03 Nov

একজন কুকুরের জবানবন্দি

লিখেছেন:সমীর ঘোষ


এভাবে যে ধীরে ধীরে আমি একটা হই হই কাণ্ডের মধ্যে ঢুকে পড়ব তা কোনওদিন স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি। কোনও একটা ঘটনা, তার প্রভাব, তার অভিঘাত যে এরকমভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে সে কথা ভাবতে আজ আমার কেমন যেন আশ্চর্য লাগে। কীভাবে যেন কী হয়ে গেল? আজ প্রতিটা মানুষ শিউরে উঠছে আমার বলা কথা শুনে। বলছে এও কী সম্ভব ? এতটা নৃশংস হবে মানুষ ? তার কাছে মনুষ্যত্যের কোনও দাম নেই ? সম্পর্কের কোনও মূল্য নেই, ভাবনার কোনও স্থান নেই ? নিজের ইচ্ছেটাই সব ? নিজের ভোগটাই চরম কাঙ্খিত ? আর কিছুই কিছু নয় ? প্রথম প্রথম আমারও খুব অবাক লাগত। ভাবতাম মানুষ কেন এমন হয়। আমি তো রাস্তার পশু,নরকের জীব। লাথ খাওয়া পার্টি। তু তু করে ডাকলেই চলে যাই। যে দুটো উচ্ছিষ্ট  খেতে দেয় আমি তার। এসব পেলেই ল্যাজ নাড়তে থাকি। বহত খুব। একটু আদর। একটু ভালবাসা পেলেই গোলাম বনে যাই। অন্নদাতার পায়ের কাছে গিয়ে কুঁইকুঁই করতে থাকি। ভাবি এ আমার কত জন্মের ফল। ভাবি কী করে ঋণ শোধ করব বুঝে পাই না। মাঝে মাঝে বিলকুল ভুল হতে যায়। কাল যে মানুষটা উচ্ছিষ্ট খাবারটা দিয়েছিল আজ যে তার কাছে গিয়ে লাঠিপেটা খেতে হবে তা বুঝতে পারি না। ভাবি শালা মানুষ বড় বিচিত্র। কখনও ভালবাসে। আমার মত কুত্তাদের রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে শোওয়ার ঘরে স্থান দেয়। আবার কখনও লাথি মারে। গায়ে গরম জল ঢেলে দেয়। এক কথায় পাক্কা হারামি। আজ এত কথা বলছি তার কারণ আমার কথা সবাই শুনতে চাইছে বলে। কয়েকজন মানুষের কার্যকলাপ নিয়ে একটা কুকুর কী বলছে তা জানতে হামলে পড়েছে গোটা সমাজ। ক্যামেরা তাক করে রেখেছে মিডিয়া। বলছে এরকমটা নাকি আগে কখনও হয়নি। কুকুরের মত জেনে বিচারক তাঁর রায় দিচ্ছেন এরকমটা পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটেনি। আজ গোটা সোসাইটি জুড়ে এমন চাপা গুঞ্জন শুনে আমারও সেইরকমই মনে হয়েছে।

[২]

এই ঘটনার সূত্রপাত বছর দশেক আগে। তখন আমি নেহাতই শিশু। এই কলকাতারই একটা গলিতে আমাদের বেড়ে ওঠা। বেড়ে ওঠা তো নয়, একটা লড়াই। আমার মাকে ছিল ভারি সুন্দর দেখতে। গায়ের রং সাদা। চেহারাও ছিল দারুন। এলাকার কুকুর দুনিয়ায় সেরা সুন্দরী বললে অত্যুক্তি হত না। চলন-বলনও ছিল আলাদা। একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব ছিল। মায়ের সঙ্গ পাওয়ার জন্য অনেককেই কাছে আসতে দেখেছি। কিন্তু মা সবাইকে পাত্তা দিত না। বেশি কাছে আসার চেষ্টা করলে রাগে গরগর করতে করতে মুখের এমন চেহারা করত যে বীর কুকুরপুঙ্গবেরা পগার পার হয়ে যেত। এমনটা দেখে আমরা খুব মজা পেতাম। আমরা মানে আমাদের ভাইবোন। আমি একমাত্র মেয়ে। বাকিরা সবাই ছেলে। মা একদিন বলল ‘সাত ভাই চম্পা’। মা নাকি রাস্তার কোন একটা মানুষের কাছ থেকে ব্যাপারটা শুনেছে। আমাদের ডাস্টবিনের পাশে জন্ম হওয়ার পর তারাই আলোচনা করছিল। ছোটবেলায় আমরা সকলেই খুব সুন্দর দেখতে ছিলাম। অনেকটা মায়ের মত। ছোট্টখাট্ট, নাদুস-নুদুস। একে অপরকে ঘিরে খেলা করতাম। আমরা ভাই-বোনেরাই ছিলাম আমাদের খেলার সঙ্গী। অনেক সময়েই আমাদের ঘিরে থাকত ছোট ছেলেমেয়ের দল। বলত কী কিউট।মানে না বুঝলেও তাদের চলন-বলন ভঙ্গি দেখে বুঝতাম তারা কেউ কেউ  আমাদের দেখে মজা পাচ্ছে। কেউ কেউ আমাদের হাতে তুলে নিয়ে আদরও করত। চটকাতো। ভাবতাম মানুষগুলো সত্যি খুব ভাল। কিন্তু ওই ভুল ভাঙতে বেশি সময় লাগে নি। সে যাই হোক খুব ছোটবেলায় আমাদের জীবনটা ছিল খুব মজার। তখন ছিল শীতকাল। রাত বাড়লেই আমরা গুটিসুঁটি মেরে এ ওর ঘাড়ের উপর চেপে মায়ের গায়ে উঠে বসতাম। সে যে কী আরাম বলে বোঝানোর নয়। কে যেন এসে ডাস্টবিনের পাশে ইট আর টালি দিয়ে ঘর বানিয়ে দিয়েছিল। প্রতিদিন সকালে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে আমরা ফিরে আসতাম ঘরে। মা খাবার নিয়ে আসত। ভাগাভাগি করে খেতাম। কিন্তু এসব সুখ আমার বেশীদিন সইল না। আমি ছিলাম সাত ভাইয়ের এক বোন। দেখতেও নাকি ছিলাম চমৎকার। সাদা ধবধবে লোম গোটা গায়। আমার চেহারায় নাকি বিদেশী কুকুরের আদল ছিল। একদিন একটা লোক এসে রাস্তা থেকে তুলে নিল আমাকে। সে নাকি আমাকে তার বাড়ি নিয়ে যাবে। ভাল করে আদর যত্নে রাখবে। আমার কান্না পেল। মা কাছেপিঠে নেই। মা এখানে থাকলে লোকটার সাহস হত না আমার গায়ে হাত দেওয়ার। কামড়ে-ছিঁড়ে শেষ করে দিত। বড় অসহায় লাগল। তিন ভাইকে দেখতে পেলাম। ওরাও রাস্তায় দাড়িয়ে কুঁইকুঁই করছে। জানি ওদের কিছু করার নেই। বাকিরা কোথায় জানি না। আমি আমার পরিবার থেকে আলাদা হয়ে গেলাম।চোখের জলে ঝাপসা হয়ে গেল নর্দমা আর ডাস্টবিনের পাশে আমাদের টালি ঢাকা ঘরটা।

[৩]

লোকটার কোলে কোলে কতটা পথ এসেছিলাম জানি না। এসে পড়লাম একটা রাজপ্রাসাদে। বিশাল বাগানওলা একটা বাড়ি। চতুর্দিকে গাছপালা। কারুকাজ করা সিঁড়ি। মেঝেতে পাথর বসানো বড় বড় ঘর। তাতে কারুকাজ করা কাঠের ফার্নিচার। শোবার খাটগুলো দেখবার মতো। বড় বড় আয়না। আক্ষরিক অর্থেই রাস্তা থেকে রাজপ্রাসাদে এসে উপস্থিত হলাম। আমার জন্য দুধ এল, মাছ এল। সকাল সন্ধে খাবারের রুটিন তৈরি হল। সে এক এলাহি ব্যাপার। খুব পছন্দ হওয়ায় যে লোকটা রাস্তা থেকে আমার তুলে আনল সে একটা আধ দামড়া,মোটা। নাম প্রতীম।গায়ের রং ফর্সা কিন্তু গোটা গায়ে লোমে ভর্তি। এক এক সময় আমার মনে হোত আর একটু হলেই লোকটা আমাদের মতো লোমে ঢাকা কুকুর হয়ে যেত। বাড়িতে সব সময় পরে থাকত একটা লাল স্যান্ডো গেঞ্জি আর অতি ছোট হাফ প্যান্ট – যেন একটু উকিঝুঁকি মারলেই ইয়ে দেখা যাবে। লোকটা কাজকর্ম কী করত আমি ঠিক জানি না তবে সব সময় শুয়োরের মত ঘোঁত ঘোঁত করত। যেন কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে কিন্তু কোনও কিছুই মনঃপুত হচ্ছে না। চোখে-মুখে একরাশ বিরক্তি। বিশাল ওই বাড়িতে ওই আধদামড়া ছাড়া থাকত তার বাবা, মা আর এক বোন। সকলেই এই লোমশ মানুষটার ভয়ে সব সময় কুঁকিয়ে থাকত। যেন এক্ষুনি ওনার চাহিদা মত কোনও কিছু হাজির না হলে প্রত্যেককে গুলি করে মারা হবে। ফলে যথাসময়ে দাবি মতো খাবার হোক বা হাত খরচের টাকা হাজির হয়ে যেত। মানুষটার দোতলার ঘরে অন্যকারও প্রবেশাধিকার না থাকলেও আমার সে ঘরে ছিল অবাধ যাতায়াত। বিভিন্ন আলোচনা থেকে আমি যতদূর বুঝেছি মানুষটার বাবা জগদীশ আর মা বাসবী দুজনেই সরকারি চাকরি করতেন। রিটায়ারের পর মোটা টাকার পেনশন থেকেই বেকার ছেলের যাবতীয় শখের বায়নাক্কা সামলাচ্ছেন।

সেই বানাক্কার সুবাদেই ওই বাড়িতে রাস্তা থেকে উঠে গেলাম আমি। আদরের ছেলে প্রতীমের খুব কুকুর পোশার শখ। ইতিপূর্বে ছোট-বড় বিভিন্ন বিদেশী কুকুর ঘুরে গেছে সে বাড়িতে। কোনওটিই থাকেনি বেশিদিন। একটু বড়সড় হতেই কাউকে না কাউকে বেচে দেওয়া হয়েছে সেগুলো। রাস্তায় আমাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে পছন্দ হয়ে যাওয়ায় ‘ইল্লি’ বলে সে তুলে নিয়ে এসেছে। মানুষের এ এক আশ্চর্য গা-জোয়ারি। জগতের সবকিছুই তার। একটা কুকুরের বাচ্চাকে রাস্তা থেকে তুলে আনতে কারো কাছে কোনও কৈফিয়ত দেওয়ারই প্রশ্ন নেই। ব্যাপারটা এমন যেন সে জীবের সেবা করার মহান কাজ করছে। রাস্তাঘাটে ন্যালব্যাল করা একটা নেড়ি কুত্তা, কোন দিন একটা রিক্সা একটা ঠাঙের উপর দিয়ে চাকা চালিয়ে দেবে বা একটা গাড়ি নিতান্ত অবহেলে পিষে দেবে দেহের একাংশ। কেঁউ কেঁউ করতে করতে ফস করে ফেটে যাওয়া বেলুনের মত প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে – তার থেকে এ ব্যবস্থা কী ভাল হল না ? বিশাল বাড়িতে বৃষ্টিতে ভেজা নেই, খুঁটে খাওয়ার ভাবনা নেই, বেপাড়ার কুকুরের সঙ্গে লড়াই নেই। তবে রাস্তার নেড়িকুত্তার বাবুবাড়িতে স্থান পাওয়া নিয়ে দার্শনিক যুক্তি যাই থাক না কেন আমার গোটা ব্যাপারটাকে ঢ্যামনামো বলেই মনে হয়।

তা যাই হোক আমি পৌঁছে গেলাম পেল্লাই বাড়িতে। কারণ আমি নাকি দেখতে অন্য অনেকের থেকে আলাদা। আগেই বলেছি আমার মা ছিল সুন্দরী। কিন্তু বাবা ? আমি আমার বাবাকে দেখিনি। জন্মের পর যে কয়েকমাস রাস্তার আস্তাকুঁড়ে কাটিয়েছি ততদিন বাবার দেখা পাইনি। আমার তখন সে বোধও তৈরি হয়নি। প্রতীম বলত আমার বাবা নাকি নেড়ি কুত্তা না। তার জাত আলাদা। তার প্রভাবই নাকি আমার উপর পড়েছে। কী জানি ভাই, কী ব্যাপার। তবে প্রথম প্রথম খাতির যত্নের কোনও অভাব ছিল না। আমার জন্য দফায় দফায় ভালো ভালো খাবারের বন্দোবস্তো ছিল। বাড়ির লোকে কিছু খাক না খাক আমার খাবার টাইমের একটু দেরিতে এলে বাড়ি মাথায় তুলতো প্রতীম। একবার আমার এঁটো খাবারের থালা সোজা মায়ের দিকে ছুঁড়ে মেরেছিল। বাসবীদেবীর কপাল ফেটে গল গল করে রক্ত বেরোতে শুরু করলেও কোনও টুঁ শব্দ দেখলাম না বাড়ির কারোর মুখে। আমার নিজেরই খুব খারাপ লাগল। বয়স্ক মহিলা, নানা কাজের মানুষ। হয়ত আমার খাবারটা সময়ে করতে পারেন নি। তাবলে মার খাবেন ছেলের হাতে? এ শালা পশুপ্রেমী না পাষণ্ড। তবে এ তো সবে শুরু। এর পরের ঘটনাগুলো শুনলে আপনি বুঝতে পারবেন আমার জবানবন্দী দেওয়ার উদ্দেশ্যটা।

[৪]

অনেকদিন ধরেই কানাঘুষোটা শুনছিলাম। প্রতীমের নাকি বিয়ে দেওয়া হবে। আমি ভাবলাম যা শালা,এই পাগল-ছাগল ছেলের আবার বিয়ে ? এ তো মা-বোনের মত বউকে ধরেও পেটাবে ? একদিন এই নিয়ে অশান্তি চরমে উঠল। আমি ভয়ে ভয়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখছি। বোনটা সবার সামনে চেঁচাচ্ছে – এই বেকার হারামিটার তোমরা বিয়ে দেবে ? ঘরে আর অশান্তি ডেকে এনো না বলে দিচ্ছি। কেউ মেনে নেবে না। মেয়ের বাড়ির লোকেরা ছেড়ে দেবে ভেবেছো ?

কী অদ্ভূত ব্যাপার। বোনটার এই আশঙ্কায় একেবারে দুয়ো দিয়ে দিল বাবা-মা। বলল তুই তোর ঢ্যামনা প্রেমিককে বিয়ে করে বিদেয় হ। আমরা আমাদের ছেলের জন্য ঠিক ওর মতন মেয়ে খুঁজে আনব। এতে ক্ষতি নয়, লাভই হবে আমাদের। আমা শালা কুকুরের বাচ্চা। মানুষের লাভ-ক্ষতির কীই বা বুঝি ? তবে এটাও ঠিক। মানুষের সবচেয়ে প্রিয় পোষ্য হিসেবে কুকুরের সুনাম আছে। একটা কুকুর একজন মানুষকে যতটা বুঝতে পারে ততটা অন্য জীব বুঝতে পারে কী না সন্দেহ। প্রতীমের বিয়ের খবরেই একটা মন্দ কিছুর আঁচ আমি পাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম এই গোঁয়ার গোবিন্দকে বিয়ে করে কেই বা সুখী হবে ? আমি নিজেও তো একজন মেয়ে। ছেলে কুকুরের চাউনি আমি বুঝি। আমার শরীরে যৌবনের ঢেউ। আমি হাঁটলে, ঘুরলে, পা মুড়ে বসে থাকলে একটা আলগা চটক যে খেলা করে আমি তা জানি। আমার খোঁজে, আমার কাছে আসার জন্য এ বাড়ির লোহার ফ্রেম দিয়ে তৈরি বড় গেটে যে পাড়ার মদ্দা কুকুরগুলো ঘুরপাক খায় তাও আমি জানি। কখনও কখনও আমার এই অনুভূতিটা বেশ লাগে। সকলের নাগালের বাইরে থেকে বিউটি কুইন হয়ে ঘুরে বেড়িয়ে একটা আত্মগরিমার ভাললাগা তৈরি হয়। তবে এটাও তো ঠিক যে যার তার সঙ্গে ভালবাসার সম্পর্ক তৈরি করা যায় না। এটা একান্তই নিজস্ব ভাললাগার ব্যাপারষ। সেখানে কারও জোর করা বা হ্যাংলামোকে প্রশ্রয় দেব কেন ? কী মনে হচ্ছে হঠাৎ এত কথা বলছি কেন ? ধান ভানতে শীবের গীত বলে মনে হচ্ছে ? হয়ত সেইকমই হয়ে যাচ্ছে কিছুটা। কিন্তু কুকুর জীবনের যে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা, যন্ত্রণা থেকে এই কথা বলছি তা পুরোটা শুনলে আপনিও অবাক হয়ে যাবেন। ভাববেন এইরকমও হয় ?  কীভাবে ওই সব ঘটনার মধ্যে প্রবেশ করলাম সে কথাই বলি আপনাদের। পৃথিবীটা তাহলে এত অধঃপতনে চলে গেছে ?

[৫]

ওই যে আগে বলছিলাম যে কানাঘুষো চলছিল। তো সেটাই সত্যি হয়ে গেল। বাসবীদেবী আর জগদীশবাবু নানা দেখাশোনা করে তাদের সোনা ছেলের বিয়ে দিয়ে দিলেন। প্রতীমের বউ হিসেবে যে মেয়েটি এ বাড়িতে এল কী অপরূপ দেখতে তাকে। যেমন গায়ের রং, তেমনই আকর্ষনীয় চেহারা। শুনলাম পড়াশুনোতেও নাকি ভাল। কলেজ না বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় যেন পড়ছিল। ভাল পয়সাওলা ঘরের ফর্সা পাত্র দেখে মেয়ের বাড়ির লোকজন আর দেরী না করে বিয়ে দিয়েছে। আমি এতসব কথা জানব কী করে ? বিয়ে উপলক্ষে বাড়িতে তখন আত্মীয়-স্বজনের ছড়াছড়ি। চতুর্দিক থেকে নানা টাইপের ট্যাড়া-বাঁকা লোক এসেছে। বিয়েতে তাদের আমোদ দেখে কে ? অথচ কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছে না। আমি তো বাড়ির কুকুর। সব ঘরেই অবাধ যাতায়াত। আমাকে নিয়ে আদিখ্যেতা করতেও কম দেখলাম না। তো যে ঘরেই যাই দেখি অন্য আত্মীয়ের নামে নিন্দে মন্দ চলছে। কে কতটা সাজ দেখাতে পারবে তারই আয়োজন চলছে। একজন তো বলল শালা নীচু জাত, পণ হিসেবে প্রচুর পেয়েছে বলেই ঘরে এনেছে। ‘পণ’ কী, ‘জাত’ কী তখন অতটা বুঝিনি। তারপর ভাবলাম এসব আত্মীয় স্বজনের খেউর। এসবে কান দিতে নেই। বিশাল সম্পত্তি, ছোট সংসার বর আর বউ ভালভাবে মানিয়ে থাকলেই হয়ে গেল। আর আমার দরকার নতুন বউয়ের ভালবাসা। কারণ আগেই বলেছি প্রতীম একটা হারামি। আমাকে বাড়িতে এনে দুটো খেতে দিয়ে কম অত্যাচার করে নি। একটু বেচাল হলেই যখন তখন পড়ত লাথি বা লাঠির বাড়ি। আরে ভাই কিছুই নয়, একটা বাটি ভর্তি এঁটো-কাঁটা মাখানো ভাত। সেটা খেতে গেলে একটুতো ভাত পড়বেই। পড়ে যাওয়া ভাত পরে না হয় খেয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু বানচোৎটার তা হবে না। একটুও ভাত ফেলা চলবে না। এ বাড়িতে থাকতে গেলে এটাই নাকি শিক্ষা। আমাকে চেনে বেঁধে রেখে লাঠি দিয়ে সে কী মার। আমার প্রবল চিৎকারে শুধু বাড়ি নয়, আশপাশের লোকজনও শিউরে উঠছে। তাও থামে না সে। মানুষের বাচ্চা হয়ে একটা কুকুরকে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব হাতে তুলে নিয়েছে। শেষে বোনটা এসে হাতের লাঠি কেড়ে নিয়ে আমায় উদ্ধার করে। সে দিন শুধু প্রবল মার নয়, শোকে, দুঃখে অনুতাপে দীর্ঘ সময় ধরে জলের ধারা নেমে এসেছিল আমার চোখ দিয়ে। ভাবছিলাম এমন কেন হল ? দিব্যি তো শালা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছিলাম। আমাকে জোর করে তুলে নিয়ে এসে এমন কেন করছে লোকটা ? এই হল মানুষের ভালবাসার নমুনা ? তুমি তো তোমার আনন্দের জন্য, মজার জন্য আমাকে এখানে ধরে এনেছো! কখনও গলা জড়িয়ে আদর করছো আবার কখনও বেধড়ক ক্যালাচ্ছো। লাথি মারছো। এই সব মানুষকে আমি ঘেন্না করি। এইসব কুকুরপোষা ভালবাসায় আমি থুথু দিই। দিনের পর দিন, এভাবে মার খাওয়ার পর আমি এ বাড়ি ছেড়ে বারবার পালাতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারি নি। লোহার মোটা গেট আর উঁচু পাঁচিল আমাকে সে সুযোগ করে দেয় নি। আমি পশু হয়েও আর এক পশুর ভয়ে বাড়ির বিভিন্ন কোণে. অন্ধকারে সিঁটিয়ে থেকেছি। তবে যখন পালানোর সুযোগ ঘটল তখন কিন্তু অনেক দেরী হয়ে গেছে।

[৬]

বাড়িতে নতুন বউ আসতেই চেনা দৃশ্যটার কিছুটা বদল হয়ে গেল। প্রতীমের প্রতিদিনের রুটিন গেল বদলে। সকাল থেকে রাত টিভিতে ক্রিকেট, হিন্দি সিনেমা, ব্লু ফিল্ম, আমাকে নিয়ে সময় কাটানো ছেড়ে বউকে নিয়ে মেতে উঠল সে। প্রথম প্রথম সিনেমা দেখতে যাওয়া, আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, বাইরে ভালমন্দ খেতে যাওয়া এই সব নিয়ে কেটে গেল মাস ছয়েক। নতুন বউ সংহিতা আমায় খুব ভালবাসতো। বিয়ের পর শুধু আমার নয় বাড়ির সকলেরই ভাল-মন্দর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল সে। অত্যাচার থেকে রক্ষা পেয়ে আমারও আনন্দে শ্বাস নেওয়ার মতো একটা স্পেস তৈরি হয়ে গেল এ বাড়িতে। কিন্তু একদিন অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম নতুন বউয়ের চোখে জল। প্রতীম নাকি তার উপর অত্যাচার করে। মারধোর করে। যৌন নিপীড়ন করে। এসব আমি প্রথম প্রথম বুঝিনি। যখন বুঝলাম তখন তার বীভৎসতা দেখে শিউরে উঠলাম। প্রীতম তার বউকে ভালবাসে না। সে একটা লোভী কুকুরের মত তার বউয়ের পেছনে লেগে থাকে। উদাহরণ হিসেবে কুকুরের কথা আনলাম তার কারণ এছাড়া আর কোনও ভাল শব্দ আমার জানা নেই। সে তাকে নিয়মিত সিনেমায় দেখা ভিলেনগুলোর মত ধর্ষণ করে। একবার নয় বারবার। যখন খুশি তখন। আমি বউমণির চিৎকার শুনতে পাই। প্রতীমের ঘরে ধ্বস্তাধস্তির শব্দ শুনতে পাই। আমার গা শির শির করে। কিন্তু জানি সে ঘরে যা চলছে তাতে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। সব কাজ সেরে ওই ছোট্ট হাফ প্যান্ট আর লাল গেঞ্জি পরে লোমশ গায়ে মুখ দিয়ে হিস হিস শব্দ করতে করতে আর নাল ফেলতে ফেলতে লোকটা যখন বেরিয়ে আসত তখন আমার মনে হত ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। কামড়ে খামচে ছিঁড়ে-খুঁড়ে দিই ওর পৌরুষ যন্ত্র। কিন্তু সে সব সাহসে কুলোলো না। জানলাম এর পেছনে শুধু একা প্রীতম নয়, এ বাড়ির সকলেই আছে। সেই যে বিয়ের সময় শুনেছিলাম নতুন বউ নীচু জাত, সেই নিয়েই সুর চড়তে দেখলাম বাড়িতে। নতুন বউ এত কাজ করে, এত সুন্দর দেখতে। এত সবাইকে ভালবাসতে চায় তবুও বাড়ির সকলে তাকে কেন পছন্দ করে না বুঝতে পারতাম না। একদিন দেখি শাশুড়ি আর ননদ মিলে নতুন বউকে মারছে। মারছে মানে রীতিমতো লাথি, চড়, কিল ঘুঁসির বন্যা বইছে। টেনে কাপড় খুলে দিচ্ছে। আমি ভাবছি এ কীরে ভাই, মেয়েরা মেয়েদের উপর এরকমভাবে অত্যাচার করে, শ্লীলতাহানী করে ! শুনলাম বউয়ের বাড়ি থেকে নতুন করে চাওয়া পণের টাকাটা এখনও আসেনি। নীচু জাতের মেয়ে বলে বিয়ের পর আরও এক লক্ষ টাকা বেশী পণ চাওয়া হয়েছে। প্রীতমরা নাকি ব্রাহ্মণ। ওদের পদবি বন্দ্যোপাধ্যায়। আর বউমণিরা হল দত্ত। নীচু ঘরের কায়স্থ। ব্রাহ্মণের সঙ্গে নীচু ঘরের মেয়ের বিয়ে হওয়ায় আত্মীয়-স্বজন নাকি ছ্যা ছ্যা করেছে। বংশের সর্বনাশ হবে বলে সমালোচনা করেছে। তবে পয়সাওলা বনেদি ঘর, উঁচু জাত এইসব সামনে রেখে ইতিমধ্যেই বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার দু লক্ষ টাকা পণ হিসেবে আদায় করেছে। আত্মীয় স্বজন ছ্যা ছ্যা করায় সেই ক্ষতে মলম দিতে আরও এক লাখের দাবি করা হয়েছে এক মাস আগেই। এখনও কেন সরকারি চাকরি করা বউমণির বাবা সে টাকা পাঠায় নি সেই নিয়েই মারধোর পর্ব চলছে। উঁচু জাতের সঙ্গে নীচু জাতের মানুষগুলোর শরীর জুড়ে কী তফাৎ তাও ঠাহর করতে পারলাম না। বুঝলাম এ শালা ধাপ্পাবাজি। কেড়ে কামড়ে খাওয়ার পথ। কুকুর হয়ে মানুষগুলোর এইরকম হারামিপনা দেখে অবাক হয়ে গেলাম। দেখছি বউমণির দু-চোখ বেয়ে নামছে জলের ধারা। হাত জোড় করে মারের হাত থেকে রেহাই পেতে চাইছে সে। অন্যদিকে কেন জানি না পৃথিবীর সমস্ত রাগ ভর করে বসেছে সম্পর্কে শাশুড়ি আর ননদ হওয়া দুই মহিলার উপর। চোখ দিয়ে যেন আগুন ছুটছে। ওরা বলছে, টাকা না এলে তোকে আমরা খুন করে ফেলব। গায়ে গাড়ির পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারব।

এখন আমি কী করব ? আমার কী করা উচিত ? কীই আমি করতে পারি ? এই সব ভাবতে ভাবতেই কেন জানিনা ভিজে গেল আমার দু চোখ। জলের ধারা নেমে গেল আমার দু-গাল বেয়ে। পুঁচকে বেলায় রাস্তা থেকে অপহৃত হওয়ার এতদিন পর আবার কেঁদে ফেললাম আমি। আগে কেঁদেছি নিজের জন্য,এবার একজন মানুষের জন্য।

[৭]

আমি যখন এ বাড়িতে প্রথম আসি তখন একেবারে রে রে করে উঠেছিলেন প্রতীমের বাড়ির লোকেরা। বলেছিল এ শালা রাস্তার নেরি কুত্তাটাকে আবার বাড়িতে ঢোকালি কেন ? তখন রাস্তা থেকে ফোঁকটাই তুলে আনা আমার মত ফুটফুটে চারপেয়ে পেয়ে প্রতীমের আহ্লাদ দেখে কে। কুকুররা যে কত ভাল হয় বাড়ির লোককে সে প্রমাণ দিতে সিডি চালিয়ে ‘হাচিকো’ নামের একটা কুকুরকে নিয়ে  সিনেমা দেখিয়েছিল সে। ওতে একটা কুকুরটার একজন মালিক ছিল। হঠাৎ একদিন মালিকটা গেল মরে। কাজে গিয়ে আর ফিরলই না। কিন্তু কুকুরটি তার মালিকের জন্য প্রতিদিন একটা রেল স্টেশনে গিয়ে অপেক্ষা করত। যদি সে ফিরে আসে। এইভাবে ৯ বছর ৯ মাস ধরে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সে স্টেশনের সামনে প্রতিদিন অপেক্ষা করেছিল। পরে ওই স্টেশনের বাইরে ওই প্রভুভক্ত কুকুরের একটা স্ট্যাচুও তৈরি করে দেওয়া হয়। প্রথমে ওই ছবিটা দেখে আমি প্রতীমকে ভাল মানুষই ভেবেছিলাম। পরে দেখলাম শালা হাড় হারামি। চেহারা মানুষের হলেও আদপে একটা পশু। আমাকে মারধোর করলেও বউমণির উপর অত্যাচারের ব্যাপারটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। একজন মানুষকে একটা কুকুর ভালবেসে ফেললে তার যে কীরকম কষ্ট হয় সে কথা ভাবতে গিয়েই ওই সিনামাটার কথা মনে পড়ে গেল। এক এক সময় বউমণি খুব কাঁদে। বিশেষ করে যখন বাপের বাড়ির লোকেরা দেখা করে চলে যায় তখন। তারা চায় বউমণি সংসার করুক। যেমন করে হোক শ্বশুরবাড়ির চাহিদা মত টাকা পয়সার জোগাড় তারা করে দেবেন। কিন্তু বনেদি বাড়ি, উঁচু ঘর, বিশাল সম্পত্তি এমন শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে যাওয়া উচিত হবে না। বউমণির নিজের মা কিন্তু খুব সাহসী। অনেকটা আমার মায়ের মত। এসব ঘটনা ঘটলেও আমার মাকে মনে পড়ে। মা এখন কোথায় কে জানে ? আমি যখন অপহৃত হলাম তখন মা কাছেপিঠে ছিলই না। হয়তো আমাদের জন্য খাবারের খোঁজে গিয়েছিল। এসে দেখল আমি নেই। তারপর কী করল মা ? আমাকে কী খুঁজতে বের হল ? ভাইদের ডেকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল আমি কোথায় ? বাড়ি ছেড়ে চলে আসার পর আমি খুব কেঁদেছি। ওই অন্ধকার সিঁড়ির নীচে ওরা থাকতে দিয়েছিল আমায়। মাও কী আমাকে না পেয়ে খুব কেঁদেছিল ? একমাত্র মেয়ে ছিলাম আমি। মাঝে মধ্যে রাতের বেলা কুকুরদের করুণ চিৎকার শুনি। যেন কাউকে খুঁজে ফিরছে। ওর মধ্যে কী আমার মা আছে ? এখনও কী রাত হলে আমায় খুঁজে বেড়ায় মা ? কী সব ভুলভাল ভাবছি। আমারই তো এত বয়স হল। মায়ের তো আরও অনেক বেশী। এতদিন একটা কুকুর বাঁচতে পারে? কে জানে, হয়ত মা মরেই গেছে। কিন্তু আমার ভাইয়েরা ? ওরা কোথায় ? বউমণির একটা ছোট্ট ভাই আছে। আর আমার ছিল সাত ভাই। কে জানে ওরা কোথায় ? ওরা বেঁচে আছে তো ? দুটো ভাই তো নর্দমার জলে পড়ে গিয়ে ঠাণ্ডা লাগিয়ে যা তা শরীর খারাপ করে ফেলেছিল। তখনই কুঁইকুঁই করত। আর বাকিরা ? গাড়ি চাপা পড়ে মরে যায় নি? এই সব কথা, ভায়েদের কথা, মায়ের কথা সব ভির করে আসে আমার মাথায়। বউমণি কাঁদে, আমিও কাঁদি। বউমণি আমায় ভালবাসে। আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। আমি বুঝতে পারি এটা ভালবাসার হাত। একজন মেয়ে হয়ে আর এক মেয়ের পাশে থাকার চেষ্টা করি। বউমণির গানের গলা খুব সুন্দর। সেবার বউমণির বাবা এসে দিয়ে গেলেন একটা বই। বললেন মামনি এই ‘গীতবীতান’টা তোর কাছে রাখ। বইটা বুকে জড়িয়ে ধরেই বউমণি  গেয়ে উঠল একের পর এক গান। … পরে শুনলাম ওই বইটায় রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গান। প্রবল দুঃসময়ে, সংকটে তাঁর গানগুলোই নাকি তাকে কোথাও একটা মুক্তির স্বাদ এনে দেয়।

[৮]

কী জানি  গানগুলোর মধ্যে কী যেন একটা শক্তি লুকিয়ে ছিল। আমি যখন কোথাও কোনও আলোর দিশা খুঁজে পাচ্ছি না, তখন বউমণির গাওয়া  গানগুলোর কথাই মনে পড়ত। বউমণি গাইত – ‘মুক্ত করো ভয়, আপনা-মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।’ আরও কতগুলো গান ছিল. মাঝে মধ্যে বউমণি গাইত। আর আমি একটু দূরে পা মুড়ে বসে চুপটি করে শুনতাম। গান শেষ হলে বউমণি আমাকে উদ্দেশ্য করে বলত এটাও রবীন্দ্রনাথের গান। কিছু বুঝলি? যেন আমি কতই বুঝেছি। তবে আমার ভাল লাগত। সেই ভাললাগাটাই একদিন কষ্টে পরিণত হল। আর সেই কষ্টটাই আমাকে তাড়িয়ে বেড়ালো সর্বত্র।

আমার আশঙ্কা সত্যি করেই একদিন মরে গেল বউমণি।আসলে মেরে ফেলা হল। এ বাড়িতে এসে বউমণির বাড়ির লোকের সে কি কান্না।প্রতীমদের সকলের বিরুদ্ধে বধূহত্যার মামলা করা হল। পুলিশ,প্রেসের লোক,পাড়ার লোকে কদিন ভরে গেল বাড়ি।শেষ দেখে ছাড়বেন বলে জানিয়ে গেলেন বউমণির বাবা।তাঁর সঙ্গেই এবাড়িতে আসতেন এক উকিলবাবু।বউমণিদের আত্মীয়।তিনিই দ্বায়িত্ব নিলেন এই মামলা লড়ার।তারপর কদিন যেতে না যেতেই সব কেমন যেন চুপ মেরে গেল।এই বাড়িতে জলজ্যান্ত একজন মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে তার কোনও প্রভাবই নেই।বছরের পর বছর ঘুরে গেল।কলকাতার বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারে রহস্যময় বধূহত্যার ঘটনা চাপাই পড়ে গেল।

প্রতীমদের বাগানওলা বিশাল বাড়িতে তখন যেন আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন আমায় একটা বস্তার মধ্যে পুরে দিয়ে তার মুখটা বেঁধে দিয়েছে। আমি কিছুতেই বেরোতে পারছি না। অথচ আমাকে আমার লক্ষ্যটা পূরণ করতেই হবে। মনে পড়ে গেল সেই সিনেমায় দেখা ‘হাচিকো’র কথা। একদিন তাল ঠুকে বেরিয়েই পড়লাম এই অভিশপ্ত বাড়ি থেকে। বাঁ পাশের গলিটা দিয়ে কিছুটা যেতেই দেখলাম কতগুলো কুকুর তাড়া করেছে আমায়। চেহারা ভাল হওয়ায় একটু রুখে দাড়াতেই ওরা থমকে গেল। কেউ আর খুব একটা কিছু বলল না। আমি দৌড় শুরু করলাম। এক জায়গায় একটা খাঁকি পোশাকের লোক দেখলাম। খাঁকি মানে নিশ্চয়ই পুলিশ। এরকম লোক আমি প্রতীমদের বাড়ি দেখেছি। দিনের পর দিন এসেছে। খেয়েছে, গল্প করেছে, চলে গেছে। কী মনে হল লোকটার পিছু পিছু গেলাম। আরিব্বাস এখানে যে খাঁকি পোশাকের ছড়াছড়ি। যত লোক, তত খাঁকি। আমি ঘাবড়ে গিয়ে কী উদ্দেশ্যে এসেছি ভুলে গেলাম। যত্রতত্র ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। একটা খাঁকি এসে আমায় হঠাৎ পেটাতে শুরু করল। আমি বিপদ বুঝে পালিয়েই এলাম। কিন্তু মনের ভেতর জেদটা আরও চেপে বসল। মনে হল সত্যের জন্য  আমাকে এগিয়ে যেতেই হবে, তা যত বিপদই আসুক না কেন।এই খাঁকিদের যে মাথা তাঁকে ব্যাপার বোঝানোর প্রয়োজন। তাই দিন দুয়েক অন্তর অন্তর আমি ওই খাঁকি বাড়িতে যেতে লাগলাম। এ বারান্দা ও বারান্দা ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। লোকগুলো আমায় চিনে গেল। তখন আর কেউই কিছু বলত না। হঠাৎ একদিন দেখি একটা খাঁকি আমায় দেখে বলল আরে এটা প্রতীপবাবুদের কুকুর না? অবাক হয়ে আমি লোকটার মুখের দিকে তাকালাম। একে আমি চিনি, যাকে আমি প্রতীমের হাত ধরে বউমণির ঘরে ঢুকতে দেখেছি।বউমণিকে যৌথ ধর্ষণের পর প্রতীমের সঙ্গে এক  উল্লাসে ফেটে পড়ত দেখেছি। দিনের পর দিন। পুলিশটা চিনে ফেললেও আমি ঘাবড়ালাম না। আমার ওই বাড়িতে যাওয়া আরও বেড়ে গেল। প্রায় প্রতিদিন। একদিন একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। দেখলাম একটা কালো কোর্ট পরা লোক ওখান থেকে বেড়োচ্ছে। আমি ওনাকে চিনি। প্রতীমের বাড়িতেই দেখেছি। আমি জানি উনি বউমণির পক্ষের মানুষ। আমার ওনাকেই দরকার। কী মনে হল আমি সামনেই দু পা তুলে দাড়িয়ে গেলাম। যেন কিছু বলতে চাই। আমাকে দেখেই চিনে ফেললেন কালো কোর্ট। গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন কিছু বলবি? সম্ভবত আমার চোখের ভাষা পড়ে ফেললেন তিনি। আমায় নিয়ে চলে গেলেন তার বাড়িতে। আমায় ঠিকানা গেল বদলে উকিল বাবুর বাড়ি।

[৯]

এর পরের ঘটনাটা ইতিহাস। আমায় পেয়ে কী রকম যেন চেগে উঠলেন উকিলবাবু। আমাকে দেখতে ভাল বলে আগেই নাম দিইয়েছিলেন ‘ফাইন’। থাকতে দিলেন সিঁড়ির নীচের ঘরে।

– একদিন বললেন আচ্ছা ‘ফাইন’ তুই সব জানিস তাই না?

– আমি হাঁ করে রইলাম

– তুই তো সব দেখেছিস, তাই না?

– আমি হাঁ করে রইলাম

– যে শুয়োরের বাচ্চারা এটা করেছে – তুই তো তাদের প্রত্যেককে চিনিস, তাই না?

– আমি হাঁ করে রইলাম

– কিন্তু কী করি বল, তুই তো কথাই বলতে পারিস না। এত কিছু আমি প্রমাণ করব কী ভাবে?

– আমার চোখ ফেটে জল চলে এল। আমি অনেক কিছু বলতে চাই কিন্তু কাউকে বলতে পারছি না। আমার বুকের ভেতর কেমন একটা যন্ত্রণা হচ্ছে। আমি উকিল বাবুর দিকে তাকিয়ে কুঁইকুঁই করে আওয়াজ করে উঠলাম। উকিলবাবু আমার পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলেন। কী মনে হল হালকা করে বললেন তুই কাল আমার সঙ্গে কোর্টে যাবি। ঘরে থেকেই বা কী করবি? এরপর আমার রুটিন গেল পালটে। আমি প্রতিদিন উকিলবাবুর গাড়িতে করে আদালতে যেতাম। আবার গাড়িতে করেই ফিরে আসতাম। কিন্তু আদালতের ভেতরে ঢোকার অনুমতি আমার ছিল না। আদালতের কাছেই একটা চেম্বারে উকিলবাবু বসতেন। সেখানেই ঘুরে বেড়াতাম আমি। কদিনেই সেখানে যারা কাজ করে সকলেরই খুব প্রিয় হয়ে উঠলাম। কারণ আমায় দেখতে খুব সুন্দর। সুন্দরকে সবাই পছন্দ করে। তবু মাঝে মধ্যে ভাবি বউমণিও তো সুন্দরী ছিল। তবুও তাকে বিশালবাড়ির ওই লোকগুলো পছন্দ করত না কেন?

[১০]

একদিন একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। আমি অবিকল মানুষের ভাষায় বলে ফেললাম – আমি কিছু বলতে চাই।

উকিলবাবু খুব ঘাবড়ে গেলেন। কোথা থেকে কে কথা বলছে খুঁজতে লাগলেন। তারপর যখন দেখলেন এ গলা আমার তখন স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন, নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই। যখন কিছুটা স্বাভাবিক হলেন তখন করে বসলেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফোন। উত্তেজনায় তাঁর সারা শরীর কাঁপছে। আমারও। কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে এলেন একজন বিজ্ঞানী, একজন পশু চিকিৎসক সহ কয়েকজন। নাওয়া-খাওয়া মাথায় উঠল। সেদিনের গুরুত্বপূর্ণ কেস বাতিল করে দিলেন।

বেশ কদিন কিছু পরীক্ষা, কিছু পর্যবেক্ষণ, কিছু কথা হওয়ার পর জানা গেল যে  আমার মধ্যে থাকা প্রবল প্রতিবাদ, সত্যিটা সামনে আনার প্রবল ইচ্ছে শক্তিই নাকি কথা আমাকে বলতে সাহায্য করেছে। আমাকে জড়িয়ে ধরে উকিলবাবুর সে কী উল্লাস। বললেন তোর উপরই সবকিছু নির্ভর করছ রে ‘ফাইন’। এমন একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে যা আগে কখনও হয়নি। হাতে এখনও একমাস সময় আছে। কী করে কী করতে হবে আমি তোকে সব শিখিয়ে দেব।

এর মধ্যেই আমি বিখ্যাত হয়ে গেলাম। মাঝে মাঝে কিছু লোক এসে আমার ছবি তুলে নিয়ে যেত। প্রতিদিন একগাদা খবরের কাগজ,টিভি চ্যানেল,ইউটিউব চ্যনেলের লোকজনকে সসম্মানে বিদায় করতেন উকিলবাবু। বিদেশীরাও নাকি খবর খবর নিচ্ছে।  তারা নাকি আমার ইন্টারভিউ নিতে চায়। আমার ঘর আলাদা হয়ে গেল। আমার জন্য সিকিউরিটি বসল। আমি তো তাজ্জব। এ আবার কী ব্যাপার রে ভাই।

[১১]

বিশেষ প্রবেশাধিকার মেলায় আজ আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি মহামান্য বিচারকের সামনে। আমার সামনে একটা যন্ত্র। ঘর ভর্তি নানা ধরণের মানুষ। এরা নাকি মিডিয়ার লোক। একজন কুকুর হয়ে আমি যে আদালতের সামনে কিছু বলতে এসেছি তাতে নাকি হৈ চৈ পড়ে গেছে চতুর্দিকে। বিভিন্ন কাগজে আমার ছবি ছাপা হয়েছে। বিভিন্ন চ্যানেল নাকি আমার ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য বসে আছে। কিন্তু আমি তো সামান্য কুকুর। আমার এসবে কাজ কী ? আমার তো ভাবনা একটাই। সে লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমি শান্তি পাচ্ছি না কিছুতেই। কী যেন একটা অস্বস্তি তাড়া করে বেড়াচ্ছে সব সময়। বিচারকের অনুমতি পেতেই আমি নিজেকে প্রস্তুত করে বলতে শুরু করলাম আমার কথা। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল প্রতীম বন্দ্যোপাধ্যায়দের জেলখানার মত ওই বিশাল বাড়িটা। আমি দেখতে পেলাম হিংস্র মুখগুলো। আমি দেখতে পেলাম কী করে বউমণির মত নিরীহ নিরপরাধ একজন মেয়েকে দিনের পর দিন অত্যাচার করেছে ওই মানুষরূপী পশুগুলো। দিনের পর দিন নিজের ঘরের মধ্যেই ধর্ষিতা হয়েছে সে। আমার মনে পড়ল পণের টাকা না পেয়ে বউমণিকে মারতে কেমন করে দুপুরবেলা তার বিছানায় বিষাক্ত সাপ ছেড়ে দিয়েছিল বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। তারপর দেহটা ফেলে রেখে আসা হয়েছিল বাগানে। পুরো প্ল্যানটা যে বা যে সব পুলিশের তারা প্রত্যেকেই বহুবার এসেছে প্রতীমদের বাড়িতে। দিনের পর দিন বাড়িতে বসেছে মদের আসর। লেনদেন হয়েছে কয়েক লক্ষ টাকার। বিনিময়ে পুলিশের তরফে ক্লিনচিট মিলেছে পুরো পরিবারের। ওই সময় কী হা-হুতাশ করতে দেখেছি বউমণির বাবা ও তার বাড়ির লোকেদের। বারবার প্রতীমদের বাড়িতে একরাশ সন্দেহ নিয়ে হাজির হতেন উকিলবাবু। আর আমি? গোটা বাড়িময় কেঁদে বেড়াতাম বউমণির জন্য। চোখের জল ফেলতাম কিন্তু কেউ দেখতে পেত না। মনের মধ্যে রাগ গরগর করত কিন্তু প্রকাশ করতাম না। শুধু অপেক্ষা করতাম সঠিক সময়ের। এইভাবে বছর পাঁচেকের শ্বাসবন্ধ করা জীবনের পর একদিন পালিয়েই গেলাম প্রতীমদের বাড়ি থেকে। ঘটনাক্রমে আমার ঠিকানা হয়ে গেল উকিলবাবুর বাড়ি।

কী আশ্চর্য আমি আদালতে দাঁড়িয়ে এত কথা বলে যাচ্ছি, অথচ কারও কোনও প্রতিবাদ নেই। ওই যে ওইদিকে দাঁড়িয়ে বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির তিন নরকের কীট। কী রকম যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে মুখগুলো। অন্যদিকটায় মাথা হেঁট করে ন্যাতার মত দাঁড়িয়ে অভিযুক্ত পুলিশগুলো। আদালত কক্ষে পিন ড্রপ সাইলেন্স। উকিলবাবু আমাকে ইশারা করে বোঝালেন আজ আমার দিন। আমার উপরই নির্ভর করছে এই মামলার রায়। দোষীদের শাস্তি। মনে পড়ল বউমণির কথা, মনে পড়ল হাচিকোর কথা। চোখটা বুজে ফেললাম। দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তেই মনটা শক্ত করে আবার বলতে শুরু করলাম।

[১২]

কুখ্যাত বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের কিনারা না হওয়া গৃহবধূ খুনের রহস্য এভাবে উন্মোচিত হওয়ায় স্তম্ভিত হয়ে গেল গোটা সমাজ। সবকিছু বিচার করে  বিচারক তাঁর ঐতিহাসিক  রায় ঘোষণার পর অনুমতি পেলাম বাইরে  বেরোনোর। বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে চারিদিকে। আজ মনটা খুব হালকা আর ভাল লাগছে। আমাকে ঘিরে  সংবাদমাধ্যমের  হাজারো প্রশ্ন আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইটের বন্যা। হঠাৎ একটু দূরেই দেখলাম বউমণির বাবা। আমার দিকে কেমন একটা কৃতজ্ঞচিত্তে তাকিয়ে। এক্ষুনি হয়ত এসে ধন্যবাদ দেবেন। আমি দেখলাম ওনার হাতে ধরা একটা বই। বউমণির সেই গীতবিতানটা। আমি জানি ওর ভেতর আছে সেই গানটা – ‘মুক্ত করো ভয়, আপনা-মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।’। আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল।

[বানানবিধি/মতামত লেখকের নিজস্ব] 

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2021 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ