31 Jul

গুরমুখ সিং-এর উইল

লিখেছেন:সাদাত হাসান মান্টো


প্রথমে টুকটাক চাকু-চালাচালি, তারপর দু-তরফের জোর লড়াইয়ের খবর আসতে লাগল। এই লড়াইয়ে চাকু, কৃপাণ, তলোয়ার এবং বন্দুক বেপরোয়া চলল। কখনও কখনও বা দেশী বোমা ফাটার খবরও আসতে লাগল।

অমৃতসরের অধিকাংশ মানুষেরই ধারণা ছিল এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেশীদিন স্থায়ী হবে না। আপাতত উৎসাহ উদ্দীপনা আছে, এই উৎসাহ উদ্দীপনা মিইয়ে গেলেই অবস্থা আপসে-আপ ঠিক হয়ে যাবে। এর আগেও এরকম দাঙ্গা অমৃতসরে বার কয়েক হয়েছে। কিন্তু দাঙ্গা বেশী দিন চলেনি। খুব বেশী হলেও মেরেকেটে দশ-পনেরো দিন, তারপর অবস্থা শান্ত হয়ে থিতিয়ে পড়েছে। এর আগে যে সব দাঙ্গাহাঙ্গামা হয়েছে তার সঙ্গে তুলনা করে লোকে মনে করেছে কিছুদিনের মধ্যেই দাঙ্গা থিতিয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। কিন্তু তা না হয়ে অবস্থা দিন দিন আরও খারাপের দিকে যেতে লাগল। | হিপাড়ায় যেসব মুসলমান থাকত, তারা পাড়া ছেড়ে পালাতে লাগল। আর মুসলমানপাড়ায় যেসব হিন্দু থাকত, তারা তাদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে সুরক্ষিত জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নিতে শুরু করল। কিন্তু এ ব্যবস্থা যে অস্থায়ী তা বুঝতে কারো অসুবিধা হল না। কারণ দাঙ্গার এই যে বিষক্রিয়া — এই বিষক্রিয়াতে সব-কিছু জ্বলেপুড়ে খাক না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত শান্তি আসবে না।

মিঞা আবদুল হাই একজন রিটায়ার্ড সাব-জজ। তার দৃঢ় বিশ্বাস, অবস্থা খুব তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে। আর তাই তিনি খুব একটা উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠেননি। তার এক ছেলে আর এক মেয়ে। ছেলের বয়স বছর এগারো আর মেয়ের সতেরো। আর ছিল বহু পুরনো এক চাকর। বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। খুবই ছোট্ট পরিবার। দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর মিঞা সাহেব ঘরে বেশ কিছু রেশন মজুত করলেন। ঘরে খাবার মজুত থাকায় তিনি অন্তত এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন। খোদা না করে, অবস্থা খারাপের দিকে গেলে — দোকান-পাট যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে তাকে কোন মুসিবতে পড়তে হবে না। কিন্তু তার ভরা-যুবতী মেয়ে সুগরা খুবই চিন্তিত। তার তেতলা বাড়ি। অন্যান্য বাড়ির চেয়ে বেশ উচু। চিলেকোঠা থেকে শহরের তিন-চতুর্থাংশ বেশ ভালোভাবেই নজরে আসে। আজ কয় দিন ধরে সুগরা দেখছে আশপাশে কোথাও না কোথাও আগুন জ্বলছে। প্রথম প্রথম ফায়ার ব্রিগেডের ঘণ্টার ঠনঠন শব্দ শোনা যেত। এখন আর তাও শোনা যায় না। আর তাই আগুন বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে ক্রমশ।

রাতের দৃশ্যগুলো একটু ভিন্ন ধরনের। ঘুটঘুটে অন্ধকারে আগুনের বিরাট বিরাট হলকা চোখে পড়ে। মনে হয় যেন কোন দেবতার মুখ দিয়ে আগুনের ফোয়ারা ছুটছে। আর কিম্ভুত কিম্ভুত আওয়াজ শোনা যায় — ‘হর হর মহাদেও’ আর ‘আল্লা হো আকবর’ ধ্বনি মিলে মিশে এক ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। সুগরা ভয়ে শিটকিয়ে এ ঘটনা আর তার বাবার কানে তোলেনি। তোলেনি, কারণ এর আগেও সে বলেছিল। তাতে তিনি বলেছিলেন, ভয়ের কোন কারণ নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে। মিঞা সাহেবের বলার ধরনই এমন-যেন কিছুই হয়নি। বাবার এইরকম কথা বলার ধরনে তার মধ্যেও কিছুটা ভরসা আসত। কিন্তু যখন বৈদ্যুতিক তার কেটে দিল এবং জল বন্ধ হয়ে গেল তখন সুগরা মিঞা সাহেবকে তার উদ্ধেগের কারণ জানাল। ভয়ে সন্ত্রস্ত সুগরা বলল অন্তত কিছু দিনের জন্যে হলেও শরিফপুরে চলে যেতে। কারণ শরিফপুরেই প্রতিবেশী মুসলমানরা যাচ্ছে। মিঞা সাহেব তার যে রায় সেই রায়েই অটল রইলেন। বললেন, “মিছিমিছি তুই ভয় পাচ্ছিস কেন? অবস্থা খুব তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে।”

কিন্তু অবস্থা ঠিক না হয়ে বরং আরও খারাপের দিকে গেল। যে পাড়ায় মিঞা আবদুল হাই থাকতেন, সেই পাড়ার মুসলমানরা পাড়া উজাড় করে পালিয়ে গেল। আর এদিকে ভগবানের অসীম কৃপায় এক দিন মিঞা সাহেব পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হলেন। ছেলে বশরত আগে একা-একাই গোটা বাড়িতে উপরে নীচে ছোটাছুটি এবং নানারকম খেলা খেলত। কিন্তু বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে সে বাবার খাটিয়ার ধরে বসে পড়ল এবং অবস্থার গতি অনুভব করার চেষ্টা করতে লাগল।

তাদের বাড়ির লাগোয়া বাজার। সেই বাজার একেবারে নিস্তব্ধ। ডাক্তার গুলাম মোস্তাফার ডিসপেন্সারি বহুদিন থেকে বন্ধ পড়ে রয়েছে। গুলাম মোস্তাফার ডিসপেন্সারি ছাড়িয়ে ডাঃ গুরাদিত্তার ডাক্তারখানা। ঝুল বারান্দা থেকেই সুগরা দেখল, তার ডিসপেন্সারিতেও তালা ঝুলছে। এদিকে মিঞা সাহেবের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। কী করবে সুগরা কিছুই বুঝতে পারল না। কিছুই সে চিন্তা করতে পারছিল না। বশরতকে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে সে বলল, “খোদার দিব্যি দিয়ে বলছি, বশরত, এখন তুমিই কিছু একটা উপায় করো। জানি এখন বাইরে বেরোলে খুব বিপদ। কিন্তু তোমাকেই যেতে হবে — কাউকে ডেকে আনন। আব্বার অবস্থা খুবই খারাপ।”

বশরত বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু বেরুতে না বেরুতেই সে আবার ছুটে ফিরে এল। ওর মুখ কেমন হলুদের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। চকে রক্তে লতপত একটা লাশ সে দেখতে পায়। আর সেই লাশের কাছেই এক দঙ্গল মানুষ একটা দোকান লুট করছে। সুগরা ভয়ে জড়সড় তার ভাইকে দু হাত দিয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে। এবং অবসন্ন হয়ে বসে পড়ে। আর এদিকে বাবার যে অবস্থা তাও সে আর। সহ করতে পারছিল না। মিঞা সাহেবের বা অঙ্গে কোন অনুভবশক্তি ছিল না। যেন তাতে প্রাণের কোন চিহ্নমাত্র নেই। কথাও কেমন জড়িয়ে গিয়েছিল। বেশীর ভাগ সময়েই তিনি ইশারায় কথা বলতেন। ইশারায় তিনি যেন বলতেন, সুগরা, ভয়ের কোন কারণ নেই। খোদার মেহেরবানিতে সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু কিছুই ঠিক হল না। রোজার মাস শেষ হয়ে আসছিল। আর মাত্র দুদিন বাকী। মিঞা সাহেবের ভরসা ছিল, ঈদের আগেই অবস্থা বিলকুল ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মনে হচ্ছিল, ঈদের দিনই যেন কেয়ামতের দিন আসছে। কারণ চিলেকোঠা থেকে শহরের প্রায় সব জায়গায় ধোঁয়া — কেবল ধোয়া দেখা যেত। রাত্রে বোমা ফাটার এমন বিকট আওয়াজ শোনা যেত যে সারা রাত্রি একদণ্ডের জন্যেও সুগরা আর বশরত দুচোখ এক করতে পারত না। এমনি বাবার সেবাশুশ্রুষার জন্যে সুগরাকে রাত জাগতে হত। কিন্তু এখন এই বোমা ফাটার বিকট আওয়াজ যেন তার মগজে গেঁথে বসে গিয়েছে। একবার সে তার পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবার দিকে তাকাত, আর একবার ভীত-সন্ত্রস্ত তার ভায়ের দিকে। আর সত্তর বছরের বুড়ো চাকর আকবর — সে বাড়িতে থাকা আর না-থাকা দুই-ই সমান। সারা দিন-রাত নিজের ঘরে পড়ে খকখক কেশেই চলেছে আর গাদায় গাদায় কফ ফেলছে।

একদিন সুগরা রাগে দিশেহারা হয়ে তাকে গালিগালাজ করে বলল, “তুমি কোন কম্মের নও। দেখতে পাচ্ছ না মিঞা সাহেবের কী অবস্থা। তুমি হচ্ছ এক নম্বরের নিমকহারাম। এখন যখন মিঞা সাহেবের জন্যে কিছু করা দরকার তখন তুমি কাশতে কাশতে দম বন্ধ হওয়ার ভড় দেখাচ্ছ। যারা সত্যিকার নোকর তারা প্রভুর জন্যে নিজেকে বলি দিতেও দ্বিধা করে না।”

সুগরা গালিগালাজ দিয়ে তার মনটাকে কিছুটা হালকা করে চলে গেল। কিন্তু পরে তার খুব অনুতাপ হল। কী প্রয়োজন ছিল এই গরিব বেচারাকে গালিগালাজ করার। রাত্রে আকবরের জন্যে একটা থালাতে খাবার বেড়ে সে যখন তার ঘরে গেল, দেখল আকবরের ঘর খালি। বশত সমস্ত ঘর তোলপাড় করে খুজল। কিন্তু আকবরকে পাওয়া গেল না। সদর দরজার খিল খোলা। সুগরা বুঝতে পারল, মিঞা সাহেবের জন্যে সে বাইরে গিয়েছে। সুগরা খোদার কাছে মোনাজাত করল, খোদা ওর যেন কিছু না হয়। দুদিন পেরিয়ে গেল। কিন্তু আকবর আর ফিরে এল না।

সন্ধ্যার সময়। এমন অনেক সন্ধ্যা সুগরা আর বশরত দেখেছে। যে সন্ধ্যায় ঈদের পূর্বাভাস পাওয়া যায়। আকাশে একচিলতে চাঁদ দেখার জন্যে তারা কত উৎসাহ আর আকুতি নিয়েই না তাকিয়ে থাকত। পরের দিন ঈদ। আজকে শুধু চাদকে প্রার্থনা করার দিন। এই চাঁদকে এক ঝলক দেখার জন্যে তারা দুজনেই কত উতলা থাকত। আকাশে যেখানে চাঁদ ওঠে সেখানে যদি ঘন মেঘ দিয়ে ঢেকে যেত, তবে কী রাগই না তাদের হত। কিন্তু আজকে সারা আকাশ ধোঁয়ার মেঘে ঢেকে গিয়েছে। সুগরা আর বশরত দুজনে চিলেকোঠায় চড়ল। দূরে কোন কোন বাড়িতে অন্ধকারের মধ্যে মানুষজনের আবছা মূতি দেখা যাচ্ছিল। বোঝা যাচ্ছিল না তারা চাঁদ দেখছে, না, ধিকধিক আগুন দেখছে।

আজ যেন চাঁদও বেশ কুশলী হয়ে উঠেছে। ধোঁয়ার যে পুরু পর্দা তার ফাক দিয়ে সে মুখ বাড়াল। সুগরা দু’ করতল তুলে প্রার্থনা করল, খোদা, তুমি মেহেরবানি করে আমার আব্বাজানকে সুস্থ করে দাও। আর বশরতের এমন রাগ হচ্ছিল যে, কী এক হাঙ্গামা এসে ঈদের এই সুন্দর দিনটাকেই মাটি করে দিয়ে গেল।

দিন তখনও পশ্চিম দিকে ঢলে পড়েনি। সন্ধ্যার যে অন্ধকার তা তখনও তেমন গাঢ় হয়নি। জল-ছিটানো উঠনে মিঞা সাহেবের চারপাই পেতে দেওয়া হয়েছিল। চারপাইয়ের পর তিনি নিস্পন্দের মতো শুয়ে ছিলেন। তাঁর চোখ দুটি আকাশের দিকে স্থির নিবদ্ধ। কী যেন ভাবছিলেন। ঈদের চাঁদ দেখে এসে সুগরা তাকে সেলাম করল। উনি ইশারাতে সুগরাকে উত্তর দিলেন। সুগরা মাথা ঝোঁকালে, যে হাতে বল আছে সে হাত তুলে তিনি ওর মাথায় স্নেহে হাত বুলাতে লাগলেন। সুগরার দু-চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। মিঞা সাহেবেরও দু-চোখ জলে ভরে উঠল। তিনি সুগরাকে সাহস দেওয়ার জন্যে অনেক কষ্টে জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, “আল্লাহ-তআলা সব ঠিক করে দেবে।”

ঠিক এই সময় সদর দরজায় কেউ ঠকঠক করল। মিঞা সাহেব সুগরাকে বললেন, “দেখ তো, কে এসেছে।”

সুগরা ভাবল, হয়তো আকবর ফিরে এসেছে। তার দু চোখ আনন্দে চকমক করে উঠল। বশরতের হাত ধরে বলল, “মনে হচ্ছে আকবর এসেছে। একবার গিয়ে দেখে এসো।”

সুগরার কথা শুনে মিঞা সাহেব মাথা নাড়িয়ে যেন বললেন, না, , আকবর নয়, অন্য কেউ।

সুগরা তার বাবাকে বলল, ‘আকবর না হলে আর কে হতে পারে আব্বা?

মিঞা আবদুল হাই তার কণ্ঠের সমস্ত শক্তি দিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তিনি কিছু বলার আগেই বশরত ফিরে এল। ভয়ে সে কাপছিল। বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। বশরত সুগরাকে এক ধাক্কা দিয়ে চারপাই থেকে সরিয়ে দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “একজন শিখ এসেছে।”

সুগরা ভয়ে চীৎকার করে উঠল : “শিখ! কী বলছিস?”

বশরত বলল, “দরজা খুলতে বলছে।”

সুগরা এক ঝটকায় বশতকে টেনে জড়িয়ে ধরল। বাবাকেও চারপাইয়ের ওপর এক লহমায় তুলে বসিয়ে দিল। এবং ভাবলেশহীন চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ মিঞা সাহেবের পাতলা দুই ঠোটের ওপর এক অদ্ভুত মিষ্টি হাসি খেলে গেল। বললেন, “যাও, দরজা খুলে দাও … গুরমুখ সিং এসেছে।”

বশরত প্রতিবাদ জানিয়ে বলল, “না, গুরমুখ সিং নয়, অন্য কেউ।”

মিঞা সাহেব নিশ্চিত ভাবে আবার বললেন, “সুগরা, দরজা খুলে দাও, গুরমুখই এসেছে।”

সুগরা উঠে দাড়াল। গুরমুখ সিংকে সে চেনে। পেনসন নেওয়ার আগে তার বাবা এই শিখের একটা কাজ করে দেন। ব্যাপারটা কী ঘটে ছিল তা সুগরার অত ভালোভাবে মনে নেই। বোধহয় তাকে এক মিথ্যে মামলা থেকে তার বাবা বাঁচিয়েছিলেন। তারপর থেকে প্রতিটি রমজানের ঈদের আগের দিন সে রুমালী সেওই-এর এক থলি নিয়ে তাদের বাড়িতে আসে। তার বাবা বহুবার তাকে বলেছেন, “সর্দারজী, আপনি কেন মিছিমিছি এই কষ্ট করেন। হাত জোড় করে সে বলত, “মিঞা সাহেব, বাহে গুরুজীর কৃপায় আপনার সব কিছুই আছে। এ এক সামান্য উপহার। আমি জনাবের খিদমতের জন্যে এর বেশী আর কী করতে পারি। আপনি আমার জন্যে যা করেছেন, আমার একশ পুরুষও সে ঋণ শোধ করতে পারবে না। ভগবান আপনার ভালো করুন।”

প্রতি বছর ঈদের আগের দিন গুরমুখ সিং সেই-এর থলে নিয়ে আসত। তার এই আসা সুগরার এত পরিচিত যে, আজকে সে কেন তার ঠকঠক শব্দ শুনেও বুঝতে পারল না। বশরতও দশ বছর ধরে তাকে দেখে আসছে। ও কেন বলল, গুরমুখ সিং নয়; অন্য কেউ এসেছে। আর কেই-ই বা হতে পারে। ভাবতে ভাবতে সুগরা সদর দরজার কাছে গেল। দরজা খুলবে, না এখান থেকে জিজ্ঞেস করবে, ‘কে’। এমন সময় আবার দরজায় ঠকঠক আওয়াজ হল। সুগরার বুক ভয়ে জোরে জোরে ওঠা-নামা করতে লাগল। কোনরকমে সে গলা দিয়ে আওয়াজ বের করে জিজ্ঞেস করল, “কে?”

বাইরে থেকে আওয়াজ এল, “আজ্ঞে … আজ্ঞে … ••আমি … •••আমি সর্দার গুরমুখ সিং-এর ছেলে … সন্তোখ।”

সুগরার সাহস কিছুটা ফিরে এল। বেশ নম্রতা এবং ভদ্রতার সঙ্গে সে বলল, “আপনি কিভাবে এলেন?”

বাইরে থেকে জবাব এল, “সাহেব কোথায়?”

সুগরা বলল, “তিনি অসুস্থ।”

সর্দার সন্তোষ সিং ব্যথিত হয়ে বলল, “ওহ…তারপর সে কাগজের | ঠোঙায় একটা খরখর শব্দ করে বলল, “সেই নিয়ে এসেছি..সর্দারজী পরলোক গমন করেছেন … •••মারা গিয়েছেন।”

সুগরা জিজ্ঞেস করল, “মারা গিয়েছে?”

বাইরে থেকে জবাব এল, “আজ্ঞে হাঁ … গত এক মাস হল মারা গিয়েছেন মারা যাওয়ার আগে বলে গেছেন, “দেখ, জজ সাহেবের জন্যে দশ বছর ধরে রমজানের ঈদে সেই নিয়ে যাই। আমার মৃত্যুর পর এ কাজ তোমাকে করতে হবে। আমি তাকে ওয়াদা দিয়েছি … ••ওয়াদা রাখতে এসেছি … সেওইটা নিন।”

সন্তোষ সিং-এর কথা শুনে সুগরার দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। দরজাটা সে একটু ফাক করল। সর্দার গুরমুখ সিং-এর ছেলে সেওই-এর ঠোঙাটা সামনে এগিয়ে ধরল। সুগরা ঠোঙাটা এক হাতে নিয়ে বলল, “খোদা, সর্দারজীকে দীর্ঘায়ু করুন।”

গুরমুখ সিং-এর ছেলে এক মুহুর্ত চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল, “জজ সাহেব কি অসুস্থ ?”

সুগরা বলল, “জী, হাঁ।”

“কি অসুখ হয়েছে?”

“পক্ষাঘাত।” ।

“ইস,•••সর্দারজী যদি বেঁচে থাকতেন, শুনলে খুব দুঃখ পেতেন••• মৃত্যুর আগেও জজ সাহেবের কথা বলেছেন। বলতেন, জজ সাহেব মানুষ নন, দেবতা।•••ভগবান যেন তাঁর আয়ু দেন। … •••ওঁকে আমার প্রণাম জানাবেন।”

সন্তোষ সিং এই দু-চারটি কথা বলে উঠোন থেকে আবার রাস্তায় নামল। … সুগরা একবার মনে মনে ভাবল, ওকে বলে — জজ সাহেবের জন্যে একজন ডাক্তার ডেকে দিতে।

সর্দার গুরমুখ সিং-এর ছেলে সন্তোষ সিং জজ সাহেবের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কয়েক পা এগুতেই চারজন লোক তাকে ঘিরে ধরল।

দুজনের হাতে জ্বলন্ত মশাল। আর দুজনের হাতে কেরোসিনের টিন এবং আগুন লাগানোর অন্যান্য জিনিস।

তাদের একজন সন্তোখ সিংকে জিজ্ঞেস করল, “কী সর্দারজী, তোমার কাজ হয়ে গিয়েছে তো?

সন্তোখ মাথা কাত করে বলল, “হাঁ, হয়ে গিয়েছে।”

লােকটি বেশ দেমাকের সঙ্গে হেসে জিজ্ঞেস করল, “তবে এখন জজ সাহেবের মামলা ঠাণ্ডা করে দিই।”

“হ্যাঁ … তোমাদের যা মর্জি কর,” বলে সর্দার গুরমুখ সিং-এর ছেলে হাঁটতে শুরু করল।

 

Tags: , , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2021 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ