01 Oct

লাল ব্রিজ

লিখেছেন:পূষন


‘এ ভাই, তোর কাছে কোনো জম্পেশ স্টোরি আছে? … বা হেব্বি কোনো স্টোরি টেলার?’

সে’বার জানুয়ারি মাসের এক শনিবারের মেঘমেদুর দুপুরবেলায় ফোন করে আমাকে এই প্রশ্নটাই করেছিল সমর। সমর আমার ছেলেবেলার বন্ধু, সেই সময় সে একটা স্বল্পনামী খবরের কাগজের অফিসে ইন্টার্নশিপ করছিল। ওর খুব ইচ্ছে ছিল যাতে ওই অফিসেই ওর চাকরি জুটে যায়। কিন্তু ক্ষীণ একটা সম্ভাবনা থাকলেও সেটার আশা না করাই ভালো। এক এলাকায় থাকার দরুণ সমরের সাথে সপ্তাহে একবার আমার দেখা হওয়া বাধা ছিলই, কিন্তু তখন নতুন কাজের চাপে বেশ কয়েকদিন তার দেখা পাওয়া যায়নি। সময় হলে নিজেই ফোন করবে — আমিও এই আশাতে ছিলাম। ঋতুচক্র অনুসারে শীতকাল হলেও গত কয়েকদিন ধরেই নাছোড়বান্দা পশ্চিমী ঝঞ্ঝার দাপট চলছে কলকাতা জুড়ে। প্রচন্ড মেঘলা আকাশ, তার সাথে হু হু করে হাড়-কাঁপানো হাওয়া বইছে। মাঝেমধ্যে এক পশলা ঝিরঝিরে বৃষ্টি। এই পরিস্থিতিতে সমরের ফোনের আশা থাকলেও তার প্রশ্নটা ঠিক আমার, যাকে বলে ‘কমন পড়ল না’। একটু ভেবে নিয়ে বললাম, ‘না … সেরকম কেউ তো… কিন্তু কেন? মানে, ঠিক কেমন গল্প চাস?’

একটু বিরক্ত হল সমর। বলল, ‘আহা! আরে, আর বলিস না! হয়েছে কি আমাদের কা…’ এইটুকু বলে আচমকা থেমে গেল সে। একটু বাদে ফের বলল, ‘শোন না! রাতে একটু দেখা কর না! এই সাড়ে আটটা নাগাদ। খুব দরকার। হবে?’

আমি ‘না’ করতে পারলাম না। এই আমার দোষ!বললাম, ‘এই ওয়েদারে অত রাতে… আচ্ছা, আয়! বাট লেট করবি না!’

— ‘ওকে। আমি স্টেশনে নেমেই কল করব।’

— ‘আচ্ছা। তাহলে আমি এক নম্বরেই থাকব। ফোন করিস।’

—‘হুম। বাই।’

— ‘বাই।’

রাত্রে যথারীতি আধাঘন্টা দেরী করেই এল সমর। ও ট্রেন থেকে নামতেই আমার সাথে প্রায় মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল। আমায় দেখে একগাল বিষণ্ণ হাসি হেসে বলল, ‘চল, একটু চা খাওয়া যাক।’

ইলশেগুঁড়ির মধ্যে হেঁটে এসে চায়ের দোকানে বসে আমি বললাম, ‘বল এবার! কি হয়েছে? হঠাৎ গল্পের খোঁজ কেন?’

সমর মুখ নিচু করে বলতে লাগল, ‘আসলে … আমাদের কাগজের ফ্লায়ারের জন্য একটা স্টোরি লাগে প্রতি সপ্তাহে। কিন্তু এতদিন সেই দ্বায়িত্ব যার উপর ছিল সেই নির্মলবাবু হট করে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ছুটিতে। এবার এডিটর আর কাউকে না পেয়ে আমার ঘাড়ে সেই কাজ এনে ফেলেছে! বুঝছিস ব্যাপারটা? কাজ ভালো হলে লাভ হবে কিনা জানি না, কিন্তু না হলে বা খারাপ হলে ফুল কেস! … এদিকে তিনদিন পরেই ডেডলাইন, কোনো প্রস্তুতি হয়নি। কি লিখব কিছুই মাথায় আসছে না। তাই বলছি তোর কাছে কোনো গল্প, গল্পের প্লট বা আর্টিকাল লেখার মত কিছু আইডিয়া আছে কি না বল না! সারাদিন তো ঘরে বসে খিটকেলে সব বইপত্র ঘাটিস … তবে হ্যাঁ, বিষয়বস্তু একটু মশলাদার হতে হবে! …… কিছু না পেলে… কিন্তু সত্যিই খুব বিপদে পড়ে যাব ভাই!’

বললাম, ‘দেশভাগ বা সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কিছু লেখ না! লোকে ভালো খায়।’

সমর মুখ ভেটকে বলল, ‘ধুর! ওসব ক্লিশে হয়ে গেছে। নতুন কিছু বল।’

একটু ভেবে বললাম, ‘ক্রস-রিলিজিয়ন লাভ স্টোরি? … অথবা পরকীয়ার কেচ্ছাটাইপ, সস্তা অথচ রগরগে কিছু?’

মাথা নাড়ল সমর, ‘উঁহু। হালকা উনিশ-বিশ হলেই ইম্প্রেশন খারাপ হয়ে যাবে। চাপ আছে। নেক্সট বল।’

এর মধ্যে চা এসে পড়ল। আমরা দু’জনেই দুটো চা তুলে নিয়ে ছোট ছোট চুমুক দিতে দিতে যে যার খেয়ালে ডুব দিলাম। ওই সময়ে কোনো মুখরোচক গল্প বা সেরকম গল্পের কোনো আইডিয়া আমার মাথায় আস’ল না। কিন্তু সমরের মুহ্যমান মুখের দিকে তাকিয়ে সটান ‘না’-ও করতে খারাপ লাগল। কি করা যায় ভাবছি — এমন সময় মরিয়া গলায় সমর বলল, ‘এমন কেউ নেই যে ভালো গল্প বলে বা জমাটি গল্পের স্টক রাখে? তেমন হলেও হয় …’

আমার চা সামান্য বাকী থাকলেও সমরের গ্লাসে শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে হাতের খালি গ্লাসটাকে বেঞ্চের সাইডে রেখে আমার হাতে একটা পাঁচ টাকার কয়েন দিয়ে হতাশ গলায় বলল, ‘ছাড়। … দিয়ে দে এটা।’

পাঁচ টাকার কয়েনটাকে দেখে এবং সেটাকে নেওয়ার সাথে সাথেই কিভাবে যেন একটা রাত, কয়েকটা ঘটনা আর একখানা বাড়ির ছবি আমার মনের একটা কোণা থেকে একেবারে সদরে এসে হাজির হল। সঙ্গে সঙ্গে কিছু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব যে এল না তা নয়, কিন্তু বন্ধুকে সাহায্য করার সামনে সেগুলোকে আর বিশেষ পাত্তা দিলাম না। যেতে তো নিষেধ করেনি লোকটা। বরং বলেছিল গেলে ভালো করে কথা বলা যাবে, আড্ডা মারা যাবে। একবার গেলে ক্ষতি কি? দেখা-ই যাক না …

কয়েনটাকে হাতে রেখে সমরের দিকে ফিরে বললাম, ‘কাল দুপুরে আসতে পারবি? স্টেশনে? … তাহলে এক জায়গায় যাব তোকে নিয়ে। লাভ হতে পারে।’

অনুজ্জ্বল কন্ঠে সমর বলল, ‘আচ্ছা, চল। আমারও অফ আছে … কিন্তু কোথায়, আর কেন?’

আমি এইবার দোকানদারকে টাকাটা দেওয়ার জন্য বেঞ্চ ছেড়ে উঠতে উঠতে ওকে বললাম, ‘চল না! … মনে হচ্ছে, ওখানে তোর গল্পের যোগাড় হয়েই যাবে …’

*******

পরেরদিন মানে রবিবারও আকাশের অবস্থা বিশেষ বদলাল না। ঠান্ডা কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। আজ বৃষ্টি না থাকলেও হাওয়া আর একটা কুয়াশা-কুয়াশা ভাব সমস্ত প্রকৃতিকে যেন আচ্ছন্ন করে ফেলে অবশ করে রেখেছে। রোদবিহীন সেই দুপুর বেলায় আমার সাথে প্ল্যানমাফিক স্টেশনেই দেখা হল সমরের। ইচ্ছে করেই দু’জনে খেয়ে-দেয়ে দেরী করে বেড়িয়েছি যাতে গন্তব্যে পোঁছাতে পৌঁছাতে একটা-দেড়টা বেজে যায়। একটা দোকান বন্ধ হওয়া দরকার। শুনেছি, ওই সময়ে-ই বন্ধ হয় সেটা। এই মুহূর্তে দেখলাম, সমর আজ জ্যাকেটের সাথে মাথায় একখানা টুপি আর চোখে গগলসও পরেছে। নিজের মুখ লোকানোর চেষ্টা। ওর এটুকু বাড়াবাড়ি চুপচাপ মেনে নিলাম। আমার ব্যাগে ট্রেনের টিকিট দু’খানা ঢোকাতে ঢোকাতে ওকে বললাম, ‘যেটা আনতে বলেছিলাম এনেছিস?’

সমর সংক্ষেপে বলল, ‘হুম।’

— ‘ঠিক আছে।’

কিছুক্ষণ বাদে ট্রেন এল। এই লাইনের ট্রেনের যাত্রী এমনিতেই কম, তার উপর আজ রবিবার। ট্রেন বেশ ফাঁকাই ছিল। আমরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উঠে পাশাপাশি বসার দুটো সিট পর্যন্ত পেয়ে গেলাম। ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষণ বাদে সমর চাপা স্বরে প্রশ্ন করল, ‘কোথায় যাচ্ছি সেটা বলবি এবার?’

আমি বললাম, ‘আরে চল না! তোর কাজেই তো যাচ্ছি। … তবে একটু অদ্ভুত লাগতে পারে, ঘাবড়াবি না। আর তোর কাজ খালি শোনা। যা বলার, যতটা বলার — আমি বলব। তুই খালি হ্যাঁ-হ্যাঁ করবি। বুঝলি?’

সমর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সম্মতিক্রমে মাথা নাড়ল। ব্যাপারটা তার যে পছন্দ হচ্ছে না এটা সহজেই অনুভব করা যায়।

ছুটির দিন বলে কিনা জানি না, আজ ট্রেন খুব মসৃণ গতিতে এগিয়ে চলল। আমরা যখন সেই জংশন স্টেশনে পৌঁছালাম তখন সবে বেলা সাড়ে এগারোটা বাজে। স্টেশনে নামতেই আমার মনে পড়ে গেল বছরখানেক আগের সেই রাতের কথা। সেই ওভারব্রিজ, সেই রাস্তাঘাট। আমি সমরের সাথে পথ চলতে লাগলাম। মনের ভেতর একটা অ্যাডভেঞ্চারের ধুকপুকানি চলতে লাগল। তার সাথে একটা আশঙ্কাও ছিল যে যার খোঁজে আসা তার দেখা না পেলে কি হবে। চলতে চলতে সেই বটগাছটা চলে এল। তার নীচে এখনও দেখলাম সেই ঝুপড়িমতন দোকানঘরটা রয়ে গেছে। সে-ই দেখলাম এক টুকরো বেড়া দিয়ে আগল দেওয়া রয়েছে। পাশের দোকানটাও দেখলাম আজ বন্ধ। হয়ত রবিবার বলে বন্ধ। কে জানে। রাস্তা আমার মনে ছিল, তাই কোনো অসুবিধা হল না। সে-ই সামনের সরু গলি, আর ডান-ডান-বাঁ।

আমাদের চারপাশ এখনও ভালোরকম আবছায়াময় হয়ে রয়েছে। মাটিতে নিজেদের ব্যক্তিগত ছায়াটাও স্পষ্ট করে চোখে পড়ছে না। হাওয়া অবশ্য বিশেষ নেই। হাঁটা পথে মিনিট দুয়েকের মধ্যে আমি সমরের সাথে ‘আদিধাম’-এর দরজায় এসে দাঁড়ালাম। লেখাটা এখনও রয়েছে: ‘বিপদে পড়িলে আসুন’। তবে এই কয়েকমাসের ভিতরেই বাড়িটা যেন আরও বুড়িয়ে গেছে। কেমন একটা সাদা-কালো বিমর্ষভাব। সে-ই হলুদ ফুলযুক্ত লতাটাকেও দেখতে পেলাম। এই বাড়ির যাবতীয় রঙের বন্দোবস্ত যেন এরই লিকলিকে কাঁধের উপর ন্যস্ত রয়েছে। মোটামুটি দায়িত্ব পালন সে করছে বটে, কিন্তু আবার পুরোপুরি পেরেও উঠছে না। সবটা মিলে পুরোনো দিনের একটা অয়েল প্যাস্টেলে আঁকা ছবি যেন।

পাশ থেকে সমর গলা নামিয়ে খসখস করে বলল, ‘অ্যাই, এটা কার বাড়ি রে? আমরা কেন এসেছি এখানে?’

আমি ‘দাঁড়া না!’ বলে দরজায় লাগানো বেলটা বাজিয়ে দিলাম। বেলের শব্দ হল না। কিছুক্ষণ কোনো সাড়াও এল না। তাও আমি ফের বেল টিপতেই ভেতর থেকে আমার পূর্বপরিচিত গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল, ‘আসছি।’

দরজা খুলতেই আমাদের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল আদিদেবের। আজ এঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে আসলে এই লোকের প্রকৃতি কেমন। হাফ-হাতা মেরুন রঙের সোয়েটার আর নীল রঙের লুঙ্গিতে সাধারণ বাঙালী প্রৌঢ়ের মত লাগছে তাঁকে। গলার রুদ্রাক্ষের মালাটা অবশ্য কিঞ্চিৎ ব্যতিক্রমী। কিন্তু সর্বোপরি তাঁর চোখ আর কপালের অনতিস্পষ্ট লাল তিলক বাকীদের থেকে অনেকটা আলাদা করতে যথেষ্ট। দরজার একটা পাল্লায় হাত রেখে আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পরেই হাসি ফুটে উঠল ভদ্রলোকের ঠোঁটের কিনারায়। বললেন, ‘আরে! তুমি যে! … আজ কত টাকার খুচরো লাগবে? অ্যাঁ? হা হা হা …’ কথা শেষ করে বেশ হাসতে লাগলেন ভদ্রলোক।

যাক! ভদ্রলোক আমায় চিনতে পেরেছেন এবং তার চেয়েও বড় কথা এইভাবে হট করে এসে পড়ায় খাপ্পা হন নি দেখে মনে মনে বেশ আশ্বস্ত বোধ করলাম। ওঁনার রিঅ্যাকশন অন্যরকম হলে খুবই বাজে ব্যাপার হত। যাই হোক, আদিদেবের হাসির উত্তরে আমিও সামান্য হাসি-হাসি গলায় বললাম, ‘না … আজ খুচরো লাগবে না। একটু দরকারে এসেছি আপনার কাছে। ইয়ে … মানে, আপনার সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে?’

প্রথমে একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন আদিদেব, তারপর ফের জোরে হেসে উঠলেন। আমি একটু থতমত খেয়ে গেলাম। এ আবার কি! কথা বলার কথায় হাসির কি আছে? হাসি সামান্য প্রশমিত করে আদিদেব বললেন, ‘আমার সাথে কথা বলবে? … সে তো দারুণ খবর! অনেকদিন বাদে শুনলাম … এসো, ভেতরে এসো। ও হ্যাঁ … তোমাদের জুতোগুলো একটু দরজার কাছেই খুলে রেখে এসো …’

আদিদেবের পিছন পিছন আমরাও ঘরে ঢুকলাম। এই সেকেলে বাড়ির ভেতরটা আজ বেশ অন্ধকার লাগল। বাইরের খারাপ আলোর জন্য-ই হয়ত। সেই সরু প্যাসেজটা পার করে বসার ঘরে উপস্থিত হলাম আমি আর সমর। ঘরের এই মুহূর্তের চেহারা বেশ রহস্যময় বলতে হবে। আলো বলতে খালি পুবের একখানা জানালা খোলা। সেটার অর্ধস্বচ্ছ মলিন পর্দা ভেদ করে বাইরের মেঘলা আকাশ থেকে অল্প যেটুকু মরা আলো আসছে তাতে ঘরের সবটা স্পষ্ট হয় নি। সামনে রাখা ছোট টেবিলের উপর একটা সবুজ কাচের চিমনিওয়ালা হ্যাজাক অল্প আঁচে জ্বলছে। স্বচক্ষে এরকম শৌখিন কিন্তু ভৌতিক হ্যাজাক আমি এর আগে দেখিনি। লোডশেডিং নাকি?! … তবে ঘরের লাইটিং এইরকম বিচিত্র হলেও আগের বার যে টেবিল, চেয়ার ইত্যাদি মামুলি জিনিস দেখেছিলাম বলে মনে পড়ে, সব-ই চোখে পড়ল। দেওয়ালে-টাঙানো কালী ঠাকুরের ছবিটাতেও হ্যাজাকের আলো পড়ে চকচক করছে। খালি একটা চেয়ার যেন বাড়তি। এটা কি আগে ছিল এখানে? … উঁহু, মনে তো হয় না। বেশী লোক আসবে জানতে পেরে চটজলদি কেউ যেন রেখে গেছে এটাকে। আবছা আলোতে দেখলেও মনে হল, খয়েরি রঙের চেয়ারটার গায়ে হালকা ধুলোর আবরণ রয়েছে। খুব একটা ব্যবহার হয় না মনে হল। পাশের চেয়ার, এমনকি টেবিলে অবশ্য ধুলো-ময়লার ছাপ নেই। বেশী না ভেবে আমরা দুটো চেয়ারে গিয়ে বসে পড়লাম। টেবিলের অপর দিকে রাখা পুরোনো আরেকটা চেয়ারে বসলেন আদিদেব স্বয়ং।

বসার পরে আমার দিকে তাকিয়ে আদিদেব বললেন, ‘বলো, কি বলবে!’

আমি একবার সমরের দিকে তাকিয়ে নিলাম। ও নতুন কিছু দেখার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আদিদেবের দিকে। কিন্তু আদিদেবের সকৌতুক চোখ সম্পূর্ণ আমার দিকে নিবদ্ধ। দৃষ্টিচক্র বলে কিছু আছে কিনা জানি না, থাকলে আমাদের এই অবস্থা তার এক আদর্শ উদাহরণ হতে পারত। যাই হোক, আমি-ই কথা শুরু করলাম। বললাম, ‘আগে পরিচয় করিয়ে দি… এ হচ্ছে আমার বন্ধু সমর চক্রবর্তী, একটা কাগজের অফিসে কা …’

‘একটা গল্প লাগবে … এই তো?’

চমকে উঠলাম একেবারে। জান’ল কি করে? কিছু বলতে পারলাম না। সমর এখনও চুপ। শেষে ঘর ভর্তি নৈঃশব্দ ভেদ করে ফের কথা বললেন আদিদেব, ‘কি হল? … তা কেমন ঘটনা চাও বলো! তবেই না বলব! অনেক স্টক আছে …’

আমি আর বেশী ভাবলাম না। বললাম, ‘তা … বলুন না! গতবার বলেছিলেন কম বয়সে ম্যাজিক শিখতে গিয়ে কিছু হয়েছিল। সেই গল্পটাই … মানে, ঘটনার অভিজ্ঞতা-ই বলুন না!’

এইবারে আচমকা খুব উদ্যম সহকারে কথা বলে উঠল সমর, ‘একদম জমজমাট অথচ রিয়ালিস্টিক কিছু … মানে, বলছিলাম যে একেবারে … ’ এতটা বলেই সে আবার চুপ মেরে গেল। উত্তেজনার বশে কথাগুলো অচেনা লোকের সামনে এভাবে বলা যে ঠিক হয়নি — সেটা হয়ত এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে সে।

আদিদেব কিন্তু এবার আর হাসলেন না। কি যেন ভেবে নিতে লাগলেন খানিকক্ষণ। এদিকে বাইরে হুট করে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ আরম্ভ হল। ঘরের আলো এখন আরও কমে এসেছে। এতক্ষণে টের পেলাম, কিসের একটা ঝাপসা সুগন্ধ যেন ঘরের বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘরের সেই গন্ধ, হ্যাজাকের আলো-আঁধারি আর বাইরের বৃষ্টির গুঞ্জন একসাথে  মিলেমিশে চমৎকার একটা গল্পের আমেজ তৈরী হয়েছে। তার সাথে আদিদেবের এই চুপ করে থাকা তো যেন বাড়তি উদ্দীপক।

— ‘কবে ছাপবে লেখাটা?’

আদিদেবের এই প্রশ্নটা কিন্তু খুব শিশুসুলভ মনে হল। কিন্তু চুপ করে রইলাম। আমাদের ভাগ্য ভালো যে ভদ্রলোক বেশ তাড়াতাড়ি সহজ হয়ে গেছেন আমাদের সাথে। আজব আবদার বুঝেও মুখের উপর তাড়িয়ে দেন নি। তবে দু’-চার কথাতেই যে উনি আমাদেরও খানিকটা সহজ করে নিয়েছেন সেটা বুঝলাম পরের মুহূর্তেই। প্রশ্নটা যাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে সেই সমর-ই এবার একটু আমতা-আমতা করে বলল, ‘এ … এই তো … পরের সপ্তাহে। মানে… যদি …’

— ‘কর্মফলে বিশ্বাস ক’র?’

আদিদেবের হঠাৎ-করা প্রশ্নটায় থতমত খেয়ে গেল সমর। প্রথমে সে চুপ করে গেল। একটু পরে কথা গুছিয়ে নিয়ে বলল, ‘করি … মানে শুনেছি যে কর্মফল নাকি এড়ানো যায় না। কিন্তু সেই কথার কোন প্রমাণ পাইনি এখনও …’

‘আমি পেয়েছি। আজ সেই ঘটনা-ই শোনো তাহলে …

প্রায় তিরিশ বছরেরও আগের কথা। অল্প কিছু ম্যাজিক শিখে জীবিকার খোঁজে ঘুরতাম তখন। বিভিন্ন গ্রামের মেলায় গাছের নীচে কত ম্যাজিক দেখিয়েছি! তোমরা সে সব দেখো নি কখনও … কিন্তু তাতে বেশী আয় হত না। তার উপর শীত চলে গেলে মেলার সংখ্যাও কমে যেত। পয়সার প্রচন্ড টানাটানি চলত। আমার দেশের বাড়ি, জমি ছিল ঠিকই; কিন্তু আমার সাথে আমার বাড়ির কোনোদিন-ই বনে নি। বনার কথাও নয়। বাড়ির ছেলে অর্থকরী কাজ না করে ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়াবে এটা আমাদের দেশের আর কোন বাড়ির লোক মেনে নেবে?! বংশে গৃহত্যাগের ধারা ছিল, তাই ছোট থেকেই আমার ব্যাপারে নজর ছিল বাবার। আমাকে বরাবর কড়া শাসনে রাখতেন তিনি। তা সত্ত্বেও যখন আমি এই পথ বাছলাম তখন আর তিনি সহ্য করতে পারলেন না। সেই থেকে বাড়ির সাথে আমার একরকম বিচ্ছিন্নতারই সম্পর্ক ছিল। প্রথমে কালেভদ্রে যেতাম। গেলেও যে সমাদর হত তা নয়। শেষের দিকে আর যেতাম না। বাবার মৃত্যুর পরে কিছু টাকা আর জমি আমার হাতে আসে। সেটা মোটে কুড়ি-বাইশ বছর আগের কথা। তাই বলতে গেলে অন্তত যতদিন বাবা ছিলেন ততদিন ওনার পদবিখানাই শুধু আমি ব্যবহার করতে পেরেছি। তবে হ্যাঁ, যখনকার কথা বলছি তখন সংসার ছিল না, কিন্তু নিজের খরচ তো ছিল। বেঁচে থাকতে গেলে মিনিমাম একটা পয়সার যোগান তো লাগেই। অর্থের এই অভাবের কারণেই আমি কিছুদিনের মধ্যেই আরেকটা রাস্তা নিলাম। করলাম কি, প্রতিদিন বিভিন্ন লাইনের ট্রেনে উঠে উঠে ম্যাজিক দেখাতে আরম্ভ করে দিলাম। এতে রোজ কিছু পয়সাও আসত, আবার লোকের কাছে নিজের প্রচারও হয়ে যেত। এই ট্রেনের আলাপ থেকেও আমি কিছু শো-এর বরাত পেয়েছি। তবে সেগুলোকে কখনও-ই ঠিক “শো” বলা চলে না। এইরকম একটা শো-ই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল …

যাই হোক, এখন যে ঘটনার কথা বলছি সেটার সূচনা ঘটেছিল বর্ধমান লাইনের এক ট্রেনের কামরায়। সেদিন কি বার ছিল ঠিক খেয়াল নেই, তবে এইরকম-ই শীতের সময় ছিল। আমি একটা ট্রেনে উঠে ম্যাজিক দেখাচ্ছিলাম। দুপুরবেলার ঝিমানো সময়। ট্রেনে বেশী যাত্রী ছিল না। যারা ছিল ম্যাজিকের প্রতি তাদের খুব একটা আগ্রহ সোজাসুজি দেখতে পাইনি। দেখলে পাছে পয়সা চেয়ে বসি — সেই ভয়ে প্রায় সকলেই মুখ ঘুরিয়ে বসেছিল। কিন্তু আড়চোখে যে তারা আমার খেলা দেখে চলেছে সেটা আমি বিলক্ষণ জানতাম। এইরকম জনতার থেকে যে মনের মতন প্রশংসা বা টাকার কোনোটাই পাওয়া যাবে না সেটা বুঝে গিয়েছিলাম। নেমে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু মাঝখানে অনেকগুলো স্টেশনে ট্রেনটা দাঁড়াত না — থ্রু ছিল, সেজন্য আর নামার উপায় ছিল না। ব্যাজার মুখে অকারণ গলাবাজি করতে করতে কামরার মাঝখানের প্যাসেজ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু কামরার ব্যাকসাইডে প্ল্যাটফর্মের উলটোদিকের দরজার কাছে আসতেই আমার মন কিছুটা পালটে গেল। বাইরের হাওয়া বেশ ঠান্ডা হওয়ায় এবং সামনে কোনো স্টপেজ না থাকাতেই হয়ত দরজার কাছে কেউ আর দাঁড়ায় নি। সেই ফাঁকা দরজার খুব কাছে দেখলাম একটি মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। এখনও মনে আছে, তার পরনে ছিল একটা ম্লান সবুজ রঙের শাড়ি, দেহের উপরের অংশে জড়ানো রয়েছে মেরুন রঙের শাল। তার মুখ দরজার বাইরের দিকে। আর মহিলার ঠিক পাশে একটা ছ-সাত বছরের ফুলহাতা সোয়েটার আর হাফ প্যান্ট পরা বাচ্চা ছেলে একখানা প্লাস্টিকের খেলনা রেলগাড়ি নিয়ে ট্রেনের দরজার দেওয়ালের গায়ে সেটার যেখানে চাকা থাকার কথা সেই জায়গাটাকে আঁকাবাঁকা পথে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ঘষে চলেছে। সঙ্গে মুখ দিয়ে ‘হুউস … হুউস’ আওয়াজ করে চলেছে। আর কেউ নেই। ছেলেটাকে ওইভাবে খেলতে দেখে হঠাৎ যেন সামান্য হাসি পেল। ভালোই। গাড়ির ভেতরেই গাড়ি-গাড়ি খেলা। অনেকটা আমাকে ‘আমি’ ভাবার মত আর কী! …

আমি ওদের কাছাকাছি যেতেই বাচ্চা ছেলেটা খেলা থামিয়ে আমার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে রইল। আমিও উৎসাহ পেয়ে গেলাম। আসলে কি জা’ন তো, টাকা অবশ্যই জরুরী; কিন্তু যে কোন পারফর্মারের কাছে তার দর্শক সব চাইতে বড় কথা। তার উপর দর্শক উৎসাহী হলে তো ব্যাপারই আলাদা! বাচ্চাটা আমার খেলা দেখে হয়ত টাকা দেবে না, কিন্তু আমার ম্যাজিক দেখে ও যে আনন্দ পাবে এবং তার বদলে সে আমাকে যে সরল হাসিটা উপহার দেবে সেটা টাকার চেয়ে খুব কম নয়।

বাচ্চাটাকে হাসতে দেখে আমি ওর আরও কাছে এগিয়ে গেলাম। মহিলাটি অবশ্য এখনও বাইরের দিকে চেয়ে রইলেন। ভাবলাম, হয়ত কিছু চিন্তা করছেন বা আমাকে গুরুত্ব দিতে চান না। সে যাই হোক, আমি কাছে যেতেই বাচ্চাটা বলল, ‘তুমি ম্যাজিক জানো?’

বললাম, ‘জানি তো! তুমি দেখবে বাবু?’

সে চওড়া হেসে বলল, ‘হ্যাঁ… দেখব!’

— ‘এই নাও তাহলে’

আমি বেশ আনন্দের সাথে ম্যাজিক দেখাতে লাগলাম। রুমাল থেকে ফুলের গোছা, সেই ফুলের কয়েকটা পাপড়ি থেকে তাস, তাস গায়েব করার খেলা ইত্যাদি সাধারণ মানের কিছু ম্যাজিক দেখিয়েছিলাম। কিন্তু বাচ্চাটা এমন সরল আনন্দের সাথে সেগুলো দেখে হাতের খেলনা রেলগাড়িটাকে বগলে চেপে রেখে উচ্ছ্বসিত হাততালি দিচ্ছিল যে মাঝে মধ্যে আমি নিজেই লজ্জা পেয়ে যাচ্ছিলাম। বাচ্চাটার অবস্থা দেখে ট্রেনের বাকীরাও যে মনে মনে উৎসাহিত হয়ে আমার দিকে সামান্য বাড়তি নজর দিচ্ছিল সেটাও বুঝতে পারছিলাম। খালি সেই মহিলার কোনো ভাবান্তর দেখতে পাচ্ছিলাম না। বাচ্চা ছেলেটার খুব কাছে দাঁড়িয়ে থাকলেও তিনি যেন আমাকে বা আমার ম্যাজিকের কাউকেই দেখতে পাচ্ছিলেন না। ওই সময় তিনি তার সমস্ত মন নিয়ে যেন আমাদের থেকে বহু দূরে অবস্থিত আলাদা কোন জগতে নিমগ্ন ছিলেন। আমি একটু অবাক হলেও বিব্রত হলাম না। যাদু দেখাতে লাগলাম। শেষ যে ম্যাজিকটা আমি ছেলেটাকে দেখিয়েছিলাম সেটা তুমিও দেখেছ। ম্যাজিকটা দেখানোর আগে ওর কাছে একটা কয়েন চাইলাম ভ্যানিস করার জন্য। এইবার বাচ্চাটা পাশের সেই ভদ্রমহিলার কাপড়ের একটা প্রান্ত ধরে মৃদু টানতে টানতে বলল, ‘মা, একটা পয়সা দাও না! কাকু ম্যাজিক করবে, ম্যাজিক! … মা, দাও না …’

এইবারে মুখ ফেরালেন ভদ্রমহিলা। তার মুখের দিকে তাকাতেই কেমন একটা বিষাদ এসে আমাকে ঘিরে ফেলল। সেই মুখের সাথে শুকিয়ে আসা ফুলের তুলনা করলে খুব বেমানান হবে না। প্রচন্ড দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ বা কষ্টের একটা মলিন ছায়া যেন লেগে আছে সুশ্রী আর পেলব মুখটা জুড়ে। তার চোখের তলার পুরু কালি আর কপালে পড়া অপরিণত কিছু ভাঁজ মহিলাটিকে যেন তার বয়সের চেয়ে বেশী বয়স্ক করে তুলেছে। কিছু একটা যেন ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে ফেলছে ওনাকে। বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে একবার নিশ্চুপে একটু হাসলেন যেন ভদ্রমহিলা। তারপর চাদরের ভেতর থেকে একটা কাঁচাটাকা বের করে তার হাতে দিলেন। বাচ্চাটা খপ করে সেই টাকাটা নিয়ে আমার হাতে চালান করে দিল। তাকে তখন ম্যাজিকে পেয়ে বসেছে। সত্যি! ম্যাজিকের নেশা-ই আলাদা। যাই হোক, কয়েন পেয়ে আমি খেলা চালু করে দিলাম। বাচ্চাটা বিস্ফারিত চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল। বলতে দ্বিধা নেই, ছেলেটার সেই উদগ্রীব অপলক দৃষ্টি আমাকেও একটু চাপে ফেলে দিল। খেলাটা ঠিকঠাক দেখাতে পারব তো? এরকম নজরদারি! ভুল না হয়ে যায় …

কিন্তু ভুল হল না। মুঠোয় বন্দী কয়েন আমার হাতের তালুতে এসে ভ্যানিস হয়ে যেতেই আনন্দে আর বিস্ময়ে প্রায় লাফিয়ে উঠল বাচ্চাটা। তারপর সেইরকম খেলনাটাকে বগলদাবা করে রেখে সজোরে হাততালি দিতে দিতে সে তার মায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, ‘ভ্যানিস! ভ্যানিস! … তুমি দেখলে মা?! … পয়সা ভ্যানিস!’

বাচ্চাটার হাসি দেখে আমিও হেসে ফেললাম। নিজেকে একজন সফল আর্টিস্ট মনে হল। সেই অনুভূতিই আলাদা। জীবনে খুব কম বার এমন সন্তুষ্টি পেয়েছি আমি। সেই ভদ্রমহিলার দিকে তাকাতেই দেখলাম একটা ক্ষীণ হাসি যেন তার অনুমতির তোয়াক্কা না করেই জোর করে তার ঠোঁটের কিনারা ধরে ঝুলে পড়েছে। হাসিটায় আভা আছে, কিন্তু আলো নেই। পরের মুহূর্তেই আমার দিকে একবার তাকালেন তিনি … কি বলব তোমাদের, সেই দৃষ্টি আমি এখনও ভুলতে পারিনি। একসাথে কষ্ট, পরিতোষ আর কৃতজ্ঞতার এরকম সহাবস্থান চোখে না দেখলে সত্যিই অকল্পনীয়! বহুদিনের প্রিয় বাসস্থান অথবা নিজের দেশ ছেড়ে যাওয়ার পূর্বে, চিরকালের জন্য মুখ ফেরানোর ঠিক আগের পলকে মানুষ শেষবার যেভাবে তার দিকে তাকায় — এই দৃষ্টিতে যেন সেই মুহূর্তের বাষ্প ছিল। কোনো এক গহন কুয়াশার ভেতর থেকে সেই চোখ যেন আমায় নিঃশব্দে বলেছিল ‘ধন্যবাদ’! ঠিক কিসের ধন্যবাদ সেটা তখন বুঝতে পারিনি। সেই সময় বরং আমার সমস্ত উৎসাহ কেমন যেন মিইয়ে গিয়েছিল। জীবনে এর আগে বা পরে অনেক কঠিন সময় দেখেছি, প্রচন্ড ভয়ের মুখোমুখি হয়েছি; কিন্তু সেরকম বিষাদ আর কোনদিন আমার গলা চেপে ধরেনি। মনে মনে ভেবেছিলাম, এ কিসের বিষণ্ণতা? এর উৎস কোথায়? কোথায় এর শেষ? …

ছেলেটা কিন্তু তখনও যাদুর ঘোরে মেতে ছিল। জলজ্যান্ত একটা পয়সা তার চোখের সামনে হাওয়া হয়ে গেল — এর চেয়ে বিস্ময়ের আর কি আছে দুনিয়ায়? কয়েনটা যে ছেলেটার প্যান্টের বাঁ পকেটে রয়েছে — এ’কথা তাকে বলতে যাব এমন সময়ে আচমকা আমাদের ট্রেনের আওয়াজের মাত্রা এবং তার দুলুনি বেশ বেড়ে উঠল। বাইরের দৃশ্য সরে যেতে লাগল দ্রুততর গতিতে। একটা হালকা যান্ত্রিক ঝনঝনানি বেজে উঠল কামরার সমস্ত ধাতব জানলা-দরজা কাঁপিয়ে। টাল সামলানোর চক্করে মুখের কথা আটকে গেল। বুঝলাম, হঠাৎ করেই গতি অনেকটা বাড়িয়েছে আমাদের ট্রেনটা। ভদ্রমহিলাটি দেখলাম ট্রেনের দরজা দিয়ে মাথা বের করে বাইরে কি যেন দেখছেন। বিশেষ গা দিলাম না, এই জিনিস তো নতুন নয়! ঘটেই থাকে। কিন্তু এর পরেই যেটা ঘটল সেটা ভয়ংকর! আমার চোখের সামনে, হাত দেড়েক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ভদ্রমহিলা বিদ্যুতের গতিতে ছেলেটার ডানহাতটা চেপে ধরলেন শক্ত করে আর তারপরেই কারো কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিকট আর তীক্ষ্ণ একটা আর্তনাদ করে বাচ্চাসমেত সেই ছুটন্ত ট্রেনের কামরার বাইরে ঝাঁপ দিয়ে দিলেন। ট্রেনের শব্দে তার সেই চিৎকার আর বেশীক্ষণ কানে এল না। এই ঘটনার প্রায় সাথে সাথেই সেইদিকের পাশের লাইন দিয়ে সজোরে হুইসেল দিতে দিতে আরেকখানা ট্রেন ঝমঝম শব্দ করে আমাদের পার করে বিপরীত দিকে চলে গেল। কামরার ভেতরে একটা কলরব উঠল। আমার পাথর-হয়ে-যাওয়া শরীর কোন অজানা প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় কিছুটা পিছনে ছিটকে এল। এরকম কিছু যে ঘটতে চলেছে তা আমি কেন, কেউ-ই আন্দাজ করতে পারে নি। ট্রেনের বাইরে তাকানোর সাহস আমার ছিল না। খালি সামনের দিকে চোখ যেতে দেখলাম সে-ই প্লাস্টিকের খেলনা রেলগাড়িটা দরজার একপাশে তখনও পরে রয়েছে। ওফ, কি সাংঘাতিক! এখনও ভাবলে বুক কেঁপে ওঠে … ’

একটু থামলেন আদিদেব। কিছুক্ষণের জন্য আমাদের দু’জনের কারো মুখেই কোন কথা সর’ল না। আমাদের হাতঘড়ির টিকটিক শব্দ কানে আসতে লাগল। যে দৃশ্য আদিদেব এইমাত্র বর্ণিত করলেন তার আকস্মিকতা আর ভয়াবহতা বোধ করি আমাদের চেতনাকেও ক্ষণিকের জন্য গ্রাস করেছিল। টেবিলে রাখা হ্যাজাকের সবুজাভ আলো দিয়ে তৈরী হওয়া ছায়াগুলো যেন আরও গাঢ় হয়ে ঘিরে ধরছে আমাদের। বাইরের বৃষ্টির গুঞ্জন একটু বেড়েছে বলে মনে হল। কয়েক সেকেন্ড এভাবে কাটার পরে আমাদের মুখের উপর চকিতে দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে ফের গল্প শুরু করলেন আদিদেব রুদ্র —

‘এই ঘটনার পর অনেকদিন পার হয়ে গেছে। তা ধ’র … প্রায় পাঁচ বছর। ছোট-বড় অনেক ঘটনা ঘটেছে। আমার বয়স তখন প্রায় তিরিশ-বত্রিশ হবে। এরই মধ্যে ম্যাজিক ছাড়াও আমি বিভিন্ন গুপ্তবিদ্যা আর পরলোকচর্চার দিকে সামান্য ঝুঁকেছি। ওই লাইনে মনের মত ওস্তাদের সন্ধানে ঘুরে বেড়াই, অল্পাহার-অনাহারে দিন যায়। আগেই বলেছি, বাড়ির বালাই ছিল না। আর এই বাড়িখানা তো এসবের অনেক পরের কথা। তা সেই সময়ে ঝোলা কাঁধে পথে-পথেই ঘুরতাম। কোথাও কখনও মেলা বা লোক সমাগম দেখলে একটা গাছের তলা বা কোন শেড খুঁজে নিয়ে তার তলে খেলা দেখাতাম, তাতে অল্প কিছু টাকা হত। খুব টাকার দরকার হলে স্টেশনেও চাদর বিছিয়ে খেলা দেখিয়েছি। অনেকসময় বিভিন্ন মন্দির এমনকি কখনও কখনও দরগাতেও আমায় আশ্রয় নিতে হয়েছে যাতে টাকা ছাড়া-ই একপেট খাওয়ার ব্যবস্থাটা হয়ে যায়। কোনো লজ্জা বা ধর্মীয় কুসংস্কার বোধ করিনি। পুরো ভবঘুরের জীবন বলতে যা বোঝায় আরকী! ট্রেনের সেই অভিজ্ঞতার কথা নানান চিন্তার কারণে অনেকটা ভুলেও গিয়েছিলাম। এই অবস্থায় একদিন কার-এক মুখে যেন শুনলাম যে আমাদের রাজ্যের উত্তরের এক জেলার ভেতরদিকের একটা গ্রামের কোনো এক মন্দিরকে কেন্দ্র করে অঘোরচতুর্দশীর সময়ে নাকি একটা তিনদিনব্যাপী অতি পুরাতন মেলা বসে। এবং সেখানে নাকি ওই সময়ে বহু তান্ত্রিক, সাধু সব এসে জড়ো হয়। মন্দিরের নাকি দারুণ মাহাত্ম্য আর নাম! আমার হাতে বিশেষ কাজ ছিল না। শিক্ষকের অভাবে শিক্ষা বিলম্বিত হচ্ছিল। মনটা সেজন্য বেশ অস্থির ছিল। এভাবে দিন কাটালে তো কিছুই শেখা হবে না! আতিপাতি ম্যাজিক দেখিয়েই জীবন কেটে যাবে। তাই ভাবলাম, দেখি না একবার গিয়ে! কপালে থাকলে ভালো কাউকে পেয়েও যেতে পারি! কিন্তু কপালে যে কি দুর্ভোগ ছিল তা তখন যদি জানতাম!

হুগলী থেকে সেই গ্রামের দূরত্ব প্রায় ১৪০ কি দেড়শ’ কিলোমিটার হবে। ট্রেন থেকে নেমে একটা বাসে করে ঘন্টাখানেক যেতে হয়। তারপর হাঁটা। ট্রেনে ম্যাজিক দেখিয়ে যাত্রার ভাড়া প্রায় উঠে গেল। কিন্তু বিকেলের দিকে মেলায় পৌঁছে আমার মন ভেঙে গেল। কোথায় তান্ত্রিক, কোথায় সাধু! একরাশ তেলেভাজার দোকান, খেলনার দোকান, নাগরদোলা — খালি এইসব। হতাশ হয়ে মন্দির দর্শনে গেলাম। তখন সবে মন্দিরের দরজা সান্ধ্যপূজার প্রস্তুতির জন্য খোলা হচ্ছে। একচালার পুরোনো আমলের মন্দির। বাইরে লাগানো ফলক থেকে জানলাম যে প্রায় আড়াইশো বছর আগে আজকের দিনে এই গ্রামের জমিদার বংশের এক বধূ স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। আগে এখানে পুজোর রাত্রে একশোর বেশী মোষ বলি হত, কিন্তু এখন সেই প্রথা আর নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি ভেতরে গিয়ে কালী মায়ের নিকষ কালো মূর্তির সামনে প্রণাম করলাম। বামা কালীর চরণে মাথা ঠেকিয়ে উঠতে-না-উঠতেই দেখি এক টাক-মাথা প্রৌঢ় ভদ্রলোক ঠিক আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাঁর রক্তবর্ণ বেশ আর গম্ভীর মুখমন্ডল দেখে মনে হল তিনি হয়ত মন্দিরের প্রধান সেবায়েত হবেন। সটান আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ইটভাটার মাঠে চলে যাও। খবর আছে।’ এইটুকু বলেই তিনি গর্ভগৃহের ভেতরের অন্ধকারে বিলীন হয়ে গেলেন। আমি আর তাকে দ্বিতীয় প্রশ্ন করার সুযোগ পেলাম না। অচেনা মন্দিরের ভেতরে ঢোকা সহজ নয়, ঝামেলা হতে পারে। তাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা আর দুই-একবার ডাকাডাকি করার পরেও যখন সেই লোকের দেখা পেলাম না তখন মন্দির ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। মাঠে না হয় গেলাম, কিন্তু খবর কিসের?

আলো তখন ম্লান হয়ে এসেছে। মেলায় জনসমাগম বাড়তির দিকে। কিন্তু মন্দিরের সেই লোকটার বলা কথা আমি কেন জানি না ফেলতে পারলাম না। ইটভাটার মাঠে যাওয়ার বাসনা একপ্রকার আমার ঘাড়ে চেপে বসল। একটু এদিক-ওদিক চাইতেই একটা স্থায়ী চা-এর দোকান চোখে পড়ল। সেখানে গিয়ে ইটভাটার মাঠ কোনদিকে জিজ্ঞেস করতেই দোকানদার বলল, ‘সামনের ওই রাস্তা ধরে সোজা চলে যান। কিছুদূর গিয়ে একখানা বিশাল বটগাছ পড়বে। সেটার গা দিয়ে যে রাস্তাটা বাঁ দিকে গেছে, ওটা দিয়ে সিকিমাইলখানেক গেলেই ইটভাটার মাঠ। হেঁটে অনেক সময় লেগে যাবে। ওদিকে বাস-টাস যায় না, তবে গরুর গাড়ি পেলে নিয়ে নিতে পারেন।’

মেলার সামনে অনেক গরুর গাড়ি-ই যাতায়াত করছিল। কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও এমন কোন গাড়ি পেলাম না যেটা ইটভাটার দিকে যেতে রাজী হয়। কারণ জানতে চাইলে শুনলাম এমনিতেই ওখানে লোকবসতি প্রায় নেই বললেই চলে, ইটভাটার শ্রমিকরা পায়ে-হেঁটে যাতায়াত করে। তার উপর এইসময়ে ওইদিকে নাকি কোন যাত্রী পাওয়ার সম্ভাবনাই মেই। তাই শুধু একজন যাত্রীর জন্য গাড়ি ওইদিকে যাবে না। শেষ পর্যন্ত একটা গাড়ি আমাকে সে-ই বটগাছটা অবধি ছেড়ে দিতে রাজী হল। আমায় নামিয়ে দিয়ে সে বটগাছের ডানসাইডের রাস্তা ধরে নিজের বাড়ি চলে যাবে। মন্দের ভালো ভেবে উঠে পড়লাম তার গাড়িতে।

কিছুটা রাস্তা যেতেই আমি বুঝতে পারলাম, এই এলাকায় সত্যিই লোক থাকে না। রাস্তার দুই ধারে ঘন গাছপালা, কখনও কখনও দূর-দূর অবস্থিত একটা-দুটো পরিত্যক্ত ঝুপড়ি অথবা ভাঙা টালির ঘর। সেগুলোও জঙ্গলের গ্রাসে যেতে বসেছে। এছাড়া দোকান-বাজার কিচ্ছু নেই। পথে একটা লোক পর্যন্ত দেখলাম না। ভাবলাম, বাপ রে! পরে এখান থেকে একলা ফিরব কি করে?গাড়ির চালককে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা, ইটভাটার মাঠ থেকে স্টেশনে যাওয়ার রাস্তা কি এটাই, নাকি আর কোন পথ আছে?’

চালক আমার দিকে মুখ না ঘুরিয়েই উত্তর দিল, ‘এই রাস্তাতে আসতি পারেন। তবে হেঁটে আসতি হবে, গাড়ি পাইবেন না। নাহলে মাঠের অন্য দিক … মানে, এখন যেখানে আপনারে নামামু, সেখান থেকে সোজা গিয়া তো আপনি ভাটার মাঠে পৌছাইবেন। তার পরে সেই মাঠের ঠিক উলটা দিকের পথ বরাবর দশ মিনিট হাঁইটা গেলে পরে নালার উপরে একখানা রেলের বিরিজ দেখতে পাইবেন। আমরা কই লালবিরিজ। জং পইরা পুরা লাল হইয়া গেছে— তাই এমন নাম। তা ওই বিরিজটায় উইঠা সেটারে পার কইরলেই সামনে, একটু দূরে পেলাটফরমের আলো দেখতে পাইবেন’খন। ওটাই সোজাপথ, দিন থাকতে ভাটার সব কাজের লোক ওখান দিয়াই আসে-যায়। লালবিরিজ দিয়া দিনে মোট ট্রেন যায় দুইখান, মানুষ চলে বেশী। ভাটায় যারা কাজ করে তাগো সকলের রাস্তাই ওই বিরিজখান। বুঝলেন কিনা!’

— ‘কিন্তু এভাবে রেলব্রীজ দিয়ে চলা তো বিপজ্জনক! মানে, ট্রেন চলে এলে? … তাছাড়া, ব্রীজে লোকে চড়ে কিভাবে?’

— ‘না না … যারা যায় তারা গাড়ির টেম জানে। কাজের মানুষের অত ভয় পাইলে কি আর চলে বাবু? তাছাড়া নীচে তো নালার জল, যাইবে কি করে? অন্য পথ দিয়া যাওয়া যায় বটে তবে অনেক ঘুইরা যাইতে লাগে। তার চেয়ে বিরিজের পাতে পা দিয়া যাওয়া খুব সোজা … আর এ বিরিজে ওঠার তরে সিঁড়ি আছে গো বাবু … সরকারী সিঁড়ি নয়, বহু আগের জমিদাররে সবাই ধইরা-বাঁইধা সিঁড়িখান বানাইছিল যাতে যাইতে-আসতে একটু সময় বাঁচে … তা সে অনেক কাল আগের কথা …’

বুঝলাম, বিনা পারমিটে বানানো সিঁড়ি। যাকে বলে, আন-অফিসিয়াল। সরকারের দেখার সময় নেই, মূর্খ লোকেরও ‘সুবিধা’। তবে ওরকম সিঁড়িওয়ালা ব্রীজ আমি আর কখনো দেখিনি বাপু …

আরও মিনিট পনের বাদে একটা বিরাট বটগাছের সামনে আমাকে একলা নামিয়ে দিয়ে সেই গরুর গাড়ি ডানদিকের একখানা রাস্তা ধরে দেখতে দেখতে দূরে মিলিয়ে গেল। আমি আর সময় নষ্ট না করে বাঁদিকের রাস্তা ধরে খুব দ্রুত পদক্ষেপে এগোতে লাগলাম। আজ যেভাবেই হোক, পুরোপুরি সন্ধ্যে নামার আগে আমায় মাঠে পৌছাতে হবেই।

কিন্তু কিছুটা হাঁপাতে হাঁপাতে সেই ইটভাটার মাঠের সামনে যখন পৌছলাম তখন ভালোরকম অন্ধকার নেমে গেছে। আমার মাথার উপর দিয়ে তখন খুব ফিকে নীল একটা প্রভা ভাটার ধোঁয়া-ওঠা তর্জনীতুল্য এক সুউচ্চ চিমনির ওপারের দিগন্ত পর্যন্ত অগণিত তারা বুকে নিয়ে জেগে রয়েছে। দেখলাম, মাঠ আসলে একটা নয়, দুটো। অপেক্ষাকৃত বড় মাঠখানার একটা সাইডে একখানা ইটভাটা। বিশাল চিমনিটা ছাড়াও স্তরে স্তরে সাজানো কয়েক পাঁজা ইট সেই কথার পুষ্টিকরণের পক্ষে যথেষ্ট। সেই মাঠটার পরে একখানা খুব সরু মাটির রাস্তা, আর সেই রাস্তার অন্যধার থেকেই আরেকটা মাঠের শুরু। সেই ছোট মাঠের দৈর্ঘ্য প্রস্থের প্রায় তিনগুণ হবে। মাঠখানা শেষ হয়েছে জঙ্গলের ভেতরে। ওই মাঠের প্রস্থ বরাবর তাকাতেই অনেকটা দূরে আমি একটা রেলের ব্রীজ দেখতে পেলাম। মাটি থেকে আন্দাজ পঁচিশ-ত্রিশ ফুট উঁচুতে ঝুলে থাকা ব্রীজখানার ধারেকাছে কোন আলো চোখে পড়ল না। দেখে মনে হল, অত্যন্ত ক্ষীণপ্রভ আকাশের পটে বিশালাকার কোন প্রাগৈতিহাসিক জানোয়ারের কঙ্কাল যেন নিঃসাড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ব্রীজের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আমি এইবার মাঠগুলোর দিকে মন দিলাম। পা চালিয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। কিন্তু কোথায় কি! অন্ধকারে ঢাকা ঘাসজমি আর ওই ভাটাখানা ছাড়া কাছাকাছি আর কিছুই তো নেই। খালি আশেপাশে কোথাও একটা কতগুলো ঝিঁঝিঁপোকা একনাগাড়ে মৃদু তানে ডেকে চলেছে। এতক্ষণে একটা কথা মনে আস’ল আমার। কি করতে এসেছি আমি এখানে? কার হদিশ চাই? ঠিক কাকে খুঁজছি? ওই অবস্থায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই হঠাৎ নিজেকে অসহায় আর হারিয়ে-যাওয়া বলে মনে হতে লাগল।

কিভাবে ফেরার পথ ধরব, মানে ব্রীজের দিকে যাব নাকি যে পথে এসেছি সে-ই রাস্তাতেই যাব এই কথা ভাবছি — এমন সময় আমার পেছন থেকে খুব ঠান্ডা আর রুক্ষ কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘কৌন হ্যায় তু? কেয়া চাহাতা হ্যায়?’

আমি চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকালাম। চেয়ে দেখি, একটা কিম্ভুত চেহারার লোক কখন যেন আমার কয়েকহাত পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। বিকট তার চেহারা। এত রোগা লোক আমি তার আগে কখনও দেখিনি। লোকটার উচ্চতা কম নয়, কিন্তু বাঁ কাঁধটা সামান্য ঝুঁকিয়ে দাঁড়ানোর ফলে একটু বেঁটে লাগছে। লোকটার মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল, মাথায় ঘন জটা। শরীরের দুই পাশ দিয়ে যে দুটো কঙ্কালসার হাত ঝুলে রয়েছে তার একখানায় হাত দেড়েক লম্বা এক লাঠি আর সেই লাঠিটার মাথায় অদ্ভুত নীল আর হলুদ শিখার আগুন জ্বলছে। আগুনটার তাপ, আলো কিছুই যেন নেই। খালি নীল রঙের একটা ছোটো সপ্রভ বৃত্ত কেবল সেই লোকটাকেই ঘিরে রেখেছে। আগুনের এই রূপ আর রঙ তখন আমার অচেনা ছিল। কেমন যেন অন্ধকার দিয়ে বানানো একটা আলো। সে যাই হোক, ওই অদ্ভুত নীল আলোতেই দেখলাম, লোকটার খালি গা, গলায় বেশ কিছু পুঁতিজাতীয় জিনিসের মালা, দেহের নীচের অংশে একখানা লাল রঙের ময়লা কাপড় জড়ানো। আধো অন্ধকারে গায়ের রঙ বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু মনে হল সেটাও খুব উজ্জ্বল নয়। তবে চোখদুটো মারাত্মক! ধকধক করে জ্বলছে যেন।বলতে লজ্জা নেই, দারুণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। একে অন্ধকার জনবিরল অচেনা জায়গা, তার উপর ওই ভয়ানক মূর্তি! অনেকক্ষণ লোকটার জবাবে আমার মুখ দিয়ে কথা সর’ল না।

আমাকে চুপ থাকতে দেখে কিনা জানি না, সেই লোকটা সেইরকম ঝুঁকে থাকা অবস্থাতেই এগিয়ে আসতে লাগল। আরও ভয় পেয়ে গেলাম। ভয়ের চোটে কয়েক পা পিছিয়ে যেতেই সেই লোকটা প্রথমে দাঁড়িয়ে গেল। কি যেন দেখল কয়েক সেকেন্ড।তারপর আমার দিক থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে সে নিজের ঝুঁকে থাকা বাঁ কাধটার দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে নজর ঘোরা’ল। যেন কেউ তাকে ওদিক থেকে ডাক দিয়েছে। দু-এক সেকেন্ড বাদে আচমকা সে ফের নজর ঘুরিয়ে সোজা আমার দিকে তাকিয়ে ঘরঘরে গলায় বলল, ‘মওৎ স্যর পে হ্যায় তেরে! লওট যা! লওট যা আভি!’ ’

হঠাৎ একটা ঠান্ডা হাওয়ার স্রোত ঘরের ভেতর ভেসে এল সেই খোলা জানালার পথ ধরে। হাওয়ার তোড়ে জানালার পর্দাটা একটা তরঙ্গ তুলে নড়ে উঠল। আদিদেব গল্প থামিয়ে সেই দিকে চেয়ে চুপ করে গেলেন। বাইরের দিকে এখন তার চোখ। বাতায়নের পরপারে দাঁড়িয়ে থাকা ধূসর আকাশের গায়ে অতীতের সেই সময়টাকেই যেন তিনি আরেকবার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন। সেই ইটভাটার মাঠ, সেই কিম্ভুত চেহারার লোক, সেই নীল আলো।

আদিদেবের মৌনতায় অধৈর্য হয়েই হয়ত সমর একসময় বলে উঠল, ‘তারপর?’

জানালার থেকে চোখ না সরিয়েই ধীরকণ্ঠে গল্পে ফিরলেন আদিদেব, ‘আমার অবস্থা তখন অনেকটা বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে শ্মশানে একলা রাত কাটাতে যাওয়া অল্প সাহসী ছেলের মত। ঝোঁকের বশে চলে তো এসেছি, এখন বিভীষিকার হাত থেকে পালাতে পারলে বাঁচি। কেউ একবার ফিরতে বললেই হল! সেইজন্যই সেদিন লোকটার আদেশের সুরে বলা কথাগুলো আমার কাছে অনুমতি বলে মনে হয়েছিল। আমি বাঁদিক বরাবর জোরে হাঁটা দিলাম সেই ব্রীজটার দিক লক্ষ্য করে। লোকটার থেকে কয়েক ফুট দূরে যেতে না যেতেই ফের পিছন থেকে ডাক এল, ‘শ্যুন!’ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কানের পাশ দিয়ে একটা ঘামের ধারা সরীসৃপের গতিতে ঘাড়ের দিকে নামতে লাগল। ভয়ে ভয়ে পিছন ফিরলাম। আমি পিছন ফিরতেই লোকটা বলল, ‘ডরনা মাৎ। তেরে করম আচ্ছে হ্যায়। বাচ জায়েগা। পর ডরনা মৎ।যা আব, লওট যা!’ কথা শেষ হওয়া মাত্র সেই মূর্তি আমার চোখের সামনে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমার এটাই দেখা বাকী ছিল হয়ত। এইবারে আমি হাঁটা ছেড়ে দৌড় লাগালাম সেই লালব্রীজের দিক লক্ষ্য করে। খোলা মাঠের মধ্যে দিয়ে ছোটার সময় ঠান্ডা হাওয়া হু হু করে এসে আমার চোখে-মুখে ঝাপটা মারতে লাগল। মনে হচ্ছিল, কোনো অশুভ ঝড় এসে যেন গ্রাস করছে আমাকে। কয়েকবার হোঁচট খেয়ে মাটিতেও পড়ে গেলাম। কিন্তু থামলাম না। থামলাম সোজা রেলব্রীজটার কাছে পৌঁছে। ব্রীজটা মাটি থেকে আন্দাজ পঁচিশ ফুট উঁচুতে। সেটার নীচ দিয়ে একখানা চওড়া নালা বয়ে চলেছে। নালার কালো, নোংরা জলটা দেখে কেন-জানি-না প্রচন্ড গা ছমছম করে উঠল। দম নিতে নিতে নজরে এল, আমার দৃষ্টি বরাবর অবস্থিত যে দুটো পেল্লায় থামের উপর লোহার ব্রীজখানা দাঁড়িয়ে আছে তাদের একটার সাইড দিয়ে লোহার একখানা লড়ঝড়ে সিঁড়ি ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে সেটার উপরের দিকে। বুঝতে পারলাম ব্রীজের উপরে ওঠার একমাত্র উপায় ওই সিঁড়িটাই। ভয় পাইনি বলব না, কিন্তু সেইসময় পালানোর বিকল্প রাস্তাও ছিল না আমার কাছে।

মিনিট পাঁচেক পরে ব্রীজের উপরের লাইনের পাতে পা দিলাম আমি। ব্রীজ কিন্তু একেবারেই চওড়া নয়। যতটা ট্রেন, প্রায় ততটাই ব্রীজের প্রস্থ। ব্রীজের উপরে হাওয়ার বেগ আরও বেশী মনে হল। হওয়ারই কথা।অন্ধকার আকাশ আর তার বুকে জ্বলতে থাকা তারাদের আমার কয়েক ফুট মাত্র নীচে থাকা পৃথিবীর থেকে বেশী কাছের বলে মনে হতে লাগল। ব্রীজে পৌঁছে দুই পাশে মাথা ঘোরাতেই আমার বাঁ দিকে অনেকটা দূরে প্ল্যাটফর্মের টিমটিমে আলো নজরে এল। সবটা দেখে বুঝতে পারলাম, ব্রিজটা মোটামুটিভাবে পঞ্চাশ-ষাট ফুট দীর্ঘ হবে, কিন্তু তারপরেও অনেকটা লাইন অতিক্রম করলে তবেই স্টেশনে পৌঁছানো যাবে। পাতে পা ফেলে তো আর দৌড় দেওয়া চলে না, কাজেই সব মিলিয়ে কম-সে-কম প্রায় ছ’-সাত মিনিটের ব্যাপার। গরুর গাড়ির চালক ঠিকই বলেছিল, কিন্তু প্ল্যাটফর্ম যে এতটা দূরে হবে এটা আমি আগে আন্দাজ করতে পারিনি। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। তাই সেই আলো লক্ষ্য করে সাবধানে মেপে মেপে পা ফেলতে লাগলাম।

ব্রীজের প্রায় মাঝামাঝি পৌঁছানো মাত্র একটা ঠান্ডা হাওয়া খসখস করে আমার গায়ের উপর দিয়ে চলে গেল। সেটার ভেতর দিয়ে কার যেন একটা ঘড়ঘড়ে অথচ মিহি গলা শুনতে পেলাম, ‘ডরনা মৎ … ডরনা মৎ …’ … আমার গায়ের সমস্ত লোম এক পলকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আর একখানা তীক্ষ্ণতর শব্দ দূর থেকে এসে আমার কানে লাগল। সেটা কিসের আওয়াজ বুঝতে আমার খুব সময় লাগল না। ট্রেনের হুইসেল! আমার শরীর জমে গেল এক নিমেষে। পরের মুহূর্তেই দূর থেকে আসা ফানেলাকৃতির এক উজ্জ্বল হলদে আলো দেখতে পেলাম আর পরক্ষণেই দানবীয় কোন সরীসৃপের মতন দ্রুত এগিয়ে আসতে থাকা ট্রেনখানাও চোখে পড়ল আমার। গতি দেখে থ্রু গাড়ি বলেই মনে হল। খুব তাড়াতাড়ি আমার দিকে এগিয়ে আসছে সেটা। এদিকে ব্রীজে সরে দাঁড়ানোর জায়গা বিশেষ নেই। ফেরাও সম্ভব নয়, কেননা ট্রেনটা সেইদিক থেকেই আসছে।পালানো ছাড়া বাঁচার রাস্তা নেই। কিন্তু সারা শরীর পালাতে চাইলেও আমার পা নড়ছিল না। কেউ যেন সেগুলোকে ওই রেলব্রীজের সাথে বেঁধে ফেলেছে। মৃত্যু কি এভাবেই টেনে ধরে তার গ্রাসকে? এদিকে ট্রেন এখন হুইসেল বাজিয়ে আমার আরও কাছে এগিয়ে এসেছে। ইঞ্জিনের শব্দ কানে খুব জোরে এসে লাগছে। আমার নড়ার ক্ষমতা যেন কোনোকালেই ছিল না। তখনও পাথরের মূর্তির মত নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি। আরেকবার সজোরে হুইসেল দিল ট্রেনটা। আমার কানে তালা লেগে গেল সেই আওয়াজে। কেঁপে উঠল ব্রীজটা।এইবারে ট্রেন ব্রীজে পা দিয়েছে। বাবা-মা’র মুখ মনে পড়ে গেল। পরক্ষণেই সামনে চেয়ে হলুদ আলোয় ধাঁধিয়ে গেল চোখের ঘোলা দৃষ্টি। আসন্ন বীভৎস আর নিদারুণ বেদনাময় উপলব্ধির কথা ভেবে ঈশ্বরকে স্মরণ করে চোখ বন্ধ বুজলাম আমি।

কিন্তু কিছুই হল না। আচমকা অনুভব করলাম, ট্রেনের গতি কমে আসছে যেন। ইঞ্জিনের আওয়াজও কমে যাচ্ছে। বরং পলকা মতন কি একটা যেন আমার পায়ে এসে থেকে থেকে আলগা গুঁতো মারছে। সাহস করে চোখ খুললাম। চোখ খুলতেই দেখি, আমার সামনে মাত্র পনের-কুড়ি ফুট তফাতে এসে প্রায় দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই ভয়ানক ট্রেন। ‘প্রায়’ বলছি কারণ তার গতি মোটামুটি শূন্যের কাছাকাছি, কোনো কারণে ব্রেক মেরেছেন চালক। সুখবরটা পুরোপুরি হজম হওয়ার আগেই আমার পায়ে ফের সেই গুঁতো এসে লাগল। বিস্তৃত হলুদ আলোতে মৃত্যুস্বরূপ সেই ট্রেনের দিক থেকে নজর কোনোমতে নিজের পায়ের কাছে ঘোরাতেই দেখতে পেলাম, একখানা প্লাস্টিকের খেলনা রেলগাড়ি কোনো অদৃশ্য চালকের হাতের টানে একবার ট্রেনের দিকে এগোচ্ছে আবার পিছিয়ে এসে আমার পায়ে ঠোক্কর মারছে। অনেকটা যেন একবার সামনের ট্রেনটাকে থামতে বলছে আর ঠিক তার পরের মুহূর্তেই আমাকে ঘোর থেকে জাগিয়ে তুলে পালাতে বলছে। খেলনা ট্রেনটার দিকে তাকানো মাত্রই বিস্ময়, ভয়, আনন্দ সব একসাথে দলা পাকিয়ে উঠল আমার মনের ভেতরে। এটা কোথা থেকে এল? এটা নড়ছে কিভাবে? আগেও কোথায় যেন দেখেছি এটাকে! … হঠাৎ আমার ডান কানের গোড়ায় অস্পষ্ট স্বরে কে যেন বহু দূর থেকে হাততালি দিয়ে সরু গলায় বলে উঠল, ‘ভ্যানিস!’ চমকে উঠলাম। মুহূর্তের মধ্যে আমার মনে পড়ে গেল কয়েকবছর আগের ট্রেনে দেখা সেই মা আর ছেলের কথা, তাদের পরিণতির কথা। সেই ছেলেটার হাতেও তো এরকম একটা … এতক্ষণে যেন প্রাণ ফিরল আমার পা দুটোতে। প্রথমে ধীরে ধীরে আর তারপরেই যত জোরে পারি দৌড় দিলাম স্টেশনের আলো লক্ষ্য করে।

কিছুক্ষণ পরে হাঁফাতে হাঁফাতে আমি যখন প্ল্যাটফর্মের মাটি ধরে বসে পড়লাম ট্রেনটা তখনও সেইভাবে ব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ বাদে ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়ার শব্দ শুনতে পেলাম। ফের চলতে শুরু করল ট্রেনটা। কয়েক লহমা বাদে নিশুতি রাতের শুনশান প্ল্যাটফর্ম কাঁপিয়ে চলে গেল ট্রেনখানা। আমি প্ল্যাটফর্মের মাটিতে বসে হাঁ করে চেয়ে রইলাম সেই দিকে। ট্রেন চলে যাওয়ার পরেই যেন দেখলাম লাইনের অন্যপাশে একখানা ঝাঁকরা গাছের অন্ধকার-ঢাকা অবয়বের নীচে দুটো অস্পষ্ট মূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটা মূর্তি মাঝারি উচ্চতার, আরেকটা আমার কোমর সমান হবে। কেন জানি না মনে হল, তারাও আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমি হঠাৎ-ই চোখ বুজে সেইদিকে হাত জোড় করে মনে মনে বললাম, ‘ধন্যবাদ।’ সহসা একটা জোর হাওয়া দিল। আমি চোখ খুলে সেই গাছটাকে দেখতে পেলাম, কিন্তু তার নীচে তখন আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই।

পরেরদিন ভোরের একটা ট্রেনে চেপে আমি ফেরার রাস্তা ধরি। তারও পরের দিন রাস্তার একটা চায়ের দোকানে বসে খবরের কাগজের পাতা উল্টাতে গিয়ে ছোট্ট একটা ট্রেন বিভ্রাটের খবরে আমার চোখ আটকে যায়। খবরটা পড়ে আমি তো থ। লিখেছে, গত পরশু রাত্রের উত্তরগামী এক দূরপাল্লার ট্রেন লালব্রীজের উপর আচমকাই দাঁড়িয়ে পড়ে। নিকটবর্তী হল্টে পৌঁছানোর আগে অনেকক্ষণ ডিলে-ও করে। তার জন্যই নাকি কাল অবধি এই লাইনের অনেক ট্রেন দেরীতে চলেছে। যাত্রীরা সমস্যায় পড়েছেন। রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে তাদের পাওয়া রিপোর্ট অনুসারে, সেদিন রাতে সিগনাল মেনে লালব্রিজ ক্রস করার সময় ওই গাড়ির চালক নাকি হঠাৎ এক-ই লাইনের উপর দিয়ে ঠিক তার উলটো দিক থেকে আরেকটি রেলগাড়িকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখতে পান। সেইজন্য তিনি ট্রেন থামাতে বাধ্য হন। কিন্তু ওই সময় ওই লাইনে অন্য কোনো গাড়ির থাকার কথা নয়। ওই গাড়ির চালকের সাথেও তিনি যোগাযোগ করতে পারেন নি। শেষমেশ লাল নিশান দেখাবার জন্য তিনি নিজে গাড়ি থেকে নামেন কিন্তু নামার পরে তিনি নাকি আর কোনো ট্রেন দেখতে পাননি। এরপরে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে, বারবার সিগনাল চেক করে নিয়ে ফের ট্রেন চালু করেন তিনি। ব্যাপারটা কোনোভাবে উপরমহলে পৌঁছে যায়। ইতিমধ্যে ড্রাইভারের মেডিক্যাল টেস্ট করা হয়েছে। রিপোর্টে অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কাগজ ভাঁজ করে রেখে ভেবেছিলাম, ওই হতভাগ্য চালকের মেডিক্যাল রিপোর্টে যে অস্বাভাবিক কিছুই পাওয়া যাবে না — এটা আমার চেয়ে ভালো আর কে-ই বা জানে! …

তা বুঝলে, এই হচ্ছে ব্যাপার! এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পেয়েছিলাম যে জীবনে যেটুকু করব ভালো কাজ করব, লোকের উপকারের চেষ্টা করব। আমাদের সব কাজ কোনো অদৃশ্য রেকর্ডারে রেকর্ড হচ্ছে হে … রিওয়াইন্ড অ্যান্ড প্লে ব্যাক এর মতন সময়মাফিক তার প্রতিফল আসবেই …… এটাই হয়ত কর্মফল।’

কাহিনী শেষ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আদিদেব। আমি সমরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে হাঁ করে আদিদেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ওর ঘোর কাটাতে হাঁটু দিয়ে ওর হাঁটুতে আলতো ধাক্কা মারলাম। ও সজাগ হল। তারপর আমার এখানে আসার আগে থেকে শেখানো মত পকেট থেকে একখানা একশো টাকার নোট আর একটা কাঁচা টাকা সম্বলিত সাদা খাম বের করে এনে আদিদেবের পায়ের কাছে রেখে দিল। সেটা দেখে ফের খিলখিল করে হেসে উঠলেন আদিদেব। তারপর বললেন, ‘বাহ! বন্ধু ট্রেনিং দিয়েই এনেছে দেখছি। তোফা! … ঠিক আছে, এটাকে অগ্রিম ধরলাম। বাকীটা চাকরি পাকা হওয়ার পরে। মানে এই ধ’র গিয়ে … পরের পরের মাসের তৃতীয় রবিবার দশটি নলেন গুড়ের রসগোল্লা আর এক কেজি মিষ্টি দই পাওনা রইল কিন্তু! কেমন?’ তারপরেই সমরের দেওয়া খামটাকে সটান ডানহাতে তুলে নিয়ে সেটাকে দুই আঙুলে ধরে নাড়াতে নাড়াতে বললেন, ‘দেখা যাক। তোমার এই কর্মফলের দৌড় ঠিক কতখানি!’ এইটুকু বলে চোখ নাচিয়ে তার সেই শিশুসুলভ অথচ গা-শিরশিরে হাসিটা আবার হাসতে লাগলেন আদিদেব রুদ্র।

 

বাড়ি ফেরার পথে সমরকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘কি রে? গল্পটা চলবে?’

সমর মুখ নামিয়ে হাঁটছিল। সে ওইভাবেই শুধু বলেছিল, ‘ কাল একবার লাইব্রেরী যেতে-ই হবে। পার্টিশনের ওপর কিছু বই তোলা সত্যি-ই খুব দরকার দেখছি … ’

[বানানবিধি/মতামত লেখকের নিজস্ব]

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2021 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ