03 Nov

বুমেরাং

লিখেছেন:শম্পা সাহা


“মন্টু, শুনলাম নাকি ওই নীল দোতলা বাড়ির ছোট ছেলেটার করোনা হয়েছে?”

“হ‍্যাঁ জেঠিমা আমিও তাই শুনলাম।”

“হবে না ,চোপর দিন মোটরসাইকেলে কাঁধে সিলিন্ডার মিলিন্ডার নিয়ে ডাক্তার সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কি না কি সব গ্ৰুপ ট্রুপ খুলে মানুষের সেবা করছে।আরে বাবা তুই কি ডাক্তার ?বেশি পাকা !এই করে এ পাড়ায় তো ওই করোনা ঢোকালো!”

মন্টু জলের ড্রামটা গেটের সামনে রাখে।দত্তগিন্নী স‍্যানিটাইজার ছড়িয়ে দেন পুরো বোতল জুড়ে।হাঁক পারেন,”নন্তু এই নন্তু জলের ড্রামটা নিয়ে যা।”

“তুই তো ওদের বাড়িও জল দিস? “এরপরের প্রশ্নবাণ মন্টুর দিকে।

“হুঁ”,দশটাকার নোটটা পকেটে গুঁজতে গুঁজতে মন্টু জবাব দেয়।

“শোন,ওদের বাড়ি জল দিলে আমরা কিন্তু আর জল নেবো না।তাহলে অন‍্য লোক দেখবো!”

“কিন্তু জেঠিমা, তাহলে ওরা জল পাবে কোথা থেকে?”

“ওসব জানিনা বাপু,লোকের রোগ নিজে ডেকে নিতে পারবো না!”

মন্টু ভেবেছিল যে যাই বলুক ,ওই বাড়িতে ও জল দেবেই কিন্তু যখন একে একে  পাড়ার সব বাড়িই এই এক মতামত জানালো মন্টু রায় বাড়ি মানে ওই নীল দোতলা বাড়ির গিন্নীকে জানিয়ে দিল,সে আর তাদের বাড়ি জল দিতে পারবে না, লোকে অবজেকশন করছে।তাই মালিক তাদের বাড়িই জল দিতে বারণ করেছে।

জ‍্যোৎস্না সবে হাসপাতাল থেকে ফিরেছে।ও শহরের এক নামকরা সরকারি হাসপাতালের নার্স।যেহেতু কোভিড পেশেন্ট দেখভাল করতে হয় তাই প্রথমবার বাড়িওয়ালা বাড়ি ছাড়তে বলেছিল ।সেবার পুলিশি হস্তক্ষেপে যদিও ব‍্যাপারটা মেটে তবু দোকানে গেলে সবাই দূরে সরে যায়,সবার শেষে মালটা ও পায়।যেন ও নার্স নয় মূর্তিমান করোনার ফ‍্যাক্টরি।কিন্তু ওর নিজেরও তিন বছরের বাচ্চা।আয়াদিদির ভরসায় ছোট্ট সঞ্চারীকে রেখে এ সময় বেশিরভাগটাই ওকে হাসপাতালে কাটাতে হয়।সারাদিন পি পি ই কিট পড়ে,রাতে বাড়ি ফিরে এত ক্লান্ত,এতো এক্সহস্টেড লাগে যে মেয়েটাকে পর্যন্ত আদর করার যেন শক্তি পায় না।কিন্তু এখন এ পরিস্থিতিতে নো ছুটি!তাই পরদিন আবার শরীর টেনে চলে হাসপাতালে।

সেদিন দত্তগিন্নী পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে মুখে আঁচল দিয়ে এই সব ব‍্যাপারেই একটা মিটিং মত ক‍রছিল।একটু দূরে দূরে,রোগের ভয়ে!জ‍্যোৎস্না ফিরতি পথে জটলা দেখে শুধু বলে,”কাকিমা,এখন জটলা করছেন কেন?আর মাস্ক ও তো নেই দেখছি।যান বাড়ি ।অকারণ ভিড় করা এখন ঠিক নয়!”

পাড়ার মহিলা মহল রে রে করে তেড়ে ওঠে,”তুমি বলার কে?এ পাড়ায় ওসব তো তোমরাই আনছো! আমরা বাড়িতেই থাকি ,তোমরাই তো মরামুরা ঘেঁটে আসছো।রোগ যদি ছড়ায় তো তোমাদের জন‍্যই ছড়াবে”!

জ‍্যোৎস্না বুঝলো বিরাট ভুল হয়ে গেছে।এভাবে  ওর কথাটা বলা উচিত হয়নি।আসলে

হাসপাতাল থেকে বেরোবার ঘন্টাখানেক আগে একটা বছর বাইশের তরতাজা ছেলেকে চলে যেতে দেখে  একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে ওর মন।কি প্রাণ চঞ্চল ছিল ছেলেটা।অনীক না কি যেন নাম!একটু সুস্থ লাগলেই গুনগুন করে গান জুড়তো।সে যে এভাবে চলে যাবে,অবিশ্বাস্য!তারপর থেকেই জ‍্যোৎস্না খুব ভেঙে পড়েছে মনে মনে।তার উপরে এসব বেয়াক্বেলা লোকেরা কিছুটা ইচ্ছে করে ইনফেকশনের সম্ভাবনা বাড়াবে আর তারপর মরণ যত নার্স ডাক্তারদের।তাই বলে ফেলেছে।কিন্তু পাড়াতুতো নারীবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে ও নিজের বোকামোতে নিজের ওপরই রেগে যায়।ক্লান্ত শরীরে, কথা না বাড়িয়ে পা চালায় বাড়ির দিকে!

দিন পাঁচেক পর,হঠাৎ রাত প্রায় সারে বারোটা।আননোন নম্বর থেকে ফোন,”মা,তোমার কাকু কেমন যেন ক‍রছে,একটু আসবে!” দত্তবাবু সুগারের পেশেন্ট কিন্তু পাড়ার মোড়ে চা না খেলে তার ভাত হজম হয় না।বেশ কিছুদিন ধরেই  জ্বর জ্বর।প‍্যারাসিটামল খেয়ে কদিন ভালোই ছিল।কিন্তু আজ চায়ের দোকান থেকে ফিরে শরীর খুব খারাপ।সন্ধ‍্যেটা যেমন তেমন ।এখন চোখ ঠেলে বেড়িয়ে আসছে,বেশ বোঝা যাচ্ছে,শ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছেন।

জ‍্যোৎস্না তাড়াতাড়ি বাবলু মানে ওই নীল দোতলা বাড়ির ছেলেটাকে ফোন করে।ও এখন সুস্থ।ফোন পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার কাঁধে হাজির। মুহুর্তের মধ‍্যে অক্সিজেন দেওয়াতে দত্তবাবু আধঘণ্টা খানেক পড়ে বেশ স্থিতিশীল।

আসলে দত্তবাবুর দুই ছেলে একজন দিল্লী অন‍্যজন ব‍্যাঙ্গালোরে।আর মেয়েতো বিয়ে হয়েছে খড়্গপুর।নন্তু সারাদিন থাকে ,বাজার টাজার করে ,ফাইফরমাশ খাটে কিন্তু রাতে তো সে নিজের বাড়িতে।তাই বুড়োবুড়ি একা।জ‍্যোৎস্না নার্স, পাড়ার বিপদে আপদে সে সবার জন‍্যেই যতটা পারা যায় করে।

রাত প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ দত্তবাবু ঘুমোলে তারপর জ‍্যোৎস্না,বাবলু আর ওর বন্ধু ওয়াসিম বের হয়।জ‍্যোৎস্না বার বার বলে যায়,পরদিন যেন কোভিড টেস্ট টা করানো হয়।বাবলু অবশ‍্য টেস্ট করানোর যাবতীয় দায়িত্ব নেয়।

টেস্ট যথারীতি পজেটিভ।জ‍্যোৎস্না আগেই সন্দেহ করেছিল,তবু রিপোর্ট না পেলে তো কিছু বলা যায় না!দত্তগিন্নী  ভীষণ কান্নাকাটি জুড়ে দিলেন,”কে দেখবে আমাদের?”,ছেলেরা তো এই সিচুয়েনে আসতে পারবে না।

বাবলু ভরসা দেয়,”চিন্তা করবেন না কাকিমা, আমরা সবাই আছি ,কাকু খুব তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবেন!”গেট থেকে বেরোতে যেতেই বাবলু মন্টুর মুখোমুখি।মন্টু  জল দিতে এসেছে।ও কি একটা বলতে যাচ্ছিল, বাবলু চোখের ইশারায় ওকে থামিয়ে দেয়।

“কোনো দরকারে ফোন করবেন কাকিমা, সে যত রাতই হোক,আমরা সব সময় আপনার পাশে আছি!”বাবলুর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে দত্তগিন্নী ভাবেন,”অপরকে বললে নিজের হয়,এই কথাটা যে কত  বড় সত‍্যি তা আজ তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেলেন!”

[বানানবিধি/মতামত লেখকের নিজস্ব]  

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2021 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ