11 Jun

অপেক্ষা

লিখেছেন:দেবাশিস সাহা


।। ১ ।।

দোতলার ঘরের পুকুর পাড়ের জানালাটা দিয়ে এক পশলা বৃষ্টি ঘরের ভেতর এসে পরতেই টেবিলে ডায়েরী – পেন ফেলে রেখে দ্রুত সেটি বন্ধ করতে ছুটল রোহিণী। অমাবস্যার ঘন  অন্ধকারে আস্তে আস্তে পা ফেলে যেই জানালাটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল ,মনে মনে ভাবতে লাগল – ‘ আজ প্রকৃতিও যেন বড় অশান্ত হয়ে উঠেছে। তীব্র হাওয়া শো শো শব্দ করে ঝড়ের বুক চিরে  বেড়িয়ে আসতে চাইছে। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অঝোর ধারায় প্রকৃতি কেঁদে চলেছে অবিরাম। যেন এক না পাওয়া ভালোবাসার তীব্র আর্তনাদের আগুন চোখের জলে নেভানোর চেষ্টা করছে সে।‘

এই বিরহের কষ্টটা চকিতেই গ্রাস করল রোহিণীকেও। অন্ধকার ঘরের একটা কোণে পড়ে থাকা নিথর দেহটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হল যে তার অপেক্ষা আর প্রতিহিংসার স্পৃহাই যেন এই রাতে ব্যাক্ত করছে বিধাতা। ঘরময় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে আপন মনেই বিড়বিড় করে বলে যেতে লাগল – “সে আসছে। আর অপেক্ষা নয়। সে আসছে!”

।। ২ ।।

“ফেরার পথে যে এরকম মুষলধারে বৃষ্টি নামবে কে জানত ? রাতও তো কম হল না ! নয় নয় করে সাড়ে দশটা তো হবেই। উফ যত দায় যেন আমার! মাসতুতো দিদির বিয়ে, তুই না গেলে হয় ? – মা তো বলেই খালাস। এ কি অজ পাড়াগাঁয় এসে পড়লাম রে বাবা! কাল আবার ২৬ তারিখ। সক্কাল সক্কাল স্কুল গিয়ে তেরাঙ্গা না তুললেই নয়!” – বিরক্ত হয়ে স্কুটার চালিয়ে কলকাতা ফিরছিল স্কুলমাস্টার সন্দীপ ধর। এখনও এক- দেড় ঘণ্টার রাস্তা তো হবেই। কিন্তু আর যে চালানো যাচ্ছে না ! একে মাঘের শীত, তার উপর এই অসময়ের অঝোর বৃষ্টি ! মনে হচ্ছে কেউ যেন তীরের ফলা ছুড়ে ছুড়ে মারছে । এবার না থামলেই নয়।

খানিকটা আরও এগিয়ে রাস্তা থেকে একটু দূরে একটা বাড়ি দেখতে পেল সন্দীপ। এতক্ষন রাস্তার দু’ধারে একটা ছাউনিও চোখে পড়ে নি। অগত্যা স্কুটারটা রাস্তা থেকে নামিয়ে বাড়িটার দিকে এগোল সে। যত এগোতে থাকল তত মনে হল কেউ যেন তার মুখ পানে চেয়ে বসে আছে! কিন্তু দেখে বোঝাই যাচ্ছে এ বাড়ি পরিত্যক্ত; কে থাকবে এখানে?

।। ৩ ।।

সামান্য ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল। মোবাইলের টর্চ জ্বেলে সন্দীপ দেখল বাড়িময় ঝুল আর ধুলোয় ভরে গেছে।

“কেউ আছেন?” – বেশ কয়েকবার ডেকে উঠল সন্দীপ। পরিবর্তে নিজের স্বরের প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কিছুই ফিরে এল না।

বারান্দাটা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে একটা সিঁড়ি। সিঁড়ি ধরে উপরে উঠতে লাগল সন্দীপ। দোতলার প্রথম ঘরটা খোলা। হাত দিয়ে ঝুল আর মাকড়সার জাল সরাতেই সামনে একটা টেবিল – চেয়ার দেখতে পেল সে । কাছে যেতেই টেবিলের ওপর একটা ডায়েরী চোখে পরল। টর্চের আলোয় ডায়েরীটা পড়তে শুরু করল সে।

।। ৪ ।।

জানুয়ারী ২০ , সোমবার

“রক্তিমদাটা না কিছুই বুঝতে চায় না! আজকেও টিউশান থেকে বেড়িয়ে দেখি বাইরে অপেক্ষা করছে। বাড়ি ছাড়তেই হবে।নইলেই আবার রাগ! আজ তো বাবা দেখেই ফেলেছিল প্রায়; কোনোক্রমে বেঁচেছি!

আচ্ছা, রক্তিমদাও কি মনে মনে ? …

না থাক! কিসব আকাশকুসুম ভাবছি ! যা ভাবি তাই লিখে ফেলি। ধুর !”

 

জানুয়ারী ২১, মঙ্গলবার

“আজ রক্তিমদা হঠাৎ একটা বড় চকোলেট এনে হাতে ধড়িয়ে দিল । হঠাৎ কেন? বুঝতে পারলাম না। কিন্তু একটা অদ্ভুত রকমের খুশি হচ্ছে কেন জানি না । রক্তিমদা আমার চোখে চোখ রেখে চাইতেই পুরো শরীরে কেমন একটা শিহরণ খেলে যায়। কিন্তু বারবার হাত ধরার চেষ্টা কেন করে ? আজ তো ছাড়তেই চাইছিল না। কব্জিতে হাল্কা ব্যাথাও আছে। আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। থাক। “

 

জানুয়ারী ২২, বুধবার

“একই এলাকায় তো থাকি, তাহলে নম্বর নেওয়ার কি দরকার পরল ? এমন জোড় করল যে না বলতেই পারলাম না । সত্যি বলতে কি, না বলতে চাইলামও না। তনয়াকে বললাম ঘটনাটা । আমার এতদিনের বান্ধবী রক্তিমদার কথা শুনে ওরকম ভুরু কুঁচকে কেন বলল – “ ছেলেটা খুব একটা সুবিধের নয় রে, একটু দূরে দূরে থাক। আর এমনিতেও দু’মাস বাদেই উচ্চমাধ্যমিক । এসব চিন্তা ছাড়।“ কই আমার তো সেরকম কিছু মনে হয়নি, ওই ভুল ভাবছে হয়তো।

কাল প্রথমবার বেড়াতে যাব রক্তিমদার সাথে। এমন জোড় করল না বলতেই পারলাম না । বলল- “কাল ছুটির দিন আছে, চ’ কোথাও একটা এক বেলার জন্য ঘুরে আসি।”

তবে কি কাল রক্তিমদা ওর মনের কথাটা বলেই ফেলবে আমায়? আচ্ছা আমি কি ঠিক করছি না ভুল ?? নাকি আজ অবধি যার জন্য অপেক্ষা করেছি, রক্তিমদা, তুমি সেই ??”

 

জানুয়ারী ২৪, শুক্রবার

“ভালোবাসা আঘাত করে জানতাম কিন্তু এভাবে? কে বুঝতে পেরেছিল? রক্তিমদা, কেন এরকম করলে আমার সাথে তুমি ? কেন কাল তোমার চাহনিতে স্নেহ নয়, ভয় দেখেছি? কেন এই পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়ে এলে কাল আমায়? তোমার ওই লোলুপ চাহনি আর পাশবিক স্পর্শে কেন ভাঙলে আমার বিশ্বাস? তোমার সারল্য তোমার ওই নির্মম অট্টহাসির মধ্যে কেন চাপা পড়ে গেল?

গলায় খুব ব্যাথা লেগেছিল। তোমার দু’হাতের ক্ষমতার সাথে আমার নিঃশ্বাস বেশিক্ষণ লড়ে উঠতে পারে নি।

তবে কি তুমি সে নও যাকে আমি খুঁজছিলাম? তুমি কি সে নও আমি যার অপেক্ষায় ছিলাম? ……”

 

।। ৫ ।।

পড়তে পড়তে হঠাৎই তারিখটার দিকে খেয়াল পড়লো সন্দীপের। এ কি? ২২ এর পর ২৪ কেন? ২৩ কই? এদিক ওদিক করে বেশ কয়েকবার পাতা উল্টালো সে। উঁহু ! নেই। ২৪ তারিখের লেখাটার ঠিক নীচে আরও কিছু লেখা আছে চোখে পড়লো সন্দীপের।

 

জানুয়ারী ২৫, শনিবার

“আজ প্রকৃতিও যেন বড় অশান্ত হয়ে উঠেছে। তীব্র হাওয়া শো শো শব্দ করে ঝড়ের বুক চিরে  বেড়িয়ে আসতে চাইছে। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে অঝোর ধারায় প্রকৃতি কেঁদে চলেছে অবিরাম। যেন এক না পাওয়া ভালোবাসার তীব্র আর্তনাদের আগুন চোখের জলে নেভানোর চেষ্টা করছে সে। তবে কি সে আসছে ?

সে আসছে! আর অপেক্ষা নয়! সে আসছে!”

মুহূর্তের মধ্যে কোথা থেকে এক হিমশীতল স্পর্শ সন্দীপের শিরদাঁড়া ছুঁয়ে চলে গেল। আচমকাই হাত থেকে ডায়েরীটা পড়ে গেল। অতর্কিতে পেছনে ঘুরতেই কিসে একটা সন্দীপের পা ধাক্কা খেল। টর্চের আলোয় সন্দীপ দেখল – একটি তরুণীর বিবস্ত্র দেহ পড়ে রয়েছে মেঝেতে। সারা শরীরে অকথ্য অত্যাচারের চিহ্ন। মেয়েটির চোখদুটো খোলা। সে চোখের দিকে তাকানো যায় না। যেন এক অন্তরের আর্তনাদ, অন্তহীন অপেক্ষা আর তার সাথে প্রানভিক্ষার অনুরোধ ঠিকড়ে  বেরিয়ে আসছে মণি দুটোর থেকে!

কতক্ষন ওভাবে সন্দীপ দাঁড়িয়ে রইল জানে না।বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে।  সারা ঘরময় এক অলৌকিক নিস্তব্ধতা।  এরই মধ্যে  হঠাৎ জানালা দিয়ে এক প্রবল আলোর ঝলকানি ঘরে এসে পড়লো। তারপর …

।। ৬ ।।

পরের দিন বেলা বাড়ার সাথে সাথে রাস্তার ধারের পোড়ো বাড়িটার আসে পাশে লোকজনের বিস্তর ভিড় জমা হতে লাগল। গত রাত্রে বাজ পড়ে বাড়িটার জায়গায় জায়গায় ভয়াবহ ফাটল ধরে গেছে। সন্দীপের স্কুটারটা বাইরে দাঁড় করানো দেখে বাড়িটার ভেতরে ঢুকে দুটো মৃতদেহ দেখতে পেয়েই পুলিশে জানায় স্থানীয় লোকজন। একটা আঠাশ – ত্রিশ বছর বয়সী যুবকের আর একটা আঠারো – উনিশ বছর বয়সী মেয়ের।

দীর্ঘ বারান্দাটার এক কোণে ঠায় দাঁড়িয়ে এসব দেখতে থাকা রোহিণীর একটি সূক্ষ্ম বিষাদময়ী হাসি সবার দৃষ্টির অগোচরে হাওয়াতে তৈরি হয়ে চকিতেই আবার হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2021 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ