22 Oct

পিংকির স্বপ্ন

লিখেছেন:ড. প্রদীপ কুমার দাস


তার বয়স পাঁচ কি ছয়। আর তার নাম পিংকি।  গৃহবন্দী অবস্হায় কাটে তার দিন।  হোম কোয়ারেনটাইনে রয়েছে। দাদু   মারা গেছেন কালরূপী নোভেল করোনাবাইরাস সংক্রমণের করাল গ্রাসে। আজ সারা বিশ্ব ছোট্ট একটা অণুজীবের আক্রমণে থরহরি কম্পমান। সারা বিশ্বজুড়ে এ যাবৎ ছিয়ানব্বই লক্ষেরও বেশি আক্রান্ত। প্রাণ চলে গিয়েছে পাঁচ লক্ষের কাছাকাছি। থামার কোন লক্ষণ নেই।

ছোট্ট পিংকির সময় কাটতেই চায় না। পরিচারিকা মাসী তার জন্যে রেখে গেছেন কিছু শুকনো খাবার, জল আর খেলার সামগ্রী। তাকে ডেকে যে দুটো কথা বলবে তার যো নেই। তাকে ঘরে আটকে  দিয়ে যে কথায় চলে গেছেন ডেকে ডেকে সাড়াই পাওয়া যায় না। শেষমেষ পিংকি তুলে নেয় কাগজ,তুলি আর রঙ পেনসিল। তার শিশুমনের স্বপ্নগুলোকে একে একে রঙের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে থাকে। তার জ্বলন্ত ছবিতে ফুটে ওঠে প্রখর রবির ঝলসানো আলোর তেজ যা দুষ্টু ভাইরাসকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। আবার কোন ছবিতে ফুটে উঠছে হাতুড়ি মেরে দৈত্য-দানোটাকে মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার ছবি। প্রিয়জন বিরহে তার মাথার মধ্যে টগবগ করে ফুটছে শুধু শত্রু নিধনের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন তো শুধু তার একার নয়। সারা বিশ্বের সাতশো কোটি মানুষের এখন ধ্যান-জ্ঞান। কিভাবে এই ক্ষুদ্র অণুজীবকে বাগে আনা যায়। দৈত্য-দানোর ছবিটা এঁকেছে একটা কাঁটাওয়ালা বলের ছবি দিয়ে যেটা শুধু গড়িয়ে গড়িয়ে চলে আর চলার পথে যাকে পায় তাকেই কাঁটা ফুটিয়ে মেরে ফেলে যেমনটা তার সব আত্মীয়-স্বজনকে মেরে ফেলেছে।

মনে পড়ে যায় এই কদিন আগে সে বাবা-মায়ের হাত ধরে মেলায় গেছে, নাগরদোলায় চেপেছে, মেলা থেকে বল কিনেছে, বাঁশি কিনেছে, গজা খেয়েছে। দাদু-দিদার সঙ্গে নদীর ধারে বেড়াতে গিয়েছে। কত আনন্দ পেয়েছে। আর এখন তাকে বন্দী অবস্হায় থাকতে হচ্ছে। তার কান্না পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন কাঁদলে তো আর দাদু এসে মন খারাপ করবে না। চোখের জল মুছে দিতেও  আসবে না। একসময়ে  দুঃখকে  বুকের মধ্যে সে স্বপ্ন দেখে সে একটা আশ্রমে এসেছে যেখানে তার সমবয়েসি ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করছে। ওদের সামনে একটা বিশাল ফুলের বাগান যেখানে হরেক রকমের বাহারি ফুল ফুটে রয়েছে। কিন্তু খেলার ছলে কেউ একটাও ফুলে হাত দিচ্ছে না। একটু দূরে বেশ কয়েকজন দাদু-দিদার বয়েসীরা একটা বেঞ্চে বসে ওদের মধ্যে গল্প-গুজবে ব্যস্ত। কেউ কেউ ছোটদের খেলাধুলা দেখে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছেন। আশ্রমটার ঠিক সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে নদীর জল কুলকুল করে। কি আশ্বর্য্য! জল তো ঘোলা নয়। স্বচ্ছ টলটলে। দু আঁচলা ভরে পান করতে ইচ্ছে হল পিংকির। সে জানে এই আশ্রমটায় দাদুর  কি যেন আছে। সকলে খুব মান্য করে,সমীহ করে। বাইরের পরিবেশটা কি সুন্দর দেখাচ্ছে। সুন্দর নীল আকাশ। সোনামাখা রোদ তার সঙ্গে মৃদুমন্দ দখিনা বাতাস বইছে। আঃ কি প্রাণের আরাম ! শুলে পরে ঘুম ধরে যাবে। পিংকি ভাবে মনে করোনা দানোটা সব কেড়ে নিয়ে যেতে পারে নি। কিছু প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বটে  তবে তাদের জন্যে রেখে গেছে অনেক কিছু। নদীর জল ভাল হয়েছে, বাইরের পরিবেশের দূষণ কমেছে। মানুষ অনেক বেশি স্বাস্হ্য সচেতন হওয়ায় অসুখ-বিসুখের সংখ্যা কমেছে।সেইসঙ্গে মানুষের আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় বেড়েছে। তাই তো আর ভয় নেই ওই করোনা দানোটাকে বধ করতে আর বেশিদিন লাগবে না।

আনন্দে দুটো হাত তুলে কি মজা! উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেই হাতটা গিয়ে লাগে পাশের র‍্যাকটার সঙ্গে। ব্যথায় ককিয়ে উঠে সঙ্গে সঙ্গে তার ঘুমটা ভেঙে যায়। ধড়পড়িয়ে উঠে বসে পিংকি। সামনে দেখতে পায় মা আর পরিচারিকা মাসীকে।তাঁরা মিটিমিটি হাসছে। মা বলে, চলো আর  এভাবে থাকতে হবে না।খবরে দেখিয়েছে ওই দুষ্টু ভাইরাসটাকে মারতে  ভ্যাকসিন বেরিয়ে গেছেে। এবার স্কুল খুলে যাবে। তোমার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে।

খবরটা শুনে  আনন্দে মনটা নেচে উঠল পিংকির।মা বলল তারাতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। আজ আমাদের আশ্রমে যেতে হবে। আজ আশ্রমে তোমার দাদুর একটা স্মরণ অনুষ্ঠান  হবে। জানোই তো  দাদুই আশ্রমের  মূল চালিকাশক্তি ছিলেন।

দাদুর কথা শুনেই ফের মনটা খারাপ হয়ে গেল পিংকির।চোখে জল এল।ওই দুষ্টু ভাইরাসটাই দাদুকে কেড়ে নিয়ে গেছে।দাদু তাকে খুব ভালবাসত। প্রতিদিন নিয়ম করে আশ্রমে নিয়ে যেত।আজ এতদিন পর যেই ভাল সময়টা এল তখনই দাদু নেই।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2021 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ