুণ লাফিয়ে বিছানা থেকে নামতে যায়। নবীন হাত চেপে ধরে। ছায়ামূর্তিটি বেরিয়ে গেলে নবারুণ ঘরের আলো জ্বালায়।

“ধরতে দিলেন না কেন?”

“মূর্তিটি সশস্ত্র ছিল বলে।”

“তাই?”

“হ্যাঁ, সরো।” নবীন উঠে আলমারি হাতড়ে একটা প্রোকার্ডিয়ার স্ট্রিপ পায়। তাতে সাতটা ওষুধ। নবীন দু’মিনিট কিছু ভাবে। তারপর আনমনে বলে,“পুয়োর জব চাইল্ড।” নবারুণ কাছে এসে দাঁড়ায়। নবীন বলে, “কাল সকালে আটটার মধ্যে সবাই যেন ড্রয়িংরুমে থাকে। জগদীশবাবু রাতে ঘুমোননি। ওনাকে সকালে ওঠাতে না সমস্যা হয়। অবশ্য যদি শেষরাতটুকু ঘুমোন। আর চিত্তকে একটা টেক্সট করে দাও। কী হল নবারুণ? নবারুণ?” নবারুণ মোবাইল হাতে স্তব্ধ হয়ে আছে। মোবাইলটা নবীনের দিকে বাড়িয়ে নবারুণ বলে, “কাউকে আর টেক্সট করার প্রয়োজন হবেনা।”

॥১০॥

“হ্যাঁ, খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক। চিত্ত সত্যিই সোনার টুকরো ছেলে ছিল। অত্যন্ত মেধাবী, সুন্দর গান গাইত, আপনাদের সবার থেকেই ও বেশ খানিকটা অন্যরকম ছিল। তবে কেউ যদি তার কাছে প্রতিজ্ঞা করে যে একটিমাত্র ওষুধ লিখে দিলেই সরকারি মেডিক্যাল কলেজে চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে তাহলে লোভ সামলানোটা সত্যিই মুশকিল। কিন্তু, কাজ হাসিলের পর যদি সে ব্যক্তি তাকে বিট্রে করে তাহলে এরকম অনুভুতিশীল, ব্রাইট ছেলের পক্ষে সুইসাইড করাটা খুব স্বাভাবিক। আজ সকালেই ও সুইসাইড করেছে- করেছে অপরাধ বোধ থেকে, করেছে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে। কিন্তু কাল রাতে ও আমাদের যা যা বলে গেছে এবং মৃত্যুর আগে নবারুণের হোয়াটসঅ্যাপে যে মেসেজটা করেছে তাতেই তদন্তের অর্ধেক সমাধান আমরা করে ফেলেছি। ব্যাপারটা খুব জটিল। আপনারা সবাই তার কিছুটা কিছুটা করে জানেন। কিন্তু সবটা কেউ জানেননা। প্রথম থেকে শুরু করছি। অরুণ রায় বিয়ে করেন আশা দাশগুপ্তকে। আশাদেবীর বাড়িতে মত ছিলনা। ওনারা পালিয়ে আসেন, বাড়ির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং বিয়ে করেন রেজিস্ট্রি করে। কিন্তু, মুশকিল হল অরুণ আইওআরসিতে চাকরি পাওয়ায়। কেননা সেখানের ম্যানেজার ছিলেন অচিন্ত্য দাশগুপ্ত যিনি কিনা আশাদেবীর মামা। চিত্ত অচিন্ত্যর ছেলে। এই তথ্য কাল রাতে আমরা জানতে পারি চিত্তর মেসেজে। যাইহোক ততদিনে অরুণের ব্যাপারে আশাদেবীর মোহ কেটে গেছে। রগচটা মানুষটার ভয়ে তিনি নিজের মেয়েকে পাঠিয়ে দিয়েছেন আমেরিকায় নিজের বোনের কাছে। এ অবস্থায় নিজের মামার সাথে আশাদেবীর দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ  এবং ক্রমশই তিনি অচিন্ত্যবাবুকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতে শুরু করেন। এদিকে অরুণ অজস্র টাকা সরিয়ে চম্পট দেবার পরিকল্পনা করছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। অস্ট্রেলিয়াকে বাছার কারণ অরুণের ছোটবেলা কেটেছে সেখানেই। মাঝে তিনি একটা ভুল করে বসলেন অচিন্ত্যকে খুন করে এবং আরো বড় ভুলটি করলেন সঞ্জীবের আত্মহত্যার পথটি খুঁড়ে দিয়ে। উপায়ান্তর না দেখে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে তিনি নাম পরিবর্তন করান, অস্ট্রেলিয়ার সিটিজেনশিপ নেন। তারপর? জগদীশবাবু, ২০১১তে দ্রোগবা চোট পাওয়ার পর তাঁর কী করতে হয়েছিল?” নবীন থেমে একটু জল খায়। পকেট থেকে পয়েন্ট থ্রি ফাইভ সেভেন রিভলবারটি বের করেন।

“প্লাস্টিক সার্জারি।”

“রাইট জগদীশবাবু। ঘামটা মুছে নিন। পকেটে রুমাল নেই? ফিরে আসি, অরুণ রায় সুধাংশু রায়ে পরিণত হলেন এবং সস্ত্রীক প্লাস্টিক সার্জারি করালেন। সুধাংশু নামের আইডিয়াটি পেয়েছিলেন বিকাশবাবুর কাছে। কেননা, তাদের ছোটবেলার বন্ধু সুধাংশু হাইস্কুলে পড়াকালীন ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে সুইসাইড করে। আসল সুধাংশুর ভাই এখনো বেঁচে না থাকলে এই মিসিং লিঙ্কটা আমাকে জোড়াতালি দিয়ে মেলাতে হত। কিন্তু সেই ভাইটি জীবিত এবং তিনি আমাদের চোখের সামনে বর্তমান। ভাই ঠিক নয়, দাদা-বড়ভাই। সেই ভাইটিই হলেন জগদীশবাবু। কী ঠিক তো?”

জগদীশবাবু মাথা নিচু করে থাকেন।

“আজ ভোরে একটা ঘটনার পর আমরা জগদীশবাবুর বাড়ি যাই। তখনই উনি বলেছিলেন। কিন্তু মৃত ভাইয়ের নাম ব্যবহার করে কোনো খুনি নিজেকে লুকোচ্ছেন বলেই তাকে খুন করলেন জগদীশবাবু? মোটিভ কী খুব স্ট্র্ং অমৃতা ? কী বলো। তুমিই তো সে যার মনে প্রথম সংশয় আসে? তারপর নিউবার্নের ক্রিমিনোলজির অর্ধেকটা পড়ে ফেলার পরে তুমিই তো মাকে সাজেস্ট করেছিলে আমার সাথে কথা বলতে, তাই না? তা যাই হোক, সুধাংশু রূপ নিয়ে অরুণ ফিরে এলেন ইন্ডিয়াতে। বিকাশবাবুর কানেকশনে পেয়ে গেলেন ইন্ডিয়ান সিটিজেনশিপ আর আইওআরসি-এর হারানো চাকরি। প্লাস্টিক সার্জারির কথাটা এখানে উপস্থিত সবাই জানতেন। তবে আপনারা তা বেমালুম চেপে গেছিলেন। কিন্তু, মুশকিল হল অন্য জায়গায়। বিকাশবাবু জানতে পারলেন সঞ্জীব দত্ত সেই ছেলে যে দেবিকার গর্ভে থাকতেই দেবিকা চলে যান বাপের বাড়ি। ইয়েস, সঞ্জীব দত্ত বিকাশবাবুর দ্বিতীয় ছেলে। প্রথম ছেলেটি মারা যাননি। তাকে তিনি নিয়ে এসেছিলেন অরুণ সামন্তের কাছ থেকে। তারপর অচিন্ত্যবাবুর কাছে রেখে এসেছিলেন মানুষ করতে। সেই ছেলেই চিরঞ্জিত। চিরঞ্জিত দত্ত। তিনি আবার অরুণের জামাই। অরুণ সামন্ত মানে দেবিকার ভাই মিথ্যে করে বলেছিলেন যে দ্বিতীয় ছেলেটি মারা গেছে গর্ভে থাকতেই। কিন্তু, কথাটা ডাহা মিথ্যা। তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন সঞ্জীবকে বিকাশবাবুর করালগ্রাস থেকে। বিকাশবাবুর তখনকার গাড়িটি দেবিকাকে খুন করে। তারপর টাকার জোরে অরুণ সামন্তের করা এফআইআর তুলিয়ে নেন। ভূষনবাবু কাল আমাদের সেই পুলিশ কেসের ফাইল দেখিয়েছে। কোনো যুতসই প্রমাণ না পাওয়ায় বেনিফিট অফ ডাউটে বিকাশবাবুকে ছাড়া হয়। কিন্তু প্রমাণ ছিল। সেগুলো জাস্ট চেপে যাওয়া হয়। যাইহোক বিকাশবাবুর বড়টি হলেন জুয়াখোর, পড়াশোনায় থার্ডক্লাস, রকে রকে ঘুরে বেরানো এক বখাটে ছেলে। সাজানো স্ক্রিপ্ট অনুসারে ডাক্তারি পাশের মিথ্যা সার্টিফিকেট দিয়ে বিকাশবাবু চিরঞ্জিতকে পাঠালেন আমেরিকায়। খুব সহজেই সহজ-সরল অমৃতাকে খুশি করতে পারলো চিরঞ্জিত। বোধহয় ওর জীবনের একমাত্র অ্যাচিভমেণ্ট। দত্ত মেডিক্যালস বিকাশবাবুর দোকান। সেখানে তিনি নিয়ে এলেন চিরঞ্জিতকে।”

এটুকু শুনে অমৃতা ডুকড়ে কেঁদে ওঠে। আশা ওর পাশে গিয়ে বসে।

“সঞ্জীবের মৃত্যুর পর পুরোনো সার্টিফিকেট আর সুইসাইড নোট দেখে বিকাশবাবুর প্রচণ্ড শক লাগে। আসলে অচিন্ত্যবাবুর কাছে তিনি চিরঞ্জিতকে রেখেছিলেন অন্যরকমভাবে ওকে তৈরি করার জন্য। কিন্তু তৈরি হল একটি বখাটে ছোকরা। তাই, ওর দরদ বেড়ে যায় মৃত সন্তানের প্রতি। ঠিক করেন রিভেঞ্জ নিতে হবে। ইচ্ছে করলেই তখনই পুলিশকে জানিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু বিকাশবাবুরও যে অরুণের সাথে যোগসাজশ ছিল এটা পুলিশ ধরে ফেললে তার সমস্যা হত। তাই এক্ষেত্রে তার হাতিয়ার হল চিরঞ্জিত। অরুণবাবুর মৃত্যু ছিল অবধারিত। আশাদেবী সুযোগ পেলেই পুরোনো পরিচয় ফাঁস করে দেবার ভয় দেখাতেন, জগদীশবাবুরও রাগ ছিল ওর উপর। তাই মাঝেমধ্যেই পুরোনো কথা তুলে তিনি অরুণকে উত্তেজিত করে দিতেন। কিন্তু, বিকাশবাবুর স্ট্র্যাটেজি ছিল মারাত্মক। তিনি জানতেন সুধাংশু ওরফে অরুণ কিছুটা হাঁটার পর জল খান। তাই, জলের বোতলে তিনটি প্রোকার্ডিয়া মিশিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, বিকাশবাবু জগদীশবাবুকে আগেই বলেছিলেন তারা তিনজনে একবার একটু হেঁটে আসবেন। পার্কে নাকি সুন্দর একটা বসার জায়গা করেছে। একথা আজ ভোরে আমাদের জগদীশবাবু জানান। কেন হঠাত্‍ তাঁর বাড়িতে গেলাম? কেন হঠাৎ  সন্দেহ হল? কেননা, চিরঞ্জিত একটা কাঁচা চাল চেলেছিল। যে স্ট্রিপটা থেকে বিকাশবাবু ওষুধ মিশিয়েছিলেন সেটায় বাকি সাতটা ট্যাবলেট তখনো ছিল। ওটা চিরঞ্জিত লুকিয়ে রেখেছিল সুধাংশুবাবুর ঘরে। পরে বেমালুম ভুলে যায়। কাল রাতে ও সেটা নিতে আসে। হয়তো সন্দেহ করার কোনো কারণ থাকতো না কিন্তু চিত্ত তার শেষ টেক্সটে আমাদের জানিয়েছে যে শেষ প্রোকার্ডিয়ার স্ট্রিপে আর তিনটে ওষুধ ছিল। তখনই ব্যাপারটা ক্লিয়ার হয়ে যায়। বুঝতে পারি সেদিন সুধাংশুবাবু চারটে প্রোকার্ডিয়া খেয়েছিলেন। একটা স্বাভাবিক নিয়মে, আর বাকি তিনটে বিকাশবাবুর মেশানো জলে।” কথা শেষ হতে না হতেই চিরঞ্জিত উঠে দাঁড়ায়। পকেট থেকে রিভলবার বের করে গুলি করে নবীনকে। অপটু হাতের টিপ নবীনের ঘাড়ের কাছে কিছুটা আঘাত দিয়ে বেরিয়ে যায়। ততক্ষণে বিকাশবাবু লুটিয়ে পড়েছেন মাটিতে। তার নিথর হাতে ধরে থাকা প্লাস্টিকের প্যাকেট থেকে ছড়িয়ে পড়ছে সাদা বিশ্রী পটাশিয়াম সায়ানাইড। ভূষনবাবু এক সেকেন্ড দেরি না করে চিরঞ্জিতের হাতে হাতকড়া পরায়।

হাসপাতাল থেকে ঘাড়ের কাছটা ব্যান্ডেজ করে ফেরার পথে ট্যাক্সি নিয়েছিল নবীন আর নবারুণ। নবীন বলে, “যা যা বললাম সবটাই সত্যি। লজিক সেটা মানবে। কিন্তু এগুলো প্রমাণ করা একটু মুশকিল হত। আর বিকাশবাবু টাকার জোরে আবারো ছাড়া পেয়ে যেতেন। চিরঞ্জিতকে জেলে পচতে হতো। না, বিকাশবাবু ওকে বের করতেন না।” “ভালোই হয়েছে। প্রাপ্য সাজা পেয়ে গেছে। আমি দুটো জিনিস বুঝতে পারছিনা। এক,বিকাশবাবু কানেকশনের জোরে সহজেই ছাড়া পেয়ে যেতেন। তাহলে কেন উনি সুইসাইড করতে গেলেন ? দুই, আপনি দুদিনের মধ্যেই আপনি এই জটিল কেসটা সলভ করলেন কীভাবে? এবার কিন্তু সত্যিই একটা গল্প লেখা যাবে। আমি ক্লুগুলো ধরতে পারছিলাম কিন্তু মেলাতে পারছিলাম না।”

“আসলে কী জানো মানুষের মন এক অদ্ভুত জায়গা। কখন কোন রং এসে মনের আকাশটাকে কী করে দেবে কেউ বুঝতে পারবোনা। অপরাধীরা ও কাঁদে, খুনিরও হয়তো কষ্ট হয় জীবনের একটা পর্যায়ে এসে। অপরাধবোধ, নবারুণ অপরাধবোধ। বিকাশ হয়তো এবয়সে এসে ভাবছিলো জীবনটাকে অন্যভাবেও কাটানো যেত। তাই হয়তো নিজের হাতেই একজন অপরাধীকে খুন করে গেল -নিজেকে অপরাধী সাব্যস্ত করে নিজেকেই খুন করে গেল। নিজের শাস্তি নিজেই নিল।”

“মনুষ্যত্ব? মনুষ্যত্ব!” কিছুক্ষণ থেমে নবারুণ বলে, “আর দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবটা?” নবীন সুন্দর করে একটু হাসেন। তারপর বলেন, “ওই যে আমার একটা জোর আছে।”

“কিসের জোর?”

নবীনের কপালে ভাঁজ পরে, ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি দেখা যায়। বামহাতটা মাথার পিছনে দিয়ে নবীন বলে, “ইনটিউশন।”

 

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2021 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ